Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৩১

দাহশয্যা পর্ব ৩১

দাহশয্যা পর্ব ৩১
Raiha Zubair Ripti

টেবিলে থাকা এঁটো থালাবাসন গুলো তুলে নিয়ে মেহরিন রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছিলো ধোয়ার জন্য। এমন সময় আকস্মিক কেউ হন্তদন্ত হয়ে মেহরিনের সামনে দাঁড়ালো। দ্রুত গলায় বলল-
-” আসসালামু আলাইকুম ভাবি। আমি আপনার অন এন্ড অনলি দেবর এজওয়ান সুলতান।
মেহরিন তাকালো মুখের দিকে। এজওয়ানের মুখ জুড়ে হাসি। তবে এমন আকস্মিক সামনে এসে পড়ায় মেহরিন একটু ঘাবড়ে গেলো। এজওয়ান মেহরিনের মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। হয়তো বুঝলো বিষয় টা। সেজন্য একটু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে মাথা চুলকে বলল-

-” অ্যা’ম এক্সট্রিমলি সরি ভাবি। তখন চিনতে পারি নি। আমি ভেবেছি রুমাইসা। আপনি রাগ করেন নি তো?
মেহরিন একটু হাসার চেষ্টা করে বলল-
-” না না ভাইয়া আমি রাগ করি নি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
-” সত্যি তো? মন রাখার জন্য মিথ্যা বলেন নি তো?
-” সত্যি বলছি।
-” যাক শান্তি পাচ্ছি এখন। আপনিও কি আমায় তখন চিনতে পারেন নি?
-” জ্বি। চিনতে পারি নি।
-” ওহ্ হ্যাঁ চিনবেন কি করে। আমি তো বিয়েতে আসিই নি।
-” হুমম।আপনার কি আর কিছু লাগবে ভাইয়া? তা না হলে এগুলো ধুতে যেতাম।
এজওয়ান তাকালো হাতের দিকে। এঁটো থালাবাসন।
-” না না ভাবি কিছু লাগবে না।
মেহরিন ঠিক আছে বলে চলে গেলো। এজওয়ান নিজেকে বকতে লাগলো। সে এত বড় ব্লান্ডার করলো কি করে?
মাহি করিডরে দাঁড়িয়ে দেখছিলো এজওয়ানের কার্যকলাপ। কিন্তু কি কথাবার্তা চলছি এজওয়ান আর মেহরিনের তা শোনা যায় নি। এজওয়ান পাশ ঘেঁষে যেতেই মাহি বলল-

-” আপনি যে লু’ইচ্চা তা জানতাম৷ কিন্তু ভাইয়ের বউ জেনেও যে ওভাবে দৌড়ে যাবেন তাকে দেখতে সেটা আনএক্সপেক্টেড ছিলো।
মাহির কথায় এজওয়ান ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো মাহির দিকে। আপাদমস্তক মাহি কে দেখে।
রাগে মাথা ফেটে যেতে লাগলো। কত বড় সাহস এই এজওয়ান সুলতান কে লু’ইচ্চা বলে! তারপরও শান্ত গলায় বলল-
-” আর ইউ জেলাস মিসেস এজওয়ান?
মাহির মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে।
-” জেলাস তাও আবার আপনার মতন লু’ইচ্চা কে নিয়ে! জেলাশ মাই ফুট।
এজওয়ান এবার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে যেতে যেতে বলে গেলো-
-” তাহলে তুুই লু’ইচ্চা,তোর বাপ লু’ইচ্চা, তোর চৌদ্দ গুষ্টি ও লু’ইচ্চা।
মাহি পিছন ফিরে এজওয়ানের যাওয়ার দিকে তাকালো।
-” আপনার মতন লু’ইচ্চামি করি আমি?
এজওয়ান পেছন ফিরে চোখ টিপে বলল-

