দহনসুধা পর্ব ৩
১৫ জন রাইটার
পিচ ঢালা রাস্তায় উমেরার স্কুটির ঘর্ষণ এবং গোটা কয়েক গাড়ির হর্ণ ছাড়া আপাতত চারিদিকে নীরব। রাস্তা ব্যস্ত হলেও এই সময়টায় তেমন গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। যা-ও দু-একটা, সেটাও দ্রুতই ছুটে চলছে। দিনের প্রায় প্রতিটি প্রহর শেষের দিকে। সূর্য পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে যাবে যাবে বলছে। হসপিটাল থেকে জারার বাসা বেশি দুরত্বে না থাকায় উমেরা প্রথম জারাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। আজ ঘটে যাওয়া প্রতিটা ঘটনা উমেরার স্মৃতিতে একেবারে গেঁথে আছে। উমেরার মস্তিষ্ক অন্যমনস্ক হলেও রাস্তার দিকে তার ছিল খুব মনোযোগ। এই অল্প বয়সে অ্যাক্সিডেন্ট করে মরার শখ অন্তত তার নেই। তবে হুট করেই উমেরার স্কুটিটা কেমন খটখট শব্দের সাথে বেসামাল হয়ে গেল। উমেরা দ্রুতই সামাল দিতে দিতে স্কুটি থেমে গেল। পা দু’টো রাস্তায় ঠেকিয়ে ব্যালেন্স করতে চাইল, যাতে সে সক্ষম। উমেরা বিরক্ত হয়ে স্ট্যান্ড দিয়ে নেমে দাঁড়াল।
“কি অদ্ভুত, এটাকে এই মাঝ রাস্তায়ই খারাপ হতে হলো! এখন এটাকে টেনে বাড়ি পর্যন্ত নিতে হবে। একটা দিনে আর কত গুলো ঝামেলা দিবে মাবুদ।”
উমেরা কথা গুলো আকাশের দিকে তাকিয়েই বলছিল, যেন সরাসরি সৃষ্টিকর্তার কাছে তুলে ধরা অভিযোগ। এখান থেকে গ্যারেজের দুরত্ব বাড়ির দূরত্বের থেকে একটু বেশিই। অনেক গুলো গণিত ক্যালকুলেশন করে উমেরা সিদ্ধান্ত নিল সে কোন ভাবে স্কুটি ঠেলে বাড়িতে পৌঁছাতে পারলেই হলো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
শেহেরাজের ডিউটি টাইম শেষ। সে টেবিলের উপরে থাকা ফোন আর ওয়ালেট পকেটে গুঁজে নিল। জাওয়াদ পাশ থেকে গাড়ির চাবিটা উঠিয়ে নিয়ে বলল,
“ভাই চলেন, আমি গাড়ি বেড় করছি!”
“না।”
শেহেরাজের স্পষ্ট কথা। যেন এই এক শব্দে সে পুরো মজলিস চুপ করিয়ে দিতে পারে। জাওয়াদ খানিকটা অবাকও হয়! এই কাজটা যে তারই করার কথা ছিল। ডিউটি টাইম শেষ হলে শেহেরাজকে ড্রাইভ করে নেওয়ার দায়িত্ব টা জাওয়াদেরই, কিন্তু শেহরাজ সরাসরি নাকোচ করায় সে বিচলতি হয়ে জানাতে চাইল,
“কেন ভাই?”
