Home দহনসুধা দহনসুধা পর্ব ৭

দহনসুধা পর্ব ৭

দহনসুধা পর্ব ৭
১৫ জন রাইটার

শত্রুর হাতে হাত রাখার মতো তিক্ত কাজটুকু কখনোই কল্পনাতেও আনেনি উমেরা। যে মুখটা দেখলেই তার বুকের ভেতর রাগের দহন জ্বলে উঠত, আজ সেই হাতটাই ধরতে হয়েছে তাকে। পরিস্থিতির চাপে ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায়, দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড়াতে হয়েছে। পায়ে পা মিলিয়ে ছুটতে হচ্ছে একই পথে। উমেরার ভেতরে তীব্র অস্বস্তি আর অনিচ্ছার ঢেউ উঠেছে তবুও সে থামতে পারছে না। কারণ জানে, এই মুহূর্তে ব্যক্তিগত ঘৃণার চেয়ে বাঁচার তাগিদটাই সবার আগে। শত্রুর হাতের গরম স্পর্শ তার শরীরের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে দেয় কিন্তু মুখের ওপর কোনো অনুভূতি প্রকাশ করে না। মাথা উঁচু রেখেই সে ছুটে চলে অসম্ভব তিক্ততা গিলে, অনিচ্ছার বোঝা বয়ে। আচমকা হোঁচট খেয়ে উমেরার পা থেমে আসে।গতি শিথিল হতে শেহরাজ তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

“বেড়াল বাঘিনী আর দৌড়াতে পারছেন না?নাটক সিনেমার মতো কোলে ওঠার ধান্দা করছেন নাকি? তবে আগেই বলে রাখি আমি ওসব পারবো না। খেয়ে বল বাড়াই জনগনের সেবা করার জন্য।আলালের ঘরের দুলালি নামক লবনের বস্তাকে তোলার জন্য নয়।”
উমেরা রেগে গেল।দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“পাগলের সুখ মনে মনে। খবরদার ওসব ফালতু কথা বাস্তব তো দূর স্বপ্নেও ভাববেন না। যেই না চেহারা নাম রাখছে পেয়ারা। আপনার কোলে ওঠার চাইতে, মরে যাওয়াকে বেশি প্রাধান্য দিবে এই উমেরা ওয়াজেদ।”
“তাই নাকি?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“সন্দেহ আছে?”
শেহরাজ দৌড়ার মাঝে উমেরার হাত ছেড়ে দিল উমেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল পিছঢালা রাস্তায়।জ্বলে উঠল হাতের তালু,পায়ের আঙুল।শেহরাজ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“যে মেয়ের কথার এত তেজ, তার নিশ্চয়ই ওই নারী খেঁকো হায়নাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতাও আছে। খামোখা এতক্ষণ কুত্তা দৌড়ানি দৌড়ালাম। থাকুন গাদ্দার বা’লচন্দ্র বিদ্যাসাগর আপা। নিজের কথার বানে ওদের প্রতিহত করুন আমি গেলাম।”

শেহরাজ ছুটতে লাগল।উমেরা পেছনে তাকিয়ে দেখল হায়নার দল এখনো অনেকটা দূরে তবে তারা তার দিকেই ধেয়ে আসছে।উমেরা দাঁড়ানোর চেষ্টা করল,দাঁড়াল তবে আগের গতিতে ছুটতে পারছে না।ডান পায়ের বৃদ্ধা আঙুল অসম্ভব যন্ত্রণা করছে।উমেরা হাত দিয়ে নখ চেপে ধরতে বুঝতে পারল তার নখটা অর্ধেক উঠে এসেছে নিশ্চয়ই ইটের সাথে ধাক্কা লেগে।অশনিসংকেতে মাথা ঘুরে উঠল উমেরার,সেই সাথে শরীর কেঁপে উঠল তীব্র রাগে।উমেরা কান্নামাখা গলায় রাগে চ্যাঁচিয়ে বলল,
“কাপুরুষের ঘরে কাপুরুষে। পাটোয়ারী বংশের প্রত্যেকটা লোক কাপুরুষ জানোয়ার। হাতে চুড়ি পরে থাকতে পারেন না?পাটোয়ারী বংশের লোকেরা মানুষ নয় শুনছিস?তোদের রক্তে শুধু লোভ আর বিশ্বাসঘাতকতা। তোদের বিশ্বাস করা মানে নিজ হাতে নিজের কফিন বানানো।”

