Home দহনসুধা দহনসুধা পর্ব ৫

দহনসুধা পর্ব ৫

দহনসুধা পর্ব ৫
১৫ জন রাইটার

আলো-অন্ধকারের মিশ্র অনুভূতিতে এই ঘরের দেয়ালগুলো ঠিক ভাবে নিশ্বাস ফেলতে পারছে না। উপরে ঝুলে থাকা ছোট্ট ল্যাম্পশেড থেকে নেমে আসছে একফোঁটা মৃদু আলো। ঠিক এতটুকুই, যতটুকু আলো কেবল একজন মানুষকে এবং তার আঁকা শিল্পীকে ফুটিয়ে তুলতে পারে। সেই অর্ধ-আলোয় দাঁড়িয়ে আছে সুঠাম দেহের অধিকারী এক পুরুষ। তার সামনে কাঠের ইজেলে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যানভাসে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে এক অসাধারণ নারী রূপ। পুরুষটি আপাতত নীল শাড়ি পরিহিতা কোনো এক রমণীর ছবি আঁকতে ব্যস্ত। তার তুলির নরম স্পর্শে সে রঙ ছুঁইয়ে দিচ্ছে রমণীর মুখের বাঁকে, চুলের আলগা উড়ন্ত রেখায়, চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত সব রহস্যে। পুরুষটির দৃষ্টি, মন, অনুভূতি, সবকিছুই থমকে আছে কেবল শুধুমাত্র সেই রমণীর অপরূপ সৌন্দর্যের পানে। সে কেবল একমনে বিড়বিড় আওরাচ্ছে,

“ইউ আর মাই ফেইরি”
ছবি আঁকা শেষ হতেই লোকটি রঙ তুলি রেখে বেরিয়ে আসে সেখান থেকে। প্রবেশ করে আধো অন্ধকারে ঢাকা অন্য এক অন্ধকার কক্ষে। যেখানে দেয়ালের রঙ ম্লান কালো। যদিও বা ফার্নিচারের গায়ে ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। তবে তাতে কি আসে যায়? সে গিয়ে বসল ভারী চামড়ার সোফায়। কেবল পেছন দিক থেকে তার অবয়ব অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এই ঘরের ক্ষীণ আলোর একমাত্র উৎস কেবল তার সামনে জ্বলতে থাকা মনিটরটি। সে মনিটরে তাকিয়ে আছে… না, মনিটরে থাকা এক অসীম সুন্দরী রমণীর দিকে তাকিয়ে আছে সে। রমণীটির রূপ লাবণ্যে আফগানি ছোঁয়া। আড়াল থেকে তোলা এই ছবিটি সুন্দরী রমণীর হাস্যজ্জ্বল গল্পে ঘেরা। লোকটি চুপচাপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ ভাঙা নিঃশ্বাসের মতো তীব্র কণ্ঠে বলে উঠল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“আমার পরী… আমার অপ্সরা… আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা একফালি স্বস্তি, বলোতো, আর কতদিন নিজেকে এভাবে দূরে রাখবে আমার থেকে? আমি বড্ড ক্লান্ত হয়ে গেছি নীল আলোয় মনিটরের স্ক্রিনে তোমায় দেখতে দেখতে। ছবিতে তোমাকে দেখে বরংচ আমার দিন কাটে কিন্তু রাতে? রাত যে আমাকে ছিঁড়ে খায়। আমি আর চাই না স্ক্রিনের নরম আলোয় তোমাকে দেখতে। আমি চাই তোমাকে ছুঁতে, তোমার গায়ে উষ্ণতা মিশে যেতে। কবে তুমি আমার পাশে বসবে? কবে তোমার কোলে মাথা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারব? সুন্দরী, তুমি কেবল আমায় হয়ে থেকে যাও। এই অধমের যে তোমায় বড্ড প্রয়োজন, বড্ড বেশিই।”
সে আবার নিচু স্বরে বলল,