“তুই বাড়ি চলে যা। আজ আমি একাই চলে যাব।”
শান্ত কিন্তু স্পষ্ট শীতল কণ্ঠ স্বর। জাওয়াদ আর কোন প্রশ্ন করার সাহস দেখায় না। এমনিতেই শেহরাজ এক কথার লোক, যেটা সে বলবে সেটাই করবে, তার উপর কথাও বলে খুব কম গুরুগম্ভীর স্বভাব। এই কথা কম বলা মানুষগুলো বেশ বিচক্ষণ হয় বলে জাওয়ায়েদের ধারণা। কারণ ওরা কথা বলে কম, তাই যা দু একটা কথা বলে সেটা যৌক্তিক এবং শুনতেই হবে এমন। জাওয়ায়েদের মাঝে মধ্যে মনে হয় সংবিধানে উল্লেখ করা উচিত, হাজারটা কথা খরচ না করে একটা দু’টো কথায় মজলিস থামিয়ে না দিতে পারলে রাজনীতিতে এসো না। শেহেরাজের সমস্ত গুণের মত এটাও চোখে লাগার মত একটা গুন। শেহেরাজ জাওয়াদের থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
হসপিটালের পার্কিং লটে একটা কালো চকচকে মার্সিডিজ-বেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে। রিমোট কী বাটন চাপতেই গাড়িটা দু’বার টুইটুই শব্দ করে উঠল। শেহেরাজ গাড়ির দরজা খুলে বসে সিটবেল্ট লাগিয়ে ইগনিশনে চাবি ঘোরাতেই গাড়িটা স্টার্ট হল। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যখন বাড়ির রাস্তা ধরছিল, তখন হাইওয়ের নির্জন এড়িয়াতেই দেখা মিলল সেই স্কুটিওয়ালা ভিনদেশী রমনীর। কোন মতে স্কুটি খানা ঠেলে গন্তব্যে পৌঁছানো যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ এবং উদ্দেশ্য। শেহেরাজ গাড়িটা নিজের অজান্তেই স্লো করল। উমেরার সে দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সে আপন মনে নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে আছে। শেহেরাজ ততক্ষণ পর্যন্ত ভিনদেশী কে দেখেছে! যতক্ষণ না পর্যন্ত উমেরা নিজের বাড়ির মোড় পেরিয়ে মিলিয়ে গেছে।
রাস্তার একেবারে মাথার দিকে শেহেরাজ হঠাৎ গাড়িটা জোরে ব্রেক কঁষে থামিয়ে দিল। কিছুক্ষণের জন্য চিন্তায় পড়ল, আগে তো কখনো এমন হয়নি! তবে ওই স্কুটিওয়ালি ভিনদেশীকে দেখার জন্য এমন পাগলামি কেন করল সে? নিজের চিন্তায় নিজেই বিরক্ত হলো খানিকটা। এরপর যত স্প্রিড দেওয়া যায় ততটাই স্প্রিডে তার গাড়িটা পাটোয়ারী বাড়ির দিকে অগ্রসর হলো।
উমেরা কোন মতে স্কুটি ঠেলে বাড়িতে পৌঁছাল। এই অবলস্ট স্কুটি নিয়ে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছান, কোন যুদ্ধের থেকে কম ছিল না তার জন্য। বাড়ির গেট পেরোতেই ওয়াজেদ বাড়ির বয়স্ক দারোয়ান উমেরাকে দেখে দ্রুত এগিয়ে আসল। কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“আম্মাজান, আপনের স্কুটি নষ্ট হইয়া গেছে সেইডা কাউরে ফোন দিয়া কইবেন না? এত কষ্ট কইরা ঠেইলা ঠেইলা আনতে গেলেন ক্যান?”
উমেরার শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত! ঘেমেছেও প্রচুর, একটা ক্লান্তিকর ভারী নিঃশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল,
“ওই তিন রাস্তার ওইখান থেকে নষ্ট হয়েছে তাই নিজেই নিয়ে এলাম! খুবই ক্লান্ত হয়ে গেছি চাচা! গাড়িটা একটু গ্যারেজে রেখে আসবেন? ”
“হ আম্মাজান। আমনে ঘরে যান, আমি জায়গার গাড়ি জায়গায় রাইখা আইতাছি।”
উমেরা আর কোন উত্তর দিল না। হিজাবের পিন আর সাদা এপ্রোন খুলতে খুলতে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল। শুদ্ধ তখন লিভিং রুমেই বসে ছিল। উমেরাকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“কিরে, তোকে এমন ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন?”
“দাঁড়াও! ফ্রেশ হয়ে এসে একবারে সব গল্প বলব। আজ অনেক কাহিনি ঘটেছে।”
শুদ্ধ নড়েচড়ে বসল, “আচ্ছা, তাই নাকি?”