-” আয় তুই আর আমি লু’চ্চামি করি বন্ধ ঘরে। করবি?
মাহি সামনে ফিরে হাঁটা ধরলো। বে’য়াদব একটা। নিচে নেমে খাবার টেবিলের চেয়ার টেনে বসলো মাহি। ক্ষুধা লেগেছে৷ সকাল থেকে কিছু খায় নি। কি আশ্চর্য ফ্যামিলি৷ একটা বার ডাক ও দিলো না!
মেহরিন রান্না ঘর থেকে বের হয়ে মাহিকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” কিছু লাগবে আপু?
-” হুমম। ক্ষুধা লেগেছে ভীষণ।
মেহরিন সযত্নে খাবার বেড়ে সামনে এগিয়ে দিলো। মাহি হাত ধুয়ে খাবার খেতে লাগলো। আফিয়া সুলতান কোথায় যেন গিয়েছে সকালে। এখনও ফিরে নি। মাহি পাশে দাঁড়িয়ে এটা ওটা এগিয়ে দিলো। খাওয়া শেষে মাহি উঠে যাওয়ার আগে মেহরিন কে বলল-

-” তোমার এই বয়স টা সংসার করার বয়স না মেহরিন। অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে বিশেষ করে এই পরিবারে বিয়ে হওয়াটা তোমার জন্য চরম ভুল। জানি না কেনো তোমার বাবা তোমায় এই পরিবারে বিয়ে দিয়েছে। তবে সামনে যে দুর্দশা অপেক্ষা করছে এই পরিবারের জন্য সেখানে তুমি নামক বাচ্চা মেয়েটা ফেঁসে যাবে ভেবে খারাপ লাগছে।
হুট করে মাহির এমন কথার মানে টা মেহরিন বুঝলো না। কোন দুর্দশার কথা বলছে মাহি?
মেহরিন রুমে চলে আসলো। সোলেমান ল্যাপটপ সামনে নিয়ে কার সাথে যেনো কানে হেডফোন গুঁজে কথা বলছে। মেহরিন গিয়ে বিছানায় বসলো। সোলেমান একবার মেহরিনের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে ফের কাজে মনোযোগ দিলো। মূলত কথা হচ্ছে মেজর জুনায়েদ খানের কেসটা নিয়ে।
সেদিন মূলত ঘটেছিল
টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে এপিবিএনের চেকপোস্টে থামানো হয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর জুনায়েদ খান কে। তখন চেকপোস্টে এপিবিএনের পোশাকে ডিউটিতে ছিলেন একজন কনস্টেবল। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর দায়িত্বে ছিলেন। আর আগে থেকেই চেকপোস্টের কাছে সাদা পোশাকে উপস্থিত ছিলেন বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর ফজর আলী ও এসআই হামিম।

এপিবিএনের ওই সদস্য চেকপোস্টে মেজর জুনায়েদের সিলভার রঙের প্রাইভেট কারটি থামার সংকেত দেন। কারটি একটু এগিয়ে গিয়ে থামে। কাছে যান এপিবিএনের ওই সদস্য। পরিচয় জানতে চাইলে জুনায়েদ নিজেকে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর পরিচয় দেন। এসময় তিনি মেজর জুনায়েদ কে চলে যেতে বলেন।
হঠাৎই পরিদর্শক ফজর আলী দৌঁড়ে এসে গাড়ির চালকের আসনে থাকা ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান। ‘ইংরেজিতে’ নিজেকে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা পরিচয় দেন মেজর জুনায়েদ। এরপরপরই প্রাইভেটকার থেকে প্রথমে নামানো হয় জুনায়েদের ভিডিও ধারণের সহযোগী সিফাত কে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে থাপ্পড় দেওয়া হয় এবং জাপটে ধরে মাটিতে ফেলা দেওয়া হয়, যা করেন চেকপোস্টে থাকা এপিবিএনের সদস্যরা। এই ঘটনা দেখে জুনায়েদ চালকের আসন থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন।
হাত উঁচু করতে বলেই দূর থেকে পরপর দুটি গুলি করেন ইন্সপেক্টর ফজর। জুনায়েদের লাইসেন্স করা পিস্তল তখন গাড়িতেই ছিল। এরপর কাছে এসে আরও দুটি গুলি করেন পরিদর্শক ফজর । এরপর সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কেই লুটিয়ে পড়েন মেজর জুনায়েদ ।

