Home দহনসুধা দহনসুধা পর্ব ৪

দহনসুধা পর্ব ৪

দহনসুধা পর্ব ৪
১৫ জন রাইটার

রাতের মধ্যপ্রহর! আজ আকাশের বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ম্লান চাঁদের আলো কেমন অদ্ভুতভাবে যেন রাতের এই থমথমে পরিবেশটিকে পর্যবেক্ষণ করছে। বাতাসটা তুলনামূলক ভারী ভারী ঠেকছে। চারদিকে শীতল অন্ধকারের এক যেন ঘনো চাদর। ঘুমন্ত ওয়াজেদ বাড়িতে কেবল শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষুদ্র শব্দ, দূরের কুকুরের এক একটা ডাক, আর সময়ের ভাঁজে মিশে থাকা অপ্রকাশ্য বিষণ্নতার গল্প অন্ধকারে রাজত্ব চালায়।

উমর ওয়াজেদ তখন অর্ধনিদ্রায় নিমজ্জিত। পর্দার ফাঁক গলিয়ে চাঁদের ফ্যাকাশে আলো ঘরে এসে পড়ছে। পরপর বেশ কিছু ফোন কল এলো। তাতেও গভীর নিদ্রায় বিশেষ ছেদ পড়ল না তার। হঠাৎ দরজায় তীব্র কড়াঘাত হলো। উমরের তখনো হুঁশ জ্ঞান নেই। আজ সারাদিন বেশ খাটুনি গেছে। ইদানীং একবার বিছানায় পিঠ ঠেকালে দিন-দুনিয়ার খবর থাকে না। তবে দরজার তীব্র ধাক্কায় নাসিফার কাঁচা ঘুম পাতলা হলো। ঘুম ভাঙতেই সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। উমরের দিকে এক লহমা চেয়ে গায়ে শাড়ির আঁচল ভালো করে জড়িয়ে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই আতঙ্ক মিশ্রিত কাঁপা গলা ভেসে এলো,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“আম্মু, মিলে আগুন লেগেছে! ভয়ানক আগুন লেগেছে! বাবা কোথায়? কল ধরছে না কেন?”
কথাটা শুনে নাসিফা প্রথমে স্তব্ধ হন। এক মুহূর্তের জন্য তার মুখের রঙ পাল্টে গেল। চোখের ভেতর জমে উঠল প্রগাঢ় অবিশ্বাস, তারপর তা রূপ নিল কঠোর উৎকণ্ঠায়। তার বুকের ভেতর কোথা থেকে হঠাৎ ভারি একটা পাথর নেমে এল। গলা শুকিয়ে এলো, ঠিকমতো কথাও বেরোতে চাচ্ছে না। স্বামীকে দেরি না করে জলদি উঠিয়ে খবর দিতেই উমর ধপ করে শোয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন।
“আগুন..? কবে? কতক্ষণ হল?”

কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন ছেলেকে। পরমুহূর্তেই তিনি চাদর গায়ে জড়াতে জড়াতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাড়ির লোকজনের কাছে ইতোমধ্যে আগুনের খবর পৌঁছে গেছে। সবাই এদিক-ওদিক থেকে দৌড়ে আসছে। সবার মুখেই আতঙ্ক। মিলে এখন কি অবস্থা আল্লাহ পাক ভালো জানেন। জলদি সেখানে পৌঁছাতে হবে। এমন ঘটনা তো কখনোই ঘটেনি। উমর ওয়াজেদের চোখ দুটো তখনও প্রজ্জ্বলিত। উমেরা বাবার পাশেই বসেছে। এমনিতেই শরীরটা তার ভালো যায় না। তার ওপর এত দুশ্চিন্তা। প্রেসারটা আবার না বেড়ে যায়! এসব নিয়ে চিন্তার শেষ নেই উমেরার।
মিলের সামনে পৌঁছানো মাত্রই ওয়াজেদ পরিবার যেন এক মৃত্যু ভয়ার্ত দুঃস্বপ্নের ভেতর ঢুকে গেল।

