Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৩৭

দাহশয্যা পর্ব ৩৭

দাহশয্যা পর্ব ৩৭
Raiha Zubair Ripti

মেহরিন বোনের ডাক শুনে ছিটকে তড়িঘড়ি করে মাথা ঘুরিয়ে সরে যাওয়ার সময় হাল্কা করে সোলেমানের ঠোঁটের সাথে মেহরিনের ঠোঁটের ছোঁয়া লাগে। মেহরিন চোখ বড়বড় করে তাকায়। সেরিন ততক্ষণে হারিকেন নিয়ে বাহিরে বেরিয়ে এসেছে৷ হায় আল্লাহ এটা সে কি করলো! তার বোন এখন বিবাহিত আগের মতন হুটহাট করে এভাবে নক না করে ঢুকে যাওয়া যাবে না। ছি ছি ছি কত বড় বে’য়াদবের মতন কাজ করে ফেলছে সে। এখন সোলেমানের সামনে যেতেই তো সেরিনের লজ্জা অপরাধবোধ হবে।
সোলেমান সোজা হয়ে দাঁড়ালো। দরজার পানে একবার তাকিয়ে মনে মনে সেরিন কে ম্যানারলেস বলে আখ্যায়িত করলো। ম্যানার থাকলে এভাবে ঢুকে আসতে পারতো না। মেজাজ তার বেশ তুঙ্গে। মেহরিনের দিকে একবার তাকালো। মেহরিন সোলেমানের নজর তার দিকে পড়তেই সেও সোলেমানের দিকে তাকালো। সোলেমান বিরক্ত গলায় বলল-

-” তোমার বোন একটা ম্যানারলেস।
মেহরিন কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। সেরিন নিজের রুমে পায়চারি করছে। গিল্টি ফিল হচ্ছে। মেহরিন হাঁটতে হাঁটতে বোনের রুম ক্রস করছিলো, সেরিন মেহরিন কে দেখেই অস্থির গলায় মেহরিন কে টেনে রুমে এনে বলল-
-” সরি মেহু আমি ইচ্ছে করে ওমনটা করি নি বোন। আমারই দোষ ইশ কি লজ্জা।
মেহরিনের নিজেরও লজ্জা লাগছে। বড় বোনের সামনে ওমন এক বাজে সিচুয়েশনে পড়ে যাওয়ার কারনে।
-” আমি আর অবিবাহিত না আপু। এমন ভুল আর করো না। আমি কিন্তু সবসময় তুমি আর ভাইয়া রুমে থাকা কালিন নক করে ডেকে তারপর প্রবেশ করি।
-” অভ্যাস তো ভুলে গেছি। তোর জামাই রেগে গেছে তাই না?
-” বাদ দাও ওসব।
সোলেমান অন্ধকারে এসে বেলকনিতে দাঁড়ালো ইব্রাহিমের ফোন পেয়ে। শালার ব্যাটা ফোন দেওয়ারও সময় পেলো না। ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়েই কর্কশ গলায় বলল-

-” কি হইছে? ফোন দিছিস কেনো?
ইব্রাহিম শুরুতেই এমন কথা শুনে হতবিহ্বল হয়ে যায়। সচারাচর সোলেমান ফোন রিসিভ করে বলে- হ্যা বল।
-” তুই ঠিক আছিস?
-” না ঠিক নাই৷
-” কি হইছে?
-” কি হইছে সেটা বললে কি, তুই সব ঠিক কইরা দিয়ে যাবি আমার?
-” মেহরিনের সাথে রাগারাগি করছিস নাকি?
-” তোর মনে হয় আমি বউয়ের সাথে রাগারাগি করার মানুষ?
-” তাহলে? এজওয়ান কিছু করছে?
-” না।
-” তাহলে?
-” যা করার সব আমার শালি করছে।
-” তোর শালি? কি করছে সে?
-” বলবো তোরে?
-” আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড তুই আমায় বলবি না?

