Home Born to be villains Born to be villains part 11

Born to be villains part 11

Born to be villains part 11
মিথুবুড়ি

‘যেখানে ওয়াসিম মঞ্জিল থেকে ইমনের স্কুল বিশ মিনিটের রাস্তা, সেখানে ঢাকা শহরের অসহ্যকর জ্যাম ঠেলে যেতে লাগল পয়তাল্লিশ মিনিট। আরেকটু দেরি হলে বোধহয় হৃৎস্পন্দন টা পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসতো। সারাটা রাস্তা গাড়িতে গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করেছে ইমামা। মনে হচ্ছিল কেউ যেন তার বুক চিঁড়ে কলিজা ছিনিয়ে নেওয়ার বর্বর উল্লাসে মেতে উঠেছে। ইমামা যখন ইমনের স্কুলে পৌঁছায়, তখন ক্লাস ব্রেক টাইম চলছিল। ইমামা পাগলের মতো হন্নতন্ন করে পুরো স্কুলে ভাইকে খুঁজতে থাকে।

‘অনেক খোঁজার পর কোথাও খুঁজে না পেয়ে যখনই বিপর্যস্ত বোন বানভাসি কান্না ভেঙে পড়বে, তখনি হঠাৎ তার শঙ্কিত দৃষ্টি জোড়া গিয়ে ঠেকল অদূরে। মাঠের অপরপ্রান্তে ইমনের মাথা দেখা যাচ্ছে। একটা বেঞ্চিতে নির্ভারচিত্তে কারোর সাথে বসে আছে সে। পাশের লোকটা অতিমাত্রায় লম্বা; তার চুলে ঝরে পড়ছে গাঢ় বাদামি রঙের কোমল আভা। পেছন থেকে তার মসৃণ, দৃঢ় পিঠে চোখ পড়তেই ইমামার গলায় শুকনো ঢোক গিলার শব্দ চাপা পড়ে গেল নিঃশব্দ ঘরের ভেতর। অপ্রকৃতিস্থ আতঙ্কে কপাল বেয়ে নামল একফোঁটা শীতল ঘাম।
‘গতি-হারা হৃদস্পন্দনে ইমামা ছুটে গেল ইমনের দিকে।
উর্ধ্বশ্বাসে পৌঁছে ঝড়ো হাওয়ার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ভাইয়ের বুকে। স্বচকিত ইমন চমকে উঠল বোনের হঠাৎ আগমনে। তার পাশে বসা লোকটার মোমঢালা পেলব মুখে ফুটে কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত ভাব।
‘ইমামা হাঁপাচ্ছে৷ ইমনকে খুঁজে পেয়েও তার ভয় প্রশমিত হয়নি। ইমামা অস্থিরচিত্তে ইমনকে খুঁটিয়ে-খাঁটিয়ে দেখতে দেখতে দেখতে ঘন নিশ্বাসের সাথে প্রশ্ন ছুঁড়ে,

“তুই ঠিক আছিস তো, ভাই?”
‘পাশের অতিরিক্ত ফর্সা লোকটার নাম ন্যাসো। তার গায়ের দুধসাদা রং, গড়ন, উচ্চতা, বলিষ্ঠ দেহ, আর উচ্চারণের ভিন্নতা—কোনোটাই তাকে বাংলাদেশি বলে মনে হয় না। তীক্ষ্ণ চোয়ালের রেখায় স্পষ্ট ফুটে আছে বিদেশি ছাপ। ন্যাসো শান্ত গলায় বলল,
“ডোন্ট ওয়ারি, ম্যাম। ও ঠিক আছে।”
‘ইমামা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। অনুভব করল বুকের ওপর চেপে বসা জগদ্দল পাথরটা সরে গিয়েছে। অন্তগর্ত ভয় এতোক্ষণ ধরে তাকে ছিঁড়ে খাচ্ছিল। নিজেকে ধাতস্থ করে ইমামা চোখ তুলে তাকাল ন্যাসোর দিকে। আর সাধারণ মেয়েদের তুলনায় উচ্চতায় ইমামা বেশ লম্বা। তবুও ন্যাসোর দিকে তাকাতে তাকে চোখ তুলতে হলো। সাদা শার্টের ওপর কালো কোট আর চোখে কালো সানগ্লাসে ন্যাসো যেন রোমান শিল্পীর ছাঁচে গড়া এক মানুষ। অথচ তার মুখে এমন এক তীক্ষ্ণ ধারালো ভাব, যা দেখলে গা শিউরে উঠার উপক্রম।

‘শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে ইমামা,”আপনি?”
‘ইমন চট করে বলল,”ইমায়, ও আমার নিউ ফেন্ড, ন্যাসো।”
‘ইমামা আড়চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল,”ফেন্ড?”
‘উপরনিচ মাথা নাড়ায় ইমন,”হুমম! আহ, তোমাকে তো বলা হয়নি। জানো, একটু আগে অনেক বড়ো একটা এক্সিডেন্টের হাত থেকে ন্যাসো আমাকে বাঁচিয়েছে।”
‘আঁতকে উঠল ইমামা,”এক্সিডেন্ট?”