মিলের পুরো প্রাঙ্গণ লেলিহান আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে। আলো-অন্ধকারে মিলের ছাদ ফেটে কটকট শব্দ করছে। বোধহয় আগুনের প্রতিটি বিস্ফোরণ দেয়ালের বহু বছরের স্বপ্নের হাড়গোড় ভেঙে দিচ্ছে। উমর ওয়াজেদ থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর চোখের সামনে পুড়ে যাচ্ছে তাঁদের পরিশ্রমে গড়া মেশিন, নতুন আনা কেমিক্যালের ড্রাম, কারখানার অফিসঘরের কাঠের কেবিনেট, একেবারে সবকিছু ছাই হয়ে ঝরে পড়ছে। মুহূর্তেই তাঁর বুকটা দহন-ধূমে ভারী হয়ে উঠল। চারপাশে পরিপূর্ণ বিশৃঙ্খলা। মানুষ ছোটাছুটি করছে, কেউ দৌড়ে পানি আনছে, কেউ আবার চিৎকার করছে ভেতরে আটকে পড়া শ্রমিকদের নাম ধরে। টানা সাইরেন বাজিয়ে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স এসে থামছে। স্ট্রেচারে করে বের করা হচ্ছে গুরুতর আহতদের। কারো হাত দগ্ধ, কারো শরীরের অর্ধেক জায়গা আগুনে ঝলসে গেছে। চারদিকে কান্নার আওয়াজ, করুণ আর্তনাদ আর আগুনের দাউ দাউ শব্দ মিলেমিশে হয়ে উঠেছে অসহনীয় এক শোরগোল। ফায়ার সার্ভিস প্রাণপণ চেষ্টা করছে পানি ছিটিয়ে আগুন দমন করার। তাদের পাইপের মুখ থেকে বিশাল চাপের পানি বেরিয়ে আগুনে পড়েই ফুটন্ত বাষ্প হয়ে যাচ্ছে। দমকল কর্মীরা চিৎকার করে জনতাকে সরিয়ে দিচ্ছে,

“পিছিয়ে যান! আরও বিস্ফোরণ হতে পারে!”
উমেরা বুঝতে পারছে না সে কি করবে? এখানকার পরিস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক নয়। তবে তার তো বসে থাকলে হবে না। কত মানুষ আহত হয়েছে? এটা তো সাধারণ কোনো বিষয় নয়। সে এক মুহূর্তেই নিজেকে সামলে কাজ শুরু করে দিল। আহতদের খোঁজে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, যাদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তাদের মাথা উঁচু করে ধরে পানি দিচ্ছে। কারো পোড়া জায়গায় বরফ-ঠান্ডা কাপড় চেপে ধরছে, আবার কারো রক্ত থামানোর জন্য নিজের ওড়না ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ বানিয়ে দিচ্ছে। এক বৃদ্ধ শ্রমিককে স্ট্রেচারে তোলার সময় সে প্রায় কেঁপে ওঠে।
“চাচা, চোখ খুলে রাখুন..। আমি আছি…, আপনার কিছু হবে না।” তার কণ্ঠ স্থির হলেও চোখের ভেতর আতঙ্কের তীব্রতা লুকানো যাচ্ছিল না।

ধোঁয়ার কুণ্ডলী আরো উপরে উঠছে। তীব্র তাপ বাড়ছে। চারদিকে ছাই উড়ে এসে জমছে মানুষের চুল-ভ্রুতে।
ওয়াজেদ পরিবার অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে শুধু দেখছে তাদের স্বপ্ন, তাদের শ্রম, তাদের ভবিষ্যতের ভরসা মুহূর্তে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। উমেরার নিজের অবস্থাও খারাপ হয়ে গেছে। শুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টায় লড়াই করছে। তার তো অনেক কাজ। পরিবারকেও ছাড়তে পারবে না, আর এই অনুকূল পরিস্থিতিও সামলাতে হবে।
সময় তার আপন স্রোতে গড়িয়ে যায়। আগুন এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণে। রাতের শেষ প্রহর চলছে। উমেরা পরিবারের থেকে আলাদা হয়ে মিলের পেছনের পুকুরপাড়ে একা গিয়ে বসল। একটু আলাদা থাকতে চায় সে। তার নিজের অবস্থাও ভালো নেই। হাত পুড়ে গেছে। সেখানে মেডিসিন লাগানো দরকার। তবে আপাতত ইচ্ছে করছে না। বাবাকে সে এর আগে কখনো এমন করে ভাঙতে দেখেনি।

