দাহশয্যা পর্ব ৩৩
Raiha Zubair Ripti
জানালা থেকে মাহি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সব টা। সোলেমান রা চলে গেলো। মেহরিন বাড়ির গেটের কাছটায় ছুটে গিয়ে দেখলো গাড়িটার চলে যাওয়া। দৃষ্টি সীমানায় যতদূর দেখা যায়। ততক্ষণ ই দাঁড়িয়ে দেখলো। যেই সীমানার দূরে চলে গেলো সোলেমান রা। তার পরপরই ভেতরে চলে আসলো।
এজওয়ান বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখছিলো মাহি কে৷ এমন ভাবে দেখছে যেন মনে হচ্ছে তার জামাই যাচ্ছে। এজওয়ান গলা ঝেড়ে বলল-
-” আশ্চর্য অন্যের জামাইকে দেখার কি আছে বেয়া’দব? লজ্জা হওয়া উচিত তোমার। আমাকে তো এভাবে দেখো না কখনও। অথচ জামাইয়ের ভাই ভাসুর কে এভাবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছো।
মাহি পেছন ফিরে তাকালো।
-” আপনাকে বিয়ে করার চেয়ে উনাদের দু’জনের মধ্যে কারো সাথে বিয়ে হলে আমি নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। এই ভেবে যে না থাক ওনারা মানুষ হিসাবে তো অন্তত ভালো। কিন্তু আপনি তো মানুষের পর্যায়ে পড়েন না। তাই ফিরেও দেখতে ইচ্ছে করে না।
-” তরিকুলের বেটি বলিস কি! এত সুন্দর ড্যাশিং চেহারা আমার অথচ তোর আমাকে মানুষ মনে হয় না!
-” না হয় না।
-” বেলেহাজ মেয়ে ভাসুর দের বিয়ে করার কথা বলিস জামাইয়ের সামনে। জি’ভ টেনে ছিঁ’ড়ে ফেলবো বলে রাখছি। আমার ভাইজান বিবাহিত। তার বউ আছে যে কি না তোমার থেকেও ভদ্র একজন মেয়ে। আমার ভাই তোমার দিকে ফিরেও তাকাবে না হু।
-” মেয়র সাহেব তো আর বিবাহিত না।
ভ্রু নাচিয়ে বললো মাহি। এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো। দাঁত চেপে বলল-
-” শালি ১২ ভা’তাড়ি।
মাহি এজওয়ান কে আরো রাগান্বিত করার জন্য বলল-
-” মেয়র ইব্রাহিম ভীষণ সুন্দর দেখতে৷ কি সুন্দর আচারণ,কথা বলার ধরণ। চোখের নিষ্প্রভ চাহনি টাও ইশ কি মারাত্মক একদম…
এজওয়ান উঠে এসে মাহির গ’লা চে’পে ধরে দেওয়ালের সাথে মিশিয়ে বলল-
-” একদম রাগাবি না। আমি ব্যতিত সব পুরুষ তোর জন্য হারাম। ওরা তোর ভাসুর লাগে। ভাসুরের মতন রেসপেক্ট দিবি। আমারে জ্বালানোর চেষ্টা করলে একদম শরীরে তোর আ’গুন ধরায় দিব বলে রাখছি।
মাহি বাঁকা হেঁসে বলল-
-” জ্বলে? জ্বলে নাকি? ভাইদের প্রশংসা করায় জ্বলছে?
-” আমার ভাইদের প্রশংসা পৃথিবীর সবাই করবে। কিন্তু তোর মুখে আমার ভাইদের না প্রশংসা শুনতে চাই না দুর্নাম শুনতে চাই। তাই বলছি ১২ ভাঁ’তাড়ি হোস না। এটা তোর সাথে যায় না।
মাহি এজওয়ান কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল-
-” আপনাকে বিয়ে করে যেই পাপ করেছি সেই পাপের কাছে এসব হওয়া কোনো ব্যপারই না। আর হ্যাঁ শুনুন। আপনি আমায় যা যা করতে নিষেধ করবেন আমি ঠিক সেগুলোই করবো।
এজওয়ান একবার মাহির দিকে তাকিয়ে রেগেমেগে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। বসার ঘরে রুমাইসা আফিয়া সুলতান, আনোয়ার সুলতান বসে ছিলো। এজওয়ানের রাগান্বিত মুখ দেখে বলল-
-” কি রে এত রেগে আছিস কেনো?