“হুমম,” মাথা নাড়িয়ে বলতে শুরু করল ইমন,”ব্রেকে আমি একটু বাইরে গিয়েছিলাম কিছু কাজে। তখন হঠাৎ রাস্তার ওপাশ থেকে কেউ আমার নাম ধরে ডেকে উঠল। লোকটার মাথায় কালো হেলমেট ছিল। আমি তার চোখের দিকে তাকাতেই সে আমাকে তার দিকে ডাকল। তারপর হঠাৎ আমার কী যেন হলো! আমার আর বিন্দুবৎ হুঁশ ছিল না। কোনোদিকে না তাকিয়ে আমি তার দিকে যেতে থাকি। ঠিক তখনি রাইট সাইড থেকে একটা ট্রাক আমার দিকে তেড়ে আসে। ভাগ্য ভালো ছিল বলে তখন ঠিক সময় ন্যাসো এসে আমাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। নয়তো আজ….
‘কথার মাঝেই ইমামা ইমনকে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে। ওর আবেগশূন্য চেহারায় ভয়ের ছাপ অদৃশ্য হলেও ভেতরে ভেতরে সে কাছের মানুষগুলোর ব্যাপারে খুব তটস্থ আর মাত্রাধিক ভঙ্গুর। ইমামা জানে হেলমেট পরা লোকটা আর কেউ নয়, সেই বর্বর, নরপিশাচ, নরপশু, নরখাদক— ম্যাডবিস্ট। কিন্তু একটা জিনিস ইমামা বুঝতে পারল না, ইমন তার ডাকে হুঁশ হারালো কীভাবে!

‘ন্যাসো নীরবমূর্তির মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। তার বাদামী রঙের শান্ত, দূরদর্শী চোখ দু’টো ভুলক্রমেও স্পর্ধা দেখালো না ইমামার মুখের দিকে ফিরে তাকানোর। জানের মায়া সকলেরই আছে, তার-ও আছে। তাই শুরু থেকেই নিজ দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়েছে।
‘ইমামা কৃতজ্ঞ গলায় বলল,”থ্যাঙ্ক ইউ সো ম্যাচ।”
‘ন্যাসো সামান্য হাসার চেষ্টা করল। যদিও তার চেহারার সাথে এই হাসি মানানসই না। তবুও সে আন্তরিক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“ডু নট ম্যানশন, ম্যাম। ইট’স মাই ডিউটি।”
‘ইমামার কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। মস্তিষ্কের ধূসর কোষে এক গুরুতর প্রশ্নের ছায়া নড়েচড়ে উঠে। কিন্তু প্রশ্নটা ঠোঁটে ফুটে ওঠার আগেই ফোনটা কেঁপে উঠল। রক্তাভ মুখে তড়িঘড়ি ব্যাগ থেকে ফোন বের করল সে। নীলচে পর্দায় ভেসে উঠেছে সারাক্ষণ ষাঁড়ের মতো খেঁকিয়ে থাকা মানুষটার দৃঢ়, মনশীতল বার্তা,
“আমি আছি!”

‘আমি আছি।’ লোকটা বোধহয় এই দুই শব্দ বরফের রাজ্য থেকে নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে কিনে এনেছে। নয়তো এমন কী আছে এতে, যা অস্থির মনকে মুহূর্তেই শান্ত করে দেয়? যেকোনো সময়, যেকোনো পরিস্থিতিতে এই দুই শব্দ প্রশান্তির নিঃশ্বাস হয়ে ভূমিকা পালন করে। এতো কীসের ভালোলাগা শব্দ দুটোই? ইমামা জানে না। তবে এটা জানে, এই অনুভূতি প্রকাশ পেলে তার গাম্ভীর্য ভেঙে যাবে। তাই মুখে ত্যাঁড়া ভাব টেনে লিখল,
“আপনি আছেন তো? এখন কী আপনাকে কোলে নিয়ে মুড়ি খাবো?”
‘সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই এলো,”চাইলে কলাও খেতে পারো।”
‘থতমত খেয়ে গেল ইমামা। মুহূর্তেই মুখভঙ্গি বদলে গিয়ে কানের পাশে গরম ধোঁয়ার মতো কী যেন উড়তে লাগল। তড়িঘড়ি করে ফোনটা ব্যাগে গুঁজে দিল সে। তারপর সামনে তাকাতেই আবার চমকে উঠে। না, লোকটা নেই। মুহূর্তের মধ্যেই উধাও।
‘হতবিহ্বল ইমামা ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখল, ইমন বেঞ্চিতে বসে ন্যাসোর আনীত আইসক্রিম খাচ্ছে নির্বিঘ্নে। ও যেন কিছুই টের পায়নি।

‘ইমান ওয়াসিমের কালো রঙের প্লাডো টা এসে থামল ভার্সিটি গেইটের সামনে। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন ইমামা গাড়ি থেকে নামে, তখন ড্রাইবার সচকিত চোখে ফ্রন্ট মিররে দিয়ে ইমামার দিকে তাকাল। বরফের মতো জমে বসে আছে ইমামা। অথচ, কপালে চিনি দানার মতো শীতল ঘাম জমেছে। বরাবরের মতোই মুখটা পাথরের মতো, অনুভূতির কোনো ছোঁয়া লেগে নেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঠিকই শঙ্কিত।
‘পরদেশীয় গায়ের রং, ভিন্ন ধাঁচের আদল আর লালচে চুলের জন্য চলতে-ফিরতে এতোদিনে নানারকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে থাকে। কিন্তু কখনো অস্বাচ্ছন্দ্যকর অনুভব করেনি। কিন্তু আজ প্রথমবার নিজেকে নিয়ে ইনসিকিউর ফিল করছে ইমামা। কারণটা অজানা নয়। সেদিনের সেই সাজানো ভিডিওটা নিশ্চয়ই অনেকেই দেখেছে। এরপর সবাই তার সম্পর্কে কী ভাবছে, বা ভাবতে পারে—অবচেতনে তা টের পাচ্ছে ইমামা।