এই মিলে আজকেই নতুন জিনিসপত্র, মালামাল আনা হয়েছিল। কত টাকার জিনিস! বাবা এই শোক সহ্য করবে কেমন করে? তাছাড়া যারা আহত হলো, মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তাদের পরিবারের সামনেই বা তারা কি করে দাঁড়াবে? কি জবাব দিবে তাদেরকে? কিন্তু এই আগুন লাগল কি করে? এটা স্বাভাবিক দূর্ঘটনা, নাকি বড়ো রকমের ইচ্ছাকৃত ষড়যন্ত্র? হঠাৎ মিলের পেছন দিকে পুড়ে যাওয়া দরজার দিকে চোখ গেল তার। ধুম করে কি একটা ভেবে উঠে গেল সেদিকে। আগুন বন্ধ হয়েছে, তবে তাপটা এখনো গা পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে। উমেরা কাঁদতে পারে না, সে চোখের জল হাতের উল্টো পাশ দিয়ে মুছে পুড়ে যাওয়া জিনিস পত্রগুলোর দিকে তাকালো। হঠাৎ একটা পুড়ে যাওয়া আইডি কার্ড চোখে পড়তেই চোখ দিয়ে জল যেন আবার গড়িয়ে পড়তে চাইল। হায় খোদা! জীবন বাঁচাতে মানুষ সব ছেড়ে বাইরে বের হওয়ার জন্য লড়েছে। আচ্ছা, আইডিকার্ডের মালিক কি সুস্থ আছেন? পোড়া আইডি কার্ডটা হাতে তুলে নিল উমেরা। পুরোটা পুড়ে-গলে বাঁকিয়ে গেছে। প্লাস্টিক তো পুড়লেও নিঃশেষ হয় না। উমেরা নামটা পড়ার চেষ্টা করল। পড়তে পারছে না। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবে নামের শেষাংশ এখনো কিছুটা স্পষ্ট। ভালো করে খেয়াল করতেই বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে এলো উমেরার। মৃদু কণ্ঠে মুখ থেকে বিড়বিড় শব্দ করে বেরিয়ে এলো,
“পাটোয়ারী?”

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ধরা দেয়নি। আকাশে নীলচে ছাইরঙা এক আবছায়া। শেহরাজ ক্লান্ত পায়ের টানে বাড়ির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে। তার বুক জুড়ে জমে থাকা রাতের গন্ধ আর অনিদ্রার কটু বিষাদ এখনো ঝুলে আছে। জুতো খোলার আগেই সে বুঝতে পারল, শরীরের প্রতিটা পেশি ঘামে ভেজা। বাথরুমের দরজা টেনে ভেতরে প্রবেশ করল সে। ঝর্ণা ছাড়তেই ঘড়ঘড় শব্দ করে জল পড়ল। উষ্ণ জল তার পিঠ বেয়ে নামতে নামতে রাত ভর ছুটে বেড়ানো সব ক্লান্তি চিঁড়ে বের করে দিতে লাগল। হঠাৎ রাতের কথা মনে পড়ল তার। রাতে শাওয়ার নিতেই তো যাচ্ছিলো। এমন সময় একটা জরুরি কল এলো। না পারতে জলদি বাইরে চলে যেতে হলো। ফিরেছে এই তো মাত্রই। গোসল শেষে তোয়ালে কাঁধে ফেলে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই কুয়াশার মতো ধোঁয়াটে ভোরের আলো তার মুখে পড়ল। চোখের নিচে কি কড়া দাগ পড়েছে? না, এবার একটু শরীরের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। নিজের কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ টেবিলের ওপরে রাখা তার ফোনটা ভোঁ ভোঁ শব্দে কেঁপে উঠল। শেহরাজ হাতে ফোন তুলে নিলো। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলো। কারণ সেখানে বড় বড় অক্ষরের লেখা, “অফিসার ইন চার্জ।” ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে চাপা উত্তাপ ভেসে এলো,