এজওয়ান দাদার পাশে বসলো।
-” দাদা তুমি দাদিরে হাতের মুঠোয় রাখার জন্য কোন কবিরাজির কাছ থেকে ঔষধ এনে খাওয়াইছিলা?
আনোয়ার সুলতান হতবিহ্বল হলো নাতির মুখে এমন কথা শুনে। হ্যাঁ সে তুলে নিয়ে বিয়ে করেছিল তার বউ কে। তার গাদ্দার শ্বশুর রাজি ছিলো না বিয়েতে। কিন্তু তার বউ তার উপর প্রথম দিকে রেগে থাকলেও পরে গলে গিয়েছিল। তাই আর শেষ পর্যন্ত যায় নি কবিরাজের কাছে।
-” কি হলো বলো।
-” হঠাৎ এ কথা জিজ্ঞেস করছিস কেনো?
-” তোমার নাত বউ কে আমি আমার হাতের মুঠোয় রাখতে চাই। তাড়াতাড়ি কবিরাজের নাম কও।
রুমাইসা ভ্রু কুঁচকালো ভাইয়ের এমন কথা শুনে।
-” বউ হাতে রাখতে চাও তারজন্য কবিরাজের কাছে যেতে হবে কেনো?
-” তাহলে কার কাছে যাব? তোর কাছে?
-” অবশ্যই আমায় জিজ্ঞেস করো আমি বলে দিচ্ছি বউ হাতে রাখার মন্ত্র।
-” বল তাহলে সেই মন্ত্র।
-” প্রতিদিন সকাল বিকেল রাতে তিন বেলা করে বিসমিল্লাহ বলে বউকে চুমু খাবে। এতে সংসারে বরকত বাড়বে। বউয়ের বাধ্য হয়ে চলবে। বউ বামে চলতে বললে বামে যাবে, ডানে বললে ডানে যাবে।
এজওয়ান রুমাইসার কান ধরে টান দিলো। এটা কোথায় বউকে হাত করা হলো? উল্টো সে নিজেই তো বউয়ের কথায় উঠ বস করবে তাহলে।
পাশ থেকে আফিয়া সুলতান রুমাইসা কে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
-” বউ হাতে রাখতে হলে বউকে বউয়ের মতন করে ভালোবাসতে হয়। বউকে বুঝতে হয়। তবেই না বউ হাতের মুঠোয় রাখা যায়।
দুপুরের দিকে একটু ভাতঘুম দিয়েছে মেহরিন৷ কাজের মহিলা চলে এসেছে৷ এখন থেকে সে-ই রান্না করবে। আফিয়া সুলতান বারন করেছে মেহরিন কে।
মাহি আজ দুপুরে গোসল সেরে সেলোয়ার-কামিজ পড়েছে৷ সেলোয়ার-কামিজ টা মূলত রুমাইসার৷ দুপুরের দিকেই আফিয়া সুলতান এসে দিয়ে গেছে। আর বলেছে বাড়ির বউ তুমি৷ এসব পড়াটা ভালো দেখায় না৷ যতদিন আছো রুমাইসার পোশাক পরিধান করবে৷
মাহি কথা না বাড়িয়ে গোসল করে পড়লো। এজওয়ান বাসায় নেই। আনোয়ার সুলতানের সাথে গিয়েছে ক্লাবে। যদিও এজওয়ান সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। তবে বেশ বুঝে রাজনীতির মারপ্যাঁচ। যে ক’টা দিন আছে এখানে সে, চাচা দাদার সাথে সেও দেখভাল করবে। ভাইজান ফোন করে বলে দিয়েছে।
বিকেল হতেই মাহি নিচে নেমে সোজা রান্না ঘরে আসে। আফিয়া সুলতান জিজ্ঞেস করে –
-” কিছু লাগবে তোমার? সকাল থেকে তো খাও নি কিছু।
মাহি পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল-
-” আমি তেমন একটা রান্না বান্না পারি না আন্টি। ডিম অমলেট, কফি,নুডলস এসবই রান্না করতে পারি শুধু। আপনি শিখিয়ে দিলে সবটা শিখতে পারবো।
আফিয়া সুলতান মাহির গালে হাত রাখলো।
-” আস্তেধীরে শিখো কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
মাহি মুচকি হাসলো।