‘নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার মতো তার মোমঢালা লালিত চেহারা অসংখ্য ছেলের রাতের ঘুম হারাম করেছে। তার ধনুকের মতো লতানো দেহ, লালিত্যে ভরা ওষ্ঠ, হরিণী চোখ,গোধুলি রঙা চুলের বাহার হাজারো যুবকের মনে তুলেছে প্রেমের ঢেউ। প্রেমের লাহরীতে ভাসতে ভাসতে কল্পনার জগতে তাঁরা কতভাবে, কত রূপে সাজিয়েছে ইমামাকে, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। সবাই যে শুধু মোহাবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়েছে তার দিকে, তা নয়। কেউ কেউ খ্যাঁকশেয়ালের মতো কামুক চোখে গিলে খেয়েছে তাকে আড়াল থেকে। তার জন্য অনেক সম্পর্কে ফাটল পর্যন্ত ধরেছে। যার ফলে অনেক মেয়ের মনে জমেছে হিংসা আর ক্ষোভ। সেই ক্ষোভই এখন নীরব প্রতিশোধে পুঞ্জীভূত। তবে মাথার ওপর ক্ষমতাধর বাবার ছায়া ছিল বলেই কেউ সাহস পায়নি সামনে এসে কিছু বলার। কিন্তু আজ? যখন তো সুযোগ এসেছে, আজ তারা নিশ্চয়ই থেমে থাকবে না।

‘সময় নিয়ে গাড়ি থেকে নামল ইমামা। গভীর এক নিশ্বাস ফেলে ধীরে সামনে এগোল সে। কিন্তু ও গেইটের কাছে যাওয়ার আগেই একসঙ্গে পঞ্চাশজন ছেলে ভার্সিটির ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঝকঝকে পোশাক, নিখুঁত চুলের ছাঁটে বাহ্যিকভাবে তাদের সাধারণ ছাত্র বলেই মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের আসল পরিচয় অন্য। এরা টাকায় কেনা ভাড়াটে লোক। যারা অর্থের বিনিময়ে রূপ বদলায়, চরিত্র বদলায়। যেখানে যেমন বেশ দরকার, সেভাবেই তারা হাজির হয়। তারা ক্যাম্পাসে ঢুকেই মুহূর্তের মধ্যে ভিড়ের ভেতর মিশে গেল।

‘ইমামা যত ভেতরে এগোয়, ততই অসংখ্য শাণিত দৃষ্টি তার গায়ে এসে বিঁধতে থাকে। নত দৃষ্টি হলেও সে টের পায়, চারদিকের চোখ তার উপর গাঢ় হয়ে বসে আছে। কিন্তু যখনই কেউ কটুক্তির জন্য মুখ খুলতে যায়, তখনি মুখ খুলার আগেই তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় সেই ছদ্মবেশী ছেলেগুলো। এমনভাবে দাঁড়ায় যেন কাকতালীয় কিছু। অথচ, ইচ্ছাকৃতভাবে শার্টের কোণ সরিয়ে কোমরের রিভলভার ভাসিয়ে তুলতেই সকলের হাসির পরিবর্তে জায়গা নেয় আতঙ্ক। ঠোঁটের কোণে জমে যাওয়া তাচ্ছিল্য মুহূর্তেই উবে যায়। ভয় তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়। কেউ আর কিছু বলার সাহস পায় না ইমামাকে। এমনকি ফিরেও তাকায় না আর।
‘এইভাবেই ইমামা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় দুইতলায়। তবে যেমনটা ভেবেছিল, তেমন কিছুই ঘটে না। সবকিছু আজ অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক। অন্যদিনের থেকেও বেশ শান্ত। কেউ ধাক্কা খায় না ইচ্ছে করে, কেউ দূর থেকে ব্যঙ্গ হাসে না, কিংবা কানাঘুষায় তার নাম ফোটায় না। হঠাৎ করেই সব যেন থেমে গেছে নিস্তব্ধ এক ষড়যন্ত্রের মতো।

‘তিনতলায় পৌঁছাতেই প্রফেসর তাসনিম দ্রুত এগিয়ে এসে স্নেহভরে ইমামার কাঁধে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আরে ইমামা! তুমি এতোদিন এলে না কেন? অসুস্থ ছিলে নাকি, বেটা?”
‘হঠাৎ প্রশ্নে আর কৃত্রিম মমতাময়ী স্পর্শে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে যায় ইমামা। গলায় হালকা কাঁপন নিয়ে বলতে চাই,
“আসলে, ম্যাম…
‘তাসনিম ম্যাম তার কথা শেষ করতে দেয় না। ইমামার হাত টেনে ক্লাসরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
“ওই বিষয়টা নিয়ে এখনো কি আপসেট তুমি? একদম এসব নিয়ে ভাববে না, ইমামা। আমরা সবাই জানি ওটা তুমি ছিলে না। আমরা তোমার উপর বিশ্বাস রাখি। চলো, ক্লাসে যাই। আমি আর প্রিন্সিপাল স্যার তোমার বাবার সাথে কথা বলবো, বুঝাবো।”