“স্যার, বড় রকমের সমস্যা হয়ে গেছে। একটু আপনারা থানায় আসতে পারবেন?”
কথা শেষে ফোনটা কেটে বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলল শেহরাজ। বিরক্ত নিয়ে আওড়ালো,
“খোদার দুনিয়ায় ৩৬৫ দিনই বোধ-হয় ‘ঝামেলা’ নামক আপদ তোকে এভাবেই ভালোবাসা দিয়ে যাবেরে শেহরাজ। জীবনও একটা মাশাআল্লাহ। ঝোনাকির পেছনের মতো তাতে কেবল সামান্য আলো আছে, অথচ ঝোনাকির পেছনে দড়ি বেঁধে সারা শহরে বিদ্যুৎ সাপ্লাই করার মতো আমজনরতার কোনো অভাব নেই।”
শেহরাজ চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। গোসলের উষ্ণতা হঠাৎ বরফে পরিণত হলো।

থানার ভেতরটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দুই পরিবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। চোখ-মুখে বিষাদ আর রাগের মিশেল। ওয়াজেদ পরিবারের ছেলে শুদ্ধ কঠিন গলায়
চিৎকার করে বলছে,
“আমাদের মিলটা ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে! পরিকল্পনা করে! এরা ছাড়া আর কেউ এসব করতে পারে না!”
পাটোয়ারী পরিবারের পক্ষ থেকে পাল্টা ধমক এল।
“মিথ্যা! আগুন তো তোমাদের নিজেদের গাফিলতিতেই লেগেছে। এখন দোষ চাপাতে এসেছো!”
টেবিল চাপড়ে উঠছে। চেয়ার টেনে শব্দ হচ্ছে। অফিসাররা বারবার দু-পরিবারকে থামানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু উত্তেজনা দু-পরিবারের কারোর থামার নয়। হঠাৎ দরজা ঠেলে শেহরাজ ঢুকে। তার বাবা, চাচা আগেই চলে এসেছিল। তার আসতে একটু দেরি হয়ে যায়। তার প্রবেশের সঙ্গে এক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ হয়ে যায়। সে টেবিলের সামনে দাঁড়ায়, হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে, নির্লিপ্ত গলায় বলে,

“চিৎকার করে সত্যি প্রমাণ করা যায় না। যারা নির্দোষ, তাদের শব্দ ছোট হয়। অপরাধীদের শব্দই বেশি লাফায়। তা জানা আছে তো? ওহ, জানা থাকবে কি করে আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম ওয়াজেদদেরকে মস্তিষ্ক ফাঁকা।”
বক্তব্যটা বুলেটের মতো গিয়ে ঠেকে অপর পক্ষের বুকে। ওয়াজেদদের মধ্যে কেউ কেউ অসন্তুষ্টভাবে নড়েচড়ে বসে। তাদের মেজাজ গরম হয়ে ওঠে। উমর ওয়াজেদের ভাই গলা তুলে পুলিশকে বললেন,
“স্যার! আগুন ওরা লাগিয়েছে। ওদের চেনা আছে। কিছুদিন আগেও তো ঘোষণা মঞ্চে নিজেরাই দাঙ্গা লাগিয়ে আমাদের ওপর দোষ দিতে চাইছিল। আর ওরাই আগুন লাগিয়েছে। কত মানুষ দেখেছে।” শেষের কথাটা আন্দাজে ছুঁড়ে দিলেন তিনি।

শেহরাজ ঘুরে তাকায়। শুধাল, “মানুষ? কোন মানুষ?
নাম বলুন। বক্তব্য লিখিত দিন। এসব ফালতু কথা দিয়ে বরঞ্চ গল্প হয় , প্রমাণ নয়।”
শেহরাজের গলা একেবারে শান্ত, কিন্তু কথার ধার ভেঙে দিতে পারে ইস্পাতকেও। উমর ওয়াজেদের ভাইয়ের মুখের রঙ বদলে যায়। সে তোতলায়,
“মমমানে..? একজন ছিল…নামটা…সঠিক…।”
শেহরাজ হেসে ঠাণ্ডা গলায় বলল, “বুঝলাম।”
হঠাৎ উমর শান্ত গলায় পুলিশকে বললেন, “আমাদের ক্ষতি করে আমাদের ওপরই দোষ চাপানোটা যে তোমাদের পুরোনো অভ্যাস তা জানা আছে।”
শেহরাজ তার দিকে তাকিয়েই বলল,