জুমায়েদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওসি শঙ্কর রায় কে প্রথম ফোন দিয়ে জানান পরিদর্শক ফজর । এর কিছু সময় পরেই পুলিশের গাড়িতে ঘটনাস্থলে আসেন ওসি শঙ্কর তখন তিনি সাদা পোশাকেই ছিলেন। ঘটনাস্থলে এসে ওসি শঙ্কর সিফাত কে হ্যান্ডকাফ পড়াতে বলেন এবং নাকমুখ দিয়ে পানি ঢালতে থাকেন। এতে সোবহান ভীষণ চিৎকার করতে থাকেন। হ্যান্ডকাফ না থাকায় শঙ্কর তার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যদের গালিগালাজ করতে থাকেন। বলেন, ‘দড়ি দিয়ে বাঁধ। নাকি সেটাও তোদের কাছে নেই?’ এসময় একজন এপিবিএন সদস্য দড়ি খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। ততক্ষণে গুলির শব্দে আশপাশের আরও মানুষ চেকপোস্টের কাছে জড়ো হতে শুরু করে।
শরীরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মেজর জুনায়েদ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাতরাতে থাকেন। তখন ওসি শঙ্কর ফজর কে কিছু একটা বলে জুনায়েদের কাছে যান। প্রথমে বুকে পা দিয়ে পাড়া দেন এবং পা দিয়ে গলা চেপে ধরেন। তখনও নড়াচড়া করছিলেন জুনায়েদ । এর কিছু সময় পরই নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায় তার। এসময় মেজর জুনায়েদের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি দেন ওসি শঙ্কর। বেশকিছু সময় পুলিশের একজন এসআই একটি গাড়িতে করে মেজর জুনায়েদ কে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেন।
র‍্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম। অভিযোগপত্রে জুনায়েদ হত্যার ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে হত্যা বলে উল্লেখ করেন তিনি। অভিযোগপত্রে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে নয়জন টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য, তিনজন এপিবিএনের সদস্য এবং তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি।
সোলেমান জানতে চাইলো-

-” হ’ত্যা করার রিজন কি ছিলো?
-” জানা গেছে একজন দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তা যিনি নিজের অপরাধ ঢাকতে তার সহকর্মীদের দিয়ে জুনায়েদ কে হ’ত্যার আয়োজন করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মা’দক নির্মূলের নামে টেকনাফ থানায় নিরীহ মানুষের উপর ওসি শঙ্কর রায় অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়নের কাহিনী জেনে গিয়েছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জুনায়েদ ও তার সঙ্গীরা। শঙ্করের অত্যাচারের শিকার কিছু মানুষের সাক্ষাতকারও তারা নিয়েছিলেন।
বিষয়টি নিয়ে শঙ্করের সঙ্গেও জুনায়েদ এবং তার সঙ্গী মঈনুল ও সোবহানের কথাও হয়। এরপর বিপদ আঁচ করতে পেরে জুনায়েদ ও তার দলকে ধ্বংস করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন শঙ্কর। তার পরিকল্পনাতেই চেকপোস্টে হত্যা করা হয় জুনায়েদ কে। আদালতে সব স্বীকার করেছে শঙ্করও তার লোকেরা।
সোলেমান তপ্ত শ্বাস ফেললো। ল্যাপটপ টা বন্ধ করে কিছুক্ষণ গা এলিয়ে দিলো সোফায়। কিছুক্ষণ এভাবে থেকেই এক চোখ খুলে মেহরিনের দিকে তাকালো। মলিনতা এখনও মুখটা থেকে সরে নি। সোলেমান মৃদু স্বরে ডেকে উঠলো –

-” মেহরিন..
মেহরিন ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো। ভ্রু নাচিয়ে জানালো ‘কি?
সোলেমান চোখের ইশারায় কাছে আসতে বলল।
মেহরিন উঠে সোলেমানের পাশে এসে দাঁড়াতেই সোলেমান হাত টেনে মেহরিন কে কোলে বসালো। আকস্মিক এমন হওয়ায় ঘাবড়ে গেলো মেহরিন। সোলেমান মেহরিনের গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়ে বলল-
-” হোয়াটস হ্যাপেন্ড? মুখ এমন অমাবস্যার আদলে ঢাকা কেনো?
মেহরিন কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে চুপ থেকে বলল-
-” একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
-” হুমম করো। অনুমতি নিচ্ছো কেনো?
-” আপনার সম্পর্কে কি এমন কিছু আছে যা আমি জানি না। অথচ আমার জানাটা আবশ্যিক।
সোলেমান মৃদু হাসলো।