-” শোন তাহলে। তোর বোন কে একটা চুমু খেতে গেছিলাম। একচুল পরিমান দূরত্ব ছিলো জাস্ট আমাদের মাঝে কিন্তু তোর বোনের বড় বোন আমার শালির জন্য শেষপর্যন্ত আর খেতে পারলাম না। ল্যাদা বউ সেজন্য বাসর করছি না৷ তাই বলে কি চুমু খেয়েও নিজেকে স্থির রাখতে পারবো না?
ইব্রাহিম কেশে উঠলো।
-” কি বলছিস এসব সোলেমান। লজ্জা আন।
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।
-” শালার ব্যাটা তুই-ই তো শুনতে চাইলি। ভাদাইম্মা একবার শুধু বিয়েটা করে নে তুই। বাসর তো দূর কি বাত চুমুটাও খেতে দিব না তোকে। তখন বুঝবি লজ্জা পশ্চাৎদেশে লুকিয়ে থাকে নাকি মুখে এসে গড়গড় করে ঝড়ে ।
সোলেমান কেটে দিলো ফোন। মেহরিন আসলো ডাকতে খাওয়ার জন্য। সোলেমান বলে দিলো কাটকাট জবাবে – সে খাবে না।
মেহরিন দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। সোলেমান পাশে বসে সোলেমানের মুখটা ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে এনে বলল-

-” রাগ টা ভীষণ অযৌক্তিক সুলতান সাহেব। আপা ভুল করে ঢুকেছিল। সে ভীষণ গিল্টি ফিল করছে এটা নিয়ে। এতদিনের অভ্যাস বদলাতে একটু সময় লাগে। আর হবে না। আপনি এখন খেতে না গেলে আব্বা আম্মা কষ্ট পাবে। তার দুই মেয়ের জামাই কে সে একসাথে এখনও খাওয়ায় নি এক টেবিলে বসিয়ে৷ আমার আব্বার ভীষণ ইচ্ছে এটা। আম্মা এত কষ্ট করে রাঁধলো আপনার জন্য। আপনি না গেলে আপা ভেবে নিবে আপনি রেগে আছেন সেজন্য খাবেন না৷ বিষয় টা কি ভালো লাগবে বলুন?
সোলেমান উঠে দাঁড়ালো।

-” হুমম বিষয় টা আসলেই ভালো দেখাবে না। চলো খেতে যাওয়া যাক।
সোলেমান মেহরিনের হাত ধরে বের হলে। কারেন্ট এখনও আসে নি। অনিক মোতালেব ভুঁইয়া, রুমাইসা টেবিলে বসে অপেক্ষা করছিলো সোলেমানের। মোতালেব ভুঁইয়া সামনে বসেছেন। সে তার দুই জামাই কে তার দুই পাশে বসিয়ে খাওয়াবেন। বাম পাশে অনিক বসেছে। ডানের চেয়ার টা মোতালেব ভুঁইয়া টেনে দিতে নিলে সোলেমান বাঁধা দিয়ে বলল-

-” আপনি বসুন,আমি বসছি।
সানজিদা বেগম খাবার বেড়ে দিলো তাদের প্লেটে। সোলেমান তার পাশের চেয়ার টা টেনে দিয়ে মেহরিন কে উদ্দেশ্য করে বলল-
-” তুমিও বসো মেহরিন। আর আম্মা সেরিন আপনারাও বসুন।
মোতালেব ভুঁইয়াও বলল-
-” হ্যাঁ তোমরাও বসে পড়ো সানজিদা। আমরা সবাই মিলে একসাথেই খেয়ে নেই৷ অনেক দিনের ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে আমার।
সানজিদা বেগম রুমাইসার পাশে বসলেন। সেরিন অনিকের পাশে। মোতালেব ভুঁইয়া আজ তৃপ্তি নিয়ে খেলেন।
খাওয়াদাওয়া শেষে যে যার রুমে চলে যায়। মেহরিন বিছানা ঠিক করে দেয়৷ সোলেমান বিছানায় শুয়ে মেহরিন কে বলল-