“আপনাদের অভ্যাস কী, সেটা পরে দেখা যাবে। আগে একটা কথা বলুন তো, প্রমাণ ছাড়া লাগামহীন কুকুরের দলের মতো থানায় আসা কি ঠিক হয়েছে?”
শেষ করেই শেহরাজ অফিসারের দিকে তাকালো। হেসে বলল, “আমাদের সময়ের অনেক মূল্য আছে অফিসার। দয়া করে পরেরবার যাছাই-বাছাই করে কল করবেন। আজ চললাম। পরবর্তীতে কল দিয়ে বিরক্ত করার আগে দশবার ভেবে দেখবেন, কাদের কল দিয়েছেন?”

অফিসার থতমত খেয়ে যান। দুই দলের মানুষই ক্ষমতাবান। কাকে রেখে কাকে যে সামলাবে? আর হ্যাঁ, আগুন যে পাটোয়ারী বাড়ির মানুষ লাগিয়েছে, তার তো কোনো প্রমাণ নেই। কেন যে মাথা না খাঁটিয়ে কলটা করতে গেল? আবার কল না করলেও তো ওয়াজেদ বাড়ির লোক তাকে ছাড়ত না। ধ্যাৎ! বাবা কি ঝামেলা?
ভেতরে দুই পরিবারের পুলিশের সঙ্গে আরও কিছু কাজ আছে। তবে শেহরাজের এখানে দাঁড়ানোর মোটেও ইচ্ছে নেই। জিজ্ঞাসাবাদ ঘরের দরজা ঠেলে শেহরাজ বাইরে বের হয়ে আসে। করিডোরে পা রাখতেই একটু দূর থেকে একটি পরিচিত মুখ তার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। মেয়েটি চেয়ারে ভদ্রভাবে গুটিয়ে বসে আছে। লম্বা দোপাট্টা মাথায়। হাত দুটো আঙুলের মুঠে বেঁধে রাখা। উমেরা ওয়াজেদ! শেহরাজ থেমে যায় এক সেকেন্ডের জন্য। চোখে বিরক্তি নয়, বরং এক ধরণের অবর্ণনীয় কৌতূহল, যেটা সে চাইলেও লুকাতে পারে না। তার মনের ভেতর কথাটা বিদ্যুৎয়ের মতো জ্বলে ওঠে।,

“আবারও এই মেয়েটা… এই গাদ্দার পাকিস্তানির বংশধরের সঙ্গে দেখা না হলেই কি নয়?”
গত দুই একদিনে দু-একবার তার সঙ্গে দেখা হওয়ায় একটা অস্বস্তিকর টান তৈরি হয়েছে, যা সে ব্যাখ্যা করতে পারবে না। অকারণে জড়িয়ে পড়া, এটা শেহরাজের পছন্দ নয়। উমেরা চোখ তুলে তাকাতেই তাদের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ড আটকে থাকে। উমেরা শেহরাজকে দেখা মাত্রই তার মনের ভেতর ধক করে ওঠে। কারণ সে জানে। এই মানুষটা পাটোয়ারী বাড়ির ছেলে। আর তারা আজ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে, সেই পরিবার এই লোকেরই। আর আইডি কার্ডের কথা এখনো ভুলতে পারছে না সে। এই কাজ ওদেরই। ওদের এই ভালো মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রূপটা খুবই জঘন্য। চাইলে এখনই আইডি কার্ডটা পুলিশকে দিতে পারে, তবে এখন দিবে না। পাটোয়ারীদের এত সহজে ছেড়ে দেওয়া অসম্ভব। শেহরাজ প্রথমে পাত্তা না দিয়ে সামনে দিয়ে চলে যেতেই নেয়। তবে কেন যেন পা তার থমকে যাচ্ছে। হঠাৎ শেহরাজ করিডোরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি আবার থানায়? ওহ এখনেও গাদ্দারের বংশধর তার চৌদ্দ গুষ্টি নিয়ে হাজির হয়ে গেছে? ভয় করছে তো! ভয়ে লিভারে পেইন হচ্ছে। একটু যদি চেক-আপ করে দিত কেউ। উফস! তুমি তো এখনো ডাক্তার হওনি। ভুল চিকিৎসা করে যদি মেরেটেরে ফেলো? বলা তো যায় না, দুশমনের মেয়ে বলে কথা, রোগী তো আর দেখবে না, দেখবে সে কোন বাড়ির ছেলে।”
বলেই বাঁকা হাসল শেহরাজ। উমেরা খুবই অস্বাভাবিকভাবে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তার চোখে হিমশীতল দৃষ্টি নেমে আসে।
“অদ্ভুত মেয়ে…!”