-” তুমি তো মেয়ে আমার সম্পর্কে জানোই না কিছু।
-” জানতে চাই আপনার সম্পর্কে।
-” এই যে জেনে নাও আমি আস্তটাকে,পড়ে ফেলো। তোমার কাছেই তো আছি।
-” ভালোবাসেন আমায়?
সোলেমান সোজা জবাব দেয়-
-” শিওর জানি না। তবে অসম্ভব ভাবে চাই তুমি মেয়েটা সারাজীবন আমার বক্ষপিঞ্জরের কাছে থেকে যাও।
মেহরিনের মন টা ভার হয়ে গেলো।
-” আমি খুবই সাধারণ একটা মেয়ে এমপি সাহেব।
-“শুরুতেই বুঝতে পেরেছি ।
-” আমাদের সবসময়ই অসম্ভবের প্রতি অসম্ভব টান থাকে। আমার জীবন টা খুবই সহজসরল। কঠিন প্যাচগোছের কখনই ছিলো না।
-” এমন সহজসরল ই রাখবো তোমার জীবনটা ট্রাস্ট মি৷ এমন কোনো অহেতুক সত্য তোমার জীবনে আসতে দিব না যাতে তোমার জীবনটা কঠিন হয়ে যায়।
মেহরিন তাকালো সোলেমানের দিকে।

-” অহেতুক সত্য?
-” হুমম অহেতুক যা সবার জানতে হয় না।
-” আচ্ছা বাড়িতে যে একটা নতুন মেয়ে দেখলাম উনি কে?
-” কে মাহি?
-” নাম জানি না।
-” এজওয়ানের বউ। মানে তোমার জা। কেনো কিছু হয়েছে?
মেহরিন মাহির বলা কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো। নাহ্ কথাটা বললে বিষয়টা যেন কেমন বাজে দেখায়। মনে হবে ভাইয়ের বউয়ের নামে কূটনামি করছে।
-” কি হলো চুপ যে? কিছু বলেছে?
-” ন..না কিছু বলে নি।
-” তোমাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়ে তারপর ঢাকায় ব্যাক করবো। কোন কলেজে ভর্তি হবে ঠিক করেছো?
মেহরিন ঠিক করেছে সে সরকারি কলেজে পড়বে। এতে ঊর্মি আর মেহরিন একই কলেজে পড়তে পারবে।

-” হুমম।
-” কোনটা?
-” নওগাঁ সরকারি কলেজে।
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো। সরকারি কলেজে পড়বে তার বউ!
-” ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছো?
-” হুমমম।
-” ঠিক আছে। আমি ভর্তির সব ব্যবস্থা করে দিব।
এজওয়ান রুমে শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছিলো মাহির। বিয়ে হলো কদিন অথচ বউকে এখনও ছোঁয়া হয় নি। যা কারেন্ট মাইয়ার শরীরে চোখেই ভষ্ম করে দেয়। ছুঁতে গেলে তো চ’ড় একটাও মাটিতে পরবে না। তাই বলে কি এজওয়ান থেমে থাকবে? মোটেই না।
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাহি রুমে প্রবেশ করলো। বে’য়াদব মেয়ে ছেলেদের মতন সেজে থাকে শুধু। এজওয়ান উবু হয়ে বলে-