উমেরা আরেকবার পেছনে তাকাল।হায়নার দল অতি সন্নিকটে।যে করেই হোক তাকে পালাতেই হবে।হঠাৎ সে অনুভব করল মাটি যেন তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। পুরো শরীরটা হালকা হয়ে হাওয়ার সঙ্গে ভেসে উঠল। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এক মুহূর্তও বুঝে উঠতে পারল না।এর মধ্যে কেউ তার শরীরটা দু’হাতে তুলে নিয়ে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করেছে। চারপাশ কেবল ঝাপসা হয়ে দৌড়ের শব্দে মিশে যাচ্ছে। উমেরা আধো খোলা চোখে তাকাতে চেষ্টা করল। দৃষ্টি ঝাপসা, নিশ্বাস কাঁপছে। ধীরে ধীরে একটি পরিচিত অবয়ব স্পষ্ট হতে লাগল। শেহরাজ!
শেহরাজকে দেখামাত্র উমেরার বুকের ভেতর দপদপ করে ওঠে আতঙ্কে। শরীরের প্রতিটি স্নায়ু সতর্ক হয়ে ওঠে, শ্বাস দ্রুত হয়ে যায়।তীব্র অশান্তি নেমে আসে তার সর্বাঙ্গে। মনে হয় যেন শরীরের প্রতিটি কোষ চিৎকার করে বলছে, নামাও এক্ষুনি।কিন্তু তার শক্তি নেই, গলা শুকনো, আর শেহরাজের হাতের চাপে সে আরও অসহায় হয়ে পড়ে।
দৌড় থামেনি, শেহরাজের নিঃশ্বাস ভারী অথচ তার চোখে ভয় নয় বরং রহস্যময়, বিপজ্জনক দৃঢ়তা।
শেহরাজ থামল তার গাড়ির কাছে। উমেরাকে দাঁড় করিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ঠেলে উমেরাকে গাড়িতে বসাল।নিজেও গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে।সিট ব্যাল্ট বাঁধার তাড়াটুকু তার মাঝে দেখা যাচ্ছে না মূলত এখান থেকে যতদ্রুত সম্ভব চলে গেলেই সে বাঁচে।উমেরা চ্যাঁচিয়ে উঠল,

“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?”
“জাহান্নামে।”
“যান। আপনি একা যান। আমাকে টেনে নেওয়ার দরকার নেই। নিজের জায়গায় নিজে একা যান।”
শেহরাজ প্রত্যুত্তর করল না।সে চোয়াল শক্ত করে ড্রাইভিংয়ে মনোযোগী হলো।পুরো রাস্তায় দুজনেই ছিল নীরব।অবশেষে গাড়ি পৌঁছে গেল কাঙ্ক্ষিত স্থানে।উমেরা জানলা দিয়ে দেখতে পেল অদূরে তার বাড়ির গেট,শেহরাজ গলা ঝেরে বলল,

“কিছুটা দূরে নামিয়ে দিলাম এইটুকু হেঁটে চলে যান। গেটের সামনে নামিয়ে দিলে আপনি নিজেই বিপদে পড়বেন।”
“তার মানে এটাই ছিল জাহান্নাম? আমার বাড়িকে জাহান্নাম বলার সাহস আপনাকে কে দিল!”
“মাত্র দশ সেকেন্ডের মধ্যে গাড়ি থেকে না নামলে আমি আমার গন্তব্যে গাড়ি ঘুরিয়ে নেব।”
নীরব হুমকি ছুড়ল শেহরাজ। উমেরা আর বাক্য ব্যয় না করে গাড়ি থেকে নেমে গেল। আজকের উপকারের জন্য শেহরাজকে ধন্যবাদটুকু জানাল না।
উমেরা বাড়ি ফিরে সবার প্রশ্নের মুখে পড়ল।পায়ে কি করে আঘাত লাগল?স্কুটিটা কোথায়?বিশেষ করে শুদ্ধ উমেরার ওপর রেগে গেছে কেন সে সত্যটা প্রকাশ করছে না?উমেরা শেহরাজের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে বাকি ঘটনা খুলে বলেছে।
উমেরা নিজের কক্ষে ফিরল। শরীরটা ভীষণ কাহিল লাগছে, পায়ে ব্যান্ডেজ করে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে গেল। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতে রাজ্যের ঘুম চোখে ধরা দিল।