শেহরাজ পুনরায় বলল। সে মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে এলো। তার বুটের শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। উমেরা তখনো নিশ্চুপ। কেবল তাকিয়ে থাকে ঘৃণাভরা দৃষ্টি নিয়ে শেহরাজের পানে।
“আপনি দেখছেন না আপনার সঙ্গে আমি কথা বলতে আগ্রহী নই?”
“কেন কেন? আমি কি চিংড়ি মাছ, নাকি গরুর মাংস? আমার সঙ্গে কথা বললে যে এলার্জিতে মুখ চুলকাবে?”
“আপনি পাটোয়ারী বাড়ির বদরক্ত। আপনাদের মতো মানুষদের চেনা আছে। জানেন তো, আপনাদের মতো রাজনীতিবিদরা শুধু মুখোশ পরে চলে। মানুষকে বাঁচায় খুব কম, ক্ষমতায় মারে বেশি।”
আচমকা শেহরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে তার ভেতরের ক্ষোভ জেগে ওঠে। সে ধীরে ধীরে উমেরার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বলে,

“আজও রাজনীতিবিদদের নিয়ে কোনো নতুন তত্ত্ব বলবে নাকি? থানায় বসে আর কি কি মহান বিশ্লেষণ আসছে মাথায়?”
উমেরা চোখ দুটো বড় বড় করে তাকায়। তার গলায় মৃদু কাঁপন। সে নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা উঁচু করে বলল,
“না আজ বিশ্লেষণ নয়, কেবল মানুষ বাঁচানোর চিন্তা করছি। আপনাদের মতো মানুষের ক্ষতি করে ক্ষমতাধর ভদ্রলোকদের মতো বাসায় বসে চা খাওয়ার সময় তো আর আমাদের নেই।”
শেহরাজের ভ্রু কুঁচকে যায়,
“তাই বলে আমাদের ওপর আগুন লাগানোর অভিযোগ দিতে হবে? তোমাদের পরিবার তো সবই পারে, বিনা প্রমাণে অভিযোগ।”
উমেরা একটু গলা শক্ত করল,

“যে পরিবার মানুষকে ভয় দেখিয়ে চলে, তাদের মুখে এমন কথা মানায় না।”
শেহরাজ এবার সত্যিই বিরক্ত হয়,
“তোমার সমস্যা কী জানো? তুমি ভাবো, তুমি সব জানো। কিন্তু বাস্তবে তুমি অর্ধেক সত্য শুনে পুরো পৃথিবীর ওপর রায় শুনিয়ে দাও। এমন সমস্যা নিয়ে এই কঠোর দুনিয়ায় চলতে পারবে না, ভিনদেশী। যাও পোঁটলাপুটলি প্যাক করে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাও।”

উমেরা শেহরাজের দিকে এগিয়ে এসে খুব নিচু স্বরে বলল, “এক পাকিস্তানিই কিন্তু অন্য পাকিস্তানি চেনে বুঝলেন তো শেহরাজ পাটোয়ারী? যাইহোক সাহায্য লাগলে বলবেন, বর্ডার পার করার ব্যবস্থা আমার। পূর্ব পুরুষদের কথা খুব মনে পড়ে তাই না? তাই তো কথায় কথায় পাকিস্তানকে টেনে আনেন।”
শেহরাজের গলার পেশি টান খায়। সে এক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “তুমি একদিন বড় বিপদে পড়বে, হবু ড. উমেরা। এভাবে মানুষ বিচার করতে গেলে ভুল মানুষের ওপর ভরসা করে বসবে।”
উমেরা রাগে চোখ সরু করল,

