Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৩২

দাহশয্যা পর্ব ৩২

দাহশয্যা পর্ব ৩২
Raiha Zubair Ripti

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে সোলেমানের। বাহিরে এখনও আঁধার। পাশেই গুটিশুটি হয়ে সোলেমানের বুকে মাথা রেখে এক হাত সোলেমানের গলার কাছ টায় জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে মেহরিন। সোলেমান আধোআধো চোখে দেখলো মেহরিন কে। এক হাত মেহরিনের গালে রাখতেই মেহরিন হালকা কেঁপে উঠলো। তারপর হালকা করে চোখ মেলে তাকালো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে সোলেমানের বুক থেকে মাথা সরিয়ে উঠে বসলো। পাশ থেকে ওড়না টা নিয়ে আশেপাশে চোখ বুলালো। না সকাল এখনও হয় নি। চোখের দৃষ্টি বাহির থেকে এবার সোলেমানের দিকে ফেরাতেই দেখলো সোলেমান তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুটা অস্বস্তি রা ঘিরে ধরলো মেহরিন কে। সোলেমান দৃষ্টি মেহরিনের দিকে রেখেই বলল-

-” উঠে পড়লে কেনো? আজান দেয় নি৷ এসো ঘুমাও।
-” আপনি কি জেগে ছিলেন সারা রাত?
-” না। একটু আগেই ভেঙেছে ঘুম।
-” আপনি তো আজ ঢাকা চলে যাবেন।
-” তো?
-” না এমনি।
-” এসো শুয়ে থাকো। আজান দিলে তখন উঠবে।
সোলেমান মেহরিনের হাত টেনে বুকে এনে ফেললো। মাথাটা চেপে ধরলো। কি যে শান্তুি লাগে তখন। কিভাবে যেন মেহরিনের সাথে কাটানো সময় গুলো একটু তাড়াতাড়িই চলে যায়। সোলেমানের ইচ্ছে করে সময়টাকে থমকে দিতে। ঢাকায় গেলেই সে ভিন্ন রূপে পরিবর্তন হয়ে যাবে। অথচ মেহরিনের সামনে সে কি শান্ত ভদ্র হয়ে থাকে! বাস্তবে সে কি এত ভদ্র?

ফজরের আজান শুরু হলে মেহরিন সোলেমান দু’জনেই উঠে বসে। এক এক করে দু’জনে ওজু করে ফজরের নামাজ টা আদায় করে নেয় রুমেই।
নামাজ শেষে সোলেমান সেদিন রাতের মতন কি যেন বিরবির করে ঠোঁটের আগায় উচ্চারণ করে মেহরিনের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। সোলেমান মেহরিন কে ছেড়ে দিতেই মেহরিন রান্না ঘরে এসে সকলের জন্য চা কফি বানায়। রান্নার খালা টা আজ বিকেলে আসবে শুনেছে মেহরিন। আফিয়া সুলতান ও নেমে আসে। সকালের খাবার টা সে বানাবে আজ। এক এক করে বাড়ির বয়স্ক পুরুষগণ এসে বসার ঘরে বসলো চায়ের জন্য । মেহরিন সবার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিলো। আমিরুল সুলতান, আর আনোয়ার সুলতান তো চায়ের প্রশংসা করেই মেহরিনের,আজ বাশার সুলতান ও করলো। কি অমায়িক সোলেমানের বউ। অথচ তার কপালে এক ছেলের বউ জুটেছে কুটোটি নাড়ে না। উল্টো তাদের না খাইয়ে রেখে নিজে খাবার অর্ডার করে খায়।
বাশার সুলতান পরম আফসোসের শুরে বলতে লাগলো-