-” দরজা লাগিয়ে চুপচাপ পাশে এসে শোও।
মেহরিন দরজা লাগিয়ে পাশে এসে উল্টো হয়ে শুতেই সোলেমান মেহরিন কে টেনে কাছে আনলো। আজ হাল্কা একটু অসভ্য হলে ক্ষতি কি?
সোলেমান মেহরিনের জামা ভেদ করে মেহরিনের পেটের উপর হাত রাখে। শুধু হাত রেখেই খ্যান্ত হয় নি। হাত চালাতেও লাগলো ত্বকে। মেহরিন অস্থির হয়ে ওঠে, নিঃশ্বাস টেনে নেয় আরও গভীরে। তার দেহে হালকা কম্পন সৃষ্টি হয়।
সোলেমান তখন মেহরিনের মুখের দিকে এগিয়ে আসে। মুখটা মেহরিনের কানের কাছে এনে খুব নিচু গলায় বলে-

-” আমার পাওনা চুমুটা এখনও বাকি আছে। আমি আবার পাওনা টাওনা বাকি রাখা একদমই পছন্দ করি না।
কথাটা বলেই ঘাড়ে চুমু খেলো। মেহরিন নুইয়ে গেলো। এভাবে গভীর ভাবে স্পর্শ করলে কি আর স্বাভাবিক থাকা যায়? সোলেমান মেহরিন কে টেনে নিজের দিকে ঘুরালো। গালে এক হাত রেখে সোলেমান মেহরিনের দিকে ঝুঁকে গেলো।
মেহরিন চোখ বুঝে আছে। কেমন লজ্জা লাগছে৷ চোখ মেলে তাকাতেই পারবে না সে।
সোলেমান ধরেই নিয়েছে এবার সে তার বউকে একটা চুমু খেতে পারবে৷ এখন তো দরজা বন্ধ কেউ আসবে না। ডিস্টার্ব ও কেউ করতে পারবে না। সোলেমান মুখটা এগিয়ে নিয়ে গেলো। সবেই চুমু টা খেতে যাবে এমন সময় ফোন টা উঠলো শব্দ করে বেজে।
যা শালার মন মেজাজ এবার পুরোপুরি মাত্রাতিরিক্ত খারাপ হয়ে গেলো সোলেমানের। এমন সিরিয়াস সময়ে এভাবে বারবার বাধা আসলে যে কারোরই মন মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। সোলেমান মনে মনে একটা বিশ্রী গালি দিলো ফোনটাকে৷ মেহরিনের থেকে সরে এসে ফোনটা তুলে দেখলো তার চাচা ফোন করেছে। দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো সোলেমানের। ফোনটা রিসিভ করে বেলকনিতে এসে ক্ষীণ গলায় বলল-

-” সমস্যা কি তোমার চাচা? তোমার বউ নেই তাই বলে কি আমারও বউ নেই? একটা বিবাহিত পুরুষকে কে এত রাতে কে ফোন করে? মিনিমাম কমনসেন্স নেই তোমার? তোমার বিয়ের পর কখনও তোমায় এভাবে ফোন করে ডিস্টার্ব করেছি আমি?
বাশার সুলতান ঘড়ির দিকে তাকালো। সবে বাজে রাত দশটা। এটা এত রাত হয় কি করে?
-” রেগে যাচ্ছিস কেনো? ফোন দেওয়াতে অপরাধ করে ফেলছি নাকি? একা একা বাড়িতে সেজন্যই তো একটু ফোন দিলাম কথা বলতে।
কথাটা শুনেই সোলেমানের কপাল আরো কুঁচকে আসলো৷ পারছে না গিয়ে চাচাকে তুলে আছাড় দিতে৷ দাঁত চেপে বলল-
-” তুমি বিয়ে করবা? বলো করবা বিয়ে? পাত্রী দেখি তাহলে। তোমাকে বিয়ে করাই দেই। বউ নিয়ে সময় কাটাতে পারবে। আর একা একা লাগবে না তখন।
ভাতিজার মুখে এমন কথা শুনে মুখটা কালো হয়ে গেলো৷ দুই ছেলেই তার এখন বিয়ের পর কেমন পরপর করে দিয়েছে৷ নিচু স্বরে বলল-

