Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৩৮

দাহশয্যা পর্ব ৩৮

দাহশয্যা পর্ব ৩৮
Raiha Zubair Ripti

সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে তার পরের দিন বিকেলেই সুলতান ভিলায় নিয়ে আসে। মোতালেব ভুঁইয়া আরো কয়েকটা দিন থাকতে বলেছিল কিন্তু সোলেমান থাকে নি। তার ঢাকায় ফিরতে হবে৷ সামনে একটা বড় কাজ আছে। সুলতান ভিলায় মেহরিন কে রেখে তার পরের দিন সকালেই সে ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে যায়। যাওয়ার সময় মেহরিন ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করেছিল-
-” আমাদের আবার দেখা কবে হবে?
প্রতিত্তোরে সোলেমান মুচকি হেঁসে বলেছিল-
-” যখন তুমি চাইবে।

এই সেই শেষ কথা। আজ আগষ্টের ২৮ তারিখ। সোলেমান চলে গেছে ১০ দিন হবে৷ এরমধ্যে একটুও কথা হয় নি মেহরিনের সাথে৷ রাত পোহালেই মেহরিনের জন্মদিন। ২৯ আগষ্ট সে ১৮ বছরে পদার্পণ করবে৷ সবাই জন্মদিন নিয়ে উৎফুল্ল হলেও জন্মদিনের দিন মেহরিনের মন খারাপ হয়ে যায় এই ভেবে যে তার জীবন থেকে আরো একটা বছর চোখের পলকে চলে গেলো। মৃত্যুর দোরগোড়ায় আরো এক বছর এগিয়ে গেলো। প্রতি বছর মোতালেব মেহরিনের জন্মদিনের দিন মাদ্রাসায় এতিম বাচ্চাদের খাওয়ান। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে দিনটা শুরু করেন। বিরবির করে কিসব দোয়া পড়ে শরীরে ফুক দিয়ে বলেন তার মেয়েকে যেন আল্লাহ নেক হায়াত আরো দান করে৷ তার মেয়েটা যেন আল্লাহর দিনের পথে সঠিক ভাবে চলতে পারে। তার দোষ ছোট বড় সকল পাপ যেন মাফ করে দেন। মসজিদের ইমাম সাহেব কে মোতালেব ভুঁইয়া তার সাধ্য মতন টাকা পয়সা দেন মেয়ের জন্য দোয়া করার জন্য। সেরিনের বেলায়ও সেম কাজই করেন৷ মেহরিন জীবনে একটা বেস্ট বাবা পেয়েছে৷ এমন বাবা লাখে একটা হয়।

মেহরিন জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে৷ আজকের চাঁদ টা অসম্ভব সুন্দর। পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ মেহরিন পরিপূর্ণ না। তার স্বামীর অভাব টা সব সময়ই হয়। কিন্তু কি করার স্বামী যে তার নেতা সাহেব। দেশও সামলাতে হয়। মেহরিন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ভাবতে লাগলো-“ তার সুলতান সাহেব কি জানে আগামীকাল সে ১৮ তে পদার্পণ করবে৷ সে কি আর তখন তার ল্যাদা বউ থাকবে? সুলতান সাহেব মেহরিন কে উইশ না করুক অন্তত একটা বার তার কন্ঠ স্বর শোনাক? তার কন্ঠ স্বর যে মেহরিনের বড্ড প্রিয়। তার কন্ঠ স্বর শুনলে মনে হয় মেহরিনের তৃষ্ণার্ত ভাব টা কেটে যায়।
রাত এখন সাড়ে সাতটা বাজে। মেহরিন জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলো বাড়ির কাজের লোক হাসান ভাই আর এজওয়ান একটা গরু কে নিয়ে আসতেছে৷ হঠাৎ গরু কেনো আনতেছে? কিছু আছে নাকি বাড়িতে?
মেহরিন নিচে নেমে আসলো। আনোয়ার সুলতান আমিরুল সুলতান কে বলছে-