-” ভাইজান তোমার ব্যাটার বউয়ের মতন যদি আমার ব্যাটার বউটাও এমন হতো!
আমিরুল সুলতান চায়ে চুমুক দিয়ে বলল-
-” রেখে যা এ বাড়ি। মেহরিন আর আফিয়া মিলে শিখিয়ে দিবে। কি মেহরিন পারবে না?
মেহরিন শুধু মুচকি এক হাসি দিলো। বাশার সুলতান দুঃখি মুখ করে বলল-
-” এজওয়ান কি রাখতে দিবে ভাইজান? ছেলেটা এমন ভাবে বিয়ে করলো যে লোকজন জানলে মুখ দেখানোর জো থাকবে না। ছেলেটাকে বোধহয় মানুষ বানাতে পারি নি।
-” আহা এভাবে বলছিস কেনো। ঠিক হয়ে যাবে।
-” সোলেমানের মতন যদি একটু বুদ্ধি থাকতো মাথায়। তাহলে এভাবে বলতাম না।
আনোয়ার সুলতান এবার থামিয়ে দিয়ে বলল-
-” কম বুদ্ধি নাকি আমাদের এজওয়ানের? সোলেমানের ই তো ভাই। মেহরিন দাদুভাই তুমি যাও সোলেমান কে কফি দিয়ে এসো।
মেহরিন সোলেমানের কফি নিয়ে চলে গেলো। রুমে এসে মেহরিন দেখলো সোলেমান রেডি হচ্ছে। মেহরিনের মন টা খারাপ হয়ে গেলো। মলিন মুখে কফির মগ টা এগিয়ে দিলো। সোলেমান মেহরিনের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে কফির মগ টা হাতে নিলো। কফির মগে চুমুক বসিয়ে মেহরিনকে জিজ্ঞেস করলো-

-” মন খারাপ?
মেহরিন বিছানায় বসে বলল-
-” উঁহু।
-” স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মন খারাপ।
মেহরিন নত গলায় বলল-
-” তাহলে তো জানার কথা কেনো মনখারাপ।
-” সেটাও জানি।
-” জেনেও জিজ্ঞেস করছেন?
সোলেমান মেহরিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বলল-
-” না করলে কেমন একটা দেখায় না? তাই একটু জিজ্ঞেস করলাম।
মেহরিন আর কিছু বললো না। সোলেমানের কফি খাওয়া শেষ হলে নিচে আসে দু’জন। ব্রেকফাস্ট করেই বের হবে।
খাবার টেবিলে সবাই বসে গেছে। এজওয়ান সবে ঘুম থেকে উঠে এসে সোফায় বসলো। সাথে তার পেছন পেছন মাহিও নেমেছে। মেহরিন দূর থেকে জিজ্ঞেস করলো-

-” ভাইয়া কফি আনবো?
এজওয়ান হাই তুলতে তুলতে বলল-
-” জ্বি ভাবি লাগবে। তবে আপনার কষ্ট করে আনতে হবে না। মাহি যাও স্বামীর জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে আসো।
মাহি ভ্রু কুঁচকালো।
-” আমি নিয়ে আসবো!
-” তাহলে কে নিয়ে আসবে? স্বামীর দেখভাল করার দায়িত্ব বউয়ের হয়। সবার সামনে সিনক্রিয়েট করাতে না চাইলে চুপচাপ নিয়ে আসো।
শেষের কথা গুলো দাঁত চেপে বলল।
-” ভেবে বলছেন তো? বি’ষও মিশিয়ে আনতে পারি।
-” তোমার দেওয়া বি’ষ ও আমি এজওয়ান অমৃত ভেবে খেয়ে নিব।
মাহি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ফুঁসতে রান্না ঘরে আসলো। সামনেই কফির জিনিস গুলো ছিলো। তাই মাহি কে খুঁজতে হয় নি। কফি বানানোর শেষে নিচে পায়ের কাছে ইঁদুর মা’রার বি’ষ দেখতে পেয়ে ইচ্ছে করলো বি’ষ টা ঢেলে খাইয়ে দিতে।
কফিটা এজওয়ানের সামনে রেখে পাশে মুখ ফিরিয়ে বসলো দূরত্ব বজায় রেখে মাহি।
সোলেমান খাবারের প্লেট টেনে নিয়ে পাশের চেয়ার টেনে বলল-

