Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৩৫

দাহশয্যা পর্ব ৩৫

দাহশয্যা পর্ব ৩৫
Raiha Zubair Ripti

মোতালেব ভুঁইয়া তার নিজ বাসায় মেহরিন কে নিয়ে আসার পর মেহরিনের অবস্থা সামান্য একটু ভালো হয়। পাশের বাড়ি থেকে চম্পার মা’কে ডেকে এনেছিল৷ সে দোয়া-দরুদ পড়ে সারা শরীরে ঝাড়ফুঁক দেয়। এতেই কিছুটা কাঁপা-কাঁপি থামে মেহরিনের। মায়ের আঁচল হাতের মুঠোয় শক্ত করে টেনে ধরে রেখেছে। এখন ঘুমে। তবে সকাল হলে কি হবে বলা মুশকিল। মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের পায়ের কাছটায় বসে আছে। শুকিয়ে যাওয়া মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” কত ডক্টর দেখাইলাম এটার জন্য। কিন্তু কোনো চিকিৎসা পাইলাম না। কবিরাজ রাও তো ঠিকমতো কিছু বলে না। শুধু কয় এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা তাদের কাছে নাই। তাবিজও দিলো। কই তাবিজে তো কাজ করলো না। হুজুর ও তো দেখাইলাম। তারাও এড়িয়ে গিয়ে বলল- ছোটো মানুষ ভয়ংকর স্বপ্ন তো তাই এমন জ্বর এসেছে। বছরে একবার করে হলেও এই স্বপ্ন আমার মাইয়াটা দেখবে। আর এমন অসুস্থ হয়ে যায়।
সানজিদা বেগম চম্পার মায়ের দিকে তাকালো।
-” চম্পার মা তুমি অন্তত কও স্বপ্নের ব্যাখ্যা টা। তুমি তো অনেক কিছুই জানো।
চম্পার মা মেহরিনের সারা শরীরের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল-
-” সব কিছুর ব্যাখ্যা হয় না মেহরিনের মা। তোমার মেয়ে কেনো যে এই স্বপ্ন বারবার দেখে বলতে পারছি না। তবে..
-” তবে কি?
-” বারবার এই স্বপ্ন যখন দেখছে তাহলে হয়তো আল্লাহ তায়া’লা কোনো কিছুর ঈঙ্গিত আগে থেকেই দিয়ে রাখছে। সেই ঈঙ্গিত আমরা কেউই এখন বুঝতেছি না। তাই সময় নিজেই জানিয়ে দিবে এটা কিসের ঈঙ্গিত । আমাদের অপেক্ষা আর মেহরিন কে আগলে রাখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। কারন যা হবার তা হবেই৷ তুমি আমি আটকাতে পারবো না। এখন মাইয়াটা ঘুমাইছে ঘুমাক। সকালে তাড়াতাড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই-ও। শ্বাসকষ্ট আছে তো মাইয়ার৷ শুরু হয়ে গেলে তখন আরেক বিপদ।
চম্পার মা চলে গেলো। বাকি রাত টা সানজিদা বেগম আর মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের পাশে বসেই জেগে কাটালো। খুব ভোরের দিকে মেহরিনের গা কাঁপিয়ে জ্বর আসলো৷ জ্বরের কারনে আবোলতাবোল বকতে লাগলো। মায়ের হাত বুকে চেপে কান্না করে বলতে লাগলো-

-” ও..ওরা কাঁদছে মা। ওরা কাঁদছে। ওদ..ওদের কেউ বাঁ..বাঁচাও। আমার বা..বাচ্চারা..আমার ক..কোল খা..খালি করে দিচ্ছে ওরা।
এই ভাঙাচোরা কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারলো না সানজিদা বেগম আর মোতালেব ভুঁইয়া। মোতালেব ভুঁইয়া কপালে হাত রেখে দেখলো প্রচণ্ড জ্বর এসেছে।
-” মেহরিন রে হাসপাতালে নিতে হইবো সানজিদা। শ্বাসকষ্ট একবার শুরু হলে তখন অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাবে আমার মেয়ের।
মোতালেব ভুঁইয়া মেয়েকে পাঁজা কোলে নিয়ে বাহিরে আসলো। বাড়ির পাশে অটোরিকশা চালক মিনাল কে ডেকে সেটায় চড়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হলো।