‘আজ ক্লাসে কেউ আসেনি। না, কেউ আসেনি বললে ভুল হবে। ইমামার কেউ আসেনি। অর্ক, গৌরব, হিয়া, ইতরাত ওরা কেউই নেই আজ। চারপাশে হাসিঠাট্টা, চিৎকার, পদচারণার শব্দে পুরো ক্লাসরুম গমগম করছে, তবুও ইমামার ভেতরটা শুনশান। শান্তমূর্তির মতো কিছুক্ষণ বসে থাকে সে। নিস্পৃহ মুখে গ্রীবা বাঁকিয়ে আশপাশে ফিরে তাকায়। এই চাকচিক্য, এই মানুষ, এই কোলাহল, কোনোকিছুই ছুঁতে পারে না তাকে।
‘একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগটা তুলে নেয় সে। ওদের ছাড়া সে কখনো ক্লাস করেনি,আর না করতেও পারবে। যদিও সে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার মন স্থীর হয়নি সেই শূন্য ক্লাসে, যেখানে তার বন্ধুরা নেই। ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল ইমামা। সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকে, তখনি ফোনটা উচ্চশব্দে চেঁচিয়ে উঠল। আবারও শয়তানটার কণ্ঠে ভেসে এলো বিরহে ভেজা সুর,

“তুমি ছাড়া শূন্য, শূন্য লাগে,
ঠোঁটে আসে নাম,তোমার বারে বারে
বোঝায় কাকে, এ-কেমন ব্যাথা…
তুমি বড়ো প্রিয়, আমার প্রিয়
তুমি আমার মনের আঙিনায় থাকো
তুমি এতো প্রিয় আমার কাছে, কতো প্রিয় আমার কাছে, এতো প্রিয় আমার কাছে, জানো না?”
“সন অব বিচ।” ইমামা লিখল।

‘উত্তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে ফোন ব্যাগে রেখে দিল সে। হঠাৎ করেই নিজেকে কেমন অনুভূতিশূন্য লাগছে। মনে হচ্ছে, কোনোকিছুরই তাকে ছুঁতে পারছে না। অন্যমনস্ক হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ভুলবশত একজনের সাথে ধাক্কা লাগে। এই সুযোগে ছেলেটা অকস্মাৎ ওর বুকে হাত দেয়। ছদ্মবেশী ছেলেগুলো আড়াল থেকে ছুটে আসার আগেই ইমামা করে বসল এক ভয়ংকর কান্ড। হিলের সুচারু অংশ দিয়ে লাথি বসাল ছেলেটার গোপনাঙ্গে। ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত জায়গা চেপে ধরে ব্যথায় কাতরাতে থাকে ছেলেটা। ইমামা অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার দিকে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
“আরেকবার লাগতে আসলে কেটে হাতে ধরিয়ে দিবো, শুয়োর।”
‘ঝাঁঝালো বাক্য গুলো চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করে হনহনিয়ে চলে যায় সে। ইমামা চলে যেতেই সেই ছেলেগুলো নিচ থেকে আহত ছেলেটাকে তুলে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়।

‘ইমামা ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সোজা গার্ডেনের পথে হাঁটল। জারুল গাছের ছায়ায় একা একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ল সে। আনমনে ভাবনায় ডুবে গেল—উপন্যাসে, কবিতা আর সাহিত্যজুড়ে কত লেখক, কত কবি নারীর সৌন্দর্য নিয়ে তো লিখেছেন। বলা হয়, মানুষ নাকি সৌন্দর্যের পূজারী। পুরুষ মুগ্ধ হয় নারীর রূপে। কিন্তু ইমামা এটা বিশ্বাস করে না। তার মতে পুরুষের মুগ্ধতা দিনের আলোর মতো—যতক্ষণ আলো থাকে, ততক্ষণই রূপের কদর। রাত নামলেই বদলে যায় সব। তখন সৌন্দর্যের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু বুকের নরম মাংসপিণ্ড আর একটা ছোটো পিচ্ছিল পথের। নয়তো সুযোগ পেলেই পুরুষের হাত নারীর শরীরে যায় কেন? সাহায্যের হাত বাড়ানোর বদলে শরীর ছোঁয়ার তাগিদটাই কেন এত প্রবল?

‘ইমামা পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করে না। করতে পারে না।
তার জীবনে বাবা আর ভাইয়ের পর সবচেয়ে বিশ্বস্ত পুরুষ ছিল তিন বন্ধু। একজন তো চলে গেছে, রয়ে গেছে দুইজন। ইমামা জানে সাময়িক অভিমান যত গভীরই হোক, তাদের প্রতি তার বিশ্বাস কখনো ভাঙবে না।
‘চব্বিশ বছরের জীবনে কোনো ব্যক্তিগত পুরুষ ছিল না তার। সিডকে মন থেকে বিয়ে করতে চায়নি সে, তবু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়েছিল অসহায়ের মতো অপারগভাবে। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে সিডকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানেও হার মেনেছে। বিশ্রিভাবে ঠকতে হয়েছে তাকে। ভাগ্যিস তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি। নয়তো আঘাতটা কতটা গভীর হতো, ভাবতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।

‘তারপর থেকেই ‘বিশ্বাস’ শব্দটা তার কাছে ভয়ানক এক দানব। পুরুষের পাশে থাকলেই অস্বস্তি ঘিরে ধরে তাকে। কিন্তু, কিন্তু সেই মানুষটা, ওই অচেনা লোকটা অদ্ভুতভাবে তার ভেতরের প্রাচীরটা ভাঙতে শুরু করেছে। ইমামার কঠিন হৃদয় যেন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। ইমামা বোকা না। সে সবই বুঝতে পারে। কিন্তু কেন? কেন এই অস্থিরতা, কেন না চাইলেই বিশ্বাস করে ফেলা, কেন এই স্বস্তি অনুভব করা? কারণটা কি সত্যিই সে জানে না, নাকি জানে কিন্তু স্বীকার করতে ভয় পায়? নাকি ভা…..