-” মেহরিন বসে পড়ো। খেয়ে নাও।
আফিয়া সুলতানের দিকে মেহরিন তাকাতেই তিনি ইশারায় বসতে বললেন। মেহরিন বসলো। সোলেমান নিজ হাতে পরোটা ডিম,ভাজি, মাংস প্লেটে তুলে দিলো।
আফিয়া সুলতান মাহি আর এজওয়ান কেউ ডাকলো খাওয়ার জন্য। মাহি যেতে নিলে এজওয়ান থামিয়ে দিয়ে বলে-
-” ছোটমা মাহি এসব খাবার খাবে না।
আফিয়া সুলতানের কপালে দু ভাজ পড়ে।
-” কেনো মাহি এসব খায় না?
মাহি পেছন ফিরে এজওয়ান কে বলল-
-” আমি কি আপনাকে বলেছি আমি এসব খাই না?
এজওয়ান কফির মগে শেষ চুমুক দিয়ে বলল-

-” তৈয়ার করা জিনিস তুমি যে একটু বেশি গিলো তা আমি জানি৷ খাবার গুলো কষ্ট করে বানিয়েছে ছোট মা, ভাবি৷ অথচ বাড়ির বউ তুমিও। তুমি কি করছো? হাত পা তুলে শুধু গিলছো। নিজের খাবার নিজে বানিয়ে খাও। বাড়ির সকল কাজ তুমি করবে। ভাবি তোমার সম্পর্কে বড় হলেও বয়সে সে তোমার চেয়ে ছোট হয়েও কত কাজ করছে একা হাতে৷ আর তুমি? বাপ মা ছোট থেকে শাসন না করলে যা হয়।
মাহি তর্জনী তাক করলো এবার। দাঁত চেপে বলল-
-” একদম মা’কে টানবেন না ঐ মুখ দিয়ে। আপনাদের মুখে আমার মা’য়ের কথা একদমই শোভা পায় না। মুখ খুলাবেন না আমার। আপনাদের এই বাড়ির বউ কে হতে চেয়েছে? আমি চেয়েছি হতে? চাই নি তো। আপনি নিজেই বানিয়েছেন।

-” হয়েই যখন গেছো তখন তো বউয়ের মতই থাকতে হবে৷ নিজে খাবার বানাবে তারপরই খেতে পারবে। কোনো অনলাইনে অর্ডার করা খাবার এ বাড়িতে আসবে না।
-” খেলাম না খাবার। এক সপ্তাহ না খেয়ে থাকলে কেউ ম’রে যায় না।
কথাটা বলেই মাহি উপরে চলে যায়। সেটা দেখে মেহরিন উঠতে চাইলে সোলেমান মেহরিনের হাতের উপর হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল-
-” খাবার ছেড়ে উঠতে হয় না। খেয়ে নাও।
-” আপু যে রাগ করে চলে গেলো না খেয়ে।
-” তার চিন্তা তোমার করতে হবে না। যার বউ সে সামলে নিবে। তুমি তোমাকে নিয়ে ভাববে জাস্ট।
মেহরিনের খাবার গলা দিয়ে নামতে চাইলো না আর। সোলেমান খাওয়া শেষে হাত মুছে এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” যত রঙ্গ করার ইচ্ছে আছে বউয়ের সাথে,তা রুমের চার দেওয়ালের ভেতরে করবি। ভরা সমাগমে করবি না। তোর আনইজি না-ই লাগতে পারে। কিন্তু আমাদের লাগে। বউ সম্মানিত একজন সঙ্গী তার সম্মান রক্ষা করার স্বামীর কর্তব্য। কোনো স্বামীর এটা কাম্য নয় যে বাড়ির গুরুজন দের সামনে এভাবে বউকে কথা শোনানোর। ধীরেসুস্থে একাকী বলেও বোঝানো যায়৷ আই থিংক এ কথা দ্বিতীয় বার বলতে হবে না।
মেহরিন মুগ্ধ হয়ে দেখলো তার এই পুরুষটি কে। সে আসলেই একজন সঠিক মানুষ পেয়েছে জীবনে। তার বাবার কাছে সে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে এমন এক পুরুষের হাতে তাকে সঁপে দেওয়ার জন্য। তার স্বামীর বলা কথাগুলো একটাও ভুল না। স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের পোশাকের মতো। পোশাক যেমন আমাদের ইজ্জত-আব্রু হেফাজত করে ও আমাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে,স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকাও তেমনি। আমাদের কারো পোশাক যদি কখনো ময়লা হয়ে সেটা যেমন আমরা একেবারে ফেলে না দিয়ে যত্ন করে
পরিষ্কার করি, ঠিক তেমনি স্বামী বা
স্ত্রীর কারো কোন ত্রুটি থাকলে সেই কারনে
তার পুরোটাই খারাপ, তার সাথে আর ভালো
ব্যবহার করা যাবে না, এমন না। বরং, স্বামী-
স্ত্রী একজন আরেকজন সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু হবে।
এজওয়ান মাথা নত করে বলল-