-” আজকের রান্নাটা না হয় আপনি দেখিয়ে দিন সাথে থেকে।
-” আচ্ছা ঠিক আছে। ভাত টা কুকারে বসিয়ে দিয়েছি। তুমি কড়াইতে তেল ঢেলে পেয়াজ মরিচ ঢেলে নাড়াচাড়া করো।
মাহি তাই করলো। আফিয়া সুলতান দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু বলে দিলো। রুইমাছ রান্না করা হলো। সেই সাথে আলু ভাজি আর ডাল।
মাহি রান্না শেষ করে টেবিল সাজালো। শরীর ঘামে ভিজে গেছে। বিরক্ত হলো। ফের উপরে উঠে গোসল সেরে রুমাইসার অন্য অফ হোয়াইটের ভেতর পিংক কালারের সুতির কাজ করা কামিজ টা পড়লো। কাঁধ অব্দি থাকা ছোট স্টেট চুল গুলো কে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে রুম থেকে বের। মেহরিন কে দেখছে না অনেকক্ষণ হলো মাহি। মেয়েটা গেছে কই? কথাটা ভেবেই মাহি মেহরিনের রুমের সামনে যেতেই দেখলো দরজা চাপানো। দরজায় কয়েকবার কড়া নাড়লো। কোনো সাড়া শব্দ নেই। ঢুকা ঠিক হবে কি না ভেবে ঢুকেই পড়লো। দেখলো মাহি জায়নামাজে মোনাজাতে বসেছে। মাগরিবের নামাজ পড়ছে। মাহির হয়তো এই সময়টায় আসাটা ঠিক হয় নি । কথাটা ভেবেই উল্টো ঘুরতেই মেহরিন ডেকে উঠলো-
-” আপু চলে যাচ্ছ কেনো।
মাহি পেছন ফিরলো। মেহরিন জায়নামাজ ভাজ করছে। মেহরিন মুখের দিকে তাকাতেই কিছুটা ভরকে গেলো। সে জাস্ট পোশাক দেখেই ভেবেছে এটা রুমাইসা। তাছাড়া মাহি তো আর এসব পোশাক পড়ে না। মেহরিন হাসার চেষ্টা করে বলল-
-” আপু আপনি! কিছু দরকার?
মাহি হাত কচলাতে কচলাতে বলল-
-” অনেকক্ষণ হলে দেখছিলাম না তোমায় সেজন্য…
-” দাঁড়িয়ে আছেন কেনো বসুন না। আসলে যোহরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে আসরের আগে উঠে আবার নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছিলাম। সেজন্য দেখেন নি।
মেহরিন মাহির হাত ধরে বসালো সোফায়। মাহি বসলো। পাশে মেহরিন ও বসলো। মেহরিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো মাহিকে। ছোট চুল বাঁকা সিঁথি করে একপাশের চুল কানে গুঁজে রাখা। ওড়নাটা গলার সাথে লাগানো। মুখে তেমন সাজসজ্জা নেই। খুব স্নিগ্ধ লাগছে মেহরিনের কাছে। মেহরিন মুচকি হেঁসে বলল-
-” আপু আপনি দেখতে অনেক সুন্দর। স্নিগ্ধ লাগছে আপনায়।
মাহি মুচকি হাসলো এ কথা শুনে। কত বছর পর মাহি আজ বাঙালি মেয়েদের মতন চুড়িদার পড়লো মনে নেই। মেহরিনের থুতনি ধরে বলল-
-” তোমার চেয়ে কমই আমি। তুমি আমার চেয়েও ভীষণ সুন্দর আর বেশি স্নিগ্ধ।
-” কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
-” অবশ্যই।
-” আপনি বাংলাদেশের? না মানে আমি কনফিউজড। আপনি আর ভাইয়া দু’জনেই দেখতে বিদেশি দের মতন। সেদিন প্রথম যেদিন দেখলাম আপনায় আর ভাইয়া কে। বিদেশী দের মতন লেগেছে। কিন্তু বিদেশী রা তো এত সুন্দর বাংলা বলতে পারে না। আপনার বাবা মায়ের মাঝে কি কেউ….