“বিষন্নসুন্দরী….
‘ভাবনার সুঁতোয় টান পড়ল মেয়েলী কণ্ঠে। চাঁদের গায়ে মেখে থাকা কুয়াশার কোমলতার মতো নির্মল মুখে সর্বক্ষণ মেলানকোলিক কবিতার ভারি নিঃশ্বাসের সাথে মিশে থাকা বিষন্ন ভাব লেপ্টে থাকত বলে দু’জন মানুষ তাকে সবসময় ‘বিষন্নসুন্দরী’ বলে ডাকত। একজন কারিব আর অপরজন ইবরাত। একজন তো চলেই গিয়েছে, আরেকজন..
তাহলে কি….

‘তুফানের বেগে গ্রীবা বাঁকিয়ে ডানে ঘুরে বসে ইমামা। সামনে তাকানোর আগেই ইবরাত ঝড়ের মতো দ্রুত এসে ইমামাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রাখে। ইমামা স্তম্ভিত। পাথরের মতো জমে যায় ওর শরীর। ইবরার দু’হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় করল। আশ্চর্যবিমূঢ় ইমামাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজে থেকে বলতে শুরু করল,
“আই’ম সো স্যরি রে ইমু। সো, সো, সো চড়ি বিদেশি অ্যাপস। পিলিজ আমাকে ক্ষমা করে দে। আমার চুনুমুনু, আমার ওপর রাগ করে থাকিস না। আমি মানছি, আমি ভুল করেছি—তোকে অবিশ্বাস করেছি, কষ্ট দিয়েছি, দূরে সরিয়ে দিয়েছি। তুই তো বুদ্ধিমান। তুই নিজেই একবার সবটা ভেবে দেখ তো; আমাদের জায়গায় থাকলে কী তুই রাগ করতি না বল? আমাদের রাগ করাটা কি অস্বাভাবিক ছিল?

কারিব আমাদের কতটা আপন ছিল, সেটা তো তুই জানতি। ওর হঠাৎ মৃত্যু আমাদের সকলকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সবাই হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। তখন মনে হয়েছিল, তুই বার বার রিজেক্ট করেছিস ওকে, সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে ও সুই-সাইড করেছে। কিন্তু এখানে তো তোর ভুল নেই। ভালোবাসা তো আর জোর করে হয়না। তুই তোর জায়গা থেকে ঠিক ছিলি। একটু দেরিতে হলেও আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। বাকিরাও বুঝবে। ওদের একটু সময় দে। ওরা সবাই আবার তোর কাছে ফিরে আসবে। আমার মতো ভুল বুঝতে পেরে মাফ চাইবে। হিয়া অসুস্থ; সেজন্য আজ আসেনি। গৌরব আর অর্ক একটা কাজে গিয়েছে। আমি ওদের বোঝাবো, সুন্দর করে বোঝাবো। খুব দ্রুত ওরা ওদের ভুল বুঝতে পারবে। প্লিজ আমাদের ওপর আর রাগ করে থাকিস না। আমরা কেউই তোকে ছাড়া ভালো ছিলাম। তুই অসুস্থ ছিলি সময় কতবার ইমনকে কল দিয়েছি আমরা, বিশ্বাস না হলে ইমনকে জিজ্ঞেস কর তুই।”

‘ইমামা জানে তার জ্বরের দিনগুলোতে তার বন্ধুরা কতবার ইমনকে ফোন দিয়ে তার খোঁজ নিয়েছে। সে সবই জানে। আর এটাও মানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাতে তাদের প্রতি রাগ দেখানো স্বাভাবিক। কিন্তু এই মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর। শয়তানটা সেদিনও ইবরাতের কথা উল্লেখ করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। ইমামা চায় না, তার কারণে তার বন্ধুরা কোনো ক্ষতিগ্রস্ত হোক।
‘ইমামা ইবরাতকে টেনে সোজা করে করাল। দু’হাতের আঁজলায় ওর মুখ আলতো করে চেপে ধরে নরম গলায় বলল,
“ইবরাত, তোদের ছাড়া আমিও থাকতে পারি না। তোরা দূরে থেকেও আমার পাশে আছিস, সেটা আমি জানি। কিন্তু এখন সবকিছু পাল্টে গেছে। প্লিজ, আর ক’দিন আমার দূরে থাক। সব ঠিক হয়ে গেলে আমি সব খুলে বলব তোদের।”

‘ইমামা এসব কথার মানে ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না ইবরাত। সে আবারও ইমামাকে জাপ্টে ধরে বলল,
“আমি বুঝেছি, তুই এখনও রেগে আছিস, তাই তো? ওকে, যতক্ষণ না তোর রাগ ভাঙে, ততক্ষণ তোকে এভাবেই জড়িয়ে রাখব আমি।”
‘ইমামা কিছুতেই ইবরাতকে তার ভয় সম্পর্কে বোঝাতে পারে না। ইবরাতকে ছাড়াতে চায়, কিন্তু ইবরাত ছাড়ে না। অস্থিরতা তরঙ্গ ওর ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক তখনই ইমামার ফোনে আবারও আসে সেই শীতল মেসেজ,
“আমি আছি।”
‘অদ্ভুতভাবে ইমামা এক মুহূর্তে শান্ত হয়ে গেল। ভরসার একটা আঁচ পেল। ধীরে ধীরে বুঝতে পারল তার কথার মানে। ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে অল্প হেসে বলল,
“আচ্ছা যা, মাফ করেছি।”