-” এভাবে না বললে ও বুঝবে না ভাই।
-” বুঝবে কি বুঝবে না সেটা তার ব্যপার। কিন্তু তুই এভাবে উশৃংখল, অসামাজিকের মতো বুঝানোর চেষ্টা করলে তা আমি মোটেও গ্রাহ্য করবো না। সুলতান বাড়ির বউদের সম্মান সবার উপরে। মাহি এখন সুলতান পরিবারে বউ। আর একটা কথা নারী জাতিকে পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে ওপরের হাড়টা সর্বাপেক্ষা বাঁকা। অতএব তুই
যদি এভাবে সোজা করতে যাস তাহলে ভাঙ্গার সম্ভাবনা আছে। আর যদি ফেলে রাখিস তবে বাঁকা হতেই থাকবে। ভালো ব্যবহার কর। ঠান্ডা মাথায় সুন্দর করে বোঝাবি। মনে থাকবে?
এজওয়ান মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। সোলেমান ইব্রাহিম কে এখনও খাবার টেবিলে আসতে না দেখে ফোন লাগালো। সবার খাওয়া শেষ অথচ তার খবর নেই।

ইব্রাহিম ইয়াসিনের সাথে কথা বলছিলো। ইয়াসিনের মাধ্যমে জানতে পারলো ইমন অনেক আগেই চলে এসেছে ঢাকা। ইয়াসিন আগামীকাল রওনা দিবে। ইব্রাহিম শুনে ফোন কাটতেই সোলেমানের ফোন পেয়ে ফোনটা রিসিভ করে আসছি বলে রুম থেকে বের হলো। করিডর দিয়ে মাহি কে রাগী মুখে বড় বড়বড় পা ফেলে যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। মাহির আবার কি হলো?. পেছন পেছন এজওয়ান কেও আসতে দেখলো। নিশ্চয়ই দুটোর মধ্যে কিছু হয়েছে।
ইব্রাহিম নিচে এসে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলো।
বাশার সুলতান, ইব্রাহিম আর সোলেমান যাবে। এজওয়ান না-কি এখনই যাবে না ঢাকা। আরো ক’টা দিন এখানেই থাকবে।
আনোয়ার সুলতানের মন যে কি ভারি হলো ছেলে নাতি চলে যাচ্ছে বলে। আমিরুল সুলতানের মুখে গম্ভীর হয়ে আছে। দুশ্চিন্তার ছাপও দেখা যাচ্ছে। সোলেমান একবার সেই মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” আমি চলে যাওয়ায় যে মন খারাপ হচ্ছে না তা চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু দুশ্চিন্তা টা করছো কি নিয়ে?
আমিরুল সুলতান ছেলের থেকে বিষয় টা আড়াল করার চেষ্টা করে বলল-
-” না না কিছু হয় নি। তোদের বিয়ে হয়ে গেলো। এখন রুমাইসারও তো বিয়ে দেওয়ার সময় এসে গেলো। জীবনের তো গ্যারান্টি নেই আমাদের । মর’ন সবসময় কাঁধে এসে দাঁড়িয়ে থাকে।
সোলেমান বাপ কে নিয়ে সাইডে গেলো। গম্ভীর গলায় বলল-
-” কথা এড়িও না৷ মোদ্দা কথাটা বলো। কি হয়েছে? দুশ্চিন্তা কি নিয়ে?
-” নাসির রে তো জানিস। আজকাল বেশ হম্বিতম্বি করছে। বড়বড় লোক জুটিয়েছে। সেদিন ক্লাবে এসে হুমকি দিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যখন-তখন কিছু করতে পারে।
সোলেমানের মুখেও এবার চিন্তার ছাপ পড়লো। নাসির উদ্দীন তাদের বিরোধী দলের লোক। খ্যাপাটে টাইপের। পাওয়ার বেশ ভালোই আছে। সোলেমানের দুশ্চিন্তা হচ্ছে সে তো সবসময় এখানে থাকে না। তার অনুপস্থিতিতে যা কিছু হতে পারে। ঢাকা হলে না হয় তার দুশ্চিন্তার একটুও ছাপ আসতো না চেহারায়। তার উপর মেহরিন আছে এ বাড়িতে। চিন্তা টা আরো বেড়ে গেছে। বাবাকে চিন্তা মুক্ত রাখতে সোলেমান বলল-

