দাহশয্যা পর্ব ৩৪
Raiha Zubair Ripti
১৪ই আগস্টের রাত পোহালেই ১৫ আগস্ট মুজিব সাহেবের মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিবছর তার জন্মদিন,মৃত্যুবাষির্কীতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে যেসব হাইফাই অনুষ্ঠান হয়, তার কোনো মানে আছে কি না সেটা প্রশ্নের মধ্যেই থাকে।
সোলেমান বেশ বিরক্ত হয় এই দিনগুলোতে। একমাত্র বংশের ধারায় এই রাজনীতি মিশে আছে সেজন্য এই রাজনীতি তার নেশা হলেও এসব দিন গুলো তে মুজিব নিয়ে আদিখ্যেতা দেখাতে তার বেশ অনিহা। আওয়ামী লীগের পতন হলে তার নিজেরও পতন ঘটবে। সেজন্য সে চায় তার দল এগিয়ে যাক৷ আওয়ামী লীগ আর যাই করুক তার দলের ভেতরে থেকে অন্তত বিশ্বাসঘাতকতা করে না । মানে মা’ইর গু’তা খেলেও নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সাথেই লেগেই থাকে৷
বেশ বিরক্ত নিয়েই পকেট থেকে ফোনটা বের করে সোলেমান ইব্রাহিম কে কল লাগালো।
ইব্রাহিম স্টাডি রুমে বসে ছিলো। সোলেমানের ফোন পেয়ে ফোন টা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-
-” হ্যাঁ বল।
-” ১৫ আগস্টের জন্য স্ক্রিপ্ট রেডি করিস তো ভাই। আমার মন থেকে কিছুই আসতেছে না। বানিয়ে বানিয়ে বলার মানুষ ও আমি নই। দেখা যাবে মাইক নিয়ে কথা বলতে বলতে এক সময় জয় বাংলা বলার সময় বলে ফেললাম আলহামদুলিল্লাহ তখন ভাই পুরাই কট খেয়ে যাব আমি।
ইব্রাহিম শব্দ করে গা দুলিয়ে হাসলো। এই ছেলেটা এত বিরক্ত এই দুটো মানুষের উপর। অথচ এই ছেলেই কিন্তু এই দলের লোক।
-” চিন্তা করিস না। স্পেশাল স্ক্রিপ্ট রেডি করে দিব তোর জন্য। লিখেই পাঠাচ্ছি।
-” হ্যাঁ ভাই পাঠা। অতিরিক্ত আবার পাম দিয়ে ভরিয়ে ফেলিস না। আবার শুকনোও রাখিস না৷ হাল্কা পাতলা শোক রাখিস।
-” ওকে,রাখছি তাহলে।
ইব্রাহিম ফোন টা কেটে ফটাফট কিছু টাইপ করে সোলেমানের ফোনে পাঠালো। সোলেমান ওপেন করে দেখলো ইব্রাহিম টাইপ করে স্ক্রিপ্ট পাঠিয়েছে-
-” আজ এই দুঃখের পাহাড় কাঁধে নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হইলাম আমি নওয়াজ সোলেমান সুলতান। আপনার আমার জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম ( আঃ) হলেও এদেশে কে জাতির পিতা, সেটা আপনারা জানেন। শেখের বাড়ি থেকে বানানো একমাত্র ফ্যাদার অব দ্য ন্যাশন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব। আপনিও পিতা বলেন আপনার বাপও পিতা বলে আপনার বাচ্চারা এমনকি আপনার নাতি নাতনিরাও তাকে পিতা বলে ডাকে। পুরো গুষ্টি তখন পিতাময় হয়ে যায়।
টিভি খুললে পিতা ব্যানারে,প্রেস ক্লাবের পোলাওতেও পিতার ঘ্রাণ। মনে হয়, জাতি একটা বিরাট পিতাতন্ত্রে বাস করছি।
সেই পিতার আজ মৃত্যু বার্ষিকী। অন্তর ফেটে যাচ্ছে নিশ্চয়ই আপনার। হ্যাঁ ফেটে যাওয়ার ই কথা। ফাটে নাই? তাহলে অন্তরটা আবার চেক করে নেন ভাই।
প্রতিবছর আমরা একই কথা রিপিট করি।
আমরা শোকাহত। শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করি। তাঁর আদর্শে দেশ গড়ি। রিপিট না করলে চলবে ক্যামনে? এতো বড় দেশ, কথা তো ঘুরেফিরেই আসে।
বাকি বছর? পিতার কথা গিলে পেট ভরাই। আদর্শ? ওটা আলমারিতে তালাবন্ধ।
তাও আজকে শোক দিবস, কিছু বলতেই হয়।
তাই আপনাদের জন্য ১৫ আগস্ট চেকলিস্ট দিয়া যাই—
১৫ আগস্ট মানেই, অবশ্যই ফেসবুকে দুইটা পোস্ট দিবেন, ছবির ফ্রেম বদলাইবেন, কালা পোশাক পড়ে শোক পালন করবেন। আর অন্তত একবার হলেও শোকাবহ আগস্ট বলে একটা ক্যাপশন আপলোড দিবেন। পোস্ট না দিলে আবার আপনি কিন্তু দেশপ্রেমিকই না!