অদ্ভুত পরিস্থিতি সামলে শেহরাজ যখন বাড়ি ফিরল তখনও মনটা কেমন অস্থির, চিন্তাগুলো এলোমেলো। নিজের অন্ধকার কক্ষে ঢুকতেই সে থমকে দাঁড়াল। ঘরটায় ছড়িয়ে আছে এক অচেনা, অজানা মিষ্টি সুবাস যেন বাতাসে ভেসে থাকা কোনো রহস্যের গন্ধ। এই ঘ্রাণ সে আগে কখনো পায়নি। এক মুহূর্তে শেহরাজের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল অস্বস্তি আর কৌতূহল ঘিরে ধরল তাকে। তার মনে হচ্ছে ঘরটার অন্ধকারেই কেউ তার আগমনের অপেক্ষায় ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে একজোড়া নরম শীতল হাত শেহরাজের কাঁধ আর বুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। এমনভাবে আঁকড়ে ধরল যেখানে ভয়, আবেদন আর অচেনা উষ্ণতা সবকিছুই মিশে আছে। শেহরাজের শরীর ঘিনঘিনে অস্বস্তিতে কেঁপে উঠল। সে মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে এক ঝটকায় মেয়েটার শরীরটা তার কাছ থেকে ছিটকে সরিয়ে দিল।মেয়েটার শরীর অন্ধকার ঘরেই কোথাও গিয়ে ঠেকল।দম নিতে নিতে শেহরাজ হাত বাড়িয়ে লাইটের সুইচ অন করল।

ঝলমলে আলো ফুটে উঠতেই দেখা গেল ঘরজুড়ে ছড়ানো বিশৃঙ্খলার মাঝখানে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। এলোমেলো চুলে লুকানো তার অর্ধেক মুখ, নিঃশ্বাস ভারি, চোখ দুটো অদ্ভুত এক ক্ষুধায় ঝলক দিচ্ছে। যেন সে অন্ধকার থেকেই উঠে এসেছে শেহরাজের জন্য।
“তুমি কে?”
শেহরাজ চোখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকাতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। বোঝাই যাচ্ছে আজকের রাতটা মাস্তিতে কাটানোর জন্যই শেহরাজের ঘরে এই মেয়েটাকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এই জঘন্য কাজটা কে করল? জাওয়াদ! শেহরাজ মেয়েটাকে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“তোমাকে এখানে কে পাঠিয়েছে?”
জাওয়াদ দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। শেহরাজের পানে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল,
“ভাই রাগ করবেন না। দিনের ঝামেলা কাটিয়ে রাতে একটু…”

“একটু?”
“মেয়েটাকে আপনার জন্যই পাঠিয়েছি। ভালো করেছি না?”
“মেয়ে দিয়ে আমি কি করব?”
“আপনি বাচ্চা নাকি,বুঝেন না?”
“না, বুঝি না। বুঝিয়ে বল আমাকে।”
জাওয়াদ আমতা আমতা করতে লাগল। এর মাঝে মেয়েটা এসে শেহরাজের গা ঘেষে দাঁড়াল আর তাতেই রাগের পারদ তরতরিয়ে বেড়ে গেল। শেহরাজ ঠান্ডা গলায় হুমকি ছুড়ল,
“এদিকে আর এক পা বাড়াস না সহ্যশক্তি শেষ হয়ে গেছে।”

জাওয়ার ভয় পেয়ে গেল। শেহরাজের রাগ সম্পর্কে তার ধারণা আছে।জাওয়াদ মিনমিন করে কিছু বলতে মুখ খুলতেই শেহরাজ হঠাৎ এমন এক কাজ করে বসলো, যা কারো কল্পনায় ছিল না।সে এক ঝটকায় হাত বাড়িয়ে জাওয়াদের নিম্নাঙ্গ শক্ত করে চেপে ধরে আবার ছেড়ে দিলো।
ঝটকা খাওয়া জাওয়াদ ব্যথা–লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেলল।মেয়েটার সামনে তার কান থেকে গলা পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল মুহূর্তেই।অবিশ্বাস্য চোখে আবার তাকাল শেহরাজের পানে।