‘ইবরাত চট করে মাথা তুলল, চোখ বড় বড় করে জানতে চাইল,”সত্যি?”
‘ইমামা মিকি হেসে মাথা নাড়াল। ইবরাত ওর গাল বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তাহলে একটা চুম্মা দে।”
‘ইমামা নাক কুঁচকিয়ে বলল,”ছিঃ ইবরাত, তুই মেয়ে।”
“তো কী হইছে, চুম্মা দে একটা। তাহলেই বুঝবো তুই রাগ করে নেই।”
“না, আমি দিতে পারব না।”
“কেন?”
“তুই জানিস, এগুলো আমার ঘেন্না লাগে।”
‘ইবরাত ভেংচি কেটে বলল, “শালির ঘরে শালি, এতো যে ঘেন্না লাগে, বিয়ের পরে কি কলা খাবি? তোর জামাইয়ের কপাল পোড়া। আই ফিল সো ব্যাড ফর হিম।”

‘ইবরাতের কথা শুনে হঠাৎ ইমামার মনে পড়ল সেই চিরায়ত ব্যক্তির গম্ভীর কণ্ঠে কিছুক্ষণ আগে বলা নির্লজ্জ মার্কা কথাটা। পেটের ভেতর অদ্ভুতভাবে গুড়গুড় করতে লাগল। ইবরাত হঠাৎ ওয়াশরুমের নাম করে সরে গেল৷ কিন্তু ভেতরে গেল না; আড়ালে গিয়ে ফোনে কাউকে কল দিল। রিসিভ হতেই কৃতজ্ঞ কণ্ঠে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ আর.কে, আমার ভুলগুলো ভেঙে দেওয়ার জন্য। সত্যিই, আমরা ভুল করেছিলাম। এতোদিন নিজের সঙ্গে লড়ে যে দ্বন্দ্ব থেকে বেরোতে পারিনি, তা এক ঝটকায় আপনি ভেঙে দিয়েছেন। আপনি সত্যিই জিনিয়াস। আপনার জন্য আমাদের ফেন্ডশিপ আবারও জোড়া লাগল। আশা করি, বাকিরাও তাদের ভুল বুঝতে পারবে। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।”

‘ওপাশের কণ্ঠস্বর পাথরের মতো গম্ভীর। কোনো সৌজন্য নেই, কোনো কোমলতা নেই, অথচ কথায় আছে অদ্ভুত ভার,
“ডু নট ম্যানশন। ইটস মাই ডিউটি টু মেক হার লাইফ লাইক আ হেভেন। ওর পাশে এই মুহূর্তে ওর বন্ধুদের প্রয়োজন। ইউ গাইজ এনজয় ইওর টাইম।”
‘লোকটা কল কেটে দিতে উদ্যত হলো। ইবরাত খুব অল্পেই বুঝে গিয়েছে এই লোকটা স্বল্পভাষী। কিন্তু কল কাটার আগে হঠাৎ ইবরাত তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“আপনি কী সত্যিই ইমামাকে ভালোবাসেন?”
“মুখে বলে কী হবে? যদি কাজে প্রমাণ না পায়?”
‘মুখের ওপর কল টা কেটে গেল। কিন্তু ইবরাতের ছোট মস্তিষ্কে এই পেঁচানো কথার মানে ঠিকভাবে আটকালো না।

‘আজ রোদের প্রখরতা অসহনীয়। পচাঁ সূর্য মামা টা যেন মাথার ওপর খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গলা শুকিয়ে গেছে ইমামার। হঠাৎ তীব্র কাশি ধরে। কাশতে-কাসতে ওর গলা ব্যথা পাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, কেউ হঠাৎ সামনে এগিয়ে দেয় একটি পানির বোতল।
‘ইমামা চমকে হাতের মালিকের দিকে তাকালো। যখন সে ন্যাসোর মুখ দেখল, অদ্ভুতভাবে কাশি থেমে গেল। ন্যাসোর দৃষ্টি অন্যদিকে। সামনের দিকে তাকালে যেন তার পাপ হবে। ইমামা বোতল নেবে না বুঝতে পেরে ন্যাসো সামান্য গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“ম্যাম, আমি আর.কে-এর লোক। আই মিন, হিজ রয়াল বডিগার্ড।”
‘দূরত্ব বজায় রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। ইমামার দৃষ্টি ক্রমশ সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। তেরছা কণ্ঠে বলল,
“তো?”
“আমি আপনার ডিউটি পালন করছি।”

“আপনার ডিউটি?” ইমামা জিজ্ঞেস করল। বলার মধ্যেই ন্যাসোর হাত থেকে বোতল নিয়ে তৃষ্ণা মেটালো। অতঃপর ইমামা নিজেই অবাক হয়ে রইল। সেদিন কুকুড়ের মাংসের সুপের পর থেকে ও আর কাউকে বিশ্বার করতে পারে না। সেদিনের পর থেকে কারো হাতের খাবারে খায় না,আর না তো বাইরের খাবার। এমনকি বাসায়ও নিজের রান্না নিজে করে খায়। কিন্তু ইমামা আজ নিজেই অবাক। শুধুমাত্র লোকটার নাম শুনে এভাবে নির্দ্বিধায়, কোনো সংকোচ ছাড়াই খেতে পারছে সে। একটুও ভয় কিংবা দ্বিধা কাজ করল না। এর কি মানে সে সেই লোকটাকে ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে?