“ইউ নো হোয়াট… জান…তুমি সামনে থেকেও তোমাকে ছুঁতে পারি না এটা আমার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। দূর থেকে তোমাকে দেখলে আমার ভেতরের সব বাঁধন ছেঁড়া দেয়…মন চায় দৌড়ে গিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরি, তোমাকে আমার বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখি… লুকিয়ে রাখি দুনিয়ার সেইসব চোখ থেকে…যারা তোমার ওপর নজর দেয়। তোমাকে শুধু আমার করে রাখার ইচ্ছেটা যে আমার কতটা হিংস্র, তুমি জানো না। তবে জানবে খুব শীগ্রই।”
হঠাৎ তার চোখের রং পাল্টে গেল নিমিষেই। কণ্ঠে জমাট বাঁধল রাগ। তীব্র আক্রোশ নিয়ে সে বলে উঠল, “কিন্তু? কিন্তু? কিন্তু? আমার ওই ফাকিং মার্কা বাপের জন্য পারি না!”
কথাটা বলা মাত্র তার চোখের আগুন নিভে গেল। সেথাশ জায়গা নিল দুঃখ,
“আমার বাবা আমাকে ভালোবাসে না জানো? ভালোবাসলে আমাকে এত কষ্ট দিত বলো তো? সে জানে আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি… কতটা চাই…তারপরও আমাকে তোমার কাছে যেতে দেয় না। কেন জানি না… কিন্তু দেয় না!”

লোকটি শব্দ করে শ্বাস ছাড়ল। ভয়ার্ত গলায় বলল, “যত..বার আ..আমি তাকে না জানিয়ে তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি…ত. ততবার সে তোমার উপর আক্রমণ করতে চেয়েছে। শুধু তোমার জন্য… তোমার ক্ষতি করে দেবে ভেবে…আমি এত কষ্ট সহ্য করছি।”
তারপর হঠাৎ আবার উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,“কিন্তু… আর বেশিদিন না, উমেরা-পাখি। আর অল্প কিছুদিন…এই ইলেকশনটা শেষ হলেই আমি তোমাকে একদম আমার করে নেব।শুধুই আমার।”
কথাগুলো বলেই সে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল। একটা পাগলামি মেশানো যন্ত্রণার হাসি যাকে বলা চলে। হাসতে হাসতেই হঠাৎ সে থমকে গেল। তার চোখে আবার নেমে এলো ব্যথার ঘোলাটে কুয়াশা।
“আচ্ছা… অপ্সরা… তুমিও কি আমাকে ভালোবাসো?
নাকি… আমায় ছাড়া আর কেউ আছে তোমার মনে?”

সে চোখ নামিয়ে হাসল। পুনরায় বলল, “থাকলে সমস্যা নেই। আমি তাকে দুনিয়া থেকেই মুছে ফেলব। নিজের পথের কাঁটা কীভাবে উপড়ে ফেলতে হয় আর্শিয়ান মির্জা সেটা খুব ভালোই জানে।”
কথাটা শেষ করেই সে পাশে থাকা অ্যালকোহলের বোতল থেকে একগ্লাস ভরে নিল। গ্লাসে থাকা তরল পদার্থটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ছুঁড়ে মারল দেয়ালে। কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল। ঠিক যেমন কেঁপে উঠছিল তার অন্তরের ঝড়। আর্শিয়ান উঠে দাঁড়াল। হেলে দুলে হেঁটে হেঁটে চলে গেল ডান দিকে থাকা একটা ঘরের দিকে। ঘরের দরজার সামনে এসে দরজায় এক লাথি বসাল। ফলস্বরূপ দরজাখানা খট শব্দ তুলে খুলে গেল। আর্শিয়ান ঘরের ভেতর ঢুকে উপর হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। ব্যাস এখন একটু কড়া ঘুমের প্রয়োজন। স্বপ্নে যে উমেরা তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তাকে তো সময় দিতে হবে? ভেবেই হেসে চোখ জোড়া বন্ধ করল আর্শিয়ান।

সকাল ৮টা। ওয়াজেদ বাড়ির সকলে খাবার টেবিলে বসে আছে। সবার সামনে খাবার পরিবেশন করছেন নাসিফা বেগম, আর তাকে সাহায্য করছে অল্পবয়সী এক মেয়ে, নাম ফুলি। সে এই বাড়ির কাজের মেয়ে, প্রায় ৫ বছর ধরে এই বাড়িতে কাজ করে আসছে। খুব বাধ্য আর শান্ত স্বভাবের মেয়ে, সবসময় হাসিখুশি মনে কাজ করে। নাসিফা বেগম ও বাড়ির সবাই তাকে খুব স্নেহ করেন। খাবার টেবিলটা একেবারে নীরব। মৌনতা ভেঙে হঠাৎ শুদ্ধ বলে ওঠে,
“আপনার কি মনে হচ্ছে না বাবা, ওই পাটোয়ারীরা বেশি বাড়াবাড়ি করছে? প্রথমে তো ওরা নিজেরাই ভুক্তভোগী সাজতে নিজেরাই দাঙ্গা করে আমাদের নামে একটা দুর্নাম ছড়ালো, দোষ তারা করে দায় আমাদের উপর চাপালো, এখন আবার আমাদের মিলে আগুন দিলো! আপনি ওদের এমনি এমনি ছেড়ে দেবেন?”

