Home দহনসুধা দহনসুধা পর্ব ২

দহনসুধা পর্ব ২

দহনসুধা পর্ব ২
১৫ জন রাইটার

হাসপাতালের দক্ষিণ দিকে নিস্তব্ধতার কক্ষ–মর্গ। ঠোঁটে মাস্কটি এঁটে মর্গের ভেতরে প্রবেশ করলেন শেহরাজ। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখলেন। সদ্য প্রয়াত কিছু রোগীর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিছুদূর হাঁটতেই একটি নির্দিষ্ট লাশের শবাধারের সামনে এসে তার পা যেনো শ্লথ গেল। তিনি আস্তে আস্তে লাশের ওপর বিছানো সাদা চাদরটি ওপরে তুললেন। ভেতরে একটা নিথর দেহ। পেটের বাম পাশে! ঠিক কিডনির সাইডে! একটা অপারেশনের সুদীর্ঘ দাগ। দৃশ্যটা দেখামাত্রই শেহরাজের মুহূর্তেই মুখমণ্ডল রক্তিমাভ হয়ে উঠল।
শেহরাজের নিশ্বাসটা দৈবাৎ দ্রুত হয়ে গেল। বুক ধড়ফড় করছে। আর ঠিক তখনই! একটা ভারী কিছু টেনে আনার ঘষটানো শব্দ। শেহরাজ বুঝতে পারল–স্ট্রেচার। পেছন ফিরতেই দেখল! দুর্বল চেহারার একজন ওয়ার্ড বয় একটা স্ট্রেচারে করে ধীর গতিতে একটা লাশ টেনে মর্গের রুমের দিকে নিয়ে আসছে। শেহরাজকে এমন জায়গায় দেখে সে হকচকিয়ে গেল। চোখে ভয় নিয়ে দ্রুত প্রশ্ন ছুঁড়ল,

“আরে, ডাক্তার সাহেব! আপনি এখানে? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?’
শেহরাজ নিজেকে সামলে নিলো। কপালে ভাঁজ ফেলে শুধাল, “এই যে, ৮৯ নম্বর বেডের লাশটা এঁর মৃত্যুটা কখন হয়েছে?”
ওয়ার্ড বয়টা সঙ্গে সঙ্গে কোমরের পকেট থেকে একটা ছোট রেজিস্ট্রার খাতা বের করল। পাতা উল্টে জানাল,
“আজ সন্ধ্যায়ই। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। তবে কী অপারেশন হয়েছিল, তা জানি না। সামান্যই তো জখম ছিল লোকটার।”
কথাটা শেষ না হতেই শেহরাজের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডক্টর ইশান ধড়ফড়িয়ে মর্গে ঢুকল। ইশানের গলা শুকিয়ে কাঠ। শেহরাজকে দেখেই তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। শেহরাজ গম্ভীর স্বরে শুধাল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ডক্টর ইশান! ৮৯ নম্বর বেডের লোকটার মৃত্যু হয়েছে রক্তক্ষরণে! অপারেশন হয়েছিল নিশ্চয়ই? সামান্য অপারেশনে এত ব্লিডিং হয় কীভাবে? উত্তর দাও!”
ডক্টর ইশান শুঁকনো জিভ দিয়ে অধর ভেজালো। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফিসফিস করল,
“সরি, ডক্টর। আসলে অপারেশন করার সময় তার একটা শিরা কেটে গিয়েছিল।”
মুহূর্তেই শেহরাজ রক্তিমাভ হয়ে গেল। তার মুখটা রাগে কুঁচকে গেছে। গলার স্বরটাও বাজখাঁই! সে চেঁচিয়ে উঠলো,

