প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৫
রাত্রি মনি
গাছের নিচে হাঁটু মুড়ে বসে শীতে থরথর করে কাঁপছে রিম। তার পরনে শুধুমাত্র জেইনের, ওভারসাইজ শুভ্র শার্টটা, যা তার ভিজে শরীরকে সামান্য আড়াল করেছে।তাও ভিজে থাকায় প্রায় স্বচ্ছ। পাশে খালি গায়ে বসে জেইন তখনো পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর চেষ্টায় মগ্ন। তার খোলা বুকে-পিঠে অজস্র লালচে খামচি আর কামড়ের ছোপ ছোপ দাগগুলো—স্পষ্টভাবে জ্বলজ্বল করছে। যেন তাদের একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের সাক্ষ্য বহন করছে।
অবশেষে পাথরে ঘর্ষণ থেকে স্ফুলিঙ্গ ওঠে। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। জেইন মুখ কাছে নিয়ে ফু দেয়। কাঠে আগুন জ্বলে ওঠে।জেইন রিমকে আলতো করে কোলে তুলে নিজের উরুর ওপর বসিয়ে দেয়। তার উরুর ওপর বসানো রিমের শরীরটা হালকা কাঁপছে। তার বুকের ভেতর থেকে বেরোচ্ছে ঠান্ডা নিঃশ্বাসের ধোঁয়া। জেইন দুই হাতে আগুনের তাপ নিয়ে রিমের ঠান্ডায় জমে যাওয়া, ফ্যাকাশে গালে রাখে।মেয়েটার ঠান্ডা ত্বকে উষ্ণতা ছুঁয়েই তার ভেতরে অন্য এক রকম উত্তাপ জেগে ওঠে।
রিম গুটিয়ে আসে, একদম ছোট্ট খরগোশ ছানার মতো, জেইনের বুকের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে ফেলে।তার নিশ্বাস তখনো খুব দুর্বল। জেইন আরও কয়েকটা কাঠ দিয়ে আগুনের তাপ বাড়িয়ে দেয়। পাশেই রিমের ভিজে কাপড়গুলো শুকাতে দেওয়া হয়েছে। চারপাশে এক অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধতা বিরাজমান।শুধু আগুনের টুকরো শব্দ, আর দূরে কোনো নিশাচরের ডাক শোনা যায়। জেইন রিমকে বুকের সাথে জড়িয়ে কপালে একটা উষ্ণ চুমু এঁকে দিল, তারপর আলতো করে চুলগুলো কানের নিচে গুজে দিল। আহ্লাদী স্বরে, তার কণ্ঠস্বরে তখনও নেশার রেশ,
“এখনো ব্যথা হচ্ছে? ওখানে?”
রিম ধীরে মাথা নাড়িয়ে প্রায় শোনা যায় না এমন নিচু গলায় বলল,
“হুম, একটু।”
জেইন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেইসব মুহূর্তে সে যতই কোমল হওয়ার চেষ্টা করে তত আরও বেশি রুক্ষ হয়ে ওঠে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কিছুতেই। সে রিমের শরীরে নিজের উষ্ণতা মিশিয়ে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
“সরি সোনা। আমি বুঝতে পারিনি, খুব বেশি ব্যাথা দিয়ে ফেলেছি তাই না?”