মিনালের অটোরিকশা জোরে ছুটছে আঁধার ভোরের রাস্তায়। মেহরিনের শরীর অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। মুখে জ্বরের তাপ। শ্বাস নিতে গিয়ে যেন বুক ফেটে যাচ্ছে তার। নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গেটের কাছে পৌঁছে মোতালেব ভুঁইয়া মেয়েকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। ডাক্তার দের ডাকতে লাগলো।
ডিউটিরত নার্স তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এলো। স্ট্রেচারে শুইয়ে দ্রুত জরুরি বিভাগে নিয়ে গেল তারা মেহরিনকে। পেছন পেছন তারও আসলো।
ডিউটিতে থাকা ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন –
-” কি হয়েছে আপনার মেয়ের?
-” দেখতেছেন না কি হইছে আমার মেয়ের? চোখের সামনে থেকেও জিজ্ঞেস করেন কি হইছে?
ডাক্তার মেহরিনের শরীর পরীক্ষা করলেন। স্টেথোস্কোপ কান পেতে শোনার পর মুখ গম্ভীর করে বললেন –
-” শ্বাসকষ্ট আছে। স্যাচুরেশন একটু কম। জ্বরও বেশি। এখনই নেবুলাইজ করতে হবে। ব্লাড স্যাম্পল পাঠাচ্ছি। ইনফেকশন আছে কিনা বা অন্য কোনো কারণ খুঁজতে হবে। আপনার মেয়ের বয়স কত?

-” সতেরো।
নার্স মেহরিনের আঙুলে অক্সিজেন মিটার লাগিয়ে বলল –
-” স্যার, স্যাচুরেশন ৯১ পারসেন্ট।
ডাক্তার তৎক্ষণাৎ নেবুলাইজারের ওষুধ লিখে দিলেন। সল্যুশন মেশিনে ঢেলে মেহরিনের মুখে মাস্ক পরানো হলো। ধোঁয়ার মতো ওষুধ মেহরিনের নাকে-মুখে ঢুকছে।
মোতালেব ভুঁইয়া ভয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল –
-” আমার মেয়ে এখন ঠিক হয়ে যাইবো তো একেবারে?
-” এগজ্যাক্টলী কি হয়েছিল বলুন তো ওনার সাথে? না মানে এত খারাপ হলো শরীর।
-” মাঝ রাতে একটা স্বপ্ন দেখছে। তারপর থেকে ভয়ে কান্না করতেছিলো। ভোর হতেই শরীর কাপিয়ে জ্বর আসে। প্রলাপ বকছিলো। এই সমস্যা টা অনেক বছর ধরেই হচ্ছে আমার মেয়ের।
ডাক্তার বললেন-

-” শুনুন, মাঝে মাঝে সাইকোজেনিক কারণে, মানে ভয়াবহ স্বপ্ন বা মানসিক চাপে হাইপারভেন্টিলেশন হয়। আবার ইনফেকশন, নিউমোনিয়া বা অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে। জ্বর, ঘাম, প্রলাপ বকা এগুলো সেপসিসের লক্ষণও হতে পারে। আমরা সব টেস্ট করছি। যদি বেশি ঝুঁকি দেখি, নওগাঁ সদর হাসপাতাল রেফার করব।
পাশেই সানজিদা বেগম ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে।
নেবুলাইজের পর মেহরিন কিছুটা শান্ত হলো। শ্বাসের গতিও কমলো। ডাক্তার বললেন-
-” অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে না আপাতত, তবে ওর ঘন ঘন এই ধরনের অসুস্থতা মানসিক ট্রমারও হতে পারে। আজ ওকে হাসপাতালে ভর্তি রাখি। জ্বর বেশি। ইলেক্ট্রোলাইট টেস্ট, সিবিসি রিপোর্ট আসুক আগে। আবার এমন হলে সঙ্গে সঙ্গে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।
সানজিদা বেগম ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” ডাক্তার আমার মেয়েটা শুধু এই সেম স্বপ্নই দেখে। আর এই স্বপ্নের পরপরই তার শরীর প্রচুর খারাপ হতে থাকে।
ডাক্তার নিঃশ্বাস ফেলে বললেন –