-” হ্যাঁ ঠিক ধরেছো। আমার মা একজন ফ্রান্সের নাগরিক। আমার বড় বোন দেখতে আবার বাঙালি।
-” ভাইয়ার মা ও কি তাহলে বাহিরের দেশের কেউ ছিলো? না মানে চাচা তো বাংলাদেশের ই। উনার ওয়াইফ কে আমি এখনও দেখি নি।
মাহির কপালে দু ভাজ পড়লো৷ আসলেই তো এজওয়ানের মা কি বাহিরের দেশের ছিলো? না-কি বিদেশে এত বছর ধরে থাকার কারনে তাদের মতন হয়ে গিয়েছে।
-” কিছু ভাবছো আপু?
মাহির হুঁশ ফিরে।
-” না না কিছু ভাবছি না। তুমি পড়াশোনা করো?
-” জ্বি উনি গতকাল ভর্তির সব কাজ শেষ করে দিয়ে গেছেন।
-” কিসের ভর্তি?
-” কলেজের।
মাহি চমকালো। কলেজের! মাহি তে ভেবেছিল হয়তো ইন্টারমিডিয়েট টা পাশ করেছে মেহরিন৷
-” তুমি এত ছোট মেহরিন! তোমার তো ১৮ হয় নি তাহলে।
-” হ্যাঁ। আগষ্টের ২৯ তারিখে ১৮ হবে।
-” এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিলো তোমার পরিবার!
-” ছেলে ভালো,পরিবার ভালো। আর ভালো পরিবার পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ পাওয়া। সেজন্য দিয়ে দিয়েছে৷ তাছাড়া গ্রামে তো এর চেয়েও ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়।
-” পড়াশোনা টা কন্টিনিউ করো।
-” জ্বি ইনশাআল্লাহ।
-” আচ্ছা নিচে যাবে তো? চলো যাওয়া যাক এক সাথে।
মাহির সাথে নিচে নেমে আসলো মেহরিন। রুমাইসা তার ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছে।
এজওয়ান সন্ধ্যার আগ দিয়ে বাসায় ফিরে। বসার ঘর পাড় হয়ে যেতেই ঘাড় বাঁকিয়ে একবার সোফায় তাকিয়ে সাথে সাথে মাথা সোজা করে হাঁটতে গিয়ে হুট করে থামিয়ে দিলো হাঁটা। ফের তাকালো সোফার দিকে। হায়হায় এটা স্বপ্ন দেখছে নাকি। তার বেডা ভার্সেস বেডি বউ চুড়িদার পড়েছে! এজওয়ান অবিশ্বাস্য চাহনি নিয়ে সামনে এগিয়ে এসে চোখ ডোলে বলল-
-” আয়হায় আমি কি স্বপ্ন দেখছি এটা! এই মেয়েটা কে রে? কোথা থেকে এলো।
মাহি ফোন টিপছিলো।এজওয়ানের কথায় ফোন টেপা বন্ধ করে তার দিকে তাকালো। বিরক্ত লাগে এই লোক কে দেখলেই।
-” জীবনে মেয়ে দেখেন নি? আশ্চর্য!
-” মেয়ে দেখেছি কিন্তু তোমায় মেয়ে রূপ দেখি নাই৷ আজ দেইখা চোখ দুইটা সার্থক হলো।
মাহি উঠে বাহিরে চলে আসলো। এজওয়ান মাহির যাওয়ার পানে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে রুমে চলে আসলো। এখন একটা লম্বা শাওয়ার নিবে। পড়নের ল্যাদার জ্যাকেট খুলে তারপর ব্লাক জ্যাকেটের নিচে থাকা ব্লাক গেঞ্জি টাও খুলে গোসলে ঢুকলো।
মাহি বাগানে এসে দাঁড়াতেই দেখলো রুমাইসা আসতেছে। মাহি জিজ্ঞেস করলো-
-” কোথায় গিয়েছিলে?