শুদ্ধের এমন কথা শুনে উমেরা শান্ত চোখে তাকালো ভাইয়ের দিকে। বাইরে যতটা শান্ত দেখাচ্ছে—ভেতরে ঠিক ততটাই ঝড় বইছে তার মনে। ‘পাটোয়ারী’ নামটা কর্ণগহ্বরে ঢুকতেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল শেহরাজের মুখ, আর সঙ্গে সঙ্গে উমেরার মনটা বিস্বাদে ভরে গেল। তবে মুখে কিছু বলল না। ওমর ওয়াজেদ রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,
“আমি কি করব না করব, তা তোমাকে বলে অবশ্যই করব না? সব ব্যাপারে নাক গলানো আমার পছন্দ না। আমার এত দুর্দিন আসেনি যে তোমার কাছে কৈফিয়ত দেব বা তোমাকে বলে কোন কাজ করবো।”
কথাগুলো তীরের মতো বিঁধে গেল শুদ্ধর বুকে। আহত দৃষ্টিতে তাকালো সে বাবার দিকে। শুদ্ধ জানে না কেন তার বাবা তার সব কথা এমন অবজ্ঞা করে। কত চেষ্টা করেছে বাবার মুখ থেকে দুটো ভালো কথা শুনতে, কিন্তু সে ব্যর্থ। যত ভালো কাজই করুক, কেন জানি তার বাবা সবসময় তার ওপর অপ্রসন্ন। শুদ্ধ গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। ওদিকে বাবার এমন কথায় উমেরা ক্রুদ্ধ হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানালো,

“বাবা! এটা কেমন কথা বললেন? ভাইয়া তো ভুল কিছু বলেনি, খুব সাধারণ একটা কথা বলেছে!”
স্বামীর কথায় নাসিফা বেগমের মাতৃমন কেঁদে ওঠে। শুদ্ধকে এমন দূরে ঠেলে দেওয়া, তাকে অবজ্ঞা করা, অবলেহা করা এসব নাসিফা বেগমকে ভিষণ পীড়া দেয়। কেউ জানেনা সন্তানের অপমানে, কষ্টে কত চোখের জল ফেলেন তিনি।
মেয়ের কথায় ওমর ওয়াজেদ নরম হয়ে গেলেন। হালকা গলায় বললেন,

“খাবার খেয়ে নাও জটপট। না খেয়ে খেয়ে শরীরের কী হাল করেছো, দেখেছো? খেয়ে দেয়ে শক্তি বাড়াও, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। এই ওয়াজেদ পরিবারের গোটা দায়িত্ব যে তোমাকেই নিতে হবে।”
বাবার এই কথায় উমেরার মেজাজ খারাপ হয়, এক কথায় বিরক্ত সে। এসব শুনতে শুনতে এখন মেজাজ খারাপ হয়। এই কথাগুলো মোটেও সহ্য করতে পারে না সে। সব সময় বাবা রাজনীতি আর ক্ষমতার কথা বলে তবে উমেরা সেই নোংরা রাজনীতিতে কখনোই নিজেকে জড়াতে চায় না। সে জানে, রাজনীতি এক নোংরা খেলা, আর সে কখনোই এই পথে হাঁটবে না। তার থেকেও বড় কথা এই দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্যতা তার ভাই শুদ্ধ’রই আছে। তবে বাবা কেনো তাকে না বলে উমেরাকে এসব বলেন?
উমেরার খুব করে বলতে ইচ্ছে করল,

“আপনার পরে রাজনীতির মাঠে শত্রুকে টেক্কা দিতে আমার ভাই আছে। সে আপনার চাইতে ভালো সামলাতে পারবে সব, সেই যোগ্যতা আমার ভাইয়ের আছে। জানি না কেন আমার ভাইকে আপনার চোখে পরে না। তবে আপনি যায় করুন না কেনো রাজনীতিতে আমি কখনো নিজের নাম লিখাবো না বাবা। রাজনীতি করতে গেলে পশু হতে হয়, মনুষ্যত্ব খোয়াতে হয়, মানুষের মৃত্যুর কারন হতে হয় আমি তা কখনো হতে পারবো না। আমি মানুষ বাঁচাতে চাই, মারতে নয়।”
মনের কথা গুলো মনেই রয়ে গেল সব সময়ের মতো মুখে কিছু না বলে খাবারে মন দিল উমেরা। হঠাৎ উমেরার চাচা খাবার চিবুতে চিবুতে বললেন উঠেন,