“ইডিয়ট! একটা মানুষের জীবন চলে গেল, আর তুমি বলছ ‘সরি’? তোমাদের কতবার বলেছ, অপারেশনের সময় মন দাও! এখন কী হবে এই লোকটার? তার জীবন তো শেষ!”
ওয়ার্ড বয়টা থতমত খেয়ে সেখানেই শ্লথ হয়ে গেল। ইশান একেবারে চুপসে গেছে। তার আর কোনো কথা নেই। কারণ, দোষটা তো তাদেরই। শেহরাজ আবার চেঁচিয়ে উঠল,
“আমি তোমাকে সাসপেন্ড করলাম! আপাতত আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও!”
এই বলেই শেহরাজ দ্রুত মর্গ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে বের হতেই দেখল! দরজার ওপাশে জাওয়াদ ছেলেটা কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

হসপিটালের জরুরি বিভাগের ঠিক সম্মুখে, সজোরে ব্রেক কষে গতির ছেদ টানে একটি স্কুটি। ধূসর পিচঢালা পথে চাকার আর্তনাথ মূর্হূতের জন্য বাতাসে রেষ রেখে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই, ব্যস্ত পায়ে স্কুটি থেকে নেমে এলো দুই তরুণী, উমেরা ওয়াজেদ এবং তার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী জারা ইসলাম।
ঘণ্টাখানেক পূর্বেও ওদের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন রকম। ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরাই ছিল মূখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এই পরিকল্পনায় ছেদ পড়ল। জারার মুঠোফোনে আসা একটি দুঃসংবাদ তার পৃথিবীটাকে লন্ডভন্ড করে দেয়। জারার একমাত্র অবলম্বন, তার ভাই জারিফ, গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী। মা-বাবাহীন জারার ক্ষুদ্র পরিবার-পরিজন বলতে এই ভাই। সেই ভাইয়ের এমন মর্মান্তিক সংবাদ শুনে জারার অবস্থা বিহ্বল,পা দুটো সপ্রায় পঙ্গু হয়ে মাটির দখল হারাচ্ছে যেন। সে প্রগাঢ় আশঙ্কায় ডুবন্ত মানুষের মতো বাঁচার শেষ আশ্রয়টুকু আঁকড়ে ধরার ভঙ্গিতে উমেরাকে আঁকড়ে ধরে।

হাসপাতালে প্রবেশের মুখে জারা একবার রুদ্ধস্বরে উমেরাকে বাড়ি ফিরতে অনুরোধ করেছিল। কারণ উমেরার বাড়ি থেকেও অনবরত ফোন আসছে ফেরার জন্য। কিন্তু উমেরা তার কথায় অটল রইল। বান্ধবীর জীবনের এমন ঘোর দুর্যোগে তাকে একা ফেলে যাওয়া কি মনুষ্যত্বের কোনো সংজ্ঞায় পড়ে? সে দৃপ্ত কণ্ঠে উল্টো ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে,
“ন’টার আগে আমার ফেরা অসম্ভব। কোনোভাবেই নয়।”
নিরাময়কেন্দ্রের এই বিশেষ উগ্র ঔষধি গন্ধ, মানুষের অস্ফুট কণ্ঠস্বর আর যন্ত্রণাকাতর মানুষের আনাগোনা সব উপেক্ষা করে, ওরা দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলে অন্তর্ভাগের দিকে। রিসেপশন থেকে জানে, জারিফ আছে দ্বিতীয় তলায়, চার নম্বর ওয়ার্ডে। সিঁড়ির ধাপগুলো একপ্রকার লফিয়ে পার করে ওরা যখন ওয়ার্ডের কপাটে পৌঁছায়, তখন জারার বক্ষপিঞ্জর ভেঙে ভয়ংকর এক ঢেউ আছড়ে পড়ে।

অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জারা দৃষ্টি মেলে তাকায় ভেতরের দিকে। হ্যাঁ, ওই তো! শয্যার ওপর এক প্রাণহীন ভাস্কর্যের মতো শুয়ে আছে জারিফ। মুখ, গলা আর হাতে তার শুভ্র ক্ষতবন্ধনী। জারা আর এক পলও স্থির থাকতে পারল না। অমোঘ এক টানে জারা ছুটে গেল ভাইয়ের কাছে। এক বিভ্রান্ত পলকে দেখল ভাইয়ের নিথর, আচ্ছাদিত মুখখানা।
তারপরই এতক্ষণ বুকের গহীনে চেপে রাখা ধৈর্যের শেষ সীমারেখা এক লহমায় চূর্ণ করে দিয়ে অন্তরের অন্তস্তলে সঞ্চিত অশ্রুর বাঁধ সপ্রায় মহাপ্রলয়ের গর্জনে ভেঙে দেয়। ভাইয়ের প্রাণহীন হাতটা খামচে ধরে আর্তনাদ করে ওঠে,
“ভাইয়া, তুই কেন এসব বিষাক্ত রাজনীতির ফাঁদে পা দিলি? দেখ, দেখ কী অপূরণীয় সর্বনাশ ডেকে আনলি দেখ!”
জারার গগনবিদারী আর্তনাথে ওয়ার্ডের স্তব্ধতা খান খান হয়ে যাচ্ছে, আর উমেরা এক বিমূঢ় পাষাণপ্রতিমার ন্যায় দাঁড়িয়ে দেখছিল বান্ধবীর এই অগাধ হাহাকার আর শূন্যতার শুরু।

জারিফের ঠোঁট দুটো সবেমাত্র খুলেছিল জারার কথার জবাব দিবে বলে, কিন্তু তার আগেই এক ঝোড়ো হাওয়ার মতো উমেরা তার থেকে কথা কেড়ে নিয়ে ক্ষোভ আর ধিক্কারে ফেটে পড়ে,
“এই রাজনীতিবিদগুলো দেশটাকে গিলে খেয়েছে! পচিয়ে ফেলেছে সব! নিজেদের কী? বিবাদ লাগিয়ে, সাধারণ মানুষকে বলির পাঁঠা বানিয়ে নিজেরা তো ঠিকই জান বাঁচিয়ে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে তামাশা দেখবে! আর মাঝখানে রাজপথে রক্ত ঝরবে, অসহায় মায়েদের কোল খালি হবে।”
আগুনের গোলার মতো কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে উমেরা জারিফের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
“জারিফ ভাই, তুমি এই শয়তানদের চক্র এখনো ছাড়ছো না কেন? যেই নেতা-খেতার জন্য আজ তোমার এই অবস্থা, গিয়ে দেখো সে এসব গায়েও লাগাচ্ছে কিনা!”

উমেরার এই অগ্নিবর্ষী ভাষণে ওয়ার্ডে উপস্থিত সকলে থমকে গেছে। উমেরা চিরকালই এমন ঝড়ের মতো উদ্দাম, সত্যিকে তীরের ফলার মতো ছুঁড়ে মারাই তার স্বভাব। কে কী ভাবল, তার পরোয়া সে কখনোই করে না। উচিত কথা বলতে উমেরা ভারী পারদর্শী। শেহরাজ এতক্ষণ জারিফের চেকআপ করছিল চেকআপ শেষ করে পাশের রোগী কে এখন দেখছে। কিন্তু এই আকস্মিক চিৎকারে তার পেশাগত মনোযোগে ছেদ পড়ল। এমন স্পষ্ট, ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর এই হাসপাতালের করিডোরে খুব একটা শোনা যায় না। শেহরাজ ধীর, সংযত পদক্ষেপে ক্রোধ জন্ম নেওয়া দৃষ্টিতে ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকায়। উদ্দেশ্য এই কন্ঠের অধিকারী কে? তাকে দেখা।