“হ্যাঁ। ফ্রেশ হয়ে আসছি, ওয়েট।”
এই কথা বলেই উমেরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের কামরায় চলে গেল। শুদ্ধ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল বোনের চলে যাওয়া পিঠের দিক। অতঃপর আবার নিজের ফোনে মনোযোগ দিল।
ওয়াজেদ বাড়ির সবাই কর্মব্যস্ততার কারণে দিনের বেশিরভাগ সময় বাহিরে থাকেন। তাই দিনের বেলার খাবারের সময় একে অপরের সাথে তেমন দেখা হয় না। যার জন্য ডিনারটা তারা সব সময় এক সঙ্গে করার চেষ্টা করে। আজও তার ব্যাতিক্রম নয়। ওয়াজেদ পরিবারে সদস্য বলতে, উমর ওয়াজেদ আর তার অর্ধাঙ্গিনী নাসিফা বেগম এবং শুদ্ধ আর উমেরাকে দিয়ে মাত্র ৪ জন সদস্য। নাসিফা বেগম ভিনদেশি হলেও এই সংসারকে সে খুব অল্প সময়েই খুব আপন করে নিয়েছিলেন। হলঘরের ডাইনিং টেবিলে খাবার পরিবেশন করে, নাসিফা বেগম সবাইকে গলা উঁচু করে আওয়াজ দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উমেরা দুলতে দুলতে এসে সোজা নিজের চেয়ারে বসল। মায়ের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলে উঠল,
“আম্মু, আমি খুবই ক্ষুধার্ত। সেই কখন থেকে পেটের মধ্য গটর মটর শব্দ করছে!”
“তোকে তো বলেছিলাম, দ্রুত খেয়ে নিতে। সেই কখন থেকে ডাকছি আমি। ”
“মোটেই না, ভাইয়া আর আব্বুর সাথে না খেলে আমার খাওয়াই হবে না!”
নাসিফা বেগমের মুখে মৃদু হাসি ফুঁটল। উমেরা তার জীবনে এসেছিল ভোরের সূর্যের আলোর রশ্মির মত! তাকে পাওয়ার পর তিনি কখনই আর একা অনুভব করেন নি, তার মেয়েটা তার জন্য জান্নাতের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে সবাই খাবার টেবিলে উপস্থিত হল। শুদ্ধ এসে উমেরার মাথায় পিছন থেকে হালকা টোকা দিল। উমেরা মাথা উঠিয়ে ভেংচি কাটল। শুদ্ধ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
“কিরে, কি ঘটনা বলবি বলছিলি?”
“ওহ, জানো আজ কি হয়েছে? জারিফ ভাইয়া না আজ সম্লেলনে গিয়ে সংঘর্ষের মুখে পড়েছিল।”
শুদ্ধ নিজের প্লেটে খাবার নিতে নিতে জিজ্ঞেস করল,
“এখন কি অবস্থা? ”
“হসপিটালে আছে। আমি আর জারা গেছিলাম। অনেক ইনজুরি হয়েছে জারিফ ভাইয়া। আমি ভাইয়াকে বলেছি, এসব সঙ্গ ছেড়ে দিতে।”
“জারিফ ভাই রাজি হয়ে গেল?”
“সেটা তো জানিনা।”
শুদ্ধ হাসল, তবে নৈঃশব্দ্যে। তার বোন ধানিলঙ্কা বটে তবে তাকে বোকা বানানো খুব একটা কসরতের কাজ নয়। নাসিফা বেগম মেয়ের প্লেটে খাবার দিতে দিতে বললেন,
“শুদ্ধ তোকে বোকা বানিয়েছে, পাগল মেয়ে।”
“কি..!”
“আরে না.. না! আম্মু, কেন ভাই বোনের ভেতর দ্বন্দ্ব বাঁধিয়ে দিচ্ছ।”
নাসিফা বেগম উমেরার পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। হালকা রাগ মিশ্রিত গলায় বললেন,
“হ্যাঁ, এভাবেই সারা জীবন বোকা বানিয়ে যাস আমার সরল সোজা মেয়েটাকে!”
“মোটেই না! আমি মোটেও বোকা নই। আজ হসপিটালে দাঁড়িয়ে জারিফ ভাইয়াকে এবং ওই খাট্টাস মার্কা লোকটাকে আচ্ছা মত বকে এসেছি।”
“কোন হসপিটাল? ”
“এস.পি.জি হসপিটাল।”
“বাহ! তুই শেহেরাজের হসপিটালে গিয়ে শেহেরাজকেই উল্টা পাল্টা বলে এসেছিস! ইন্টারেস্টিং ভেরি ইন্টারেস্টিং! ”
“ওটা ওই নেতার ছেলের হসপিটাল? ”
“হ্যাঁ, ওটা তাদেরই হসপিটাল এবং সে ওখানকার বড় ডাক্তার। সব ডাক্তারদের হেড!”