-” আচ্ছা রাখছি।
ফোন কেটে দিলো বাশার সুলতান। বাড়িতে কেউ নেই। একা একটা আধবুড়ো বয়সের মানুষটার কি আর ভালো লাগে? আজ বউটা কাছে থাকলে বাশার সুলতান বউয়ের সাথে এই দীর্ঘ রাত টা অতিবাহিত করতে পারতো।
সোলেমান ফোনটা সুইচঅফ করে দিলো৷ বউকে আর চুমু খাওয়া লাগবে না৷ শা’লার কপাল উপর থেকেই আসতেছে এত বাঁধা। রেড লাইন সিগনাল দিয়ে জানাচ্ছে সোলেমান বউয়ের কাছে থেকে অসভ্যতামি করিস না। ভালো হয়ে যা৷ পিচ্চি একটা মেয়ে। বড় হতে দে।
সোলেমান বিছানায় এসে মেহরিনের হাতটা তার শরীরে জড়িয়ে নিয়ে উল্টো হয়ে শুয়ে বলল-

-” যাও উপরওয়ালার তরফ থেকে বোধহয় বাঁধা আসতেছে। তোমার কপালে স্বামীর আদর নেই মেয়ে,ঘুমাও।
মেহরিন মুচকি হাসলো স্বামীর মুখে এমন রাগী স্বরে বলা কথাটা শুনে। মেহরিন সোলেমানের দিকে ঘুরে শোয়া। সোলেমানের পিঠ মেহরিনের দিকে। মেহরিন সেই পিঠের দিকে তাকিয়ে রইলো৷ সোলেমান মেহরিনের হাত চেপে ধরে রেখেছে তার বুকে। মেহরিন চেপে আসলো। সোলেমানের শরীর ঘেঁষে শুতেই সোলেমান তার দিকে ফিরলো। চোখে চোখ পড়লো দু’জনের। মেহরিন তাকিয়ে রইলো সোলেমানের বুকের দিকে। সোলেমান বুকের সাথে মেহরিন কে চেপে ধরে বলল-

-” তাড়াতাড়ি বড় হও তো ল্যাদা বউ৷ এভাবে আর থাকা যাচ্ছে না। চোখের সামনেই রসমালাই। তাকে ধরতে পারছি, ছুঁতে পারছি, ঘ্রাণ নিতে পারছি কিন্তু খেতে পারছি না। এর কোনো মানে হয়? নেহাত আমি ভদ্রলোক বলে নিজেকে সামলে রাখছি। কিন্তু আর কতদিন ই বা সামলে রাখতে পারবো বলো তো? দিনশেষে তো র’ক্তে মাংসে গড়া একজন মানুষ আমি,ধৈর্য্য ভেঙে যাবে একসময়। তখন অঘটন ঘটে গেলে তার দায়ভার কিন্তু মোটেও আমার হবে না বলে রাখছি হু।
সুলতান ভিলায় ডিনার খেয়ে যে যার মতন চলে গিয়েছে রুমে ঘুমাতে। মাহি আগেই এসে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ এজওয়ান বাহিরে ছিলো৷ তার বাপ নাকি নিঃসঙ্গতা অনুভব করছে। এজওয়ান পরামর্শ দিলো ঝটপট একটা বিয়ে করে নিতে। বাশার সুলতান ছেলের কাছেও হতাশ হলেন। ধূর সেও কাল চলে আসবে নওগাঁ। একা-একা সে কেনো পড়ে থাকবে ঢাকা। এজওয়ান তা শুনে বলল –