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু! আসছে বছর আবার হবে এই সেম ভাষণ রিপিট করা। ততদিন সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন, আল্লাহ হাফেজ৷
সোলেমান পুরোটা পড়ে হাফ ছাড়লো৷ ভয়েস টা অন করে সোলেমান পাঠালো-
-” সেই হইছে সেই৷ লেখাটা পড়ে অনেক খুশি হইছি এত খুশি হইছি যে খুশির ঠেলায় ইচ্ছে করতেছে নিউ মার্কেটের সামনে বসা ভ্যান থেকে তোরে একটা পিংক কালারের আন্ডারওয়্যার কিনে দিতে শা’লা।
ইব্রাহিম ভয়েস টা পড়ে শব্দ করে হাসে। সোলেমান সব চিন্তা এক সাইডে রেখে বিছানায় হাত পা মেলে দিয়ে শুয়ে পড়লো। এই রাত টা না কাটুক। ১৫ তারিখটার বদলে ১৬ তারিখ আসুক। রঙ তামাশা করতে একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু চাইলেই কি আর সম্ভব নাকি? রাত পেরিয়ে চলেই আসলো ১৫ই আগষ্ট।
চারিদিকে মাইকে বাজতে লাগলো-
-” যদি রাত পোহালে শোনা যেত..
বঙ্গবন্ধু মরে নাই।
যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো
বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই…
মুক্তি চাই…মুক্তি চাই…
তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা,
আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা…
সোলেমান ঘুমন্ত অবস্থায় কান চেপে ধরলো। বিছনা থেকে উঠে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে বলল-
-” সাতসকালে কে বাজাচ্ছিস গান? বন্ধ কর বলছি৷ কানটা খেয়ে দিচ্ছিস শালার ব্যাটারা।
বাহির থেকে শফিক ভেতরে ঢুকলো।
-” স্যার বড় সাহেব বাজাচ্ছে। আজ তো ১৫ই আগস্ট।
সোলেমান বাগানে আসলো। বড় বড় দুটো কালো বক্সে গান টা বাজছে আর বাশার সুলতান চেয়ারে বসে গা দুলিয়ে বক্সের সাথে সাথে গাইছে। সোলেমান এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়িয়ে বলল-
-” বন্ধ করো বলছি গান। তোমার শুনতে ইচ্ছে করলে হেডফোন লাগিয়ে শুনো৷ আমাদের ডিস্টার্ব করছো কেনো?
বাশার সুলতান গান বন্ধ করে দিলো।
-” আশ্চর্য গান না বাজালে হয় নাকি?
-” একদম বাজাবে না৷ বাহিরে গিয়ে বাজাও। বিরক্ত হচ্ছি আমি।
-” গান শুনেই বিরক্ত? তাহলে সভায় গিয়ে কি করবি?
-” তোমরা কেঁদে কেঁদে ভাষণ দিবে আর আমি ট্যিসু এগিয়ে দিব।
সোলেমান রুমে ফিরে শাওয়ার নিয়ে কালো কালারের পাঞ্জাবি পড়ে নেয়। চুল গুলো ঠিকঠাক করে শরীরে তার পছন্দের সেই শুমুখ পারফিউম টা লাগিয়ে রুম থেকে বের হয়। ব্রেকফাস্ট টা ধীরেসুস্থে করে নেয়। তারপর রিমোট টা নিয়ে টিভি ছাড়তেই ভেসে উঠে নেত্রীর ভাষণ।
ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার না হলেও, দিনভিত্তিক নির্ধারিত সময়ে প্রচার হয়। কোথা থেকে দেন, সেটি নির্দিষ্টভাবে গণমাধ্যমে সব সময় উল্লেখ থাকে না, তবে বেশিরভাগ সময় গণভবনের কোনো কনফারেন্স রুমেই সেটআপ করা হয়।
তিনি ভাষণে বলছেন-
-” ১৫ আগস্ট শুধু আওয়ামী লীগের শোক নয়, পুরো জাতির শোক। খু’নিরা আমার বাবা ও আমার পরিবারের সকল কে এই দিনে নির্মম ভাবে হ’ত্যা করে। বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করাই ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য। আমার বাবার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে হবে, যাতে দেশের কোনো মানুষ দরিদ্র না থাকে। শোককে শক্তিতে পরিণত করুন।
বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা করে বলেন-যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তারা এখনো ষড়যন্ত্র করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, উন্নয়ন, এবং গণতন্ত্রের কথা বলেন। ভাষণের শেষে বলেন, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। মাঝখানে বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে আরো অনেক কথাই বলেছেন। সোলেমান টিভিটা বন্ধ করে দিলো। সারাদিন টিভিতে এটা এখন একি রন বাজা বাজে ঘন ঘন-র মতো চলতেই থাকবে৷