-” আমাদের উচিত হানিমুনে যাওয়া।
মাহি ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। কোন মুখে হানিমুনের কথা বলে এই লোক? যেখানে এল ঘরে থাকার কথা ভাবলেই মাহির উল্টি চলে আসে। মাহি আয়নায় নিজেকে দেখে বলল-
-” হুমম যাব।
এজওয়ানের চোখ মুখ জুড়ে অবাকের ছায়া।
-” কবে!
মাহি ঘাড় বেঁকিয়ে বলল-
-” আপনার মরার চতুর্থ দিন।
-” কাকে নিয়ে? তোমার ঐ ভালোবাসা কে নিয়ে?
-” আমি একবার ও বলেছি? তবে মন্দ বলেন নি।
-” এমন চিন্তা মাথাতেও এনো না চান্দু। তোমায় এত সহজে ছাড়ার জন্য বিয়ে করি নি।
-” আমিও আপনাকে এত সহজে ছাড়ছি না মিস্টার এজওয়ান সুলতান।
এজওয়ান উঠে এসে বলে-

-” আমিও চাই তুমি আমায় না ছাড়ো। নিজের সাথে করেই রেখে দাও। ট্রাস্ট মি আমি থেকে যাব।
হুট করে এজওয়ানের এমন কথা শুনে মাহি ভ্রু কুঁচকালো। বুকে জোরেশোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল-
-” নেশা চ’ড়ে গেছে নাকি মাথায়? আবোলতাবোল বকছেন। আপনি আমার শত্রু ভুলে যাবেন না।
-” কিসের শত্রুতা আমার সাথে তোমার?
-” সেটাই খুঁজতে থাকুন৷ কিসের শত্রুতা আমার আপনার সাথে।
-” শত্রুতা কে এক সাইডে রেখে আমি একটা অফার দিতে চাই তোমায়।
-” কিসের অফার?
-” তুমি তো তোমার জামাইকে ভালোবাসো না তাই তো? আমার বউও আমায় ভালোবাসে না। তাহলে চলো দু’জনে মিলে প’রকীয়া করি। ট্রাস্ট মি কেউ জানবে না। না তোমার জামাই আর না আমার বউ।
মাহির কুঁচকে যাওয়া চেহারা রাগে পরিনত হলো। দাঁত চেপে বলল-

-” অ’শ্লীল লোক।
-” সে আমি বরাবরই। অফার টা কিন্তু মন্দ না। ভেবে দেখতে পারো।
-” আপনি জানেন,আপনার আর আপনার বাবার মতন বদ লোক আমি একটাও দেখি নি।
-” ট্রাস্ট মি আমিও তোমার মতন মেয়ে আর একটাও দেখি নি। কি কড়া চাহনি মাইরি,কি ঝাঁঝ। পুড়াই মাথা নষ্ট করে দেওয়ার মতন। বাই দ্যা ওয়ে আমার বাপ তোমার কি করছে?
-” আপনার বাপ কে জিজ্ঞেস করেন কি করছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে ঘৃণা আমি আপনাদের করি।
-” তোমার ঘৃণাতেই না হয় বেঁচে রইলাম। আই হ্যাভ নো প্রবলেম।
-” আপনি জীবনে অনেক কিছু পেয়েছেন তাই না?
-” এক মায়ের আদর ছাড়া পৃথিবীর সব কিছু পেয়ছি।
-” সেজন্যই এমন কু’সন্তান হয়েছেন।
এজওয়ান হাসে৷ কিছু বলে না। মাহির শরীর জ্বলে উঠে এই হাসিতে। এজওয়ান হাত মুচড়ে ধরে এবার মাহি। মাহির পিঠ নিজের বুকের সাথে মিলিশে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলে-

-” তোর কথা মতে এতক্ষনে আমার বউয়ের অধিকার জোর করে নিয়ে নেওয়া উচিত ছিলো। তুই তো আমার বউ লাগিস৷ পাঁচ টাকার সাথে আমার মৃ’ত্যুর নামে সিল করা বউ তুই। তোর উপরে আমার অধিকার আছে৷ কিন্তু আমি তা করেছি?
-” ফলালে জাস্ট দেহটাই পাবেন। মন কখনই পাবেন না।
-” তোর দেহ পাওয়ার আগে তোর মন পাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও আমার নাই। পুরুষের সুখ নারীর দেহে।
ঘৃণায় শরীর ঘিনঘিন করে উঠলো মাহি।
-” ছাড়ুন লাগছে আমার।
-” এই টুকু ধরাতেই লাগছে! যখন গভীর ভাবে ধরবো তখন কি করবে সুইটহার্ট?
-” জানে মে’রে ফেলবো বলে রাখলাম।