উমেরা কিছুক্ষণ নিরবতার বলল,
“এই সরকার ব্যাবস্থার নেতা-মন্ত্রীগুলো কি অদ্ভুত তাই না? যারা নিজেরা নিজেদের স্বার্থে মানুষের অপব্যবহার করে, কত শত মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলে। ঠকানো, খুন, সমগ্র বেয়াইনি কাজ সব এই শিক্ষিত মানুষগুলোই করে! দেশ তো চালাচ্ছে মূলত অশিক্ষিত গায়ে খাটা লোক জন।”
শুদ্ধ সহ সবাই উমেরার কথা গুরুত্ব দিয়েই শুনছিল। উমেরা আবার বলতে শুরু করল,
“যাকে মারে তাকেই খাবার দেয়! এই পুরো কাজটা না পানির চক্রের মত, চক্রাকারভাবে ঘটেই চলেছে। এদের ভেতর থেকে কেউ এমন নেই যে আসলে দেশকে ভালোবাসে! দেশকে সত্যিকারে ভালোবাসলে মানুষ কখনো দুর্নীতিতে জড়াতে পারত না। ”
শুদ্ধ হাতের চামটা প্লেটে রেখে উমেরার পানে চায়,
“অপরাধী রাজার থেকে মন্ত্রী বেশি ভয়ানক! এরা জানে রাজা অপরাধ করছে, কিন্তু কোন পদক্ষেপ নেয় না। এর কারণ যদিও স্বার্থ তবে রাজনীতিতে যত মানুষের আনাগোনা আছে তারা সহজেই চলে আসেনি। তাদের এই পর্যায়ে আসতে এত পরিক্ষা দিতে হয়েছে, যে এখন তারা চাইলেও এই পথ ছাড়তে পারবে না।”
“গত কিছু বছরে দেশের ভেতর থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, সেগুলো ফেরত আনতে পারলে গোটা ৪ বছরের বাঝেট পাস করা যেত।”
নাসিফা বেগম হাত থেকে চামচটা প্লেটে রাখলেন। সিরামিকের প্লেটে চামচের মৃদু শব্দ দু-ভাই বোনকে মায়ের দিকে তাকাতে বাধ্য করল। নসিফা বেগম উমেরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“জানো একটা বিষয় কি? যদি কারোর চরম পর্যায়ে ক্ষতি করতে চাও, তাহলে তাকে বিবাহ করিয়ে দাও, না হয় তাকে রাজনীতিতে ঢুকিয়ে দাও। তুমি একজন স্বাধীন চেতা মেয়ে, আমি সেই মনোভাব কে সম্মান করি উমেরা! তবে এই পর্যায়ে এসে তুমি এসব বিষয় থেকে যত নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারো ততই তোমার জন্য মঙ্গল। একজনের চিন্তা বদলালে আহামরি রেভুলেশন হয়ে যাবেনা। ক্ষমতা শব্দটার যে কতটা ক্ষমতা, সেই সম্পর্কে তোমার কোন ধারণাই নেই। আমি চাইনা তুমি কোন সমস্যার ভেতরে নিজেকে জড়িয়ে ফেল।”
উমেরা মায়ের কথায় মাথা নামিয়ে নিল। তার মায়ের কথায় যুক্তি আছে। উমর ওয়াজেদ স্ত্রী এর কথা গুলো পুরোটা শুনলেন, এরপর তিনি যা বললেন সেটা শুনে উপস্থিত গম্ভীর ভাবটা মূহুর্তেই কমে গেল,
“বিয়ে করিয়ে দাও মানে? তোমার কি আমার সাথে বিয়ে হবার পর জীবনের চরম ক্ষতি হয়ে গিয়েছে?”
“এমন ভাবে বলছো, যেন আমি মহা আনন্দে আছি তোমায় বিয়ে করে।”
“তুমি কি বলতে চাইছো, নসিফা?”
“বিয়ে করে তোমাদের খাবার বানাতে বানাতেই তো আমার জীবন শেষ! আর কিছু আছে আমার জীবনে?”
“এটা কিভাবে বলতে পারলে তুমি?”
“তা নয়তো কি?”
