Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৪

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৪

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৪
রাত্রি মনি

রিম তখনো এক ঘোর লাগা বিস্ময়ে জেইনের দিকে তাকিয়ে ছিল। লোকটা এত নিখুঁত, এত পরিপূর্ণ কেন? সুদর্শন, বিত্তবান, দক্ষ—তার উপর এমন মন ছুঁয়ে যাওয়া গানের গলা! রিম যেন তার চোখে দেখছিল এক অবিশ্বাস্য জাদু। রিমের ঘোর লাগা দৃষ্টি অনুসরণ করে জেইন তার উষ্ণ ঠোঁট আলতো করে কামড়ে ধরল রিমের দিকে তাকিয়ে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা হেসে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন, সোনা? আমি কিন্তু ভুলে যাবো এটা একটা খোলা গাড়ি! You know what I mean.”

কথাটা বলেই জেইন এক চোখ টিপে দিল। লজ্জায় রিমের মুখমণ্ডল রক্তিম হয়ে উঠল। এই লোকটা যেন সবসময় তাকে লজ্জার বেড়াজালে ফেলে দিতে পছন্দ করে! সে মুখ নামিয়ে জেইনের শক্ত, উষ্ণ বুকের সাথে নাক ঘষল। কেমন যেন অদ্ভুত, মাতাল করা একটা ঘ্রাণ—ইচ্ছে করে সবসময় এভাবেই এই নিরাপদ বুকের মধ্যে ডুবে থাকতে। তার আঙুলগুলো আলতোভাবে জেইনের শার্টের ভেতরের বুকের ত্বকে আঁকিবুঁকি করতে লাগল।
জেইনের হাত তখনো রিমের টি-শার্টের ভেতরে, তার উষ্ণ পিঠের উপর। বাইরের ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও দুজনের শরীরের উষ্ণতা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে এক স্বর্গীয় আবেশ তৈরি করেছে। জেইন বুক ভরে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। এতটা গভীর শান্তি সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
নিস্তব্ধতা ভেঙে রিম ধীর, ফিসফিসে গলায় বলে উঠল,

“তুমি এতো ভালো গান গাইতে পারো! আমি তো জানতাম না।”
জেইন ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই কামুক ও গভীর হয়ে উঠল,
“শুধু গান না… আরও অনেক কিছুই ভালো পারি। তোমার থেকে ভালো আর কে জানে সেটা?”
রিম লজ্জায় পুরোপুরি জেইনের বুকের গভীরে গুটিয়ে গেল। জেইন তাকে নিজের বুকের সাথে সামলে রেখে আলতোভাবে পিঠে হাত বুলিয়ে চলেছে।
“ভুলে যেও না তোমার গানের সূচনা কিন্তু আমার হাতেই হয়েছিল! তুমি কি ভেবেছো পৃথিবীতে একমাত্র সেই ফাটাস্টারই গান গাইতে পারে?”
রিম চমকে তাকাল। জেইনের চোখে তখনো সেই নিবিড় দৃষ্টি। রিশাব!… তার মনে এক মুহূর্তে শঙ্কা জাগল। সে জানে না রিশাব কেমন আছে? কোথায় আছে? তার মনে প্রশ্ন জাগে, তবুও মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতে পারে না। কারণ সে জানে জেইন তার মুখে রিশাবের নাম কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। তাই সে চুপ করে থাকল, শুধু তার চোখেই ফুটে উঠল তার অস্থিরতা।
হঠাৎ জেইনের কণ্ঠস্বর করুণ হয়ে উঠল,

“চিন্তা করো না। He is fine. আমার বউ অন্যের চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকবে, মন খারাপ করবে—এটা আমি কিছুতেই সহ্য করবো না। সো ওর কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও। গট ইট?”
রিম ভ্রু কুঁচকে, কিছুটা অভিমান নিয়ে বলল,
“তোমাকে কে বলেছে আমি ওর কথা ভাবছি?”
জেইন আলতো করে হেসে রিমের কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।
“তোমার মনের সব কথাই আমি জানি। আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া এতো সহজ না, বার্বিডল।”
রিম মুখ কুঁচকে কিছু বলতে যায়, কিন্তু তার আগেই উচ্ছ্বাসে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। তার দৃষ্টি তখন দিগন্তে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে জেইনের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
“আরাত্র…ঐ দেখো! আকাশে কত সুন্দর সাত রঙা রেইনবো! পাখিরা কি সুন্দর ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। ইটস সো বিউটিফুল! এগুলো কি পাখি? আমি আগে কখনো এতো সুন্দর দৃশ্য দেখিনি!”
জেইন একদৃষ্টিতে গভীর চোখে রিমের দিকে তাকিয়ে রইল। রিমের মুখে তখন এক ধরনের স্বর্গীয় দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে—সেই নিষ্কলঙ্ক আনন্দ। রিমের দিকে তাকিয়েই জেইন, নেশা ধরানো কণ্ঠে ফিসফিস করে,
“আমিও কখনো দেখিনি। এতো সুন্দর, এতো পবিত্র…”

খোলা মার্সিডিস-বেঞ্জটি এসে থামে পাহাড়ের চূড়ার একেবারে কিনারায়, এক অপূর্ব ছোট্ট টং ঘরের সামনে। রিম গাড়ি থেকে নেমেই যেন এক অন্য জগতে পা রাখল। সে হা হয়ে চারপাশে তাকিয়ে রইল। সবকিছু এতো সুন্দর, স্নিগ্ধ—ঠিক যেন তার স্বপ্নের ক্যানভাস।
গাছের গুঁড়ি থেকে প্রায় দুই ফুট উঁচুতে তৈরি করা কাঠের একটি ছোট্ট টং ঘর। তার চারপাশে বাহারী ফুলের সমারোহ—রক্তজবা, অপরাজিতা, আর নাম না জানা কতশত সুগন্ধি ফুল! তার উপর উড়ে বেড়াচ্ছে শত শত রঙিন প্রজাপতি। পাশে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলে তৈরি হয়েছে ছোট্ট একটা লেকের মতো পুকুর। সেখানে শান্তভাবে ভেসে আছে সাদা রঙের একটি কাঠের বোট।

রিম চঞ্চল হরিণীর মতো দৌড়ে গিয়ে বাগানে চলে যায়। সে হাত বাড়িয়ে ফুল স্পর্শ করে, প্রজাপতির পিছনে ছোটে। জেইন গাড়ি থেকে নেমে, বুক পকেটে হাত গুঁজে, অসীম তৃপ্তি নিয়ে রিমের দিকে তাকিয়ে থাকে। অজান্তেই তার মুখে তখন এক নীরব হাসি ফুটে ওঠে। সে জানে, এই জায়গাটি রিমের জন্য পারফেক্ট। সবকিছু শুধুমাত্র রিমের জন্যই স্পেশালি তৈরি করা হয়েছে। রিম তখনো ফুল আর প্রজাপতির মায়াবী জগত দেখায় মগ্ন, আচমকা নিজের পেছনে কারো দৃঢ় উপস্থিতি টের পেয়ে সে চমকে ঘাড় ঘোরায়। ঘোরার সাথে সাথেই সে ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় পড়ে যেতে নিয়েছিল। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও সুযোগ দিল না জেইন। বিদ্যুতের গতিতে সে রিমের কোমড় জড়িয়ে ধরল এবং নিজের উষ্ণ দেহের সাথে মিশিয়ে নিল তাকে।

রিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই, জেইন তাকে নিমিষেই করে কোলে তুলে নিল। ঘটনাটা এতটাই দ্রুত ঘটল যে রিম ভয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল। জেইন তত্ক্ষণাত্ তার এক হাতে রিমের আর্দ্র ঠোঁট চেপে ধরে, তার কানের কাছে ঝুঁকে গভীর, ফিসফিসে কণ্ঠে বলল,
“Shhh… সবসময় এতো চিৎকার করো কেন বলতো! নেগেটিভ ফিল হয়। তোমার চিৎকারের শব্দে আমার শরীরে কারেন্টের ঝটকা লাগে। কারো চিৎকারের শব্দ কি করে এতো সে/ক্সি হতে পারে! বলো তো? মন চায় শুধু গিলে ফেলি।”

রিমের বুক তখন ঢিপঢিপ করছে, যেন কোনো উন্মত্ত ঢাক বাজাচ্ছে ভেতরে। কোনদিন জানি এই লোকের লাগামহীন কথায় হার্ট অ্যাটাক করে সে। জেইন তাকে কোলে নিয়ে সোজা টং ঘরের দিকে চলে গেল। দৃঢ় পদক্ষেপে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগল। রিমের বুক তখনো কাঁপছে, কিন্তু লজ্জায় মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। জেইন তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, চোখে সেই দুষ্টু হাসি,
“কী ব্যাপার! তোমাকে এতো ভারী লাগছে কেন বলো তো? আগে তো এতো হালকা ছিলে, যেন মেঘ। আমার আদরের স্পর্শে ফুলে উঠেছ নিশ্চয়ই? নাকি আমার ক্ষুধা বেড়েছে তাই তোমাকে আরও মিষ্টি মনে হচ্ছে?”
রিম রাগে ফোঁস করে উঠল—সে নাকি ভারী! রাগে শক্ত করে জেইনের কোমরের কাছটায় খামচে ধরল।
জেইন এক মুহূর্তের জন্য থামল, ধীরে শ্বাস নিয়ে ক্রূর হাসল। তার চোখ তখন আরও বেশি হিংস্র।
“আহ্! এখনি শুরু করে দিয়েছো! ওহ্, ওয়াইল্ড ক্যাট! I just love it. আজকে একটা ম্যাচ হবে। দেখবো কে কাকে কতো বেশি খামচি আর কামড় দিতে পারে। তোমার প্রিয় খেলা বলে কথা!”
এই বলেই সে রিমকে নিয়ে সোজা ফেলে দিল টং ঘরে থাকা ছোট্ট, নরম বিছানায়। রিম উঠে রাগে জেইনকে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার নজর পড়ল ঘরের অন্দরমহলে। ঘরটা ছোট্ট, কিন্তু খুব সুন্দর গোছানো—কাঠের মেঝে, দেওয়ালে রড আয়রনের লন্ঠন, জানালার পর্দাগুলোও তার মনের মতো। সে ঘর দেখতে ব্যস্ত, আর ঠিক সেই মুহূর্তে আচমকা এক লাফে বিছানায় উঠে পড়ল জেইন।

রিম ভড়কে গেল, তার নিঃশ্বাস থমকে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, জেইন তার তুলতুলে ঠোঁট দুটো নিজের দখলে নিয়ে নিল। রিমের চোখ ছানাবড়া!সে হাঁসফাঁস করে উঠল। জেইন শক্ত করে তার দু’গাল চেপে ধরে উন্মাদের মতো চুমু খেতে শুরু করল। রিম নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করল, কিন্তু জেইন আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠল।
চুমুর মাঝে সে ছোট ছোট কামড় দিয়ে রিমের ঠোঁট শুষে নিতে লাগল। যেন সে সেখানে কোনো নিষিদ্ধ মাদক খুঁজে পেয়েছে এবং তা পান না করে সে শান্তি পাবে না। রিম এই তীব্র আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে, অবশেষে কুট করে কামড় বসিয়ে দিল জেইনের ঠোঁটে। জেইন সাথে সাথে তাকে ছেড়ে দিল। ঠোঁটে লেগে থাকা রক্তটুকু সে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছে নিল। তার চোখে তখনো তীব্র নেশা।

“এটা কি হলো?”
রিম তখনো হাঁপাচ্ছে।
“দেখছো না কি হয়েছে! সবসময় আমার ওপর এমন ঝাঁপিয়ে পড়ো কেন! দম বন্ধ হয়ে যায় আমার।”
জেইন ঠোঁটের রক্ত মুছে, আবার ঝুঁকে এল। তার কণ্ঠস্বর তখন আর্দ্র ও কামুক,
“কি করবো! তোমাকে দেখলেই ইচ্ছে করে শুধু খেয়ে ফেলি। এতো টেস্টি কেন তুমি বলোতো? বিশেষ করে তোমার এই লিপস দুটো… আর…”
রিম ভ্রু কুঁচকে, কৌতূহল আর রাগ মিশিয়ে তাকাল,
“আর কী?”
জেইন ঠোঁট কামড়ে ক্রূর হাসল। তার চোখ তখন জ্বলজ্বল করছে। সে রিমের দিকে আরও ঝুঁকে এসে, তার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার পু*শি…”
বলেই আলতো দাঁত বসিয়ে দিল রিমের কানের লতিতে। রিম ঝাঁকুনি খেয়ে উঠলো। মাথা ভনভন করে করছে। এই লোককে জিজ্ঞাসা করাটাই ভুল হয়েছে তার। অসভ্য, নির্লজ্জ লোক একটা! সে জেইনের বাহুতে জোরে আঘাত করল, কিন্তু জেইন ততক্ষণে হেসে উঠেছে। সে রিমকে তার শক্ত বাহুতে টেনে নিল, যেন এই আলিঙ্গন থেকে তার আর মুক্তি নেই।

বিকেল তখন গোধূলির মায়া মেখেছে। জেইনের কোলে গলা জড়িয়ে আছে রিম—জেইনের ভাষ্যমতে, সে থাকতে তার বউ কেন কষ্ট করে পায়ে হেঁটে আসবে! তাদের গন্তব্য সেই শান্ত লেকের ধার, যেখানে অপেক্ষা করছিল ছোট্ট, কাঠের নৌকা। লেকের জল তখন সোনালী আলোয় চিকচিক করছে, ঠিক যেন তরল সোনা। চারপাশের ঘন সবুজ বনানীর ছায়া পড়েছে সেই শান্ত জলে, তৈরি হয়েছে এক নিস্তব্ধ স্বর্গ। জেইন অত্যন্ত আলতো হাতে রিমকে নৌকায় তুলে নিল।