-” বড়সড় গরু এনেছিস তো? হুজুর কে বলা আছে?
-” জ্বি আব্বা সব বলা আছে। হুজুর চলে আসবে ঠিক সময়ে।
-” বাচ্চাদের জন্য জামাকাপড়?
-” ওগুলোও সব কেনা হয়েছে।
মেহরিন বুঝলো না কোনো কথার মানে৷ হুজুর আসবে কেনো কাল বাসায়? গরু আর বাচ্চাদের জামাকাপড়ের কথা বলছিলো কেনো? কাল কি বাসায়? মেহরিনের যে জন্মদিন এটা তো জানার কথা না বোধহয়।
মেহরিন রান্না ঘরের দিকে গেলো। আফিয়া সুলতান চা বানাচ্ছে। মেহরিন জিজ্ঞেস করবে করবে করেও পরে আর জিজ্ঞেস করতে পারলো না।
মাহি বাগানে দাঁড়িয়ে গরু টাকে দেখছে৷ এজওয়ান গরুটাকে গাছের সাথে বাঁধছে। মাহি জিজ্ঞেস করলো-

-” গরু দিয়ে কি হবে?
-” মানুষ খাওয়ানো হবে।
-” কবে?
-” আগামীকাল।
-” কি উপলক্ষে?….. এক মিনিট কাল কয় তারিখ?
-” ২৯ তারিখ।
-” কাল তো মেহরিনের বার্থডে।
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো। অবাক হয়ে বলল-
-” কাল ভাবির জন্মদিন?
-” হুমম। সেই উপলক্ষেই কি এসব আয়োজন করা হচ্ছে?
এজওয়ান কিছু বললো না৷ অদ্ভুত মেহরিনের জন্মদিন হবার জন্য আর কোনো তারিখ ছিলো না। আগষ্টের ২৯ তারিখেই হতে হলো! হায়রে সোলেমান ভাইয়ের একদিকে বউয়ের জন্মদিন আর আরেক দিক দিয়ে….
-” কি হলো উত্তর দিন।
-” কি উত্তর দিব?
-” এসব আয়োজন মেহরিনের জন্য?

-” আমি একবারও বলেছি এসব ভাবির জন্য? মাথা খেয়ো না তো যাও এখান থেকে। রাত হলে তো খেতে দাও না৷ অথচ আমার মাথা খেতে ঠিকই চলে আসো। সকাল হলেই দেখতে পারবে এসব কিসের জন্য।
মাহি মুখ বাকিয়ে চলে আসলো। যা ইচ্ছে হোক। মাহি ফোনে একটা কেক অর্ডার দিলো। রাত ১২ টা বাজলেই সে মেহরিন কে উইশ করবে।
কেক টা এক ঘন্টার মাঝে চলে আসলো। মাহি ফ্রিজে রেখে দিলো। সবাই ঘুমিয়ে গেলে রুমাইসা কে নিয়ে সে মেহরিন কে সারপ্রাইজ দিবে।
রাতের ডিনার টা আজ সবাই অনেক চুপচাপ করে খেয়েছে অন্যান্য দিনের চেয়ে৷ মেহরিন মাহি দু’জনেই সেটা লক্ষ করেছে বেশ ভালো মতই। ডিনার শেষে যে যার রুমে চলে গেলো। মাহি রুমে পায়চারি করতে করতে ১২ টা বাজার অপেক্ষা করলো। এজওয়ান মাহিকে রুম জুড়ে পায়চারি করতে দেখে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল-

-” কি? শয়তানি বুদ্ধি আঁটছো নাকি মাথায়?
-” বাজে কথা বলবেন না তো। ঘুমান আপনি।
-” তুমিও আসো ঘুমাই। জেগে আর কি করবে বলো? শুধু চেহারায় চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল ফেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না।
মাহি কথা বাড়ালো না। ১২ টা বাজতেই রুম থেকে বের হলো। ফ্রিজ থেকে কেক টা নিয়ে রুমাইসার ঘরের সামনে গেলো। দরজায় টোকা দিতেই শুনতে পেলো রুমের ভেতর থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। মাহি চমকালো। আশ্চর্য এমন হাসিখুশি একটা মেয়ে কাঁদছে কেনো?
মাহি দরজায় কড়া নাড়লো।
আকস্মিক দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে চমকে উঠলো রুমাইসা। তড়িঘড়ি করে চোখের জল টা মুছে হাতে থাকা ছবিটা খাটের নিচে রেখে গলা পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করলো-