-” দেখুন, স্বপ্নের অর্থ চিকিৎসায় নেই। ওর বয়সের মেয়েরা কোনো কারণে ভয় পেলে এভাবে প্রলাপ বকতে পারে। তবে শারীরিক দিক আমরা পুরো পরীক্ষা করছি। মনোবিশেষজ্ঞ দেখানোর কথাও ভাবতে পারেন, যদি শারীরিক কোনো কারণ না মিলে। এখন জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল ইনজেকশন দিচ্ছি। আশা করছি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে।
সোলেমান ঘুম থেকে উঠে সকাল আটটার পরপর। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ফোনের দিকে তাকাতেই দেখলো বোর্ড থেকে ফোন করা হয়েছে অনেক বার। সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো। তার নিচেই তার বাবা ভাইও ফোন করেছিল রাত তখন তিনটে বাজে। ফোনটা সাইলেন্ট থাকায় বুঝতেই পারে নি৷ সোলেমান আগে বোর্ডকে কল লাগালো। বোর্ড থেকে জানানো হলো- গতকাল সোলেমানের দেওয়া ভাষণে উপর মহলের সবাই বেশ চটে আছে৷ যদি দলের লোক নিয়ে ভালো ভালো কথাই না-ই বলতে পারে তাহলে দলে আছে কেনো? সোলেমানের ভাষণ নিয়ে বেশ হইচই উঠেছে৷ ১০ টার পর মিটিং সোলেমান কে থাকতে বলা হলো।

সোলেমান ফোন টা কেটে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো। এই বা’লছালের দিন গুলোতে সোলেমান এখন আর দেশেই থাকবে না। দেশের বাহিরে চলে যাবে৷ নাটক শেষ হলে তারপর আসবে৷ আদিখ্যেতা যত্তসব।
ব্রেকফাস্ট টা করে বোর্ড মিটিং এর জন্য রেডি হবার সময় মনে পড়লো বাড়ি থেকে ফোন দিয়েছিল। কল টা আর ব্যাক করা হয় নি। সোলেমান পাঞ্জাবির হাতাটা ফোল্ড করতে করতে এজওয়ানের নম্বরে কল দিলো।
এজওয়ান ঘুমে ছিলো। ভাইয়ের ফোন পেয়ে ফোনটা কানে নিতেই সোলেমান বলে উঠলো-

-” ফোন দিয়েছিলি রাতে। সব ঠিকঠাক আছে?
-” ভাই ভাবির যেনো কি হইছে।
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।
-” কি হইছে মানে? কি হইছে মেহরিনের?
-” রাত তিনটের দিকে ভাবি ভীষণ কান্নাকাটি করতেছিলো। তারপর উনার আব্বা এসে নিয়ে গেছে সেই রাতেই।
-” নিয়ে গেছে মানে? কাঁদছিলো কেনো?
-” তা জানি না। জিজ্ঞেস করছিলাম আমরা কিন্তু ভাবি বলতে পারে নাই। হেঁচকির জন্য কথাই বলতে পারে নাই। শুধু তার আব্বাকে খুঁজতেছিল আর বাসায় যাইতে চাচ্ছিলো বারবার। পরে আমি ভাবি আর তার আব্বাকে বাসায় দিয়ে এসেছি।
-” এখন কেমন আছে?
-” আমি এখনও ঘুমে ভাই। বের হই নি রুম থেকে।
সোলেমান দাঁত চেপে বলল-
-” তুই ঘুমিয়েই থাক।