তার আলিঙ্গন আরো বেশি দৃঢ় হয়,
“তুমি আমাকে জড়িয়ে একটু চুপচাপ বসে থাকো। একটু পর সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রিম তার উষ্ণ ঘাড়ে মাথা এলিয়ে দিল। শরীরটা আর স্থির রাখতে পারছে না—হঠাৎ একটু টান খায়; যেন চিনচিনে ব্যথা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। পেটের ব্যথা যেন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। সে জেইনের গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলে উঠলো,
“আরাত্র…”
“উমমম্…”
জেইনের সেই মাদকের মতো কন্ঠস্বর রিমের শরীরে আবার কাঁপন ধরিয়ে দিল। সে শুষ্ক ঢোক গিলে নিল। কাঁপতে কাঁপতে মিনমিনে গলায় বলল,
“ক্ষিদে পেয়েছে খুব।”
এই কথাটুকু বলতেই রিমের গলা কেঁপে ওঠে। চোখে জল চিকচিক করে। জেইনের বুক থেমে যায় মুহূর্তের জন্য।সকাল থেকে না খেয়ে আছে মেয়েটা। তারা স্কাইডাইভিংয়ে আসবে বলে না খেয়েই বেরিয়েছিল। এখন তো সন্ধ্যা হতে চললো! ক্ষিদে পাবারই কথা। সে রিমকে নিরাপদ ভঙ্গিতে গাছের সাথে হেলান দিয়ে শুইয়ে দেয়। আশেপাশে একবার ভালোভাবে তাকিয়ে সবটা পর্যবেক্ষণ করে নেয়। ঘুরেফিরে রিমের দিকে তাকাতেই গলা শুকিয়ে গেল তার। রিমের শার্টের কলার সরে গিয়ে বুকের অনেকটা অংশ উন্মুক্ত। আগুনের আলোয় তার বুকের উপরের ত্বক লালচে ছায়া ছড়াচ্ছে।জেইনের দৃষ্টি আটকে যায় সেখানে—মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতর আগুন ছুটে যায়। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। গলা শুকিয়ে যায়।
তার মনে হয়, এই মেয়েটা যেন কোনো নিষিদ্ধ ফুল, যেটা ছোঁয়া মানে ধ্বংস। আর সেই ধ্বংসকেই সে চোখ বুজে করে আলিঙ্গন করে মৃত্যুবরণ করতে চায়। সে দৃষ্টি ফেরাতে পারে না। একটা কষ্টকর শুষ্ক ঢোক গিলে ফেলে। এই দুর্বল মুহূর্তেও তার পশুর মতো চাহিদা যেন গলা টিপে ধরছে। এতো যন্ত্রণা কেন হচ্ছে বুকে? একটু আগেই তো এই তুলতুলে শরীরটা তার অধীনস্থ ছিল! এই মুহূর্তে রিমকে আরও বেশি করে কাছে টানার তীব্রতা তাকে নিয়ন্ত্রণহীন করে দিচ্ছে। সে দীর্ঘ, গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলে—তার তৃষ্ণা মিটছে না কিছুতেই। এই মেয়েটাকে সে যত কাছে পাচ্ছে, তত আরও বেশি করে তার অস্তিত্ব গ্রাস করতে ইচ্ছে করছে।সে কাঁপা হাতে রিমের কলারটা টেনে ঠিক করে, ধীরে ধীরে উপরের বোতামটা লাগিয়ে দিল।
“আমি খাবারের ব্যবস্থা করে আসছি। তুমি এখানেই থাকবে। এখান থেকে এক ইঞ্চিও নড়বে না… কেমন?”
