দহনসুধা পর্ব ৬
১৫ জন রাইটার
কথায় আছে, মানুষের বিপদ যখন ঘনিয়ে আসে তখন পদে পদে ভুল হতে থাকে। তার প্রতিটি সঠিক কদম ও ভুল পথেই পরে যায়। যেমনটা হয়েছিল উমেরার সাথে। সে কোনো কিছু ভুল না করে ও তার কদম গুলো বার বার ভুল পথেই যাচ্ছিল। তার নিজের ও কোনো ধারনা নেই নিয়তি কোন খেলা খেলছে তার সাথে। এটা কী নতুন কোনো সূচনার ইঙ্গিত? না-কি ধেয়ে আসা ঘূর্ণি ঝড়ের পূর্বাভাস!!
ঘড়ির কাটা বলছে সময় ঘনিয়ে সন্ধ্যার ধার ধার, কলেজ থেকে বেড়োতে বেড়োতে প্রায় সন্ধ্যা লেগে যায় উমেরার। এমনিতেই বেশ কিছু দিন ধরে রাস্তায় অবরোধ, ধর্মঘট লেগেই রয়েছে তার উপরে আবার দেরি করে বাসায় যাওয়া, মনে একটু তো কু-ডাক ডাকেই। সচারাচর উমেরার এমন দেরি হয় না, কিন্তু আজ হলো! কারণ কলেজ থেকে উমেরাদের জানানো হয় মেডিকেল ক্যাম্পিনের জন্য তিন দিনের সফরে তাদের শহরের বাইরে যেতে হবে। এবং সেখানে গিয়ে গ্রামের লোকদের ফ্রী চিকিৎসা দিতে হবে। এতে করে তাদের মানুষের সাথে মিশতে আগ্রহ বাড়বে। মেডিকেল কলেজ গুলো প্রায় প্রতি বছরই এমন ক্যাম্পিনের আয়োজন করে থাকেন, এ বছর ও তার ব্যতীতক্রম নয়!
ফর্ম ফিলাপ থেকে শুরু করে আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে কলেজ থেকে বের হতে উমেরার সন্ধ্যা লেগে যায়। তার উপরে জারা ও সাথে নেই। ভাইকে দেখতে চলে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। এখন পুরোটা রাস্তা উমেরার একা যেতে হবে। সমস্ত কিছু গুছিয়ে স্কুটি স্টার্ট দিয়ে আপন গতিতে যেতে থাকে উমেরা, কিন্তু চিন্তার বিষয় ছিলো পুরো রাস্তাটাই কেমন যেনো গা ছমছমে ভাব বিরাজ করছে। উমেরা জানতো অবরোধ চলছে, কিন্তু তাই বলে আজকে এতো জটিল অবরোধ? রাস্তায় তো সচারাচর মানুষ জন থাকেই, তাহলে আজ এতোটা জন শূন্য কেন? নিজের মনে চিন্তা করতে করতেই স্কুটি চালাতে থাকে উমেরা।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
এই চিন্তায় বিঘ্ন ঘটে হঠাৎ স্কুটি থেমে যাওয়ার ফলে। একটুর জন্য পরে যেতে যেতে ও যায়নি, উমেরা পা দিয়ে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করল। রাস্তায় পরে থাকা ইটের টুকরো লেগে উমেরার স্কুটির টায়ার ফাটল ধরে। স্কুটি থেকে নেমে টায়ার চেক করে প্রচন্ড বিরক্তি বোধ করল উমেরা। একাই বিড়বিড় করল,
”বুঝলাম না ব্যাপারটা! সব ঝামেলাকে আমার বাসার এড্রেস কে দিল? কার এতো শত্রুতা আমার সাথে? একটার পর একটা ঝামেলা লেগেই রয়েছে, ধ্যাত!”
উমেরা টায়ারে সজোরে এক লাথি মারল। এরপর এক আকাশ পরিমাণ বিরক্তি নিয়ে স্কুটি ঠেলতে ঠেলতে যেতে থাকে। যদি পথে কিছু পেয়ে যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। আর যদি না পায় তাহলে আর কি? তুললো ঝোলা, চললো ভোলা!
উমেরা ভারি স্কুটিটিটা ঢেলে ঢেলে নিয়ে যেতে থাকে। কদম যেনো সময়ের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ছে। না, দেরি করা যাবে না। এমনিতেই লোকজন নেই, তার উপরে অবরোধ, হীতের বিপরীত না হয়ে যায় আবার!