-” আসো তুমি নওগাঁ । তোমার সাথে বোঝাপড়া আছে কিছু। আমার বিবাহিত জীবনে এক বাঁশ ঢুকিয়ে দিছো তুমি। সেই বাঁশ বের করা লাগবে না?
বাশার সুলতান ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে।
-” কি বোঝাপড়া? কিসের বাঁশ?
-” আসলেই জানবে। আগে আসো তো তার বলছি। এখন রাখি বউ নিয়ে ঘুমাবো৷ তুমি জেগে জেগে তারা গুনো গুড নাইট।
এজওয়ান ফোনটা কেটে রুমে আসলো ১২ টার দিকে। রুমে ঢুকেই দেখলো মাহি ঘুমিয়ে আছে৷ এজওয়ানের সহ্য হলো না মাহির ঘুম টা। মাথায় কিছু শয়তানি বুদ্ধি আসলো।
ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো মাহির দিকে । গলার কাছে গিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতেই মাহি চমকে উঠলো৷ ধড়ফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে এজওয়ানের দিকে তাকালো। গলায় হাত দিয়ে বলল-

-” কি করছেন এসব,?
এজওয়ান মাহির চুল হাতো নিয়ে মুখ ডুবিয়ে বলল-
-” একটু অভদ্র মন হ‌তে চা‌চ্ছে
আসো না মে‌লে দি‌য়ে তোমা‌রি সেই চুল
ক‌রে ফে‌লি দু’জনা কিছু আবে‌গি ভুল।
মাহি এজওয়ানের থেকে মাথার চুল গুলো ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
-” ম’দ গিলে আসছেন নাকি অসভ্য ব্যাটা ছেলে কোথাকার।
এজওয়ান বড় করে মাহির মুখের সামনে হা করে নিশ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলে-
-” এক ফোটাও গিলি নি। ট্রাস্ট মি।
কথাটা বলেই এজওয়ান মাহির ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে দিলো। মাহির ফের ধাক্কা দিয়ে হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল-

-” একদম দূরে থাকুন আমার থেকে।
এজওয়ান ফের মাহির কাছে আসতে আসতে বলল-
-” অভদ্র হ‌য়ে‌ছি আমি তোমা‌রি প্রে‌মে, তাই কা‌ছে আসো না, আরো কা‌ছে আসো না, শসসহঃ.. কথা ব‌লো না, কোন কথা ব‌লো না।
মাহি এবার ছটফট করতে লাগলো।
-” উফ নড়ো না।
মাহি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল-
-” গোলা’মের পুত লাস্ট বার ওয়ার্নিং দিচ্ছি ছাড় বলছি আমাকে।
এজওয়ান মাহির ঠোঁটে শুকনো এক চুমু খেলো মাহির শরীর দাউদাউ করে জ্বলতে লাগলো। রাগে এজওয়ানের ঘাড়ে কামড় বসিয়ে দিলো মাহি।
এজওয়ান ছেড়ে দিলো ব্যাথায় মাহি কে। মাহি উঠে পাশে থাকা পানির জগ থেকে পানি নিয়ে ঠোঁট টা ধুয়ে নিলো।

-” বেয়া’দব অশ্লীল লোক একটা। দাঁত মাজে না।
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো। কতবড় মিথ্যা অপবাদ! না এটা মেনে নেওয়া যায় না। সকাল বিকেল রাতে সে দাঁত মাজে নিয়মিত। এই মেয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পাড় পেয়ে যাবে? মোটেও না৷ এজওয়ান তার সাদা ধবধবে দুধের মতন ৩২ পা-টি দাঁত দেখিয়ে বলল-
-” দেখ শালি দেখ ক্লোজ আপ দিয়ে দাঁত মাজি সকাল রাতে৷ দুধের চেয়েও ফকফকা দাঁত আমার। ক্লোজআপের জন্যই তোমার কাছে যাই একটু ক্লোজ হতে৷ তা না হলে তোমার কাছে যাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না, ইঁদুর ম’রা গন্ধ ভেসে আসে তোমার শরীর দিয়ে। গোসল টোসল তো করো না বোধহয়। করবে কি করে? ফরজ গোসল না করলে তো শরীরে ইঁদুর ম’রা গন্ধ থাকবেই। নেহাতই আমি একটা ভদ্র সভ্য ছেলে সেজন্য তোমায় মাঝেমধ্যে দুটো না না জাস্ট একটা চুমু খাই। তোমার তো নিজেকে নিয়ে গর্বে গর্ভবতী হয়ে যাওয়ার কথা মাহি। শুকরিয়া আদায় করো তোমার জামাই তোমাকে দয়া করে একটু ভালেবাসে। তা না হলে সারাজীবন অসুখী হয়ে থাকতে। আমার আবার মন বড় এমন গরীবস মেয়েকে অসুখী থাকতে দেখতে ইচ্ছে করে না। তাই সঙ্গ দিয়ে একটু জীবিত করি। অকৃতজ্ঞ মেয়ে কোথাকার।
মাহি রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো এজওয়ানের দিকে।