“ভরসা করার মতো কোনো প্রয়োজন নেই আমার। আর আপনার মতো লোকের ওপর তো, কখনোই নয়।”
শেহরাজ উমেরার দিকে ঝুঁকে আসে।
“তাহলে আমার কাছ থেকে দূরে থাকো। অকারণে আমার সামনে বারবার এসে পড়ছো কেন? এটেনশন চাই নাকি তোমার? শেহরাজের এটেনশনের মূল্য কিন্তু বহুত। মূল্য চুকাতে পারবে তো, ডাক্তার ম্যাডাম?” বলেই শেহরাজ বাঁকা হাসে। চোখ দুটো তার ছোট ছোট হয়ে আসে।
উমেরা বুক ভর্তি গর্ব নিয়ে বলল,

“দেখুন আপনার সামনে আমি আসি না। আপনারাই ঝামেলার মতো আমাদের পেছনে লেগে থাকেন। আর বাকি রইল এটেনশন? উমেরার দিন এতটাও খারাপ হয়ে যায়নি যে, সস্তা কারো থেকে এটেনশন চাইতে হবে।”
“ওহ্… তাই নাকি? তাহলে তো তোমার খারাপ দিন দেখার অপেক্ষায় রইলাম, হবু ড. উমেরা ওয়াজেদ। আসলে কি আর বলব? শুনেছিলাম তোমাদের পরিবারের বংশগতভাবে মাথায় সমস্যা আছে। এখন দেখছি, ঘটনা আসলেই সত্য। মানতে হবে, ওয়াজেদ পরিবার বলে কথা। আর তোমার কথা কি বলব? গাছ যেমন, ফল তো তেমন হবেই।”
উমেরা ঠোঁট সোজা করে, “হ্যাঁ। আর এতে আপনার সমস্যা কী?”
“সমস্যা? যে পরিবার আজ থানাটাকে সার্কাস বানিয়ে ফেলেছে। তার মেয়ে ডাক্তার হয়ে এখানে ‘মানবতার বানী’ শোনাতে এসেছে, এটাই সমস্যা। তোমার পরিবার আমাদের আগুন লাগানোর মামলায় জড়াতে চায়। আর তুমি এখানে এমন ভাব করছো, যেন পাহাড়ের বুকে ফুল তুলতে এসেছো।”
উমেরা শেহরাজের সামনে বরাবর এসে দাঁড়ায়,

“দোষীর মুখে কত কথার খই ফুটতে পারে খোদা?”
“দোষী আমরা? নাকি তোমাদের লোকেরা নিজেদের মিল সঠিকভাবে চালাতে পারে না, তাই আগুন লেগে গেছে? তার দায় আমাদের ঘাড়ে চাপাতে এসেছ?”
“যে পরিবার জোর,পেশি খাটিয়ে চলে, তাদের ওপর অভিযোগ আসবেই। এটা স্বাভাবিক নয় কি?”
“আর যে পরিবার সুযোগ পেলেই পাটোয়ারীদের পিঠে ছুরি বসায়। তাদের মেয়েরা এসে জ্ঞান দেবে? এটা কি স্বাভাবিক ? আরে বাবা এটা কোন ধরনের আইন?”
উমেরা চোখ সরু করল,

“আমি সত্য বলি। আর সত্য সবসময় কষ্ট দেয়, বুঝলেন তো?”
শেহরাজ এবার সামনে আরও ঝুঁকে যায়।
“তোমার সত্য? তুমি তো পাঁচটা পোস্টার দেখেই মানুষের চরিত্র লিখে ফেলো। একজন রাজনীতিবিদের ছেলেকে দেখে ভাবো, সে জন্মগত অপরাধী। নিজেও তো রাজনীতিবিদের মেয়ে, ভাব করছো যেন তোমার বাবা রাস্তার মোড়ের হনি পাগল? ভিক্ষা করে তোমায় মানবতার ফেরিওয়ালী বানিয়েছে?”
উমেরা তীক্ষ্ণ হাসল, “ভিক্ষুকের ঘরে জন্ম হলেও আফসোস থাকত না। তবে জানেন কি? আপনারা ভাবেন, ক্ষমতার দাপটে সবকিছু ধামাচাপা দেওয়া যায়। বাস্তবতায় ফিরুন, মিস্টার পাটোয়ারী।”
“কম করে কথা বলো, হবু ডাক্তার সাহেবা। তোমার মুখোশের আড়ালে যে অহংকারটা লুকিয়ে আছে না, ওটা খুব বাজে দেখায়।”
উমেরা জবাব দেয়,