শেহরাজ প্রথমে উমেরার দিকে কঠোর ক্রুদ্ধ চোখে দৃষ্টিপাত করল। কিন্তু এই দৃষ্টি উমেরার উপর স্থির হতেই ওর চোখ থেকে মুহূর্তের মধ্যে কাঠিন্য মুছে গিয়ে তা বিস্ময়ে পরিণত হয়। আর হওয়ারই কথা! ​উপস্থিত শতখানেক মানুষের ভিড়েও শেহরাজের চোখে অচেনা উমেরা এক ভিন্ন গ্রহের আগন্তুকের মতো লাগলো। তার পরিধানে কালো বোরখা তার উপর জড়ানো দুধসাদা অ্যাপ্রন। মাথায় অত্যন্ত সাধারণভাবে পেঁচানো কালো হিজাব। এই সাদামাটা বেশভূষাতেও উমেরার উপস্থিতি ভারী নজরকাড়া। উমেরার চেহারা টা বড্ড মায়া ঝরানো এক চেহারা। শুভ্র তুষারের ন্যায় স্নিগ্ধ তা। লাবণ্য সপ্রায় চুঁইয়ে পড়ছে। নাক-মুখের গড় সূক্ষ্ম, মনে হচ্ছে ক্ষুরধার তুলিতে আঁকা। শেহরাজ কোথাও একটা কথা পড়েছিল যে,

“বাঙালি মেয়েদের সৌন্দর্যের একটা অলিখিত সীমা থাকে, আর সেই সীমা অতিক্রম করলে তাদের আর বাঙালি মনে হয় না, বরং ভিনদেশি কেউ মনে হয়।”
আজ শেহরাজ সেই কথাটিই বাস্তবে উপলব্ধি করল এই অচেনা উমেরাকে দেখে। উমেরার এই শুভ্র লাবণ্যময় চেহারা প্রথম দর্শনেই যে-কারও মনে আফগান অথবা তুর্কীয় রমণীর ভ্রম জাগাবে। উমেরার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিতে নিতে শেহরাজ নিজের অজ্ঞাতসারেই মনে মনে ভাবে,
“দেখতে বিদেশিনীর মতো হলেও, কথাবার্তা তো দেখছি বাঙালি পাশের বাসার তেতো-রসা আন্টির চেয়েও বেশি কড়া!”

​উমেরাকে দেখে শেহরাজ যেমন চমকেছে, শেহরাজকে দেখে উমেরাও ঠিক ততটাই বিস্মিত হয়েছে। উমেরা শেহরাজকে ভালো করেই চেনে, সে উমেরার পরিচিত গণ্ডির মানুষ। কিন্তু শেহরাজের কাছে উমেরা সম্পূর্ণ অপরিচিতা, অজানা এক মুখ। শেহরাজকে এখানে, নিজের দলের মানুষের সেবায় নিয়োজিত দেখতে পেয়ে উমেরা বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়। উমেরা কখনও ভাবেনি যে শেহরাজের মতো একজন ব্যক্তি, এভাবে সব আভিজাত্য ত্যাগ করে মাটির কাছাকাছি নেমে এসে মানুষের সেবায় হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। শেহরাজের এই নিরহংকার উপস্থিতি উমেরাকে অতিশয় বিস্মিত করে তোলে। ​

শেহরাজের চোখে উমেরা যেমন এক রহস্যময় উপস্থিতি তেমনই উমেরার চোখেও শেহরাজ এক অনন্য ব্যতিক্রম। আর এই ভিন্নতার মূল কারণ হলো শেহরাজের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ ও সুদর্শনতা। এই স্বল্প জীবনে উমেরা এমন ফিটফাট, কেতাদুরস্ত ডক্টর খুব কমই দেখেছে। উমেরার অভিজ্ঞতা বলে, ডাক্তারেরা বিদ্যার ভারে নিজেদের শারীরিক যত্ন নেওয়ার সময় পান না। সারা জীবন শুধু পড়েই গেলেন ফলস্বরূপ, মগজে যখন জ্ঞান জমে, ফিটনেস তখন যায় তলানিতে ডুবে। ​তবে ব্যতিক্রম তো সবসময়েই সবকিছুতে থাকে। শেহরাজ তেমনই এক ব্যতিক্রম। শেহরাজ এই গতানুগতিক ছক ভেঙেছে। সে নিয়মিত রাজনীতির আবর্তে যুক্ত থেকেও, পেশাগত জীবন সামলেও, কীভাবে যে নিজের এমন মোহনীয় রূপ-ছটা ধরে রেখেছে তা উমেরার কাছে এক বিরাট প্রশ্ন বটে। কিন্তু পরমুহূর্তেই কিছু একটা মনে হয়ে শেহরাজের দিকে তাকিয়ে উমেরার সমস্ত শরীর এক কেমন ঘৃণায় রি রি করে ওঠে। শেহরাজ যে তাদের জাত শত্রু!