এজওয়ান আয়নায় থাকা মাহির মুখ টা দেখলো। কি ঘৃণা ভরা সেই চাহনি উফ! এজওয়ানের মজাই লাগছে এই চাহনি৷ চাহনি টাকে আরো চেতিয়ে দেওয়া যাক। মাহিকে নিজের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ালে দু হাত চেপে ধরে মাহি কিছু বুঝার আগেই ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় মাহির ঠোঁটে। মাহির মনে হচ্ছিল দমটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে জঘন্যতম অনুভূতি হচ্ছে। মাহি পা দিয়ে এজওয়ান কে লা’ত্থি দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছে কিন্তু এজওয়ান আরো চেপে আসলো। কামড় ও দিতে লাগলো। মাহির মনে হচ্ছে সে কোনো বিষ পান করছে। ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে আছে। পাক্কা দশ মিনিট পর এজওয়ান ছেড়ে দিলো মাহিকে৷ ঠোঁট দিয়ে র’ক্ত পড়ছে৷ হয়তো কিছুক্ষণ পর ফুলেও যাবে ঠোঁট ।
মাহি সামনে থাকা ফুলদানি টা ছুঁড়ে মা’রে এজওয়ানের দিকে। এজওয়ান গায়ে লাগার আগেই ধরে ফেলে। বা হাত দিয়ে ঠোঁট মুছে বলে-
-” সিল মে’রে দিলাম। এটা জাস্ট ডেমো ছিলো। পিকচার আভি বাকি হে। আমি ধরতে আসলে বাঁধা দেওয়ার মতন কোনো আইন নেই বাংলাদেশে। ভেবেছি তোকে মে’রে ফেলবো। কিন্তু না। তোকে নিয়ে আমি সংসার করবো। আমার বাচ্চা কাচ্চার মা হবি তুই। আমার ঘরণী হয়ে থাকবি মৃত্যুর আগ অব্দি।

ইমন ঈদের তিনদিন পরই ঢাকায় চলে গেছে। অলংকারপুর গ্রাম টাকে তার জা’হান্নামের মতন লাগছিলো। ভর্তির টাকা দিয়ে এসেছে মায়ের হাতে। বলেছে কোনো সরকারি কলেজে ভর্তি করাতে। মেহরিন ও যেহেতু সরকারি কলেজে ভর্তি হবে সেজন্য ঊর্মি ও নওগাঁ সরকারি কলেজে ভর্তি হবে।
সেরিনের শ্বশুর বাড়ির বিয়েতে আনোয়ার সুলতান আর আমিরুল সুলতান গিয়েছিলো,রুমাইসা আর আফিয়া সুলতান গিয়েছিল। মোতালেব ভুঁইয়া দের বাড়ির কেউ যায় নি। গেলেই মহিলার ত্যাড়া কথা শুনতো।
সোলেমান মেহরিন কে যেতে বলেছিল কিন্তু মেহরিন যায় না। অস্বস্তির মধ্যে সে নিজেকে ফেলতে চাচ্ছে না। রুমাইসা খেয়ে দেয়েই চলে এসেছিল।
ইমন ইব্রাহিমের বাগান বাড়িতে এসে নিজের বরাদ্দকৃত রুমটাতে এসে শুয়ে আছে। ইয়াসিন টাও ফিরে নি। আর তার পক্ষেও ওখানে থাকা সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই চলে আসা।
এখন এখানে এসেও শান্তুি পাচ্ছে না। যত সুখ নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলো। তার চেয়ে কয়েকগুণ ব্যথা নিয়ে ঢাকা ফিরলো।