বাশার সুলতান ছেলেপেলে দের দিয়ে সব ব্যবস্থা করিয়ে রেখেছেন। ইব্রাহিম আসতেই সোলেমান বাশার সুলতান বেরিয়ে পড়ে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে মানুষের ভিড়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে। চারপাশে কালো ব্যানার। বাশার সুলতান সাথে সোলেমান ইব্রাহিম ও ফুল দিয়ে এসেছে। বাশার সুলতান ইব্রাহিম কে বলল-
-” একটু এঙ্গেল থেকে তুলো, যেন ফুল দেওয়ার ছবিটা ভালো আসে সোলেমানের।
তারপর তারা রমনা চলে আসে। এখানে মস্ত বড়ো একটা স্টেজ বানানো হয়েছে। প্রায় সব এমপি রা এসেছে। মানুষের সমাগমে ভোরে গেছে রমনা৷
ঢাকা-১৩, ঢাকা-৯, ঢাকা-৫,ঢাকা-১০ আসনের এমপিরা এসেছেন।
মাইক্রোফোন হাতে এগিয়ে যান ঢাকা ১৩ আসনের এমপি । গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে থাকেন-
সোলেমানের পেট ফেটে হাসি বেড়িয়ে আসছে। এত বড় গরুর রচনা! অথচ আশেপাশের সকলের চোখে জল। ইব্রাহিম হাত চেপে বলল-
-” কন্ট্রোল ভাই কন্ট্রোল।
সোলেমান ট্যিসু নিয়ে মুখ চেপে ধরলো। ঢাকা ১৩ আসনের সেই এমপি এসে সোলেমানের পাশে বসে সাংবাদিকদের ডেকে বলতে লাগলো-
-” ঠিকমতো ভিডিও করছো তো? ভিডিওটা ঠিকঠাক ফেসবুকে আর চ্যানেলে দিবে। নেত্রী যেন দেখে, আমি কেমন বক্তৃতা দিয়েছি।
সোলেমান তপ্ত শ্বাস ফেললো। এবার তার পালা।সোলেমান মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে চারপাশে তাকালেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-
-” আজকের দিনটা দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিনে অনেক বড় একটা ঘটনা ঘটেছিল, যা দুঃখজনক।
আমাদের জন্য শোকের দিন, সবাই বলেই দিয়েছে আজকের দিনে কি ঘটেছিল। আমার বলার জন্য আর কিছু বাকি নেই।
তবে আমার মনে হয়, শুধু শোক পালন করলেই হবে না। দেশের মানুষ যেন ভালো থাকে, দেশের উন্নয়ন যেন থেমে না যায়,এটাই আসল কথা।সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। ধন্যবাদ।
জয় বাংলা।
মাইক্রোফোন নামিয়ে সোলেমান সরে যায়। খুবই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখে। রচনা বলার কোনো মানে হয়? জাতি জন্মের পর থেকেই শুনে আসতেছে এসব কথা।
বিকেল অব্দি চললো এসব। খাওয়াদাওয়াও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সোলেমান খেয়ে দেয়ে চলে আসে। বাসায় ফিরে আগে শরীর থেকে শোকের পোশাক খুলে সাদা পাঞ্জাবি পড়ে নেয়। আহ্ এখন কি শান্তি।
মহাদেবপুরের সুলতানপুরেও মোটামুটি রকমের শোক পালন করেছে আমিরুল সুলতান রা। শোক পালন শেষেই সন্ধ্যার দিকে একটা শালিসি বসে সুলতান ভিলার বাগানে।
পাশের গ্রাম তাতারপুরের শ্রীকান্ত দাসের মেয়ে মুনি পালিয়ে এসেছে সুলতানপুরের মন্টু মিয়ার ছেলে মিলনের সাথে। মেয়েটা হিন্দু পরিবারের। অথচ ছেলেটা মুসলিম। এদের বিয়ে দেওয়া এক প্রকার অসম্ভব।
উপরে ঘরের জানালা থেকে মাহি, মেহরিন, রুমাইসাও সব দেখছে। নিচে নামা তাদের নিষেধ। আনোয়ার সুলতান আর আমিরুল সুলতান ছেলে-মেয়েকে একবারে চেয়ে দেখলেন। দুই পরিবারের বাবা-মাও উপস্থিত সেখানে।
মেয়ের বাবা শ্রীকান্ত দাস সাফ জানিয়ে দিলেন-
-” কোনো মতেই এই ছেলের সাথে মুনির বিয়ে হবে না। অসম্ভব! আমাদের ধর্মে এ পাপের কোনো স্থান নেই। দরকার পড়লে মুনিকে মেরে ফেলব, তবু এমন পাপ করব না।
ভালোবাসা কি আর পাপ-পুণ্যের হিসাব মানে?