ফোনটা কেটে সোলেমান তার বাবা কে ফোন দিলো। আমিরুল সুলতান সবেই মোতালেব ভুঁইয়ার সাথে কথা বলেছেন। মেয়েটাকে নাকি হাসপাতালে নিতে হয়েছে৷ আমিরুল সুলতান হাসপাতালের দিকেই রওনা হচ্ছিলো৷ এমন সময় ছেলের ফোন পেয়ে ফোন রিসিভ করে বলল-
-” হ্যালো,রাতে ফোন কেনো ধরছিলি না?
-” বাবা মেহরিন এখন কেমন আছে?
-” মেহরিন কে ভোরে হাসপাতালে নিয়ে গেছে মোতালেব। শরীর নাকি অনেক খারাপের দিকে গিয়েছিল।
-” খারাপ হইছে মানে? কি হইছে?
-” জ্বর আসছে।
-” কোন হাসপাতালে নিয়ে গেছে?
-” মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
-” আচ্ছা রাখছি।

সোলেমান ফোনটা কেটে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। এদিকে তার মিটিংয়ে সময়ও চলে আসতেছে৷ বোর্ড থেকে ফোন করলো সোলেমান কে। কিন্তু সোলেমান ফোন ধরলো না। সোলেমান ফোন ধরছিলো না বলে ইব্রাহিম কে ফোন করা হলো। ইব্রাহিম সোলেমানের বাসায় এসে জানতে পারলো সোলেমান বেরিয়ে গেছে৷ ইব্রাহিম ভাবলো বোধহয় মিটিং এর জন্য বেরিয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু না বেশ খানিকটা পর আবার ফোন করা হলো ইব্রাহিম কে। সোলেমানের তো এতক্ষণে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু নাহ্ সোলেমান এখনও যায় নি। ইব্রাহিম সোলেমান কে কল করলো। সোলেমান একবার নাম্বার টা দেখে রিসিভ করে ব্লুটুথ টা কানে নিলো।

-” বল।
-” তুই কোথায়? বোর্ড থেকে যে বারবার ফোন দিচ্ছে। তুই এখনও পৌঁছাস নি কেনো?
-” আমি যেতে পারবো না।
-” যেতে পারবি না কেনো?
-” আমি নওগাঁ যাচ্ছি।
-” নওগাঁ যাচ্ছিস মানে?
-” বউয়ের কাছে যাচ্ছি আমি।
-” আশ্চর্য এই মিটিং টা কত ইম্পর্ট্যান্ট তুই জানিস না? তোর আসন নিয়ে টানাটানি হবে পরে।
-” আমার কাছে আমার বউ আগে নাকি তোদের বোর্ড মিটিং টা আগে?
-” অফকোর্স মিটিং টাই আগে এখন।
-” তোদের বোর্ড মিটিং এর গুষ্টি কি’লাই। মিটিং এর পা’ছায় লাল বাত্তির বিদায় জানাইলাম । ফিরে এসে আসসালামু আলাইকুম বলতেছি রাখ এখন।
ফোনটা কেটে দেয় সোলেমান। বিরবির করে বলে-

-” আমার বউ অসুস্থ আর শালার ব্যাটারা পড়ে আছে বোর্ড মিটিং নিয়ে। বোর্ড মিটিং এর মায়রে বাপ।
সোলেমানের বদলে পরিশেষে বোর্ড মিটিংয়ে গেলো বাশার সুলতান আর ইব্রাহিম।
ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে মাহি আর রুমাইসা খবার নাড়ানাড়ি করছে কিন্তু খাচ্ছে না। তা দেখে আফিয়া সুলতান জিজ্ঞেস করলো-
-” খাচ্ছো না কেনো তোমরা?
মাহি হাত ধুয়ে বলল-
-” আন্টি মেহরিন এখন কেমন আছে? হুট করে ওমন করলো কেনো? ওর কি কোনো ফোবিয়া জাতীয় রোগ আছে?
-” হয়তো দুঃস্বপ্ন দেখেছিল৷ সেটা দেখেই ভয় পেয়েছে৷ এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে৷
-” কোন হাসপতালে আছে?
-” মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তোমার আঙ্কেল গেছে দেখা করতে।
-” আগে জানলে আমিও চলে যেতাম আঙ্কেলের সাথে।
রুমাইসা হাত ধুয়ে বলল-