‘ন্যাসো স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বুকের ওপর হাত ভাজ করে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“জি। আগে পার্ট টাইম ছিল, এখন ফুল টাইম। আই মিন এখন আপনাকে চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখছি—এটাই আমার ডিউটি।”
‘ইমামা ন্যাসোর কথায় থতমত খেয়ে গেল। এর মানে কী? সে কে, যে তাকে চব্বিশ ঘণ্টা নজরে রাখার সাহস দেখাচ্ছে? এই এখতিয়ার তাকে কে দিয়েছে? হঠাৎই মনে পড়ে গেল তাদের গতকালের শর্ট কনভেনশন,
“তুমি ফুলের চেয়েও সুন্দর, বিশ্বাস করো তো?”
‘ইমামা টাইপ করার আগেই তার মেসেজ আবার আসে,
“তুমি ভোরের চেয়েও স্নিগ্ধ, মানো তো?”
‘ইমামা হতভম্ব। হঠাৎ এসব কী বলছে এই লোকটা? আর এই তুমি! হঠাৎ তুই কেন? সে তো কখনো তাকে তুমি বলেনি, সবসময় আপনি ব্যবহার করেছে। রেগে গেলে তুইতোকারি করেছে। তখন ইমামাও কথা দিয়ে ছাড়েনি। চিবুক শক্ত করে ইমামা লিখল,

“না।”
‘সে আরও লিখল,
“তুমি সূর্যের মতো তেজি, মানো?”
“হ্যাঁ!”
“তোমার ভেতরটা মাঘের মতো শান্ত, বর্ষার মতো ভেজা, বুঝো?”
‘ইমামা চুপ। সে আবার জোর দিল,
“তোমার আমাকে প্রয়োজন, বিশ্বাস করো?”
“আমার কাউকে প্রয়োজন নেই।”
“আমার তোমাকে প্রয়োজন, বড্ড প্রয়োজন।”
‘ইমামা আবার চুপ। তখন সে শেষবার লিখল,
“মেরি ইস্ক ম্যে তেরি জান ফানাহ্ হো যায়!”
‘ইমামার মনে উদ্দীপনা আর সন্দেহ এক সঙ্গে জেগে ওঠে। লোকটা কি সত্যিই তাকে প্রেমে ফেলার জন্য এসব করছে? সে তো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল—সে ইমামাকে তার প্রেমে ফেলে ছাড়বেই। কিন্তু হারার মেয়ে তো ইমামা নয়।

‘হঠাৎ ইমামা সরাসরি ন্যাসোর উদ্দেশ্যে বলল,”আপনার শার্টে হিডেন ক্যামরা সেট করা আছে, রাইট?”
‘ন্যাসো ইমামার চতুর বুদ্ধিতে কিছুটা ভরকে গেলেও মিথ্যার আশ্রয় নেয়নি। শীতল কণ্ঠে বলল,
“শুধু আমার না, সবার!” সামনের দিকে ইশারা করল সে। ইমামা তাকালেই দেখতে পেল ছদ্মবেশী ছেলেগুলোকে। সে চমকে উঠল। ন্যাসো এবার গেইটের দিকে ইশারা করল। ইমামা সেদিকে তাকাতেই শিউরে উঠল. এতো গার্ড একসাথে সে আগে কখনো দেখেনি। শুকনো ঢোক গিলে ভেতরে, ভেতরে মিইয়ে গেলেও তেজ নিয়ে বলল,
“তারমানে, আপনার বস সবসময় আমাকে দেখতে পাচ্ছে, রাইট?”
“ইয়েস, ম্যাম।”
“চোখ বন্ধ করুন।”
“সরি, ম্যাম।”
“মানে?”
“এক সেকেন্ডের জন্য আপনাকে চোখের আড়াল করলে, আমার চোখ তুলে নেওয়া হবে,ম্যাম।
“আই সেইড, ক্লোজ ইওর আইসস!”

‘সারাক্ষণ কানে গুঁজে রাখা ব্লুটুথে তৎক্ষনাৎ সংকেত এসে পৌঁছল। উপরের হুকুম পাওয়ার পরই ন্যাসো চোখ বুজে। ইমামা সঙ্গে সঙ্গে মধ্যমা আঙুল বের করে দেখিয়ে দিল। তা দেখে ল্যাপটপের সামনে থাকা মানুষের ঠোঁটে এক চিলতে ক্রূর হাসি ফুটে উঠল। তার গভীর দৃষ্টি ল্যাপটপের স্ক্রিনে আটকে। অথচ স্ক্রিনের পিছনে রক্তের বন্যা। পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অস্ত্র, ড্রাগস, আর মেঝেতে কয়েকজনকে জবাই করা হচ্ছে। নিশ্চয়ই এখানে কোনো কাজের ভুল বা প্রতারণার শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
‘ন্যাসো চলে যেতেই ইবরাত এসে ইমামার পাশে বসল। বসেই সবসময়ের মতো হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে বলে,
“এহহহহ্, বিয়ে করে ফেলবো। বাঁচবোই বা আর ক’দিন?”
‘ইমামা বলল,”তুই মুখে রোজই বিয়ে করে ফেলিস।”
‘ইবরাত জবাব দেয় না। শব্দ করে শ্বাস ফেলে। ইমামা কি যেন ভেবে হঠাৎ বলল,
“কারিব কয় জানি তারিখে মারা গেছে, ইবু?”
‘ইবরাত সচকিত চোখে তাকাল ইমামার দিকে। ইমামার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। একবার একটা কিছু দেখলে সেটা আর কখনোই ভুলে না ইমামা।