ছেলের বাবাও সেম। কিন্তু ছেলেমেয়ে তারা বিয়ে করবেই। ছেলে একসময় বলেই ফেললো সে দরকার পড়লে ধর্ম ত্যাগ করবে৷ কথাটা কানে আসতেই আনোয়ার সুলতান আমিরুল সুলতান সহ সকলে নাউজুবিল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে থুথু ছিটালো। ছি ছি কত বড় ফেরাউন হলে এই কথাটা বলে। এ তো মুসলিম হিসাবে কলঙ্ক। এজওয়ান মূহুর্তে উঠে গিয়ে চ’ড় থা’প্পড় মে’রে আসলো ইচ্ছে মতো। আনোয়ার সুলতান বলে উঠলো-
-” এই ছেলেকে চ’ড়িয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হোক। এর মতন ছেলেরা মুসলিম দের জন্য কলঙ্ক। কত বড় সাহস এক মাইয়ার জন্য নাকি সে তার ধর্ম ত্যাগ করবে! বা’ইড়াইয়া মা’ইরা ফেলা উচিত গো’লামের বাচ্চা রে। আল্লাহর ভয় কি এই শু’য়োরের বাচ্চার মনে একটুও নাই? কত বড় পাপা করলো হা’রামজাদা জানে? ভালোবাসায় অন্ধ হইয়া গেছে! মন্টু এই পোলা সাথে রাইখো না নিজের। তাইলে তোমারে আমি ভিটে ছাড়া করবো বলে রাখলাম।
মন্টু মিয়াও হতবাক ছেলের এমন কথা শুনে। মুসলিম হয়ে জন্ম নেওয়াটা কত বড় ভাগ্যের এই পুলা বুঝলো না! ছি এই কাফের কে সে জন্ম দিছে!
-” আপনি যা ভালো মনে করেন চাচা তাই করেন। এই পোলারে আমি ত্যাজ্য করলাম এখন থেকে আপনাগো সামনে দাঁড়াইয়া৷ এর মতন পোলা না থাকলে কিচ্ছু হইবো না আমাগো।
আমিরুল সুলতান বাবাকে থামিয়ে দিয়ে মিলনের দিকে এগিয়ে গেলো। রাগ তার যে কম হচ্ছে না এমনটাও না। তবে তার চেয়ে বেশি করুনা হচ্ছে ছেলেটার জন্য৷ কিভাবে বলতে পারলো সে ধর্ম ত্যাগ করে দিবে তাও আবার একটা মেয়ের জন্য!
এবার আমিরুল সুলতান মিলনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুখটা কাছে নিয়ে বললেন-
-” তুই কি জানিস, ধর্ম ত্যাগ করা মানে কী? যে বা যারা ঈমানের পর কুফরী করে, তার সব আমল দুনিয়া-আখিরাতে বৃথা। এবং তারা জাহান্নামের অধিবাসী।
ভালোবাসা যদি তোরে আল্লাহর অবাধ্য করে, সেই ভালোবাসা শয়তানের ফাঁদ। তুই ভাবতেছিস মুনিরে বিয়া করলেই সব মিলে যাবে? শোন, ইসলামে মুসলমান পোলার হিন্দু মাইয়ারে বিয়া করার কোনো জায়গা নাই। যদি মাইয়া ইসলাম কবুল না করে, তাহলে এই বিয়া হারাম।
আর তুই যদি নিজের ধর্ম ত্যাগ করিস, তুই মুরতাদ হবি। জানিস মুরতাদির শাস্তি কী? রাসুল (সা.) বলেছেন—যে তার দ্বীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো।
কিন্তু এই শাস্তি দেওয়া কোনো ব্যক্তির কাজ না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র তা করে না। তবে তার চাইতে বড় ভয় কী জানিস? তুই যদি আল্লাহরে ত্যাগ করিস, আল্লাহ তোরে ত্যাগ করবে। তখন তোর কোনো আমল, কোনো ভালো কাজ আল্লাহ কবুল করবে না। কবরের আজাব, কিয়ামতের শাস্তি তোর জন্য তৈরি।
মুনিরে বিয়া করতে চাস ভালো কথা, কিন্তু ধর্মের জন্য জীবন দিতে পারিস না অথচ এক মাইয়ার জন্য ধর্ম ত্যাগ করার কথা বলিস! এই কথা কইলে তুই কুফরি করিস। কোনো মাইয়া আল্লাহর চেয়ে বড় না।
শোন মিলন, তোর জীবনের বড় পরিচয় হইল তুই মুসলমান। আল্লাহ তোফা করে তোরে বানাইছে মুসলিম। কোনো মাইয়া এই পরিচয়ের বড় না। তুই যা করতে পারিস, তা হইল আল্লাহর কাছে তাওবা করা। আল্লাহর কাছে কাঁদিস, মাফ চা। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
আল্লাহর রাস্তা ছাড়িস না। আল্লাহর জন্য মুনিরে ভুলে যা। তুই যদি আল্লাহরে ধরিস, আল্লাহ তোর জন্য এমন কাউরে পাঠাবে, যে তোর কদর বুঝবে।
আনোয়ার সুলতান মাইয়ারে জিজ্ঞেস করলো-
-” তুমি হইতে পারবা মুসলিম?