রিম নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। ধীরে ধীরে, রক্তজমাট ঠোঁট নাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমরা বাড়ি যাবো কখন?… আমার আর ভালো লাগছে না…”
“যাবো তো সোনা। খুব শীঘ্রই। তোমাকে নিয়ে এভাবে এই পাহাড় পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি তোমার এই দুর্বল শরীরকে আর কষ্ট দিতে চাই না। আমাদের এখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত ওরা আমাদের খুঁজে পাচ্ছে। আমার মনে হয় ওরা আমাদের আশেপাশেই কোথাও আছে। হয়তো হেলিকপ্টার নিয়ে আমাদের খুঁজছে। খুব শীঘ্রই ওরা আমাদের খুঁজে পেয়ে যাবে। তারপর আমরা আবার বাড়ি যেতে পারবো। তুমি এখানে একটু কষ্ট করে অপেক্ষা করো। আমি তোমার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে আনছি।”
“তাড়াতাড়ি আসবে। আমার একা ভালো লাগে না।”
জেইন রিমের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিল।
“ঠিক আছে, লক্ষ্মীটি। আমি এইতো যাবো আর আসবো।”
সন্ধ্যা নেমে এসেছে।বনের মধ্যে আগুনটা এখন ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে জ্বলছে—তার চারপাশে ছায়াগুলো নড়ছে, যেন জীবন্ত কিছু নড়ছে পাতার আড়ালে। দূরে হাওয়ায় পাতা নড়ে এক অদ্ভুত ফিসফিস শব্দ তুলছে।
হঠাৎ পাতার মচমচ শব্দ শোনা যায়।আগুনের আলোয় ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে জেইনের অবয়ব। হাতে কয়েকটি নাম না জানা রসালো ফল আর কিছু বুনো কাঠবাদাম।
সে রিমের কাছে এসে দেখে, রিম ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে আছে।
মেয়েটার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে উঠছে-নামছে। আগুনের আলোয় তার মুখের ছায়া পড়ে আছে—যেন কোনো পবিত্র ফুল। জেইন নিঃশব্দে বসে পড়ে তার পাশে। জেইন নেশাক্ত ঘোর লাগা চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গিয়েছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। জেইন ধীরে তার মাথায় হাত রাখে—আলতো করে আঙুল চালায় চুলের ভেতর দিয়ে। মৃদু স্বরে ডেকে ওঠল,
“ফায়ারফ্লাই… সোনা, হেই বার্বিডল… উঠো সোনা। দেখো আমি তোমার জন্য কি নিয়ে এসেছি।”
রিমের চোখ ধীরে ধীরে খুলে যায়। চোখে আগুনের লাল প্রতিফলন পড়ে—যেন আধঘুমে জেগে থাকা কোনো পরীর মতো দেখাচ্ছে তাকে। জেইন তাকে নিজের বাহুর মধ্যে টেনে আনে। তার হাতের মুঠোয় রিমের কাঁধ ঢেকে যায় পুরোপুরি।
“নাও… এই ফলগুলো খেয়ে নাও। শরীরের দূর্বলতা কিছুটা কমবে।”
রিম কাঁপা হাতে ফলগুলো নেয়। কামড় বসাতেই মিষ্টি রস ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। সে এমনভাবে খেতে থাকে যেন ক্ষুধা তার শরীর ছিঁড়ে খাচ্ছে। রিম নিজেই বুঝতে পারছিল না তার এতো ক্ষিদে পাবার কারণ কি?/—আগে হলে সে সারাদিন না খেয়ে থাকলেও এতো কষ্ট হতো না, কিন্তু এখন ক্ষিদেটা যেন এক আদিম আকাঙ্ক্ষার মতো তাকে চেপে ধরেছে।
জেইন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে—তার গলার নড়াচড়া, ঠোঁটের ভেজা আভা, ফলের রঙে লালচে হয়ে ওঠা আঙুলের দাগ…
সবকিছু তার ভিতরকার আগুনে ঘি ঢেলে দেয় যেন।
রিম খেতে খেতে হঠাৎ থেমে যায়। তার হাতের লালচে কামড়ে খাওয়া ফলটা জেইনের দিকে এগিয়ে ধরে।
“এটা তুমি খাও।”
জেইন সামনে ঝুঁকে আসে। তার ছায়া রিমের মুখের ওপর ঢেকে যায়। তারপর—হঠাৎ একটা হিংস্র, তীব্র কামড় বসায় ফলটার ওপরে। রিমের শরীর কেঁপে ওঠে।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ বিদ্যুতের মতো একটা ঝাঁকুনি লাগে। নিঃশ্বাস আটকে আসে। জেইনের মুখ এখন তার মুখের একদম কাছে। তার গালের পাশ ছুঁয়ে জেইনের উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়ে। তপ্ত, ধীর, কামনামিশ্রিত।রিমের চোখ বন্ধ হয়ে আসে, শ্বাস ভারী হয়ে যায়। তার সমস্ত দেহের এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া— সে বুঝে উঠতে পারে না।জেইন ধীরে ধীরে মুখটা আরও কাছে আনে। তার ঠোঁট রিমের কানের পাশে ছুঁয়ে যায়, আর সেই ছোঁয়াতেই রিমের শরীর শিরশির করে উঠে।জেইন গাঢ় মাদকতা মেশানো কণ্ঠে ফিসফিস করে,
“টুনা ফিশ খাবে?”