-” আপনার সঙ্গ চাইছে কে? আমি চাইছি?
-” চাওনি সেজন্যই তো সেধে সেধে দিচ্ছি। চাইলে কি আর দিতাম নাকি? এত সময় অপচয় করার মতন অঢেল সময় আমার নেই। সরো এখান থেকে হাফ লেডিসজেন্টলম্যান মাহি।
শেষের কথা টা শুনে মাহি দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলো-
-” হাফ লেডিসজেন্টলম্যান মানে?
-” হাফ নারী আর হাফ পুরুষের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়া মানুষ।
-” কোন দিক দিয়ে আমায় আপনার পুরুষ মনে হয়?
-” সব দিক দিয়ে সুইটহার্ট। ঘুমাবে নাকি আরেকটু ডোজ চাও? দিব? ভালোই লাগে ডোজ টা দিতে। কি নাইস অনুভূতি। তুমিও একটু হাতে হাতে সাহায্য করলে মানে সঙ্গ দিলে অনুভূতি টা আরো জোশ হতো। নেক্সট টাইম সঙ্গ দিবে ওকে?
মাহি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো৷ এর সাথে তর্কে যাওয়া মানে মানুষ হয়ে ঘাস খাওয়ার সমান।
পরের দিন সকালে…..

আজ ক’টা দিন হলো প্রেমার শরীর ভীষণ দূর্বল। কোনো কিছু খেতে পারে না। বমি হচ্ছে, কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। পিরিয়ড টাও দু’মাস হলো হচ্ছে না। একপ্রকার আতঙ্কিত হয়ে গেলো প্রেমা। ভয়ে ভয়ে বাড়ির পাশের ফার্মেসী থেকে একটা কিট নিয়ে পরীক্ষা করে নিলো। ফলাফল পজিটিভ আসলো। দুটো লাল দাগ স্পষ্ট কিটে। প্রেমার জায়গায় অন্য কোনো বিবাহিত নারী থাকলে বোধহয় এই কিট টা দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেত। আনন্দে কেঁদে দিত। কিন্তু প্রেমা আনন্দিত হতে পারছে না। তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে ঠিকই কিন্তু সেটা আনন্দের না। তার এই ৯ বছরের সংসারে সে এমন নিউজ এর আগেও একবার পেয়েছে৷ প্রথম নিউজে খুশি হলেও সেই খুশি তার বেশিক্ষণ টিকতে পারে নি। তার স্বামী নামক পুরুষ টি প্রেমার মা হবার কথা শুনেই সেই মূহুর্তেই বাচ্চাটা নষ্ট করার সব পরিকল্পনা করেছিল। এবং সফলও হয়েছিল। প্রেমা হাতে পায়ে ধরে আর্তনাদ করে ভিক্ষা চেয়েছিল প্রাণ টার। কিন্তু শেখর বাঁচতে দেয় নি। আড়াই মাসের বাচ্চা ছিলো সে৷ শেখর কে প’শুর সাথে তুলনা করলে বোধহয় প’শুকেও অপমান করা হবে৷ সে এরচেয়েও একজন নিকৃষ্ট মানুষ৷ তার জীবনে এক নেশা,শারীরিক চাহিদা খারাপ কাজ করা ছাড়া আর কিছু নেই৷ প্রেমার প্রেগন্যান্ট হবার কথা শুনে শেখর একটা কথা বলছিল সেই কথা মনে হলেই প্রেমার ম’রে যেতে ইচ্ছে করে। সে বলেছিল –