নৌকাটি ধীরে ধীরে লেকের মাঝখানে এগিয়ে চলল। চারপাশে নীরবতা এতটাই গভীর ছিল যে কেবল বৈঠার জল কাটার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। জেইন বৈঠা থামিয়ে রিমকে নিজের দিকে টেনে নিল। লেকের ঠাণ্ডা, মিষ্টি বাতাসে রিমের এলোমেলো চুল বারবার জেইনের মুখে ঝাঁপটা দিচ্ছে।
তারা একে অপরের বাহুতে মাথা রেখে শুয়ে রইল, দিগন্তের মৃদু রঙ আর বনানীর দিকে তাকিয়ে। এই সময়টুকু ছিল তাদের হৃদয়ের একান্ত আলাপনের, যেখানে কোনো কথা ছিল না, ছিল শুধু দু’জনের উষ্ণ নিঃশ্বাস আর অটুট নির্ভরতা—যেন তারা পৃথিবীর কোলাহল থেকে বহুদূরে এক ব্যক্তিগত স্বর্গে ঠাঁই নিয়েছে।
অন্যদিকে___

দূর আকাশে স্থির হয়ে থাকা একটি হেলিকপ্টারে বসে কেউ একজন দুরবিন দিয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। তার চোখ তখন আক্রোশে জ্বলছে, রাগে সে ফোঁস ফোঁস করছিল। সেই তীব্র ক্রোধে সে পাশে কিছু না পেয়ে জোরে আঘাত করল হেলিকপ্টারের দরজায়। তরতাজা লাল রক্ত ফিকিনি দিয়ে গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তার। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে হাতে তুলে নিল একটি ঝকঝকে কালো বন্দুক। নিশানা স্থির রিমের দিকে। ট্রিগার প্রেস করতে নিবে—ঠিক তখনই দেখল জেইন আচানক ঝুঁকে পড়েছে রিমের ওপর। সাথে সাথেই বিরক্তিতে ও ব্যর্থ ক্রোধে ভ্রু কুঁচকে গেল সেই ব্যক্তির।
এদিকে, নিজের দিকে জেইনকে অমন অতর্কিতভাবে ঝুঁকে পড়তে দেখে যেন নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেল রিম। শ্বাসরুদ্ধকর কন্ঠে, ধীরে ধীরে সে বলল,
“ক..কী করছো তুমি? এটা নৌকা! কেউ দেখে ফেললে…”
জেইন তার চোখে গভীর দৃষ্টি রেখে বলল,
“ডোন্ট ওয়ারি। কেউ দেখবে না। তুমি আর আমি ছাড়া কেউ নেই এখানে। আর না তো আসার স্পর্ধা থাকবে। আর যদিও দেখে তাহলে শুধু জ্বলবে। তাই সব বাদ দিয়ে শুধু আমার দিকে ফোকাস করো।”

“পারবো না। ছাড়ো!”
“নো। আপাতত ছাড়ছি না, আ’ইম হাংরি…”
জেইনের গলায় তখন নেশার ঘোর।
“তাহলে রুমে গিয়ে খাবার খাও!”
“উহুম, তোমাকে খাবো… রুমে চলো!”
“আরেকটু থাকি না। লেকের মাঝখানে তোমার সাথে এমন একা থাকাটা ভালো লাগছে তো…।”
“নো। আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। অন্ধকার হয়ে আসছে। আর এখানে সন্ধ্যা হলে মানুষ খেকো জম্বি দেখা যায়,”
সাথে সাথেই রিম শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জেইনকে। জেইন ঠোঁট কামড়ে এক শয়তানি হাসি হাসল। সে জানত, এমনটাই হবে।

“কী হলো! এখানে থাকবে না?”
“না।”
“তাহলে আমাকে ছাড়ো, যাবো কিভাবে?”
“না ছাড়বো না। এভাবেই যাবে।”
জেইন ভেবে পায় না, যেই মেয়ে আগে তাকে দেখলেই ঘৃণায় জ্বলে যেতো, সেই মেয়ে এখন তাকে ছাড়তেই চাইছে না! উল্টো আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। সে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে রিমকে আবার কোলে তুলে নিল।
“রুমে গেলে আমি যা চাইবো, সব দিতে হবে কিন্তু,”
“দিব!” রিম তত্ক্ষণাৎ বলল।
“বুঝে শুনে বলছো তো? পরে যেন পালিয়ে না যাও,”
“হুম, তুমি যা চাইবে তাই দিব। কিস করতে চাইলে কিস করতে দিব। হাই করতে চাইলে, হাগ করতে দিব। আর বাকি কিছু করতে চাইলে—সেটাও দিব।”
“বাকি কিছু মানে কি গো? স্পষ্ট করে বলো তো!”
জেইন তার কানে ফিসফিস করল।

রিমের মুখ লজ্জায় পুরোপুরি লাল হয়ে গেল। জেইন ভেবে পায় না, এই মেয়ের এতো লজ্জা আসে কোথা থেকে! এতো কিছুর পরেও এতো লজ্জা! শেষমেশ বউয়ের লজ্জাটাই ভাঙতে পারলো না সে। তবে যাই হোক লজ্জা পেলে মেয়েটাকে দারুন লাগে। একেবারে রেড চেরির মতো। খালি কামড়ে খাওয়াই বাকি।
জেইন রিমকে নিয়ে সোজা রুমে চলে এল। তাকে নরম বিছানায় বসিয়ে সে নিজেই দুটো কাপ নুডুলস বানিয়ে নিল। তারপর গরম গরম নুডুলস রিমের সামনে নিয়ে বসল। ধীরে ধীরে ফু দিয়ে তাকে খাইয়ে দিতে লাগল। রিমও চুপচাপ খেতে লাগল। একটু পর সে খেতে খেতে বলল

“আরাত্র… তুমি খাবে না?”
জেইন আলতো করে হেসে রিমের দিকে নেশাতুর চোখে তাকাল,
“না। আমার খিদে পেটে নয়, অন্য কোথাও। তোমাকে লাগবে। নুডুলসে মিটবে না এই ক্ষিদে।”
“ইশশশ…” রিম লজ্জায় চোখ নামাল।
খাবার শেষে জেইন রিমকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে আধ শোয়া ভঙ্গিতে বসে পড়ল। খোলা জানালা দিয়ে বাইরে থেকে হু হু করে বাতাস আসছিল। ঠান্ডায় রিম পুরোপুরি জেইনের উষ্ণ বুকে গুটিয়ে গেল। যেন পারলে সেখানেই ডুবে যেত।জেইন একটি ভারী চাদরে দুজনের শরীর টা মুড়িয়ে নিল।
চাঁদের ম্লান আলো তখন জানালা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে—এক রূপকথার জগতের মতো লাগছিল দৃশ্যটা। রিম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সেই মায়াবী দৃশ্যে।নিস্তব্ধতা ভেঙে সে ফিসফিস করে বলল,
“চাঁদটা কি মায়াবী তাই না? আচ্ছা সবাই তো তার জীবন সঙ্গিনীর রূপকে চাঁদের সাথে তুলনা করে কাব্য করে। তুমি তো কক্ষনো করলে না! আচ্ছা বলো না, আমাকেও কি চাঁদের মতো সুন্দর লাগে?”
জেইন কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকল। অতলান্ত প্রশান্তি নিয়ে সে শান্ত স্বরে বলল,