-” চলো এখনই যাই ভাবি৷ আমার ভালো লাগছে না মেহরিন কে ছাড়া।
-” এখন যেও না। পরে যেও দুপুরের দিকে৷
১২ টার পরপর এজওয়ান, মাহি আর রুমাইসা কে কোথাও একটা যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। জানালর পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলো৷ বাশার সুলতান বলছে রাজনীতি তে তাকে ঢোকার জন্য৷ সোলেমান নাকি একা সামলাতে পারছে না। আজ বোর্ড মিটিংয়ে অনেক কথা শোনানো হয়েছে তাদের। সোলেমানের উপর অনেক ক্ষুব্ধ হয়ে আছে সবাই।
এজওয়ানের এসব রাজনীতি ভালো লাগে না। তাই কথাটাকে তেমন গ্রাহ্য না দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বোন আর বউয়ের পিছু নিয়ে রুমাইসাকে ডাকলো।
রুমাইসা পেছন ফিরে ভাইকে দেখে জিজ্ঞেস করলো-

-” তুমিও যাবে নাকি?
-” কোথায় যাচ্ছিস তোরা?
-” ভাবিকে দেখতে। তুমি যাবে?
-” হ্যাঁ যাওয়াই যায়।
মেহরিনের শরীর টা আগের তুলনায় এখন অল্প কিছুটা সুস্থ হয়েছে। তবে জ্বর কমে নি তেমন একটা৷ খিঁচুনি নেই এখন। আমিরুল সুলতান ডাক্তারের সাথে কথা বলছে। তেমন চিকিৎসা না হলে সে বড় হাসপাতালে নিয়ে যাবে। ডাক্তার আশ্বস্ত দিয়ে বলল-
-” তার দরকার হবে না। তবে একটা মনোবিশেষজ্ঞ দেখাতে।
আমিরুল সুলতান খোঁজ লাগালো নওগাঁর কোন মনোবিশেষঞ্জ বেস্ট। তার বউমাকে সেখানে নিয়ে যাবে। যদি নওগাঁ না থাকে তাহলে ঢাকায় নিয়ে যাবে।
মাহি, এজওয়ান, রুমাইসা এসে গেছে হাসপাতালে। আমিরুল সুলতান কে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো -“ ভাবিকে কোথায় রাখা হয়েছে?
আমিরুল সুলতান বলল-

-” সেকেন্ড ফ্লোরে আয়। আমি দাঁড়িয়ে আছি।
এজওয়ান মাহি রুমাইসা কে বলল- “ দোতলায় আছে ভাবি।
মাহিরা দোতলায় চলে আসলো। রুমাইসা বাবাকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” বাবা মেহরিন ভালো আছে?
আমিরুল সুলতান মেয়ের গালে হাত রেখে বলল-
-” ভাবি। ভাবি বলবে।
রুমাইসা মাথা নত করে বলল-
-” ভুলে যাই৷ মনে থাকবে এখন থেকে। ভালো আছে? অনেক দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
-” স্যালাইন দেওয়া হয়েছে৷ সেন্সলেস এখন৷ তবে চিন্তার কারণ নেই।
মাহি এবার জিজ্ঞেস করলো-
-” দেখা করা যাবে একটু?
আমিরুল সুলতান মাথা নাড়িয়ে বলল-
-” যাও দেখা করে আসো।
মাহি কেবিনের ভেতরে ঢুকলো। মোতালেব ভুঁইয়া আর সানজিদা বেগম মেয়ের মাথা আর পায়ের কাছে বসে আছে। মাহির কেমন কষ্ট হতে লাগলো। মেহরিন খুবই ভাগ্যবতী। এমন মা বাবা পেয়েছে৷ যে বাবা ঐ মধ্য রাতে মেয়ের একটা কল পেয়েই ছুটে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছে মেয়েকে নিয়ে যেতে। মেহরিনের মায়ের চোখ দিয়ে এখনও জল গড়াচ্ছে। ইশ সবার বাপ মা যদি মেহরিনের বাপ মায়ের মতন হত! কিন্তু না কিছু কিছু বাবারা হয় বাবা নামের কলঙ্ক। মাহি এগিয়ে গেলো। মেহরিনের চোখের পাতা গুলো বন্ধ । মোতালেব ভুঁইয়া পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে পাশ ফিরলো। এই মেয়েটাকে গতকাল রাতেও দেখেছে কিন্তু জানে না আসলে কে এই মেয়ে। তাই জিজ্ঞেস করলো-