হাঁটতে হাঁটতে অজানা এক আতঙ্কে থমকে যায় উমেরার কদম। কারণ সামনে দাঁড়ানো লোক গুলো যে সুবিধার নয়। এটা তাদের ভাবমূর্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মোট পাঁচ জন ব্যক্তি উমেরার সামনে দাড়িয়ে আছে। একজনের হাতে মশাল, এক জনের হাতে টি-য়ারশেল, বাকিদের হাতে হকিস্টিক!! গলা শুকিয়ে আসে উমেরার। এখন কী করবে সে? তাকে ও কী মা-রা হবে? কিন্তু সে তো কিছু করেনি! তাহলে লোক গুলো এভাবে তার দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কেন? শুকনো একটা ঢোক গিলে নিলো উমেরা!
”ভাইয়ুউউ! মালডা তো পুরা খাসা..! নিবা নি লগে?”
সামনে থাকা ব্যক্তি মুখে এমন কু-রুচি পূর্ন বাক্য শুনে ভয়ে নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে উমেরার। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে, না কেউ নেই। উমেরা এক কদম এক কদম করে পিছিয়ে যেতে থাকে। ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বিচ্ছিরিভাবে বলে উঠল,
”আরে সোনা পাখি! যাও কই? তোমারে আমাগো লগে নিমু তো! উড়াল দিয়া যাওয়ার কথা মাথা থেইকা ফেলে দাও সোনা পাখি।”
উমেরার চোখ কপালে উঠে যায়। সে সাত পাঁচ না ভেবেই প্রাণ পনে দৌড়ানো শুরু করল। কিন্তু আতঙ্কের বিষয় হলো, তার পিছু নিলো সেই লোক গুলো। কিছু দূর আসতেই একজন হাঁপানোর স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
”দাঁড়া শালী…! তোরে লগে লমু, হুদাই হয়রানি করিস না।”
সেই কন্ঠ আরো কাঁপিয়ে দিল উমেরাকে। প্রায় কান্না করতে করতে প্রাণ পনে দৌঁড়াতে থাকে সে। ফাঁকা রাস্তা, তার উপরে এমন বিশ্রী ঘটনা! আল্লাহ না করুক তার সাথে যদি আজ কিছু হয়ে যায়! দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আচমকা শক্ত পক্ত কিছু একটার সাথে বারি খেয়ে নিচে পরে যেতে ন্যায় উমেরা। কিন্তু কারো শক্ত হাতের বাঁধন তাকে আবদ্ধ করে নিল। ভয়ে ভয়ে ধীরে চোখ মেলে তাকাতেই দেখে শেহরাজ! এক হাতে উমেরাকে ধরে আছে আরেক হাতে নিজের সানগ্লাস খুলতে ব্যাস্ত। উমেরা তার শক্ত হাতের বাঁধনের মাঝে আবদ্ধ। উমেরার নিকাব খুলে যাওয়াতে তার লাল টকটকে চেরির মতো মুখে শেহরাজের দৃষ্টি আটকে রইল। প্রথমবারের মতো শেহরাজ উমরাকে এতো কাছ থেকে দেখছে কিন্তু সে শুধু লক্ষ্য করল উমেরার ভীতু মুখভঙ্গি, দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার অবস্থা নাজেহাল। কাঁদতে কাঁদতে চোখ জোড়া রসগোল্লার মতো হয়ে গেছে। হালকা কটাক্ষের সুরে শেহারজ বলে উঠে,
”বাঘিনী আজকে বেড়াল হয়ে গেলো না-কি? interesting! very interesting! ”
রীতিমতো ধাক্কা দিয়ে শেহরাজের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল উমেরা। হাপরের মতো তার বুক উঠানামা করছে। ঘন ঘন নিশ্বাষ ফেলে বলল,
”বিপদে পরা মানুষকে নিয়ে উপহাস করা পাটোয়ারীদের র’ক্তে আছে বুঝি?”
”বাহ! এই তো বাঘিনী! উফস সরি, বেড়াল বাঘিনীর মুখে বলি ফুটেছে দেখি। নাইস! ইউ গাইস ক্যারি অন! আইম লিভিং!”
শেহরাজ বাঁকা হেসে নিজের কালো গ্লাসটি আবার চোখে পড়ে নিলো। পকেটে হাত পুরে উমেরা আর বাকিদের সাইট কেটে বাতাসের ন্যায় চলে যেতে নেয়।
”পাটোয়ারীরা কাপুরুষ শুনেছিলাম, কিন্তু আজকে তার লাইভ নমুনা নিজের চোখে দেখলাম।”
উমেরা খুব উচ্চস্বরে শেহরাজকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলল। কিন্তু শেহরাজ তো শেহরাজই! সে থরিই না পাত্তা দিলো উমেরাকে। পাশ কাটিয়ে সুন্দর মতো চলে গেলো।
উমেরার ভয়ে বুক আরো ভারে হয়ে আসে। ফাঁকা রাস্তা, একা মেয়ে মানুষ, আর তাকে খু’ব’লে খাওয়ার জন্য মানুষ রূপি ন’রপি’শাচ গুলো লা’লসা’র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। তাদের এক কদম করে সামনে বাড়ছে, এবং উমেরার এক একদম করে পিছিয়ে যাচ্ছে। লোকগুলোর মধ্যে একজন কটু দৃষ্টি ফেলে বলল,
”সোনা পাখি অনেক দৌড়াইছোস! এই তোরা ধ্যান রাখ। আমি একটু খাইয়া আসি!”