“না।”
রিম কিছুটা বিমর্ষ স্বরে প্রশ্ন করল,
“কেন? আমি কি তবে তোমার চোখে সুন্দর নই?”
জেইন দুহাতে রিমের মুখটা তুলে ধরল। তার চোখে তখন গভীরতম দৃষ্টি। যা বোঝার সাধ্যি হয়তো রিমের নেই।
সুন্দর? তুমি সুন্দর নও, সুন্দরের চেয়েও বেশি কিছু ,তুমি পবিত্র। চাঁদেরও তো কলঙ্ক আছে। গ্রহণ লাগে। কিন্তু তোমার সত্তা আমার কাছে এক শুদ্ধ জ্যোতি। আমি চাই না কোনো উপমার আঁচ তোমার গায়ে লাগুক। ঐ চাঁদের সাথে কখনো তোমার তুলনা দিতে পারবো না।”
“কেন?”
জেইন রিমের কপালে উষ্ণ ঠোঁট ছুঁইয়ে শান্তভাবে বলল,
“কারণ ওই চাঁদ সবার। পৃথিবীর সবাই তার রূপের তৃষ্ণা মেটায়, তাকে নিয়ে মেকি প্রশংসা করে। কিন্তু তুমি… তুমি শুধু আমার। একান্ত, ব্যক্তিগত এবং এক অনন্য ধ্রুবতারা। তোমাকে অন্য কারো সাথে ভাগ করার সাধ্যি আমার নেই।”
রিম চোখ বুজে ফেলল, তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত পূর্ণতা। সে জেইনের বুকে মুখ গুঁজে বলল,
“আমিও তোমাকে অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারবো না, আরাত্র। কক্ষনো না। আমাকে কোনোদিন তোমার উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত করো না। আমাকে ধোঁকা দিও না কক্ষনো। আমি মরে যাবো।”
“কখনও না। যতদিন এই হৃদস্পন্দন আছে, তুমি ঠিক এভাবেই আমার বুকের পাঁজরে আগলে থাকবে।”
জেইন তার কপালে আলতো একটা চুমু এঁকে দিয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রাখল। চাঁদের আলোয়, তাদের উষ্ণ আলিঙ্গনে, পাহাড়ের চূড়ার সেই টং ঘরে, দুই হৃদয় তখন শান্ত, ব্যক্তিগত এবং শাশ্বত হয়ে রইল।

“আআআআআআআ…!”
এক হিংস্র ঝটকায় ভারী কাঁচের ফ্লাওয়ার ভেজটা ভেঙে ফেললো রমনী। টুকরোগুলো মেঝেতে ছিটকে পড়লো, যেন কাঁচের স্নায়ু ছিন্ন হলো। রাগে তার ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে, বুকটা ওঠানামা করছে এক বন্য জন্তুর মতো।
ওপাশ থেকে চিৎকার শুনে ছুটে এলো তার ভাই। ঘরের লন্ডভন্ড অবস্থা দেখে তার মুখটা কুঁচকে গেল—এক শীতল, হিসেবি বিরক্তি। বোনের এই নিয়ন্ত্রণহীন উন্মত্ততা তার কাছে পরিচিত, কিন্তু বিরক্তিকর।
“হোয়াট দা হেল আর ইউ ডুয়িং অলিভা? মানে কি এসবের? আবার?”
“বারবার! বারবার ব্যর্থ হচ্ছি আমি!”
অলিভা ঘুরে দাঁড়ালো, তার চোখ দুটো উন্মত্ত।
“এতদিন পর সুযোগ একটা পেয়েছিলাম, সেটাও হাত ছাড়া হয়ে গেল! এজে! এজে বারবার বাঁচিয়ে নিচ্ছে ঐ মেয়েটাকে! ও… ঐ মেয়েটা সারাক্ষণ চিপকে থাকে ওর সাথে! আমি সহ্য করতে পারছি না ভাই! পারছি না!”
অলিভা তার নিজের চুল মুঠোয় ধরে টানতে লাগলো, তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে শেষে জোরে চিৎকার করে উঠলো।

“আআআআআআআ…!”
তার ঠোঁট কাঁপছে, বারবার ফিসফিস করে একটি কথাই উচ্চারণ করতে থাকে, যেন সেটা কোনো অন্ধকার মন্ত্র,
“শেষ করে দিব। শেষ করে… শেষ করে দেব…”
ঠাস!
গালে একটা তীব্র থাপ্পড় বসে গেল তার। শব্দটা ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো, ভেঙে যাওয়া কাঁচের শব্দকে ছাপিয়ে। অলিভা স্তম্ভিত হয়ে গেল, তার চোখ ছলছল করছে।
লিওর চোখদুটো আগুন আর বরফের মিশ্রণ, শান্ত কিন্তু মারাত্মক। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে ফিসফিস করে উঠলো, প্রতিটা শব্দ যেন শান দেওয়া ছুরি,
“আমাদের মাঝে কি চুক্তি হয়েছিল ভুলে গেছিস? আমি তোকে বলেছিলাম, এঞ্জেলের গায়ে যেন একটা আঁচড়ও না লাগে! তারপরেও তুই… ওর যদি কিছু হয়, মাইন্ড ইট তোকে মারতে আমার ন্যানো সেকেন্ডও লাগবে না। ভুলে যাবো যে তুই আমার বোন। আমাদের কোনো রক্তের সম্পর্ক আছে! তোর এই শিশুসুলভ জেদ আমাদের পুরো প্ল্যানটা ধ্বংস করে দেবে।”

লিও ঝুঁকে পড়লো অলিভার দিকে, তার মুখমণ্ডল বীভৎস এক প্রতিজ্ঞায় কঠিন।
“আর তো মাত্র কয়েকটা দিন। সব, সবকিছু প্ল্যান মাফিক হচ্ছে। একটু ধৈর্য ধর। তারপর আমি পাবো সেই এঞ্জেলকে, My perfect doll। আর তুই পাবি জেইন’কে।”
লিও একটা দীর্ঘ, শীতল নিঃশ্বাস ছাড়লো।
“আর যদি এর মধ্যে তুই আবার কোনো অন্ধকারের ভুল করিস… মনে রাখিস, এই ঘরে তখন শুধু একটি লাশ খুঁজে পাওয়া যাবে। সেটা ঐ মেয়েটার হবে না, অলিভা। সেটা তোর হবে।”

ঢাকা, গুলশান।
একটি কালো, মসৃণ SUV বিরাট প্রাসাদতুল্য এক ম্যানশনের সামনে এসে থামল। ম্যানশনটি নীরব, যেন দীর্ঘদিনের ঘুমন্ত কোনো প্রাচীন রহস্য। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো দুজন যুবক আর এক রমনী। এই নিয়ন-আলোর ক্ষীণ অন্ধকারেও তাদের চোখে চকচকে সানগ্লাস, যা তাদের উদ্দেশ্যকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। পাশ থেকে সবচেয়ে কমবয়সী যুবকটি, যার চোখে চঞ্চল ঔৎসুক্য, বলে উঠলো,
“এটাই তাহলে চৌধুরী ম্যানশন!”
তার কথার প্রতি উত্তরে জবাব দিলো সেই যুবকের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ছয়ফুট উচ্চতার বিশালদেহী যুবকটি। তার কণ্ঠস্বর দৃঢ় ও চাপা।
“হ্যাঁ। এখানেই তোমাদের বসের ছেলেবেলা কেটেছে। তোমরা ভেতরে যাবে? নাকি এখানেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে?”