-” তুমি? তুমি কে মা?
মা ডাক শুনে মাহির কেনো জানি কান্না পেয়ে গেলো।
-” জ্বি আমি…
-” আমার বউ আঙ্কেল। আমি ভাবির দেবর। আর মাহি ভাবির জা।
কথাটা বলতে বলতে ভেতরে ঢুকলো এজওয়ান। মোতালেব ওহ্ আচ্ছা বলে উঠে দাঁড়ালো। ডাক্তারের কাছে যাবে। বিল পরিশোধ করতে।
মাহি বসলো মেহরিনের পায়ের কাছে। আলতো করে হাত রাখলো মেহরিনের পায়ে। সানজিদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” আন্টি কাঁদবেন না আর। ডক্টর তো বলেছে মেহরিন ঠিক হয়ে গেছে।
সানজিদা বেগম আঁচল দিয়ে চোখ মুছলো। আর তখনই ফোন আসলো। তাকিয়ে দেখলো সেরিন ফোন করেছে। এখনও বলা হয় নি সেরিন কে মেহরিনের বিষয়ে।
ফোনটা নিয়ে কেবিনের বাহিরে চলে আসলো।
এজওয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাহিকে দেখতে লাগলো। ঝাছিকি রাণী দেখছি বেশ মানিয়ে নিয়েছে তার ফ্যামিলি কে। নাইস!
মোতালেব ভুঁইয়া বিল পরিশোধ করতে গিয়ে জানতে পারলো আমিরুল সুলতান সব বিল পরিশোধ করে দিয়েছে। বিষয় টা মোটেও খুব একটা ভালো লাগলো না তার।
সানজিদা বেগম সেরিন কে সবটা খুলে বলল৷ সেরিন ভীষণ রাগারাগি করছে মায়ের উপর কেনো রাতে ফোন করে জানালো না। সে এখনই আসতেছে হাসপাতালে।
মেহরিনের জ্ঞান ফিরেছে ১ টার দিকেই। কেবিন জুড়ে মানুষ। তার শ্বশুর বাড়ির সবাই এসেছে শুধু দাদা শ্বশুর বাদে। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে মেহরিনের গতকাল রাতের কথা ভেবে। মেহরিনই বা কি করবে৷ তারই বা কি করার আছে? সে নিজের মধ্যে থাকে না। ভয়ে ওরকম টা করে ফেলে। আফিয়া সুলতান পাশে বসে মেহরিনের মাথায় হাত বুলাচ্ছে। মেহরিন আধশোয়া। নিঃশব্দে মাথা নত করে বলল-

-” দুঃখিত আম্মা গতকাল রাতের জন্য। বেয়াদবি করে ফেলেছিলাম বোধহয়। আপনাদের কারো কথা শুনি নি।
কেবিনের সবাই অবাক হয়ে তাকালো এই কথায়। আফিয়া সুলতান মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে বলল-
-” একদম বেয়াদবি করো নি মা। আমরাই বুঝতে পারি নি হুট করে ওমন কেনো করছিলে। আমরাই দুঃখিত মা।
মাহি এগিয়ে আসলো।
-” তুমি ঠিক আছো মেহরিন? কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো এখন?
শরীরে এখনও জ্বর। তারপরও মুখে ম্লান হাসি ঝুলিয়ে বলল-
-” জ্বি আপু ঠিক আছি৷ কোনো কষ্ট হচ্ছে না।
আর তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে অস্থির হয়ে এলোমেলো পায়ে ভেতরে ঢুকে সোলেমান। সবাই দরজার পানে তাকায়। সোলেমান কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা মেহরিনের দিকে এগিয়ে গেলো। শরীর তার ঘেমে-নেয়ে একাকার। আফিয়া সুলতান উঠে দাঁড়ালো। সোলেমান আফিয়া সুলতানের জায়গায় বসে মেহরিনের গালে দু হাত রেখে উদ্বিগ্ন গলায় বলল-