উমেরার জ্বলন্ত দৃষ্টি শেহরাজকে বিদ্ধ করতে চাইলো। এমনিতেই এই রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে উমেরার রাগের পারদ চরমে, তার উপর শেহরাজের উপস্থিতি এই আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করলো। উমেরার নিজস্ব ধারণা, আজকের এই সমস্ত রক্তপাতের জন্য, জারিফের এই যন্ত্রণার জন্য, এই একলহমায় শান্ত, নিরাসক্ত শেহরাজ দায়ী। উমেরা আজ সুযোগ পেয়েছে শেহরাজকে দু-একটা কথা শুনানোর। তাই ​সে সশব্দে জারিফের বেডের পাশে রাখা টুলটি টেনে নিয়ে বসতে বসতে শোধায়,
​”জারিফ ভাই, আমার কথা শোনো। এই নেতা-ফেতাদের পিছু ছেড়ে নিজের ব্যবসায় মন দাও। দরকার হলে ইউরোপ চলে যাও, সেখানে গিয়ে কাজ করো। এই নষ্ট পলিটিক্স তোমাকে নিন্দা আর আঘাত ছাড়া আর কিচ্ছু দেবে না!”

​জারা, এতক্ষণ হয়তো পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিল, উমেরার কথায় সে-ও বারুদের মতো জ্বলে ওঠে বলে,
“হ্যাঁ ভাইয়া! ঠিকই বলেছে উমেরা। এসব তুই এক্ষুনি ছাড়! কীসের জন্য করবি এসব? এগুলো করে তো কোনো লাভ নেই, যা হবে তা শুধু তোর লস!আর এই দুনিয়ায় আমাকে একা করার রাস্তা।”
​জারা এখনও খেয়াল করেনি, তাদের ঠিক পাশের সিটেই দাঁড়িয়ে আছে শেহরাজ। ​জারিফের এদের এসব কথাবার্তা শুনে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ফাটা থুতনি নিয়ে সে কথা বলতেও পারছে না, তীব্র যন্ত্রণার সাথে যোগ হয়েছে চরম অস্বস্তি। সে উমেরা আর জারাকে থামাবে কী করে? শেহরাজ যে ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে! জারিফের অসহায় চোখ শুধু এদিক-ওদিক করতে লাগে। ​উমেরা জারিফের এই ছটফটানি দেখে, কিন্তু ও থামে না। জারার কথায় তাল মিলিয়ে আরও তীক্ষ্ণ, আরও বিদ্রুপ সুরে বলে,
“তা, যে নেতার জন্য জান বাজি রেখে আজ তোমার এই হাল হলো, সে একবারও খোঁজ নিয়েছে? নাহ! নেবে না! নেওয়ার কথাও না! কাপুরুষের মতো দেখো ঠিকই কোনো এসির গর্তে লুকিয়ে আছে! আর তোমরা এখানে মরছো মরণ যন্ত্রণায়!”

ওর ​শেষের কথাগুলো একটা চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে থমথমে ঘরটায়। জারার গাল বেয়ে উষ্ণ অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ে কান্না ভেজা কণ্ঠে ও জারিফের দিকে চেয়ে বলে,
“আমি তোকে সবসময় বলি,ভাইয়া! ছেড়ে দে এসব! তোর কিচ্ছু করতে হবে না। আজ তোর এই অবস্থা যাদের জন্য হলো, গিয়ে দেখ, তারা ঠিকই শান্তিতে আছে!”
উমেরা এই আগুনেই ঘি ঢেলে জারার কাঁধে হাত রেখে আরও উস্কে দিতে বলল,
“থাকবেই তো! এইসব ফালতু পলিটিশিয়ানদের পাল্লায় পড়লে এমনই হয়। আরে, কাদের জন্য করো এসব? ওরা তোমাদের শুধু ব্যবহার-ই করলো, আর কিচ্ছু না!”