-” কে?
-” আমি মাহি।
রুমাইসা বসা থেকে উঠে দরজাটা খুলে দিলো। জিজ্ঞেস করলো-
-” কিছু বলবে ভাবি?
মাহি রুমের ভেতর ঢুকলো। ড্রিম লাইট জ্বলছে। মাহি সুইচ টিপে বাতি জ্বালালো।
-” তুমি কাঁদছিলে কেনো রুমাইসা?
রুমাইসা চমকালো। থতমত খেয়ে বলল-
-” ক..কই কাঁদছিলাম? কাঁদি নি তো।
মাহি রুমাইসার ফিরিয়ে নেওয়া মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল-
-” মিথ্যা বলবে না রুমাইসা। আমি স্পষ্ট শুনেছি৷ এই যে দেখো চোখ ফোলা তোমার।
রুমাইসা কথাটাকে সূক্ষ্ম ভাবে এড়িয়ে গিয়ে মাহির হাতে থাকা কেক টা দেখে বলল-
-” কেক কিসের জন্য ভাবি?
কেকের কথা তুলতেই মাহির মনোযোগ হারিয়ে গেলো। কেকের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” মেহরিনের জন্মদিন আজ। জানো না?
রুমাইসা চমকালো।

-” ভাবির জন্মদিন আজ?
-” হুমম। চলো মেহরিন কে সারপ্রাইজ দিব।
রুমাইসা হাত কচলাতে শুরু করলো। মাহি রুমাইসার হাত ধরেই নিয়ে গেলো মেহরিনের রুমের সামনে।
মেহরিন তাহাজ্জুদের নামাজ টা সবেই আদায় করে উঠেছে। দরজায় আকস্মিক ধাক্কানোর শব্দ শুনে জায়নামাজ টা গুছিয়ে রেখে দরজা খুলতেই সামনে কেক আর জলন্ত মোমবাতি মুখে সামনে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো মাহি কে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে রুমাইসা৷ মেয়েটার চোখ মুখ ফোলা লাগছে। কিছু হয়েছে ওর?
মাহি কেক টা সরিয়ে হাসি মুখে বলল-

-” শুভ জন্মদিন মেহরিন।
মেহরিন অবাকই হলো। মাহি মনে রেখেছে তার জন্মদিন?
মাহি ভেতরে ঢুকে কেকটা বিছানায় রাখলো। মেহরিন রুমাইসার দিকে তাকিয়ে বলল-
-” আপু তুমি ঠিক আছো?
রুমাইসা জড়িয়ে ধরলো মেহরিনকে৷ ভাঙা গলায় বলল-
-” জন্ম দিনের শুভেচ্ছা তোমায় ভাবি।
মাহি মেহরিন কে ডেকে আসতে বলল।
মেহরিন রুমাইসা কে নিয়ে এগিয়ে আসলে মাহি কেকটা কাটতে বলল। মেহরিনের মুখটা কালো হয়ে গেলো। সে জীবনে জন্মদিনে কেক কাটে নি। আর এভাবে জন্মদিন পালন করা মোটেও উচিত নয়। জন্মদিন উদযাপন মূলত ইহুদি-খ্রিস্টানদের সংস্কৃতি থেকে এসেছে। আর মেহরিন এসব ইহুদিদের মতন জন্মদিন পালন করা মোটেও পছন্দ করে না। আর জন্মদিন আনন্দের সাথে পালন করার মতো কোনো বিষয় না৷ এটা আরো জীবন থেকে প্রাপ্ত বছরগুলো এক এক করে কেটে নেয়। এই দিন নিয়ে মেহরিনের আনন্দ হয় না।

-” আপু।
মাহি উত্তর দিলো-
-” হুমম বলো।
-” কেকটা আমি না কাটলে কষ্ট পাবেন?
মাহি ভ্রু কুঁচকালো।
-” কেনো কি হয়েছে মেহরিন? কাটবে না কেনো?
-” আমি কখনও কেক কেটে জন্মদিন পালন করি নি আপু। আমার পরিবারও করে নি। আমাদের ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের কালচার মেলানো উচিত না।
-” সামান্য কেকই তো মেহরিন। আমরা তো গান বাজনা করছি না৷ কিচ্ছু হবে না।
-” আমার কথায় কষ্ট পাবেন না৷ না জেনেই কত পাপ করে ফেলি আমরা। আর সেখানে আমি জেনে শুনে আপনার মন রক্ষার জন্য এই কাজ টা করতে পারছি না। মাফ করবেন৷ এসব কেক কাটায় আমি বিশ্বাসী নই৷ আপনি শুধু মন থেকে দোয়া করবেন আমার জন্য আমি তাতেই খুশি।
মাহি কেকটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার আগেই বোঝা উচিত ছিলো মেহরিন কেমন টাইপের মেয়ে। কেক টা সাইডে রেখে বলল-