মুনি কিছু বলার আগেই শ্রীকান্ত দাস বলল-
-” ভাইব্বা চিন্তা বলিস মুনি। ঐ পুলা নিজের ধর্ম মানে না বইলা এমন কথা বলতেছে৷ তুই কি মানিস না নিজের ধর্ম? ভগবানের ভয় কর মুনি। এই পাপ তুই করিস না।
মেয়েটা অস্বীকার করলো। সে তার ধর্ম ছাড়তে পারবে না। আনোয়ার সুলতান শ্রীকান্ত দাস কে বলল-
-” মাইয়া নিয়ে যাও চোখের সামনে থেকে৷ নিয়া তোমাদের ধর্মের কারোর সাথে অতিশীঘ্র মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করো। আমাগো গ্রামের পুলারে আমরা দেখতেছি।
মেয়ে নিয়ে চলে গেলো তারা। মন্টুর ছেলে মিলন ওরে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করছে মুনির চলে যাওয়া নিয়ে। আনোয়ার সুলতান রেগে বলল-
-“ছোকরা কে ধরে কেউ তুলে আ’ছাড় মেরে ফেলে দে তো৷ প্যানপ্যান বন্ধ হোক৷ ভালোবাসায় ধর্ম ভুলে গেছে গোলামের বাচ্চা। ওরে পি’টাইয়া র’ক্তাক্ত করে গ্রাম ছেড়ে বের করে দে তোরা।
ছেলে এখনও মুনি মুনি করতেছে৷ চিৎকার করে বলতেছে আমি মুনিরে ছাড়া বাঁচবো না। তুই কি শুনলি না, মুনি তোর লগে থাকতে চায় না ধর্ম পাল্টে । সে নিজের ধর্ম ছাড়তে পারবে না। তুই আর কিসের লাইগা আল্লাহরে ত্যাগ করবি? তুই কি চাইস, দুনিয়ার কয়েক দিনের ভালোবাসার লাইগা চিরকালের জাহান্নাম বেছে নিতে?
এজওয়ান রেগে ছেলেপেলের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? বাঁচতে চাইতেছে না ছেলে নিজে থেকেই৷ মে’রে হাত পা ভেঙে এলাকার বাহিরে ফেলে দিয়ে আয়। জা’নোয়ারের বাচ্চার ভালোবাসা মাথা থেকে নেমে যাবে। প্রেম করবি ভালো কথা ধর্ম দেখে নিবি না শালার ব্যাটা।
মেহরিনের রাগ হয়েছিল শুধু রাগ না প্রচণ্ড ঘৃণা হচ্ছিল যখন ছেলেটা বলল সে ধর্ম ত্যাগ করবে৷ ছেলেটা যদি বুঝতো তার এই ধর্ম ত্যাগ করার কথাটা বলা মানে কি এর পরিনাম কতটা ভয়াবহ তাহলে ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালাতো। আসলেই ভালোবাসা মানুষকে পাগল বানিয়ে ফেলে। মানুষ ভালোবেসেই পাগল হয়। তার জলজ্যান্ত প্রমান এই ছেলেটা৷ পাগল না হলে এত বড় পাপ সে করে?
মন্টু মিয়া আর তার বউ অঝোরে কান্না করছে। কিন্তু কি আর করার। এমন কলঙ্ক তারা জন্ম দিয়েছিল! এক মাইয়ার জন্য সব ভুলে গেলো!
আমিরুল সুলতান ছেলেদের হাত উঁচু করে থামিয়ে দিলো।
-” কেউ মা’রবে না। মা’রলেই সব ঠিক ঠিক হয়ে যাবে না। মিলন দেখলি তো মেয়ে তার ধর্ম ত্যাগ করতে পারবে না। তাহলে তুই কিসের জন্য নিজের ধর্ম ত্যাগ করবি বল তো? আল্লাহর চেয়ে বড় কেউ হয় না রে। শয়তানের ফাঁদে পড়েছিস তুই। বেরিয়ে আয়। তোর জন্মদাতা বাপ মায়ের কথা ভাববি না? দেখ কাঁদছে কেমন করে। আল্লাহর ভয় কর। একটু ভাব জাহান্নামের সেই সকল শাস্তির কথা। জাহান্নামের আগুন কোনো খেলনা না। যারা কুফর করে, তাদের জন্য আগুনের শাস্তি রয়েছে,তাদের চামড়া যখনই পুড়ে যাবে, আমরা তাদের পরিবর্তে নতুন চামড়া সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি উপভোগ করতে পারে।
তুই ভাবতে পারিস, নিজের দেহ পুড়তেছে, আবার তৈরি হচ্ছে? আর তাতে আবার আগুনের শাস্তি নতুন করে শুরু হচ্ছে? তুই কি পারবি সহ্য করতে, সেই আগুনের স্ফুলিঙ্গ, যা পাথর পর্যন্ত গলিয়ে ফেলে? আল্লাহ আরো বলেছেন—
“জাহান্নামের ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। সেখানে মানুষের দেহ থেকে এমন দুর্গন্ধ বের হবে, যা কবরের পচা মৃতদেহের থেকেও ভয়ঙ্কর। আগুনের শিখা হবে কালো, যার তাপ পৃথিবীর আগুনের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি।
আল্লাহর ভয় কর। কল্পনা কর, জাহান্নামের সেই শিকল, যা মানুষের গলায় ঢুকিয়ে পা দিয়ে বের করা হবে। খেজুরের কাঁটার মতো লোহার আঁকশি দিয়ে টানা হবে চেহারার মাংস।
তাদের শাস্তি কখনো লাঘব করা হবে না। তারা সেই আগুনের মধ্যে চিরকাল থাকবে।
তাই বলছি সময় থাকতে তাওবা কর। আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইস না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।
মিলন আমিরুল সুলতানের পা ধরে এবার আরো জোরে চিৎকার করে কান্না করতে লাগলো। কত বড় পাপিষ্ঠ সে! সে তার আল্লাহ কে ছেড়ে দিতে চাইছিলো!