সোলেমান আজ মেহরিনের কলেজের সব কাজকর্ম শেষ করেছে অনলাইনে৷ এখন স্কুল কলেজ খোলার ঘোষণা আসলেই কলেজে গিয়ে পড়তে পারবে। নওগাঁ কলেজে যেতে ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগবে সোলেমান ভিলা থেকে৷ বাড়ির গাড়িতে করেই চলাচল করবে। যদি স্কুল কলেজ খোলা এখনও অনিশ্চিত। বোধহয় ২১ সালের শেষের দিকে খুলতে পারে। সকাল হলেই চলে যাবে সোলেমান ঢাকায়৷ এখন এক মনে চাঁদ দেখছে সোলেমান আকাশের। মেহরিন কফি বানাতে গিয়েছে রান্না ঘরে। মেহরিনে মুঠোফোন টা রাখা সাইডে। সেই ফোন থেকে ভেসে আছে হাওয়া মে উড়তা যায়ে মেরা লাল দোপাট্টা মাল মাল গান টা।
মেহরিন কফির মগ নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে বেলকনিতে। আকস্মিক এই গান শুনে কিছুটা চমকে গেলো। ভীষণ পছন্দের এই গান। মেহরিন কফির মগ টা এগিয়ে দিলো। সোলেমান নিলো।পাশে চেপে সরে গিয়ে মেহরিন কেউ বসতে দিলো। মেহরিনের হাতে তার নিজের জন্য আনা চা। মেহরিন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল-

-” গানটা আপনি ও শোনেন?
সোলেমান ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো।
-” তুমিও শোনো?
-” আগে শোনা হত মায়ের ফোনে।
সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
-” তুমি ভীষণ বই পড়ো তাই না?
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল-
-” জ্বি।
-” তোমার পছন্দের লেখক কে?
মেহরিন চোখ বন্ধ করে বলল-
-” হুমায়ুন আহমেদ।
-” পছন্দের বই?
-” কোথাও কেউ নেই।
-” পছন্দের চরিত্র?
-” প্রিয় বাকের ভাই।
সোলেমান ঠোঁটে কোনে কিঞ্চিত বিষন্নতা দেখা গেলো। প্রিয়! বউ কেনো প্রিয় বাকের ভাই বলল?

-” আমি তোমার জীবনের সেই বাকের ভাই মেহরিন। আর তুমি হচ্ছো আমার মুনা। কি চমৎকার তাই না? তোমার নামে আর মুনা নামে কি অদ্ভুত এক মিল। আচ্ছা কখনও যদি তাদের মতন আমাদের সমাপ্তি হয় তাহলে কেমন হবে?
মেহরিন কিঞ্চিত চমকালো। সাথে সাথে বলে উঠলো-
-” একদম না। এটা একদমই ভালো হচ্ছে না। আমি একদমই মুনা হতে চাই না। আর আপনিও দয়া করে বাকের ভাইয়ের সাথে নিজের তুলনা করবেন না৷ বাকের ভাই আর মুনার মতন করুন সমাপ্তি আমার জীবনে আমি চাই না। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি টা আমি আজও মেনে নিতে পারি না… আপনি…আপনি আমার এমপি সাহেব। সেটাই কি যথেষ্ট নয়?

-” কখনও কখনও কোন একজনের কাল্পনিকে গড়া চরিত্র বাস্তবে মানুষের সাথে মিলে যায় মেহরিন। তাই বললাম আর কি।
মেহরিন মাথা নত করে বলল-
-” তাহলে আজ থেকে আমার অপছন্দের তালিকায় রেখে দিব বাকের ভাই কে।
সোলেমান মেহরিন কে এক হাত দিয়ে আগলে নিয়ে বলল-
-” একদমই না। আমি জাস্ট মজা করেছি৷ বাকের চরিত্র টা আমার ভীষণ পছন্দ। একসময় আমিও বাকেরর মতই ছন্নছাড়া ছিলাম।

দাহশয্যা পর্ব ৩০

-” এখন পরিপাটি?
-” হ্যাঁ বিয়ে করলাম। ভবিষ্যতে কোনো একদিন বাবা হবো। সন্তান মানুষ করতে হবে তো। এখন থেকেই নিজেকে পরিপাটি না করলে কেমন একটা দেখায় না?
বাচ্চার কথা শুনে মেহরিন লজ্জা পেলো। তাদের মধ্যে তো কিছুই হয় নি। হবে কি না তার ঠিকঠিকানা ও নেই। অথচ তিনি বাবা হওয়াতে চলে গেছে।

দাহশয্যা পর্ব ৩২