“ভাই আপনি এটা কি করে করলেন!”
“হাত দিয়ে চেপে ধরলাম।”
“আস্তাগফিরুল্লাহ!”
“নাউজুবিল্লাহ।”
জাওয়াদ দমে গেল।অন্তত এইটুকু তার বোঝা হয়ে গেছে শেহরাজের সাথে তর্কে পারা যাবে না।শেহরাজ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করল কক্ষ থেকে যেন বেরিয়ে যায়।মেয়েটা চলে যেতে জাওয়াদ মিনমিনিয়ে বলল,
“সরি ভাই।”
“আর যেন এমন না দেখি।”
“আমার ঘাড়ে কটা মাথা যে আমি শেহরাজ পাটওয়ারীর কথা অমান্য করব!”
জাওয়াদের কথায় প্রত্যুত্তর করল না শেহরাজ।সে শার্ট খুলে কাবার্ড থেকে আরেকটি শার্ট বের করে গায়ে জড়াল।তার কর্মকাণ্ডে জাওয়াদ সন্দিহান কণ্ঠে বলল,

“ভাই আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন?”
“হুম।”
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“জরুরি কাজ আছে।”
“আমি যাব সাথে?”
“না।”
“বাইরের পরিস্থিতি ভালো না।আমি যাই?”
“আরেকবার চেপে ধরব নাকি?”
দমে গেল জাওয়াদ। শেহরাজের হুমকিতে ঢোক গিলে চুপচাপ সরে দাঁড়াল। শেহরাজকে সে যতটা বোঝার চেষ্টা করুক না কেন, কখন কী ভাবছে কারোই জানা নেই। মনে হলো, শেহরাজের চোখে লুকানো অদ্ভুত অন্ধকার জাওয়াদের ভিতরে ঢুকে গিয়েছে, শরীর ও মন উভয়ই তার ইচ্ছার কাছে নত।

পায়ের যন্ত্রণায় সহ্য করতে না পেরে উমেরা কিছু ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেল। ঘুমের রাজ্যে সে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বপ্নময় দৃশ্যে, কিন্তু বাস্তবতার রাজ্যে ঘটে চলেছে অন্যরকম ভয়ংকর কিছু। তার প্রিয় খোলা বেলকনির দরজা দিয়ে আগন্তুক ব্যাক্তি একজন চুপচাপ কক্ষে প্রবেশ করল।দরজাটি আগে থেকেই খোলা ছিল।
উমেরার অচেতন শরীর শান্ত, কিন্তু ঘরের হাওয়ায় ভেসে আসে এক অজানা উপস্থিতির শিহরণ। চুপচাপ পা পড়ার শব্দ, শ্বাসরুদ্ধ করা নিঃশ্বাস সবই যেন তাকে ঘুমের মাঝে সতর্ক করছে।আগন্তুক লোকটি ধীরে ধীরে উমেরার বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টিতে যেন এক অদ্ভুত উন্মাদনা একই সঙ্গে লোভ ও নেশা জড়ানো।চোখগুলো উমেরার নিষ্পাপ মুখখানীর প্রতিটি রেখা খুঁটিয়ে দেখছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে তার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাওয়া রূপটা আরও কাছে টানছে।মনে হয় বাতাসে যেন অচেনা উত্তেজনার ঘ্রাণ ভেসে আসছে, যা ঘরে থাকা নিঃশব্দতা পর্যন্ত ছিঁড়ে দিচ্ছে।

দহনসুধা পর্ব ৬

আগন্তুক ব্যক্তি আরও কাছে এসে উমেরার শরীরের ঘ্রাণ নিল। চোখগুলো উমেরার দিকে জড়ানো, নেশার মতো দৃষ্টিতে।আগন্তুক ব্যক্তিটি ফিসফিস করে বলল,
“উমেরা, আমার উমেরা…আমার অবিনশ্বর ভালোবাসা।”

দহনসুধা পর্ব ৮