-” আচ্ছা এটা নিয়ে চিন্তা করে প্রেশার লো করো না। আমি সব ব্যবস্থা করে দিব যাতে নাসির উদ্দীন বাড়াবাড়ি করতে না পারে। বাড়ির চারপাশে আরো গার্ড বাড়িয়ে দিব। আর এজওয়ান তো এখন আছেই বাড়িতে ও সামলে নিবে।
আমিরুল সুলতান ছোট করে হুমম বললো। এই বিষয় টা আনোয়ার সুলতান এখনও জানে না। আমিরুল সুলতান জানায় নি। জানালেই তার বাবা হাঙ্গামা বাঁধিয়ে ফেলবে। লোকজন পাঠাবে নাসিরের বাড়িতে ভাঙচুর করার জন্য৷ এতে পরিস্থিতি আরো হাতের নাগালের বাহিরে চলে যাবে।

মেহরিন সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রুমাইসার সাথে। সোলেমান একবার সেদিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেলো। রুমাইসা ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। সেই ছোট্ট থেকে সে মানুষ হয়েছে ভাইয়ের কাছে। বয়স যখন রুমাইসার সবে সাত মাস। সেই সাত মাসের ছোট্ট রুমাইসাকে ৮ বছরের ছোট্ট সোলেমান সামলিয়েছে। খাইয়েছে,ঘুম পাড়িয়েছে,গোসল করিয়েছে, সবটা একা হাতে। রুমাইসার মাঝেমধ্যে এখন খুব রাগ হয়। তার ভাই কেনো যে তাদের সাথে থাকে না। সাথে না-ই থাকলো, ঢাকায় তো নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু না নিবে না।
সোলেমান বোন কে আদর করলো। রুমাইসা অভিযোগ নিয়ে বলল-

-” থেকে গেলে কি হয় তোমার? সবসময় ঢাকায় পড়ে থাকো। মনে পড়ে না আমাদের?
সোলেমান মুচকি হাসলো বোনের কথায়। মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” মন ও পো’ড়ে, মনেও প’ড়ে।
-” তাহলে থাকো না কেনো?
-” এখানে থাকলে তোর নেতা ভাই দেশ চালাবে কি করে?
কথাটা বলতে বলতে আফিয়া সুলতান এগিয়ে আসলো। সোলেমান মা’কেও জড়িয়ে ধরলো।
-” একটা বড় ভাই তো হাজার টা নেতার চেয়ে উত্তম হয় মা। এই দুনিয়ায় আমার আপন বলতে এই এক বড় ভাই ছাড়া আর কে আছে বলো তো? সে সবার নেতা হতে গিয়ে আমার সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফেরেস্তা রাও পর্যন্ত সময় থমকে দেয় ভাই বোনের কথা বলার সময়। অথচ আমার ভাইয়ের সময়ই হয় না। আমি আমার ভাইকে কাছেই পাই না। একটু নিরালায়ে বসে ঠিক মতন কথাও বলতে পারি না৷ ভাইয়ার নেতা হতে গিয়ে আমার ভাইয়া হওয়া আর হলো না।