-” এই মেয়ে কি হয়েছিল রাতে? কান্নাকাটি করছিলে কেনো? কোথায় কষ্ট হয়েছিল?
মেহরিন সোলেমানের এমন অস্থিরতা দেখে সোলেমানের কব্জি তে হাত রেখে বলল-
-” আপনি আগে শান্ত হন। আমি ঠিক আছি।
সোলেমান মেহরিনের গাল এমন আগুনের মতো গরম দেখে সাথে সাথে কপালে হাত বুলালো। এ মেয়ের তো শরীরে অনেক জ্বর।
বাবার দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল-
-” শরীরে এখনও জ্বর থাকে কি করে? ডক্টর মেডিসিন দেয় নি?
-” দিয়েছে। কমতে তো একটু সময় লাগবে।
সোলেমান মেহরিনের হাত মুঠোয় নিয়ে বসে রইলো৷ আফিয়া সুলতান ইশারায় সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলল। সবাই বের হলো। এখন কেবিনে শুধু মেহরিন আর সোলেমান। সোলেমান কেবিনের চারিপাশে চোখ বুলালো। তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই হাসপাতলের। আর তার বউকে কি না এখানে নিয়ে আসা হয়েছে! বিরক্তিতে চ বর্গীয় উচ্চারণ করলো।
মেহরিন এখনও তাকিয়ে আছে সোলেমানের দিকে। সোলেমান বুঝলো সেটা। সেজন্য বলল-

-” আমার চেহারা কি অনেক সুন্দর?
মেহরিন মৃদু হাসলো।
-” আপনি দেখেন নি কখনও নিজের চেহারা আয়নায়?
-” দেখেছি কিন্তু তেমন বিশেষ কিছু খুঁজে পাই নি যা দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে পারে।
-” তাহলে বলবো আপনি নিজেকে ঠিক ভাবে কখনও দেখেন-ই নাই।
-” আচ্ছা মেনে নিলাম অনেক সুন্দর আমি। এখন বলো রাতে কি হয়েছিল? কাঁদছিলে কেনো?
মেহরিন চুপ হয়ে গেলো।
-” একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভয় থেকে ওমন টা করে ফেলেছি।
-” বাচ্চা মেয়ে কি এমনি বলি তোমায়? ভয়ে একদম বাড়ির সকলের আত্মা বের করে নিয়েছিলে! আমি খবর টা শোনা মাত্রই ছুটে চলে এসেছি। না জানি আমার ল্যাদা বউটার কি হয়েছে।
এরমধ্যে ডাক্তার আসলো। মেহরিনের পালস শরীর চেক করলো। জ্বর দু একের মধ্যে কমে যাবে। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-

-” গুরুতর কিছু হবে না তো পরে?
ডক্টর না জানালো। ডক্টর চলে যেতেই রুমাইসা খাবার নিয়ে ঢুকলো মেহরিনের। স্যুপ নিয়ে এসেছে রেস্টুরেন্ট থেকে। সোলেমান স্যুপ টা হাতে নিয়ে বলল-
-” আমি খাইয়ে দিচ্ছি তুই যা। ভেতরে কাউকে আসতে মানা করবি। আই নিড সাম স্পেস।
রুমাইসা মাথা নেড়ে বাহিরে চলে গেলো। সোলেমান নিজ হাতে মেহরিন কে খাইয়ে দিলো খাবার টা। অল্পই খেলো মেহরিন। মুখটা তেঁতো হয়ে গেছে। সোলেমান জোর করলো না। মুখ টা মুছে দিয়ে মেহরিনের মতন হয়ে আধশোয়া হয়ে বসলো মেহরিনের পাশে বেডে হেলান দিয়ে। তারপর এক হাত দিয়ে মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে মেহরিনের মাথাটা তার বুকের কাছটায় চেপে ধরলো একটু প্রশান্তি পাওয়ার লোভে। মেহরিন অনুভব করতে পারলো সোলেমান বুকের ভেতর টা অনেক জোরে লাফাচ্ছে। মেহরিন হাত রেখে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ৩৪

-” এত অস্থির কেনো আপনার হৃদয়? শব্দ গোনা যাচ্ছে।
সোলেমান চোখ বন্ধ করে বলল-
-” এর জন্য দায়ী তুমি মেহরিন তাবাসসুম।

দাহশয্যা পর্ব ৩৬