“মানে? তুই কী সত্যি মনে করতে পারছিস না কারিব কবে মারা গেছে?”
‘ইমামা মাথা নাড়াল। সে চেষ্টা করল অনেকক্ষণ মনে করার। কিন্তু, যখনই বুঝতে পারল, সে কিছুতেই মনে করতে পারছে না, তখন মনের অজান্তেই চোখের কোণ ভিজে আসে। অন্তরে নামে আঁধার।
‘ইবরাত ভাবল ইমামা হয়তো ওর অসুস্থতা নিয়ে চিন্তিত, তাই বেফাঁসে ভুলে গেছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাত রাখল ইমামার পেটের বাঁ দিকে। মোম গলা নরম কণ্ঠে বলল,
“এবার অপারেশন টা করিয়ে নে, ইমু।”

‘ইমামা ইবরাতের হাত সরিয়ে দিয়ে বেঞ্চে গা হেলিয়ে চোখ বুঁজে। নিরেট ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমার জন্য কারো জীবন রিস্কে পড়ুক, তা আমি চাই না ইবরাত।”
‘গর্জে উঠল ইবরাত,”তোর এসব কথা রাখ তো ইমু। একটা কিডনি নিয়ে দিব্বি বাঁচা যায়।”
‘ইমামার ঠোঁটে নির্জীব হাসি। চেহারার উজ্জ্বলতা আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। হঠাৎ ও উঠে দাঁড়াল।
“আমার একটা কাজ আছে। আমি আসছি রে।”
‘তারপর ইবরাতকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেল। অফিসার মাহেশ সেদিন রাতে এক্সিডেন্ট করেছে। এখন হসপিটালে আছে। ওনার সাথে দেখা করা খুব প্রয়োজন। এখনো অনেককিছু জানার আছে। তার হাতে সময় কম, যা করার দ্রুত করতে হবে।

‘ইমামার গাড়ির ঠিক পিছনেই ন্যাসোর গাড়ি। পিছনে আরও কয়েকটা গাড়ি আছে। ন্যাসো চোখ এক মুহূর্তের জন্যও সামনে থেকে সরে না। আচমকা ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে লেখা—‘Boss’। বুকের মধ্যে শুকনো ঢোক গিলে কলটা রিসিভ করল সে।
“বস, নজরে আছে। ডোন্ট ওয়ারি।!
‘ওপাশ থেকে ভারি, ঠান্ডা কণ্ঠস্বর,”কাজে কোনো ভুল যেন না হয়, ন্যাসো।”
“ওকে, বস।” তারপর একটু থেমে নরম গলায় বলল,”লোকার কাছ থেকে শুনলাম ইদানীং ফাদারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছে না?”
‘তার কণ্ঠে বজ্রপাত,”দ্যাটস নান অব ইওর বিজনেস।”
“সরি, বস।”
‘একটু নীরবতা। তারপর বসের কঠিন গর্জন,

“ওই বাষ্টার্ডটাকে খুঁজে বের করতে আর কতদিন লাগবে?”
‘ন্যাসোর গলায় চাপা ক্ষোভ আর অসহায় রাগ,”বস, রাস্কেলটা ভীষণ চালাক। চোখের সামনে দিয়েই ফসকে যায়। আর ওর সঙ্গে একটা সাপ আছে। যখনই ধরতে যাই, ওই সাপটা আক্রমণ করে। এখন পর্যন্ত আমাদের চারজন গার্ড মারা গেছে। ফরেনসিক রিপোর্টে বলেছে ওই সাপটা বিশ্বের সবচেয়ে বিষধর প্রজাতি সাপগুলোর মধ্যে একটা।”
‘তার কণ্ঠে জমে থাকা দুনিয়ার সমস্ত ক্ষোভ,”তাহলে আগে এই সাপটাকেই চাই।”
“ওকে, বস।”
‘ন্যাসো থেমে একটু ইতস্তত করল,”শুনলাম, ড্রাগসের চালানে নাকি দশ মিলিয়ন ডলারের লস হয়েছে?”
“হু কেয়ার্স?”

‘ন্যাসো চুপ করে গেল। তারপর গলা নিচু করে বলল,
“আমার মনে হয়, আপনার এবার একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত।”
“আই’ভ অলরেডি মেড আপ মাই মাইন্ড — শি’জ দ্য অনলি ওয়ান।”
‘বসের এই স্বীকারোক্তিতে ন্যাসোর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল। কুটিল হেসে বলল,
“তা দেখা হচ্ছে কবে?”
‘ওপাশের কণ্ঠ হঠাৎ বিস্ফোরিত হল,”ওই বিচ কালকেও সুইসাইড করার চেষ্টা করেছে!”
“কি বললেন?” আঁতকে উঠল ন্যাসো। “সোফিয়া আবার সুই-সাইড করার চেষ্টা করেছে?
“রিল্যাক্স, মরেনি।”

Born to be villains part 10

‘ন্যাসো গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ছোট্ট মুখে একটা কথা বলি, বস—এতটাও আসক্ত হবেন না, যতটা হলে ধ্বংস হবার সম্ভাবনা থাকে।”
‘ওপাশের কণ্ঠে নির্লিপ্ত দৃঢ়তা,
“তাকে পাওয়ার জন্য যদি ধ্বংস হতে হয়—তাহলে ধ্বংসের ময়দান নিজের হাতে সাজাবে, রিচার্ড কায়নাত।”

Born to be villains part 11 (2)

1 COMMENT

Comments are closed.