রুমাইসা ভাবিকে দেখে মুচকি হেঁসে বলল-
-” ফ্রেন্ডের বাসায় ভাবি। তুমি এখানে দাঁড়িয়ে যে?
-” এমনি। আসলে তোমাদের বাড়ি টা তো ঘুরে দেখা হয় নি আমার। তাই আসলাম বাগান টায় ঘুরতে।
-” আমি দেখাবো ঘুরে?
-” না না তার দরকার নেই৷ তুমি গিয়ে হাত মুখ ধোও। আমি রুমেই যাব এখন।
রুমাইসা চলে আসলো। রুমাইসার পেছন পেছন মাহিও চলে আসলো। নিজেদের রুমে এসে ফোনটা চার্জ দিয়ে বিছানায় বসতেই ওয়াশরুমের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসলো খালি গায়ে এজওয়ান। পড়নে নিচে শুধু সাদা টাওয়াল। মাহি চোখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখেই সাথে সাথে চোখের উপর হাত দিয়ে জোরে চিৎকার করে বলল-
-” বে’য়াদব অশ্লীল বেডা। এভাবে কেউ বের হয়?
এজওয়ান আয়নায় নিজেকে দেখে বলল-
-” কেনো আমি কি লে’ঙটা হয়ে বের হয়েছি নাকি? আর তাছাড়া বের হলেই বা কি? পর নারীর সামনে এসেছি নাকি? ৩ কবুলের সাথে বকা দেওয়া বউয়ের সামনে এসেছি তাও ঢেকেই।
-” লাজ বিহীন পুরুষ একটা।
-” ঢং বাদ দাও তো মাহি৷ আসো জামাইয়ের শরীরে সরিষার তেল মেখে দাও। দাদার শরীরে দাদিজান আগে মেখে দিত।
-” কেরোসিন তেল থাকলে দিন৷ মাখিয়ে দেই শরীরে।
এজওয়ান সাদা একটা শার্ট পড়ে প্যান্ট পড়লো। মাহি চ্যান লাগানোর শব্দ পেয়েছে। হাত থেকে চোখ টা সরাতেই সামনে এজওয়ান কে তার দিকে ঝুঁকে থাকতে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। এই প্রথম সে নিজেও এজওয়ান কে শার্টে দেখছে। মাহি ভালো করে নজর দিতেই দেখতে পেলো এজওয়ানের গলায় একটা চেন। চেনটা খেয়াল করে একটু নিচে তাকাতেই দেখতে পেলো চেনের নিচটা শার্টের ভেতর দিয়ে ঢোকানো। মাহি ভ্রু কুঁচকালো। এই চেন তো সে আগে কখনও দেখে নি। মাহি জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো এজওয়ান কে। এজওয়ান হেঁসে ফের গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। চুল গুলো কে সুন্দর করে ঠিক করে। শার্টের কলার টা পেছনের দিকে ঠেলে দিলো। মাহি তাকালো আয়নার দিকে৷ এজওয়ানের চেনটা বেরিয়ে এসেছে। মাহি লক্ষ করলো মনে হলো চেনটার নিচে ইংরেজি অক্ষরের বড় হাতের AJ অ্যালফাবেট দিয়ে বাঁধাই করা। মনের ভুল নাকি? যাচাই করার জন্য মাহি এগিয়ে আসলো৷ হঠাৎ করে এজওয়ান মাহি কে এগিয়ে আসতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো।
-” আরে জামাই দেখে ক্রাশ খেয়ে গেলে নাকি?