আমিরুল সুলতান মন্টু মিয়া কে বললেন-
-” ছেলেকে নিয়ে বাড়ি যাও মন্টু। বকো না। বুঝিয়ে ইসলাম সম্পর্কে আরো জানাও। যাওয়ার পথে অবশ্যই হুজুরের সাথে দেখা করিয়ে নিয়ে যাবে ছেলেকে। কলেমা পড়াবে। এখন আসো।
ছেলেকে নিয়ে চলে গেলো মন্টু মিয়া। মেহরিন অবাক হয়ে দেখলো শ্বশুর কে। কি সুন্দর ভাবে সমাধান করে দিলো বিষয় টা। সবার আগে আল্লাহ কে ভালোবাসা উচিত।
মাহিও বেশ অবাক হলো।
রাতে ডিনার শেষে সোলেমান ফোন করলো বাবা আমিরুল সুলতান কে৷ কানে এসেছে আজ ভিলায় নাকি শালিসি বসেছিলো। আমিরুল সুলতান সবটা খুলে বলল। সোলেমান শুনলো সবটা। তারপর জিজ্ঞেস করলো-
-” মেহরিন আছে আশেপাশে?
আমিরুল সুলতান বললেন-
-” ঘুমাতে গিয়েছে। কথা বলবি? রুমাইসাকে দিয়ে ফোনটা পাঠাবো?
-” না থাক ঘুমাক। কাল একটা ফোন পাঠাচ্ছি। তোমার বউমাকে দিও সেটা।
-” আচ্ছা ঠিক আছে। আজ ভালো ছিলো দিনটা?
-” হ্যাঁ খুব ভালো ছিলো। ভালোর ঠেলায় আর কিছুই ভালো লাগছে না। রাখি তাহলে। আর হ্যাঁ তোমার বুড়ো বাপ কে পেশারের ঔষধ খাইতে বইলো। এত অল্পতে পেশার উঠে যায় কেনো? সব কিছু হম্বিতম্বি করে হয় না।
এজওয়ান রুমে এসে সটান হয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। মাহি তাকিয়ে দেখলো বিছানার অর্ধেক টার বেশিই দখল করে নিয়েছে। মাহি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পাশ থেকে বালিশ টা নিয়ে লাইট নিভিয়ে সোফায় এসে শুয়ে পড়লো। তর্কাতর্কি করার মুড নেই এখন।
খানিক টা চোখ লেগে আসতেই মাহি অনুভব করলো কেউ তাকে শূন্যে তুলে হাঁটছে। বাহির থেকে আসা আলোয় দেখতে পেলো এজওয়ান তাকে পাঁজা কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছে। মাহি উঠার চেষ্টা করলে এজওয়ান মাহির দু হাত চেপে ধরে বলল-
-” একদম চেঁচামেচি করবে না রাতে। বিষয় টা ভালো দেখায় না৷
মাহি দাঁত চেপে বলল-
-” এখানে নিয়ে আসলেন কেনো আমায়? এক বিছানায় শোয়া সম্ভব নয়।
এজওয়ান মাহির পাশে শুয়ে মাঝখানে একটা কোল বালিশ রেখে দিয়ে বলল-
-” এখন তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। ডোন্ট ওয়ারি বালিশের নড়চড় হবে না।
এজওয়ান পাশ ফিরে ঘুমালো। মাহি বেলকনির দিয়ে মুখ করে ঘুমালো। দু’জনের মুখ দু’দিকে।
দোতলা, লাল ইটের তৈরি বাড়িটার ছাদের কিনারায় শেওলাঝাঁঝা জমে আছে। লম্বা বারান্দার গ্রিলগুলো ধূসর মরিচায় ক্ষয়ে গেছে, যেন সময়ের ভার সইতে না পেরে ঝুলছে। ঘরের ভেতর টানা করিডোর, করিডোরের মেঝেতে কালো-সাদা মার্বেলের আড়ম্বর। দেয়ালে বড় বড় কাঠের আলমারি, যার কাচের ভেতর শোকেসে সাজানো পুরনো পুতুল আর ধুলো ধূসর ছবি।
চারদিক নির্জন, অথচ হাওয়ার ফুঁসে ওঠা জানালার কপাটে যেন শরীর কেঁপে উঠে। মেহরিন আলতো হাতে জানালা টা বন্ধ করে দিলো। পড়নে তার সাদা রঙের শাড়ি।
আকস্মিক এই শূণ্য বাড়িতে অতি ক্ষীণ, চিকন কণ্ঠের কান্না ভেসে আসে।
মেহরিনের বুকের ভেতরে ধড়ফড় শুরু হয় সে আওয়াজ শুনে৷ এ কান্না কোনো বাচ্চার কান্না৷ কিন্তু বাচ্চা আসবে কোথা থেকে? মেহরিন আশেপাশে তাকায়। কান্নার শব্দে তার বুকের ভেতর টা পু’ড়ে উঠছো। আশ্চর্য তার বুক পুড়ছে কেনো?