শুদ্ধ আর উমেরা মা বাবার এমন দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়ার সাথে অবগত। এটা প্রায় প্রতিদিনই বিনা পপকর্ণ ছাড়া তারা উপভোগ করে। এখনে ব্যাতিক্রম কিছু নেই।
পাটোয়ারী বাড়ির সদর গেটে বিরাট সিকিউরিটির ব্যবস্থা।
শেহেরাজের গাড়িটা দেখেই দারোয়ান দৌড়ে এসে গেট খুলে দিল। শেহেরাজের কালো গাড়িটা বাড়ির ভেতরে আসতেই একজন গার্ড এসে গাড়ির দরজা খুলে ধরল। শেহরাজ বেরিয়ে এসে চাবিটা তার হাতে দিয়ে গটগট করে ভেতরে দিকে চলে গেল।
পাটোয়ারী বাড়ির উপর তলায় দক্ষিণ দিকে শেহেরাজের কামরা। এই বাড়িতে সব থেকে বড় কামরাটাই শেহরাজের। শেহেরাজ নিজের রুমে এসে লাইট জ্বালিয়ে দিল। শার্টের বুকের সামনের দু তিনটা বোতাম খুলে নিজেকে স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা করল, হাতের ঘড়িটা খুলে বেড সাইডের টেবিলে রাখল। অতঃপর বেলকনির গ্লাস টেনে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। মৃদু বাতাস এসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে গেল। বারান্দা থেকে সোজা বাগান পেরিয়ে ব্যস্ত শহরের রাস্তাগুলো দেখা যায়। শেহরাজ এক ঝলক সেদিকে তাকিয়ে বেলকনিতে থাকা চেয়ারটায় বসল। তার চাহনি শান্ত, শীতল, নীরবে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। পরিবেশ এমন, যে গাছের পাতা নড়ার শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না।
শুধু মাঝে মধ্যে ভেসে আসছে, দু একটা গাড়ির হর্ণ আর কুকুরের ডাক। শেহেরাজ তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেট প্যাকেট বের করল। প্যাকেটের গায়ে বড় বড় করে ইংরাজি শব্দে লেখা, ‘Djarum Black’ একজন ডক্তার হিসাবে এমন একটা নেশালো জিনিসের সাথে সংযোগ কতটা যৌক্তিক শেহেরাজ জানে না। তবে তার সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলীর সাথে দিনের সমস্ত ক্লান্তি বাতাসে মিশে যায়, এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ধারণা। সিগারেট জ্বালিয়ে দু ঠোঁটের মাঝে রেখে চেয়ারের পেছন দিকে মাথাটা এলিয়ে দিল। আজ জীবনের প্রথম তার সাথে এমন ঘটনা ঘটল, কোন অজানা নারী তার বজ্রকণ্ঠে, অন্যায়ের নামে তার বিরুদ্ধে কথা শুনিয়ে গেল। কি যেন বলেছিল,
“জারিফ ভাই, তুমি এই শয়তানদের চক্র এখনো ছাড়ছো না কেন? যেই নেতা-খেতার জন্য আজ তোমার এই অবস্থা, গিয়ে দেখো সে এসব গায়েও লাগাচ্ছে কিনা! আমার কথাটা শোনো, এই নেতা-ফেতাদের পিছু ছেড়ে নিজের ব্যবসায় মন দাও। দরকার হলে ইউরোপ চলে যাও, সেখানে গিয়ে কাজ করো। এই নষ্ট পলিটিক্স তোমাকে নিন্দা আর আঘাত ছাড়া কিচ্ছু দেবে না!”
ভাবতে ভাবতে শেহেরাজ তড়াক করে চোখ খুলে তাকাল। হাতের জলন্ত সিগারেট পুড়ে তখন অর্ধেক! শেহেরাজের চোখ রক্তিমবর্ন হয়ে উঠল মূহুর্তেই, হাতের সিগারেট চেপে ধরতেই পোড়া অংশটা ভেঙে পড়ল। চোয়াল শক্ত করে বিড়বিড় করল,
দহনসুধা পর্ব ২
“শয়তানদের চক্র, হুঁহ!”
শেহেরাজের চোখের সামনেই উমেরার হিজাবের নিচে থাকা ধচোখজোড়ার দৃশ্য ভেসে উঠল। আর যাই হোক, মুখের ভাষার সাথে ওই মায়াবী চোখ দুটোর মিল খোঁজা নিহাতই বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিঃশব্দেই অলিখিত এক কবিতার ন্যায় সেই চোখের ভাষা। কিন্তু মুখের ভাষা? হঠাৎ করেই সিগারেটের জলন্ত অংশ ত্বকে লাগতেই, ছ্যাঁকা খেয়ে কল্পনার জগত থেকে বাস্তবতায় ফিরে আসে। সে কি ভাবছিল সে এইসব! হাতের সিগারেটটা বারান্দা থেকে ছুড়ে ফেলল নিচে। এক রকম নাক টানার ভঙ্গি করে চেয়ার ছেড়ে আবার রুমে চলে আসল। লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে নিজের ভিতরের দহন আর মস্তিষ্কটাকে ঠান্ডা করা প্রয়োজন!