উমেরার বলা প্রতিটি শব্দ এক একটি অদৃশ্য চাবুক হয়ে আছড়ে পড়ছে শেহরাজের ওপর। উমেরার এই তীক্ষ্ণ, বিষাক্ত কথাগুলো তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। শেহরাজের কপালের একটি রগ ধীরে ধীরে ফুলে ওঠে, চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। শেহরাজের চেহারার এই সূক্ষ্ম কিন্তু ভয়ঙ্কর পরিবর্তন ঈশানের চোখ এড়ায় না। সে তৎক্ষণাৎ জাওয়াদকে ইশারায় সতর্ক করে। জাওয়াদ পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্য ডাক্তার ও নার্সদের সাথে নিয়ে বিনয়ী অথচ শক্ত কণ্ঠে বলে,
“আপনারা সবাই এখন দয়া করে বাইরে যান। চেক-আপের সময় এত ভিড় থাকলে আমাদের কাজ করতে সমস্যা হয়।”

এই আকস্মিক ঘোষণায় উমেরার মেজাজ আরও বিগড়ে যায়। সে বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে টুল থেকে প্রায় ছিটকেই উঠতে উঠতে বলে,
“চল জারা, বাড়ি চল! ভাইয়ার জন্য রান্না করেও তো আনতে হবে। তোর ভাইয়ের ঐ ‘নেতা’ তো আর এসে খাইয়ে দিয়ে যাবে না!”
শেষ কথাটায় তীব্র বিদ্রুপ করেই উমেরা বলে। জারাও দুই হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ায়। এক করুণ দৃষ্টিতে জারিফের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি আসছি ভাইয়া, বাসা থেকে টিফিন নিয়ে আসছি।
এই বলে ব্যাগটা কাঁধে টেনে নিয়ে সামনের দিকে এক পা বাড়ায়। উমেরাও তার পাশে পা বাড়ায়, বিজয়ের এক সূক্ষ্ম হাসি তার ঠোঁটের কোণে আঁচড়ে পড়তেছে। ​ঠিক এমন মুহুর্তে,থমথমে ওয়ার্ডের জমাট বাঁধা নীরবতা ভেদ করে ভেসে আসে শেহরাজের কণ্ঠস্বর। সে চিৎকার করেনি, তথাপি স্বর ছিল বরফের মতো শীতল, স্থির, এবং অকম্পিত,
​”জারিফ! তুমি তোমার বোনদের বলে দাও, খাওয়ার-দাওয়ার সব ব্যবস্থা হাসপাতালেই করা আছে। তাদের আলাদা করে কষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই।”

এ-বাণী কর্নপাত হতেই উমেরা এবং জারা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে থমকে গিয়ে একসাথেই পিছনে ফিরে তাকায়। ​জারা চমকে উঠে এই অপ্রত্যাশিত স্বর শুনে। সে পিছন ফিরে তাকায় বটে, কিন্তু কে বললো তা বুঝতে পারে না। আঁচ করবেই কি করে শেহরাজ তো অন্য দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। তাই শেহরাজের পরিচয় জারার কাছে সম্পূর্ণ অজানা। জারা অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে, চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করে,
“ক, ক কে কথাটা বললেন?”