আসলেই কি সোলেমান নেতা হতে গিয়ে একজন আদর্শ ভাই হতে পারে নি? সব সময় সাথে সাথে থেকেই প্রমাণ করতে হয় যে ভাইয়া আছে? বোকা রুমাইসা জাননেই না হয়তো তার ভাই তার জন্য প্রতিনিয়ত কি করে। সোলেমানের কাছে রুমাইসা তার প্রথম সন্তানের মতো। সন্তানের মতো করে আগলে রেখেছে, যত্ন করেছে। সেই বোনের কি অভিমান আজ!
সোলেমান বোনের গালে আলতো করে হাত রাখলো৷ দু’চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। সোলেমান আলতো হাতে মুছে দিলো সেই জল। বুকে জড়িয়ে ধরে বলল-

-” খুব বাজে আমি ভাই হিসাবে? বল রুমু, খুব বাজে আমি ভাই হিসাবে?
রুমাইসা বেশিই বলে ফেলছে। ইশ সে শুধু নিজের কথাটাই ভাবলো স্বার্থপরের মতন! ভাইয়ের দিক টা ভাবলো না! না তার ভাইয়া বেস্ট ভাইয়া। সে ভুলে গেলো কি করে তার ভাইয়া তাকে কিভাবে একা মানুষ করেছে! রুমাইসা ভাইয়ের হাত মুঠোয় নিয়ে চুমু খেয়ে ছলছল নয়নে বলল-
-” সরি। আমি হার্ট করতে চাই নি তোমায় ভাইয়া। তুমি ওয়ার্ল্ডের বেস্ট ভাইয়া। আমি স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম। শুধু নিজের কথাটাই ভাবছিলাম। প্লিজ কষ্ট পেও না আমার কথায় ভাইয়া। অ্যা’ম সরি।
সোলেমান কিছু বললো না। আফিয়া সুলতান রুমাইসা কে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। বোঝাতে লাগলো মেয়েকে-

-” ভাইয়ের সাথে এভাবে কেউ কথা বলে? সোলেমানের মতন ভাই,ছেলে,স্বামী পাওয়া ভাগ্যর বিষয়। সব সময় সাথে থেকেই প্রমাণ করতে হবে তার কোনো মানে হয় না। দূরে সে সাধে থাকে না পরিবার ছেড়ে। বুঝতে হবে ভাইয়ের পরিস্থিতি।
রুমাইসা বুঝতে পারলো তার ভুল টা। আসলেই সে একটু বেশিই হার্ট করে ফেলছে ভাইকে।
মেহরিন এতক্ষণ পাশ থেকে ভাই বোনের কথা গুলো শুনছিলো। মেহরিনের কোনো বড় আপন ভাই নেই। সানজিদা বেগমের একবার একটা ছেলে সন্তান হয়েছিল মেহরিন হওয়ার এক বছর পর। কিন্তু বাচ্চা টা মৃত হয়ে জন্মেছিল। সে বেঁচে থাকলে মেহরিনের বছর এক ছোট হত। আল্লাহ তাকে নিয়ে নিয়েছে তার কাছেই। বাবাকে কখনও আফসোস করতে দেখে নি মেহরিন। লোকজন বলতো- এই যে দুটো মেয়ে তার, ছেলে হলো কিন্তু বাঁচলো না৷ এখন বৃদ্ধ বয়সে তাদের দেখবে কে মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পর?
মোতালেব ভুঁইয়া তখন সে কথা শুনে হাসতেন আর বলতেন—