রিম চমকে উঠে তাকায়। তার বুক ধড়ফড় করছে, চোখ বিস্ফারিত। এই মানুষটা কীভাবে সাধারণ একটা কথা এমনভাবে বলতে পারে যে নিঃশ্বাসই বন্ধ হয়ে যায়? সে কাঁপা গলায় বলে,
“ক… কিভাবে?”
জেইন ঠোঁটের কোণে হালকা রহস্যময়ী বাঁক এনে বলে,
“সেই চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। তুমি শুধু বলো, খাবে কি না?”
রিমের চোখে এক ধরনের তন্দ্রা নেমে আসে। সে যেন পুরোপুরি জেইনের আওতায় চলে গেছে।
তার ঠোঁট কাঁপে, তারপর মৃদু স্বরে বলে,
“খা..খাবো।”
জেইনের চোখে তখন এক চিলতে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা ঝলকে ওঠে। সে পাশ থেকে একটা ধারালো, সূক্ষ্ম পাথর আর একটা শক্তপোক্ত লম্বা লাঠি তুলে নিল। তারপর দক্ষ হাতে শুকনো লতা দিয়ে বেঁধে ফেললো।
“আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি। তুমি এখানেই বসে থাকো, ঠিক আছে?”
রিম দ্রুত বলে ওঠে,
“আমিও যাবো।”
জেইন মুখ তুলে তাকায়। আগুনের আলোয় তার চোখদুটি ধূসরচে ঝিকমিক করে ওঠে।
“কিন্তু তুমি তো হাঁটতে পারছো না।”
রিম কাঁপা গলায় বলে,
“এখন পারবো… আই’ম ফাইন নাও।”
“তার কোনো দরকার নেই। তুমি এখানেই থাকবে। আমি যাবো, আর আসবো।”
“না! আমিও যাবো।”
রিমের কণ্ঠে জেদ, একগুঁয়েমি।
জেইন চুপ করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
“আর ইউ শিওর ইউ ক্যান ওয়াক?”
“হুম।”
জেইন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে, তারপর এক ভ্রু উঁচু করে বলে,
“আমি কিন্তু মাছ ধরতে গিয়ে তোমায় কোলে নিতে পারবো না…”
রিম ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
“উফ্! বললাম তো পারবো।”
জেইন শিকারি লাঠিটি হাত থেকে নিচে রেখে দিল। ধীরে ধীরে আগুনের পাশে ঝুঁকে রিমের কাপড়গুলো হাতে তুলে নিল—আগুনের তাপে এতক্ষণে সেগুলো উষ্ণ হয়ে উঠেছে। সে রিমের ঠিক পাশে হাঁটু মুড়ে বসল। রিম তখনো কম্পিত শরীরে নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। জেইন ধীরে ধীরে তার শার্টের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল। গাঢ় কন্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“Change first, Otherwise it will get colder again, and you will get sick. And I won’t let that happen.”