“আর আপনার উচ্চাভিলাষী, সর্বজানা মুখভঙ্গি, ওটা তো আরও বাজে দেখায়।”
শেহরাজ এগিয়ে এসে হঠাৎ উমেরার হাত পেছন থেকে ধরে মুচড়ে দেয়। তীব্র ব্যথায় উমেরা থমকে দাঁড়িয়ে যায়। নিঃশ্বাস আটকে আসে, কিন্তু চিৎকার করে না সে। তার মুখ শেহরাজের কাছে, খুব কাছে। উমেরা ফিসফিস করল,
“ছাড়ুন বলছি!”
শক্ত শোনাল তার কণ্ঠ। শেহরাজ উমেরার কানের কাছে ঝুঁকে খুব নিচু, আর শীতল স্বরে বলল,
“তুমি ভুল জায়গায় ভুল মানুষকে ভুল কথা বলেছো, হবু ডাক্তার সাহেবা।”
উমেরার চোখে একরাশ ঘৃণা। ব্যথা পাওয়া সত্ত্বেও বলল, “আপনার মতো মানুষ সত্যকে ভয় পায়, তাই হাত মুচড়ে ধরা ছাড়া আর কিছুই করতে তারা পারে না।”
শেহরাজ উমেরার আরও কাছে আসল।

“তোমাদের পরিবারই আগুন লাগিয়েছে। আর তার দায়ভার ষড়যন্ত্র করে আমাদের ঘাড়েই চাপাতে চাইছো? আর কি যেন, তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে ন্যায়বোধের বক্তৃতা দিচ্ছো? হাউ ফানি। বিশ্বাস করো, কান ধরে গেছে তোমার এই হাদিসের বাণী শুনতে শুনতে।”
উমেরা শ্বাস কাঁপিয়ে বলল,
“শয়তানরা হাদিসের বাণী শুনলে, কান তো ধরবেই। আমি যা দেখি, তাই বলি। মুখোশধারীদের ভয় পাই না।”
শেহরাজ হাতের চাপ আরও বাড়ায়। শক্ত চিবুকে বলে,
“ভয় পেতে হবে, উমেরা। কারণ তুমি এখন জানবে, আমি শুধু পাটোয়ারী পরিবারের ছেলে নই। আমি শেহরাজ পাটোয়ারী। আমার পেছনে লাগলে দুনিয়ায় জাহান্নাম দেখিয়ে ছাড়ব।”

দহনসুধা পর্ব ৩

হঠাৎ শেহরাজ তার কথার মাঝে পায়ের শব্দ পেল। ভেতরের কাজ বোধহয় শেষ হয়েছে। সে জলদি উমেরার হাত ছেড়ে দেয়। উমেরা পেছনে এক পা সরতেই দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে শ্বাস নেয়। দুজনের চোখ আরো একবার একে-ওপরের দিকে আটকে যায়। রাগ, ঘৃণায় দুটি দৃষ্টি এক হয়েও যেন আলাদা। শেহরাজ এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে বাইরে চলে যায়। উমেরা তখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে। চোখে জল। তবে এই জল রাগ-ক্ষোভ থেকে সৃষ্টি, ঘৃণা থেকে সৃষ্টি। এই জল মাটিতে পড়তে দেওয়া যাবে না। পড়লেই উমেরা ওয়াজেদ তার জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত পাপিষ্ঠ শত্রুর কাছে পরাজিত হবে। যা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ উমেরা কখনোই পরাজিত হতে শেখেনি, হবেও না।

দহনসুধা পর্ব ৫