-“ এক ব্যবস্থা না এক ব্যবস্থা ঠিক ই জুটিয়ে দিবেন আল্লাহ। ভাগ্য যদি ভালো হয় তাহলে মেয়ে আর মেয়ের জামাইরাই ছেলে হয়ে উঠবেন।
মেহরিনের পরিবার কখনও মেহরিনকে ভাইয়ের অভাব বুঝতেই দেয় নি। মেহরিন ভাইয়ের যে কি অভাব সেটা মেহরিন কখনও ভাবার সময়ই পায় নি৷ মোতালেব ভুঁইয়া পেতেই দেয় নি। সেরিনের মতন বোন ভাইয়ের চেয়ে কম নাকি? তার উপর তেহরান তানভীর আছে।
সোলেমান মেহরিনের পানে তাকালো। মেহরিন সোলেমানের বুকে হাত রেখে বলল-
-” কষ্ট পাবেন না। আপনি মোটেও বাজে নন। আপনি আমার দেখা একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ, ভাই হিসেবে, ছেলে হিসেবে এমনকি একজন স্বামী হিসেবেও। সব সময় পাশে থেকেই যে নিজের উপস্থিতি নিজের দায়িত্ববোধ জানান দিতে হবে ওপর পাশের ব্যক্তি কে তার কোনো মানে নেই। আমি নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি আপনাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে।
সোলেমান মেহরিনের হাতের উপর হাত রাখলো।

-” আমাকে পেয়ে সত্যি তোমার নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়?
-” আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামীদের মাঝে আপনি একজন। সকল নারীর জীবনে আপনার মতন পুরুষের আগমন আল্লাহ ফরজ করে দিক।
সোলেমান মেহরিনের কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকালো। সোলেমানের নিঃশ্বাস পড়ছে মেহরিনের মুখ জুড়ে। মেহরিন অন্য হাত সোলেমানের গালে রাখলো। জিজ্ঞেস করলো-
-” আপনি ঠিক আছেন?
সোলেমান সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মেহরিন কে আপাদমস্তক দেখে বলল-
-” সাবধানে থেকো। আসছি তাহলে?
মেহরিন বেদনামাখা এক হাসি উপহার দিলো সোলেমান কে। ইশ সেই হাসি থেকে যেনো মনে হলো কোনো তীরে ছুঁড়ে মারা হলো। আর সেটা সোজা সোলেমানের বুকে এসে লাগলো। সোলেমান নিজেকে সামলে নিয়ে মেহরিনের হাত দু’টো মুঠোয় নিয়ে চুমু খেলো।

-” এমন হাসি উপহার দিও না বউ বিদায়ের সময়। যাত্রাপথ তাহলে স্বস্তির হবে না আমার জন্য।
-” আল্লাহ আপনার শুধু যাত্রা পথ না। আপনার জীবনের সকল পথ স্বস্তির করে দিক এই প্রার্থনাই করি।
সোলেমান বুকে টেনে নিলো মেয়েটাকে। আগের কোনো জন্মে কি সোলেমান কোনো পূন্যের কাজ করেছিল? যার কারনে এমন একটা মেয়েকে সে জীবনে পেলো!
ইব্রাহিম কে আসতে দেখে সোলেমান ছেড়ে দিলো মেহরিন কে। সোজা হয়ে ফের আসছি বলে মেহরিনের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। মেহরিন সোলেমানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। ইশ কি যে কষ্ট হচ্ছে মানুষ টা চলে যাচ্ছে বলে। ইব্রাহিম মেহরিনের দিকে একবার তাকালো। মেয়েটার জন্য মাঝেমধ্যে ভীষণ খারাপ লাগে ইব্রাহিমের।

দাহশয্যা পর্ব ৩১

ইব্রাহিম ড্রাইভিং সিটে এসে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। সোলেমান এখনও তাকিয়ে আছে গাড়ির জানালা দিয়ে মেহরিনের দিকে। স্পষ্ট দেখতে পেলো মেহরিনের নয়ন জোড়া ছলছল করছে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু মুখে কি নিদারুণ হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। গাড়িটা সুলতান ভিলার গেট পেরিয়ে যেতেই সোলেমান সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। মেহরিনের মুখটা এখনও ভাসছে। সোলেমান ঠোঁটে কোনো বিষন্নতার ছাপ এনে বিরবির করে বলল-
-❝ আমার জীবনে তুমি এলে হুদহুদ পাখির বেশে। অথচ তোমার ভাগ্য হলো আছিয়ার মতন!❞

দাহশয্যা পর্ব ৩৩