প্রতিটি বোতাম খোলার সাথে সাথে যেন তাদের অন্তরঙ্গতা আরও গভীর হচ্ছিল। তার আঙুলের উষ্ণ স্পর্শ রিমের ফ্যাকাশে ত্বকে এক শিহরণ জাগাচ্ছিল।
যখন শার্টটি পুরোপুরি খুলে গেল, রিম লাজুক দৃষ্টিতে চোখ নামিয়ে নিলো। মিইয়ে গেল লজ্জায়, তার গাল দুটো আবার রক্তিম হয়ে উঠল। শরীর যেন জমে গেল। কিন্তু সে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলো না। কারণ তার শরীরে এমন কিছুই অবশিষ্ট নেই যা জেইনের অজানা। জেইন এক মুহূর্তের জন্য তার খোলা শরীরের দিকে তাকাল—সেখানে কামড়ের দাগ আর চুম্বনের চিহ্ন তখনও স্পষ্ট। সেই দৃশ্য জেইনের বুকে কামনার এক তীব্র ঢেউ তুলল, কিন্তু সে কষ্ট করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রিমকে কাপড় পড়িয়ে দিল।
জেইন তখন হাঁটু অব্দি পানিতে। হাতে লোহার ধারালো বর্শা, চোখ স্থির, নিঃশ্বাস পর্যন্ত হিসেব করা। চাঁদের মলিন আলো পানির উপর রক্তের মতো ঝলমল করছে। তার পেশিগুলো টানটান, যেন—এক অদৃশ্য হিংস্র শিকারি দাঁড়িয়ে আছে ঝিলের বুকে।
পাশে রিম। পানিতে পা ভিজিয়ে বসে আছে। তার চোখে কৌতূহল, ঠোঁটে হালকা হাসি। কিন্তু জেইনের মুখে সেই হাসির কোন ছোঁয়া নেই। সে বারবার রিমকে কে বারণ করেছিল, পানি থেকে দূরে থাকতে বলেছিল। কিন্তু রিম শোনেনি। হঠাৎ জেইনের চোখে এক ঝলক। নিঃশ্বাস বন্ধ। মুহূর্তেই বর্শা ছুড়ে দিল পানিতে,
“শ্বাাশ!”
ছপ করে ওঠা শব্দে দেখা গেল একটা বিশাল টুনা মাছ, ছটফট করছে। তার ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্টির বাঁকা হাসি।
আর তখনই—
“আআআআআআআআআআআ!!!!”
ভয়ংকর, তীক্ষ্ণ, কানে ছুরির মতো গেঁথে যাওয়া এক তীব্র চিৎকার। যা ভেঙে দিল প্রকৃতির নৈঃশব্দ্য।
জেইন বর্শা ফেলে দিয়ে বিদ্যুৎ-বেগে ঘুরে দাড়াল। ভয়াবহ দৃশ্য! রিম জলে হাবুডুবু খাচ্ছে। বিষাক্ত, ক্ষুধার্ত পিরানহা মাছের দল ঘিরে ধরেছে তাকে। একটা না… দুইটা না… সাত-আটটা বিকট লালচে চোখওয়ালা মাছ, রক্তে ক্ষুধার্ত, বীভৎসভাবে কামড়ে ধরেছে জামা। জেইনের শিরায় যেন বরফ গলে গেল। হাড় পর্যন্ত জমে গেল। পরের সেকেন্ডে সেই জমাট হাড় ভেঙে গেল হিংস্রতায়।
এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ঝাঁপিয়ে পড়ল রিমের দিকে।ইতিমধ্যে, একটি পিরানহা রিমের কোমরের কাছে, আরেকটি পায়ের কাছে কামড়ে ধরেছে। রিম যন্ত্রণায় মুচড়ে যাচ্ছে। তার গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে এলো, করুণ ভাবে ডেকে উঠলো জেইনের নাম ধরে,
“আরাত্র… আরাত…. আআআআ আমাকে বাঁচাও!”
রিমের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। তার শরীর ছটফট করছে, রক্ত পানির সাথে মিশে লাল ধোঁয়া তুলছে।পিরানহার দাঁতের ক্ষতচিহ্ন রিমের পা এবং কোমরের কাছে বসে গেছে। জেইন পাগলের মতো তার কাছে পৌঁছে হাত দিয়ে টেনে টেনে পিরানহা সরাতে থাকল। সে যতবার সরায়, ততবার সেগুলো আরও হিংস্রভাবে কামড়ে ধরে। একসময় তার নিজের হাতেও কামড় বসালো। ঝরঝর করে রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে ফিনকি দিয়ে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সে নিজের ব্যথা অনুভবই করছে না। জলের স্বচ্ছ রঙ মুহূর্তেই লালচে রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে।রিমের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, নিঃশ্বাস ধীর।
জেইন অস্থির, প্রায় আর্তনাদ করা কণ্ঠে বলে ওঠে,
“চোখ খুলে রাখো সোনা! কিচ্ছু হবে না তোমার। এইতো আমি আছি!”