-” তুই পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘুরলে রাতে এসে আমি কারে চু**।
কতটা নিকৃষ্ট হলে মানুষ এসব বলে? তার নিজের রক্ত ছিলো পেটে সেই র’ক্ত কে সে নিজের হাতে খু’ন করে৷ দোকান থেকে বাচ্চা নষ্ট করার মেডিসিন এনে জোর করে খাওয়াতে চায়। কিন্তু প্রেমা খায় নি। প্রেমা শেখর কে বুঝিয়েছিল, কেঁদে আকুল হয়েছিল। প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিল ওই ক্ষুদ্র প্রাণটার জন্য। কিন্তু শেখর ছিল অটল, নিষ্ঠুর।
একদিন রাতে, চুপিচুপি একটা বড়ি মিশিয়ে দিয়েছিল প্রেমার গ্লাসে।
প্রেমার তেষ্টা পাওয়ায় পানিটা খেয়েছিল। কিন্তু প্রেমা জানত না ওর শরীরে মৃত্যুর রাসায়নিক ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জানলে তেষ্টায় ম’রে যেত তারপরও খেত না ঐ পানি।
পরদিন সকাল থেকেই প্রেমার পেট মোচড়ানো ব্যথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ব্যথাটা অসহ্য হয়ে ওঠে। গলা ফাটিয়ে কাঁদে প্রেমা নাভির নিচে অসহনীয় এক যন্ত্রণা। কোমর থেকে পায়ের রগ পর্যন্ত টান ধরে আসে। চিৎকার করে ওঠে বারবার, গলা ফাটে। শেখর কে বারবার বলে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে৷ উল্টো শেখর আরো ধমক দিয়ে বলে-

-” নাটক কম কর শা’লি। কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে যাবি।
সেই সন্ধ্যেয় রক্ত নামল। এক পশলা নয়, যেন কোনো নদী ভেসে গেল ওর দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে। প্রেমা বাথরুমে দৌড়ে গেল। প্রেমা তখনও বুঝতেছিল না কী হচ্ছে এটা। হঠাৎ করে ওর দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে একটা লালচে রক্তের চাকা গড়িয়ে পড়লো। প্লাস্টিকি মাংসের টুকরার মতো। গোলগাল, গুটিশুটি হয়ে থাকা ছোট্ট কিছুর একটা অবয়ব। কী ছিল সেটা? এটাই তো প্রেমার বাচ্চা।
ওর গর্ভে জন্ম নেয়া, পৃথিবী দেখতে না পারা একটা ক্ষুদ্র প্রাণ। প্রেমা চোখ ফেটে কাঁদে, দম আটকে আসে। বাথরুমের মেঝেতে বসে পড়ে। রক্তে ভেজা পায়ের মাঝখানে তাকিয়ে দেখে ছোট্ট সেই চাকা। কতটা মাংস! কতটা র’ক্ত!