“ভাইজান, একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম। কথাটা উমেরা আম্মুকে নিয়ে। যদি অনুমতি দেন, তবে বলি?”
কথাটা শুনে উমেরা, নাসিফা বেগম, আর ওমর ওয়াজেদ সকলেই নড়েচড়ে বসেন। শুদ্ধর কোন হেল দোল দেখা গেল না। সে নিজের খাওয়ায় মনোযোগী। রুটি ছিঁড়ে মুরগীর ঝোলে চুবিয়ে মুখে পুরে বলল,
“উমেরা কী কোন ভুল করেছে চাচাজান?”
ভাইয়ের এহেন কথা শুনে উমেরা ভাইয়ের পানে চায়। কারন শুদ্ধ এমন কথা বলছে তার মানে চাচাজান কী বলতে চায় তা সম্পর্কে শুদ্ধ অবগত। উমেরা আর আগ্রহ দেখালো না তার ভাই কথা বলছে মানে কোন সমস্যা হলে ঠিক সামলে নিবে। চাচাজান দুদিকে মাথা নেড়ে হেসে বললেন,

“আরে না আম্মু আবার কী করবে? আর বলিস না আমার বন্ধু সমরেশ আছে না? ওর ছেলে এতটুকু বলতেই…
শুদ্ধ নিজের ক্রোধ, বিরক্তি আড়াল করে খুবই শান্ত কন্ঠে বলে উঠল,
“বাদ দিন চাচাজান। ওনাদের না করে দেবেন। ওই পরিবারে আমার বোন দেব না! আপনার বন্ধুর ছেলের নারীদোষ আছে, নানা ক্লাবে মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে। জেনে শুনে চরিত্রহীন মানুষের কাছে বোন দেব না আমি!” শুদ্ধর এমন কথায় ভদ্রলোক অপমানিত বোধ করলেন। থমথমে গলায় বললেন,
“আমি তো শুধু বলতে চেয়েছিলাম যে ওরা প্রস্তাব রেখেছে…”
ভাইকে পুরোটা শেষ করার সুযোগ না দিয়ে ওমর ওয়াজেদ রেগে শুদ্ধকে বলে উঠলেন, “তুমি এত কথা বলো কেন? তোমাকে কি কেউ বলেছে সব ব্যাপারে কথা বলতে? আমার মেয়ের ব্যাপার আমি বুঝে নিবো। সব ব্যাপারে মাথা ঘামাবে না।”

শুদ্ধ ও তেজি গলায় জবাব দিল, “উমেরা যেমন আপনার মেয়ে, তেমনি সে আমার বোন বাবা! আর আমি আমার বোনকে জেনে শুনে জাহান্নামে ফেলতে দেব না!” শুদ্ধের তেজী কণ্ঠে ঘর গরম হয়ে উঠল।
সবাই চুপ করে গেল।
শুদ্ধ পুনরায় গম্ভীর কন্ঠে বলল, “আগামী দিনগুলো খুব খারাপ যাবে। আমি চাই না এসবের সঙ্গে আমার বোনকে জড়াতে। খুব দ্রুত ওর বিয়ের ব্যবস্থা করব। আমি পাত্র খুঁজছি। ভালো পাত্রের সন্ধান পেলেই বিয়ে দেব। আমি কোনো ভাবেই চাই না পাটোয়ারীদের নোংরা চালের শিকার আমার বোন হোক। আমার বোনকে আমি কারো চালের গুটি হতে দিবো না।”
ওমর ওয়াজেদ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন তার আগেই, উমেরা ফুসে উঠল। কন্ঠে আক্রশ বিস্ফোরিত হলো,