-” বেশ তোমায় আমি জোর করবো না৷
কথাটা শেষ করে মেহরিনের দু গালে হাত রেখে কপালে চুমু খেয়ে বলল-
-” আল্লাহ তোমার জীবন টা খুশিতে ভরে দিক। কোনো দুঃখ তোমায় স্পর্শ না করুক। তুমি একটা পবিত্র সাদা পায়রা।
মেহরিন মৃদু হাসলো। মাহি কেক টা নিয়ে বলল-
-” তাহলে অন্য দিন খাওয়া যাক কেক?
-” জ্বি অবশ্যই।
-” ঘুমাও তাহলে। আসছি।

মাহি রুমাইসা চলে গেলো। মেহরিন দরজা আঁটকে বিছানায় আসলো। এখন ঘুমিয়ে পড়া উচিত তার।
সকালে ঘুম ভাঙলো মেহরিনের ঘুম ভাঙে আফিয়া সুলতানের ডাকে। মেহরিন বিছানা ছেড়ে উঠতেই নাকে ঘ্রাণ আসে খাবারের। খোলা চুল গুলো হাত খোঁপা করে বেঁধে বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুললো। ফজরে উঠে নামাজ পড়ে আবার শুয়েছিল একটু। আফিয়া সুলতান মেহরিন কে মাথায় কাপড় দিয়ে তাড়াতাড়ি নিচে আসতে বলল। মেহরিন মাথয় ভালে মতো হিজাবের মতন করে ওড়না দিয়ে নিচে আসলো। বসার ঘরে মেঝেতে সাদা চাদর বিছানো হয়েছে৷ আজ কোনো অনুষ্ঠান বাসায়? মেহরিন বাগানে আসলো৷ দেখলো বড় বড় হাড়িতে রান্নার কাজ চলছে। পাশে এসে মাহি দাঁড়াতেই মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-

-” আজ কি কোনো বিশেষ দিন আপু? যার জন্য এত আয়োজন।
-” বলতে পারছি না।
তখনই বাড়ির গেট দিয়ে একটা সাদা গাড়ি ঢুকে। গাড়ি থেকে সাদা পাঞ্জাবি, টুপি আর চোখে চশমা হুজুর নেমে এলেন শান্ত ভঙ্গিতে। তিনি একজন সম্মানিত আলেম, যিনি বরাবরই কুরআন-হাদীসের আলোকে কথা বলেন।
হুজুরের পেছন পেছন কিছু বাচ্চা ছেলেরা নেমে আসলেন। আফিয়া সুলতান মেহরিন আর মাহিকে ভেতরে যেতে বলল।
আমিরুল সুলতান এগিয়ে গেলো হুজুরের নিকট। গাড়ি পাঠিয়েছিল তাদের আনার জন্য।

-” আসতে অসুবিধা হয় নি তে?
আলেম মুচকি হেঁসে বলল-
-” না না কোনো অসুবিধা হয় নি।
-” চলুন ভেতরে চলুন।
বসার ঘরে পুরুষ সদস্যরা বসেছে, মেয়েরা ঘরের ভেতরে।
হুজুর বসে বললেন-
-” মৃত ব্যক্তির দোয়ার দরকার হয়।
কবরের পরে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, শুধু ৩টি জিনিস যায়-
•সদকা জারিয়া,
•ইলমে নাফি (উপকারি জ্ঞান)
•নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।
তিনি নিজ হাতে খোলাফা পাঠ করলেন, তারপর সূরা ইয়াসিনের কিছু অংশ পড়লেন। সবাই চুপচাপ শুনলো।
মাইকে সবটা শুনলো মেহরিন। আমজাদ সুলতান নামটা কিছুটা শোনা শোনা লাগছে। কিন্তু কোথায় শুনেছে মনে পড়ছে না। আফিয়া সুলতান কে জিজ্ঞেস করলো-