মাহি এজওয়ানের কথাটাকে পাত্তা না দিয়ে এজওয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে গভীর ভাবে মনোযোগ দিয়ে দেখলো চেনাটা। না ঠিকই দেখেছে৷ চেনের নিচে AJ লেখা। মাহি চুপচাপ চলে গেলো রুম থেকে।
এজওয়ান মাহির যাওয়া দেখলো। এর আবার কি হলো? চেনটা শার্টের ভেতর ঢুকিয়ে ফোনটা নিয়ে বেলকনিতে গেলো।
সন্ধ্যার পরপরই সুলতান নিবাসে এসে পৌঁছায় সোলেমানরা। ইব্রাহিম ও এসেছে। আসার পথে রাতের খাবার টাও সাথে নিয়ে এসেছে। রান্নার ম্যেড নেই বাড়িতে। সোলেমান বাসায় ঢুকেই আগে লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে হাল্কা হয়। পড়নে এখন অফ হোয়াইট টাউজার আর ব্লাক টি-শার্ট। মাথার চুল গুলো ভালো মতো মুছেই গলা ছেড়ে -” মেহরিম এক কাপ কফি নিয়ে আসো তো” কথাটা বলতে গিয়ে থেমে গেলো। মনে পড়লো সে এখন সুলতান নিবাসে। মন টা কেমন করে উঠলো।
ইব্রাহিম সোলেমানের রুমের দিকে আসছিলো। সোলেমান কে বিছানার সামনে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল-
-” কিরে কি ভাবছিস এভাবে দাঁড়িয়ে?
সোলেমান পেছন ফিরলো। ভেজা টাওয়াল টা চেয়ারে ছুঁড়ে ফেলে বলল-
-” কিছু না।
ইব্রাহিম এগিয়ে আসলো। সোলেমানের কাঁধে হাত রেখে বলল-
-” বউ কে মনে পড়ছে নাকি? আর ক’টা দিন থেকে আসতি তাহলে। আমি এদিক টা সামলে নিতাম।
-” তুই পারবি না বলেই আমার আসা৷
-” আচ্ছা শোন।
-” বল শুনছি।
-” আসার সময় মেহরিনের চোখ মুখে স্পষ্ট দেখতে পেলাম তোর চলে আসায় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলো।
-” কষ্ট তো পেয়েছেই।
-” ভীষণ ম্যাচিউর তোর বউ টা।
-” হুমম। সাথে লক্ষী-ও।
-” তুই কখনও মেহরিন কে কষ্ট দিস না সোলেমান।
-” মেহরিন কে কি ডিভোর্স দিয়ে দিব তাহলে ইব্রাহিম?
ইব্রাহিম কিছুটা চমকালো। সে কখন বললো ডিভোর্সের কথা। সে তো বললো কষ্ট না দিতে।
-” আমি ডিভোর্সের কথা বলি নি সোলেমান।
-” আমার সাথে থাকলে কষ্ট তো পাবেই।
-” তাই বলে ডিভোর্স! তুই নিজেই তো বলিস সুলতান পরিবারের ছেলেদের বিয়ে একবার হয় তাহলে?
-” আমি কখন বললাম মেহরিন কে ছেড়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করবো?
-” তুই ভীষণ রং বদলাতে পারিস সোলেমান। মেহরিনের সামনে এক রকম,আর আমাদের সামনে আরেক রকম।
-” তাহলে কি বউয়ের সামনে শ’য়তানের রূপ প্রকাশ করবো আমি?
-” সেটা কখন বললাম।
দাহশয্যা পর্ব ৩২
-” নিজের বয়সের থেকেও বেশি খু’ন করা এই নওয়াজ সোলেমান সুলতান সবার সামনে শ’য়তানের রূপ প্রকাশ করলেও এই মেয়ের কাছে গিয়ে আমি কি করে যেন একদম মাসুম বাচ্চা সেজে যাই ভাই। বুঝি না কি যে হয় আমার তখন৷ যে হাত দিয়ে অবলীলায় মানুষ খু’ন করি, সেই হাতই মেহরিনের গায়ে ছোঁয়া লাগতেই তুলোর মতো কোমল হয়ে পড়ে। মাইরি, মেহরিনের মাঝে কিছু একটা আছে। এমন কিছু, যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। ও সামনে থাকলে শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। মেহরিনের সঙ্গে থাকলে দুনিয়ার হিসাব-নিকাশ সব ভুলে যাই। মেয়েটাকে বুকে নিলে কি যে প্রশান্তি লাগে। এই প্রশান্তি আর মানু’ষ খুন করার মাঝে যেই প্রশান্তি পাই দুটোই সেম রে।