জারার প্রশ্ন শুনে ​উমেরা এক মুহূর্তও দেরি করে না। সে জানতো এই কণ্ঠস্বরের উৎস কে, এবং কেন এই কথা বলা হয়েছে। শেহরাজের এই ‘দারুণ ব্যবস্থা’র ঘোষণা উমেরার কাছে এক ধরনের পরাজয়। আর তাই সে সেই কথার কোনো গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। পাত্তাহীন, তাচ্ছিল্যের সুরে উমেরা জারার হাত টেনে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগোতে এগোতে বলে,
​”আরে চল! চল বাইরে! বাইরে যাওয়ার জন্য ঘোষণা দিল শুনিসনি হয়তো? ওয়ার্ডবয়-টুওয়ার্ডবয় কেউ একটা কিছু বলেছে বোদহয়। এসব খুঁজে আমাদের কী লাভ?”
​এ বলে উমেরা প্রায় জোর করেই জারাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগে। জারাও আর কিছু না বলে উমেরার সাথে পা বাড়ায়।

এদিকে উমেরার কথাগুলো শুনে শেহরাজের ললাটের শিরা-উপশিরা রোষানলে উত্তেজনার চরম সীমায় উপনীত হলো। জীবনে এই প্রথম সে এমন কোনো ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেল অথবা তার বক্তব্য শ্রবণ করল, যার স্পর্ধা এমন সুদূরপ্রসারী যে সে শেহরাজের সন্নিধানে থেকেও তার তিরস্কার করার সাহস দেখিয়েছে। ​শেহরাজ তপ্ত নিঃশ্বাস গ্রহণ করে স্বীয় চিত্তকে শান্তনা দিলো। সে নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিলো যে, যার যেমন মন-মানসিকতা, সে তাকে তেমনই বিবেচনা করবে। অতএব এতে ক্রোধের উদ্রেক হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ, প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা নিজেদের ক্রোধ বা আক্রোশ বিপরীত বা অনুপযুক্ত পাত্রে ঢেলে দেয় না।

উমেরা এবং জারা বাইরে এসে হাসপাতালের করিডোরে নীরবে বসে আছে । ডাক্তারদের প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে, জারিফের সঙ্গে জারার কিছু জরুরি কাজ আছে বলে। এখনো বাড়ি যায়নি তারা। জারা বারবার উমেরা’কে বাড়ি ফিরে যেতে অনুরোধ করছে, কিন্তু উমেরা তার প্রিয় বান্ধবীকে এই অবস্থায় একা ফেলে যেতে রাজি না, তাই সে এখানেই অপেক্ষায় বসে আছে। জারার চোখ বেয়ে এখনও অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছে। উমেরা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না, কোন শব্দ দিয়ে সে জারাকে এই মুহূর্তে সান্ত্বনা দেবে।

​আজকের এই চারপাশের ঘটনাবলী উমেরা’র ধৈর্যের দেয়ালে আঘাত হানছে কেবল আঘাতই হানছে না, সেই দেয়ালটি সশব্দে ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়েছে ঠিক ওরই মাথার ওপর।​অত্র সব ঘটনায় উমেরা যে বিরক্ত, তা বললে তার অনুভূতির গভীরতা বোঝানো যাবে না। এটা স্রেফ এক সাধারণ বিরক্তি নয়। এটা এক আঠালো, গা গুলিয়ে ওঠা তীব্র বিতৃষ্ণা, যা তার গোটা মেজাজকে তিক্ত, কটু করে তুলেছে। ​কপালের চামড়ায় এই তীব্র বিতৃষ্ণার একটি স্পষ্ট ভাঁজ ফুটে উঠেছে উমেরা’র। সেই ভাঁজ নিয়েই সে জারার দিকে তাকিয়ে ক্ষোভে পরিপূর্ণ কণ্ঠে শোধায়,

​”একটাই জীবন! তাও আবার বাংলাদেশী! ধ্যাত! কী এক ঠাটা পড়া কপাল!”
ওর কথার জবাবে ​জারা হতাশায় একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “এই দেশে জন্ম নেওয়াটাই এক অভিশাপ। এখানে শুধুই দুর্নীতির খেলা ব্যতিরেকে আর কিছুই নেই।”
​উমেরা জারার পিঠে সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “হয়েছে আর কষ্ট পাস না। জন্ম যখন নিতেই নিয়েছি, তখন বাঁচতেও হবে আর কী-ই বা করার আছে?”