রমনী, এক লহমায় গাড়ির ডিকির ওপর উঠে বসলো। চোখের সানগ্লাসটা খুলে ঠোঁটে ফু দিতে দিতে বলল,
“নো নিড। আমি এখানেই কভার দেব। তোমরা যেতে পারো।”
পাশ থেকে সেই যুবকটি, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো,
“আমি যাবো ভাই। ভেতরে কী আছে দেখতে হবে।”
যুবকটি সামান্য মাথা ঝাঁকালো।
“ঠিক আছে, চল।”
তারা গেট পেরিয়ে মার্বেলের পথ ধরে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো, তাদের বুটের শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে দিল।
ঠিক তখনই টর্চ হাতে বেরিয়ে এলো একজন বৃদ্ধ বয়স্ক দারোয়ান। লোকটার গায়ে শাল, বয়সের ভারে টর্চ হাতে কাঁপছে।

“কে ওখানে?” বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ, কিন্তু সতর্ক।
যুবকটি এগিয়ে গেল। বৃদ্ধা ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রইল। চোখের মোটা চিকন চশমা’টা খুলে কাপড় দিয়ে মুছলো, যেন অতীতের কোনো অস্পষ্ট চিত্রকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে পরখ করছে, যেন বছর ধরে হারিয়ে যাওয়া কোনো ব্যক্তিকে অন্ধকার স্মৃতি থেকে চেনার চেষ্টা করছে। সে আঙুল তুলে কাঁপতে কাঁপতে বলল
“তুমি… কে… বাবা? খুব চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু মনে করতে পারছি না। আসলে বয়স বেড়েছে তো। তোমার নাম কি?”
“আমি ইয়াশ। আকরাম চাচা। আপনাদের আরু বাবার বন্ধু। মনে নেই? আগে ওর সাথে রোজ আসতাম এখানে।”
“ই… ইয়াশ! তুমি… ইয়াশ!”

বৃদ্ধের চোখে এক মুহূর্তের জন্য আলো ঝলসে উঠলো।
“দেখেছো, কত বড় হয়ে গেছো! চেনাই যাচ্ছে না। হঠাৎ এতো বছর পর!……
তোমরা নেই, একসময়ের হাস্যোজ্জ্বল বাড়িটা কেমন মরার মতো পরে আছে। আমি আর ক’দিন বাঁচবো বলো? এই বাড়ির দেখভাল কে করবে?”
বলতে বলতে কেশে উঠলো বৃদ্ধ। তারপর কণ্ঠস্বর নামিয়ে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
“প্রায় বছর খানেক আগে এমনই এক রাতে আরু বাবা… এসেছিল এখানে। সেদিন অন্যরকম লাগছিল তাকে, যেন কোনো পুরোনো ক্ষত বুকে জমে রয়েছে। আমি অনেক করে বুঝিয়েছিলাম সেদিন, অরিত্রিকা মায়ের কোনো দোষ ছিল না। সে নির্দোষ ছিল। সবটাই একটা চক্রান্ত ছিল। সব তার স্বামী জারকোভের প্ল্যান ছিল। সেদিন সবটা নিজ চোখে দেখেছিলাম আমি। কিন্তু জারকোভের ভয়ে কিছু বলতে পারি নি। কিন্তু আরু বাবা কিছুই বললো না, সবটা শুধু মুখ বুজে শুনেই গেল। সেই রাতে… ১২ বছর আগে…”

“কি এমন হয়েছিল সেই রাতে?” ইয়াশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। চোখে কৌতুহল।
“অরিত্রিকা মা নিজের রুমেই ঘুমাচ্ছিলেন। আর তারপর……………”
সবটা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় ইয়াশ। তার পেশী শক্ত হয়ে আসে। নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে এতটা গভীর ষড়যন্ত্র করেছে জারকোভ! যেই স্ত্রীকে একসময় ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন, তাকে মারার জন্য এতো কিছু! শুধুমাত্র সন্তানকে নিজের পাপের রাজত্বের রাজা বানানোর জন্য!
তবে একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝতে পারছে না ইয়াশ। জেইন এখানে এসেছিল, অথচ এ ব্যাপারে তাকে কিছু বলেনি কেন? তার সবকিছুই তো ইয়াশের জানা, তাহলে এই মৌলিক সত্যটা কেন লুকিয়ে রেখেছে? প্রশ্নটা তার মনে গভীর কালো গর্ত তৈরি করে রয়ে গেল।
তার ভাবনার মাঝেই আকরাম চাচা বলে উঠলেন,

“এই ছেলেটা কে?”
“ও মাত্তেও। আমাদের সাথেই থাকে।”
ইয়াশ একটু চুপ থেকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল ম্যানশের দিকে। তারপর বললো,
“আচ্ছা চাচা, আমাদের এবার যেতে হবে। তুমি নিজের আর এই বাড়ির খেয়াল রেখো। আমরা আবার আসবো, কেমন।”
“আর কবে তোমরা আসবে বাবা? দেখতে দেখতে তো ১২ টা বছর পেরিয়ে গেল…”
বৃদ্ধের কণ্ঠে এক ভারী বিষাদ।
“আমরা আসবো চাচা। সবাইকে নিয়ে আবার একসাথে। দেখবেন, এই বাড়িটা আবার আগের মত হইহুল্লোড়ে ভরে উঠবে।”
“সেই আসাতেই তো বসে আছি। আমার যে বয়স হয়েছে। বেঁচে থাকতে তোমাদের সবাইকে আবার একসাথে দেখে যেতে চাই।”
ইয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাত্তেওকে নিয়ে সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলো। গাড়িতে বসেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এলেনা। তারা দুজনে আসতেই এলেনা গাড়ি স্টার্ট করলো। তিনজনই নীরব, যেন প্রত্যেকেই কোনো ছড়িয়ে যাওয়া ভুতুড়ে টুকরোগুলো মেলাচ্ছে। এই নিঃশব্দের মাঝেই ধীরে ধীরে, কালো SUV-টি রাতের অন্ধকারে মিশে গেল।

গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেই হঠাৎ নীরবতা ভেঙে এলেনা বলে উঠলো,
“ইয়াশ…”
“উম..”
“একটা কথা বলতো। যেই ছেলেটা ১২ বছর আগে নিজের মাকে নিজের হাতে খুন করতে চেয়েছিল, সে হঠাৎ, মায়ের বেঁচে থাকার খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করতে চাইছে কেন? সেই হার্ড ড্রাইভটা… তারপর ফ্রান্সিসকোর সব হসপিটাল তন্ন তন্ন করে খোঁজা… আর সে কেনই বা বাবার সারনেম ইয়ুস না করে মায়ের সারনেম ইয়ুস করছে! ইজেন্ট ইট স্ট্রেঞ্জ?”
ইয়াশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে দিল। ক্লান্ত ভঙ্গিতে, কিন্তু তার চোখে তীক্ষ্ণ ইস্পাত।
“সব জানতে পারবে। সময় আসুক! তার আগে আমার অনেক কিছু জানার বাকি আছে।”