সে দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটে যায় এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। পাগলের মতন আলমারির দরজা খোলে, পর্দা সরায়, বারান্দা ঘুরে আসে। কিন্তু কোথাও নেই সেই কান্নার উৎস।
কান্নার আওয়াজ যেন আরও কাছে চলে আসে, আরেকটু স্পষ্ট।
মেহরিন থমকে দাঁড়ায় এক লম্বা, ভারী পর্দার সামনে। পর্দার ফাঁক দিয়ে শীতল বাতাস বয়ে আসছে।
কাঁপা কাঁপা হাতে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেয় সেই পর্দা।
দুটো ছোট্ট শিশু মেঝেতে শুয়ে কাঁদছে। সাদা চাদরে মোড়ানো তাদের ছোট ছোট শরীর। মুখটা স্পষ্ট নয়। কেবল দুটো ছোট হাত চাদরের বাইরে বের হয়ে আছে। হাত পা নাড়িয়ে কাঁদছে।
মেহরিনের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। ইশ বাচ্চাগুলো কার? এভাবে শুইয়ে রেখেছে কেনো ফ্লোরে? ওদের বাবা মা কোথায়? কি নিষ্ঠুর বাবা মা এদের। মেহরিনের বড্ড মায়া হয়৷ হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায়। কিন্তু একপা এগিয়ে আসতেই বাচ্চা দুটো ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। মেহরিন থমকে দাঁড়িয়ে পরে। ফের শুনতে পায় বাচ্চার কান্না। পাশ ফিরতেই দেখে তার পাশেই বাচ্চা দুটো শুয়ে আছে৷ আশ্চর্য মুখ দেখা যায় না। মেহরিন হাত বাড়ায়। ছুঁতে পারে না। এবার কোথা থেকে যেন দুটো হাত এসে বাচ্চা দুটোকে তুলে নিয়ে হাওয়ায় ভাসত ভাসতে উপরে উঠে চলে যেতে লাগে। মেহরিন চিৎকার করে বলতে থাকে-
-” কে তুমি? কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ওঁদের? রেখে যাও না ওদের, ওরা কাঁদছে। বাচ্চাগুলো কে নিয়ে যাচ্ছ কেনো? ওদের বাবা মা ওদের বোধহয় খুঁজছে। নিয়ে যেওনা৷
মেহরিনের কথাটা শেষ হতেই বাচ্চাগুলো কে মুহূর্তের মধ্যেই উপর থেকে ছুঁড়ে ফেলা হলো। মেহরিন সেই দৃশ্য টা দেখা মাত্র চিৎকার করে বলে উঠল-
-” নাআআআআ…
মেহরিন শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠলো। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। ঘাম ঝরছে কপাল বেয়ে। পুরো শরীর কাঁপছে।
রুমাইসার প্রচুর তেষ্টা পেয়েছিল। রুমের বোতলের পানি ফুরিয়ে গিয়েছিল সেজন্য বোতল নিয়ে যাচ্ছিল পানি আনতে৷ আকস্মিক মেহরিনের রুমের পাশ দিয়ে যওয়ার সময় মেহরিনের চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেলো। হন্তদন্ত হয়ে মেহরিনের রুমের দরজা ধাক্কা দিতেই খুলে যায়।
রুমাইসা ভেতরে ঢুকে দেখে মেহরিন হাঁপাচ্ছে আর নাক টানছে। বিরবির করে কিছু বলছে৷ রুমাইসা পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো-
-” কি হয়েছে তোমার মেহরিন?
মেহরিন রুমাইসা কে দেখা মাত্রই জড়িয়ে ধরে এবার শব্দ করে কেঁদে বলে উঠলো-
-” আ..আমার আম্মা আমার আম্মাকে ফোন দাও। আমি বাড়ি যাব। আমার আম্মাকে দরকার। আমার আম্মাকে কল দাও।
রুমাইসা মেহরিন কে শান্ত থাকতে বলে নিজের রুমে গেলো ফোন আনতে।
মেহরিনের শরীর এখনও কাঁপছে। স্থীর হচ্ছে না।
এই স্বপ্ন, এই একই স্বপ্ন। তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে । প্রথম দেখেছে এই স্বপ্ন ক্লাস ফোরে থাকা কালীন। সেই থেকেই শুরু। হুটহাট সেম স্বপ্ন সে দেখছে। আর প্রতি বারই, এই স্বপ্নের পরের কয়েকটা দিন মেহরিন প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়।
রুমাইসা ফোন নিয়ে মেহরিনের রুমে আসলো। মেহরিনের দিকে বাড়িয়ে দিতেই মেহরিন কাঁপা কাঁপা হাতে তার বাবার নম্বরে কল করে।
মোতালেব ভুঁইয়া ঘুমে ছিলেন। রাত বাজে এখন তিনটে। এত রাতে ফোন আসায় বেশ অবাক হলেন। বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুলে দেখলেন ছোট বাড়ির শ্বশুর বাড়ি থেকে ফোন। মেয়ে তার ঠিক আছে তো। তাড়াতাড়ি করে শোয়া থেকে উঠে বসে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিলেন। হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে ছোট মেয়ের কান্নার শব্দ শুনলেন। মোতালেব ভুঁইয়া অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
-” মেহরিন মা আমার কি হয়েছে। কাঁদছো কেনো মা?