আর কতটা স্বপ্ন…
প্রেমার হাত থরথর করছিল। ওর বুকটা যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। সে চিৎকার করতে চেয়েও পারেনি। শুধুই হাউমাউ করে কেঁদে গিয়েছিল।
প্রেমার আঁধার জীবনে জন্ম নেয়া এক আলো।
একটা কুঁড়ি, যাকে ফুটতেই দেওয়া হলো না! সেই আড়াই মাসের বাচ্চাটা যার সবে শারীরিক গঠন শুরু হচ্ছিল তাকে তার নিজের বাবাই হ’ত্যা করেছে৷ সেই ছোট্ট টুকরো টাকে শেখর কাজের লোক এনে কাপড় দিয়ে তুলে ফেলে দিয়ে আসতে বলে বাড়ির ডাস্টবিনের ড্রামে! এমন বাবা কখনও দেখেছেন আপনারা? হয়তো দেখেছেন। পৃথিবীতে এমন অযোগ্য বাবা আছে। প্রেমার কপালেও এমন জঘন্য একটা পিতা আছে৷ তাই তার পেটের সন্তানও এমন জঘন্য পিতা পেয়েছে৷ প্রেমাকে সেদিনই কড়া করে বলে দেওয়া হয়েছে বাচ্চা যেন ভবিষ্যতে তার গর্ভে না আসে৷ সেই রাতেই শেখর শারীরিক সম্পর্ক করেছিল প্রেমার সাথে৷ ভাবতে পারছেন শেখর কতটা জঘন্য! প্রেমার ঘন্টা কয়েকও হয় নি সন্তান হারানোর শোক৷ তীব্র ব্যথা৷ গড়গড় করে রক্ত বের হওয়ার। সেই সময়টাতেই সে প্রেমার কাছাকাছি আসে জোর জবরদস্তি করে।

কিন্তু এখন প্রেমা কি করবে? এবার কিভাবে সে নিজে বাঁচবে আর নিজের বাচ্চা টাকে বাঁচাবে? শেখরের কানে গেলে বাচ্চা আর সে দু’জনেই শেষ হয়ে যাবে। প্রেমার মৃত্যু হবে না কিন্তু বাচ্চার মৃত্যু নিশ্চিত। প্রেমা কিট টা কমোডের ভেতর ফেলে দিলো৷ বুঝতে দেওয়া যাবে না শেখর কে৷ যতদিন লুকিয়ে রাখা যায় সে রাখবে৷
প্রেমা বড়বড় করে দম ফেলে নিচে আসলো৷ শেখর বাসায় নেই। তার শ্বশুর আর ছোট দেবর সামির বাসায়। শেখররা ৩ ভাই৷ মেঝ দেবর টাকে সরাসরি এখনও দেখে নি প্রেমা কখনও। নাম শুনেছে সুবহান। কই থাকে সেটাও জানে না৷ তবে মাঝেমধ্যে শ্বশুর আর শেখর কে ফোনে কথা বলতে শুনে।

প্রেমা খাবার বেড়ে দেয় শ্বশুর আর দেবর কে। সামির গুনেগুনে হলেও প্রেমার থেকে ৫-৬ বছরের ছোট। ভাবি বলে সম্মান তো দেয়ই না৷ বয়সে যে বড় সে হিসাবেও সম্মান নেই। এমন ভাবে অপমান অপদস্ত করে যেন মনে হয় প্রেমা তার পার্সোনাল কাজের লোক। এই তো খাবারে প্রেমা পরোটা আর ডিম দিয়েছে। লাটসাহেব তা খাবেন না। প্রেমা কে হুকুম দিলো স্যান্ডউইচ বানিয়ে আনতে। অথচ সকালে উঠে সে অসুস্থ শরীর নিয়ে এসব বানিয়েছে। মুখের উপর না বললে এ ছেলে তেড়ে এসে মা’রতেও দ্বিধা করবে না।

দাহশয্যা পর্ব ৩৬

প্রেমা মাথা নত করেই রান্না ঘরে গেলো স্যান্ডউইচ বানাতে। সবার খাওয়া শেষ হলো। কিন্তু প্রেমাকে কেউ খাওয়ার কথা বললো না। প্রেমা খাবার গুলো ঢেকে রুমে চলে আসলো। এই পৃথিবীতে আপন বলতে প্রেমার কেউ নেই৷ এই চার দেওয়ালের মাঝেই তাকে থাকতে হয়। একটু দম বন্ধ হয়ে আসলেও বের হবার জো নেই। প্রেমা দাঁত কামড়ে সব সয়ে যাচ্ছে এই ভেবে একদিন তার জীবনে সুখ আসবে আর নয়তো অতিশীঘ্র তার মরণের ডাক আসবে।

দাহশয্যা পর্ব ৩৮