সিসিলির পাহাড়ি অঞ্চলের ভোর আজ স্বর্ণালী মায়ায় মোড়া। নভেম্বরের এই মাসটায় যেন প্রকৃতি আগে থেকেই ধারণ করেছে শীতল, স্নিগ্ধ রূপ। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা আঁকাবাঁকা পথ আর দূরে নীলচে-ধূসর সমুদ্রের হাতছানি—এক শান্ত কিন্তু রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করেছে।
সূর্য তখনো পুরোপুরি ওঠেনি, তাই চারপাশের আলোটা ছিল নরম, দুধসাদা। সমুদ্র তখন টলমলে, ঢেউয়ের তালে তালে গান গাইছে। সেই গানের শব্দে মিশে আছে লবণাক্ত বাতাসের ভেজা সুর। সৈকতের নরম বালি তখনো শিশিরে ভেজা, আর দূরে বনানীর মাথায় লেগে আছে কুয়াশার পাতলা চাদর।

এই মন মুগ্ধকর পরিবেশে, জেইন আর রিম দাঁড়িয়ে আছে জলের ধারে। জেইনের হাতে চকচকে একটা সার্ফিং বোর্ড।
জেইন রিমকে নিয়ে নামল সেই উত্তাল ঢেউয়ের বুকে। শুরুতে রিম কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত, আতঙ্কে তার বুক ঢিপঢিপ করছে। এত বড় বড় ঢেউ দেখে রিমের যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। রিমের সেই অনিশ্চয়তা জেইন বুঝতে পারছিল। সে নিরবে রিমকে কেবলই উৎসাহ আর আশ্বাস দিয়ে গেল।
তাদের শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল লবণাক্ত জলের প্রতিটি ঝাপটা। সার্ফবোর্ডের উপর ভারসাম্য রাখার প্রতিটি ব্যর্থ প্রচেষ্টায় রিম বারংবার হোঁচট খাচ্ছিল, আর প্রতিবারই ভয়ে চিৎকার করে উঠছিল সে। জেইনের চোখে তখন সামান্য বিরক্তি। রিমকে উদ্দেশ্য করে চাপা স্বরে বলল,

“এতো ভয় পেলে এসব শখ রাখার কী দরকার ছিল? আর এখানে আসারই বা কী দরকার ছিল! হয় তুমি সাহস দেখাও, নয়তো তীরে ফিরে যাও। আমার বউ এমন ভীতু হতে পারে না!”
জেইনের এই তির্যক কথাগুলো যেন রিমকে আরও বেশি জেদি করে তুলল। সে দাঁতে দাঁত চেপে আবার চেষ্টা করল। একসময় জেইন আর অপেক্ষা করল না। সে দ্রুত রিমের পিছনে এসে দাঁড়াল, শক্ত করে তার কোমড় জড়িয়ে ধরে তাকে দাঁড়াতে সাহায্য করল। রিম অনুভব করল জেইনের উষ্ণ শরীর তার পিঠের সাথে মিশে আছে। সেই নিরাপদ স্পর্শে তার ভয় কিছুটা কমল।
তারা দুজনে যখন একসাথে অপেক্ষা করছিল, তখনই এল একটি বিশাল ঢেউ। জেইন তার অভিজ্ঞ হাতে বোর্ডটিকে ঢেউয়ের উপর তুলে দিল।

“আআআআআ…..”
মুহূর্তের জন্য রিমের গলা থেকে ভয় মিশ্রিত একটা চিৎকার বেরিয়ে এল। কিন্তু ঢেউয়ের মাথায় যখন তারা ভাসতে শুরু করল, সেই চিৎকার মুহূর্তেই আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে পরিণত হলো।
তখন তাদের চিৎকার আর সম্মিলিত আনন্দ যেন পুরো সৈকতকে সিক্ত করে তুলল। ঢেউ পার করে যখন বোর্ডটি আবার শান্ত জলে এল, রিমের চোখে তখন বিজয়ের ঝিলিক—সে জেইনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আর জেইনের চোখে তখন গর্বের প্রতিচ্ছবি। তাদের এই অ্যাডভেঞ্চার যেন কেবল সার্ফিং ছিল না—যেন ছিল জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ একসাথে পার করার এক উষ্ণ অঙ্গীকার।

অবশেষে এল তাদের সফরের চূড়ান্ত মুহূর্ত—আকাশের বিশাল শূন্যতায় ডানা মেলার পালা। তাদের শরীর তখন অ্যাড্রেনালিনে পূর্ণ। প্লেনের দরজা যখন খোলা হলো, নিচে পৃথিবীটা তখন ছবির মতো ছোট, খেলনার মতো দেখাচ্ছিল। রিমের বুকে এক মুহূর্তে তীব্র ভয় আর উন্মত্ত উত্তেজনা মিলেমিশে গেল। সে জেইনের হাত চেপে ধরল, যেন এই বাঁধনই তার শেষ আশ্রয়।
জেইন তার চোখে চোখে তাকাল, তার ভেতরের সমস্ত গভীর বিশ্বাস রিমের হৃদয়ে সঞ্চারিত করল। তার দৃঢ়, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কণ্ঠস্বর রিমের কানে বাজল,
“I will never let go of your hand, Never.”

তারপর, সেই বিশাল শূন্যে ঝাঁপ!
মুহূর্তের জন্য মনে হলো সময় যেন থমকে গেছে। প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মুক্ত পতন! রিমের গলা থেকে প্রথম চিৎকারটা বেরিয়ে এল আতঙ্কে। তার চিৎকারের তীব্রতায় জেইন চোখ-মুখ খিঁচে কানে আঙুল দিল।
রিম আবার যখন চিৎকার করতে যাবে, ঠিক তখনই জেইন শক্ত করে তার ঠোঁট দুটো দিয়ে রিমের ঠোঁট চেপে ধরল। সেই তীব্র শব্দ মুহূর্তে থেমে গেল। রিমের বুক তখন ধুকপুক করছে—উচ্চতার ভয় নাকি জেইনের অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, সে বুঝতেই পারল না।

জেইন হয়তো শুধু চিৎকার থামাতে চেয়েছিল। কিন্তু রিমের তুলতুলে, কাঁপতে থাকা ঠোঁট পেয়ে তার ভেতরের ক্ষুধা যেন আরও বেড়ে গেল। সে চুমুতে চুমুতে অস্থির করে তুলল রিমকে, যেন আকাশের মাঝেই সে তার ক্ষুধা নিবারণ করতে চাইছে। রিম এমন পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে ভয়ে ও আবেগে জেইনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
স্কাইডাইভিংয়ের সময় এমন জুটি দেখে তাদের “ট্যান্ডেম ইন্সট্রাক্টর”ও অবাক! এমন রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের মুহূর্তে একে অপরের ঠোঁটে এমন তীব্র চুম্বন—অবাক হয়ে বেচারা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিলো অস্বস্তিতে।
চুম্বন শেষে ধীরে ধীরে রিমের ঠোঁট দুটো ছেড়ে দিল জেইন। রিমের ভয় যেন এবার রূপান্তরিত হলো পরম, বাঁধনহীন স্বাধীনতায়। দুজনে এক হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে বিশাল আকাশের বুকে। বাতাস তাদের কান ছুঁয়ে দ্রুত বেগে ছুটে যাচ্ছে। নিচে মেঘের ভেলা আর দূরে আবছা পৃথিবী।
ঠিক তখনই, একটি তীব্র, অপ্রত্যাশিত দমকা হাওয়া যেন আকাশ চিরে নেমে এল। মুহূর্তের মধ্যে তাদের এয়ারক্র্যাফট (Aircraft) বিকট শব্দে চুপসে গেল। জেইন, রিম দুজনেই আচমকা ছিটকে পড়ল সোজা নিচের দিকে।