“কি বলছো? এখনই কীসের বিয়ে! আমি তো মাত্র আমার স্বপ্নের দিকে পা বাড়িয়েছি! আমি ডাক্তার না হওয়া পর্যন্ত কিছুতেই বিয়ে করব না!”। তার কণ্ঠে ছিলো ঝড় আভাস চোখে আগুন।
“আর রইল বাকি ওই পাটোয়ারীদের কথা? ওদের যা ইচ্ছে করুক। আমিও দেখি তারা কি করে!”
বাঁকা হেসে ফের বলল, “আসুক না আমার সাথে লাগতে বা আমার ক্ষতি করতে তবে, আমিও খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিবো আমি উমেরা ওয়াজেদ শত্রুর বুকে পারা দিয়ে ঠিক কী করে উপরে উঠতে জানি।”
কথা শেষ হতেই উমেরা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। ধপ শব্দ করে উঠে দাঁড়াল। নিজের কক্ষের দিকে পা বাড়াল। উমেরাকে ওভাবে উঠতে দেখে ফুলি ছুটে গেল পেছন পেছন। উমেরা ঘরে ঢুকতেই “ধারাস” করে দরজা খানা লাগিয়ে দিলো। সেই শব্দে যেন পুরো বাড়িটাই কেঁপে উঠল, শব্দ প্রতিধ্বনি হতে লাগল চারপাশে। ফুলি এসেও চলে গেল, উমেরার রাগের আভাস পেয়েছে সে তাই মুখও তুলল না আর।
উমেরা ঘরে ঢুকেই ব্যস্ত হাতে আলমারি খুলল, ভেতর থেকে একটা বক্স বের করল। বক্সটা খোলামাত্র দৃশ্যমান হলো সেই আধপুরা আইডি কার্ডটা। উমেরা সেটা হাতে নিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরল। রাগ, দুঃখ অপমান আর ঘৃণায় দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“পাটোয়ারি… পাটোয়ারি… পাটোয়ারি! তোর শেষটা আমি উমেরা ওয়াজেদ দেখে ছাড়ব।তোদের এই নোংরা থাবা দেওয়া হাত আমি ভেঙে গুড়িয়ে দেব। তোর জন্যেই আমার জীবনে এত সমস্যার উৎপত্তি! আমার পরিবারের দিকে চোখ দিলে তোর সেই চোখ আমি উপরে ফেলব। মনে রাখিস, আমি রাজনীতি পছন্দ করি না,কিন্তু রাজনীতি আমার রক্তে। কোন খেলায়, কোন চালে বিজয় নিশ্চিত তা আমি খুব ভালো করে জানি। তুই যদি আমার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াস কসম, তোর পতন ঘটবেই আমার হাতে!”

হঠাৎই তার মনে ভেসে উঠল সে মুহূর্ত, শেহরাজের হাত ধরা। ভীষণ ঘৃণা ছুঁয়ে গেল সারা গায়ে। উমেরা কার্ডটা বক্সে রেখে আলমারিতে তুলে রাখল। তারপর দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যেই হাতটা শেহরাজ ধরেছিল, সেটাই সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ধুতে লাগল। আর শেহরাজকে যত রকম গালি তার ভান্ডারে আছে সব উগরে দিল মনে মনে।
১০ টা বাজে ঘরের দরজা খুলে বের হলো উমেরা। জারার কল এসেছে এখনই বেরোতে হবে তাকে। উমেরা একদম বোরকা পরে নিচে নামছে। হঠাৎ সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে পা দুটো থেমে গেল তার। আচমকা উমেরার হাত পা কাঁপা শুরু করে। হাত পা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, উমেরা নিজেকে পরে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে হাত দিয়ে সিঁড়ির রেলিং শক্ত করে ধরল । শরীর টলছে, কাঁপছে… মুহূর্তেই ঘেমে উঠেছে সারা শরীর। গলা শুঁকিয়ে কাঠ। কারণ ঠিক তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তার কালো অতীতের ছায়া যা তাকে আজও তাড়া করে বেড়ায়। মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে সেই বিষাক্ত অনুভূতিগুলো। উমেরার পেনিক এট্যাক হচ্ছে। তার সামনে যে তার মতোই নোংরা শোষণের নিদারুণ যন্ত্রণা সহ্য করছে ফুলি।

দহনসুধা পর্ব ৪

ফুলি… সিঁড়ির পাশে রাখা ফুলদানি-টা মুছচ্ছিল। হঠাৎ সে অনুভব করল তার পেটের কাছটায় পুরুষালি শক্ত হাতের ছোঁয়া। ভীত ফুলি ভয় পেয়ে চকিত দৃষ্টিতে ফিরে তাকাল। দেখতে পেল তার সামনে দাঁড়িয়ে একজন সুদর্শন যুবক। শ্যামবর্ণের আকর্ষণীয় দৈহিক গঠন। বিড়ালচোখ। সিগারেটে ঝলসে যাওয়া কালচে ঠোঁটটাও যেন নজর কাড়া। ভ্রু জোড়া ঘন কালো। কালো সুট-প্যান্টে জোভান ওয়াজেদ। উমেরার চাচাতো ভাই। তার এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নোংরা মন মানসিকতার মানুষ রূপী নারীখেকো এক হায়েনা। ফুলি কাঁপা কাঁপা গলায় কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার বলার আগেই আবার সেই নোংরা শোষণে থাবা মেলে ধরল জোভান। সেই থাবা’ই কেঁপে উঠল ফুলির কায়া। উমেরা…
আর সহ্য করতে পারল না। কাঁপা কাঁপা গলায় কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই, একটা শক্ত হাত তার মুখ চেপে ধরল।

দহনসুধা পর্ব ৬