শেহরাজ এখন তার নিজস্ব কেবিনে নিভৃতে দাঁড়িয়ে। হাতের আঙুলের ফাঁকে ধরা এক গ্লাস ‘ব্ল্যাক লেমনড্রপ ককটেল’। শেহরাজ আদতে স্রোতের বিপরীতে চলা এক মানুষ সবাই যা করে বা পছন্দ করে, তার চেয়ে ভিন্ন কিছুতেই তার আকর্ষণ। প্রচলিত চা বা কফির উষ্ণতায় সে স্বস্তি খোঁজে পায় না। তার কাছে এই ককটেলি ধ্রুবক। কারণ এর তীক্ষ্ণ, অম্ল-মধুর স্বাদ শুধু ক্লান্তিই হরণ করে না, দেহকে সতেজ রেখে মনোযোগকে শাণিত করে তোলে, আর এর ঝাঁঝালো সৌরভে মেজাজ মুহূর্তে ফুরফুরে হয়ে ওঠে।
শেহরাজের স্থির দৃষ্টি কাচের জানালার ওপারে, নিম্নের ব্যস্ত প্রাঙ্গণে নিবদ্ধ। যেখানে উমেরা আর জারা স্কুটারে চেপে বসছে, আর উমেরা ব্যস্ত ভঙ্গিতে জারাকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে। শেহরাজের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে জাওয়াদ। শেহরাজকে এমন ধ্যানমগ্ন হয়ে নিচে তাকিয়ে থাকতে দেখে জাওয়াদও কৌতূহলী হয়ে উঁকি দেয়। উঁকি মেরেই উমেরাকে চিনতে পেরে সে বলে ওঠে,

“ভাই, চিনতে পারলেন ওকে? উমর ওয়াজেদের কন্যা। ভারি চটপটে আর স্মার্ট!”
জাওয়াদের এই তথ্যে শেহরাজের কপালে এক সূক্ষ্ম অথচ তীক্ষ্ণ ভাঁজ পড়ে। হাতের গ্লাসটি ঈষৎ নাড়িয়ে সে শীতল স্বরে বলে,
“ওহ্! তার মানে এই মেয়ে ওয়ার্ডে যা যা বলছিল, সবটা আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা? ইচ্ছেকৃত ঔদ্ধত্য?”
জাওয়াদ মাথা নেড়ে সায় দেয়, “হতেও পারে।”
শেহরাজ গ্লাসে হালকা চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, “উমরের মেয়ে? উমর ওয়াজেদকে তো আমি চিনি। তার অবয়বের সাথে তো কোনো মিলই নেই। মেয়েটি দেখতে একেবারে ভিনদেশী ধাঁচের। তোমার তথ্যে ভুল নেই তো?”
জাওয়াদ ঠোঁট চেপে হেসে উত্তর করে,

“না ভাই, ভুল বলিনি। ও উমরেরই মেয়ে, শুদ্ধর বোন। দেখো না, শুদ্ধও তো কত সুপুরুষ! শুনেছি ওদের মা আফগানি। সেই সূত্রেই বোধহয় তারাও এমন সুন্দর।”
শেহরাজ জাওয়াদের কথায় আর কোনো প্রত্যুত্তর করে না। তার দৃষ্টি এখনো স্কুটিচালনাকারী উমেরার ওপরি স্থির। সে মনে মনে ভাবে,

দহনসুধা পর্ব ১

“আহারে ভিনদেশী, সাহস দেখানোটা দোষ না। দোষ হলো কার সামনে দেখাতে হয়, কতটা দেখাতে হয়, সে হিসেব না জানা। তোমায় তো মূল্য চুকাতে হবে, তবে আমার শর্তে, আমার সময় অনুযায়ী। আপাতত হিসেবের খাতায় তোমার নামটা ঋণ হিসেবে তোলা থাক। সময় হলে সুধ সহ আমার প্রাপ্য আমি আদায় করে নেব।”

দহনসুধা পর্ব ৩