রিম ক্ষীণ কণ্ঠে ফুঁসলে উঠলো,
“আরা আ.. আমা… আমার কষ্… কষ্ট হচ্ছে…. আমাহ আমার কিছু হলে তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করবে না তো? আমার জায়গা অন্য কাউকে দেবে না তো? আমি মরে গেলেও তোমার পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারবো না… খুব… খুব ভালোবাসি তোমাকে।”
জেইন ঝাঁকুনি দিয়ে হিংস্র পশুর মতো গর্জন করে উঠলো,
“এই চুপ! চুপ বান্দির বাচ্চা! আর একবার মরার কথা বললে জিভ টেনে ছিড়ে ফেলব তোর। কলিজা টা ছিঁড়ে কেটে টুকরো টুকরো করবো। কিচ্ছু হবে না তোর। আমি থাকতে…!! কিচ্ছু হতে দেব না তোর।”
জেইন কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। তার চোখ এখন রক্তচোখ, পশুর মতো। সে বর্শা তুলে হিংস্র আঘাত করতে থাকল মাছগুলোর ওপর। একটার পর একটা পিরানাকে ছিঁড়ে ফেলছে, ছুরির মতো বর্শার ধার দিয়ে টুকরো টুকরো করছে তাদের।রক্ত আর জলের মিশেলে এক বিভীষিকাময় দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। চারদিকে ছিটকে পড়ছে লাল পানি, মাংসের টুকরো, গন্ধে ভরে যাচ্ছে বাতাস।
জেইনের চোখে তখন পাগলামি, ভয়—সব মিলেমিশে এক বিষাক্ত দৃষ্টি। সে রিমকে কোলে তুলে,তীরে নিয়ে এলো। তার পায়ের নিচের কাদা এখন রক্তে ভেজা। তীরে এসে সে রিমকে বিছিয়ে দেয় মাটিতে। রিমের চোখ বন্ধ। নিঃশ্বাস নেই। পা থেকে কোমর পর্যন্ত ছোপ ছোপ কামড়ের দাগ, রক্তের স্রোত। জেইনের মুখ বিকৃত হয়ে যায়। একা এই ঘন জঙ্গলে কি করবে বুঝতে পারছে না। সে দু’হাতে নিজের চুল টেনে ধরলো। তার বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক হিংস্র, অসহায় চিৎকার,
“এইইইইইই!!! এই, এই বান্দির বাচ্চা এই!!! চোখ খুলছিস না কেন তুই! কথা বল! কথা বল, বান্দির বাচ্চা! আর কতো কষ্ট দিবি তুই আমাকে? জ্বলে যাচ্ছি আমি! পুড়ে যাচ্ছে আমার বুক! কথা বল!! বেইমানের বাচ্চা!!!!”
তার কণ্ঠস্বর জঙ্গলের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়। পাখিরা উড়ে যায়। বাতাস থেমে যায়। রিমের সাড়া শব্দ না পেয়ে সে অসহায়ের মতো ভেঙে পড়ে। রিমকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করতে থাকল,
“চোখ খোলো সোনা। প্লিজ। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না আমি। তোমাকে ছাড়া মরে যাবো আমি। বিশ্বাস করো মরে যাবো। বাঁচতে হলে যে তোমাকে চাই আমার!”
তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। বজ্রের শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। ঠিক তখনই—আকাশ কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠলো এক বিকট শব্দ,
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৪
WHUP! WHUP! WHUP!
তীক্ষ্ণ আলো এসে পড়ে জেইনের ওপর, রক্তে ভেজা শরীর, কোলে অচেতন রিম। দৃশ্যটা যেন জাহান্নামের একচিলতে টুকরো। ধীরে ধীরে মাথা তুলে উপরের দিকে তাকায়। তার চোখে দেখা দেয় এক টুকরো আশার আলো—নাকি এক নতুন বিপদের ইঙ্গিত?