বিকৃত মস্তিষ্কের এক লোক উমেরার দিকে একটু একটু করে আগাতে থাকে। উমেরা কাঁপা কাঁপা গলায় আকুতি করে,
”দেখুন! প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আমার কোনো ক্ষতি করবেন না প্লিজ! আ.. আমাকে যেতে দিন।”
”ক্ষতি কেন করুম ছেমড়ি? আমরা তো সোহাগ করুম! সোহাগ বোঝ? না বুঝলেও সমস্যা নাই। শিখায়া দিমু আজকে।”
“দে…, দেখুন..নাহ..নাহ প্লিজ.. নাহহহহহহহহহহহ!”
উমেরা ভয়ে নিজের মুখ দু’হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল। নিঃশ্বাস তার খুব জোড়ে জোড়ে পড়ছে। এভাবেই কিছুক্ষণ কাঁপতে থাকে, কিন্তু বেশ অনেকক্ষণ পর যখন দেখল নিজের সাথে তেমন কোনো কিছু ঘটছে না। সে আস্তে আস্তে হাত সরিয়ে তাকায় উমেরা। তার চোখ বিস্ফারিত!
এটা কী আদোও সত্যি? যাকে জন্মের পর থেকে শত্রু পক্ষের ছেলে ভেবে এসেছে আজ সেই তার জন্য এতো গুলো লোকের সাথে মারামারি করছে! এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে উমেরা শেহরাজের দিকে। শেহরাজ কাউকে উমেরার কাছে ও ঘেঁষতে দিচ্ছে না। এক এক করে মা’রতে থাকে তাদের। এভাবে প্রায় অনেক ক্ষণ ধরে চলল সংঘর্ষ। ভয়ে লোক গুলো বানরের মতো লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায়। শেহরাজ নিচে পরে থাকা উমেরার ব্যাগ তুলে ঝাড়তে ঝাড়তে তার দিকে এগিয়ে দেয়। আবারও চোখে গ্লাসটা পরে নিয়ে বলে,
”শেহরাজদের র’ক্ত বীর পুরুষের র’ক্ত! আশা করি লাইভ নমুনা দেখা শেষ পাতি ডাক্তার সা হে বা!”
উমেরা টু- শব্দ ও না করে চুপচাপ নিজের ব্যাগটি শেহরাজের থেকে নিয়ে নিল। বর্তমানে সে যেই আতঙ্কে রয়েছে, ভালোই ভালোই বাড়ি যেতে পারলেই হলো। ব্যাগ কাঁধে দিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তাদের কানে ধেয়ে আসে অনেক জন মানুষের পায়ের শব্দ! দু-জনেই একসাথে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখে, ১০-১৫ জন মানুষ তাদের দিকে ধেয়ে আসছে!
”ওহহ শীট!!”
শেহরাজ উমেরার হাত ধরে দৌড়ানো শুরু করে করল। উমেরা কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
”আরেহহ! একি! দৌড়াচ্ছেন কেন? ”
”চোখে কী কম দেখো? দেখছো না হায়েনার দল তাড়া করছে?”
”তাতে কী? আপনি না বীরপুরুষ? ওদেরকে ধরে মারুন!”
”এতো জনকে মারতে গেলে আমার হাড়ের ও হদিস পাওয়া যাবে না! আর আমি চাইনা, শত্রুর জন্য আমার নিজের হাড় হয় হোক।”
দহনসুধা পর্ব ৫
“যদি তাই হয়, তাহলে একটু আগে মারলেন কেন?”
“নিজের স্বার্থের জন্য।”
”কীহহহ!”
“জ্বী।”
শেহরাজ উমেরার হাত খুব শক্ত করে ধরে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। উমেরা ও তার সাথে তাল মিলিয়ে পা চালাচ্ছে। কিন্তু উমেরার দৃষ্টি একটু পরিবর্তন হয় শেহরাজকে নিয়ে। এতোক্ষণ তাকে বীরপুরুষ ভাবলে ও বর্তমানে তাকে ইদুর ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। এটাকে বীরপুরুষ বলে না, বলে কাপুরুষ!