“নাআআআআ!”
একটা তীক্ষ্ণ মেয়েলী চিৎকার। জেইন সঙ্গে সঙ্গে রিমকে আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। তাদের রশি আর প্যারাসুট কি সুরক্ষিত আছে? এই আকস্মিক দুর্যোগে তাদের অ্যাডভেঞ্চার মুহূর্তেই এক ভয়ঙ্কর জীবন-মৃত্যুর খেলায় পরিণত হলো।

উঁচু পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঝরঝর করে নেমে আসছে স্বচ্ছ জলধারা। কিছুক্ষণ পর জেইন পিটপিট করে চোখ মেলল, যদিও চারপাশ তখনও তার চোখে ঝাপসা। নিজেকে সে এক ছোট্ট ঝিলের ধারে পড়ে থাকতে দেখল; সামনেই সেই রুক্ষ পাহাড়টা, যেখানকার শীতল জল এসে জমা হচ্ছে এই ঝিলে।মাথার ভেতরটা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় রি রি করছে জেইনের। শেষ স্মৃতি বলতে সেটুকুই—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে রিমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল, কিন্তু এখন সে সম্পূর্ণ একা!

এক তীব্র শঙ্কা নিয়ে সে আশেপাশে রিমকে খুঁজতে লাগল। তখনই তার চোখ গেল ঝিলের দিকে—রিম নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে ঝিলের ঠান্ডা জলে! হুট করেই মনে পড়লো, রিম সাঁতার জানে না!
ভয়ে জেইনের রক্ত হিম হয়ে গেল। দ্রুত রিমের কাছে গিয়ে তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিল। রিমের শ্বাস চলছিল না। জেইন ভয়ে অস্থির, বুক কাঁপছে। রিমের গালে হাত রেখে আলতো চাপড় মারলো। কিন্তু রিম পুরোপুরি নিস্তেজ, ঠাণ্ডা।
জেইনের কণ্ঠস্বর হালকা কাঁপছে, সে আতঙ্কিত হলেও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে,
“সোনা… হেই, চোখ খোলো সোনা। সবসময় আমাকে এভাবে ভয় দেখাও কেন বলো তো? তোমার যন্ত্রণায় হাফ পাগল হয়ে আছি। একদিন পুরো পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো। আর জ্বালা দিও না প্লিজ। চোখ খুলে একবার আমার দিকে তাকাও, লক্ষ্মীটি।”
অবশেষে সাড়া না পেয়ে জেইন আর দেরি করল না। সে রিমকে পাথরের উপর শুইয়ে দিল। আলতো ভাবে পেটে চাপ দিতেই রিমের মুখ দিয়ে ছিটকে পানি বেরিয়ে এলো। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চাপ দেওয়ার পরেও যখন রিমের জ্ঞান ফিরলো না, জেইন তখন আর এক মুহূর্ত নষ্ট না করে নিজের ঠোঁট দুটো রিমের ঠোঁটে লাগিয়ে তাকে কৃত্রিম শ্বাস দিতে লাগলো।

একসময় রিম ফোস করে বড় করে নিঃশ্বাস ফিরে পেল। জেইন তার দিকে ঝুঁকে আরও বেশি করে শ্বাস দিতে লাগল—যেন নিজের শরীরের সমস্ত প্রাণ সে রিমের শরীরে সঞ্চারিত করতে চাইছে। অবশেষে রিম ছটফটিয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গেই জেইন তাকে শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো রিম। জেইন তাকে বুকের কাছ থেকে সরিয়ে দু’গালে আলতো ভাবে হাত রাখল। চোখে চোখ রেখে গাঢ়, কম্পিত গলায় বলল,
“তুমি ঠিক আছো তো? কোথাও কষ্ট হচ্ছে না তো?”
রিম ধীরে মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝাল। জেইন স্বস্তির এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আবারো তাকে শক্ত করে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। শীতের মাঝে ঠান্ডা পানির ছোঁয়ায় রিমের শরীর জমে গেল। কাঁপতে কাঁপতে সে ফিসফিস করে বলল
“ঠান্ডা লাগছে খুব…।”

জেইন তার দিকে গভীর, নেশাতুর দৃষ্টিতে তাকালো। গোলাপী রঙের ভিজে জামাটা শরীরের সাথে মিশে গেছে পুরোপুরি। ভেতরের নীল রঙের ইনারটাও যেন জামার ওপর দিয়ে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। জেইনের গলা যেন শুকিয়ে গেল। সে শুষ্ক ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারলো না।
এই মুহূর্তে তার অন্যকিছু চাই—উষ্ণতা, সান্নিধ্য, একান্ত অধিকার। মেয়েটা যেন প্রতিটি মুহূর্তে নিজের নিষিদ্ধ রূপ দিয়ে পাগল বানিয়ে দেয় তাকে। প্রতিবারই যেন নতুন রূপে আবিষ্কার করে এই মেয়েটাকে সে।
জেইন সেই ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে গাঢ়, নেশা ধরানো কণ্ঠে ফিসফিস করলো,
“জামাটা খুলে ফেলো। এখনি।”

রিম চমকে তাকালো। এই লোক বলে কী! এখানে খোলা জায়গায় কিভাবে জামা খুলবে সে?
“তুমি পাগল হয়ে গেছো? এখানে কিভাবে জামা খুলবো আমি? কেউ দেখে ফেললে!”
“কেউ দেখবে না। আমি আছি তো। নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করে রাখবো তোমায়,”
“অসম্ভব! আমি খুলতে পারবো না!”
“এটা না খুললে আরও বেশি ঠান্ডা লাগবে তোমার। You are freezing.. Try to understand the situation, বেইবি”

“না…”
রিমের শরীর কাঁপতে কাঁপতে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগল। তার সেই আর্দ্র, কাতর নিঃশ্বাসের শব্দও যেন জেইনকে উন্মত্ত করে তুলল। জেইন ঠোঁট ফাঁক করে বড় করে শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যর্থ হলো।
“Don’t breathe like that, baby, I’m going crazy. Stop teasing me!”
রিম অবাক হয়ে তাকালো। এখন কি এই লোকের জন্য সে শ্বাস নেয়াটাও বন্ধ করে দিবে, আজব!
সেই মুহূর্তে তার বিস্ময়কে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়ে জেইন নেশাগ্রস্তের মতো তার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিলো। ছোট ছোট, লালা সিক্ত চুম্বনে ভরিয়ে তুললো রিমের সমস্ত কায়া। ঠান্ডার মধ্যে পুরুষালি রুক্ষ ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শে শিউরে উঠল রিম। নিজেকে সামলাতে সে শক্ত করে খামচে ধরলো জেইনের চুল।