মেহরিন হেঁচকির ঠেলায় কথা বলতে পারছে না। কোনো রকমে বলল-
-” আমায় নিয়ে যাও আব্বু। আমি বাড়ি যাব।
মোতালেব ভুঁইয়া এই একটা কথা শুনেই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি টা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-
-” এই তো মা আমি আসতেছি এক্ষুনি। তুমি কাইন্দো না মা। বাবা আসতেছে।
সেই মাঝরাতে মোতালেব ভুঁইয়া ছুটলেন মেয়ের শ্বশুর বাড়ির দিকে। রাস্তায় গাড়ি নেই। গাড়ির অপেক্ষাও করলো না। গাড়ি অপেক্ষা করলে তার মেয়ের কাছে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে। ভাঙাচুড়া রাস্তা। বৃষ্টির পানি জমে আছে। ছোট্ট বাটন ফোনে আর আলোই বা কত হয়? সেই অলংকারপুর থেকে সুলতানপুর পায়ে হেঁটে আসলেন।
মেহরিনের কান্না থামছে না। আফিয়া সুলতান আমিরুল সুলতান, মাহি, এজওয়ান উঠে এসেছে৷ আনোয়ার সুলতান ঘুমের ঔষধ খায় বিধায় জাগনা পায় না। মেহরিন কেঁদেই চলছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলতে পারছে না। শুধু আব্বু আব্বু করে যাচ্ছে। চোখ মুখ ফুলে লাল হয়ে গেছে। নিচ থেকে খবর আসলো মোতালেব ভুঁইয়া এসেছে৷ কথাটা কানে আসতেই মেহরিন ছুটে আসলো। মোতালেব ভুঁইয়ার পা,লুঙ্গি পাঞ্জাবি রাস্তার কাঁদায় মাখোমাখো। বুঝাই যাচ্ছে পায়ে হেঁটেই চলে এসেছেন মেয়ের ফোন পেয়ে। মেয়েকে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরতে দেখে বুকটায় ব্যথা হতে লাগলো। অস্থির গলায় মেয়ের কপালে মাথায় গালে হাত রেখে বলল-
-” মা আমার৷ কাঁদে না মা৷ বাবা এসে গেছে তো মা।
মেহরিন বাবার বুকে মুখ চেপে বলল-
-” আমি বাসায় যাব আব্বা। আমি বাসায় যাব।
আমিরুল সুলতান এগিয়ে এসে মোতালেব ভুঁইয়া কে বলল-
-” হুট করে মেয়েটা কান্না করতেছে ভাই। জিজ্ঞেস করেছি অনেক বার কেনো কাঁদছে। কিন্তু বলতে পারে নাই। রুমাইসা পানি খেতে বেরিয়ে দেখলো মেহরিন কাঁদছে।
মোতালেব ভুঁইয়া আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল-
-” এখানে থাকলে ওর কান্না কমবে না ভাই। মেয়েটাকে নিয়ে বাসায় যেতে চাচ্ছি।
আমিরুল সুলতানের কপালে দু ভাজ পড়ে।
-” তা না হয় নিয়ে যাবেন৷ কিন্তু এত রাতে কি ভাবে? সকাল হোক?
মেহরিন চেপে ধরলো বাবার হাত৷ মানে সে এখনই বাসায় যাবে। ভয়ে মুখটা ওর অন্য রকম হয়ে আছে৷ মাহির ভীষণ মায়া হচ্ছে কষ্ট হচ্ছে। কি হলো মেয়েটার? এমন করছে কেনো?
দাহশয্যা পর্ব ৩৩
-” মেয়ে আমার থাকতে পারবে না ভাই৷ শেষে দেখা যাবে কাঁদতে কাঁদতে আরো অসুস্থ হয়ে যাবে।
আমিরুল সুলতান এজওয়ান কে বললো মেহরিন আর মোতালেব ভুঁইয়া কে বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিতে৷ গাড়ি পাবে না এই রাতে রাস্তায়৷ আর একা ছাড়তেও পারবেন না তিনি। এজওয়ান তাই করলো। সেই মধ্য রাতে মেহরিন আর তার বাবা মোতালেব ভুঁইয়া কে অলংকারপুর রেখে আসলো।