জেইন এক হাত পেছনে নিয়ে ধীরে ধীরে খুলে দিল রিমের জামার চেইন। কোমল বক্ষে মুখ ডুবিয়ে সে আদুরে চুম্বনে ভরে দিল রিমের বুকের মাঝখান। রিম থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে জেইনকে শক্ত করে আকড়ে ধরলো বুকে। ঠোঁট ফাঁক করে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল। জেইন যেন আরও বেশি উতলা হয়ে গেল। এলোমেলো, অবাধ্য ভাবে তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল রিমের সর্বাঙ্গে। সেই এলোমেলো হাতের স্পর্শে অস্থির হয়ে উঠলো রিম। জেইনের ছোঁয়ায় তার শরীরে যেন বিদ্যুতের ঝটকা লাগছে। বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে সে। অচেতনেই তার নখ ডুবে যায় জেইনের বুকে।
হঠাৎ জেইন রিমকে ছেড়ে দূরে সরে যায়। বড় বড় করে শ্বাস টেনে হাঁপাতে থাকে। তার চোখ দুটো লালচে, কামুক। রিমের শরীরটা তখন কেমন শিরশির করছে। বারবার পেঁচিয়ে যাচ্ছে, সাপের মতো। শরীরে এক ধরনের অদ্ভুত কম্পন। যেন মিষ্টি কোনো শিহরণ। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে জেইনের গভীর স্পর্শ না পেলে তার শরীর শান্ত হবে না কিছুতেই। কিন্তু সে বুঝতে পারছে না জেইন তাকে কেন ছেড়ে দিল। লজ্জায় মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছে না। সে জেইনের দিকে অভিমানী চোখে তাকিয়ে রইল।
জেইন তাকে এক লহমায় নিজের কোলে তুলে নিল। রিম মুখ ফুলিয়ে বললো,

“কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমায়?”
“কেন, বাড়ি যাবে না? নাকি সারাজীবন এখানেই থাকার প্ল্যান করছো?”
রিম খামচে ধরলো তার বুকে। জেইন শান্ত কিন্তু গভীর স্বরে বলল,
“কী হয়েছে? রাগ দেখাচ্ছো কেন? তোমাকে তো ছেড়েই দিয়েছি।”
রিমের অভিমান আরও দ্বিগুণ হলো। এই লোকটা কি একটুও বুঝে না তার মনের কথা! রিমের অভিমান আরও দ্বিগুণ হলো।
“আমি বলেছি ছেড়ে দিতে?”
“মানে!”
রিম উদ্ধত অভিমানে ঠোঁট উল্টে বলে উঠল,
“ধুর! কিচ্ছু বুঝে না! আমার আদর লাগবে। অনেকগুলো আদর লাগবে… এখনি”
জেইন চোখ বড় বড় করে তাকালো। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না!
“কী বললে তুমি?”

রিম মুখ ফুলিয়ে ফেলল। এবারে কান্না পাচ্ছে তার। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। এভাবে মুখ ফুটে বলার পরেও তার চাওয়া বুঝতে পারছে না জেইন? সে অভিমানে বললো,
“কিচ্ছু না… যাও এখান থেকে।”
মুহূর্তের ব্যবধানে জেইন রিমকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝর্নার শীতল জলধারার নিচে নামিয়ে দিয়ে নিজের ভিজে শার্টটা খুলে ফেলল। রিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিচে ঝুঁকে রিমের জামা সরিয়ে তুলতুলে উদরে মুখ ডুবিয়ে দিলো।
হঠাৎ এই অতর্কিত স্পর্শে রিম চোখ বুজে থরথর করে কাঁপতে লাগলো, জেইনের চুল খামচে ধরে রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে বলল,
“ক… কী করছো!”
জেইন তখন এক অবাধ্য নেশায় মত্ত। রিমের পেলব উদরে তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠের ছোঁয়া এঁকে দিতে দিতেই ঘোরের ঘোরে নেশাক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,

“বউকে আদর করছি। অনেকগুলো আদর। আমার আদুরে বউটা রাগ করেছে। রাগ ভাঙাতে হবে না!”
রিম আবেশে চোখ বুজে ফেলল। তার মনে হলো সে যেন কোনো স্বর্গীয় সুখের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। জেইনের তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠাধর ধীরে ধীরে উপরের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। রিমকে আলতো ভাবে পাথরের উপর শুইয়ে দিয়ে জামাটা টেনে খুলে ফেলল। রিমের পরনে তখন শুধুমাত্র একটা নীল রঙের ইনার। হুক খুলতে না পেরে জেইন অধৈর্য হল, সেই সাথে বিরক্ত! এক মুহূর্তও দেরি না করে, একটানে ছিঁড়ে ফেলল ইনারটা! রিম হাঁসফাঁস করতে লাগলো। খোলা বুক পেয়ে ক্ষুধার্তের মতো হামলে পড়লো জেইন। রিমের কোমল ব*ক্ষে তার ঠোঁটের স্পর্শ যেন বিদ্যুৎপ্রবাহ বইয়ে দিল। রিম যন্ত্রণা আর আবেশে চোখ বন্ধ করে, থরথর করে কাঁপতে লাগল। জেইন যেন উন্মত্ত—বুক থেকে পেট, শরীরের প্রতিটি কোমল, শীতল জায়গায় একের পর এক ঠোঁট ছুঁইয়ে যেতে লাগল। ঝরনার জলকণা রিমের নাভিমূলে জমে ছিল ক্ষুদ্র মুক্তোর মতো; জেইন সেই জলবিন্দুগুলো নিজের ওষ্ঠে শুষে নিল। এক তীব্র শিহরণে রিম ঝাঁকুনি খেয়ে উঠলো।

জেইন একবার মুখ উঁচিয়ে রিমের দিকে তাকালো। রিমের বন্ধ চোখের পাতা তিড়তিড় করে কাঁপছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে মেয়েটা।আর এক মুহূর্তের বিলম্ব সইল না জেইনের। সে নিজের ঠোঁট দিয়ে রিমের ওষ্ঠাধর রুদ্ধ করে দিল। রিমের ঠোঁটে ছিল মাদকের চেয়েও ঘোরলাগা উষ্ণতা। সেই উষ্ণতার সাগরে ডুব দিল জেইন।তারা দুজনেই তলিয়ে যেতে লাগল একে অপরের গহীন অরণ্যে। রিমের চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা নোনা জল।সে সুখের আবেশে জেইনকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো নিজের অস্তিত্বের সাথে।তাতে যেন বহুগুণ বেড়ে গেল জেইনের উন্মাদনা।

ঝরনার স্ফটিক জল গড়িয়ে পড়ছে তাদের দুজনের শরীরে, কিন্তু সেই শীতলতা হার মেনেছিল তাদের ভেতরের উত্তাল আগ্নেয়গিরির কাছে। জেইন রিমকে এমন ভাবে আঁকড়ে ধরলো, যেন এই মুহূর্তের বাইরে আর কোনো অস্তিত্ব নেই। রিমও তার সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিল জেইনের কাছে। প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি চুমু যেন তাদের সম্পর্কের গভীরতাকে আরও বেশি করে জানান দিচ্ছে। তারা ভুলে গেল চারপাশের পৃথিবী, শুধু অনুভব করলো একে অপরের স্পর্শের উত্তাপ।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৩

বাতাসে তখন শুধু তাদের দুজনের অবাধ্য নিঃশ্বাসের শব্দ আর ঝরনার জলের মৃদু কলতান। ভালোবাসার এই গভীর মিলনে তারা যেন একাত্ম হয়ে গেল, যেখানে দুটি শরীর, দুটি মন মিলেমিশে তৈরি করলো এক নতুন জগৎ, যা কেবলই তাদের নিজেদের।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৫