-” আম্মা আমজাদ সুলতান টা কে?
আফিয়া সুলতান উত্তর দিলো-
-” এই পরিবারের বড় ছেলে। আমার ভাসুর।
মেহরিন চুপ হয়ে গেলো। এজন্যই নাম টা শোনা শোনা লাগছিল। তার মানে উনি মেহরিনের চাচা শ্বশুর।
হুজুর মুনাজাত ধরলেন- হে আল্লাহ, এই
সুলতান পরিবারের বড় ছেলে আমজাদ সুলতান কে তুমি কবরে শান্তি দাও, আলো দাও। যদি কোনো ভুলভ্রান্তি থেকে থাকে, তুমি ক্ষমা করে দাও। তার সন্তানেরা যেন তার জন্য সদকা ও নেক আমল করে যেতে পারে। আমিন।
মোনাজাত টা শেষ হতেই রুমাইসা শব্দ করে কেঁদে উঠলো। মেহরিন চমকালো। কান্নার মাঝে বারবার বাবা বলে কাঁদছে। আফিয়া সুলতান রুমাইসা কে নিয়ে ঘরে গেলো। আফিয়া সুলতান কে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতন কাঁদতে আমার বাবা বলে বলে।
মাহি এজওয়ান কে জিজ্ঞেস করলো-

-” ও এভাবে বাবা বাবা বলে কাঁদছে কেনো?
-” তাহলে কি আম্মা আম্মা বলে কাঁদবে?
মেহরিন ভাবলো চাচাকে বোধহয় অনেক ভালোবাসতো রুমাইসা৷ সেজন্য এভাবে কাঁদছে বাবা বাবা বলে।
দুপুর গড়িয়ে গেলে হুজুর বিদায় নিলেন।
এজওয়ান, আমিরুল সুলতান, আনোয়ার সুলতান রওনা হলেন শহরের পাশের এক ছোট্ট এতিমখানার দিকে।
সঙ্গে করে নেওয়া হয়েছে রান্না করা খাবার আর নতুন জামাকাপড়, জুতা, টুথপেস্ট-সাবানসহ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস। এতিম খানায় দিবে আর পথশিশু দের দিবে।
সুলতান নিবাসের সামনের বাগানের ডানে একপাশে একেবারে শেষ প্রান্তে সাদা পাঞ্জাবি মাথায় টুপি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে সোলেমান। তার পাশে বাশার সুলতান আর ইব্রাহিম ও দাঁড়ানো। সোলেমানের সামনেই দুটো কবর পাশাপাশি। একটা আমজাদ সুলতানের আরেকটা আমজাদ সুলতানের স্ত্রী মরিয়ম সুলতানের। ধীর গলায় সোলেমান সালাম দিলো-

-” আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর।
তারপর কিবলামুখী হয়ে সুরা ফাতিহা, সুরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসি এবং অন্যান্য সুরা পাঠ করে নিলো।
আজ অনেক গুলো বছর হলো এই মানুষ দুটো সোলেমানের নিকট নেই৷ আজ তারা বেঁচে থাকলে কতই না ভালো হতো! বাশার সুলতান বড় ভাইয়ের কবরটার দিকে তাকালো। বাবার মতনই সবসময় ভালোবেসে গেছে তাকে। জিয়ারত শেষে বাশার সুলতান আর ইব্রাহিম চলে গেলো পথ শিশুদের খাবার আর জামাকাপড় বিলাতে।
সোলেমান পড়ে রইলো কবরের সামনেই। তার পা নড়তে চাইছে না। শরীর ভার হয়ে আসতেছে। চোখের সামনে কত দৃশ্য ভেসে আসতেছে। চোখ দিয়ে গড়ালো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। মায়ের শরীরে গন্ধ বাবার স্নেহ আজ দুই যুগের বেশি হলো সোলেমান পায় না। যেই নির্মম ভাবে তার বাবা মা কে মারা হয়েছে তার প্রতিশোধ না নেওয়া অব্দি সোলেমান শান্তি পাচ্ছে না। সে ঐ সব খু’নি দের শাস্তি দিয়েই ছাড়বে যারা তাকে আর তার বোন কে এতিম করেছে।
সোলেমান চোখের জল মুছে নিলো সন্তপর্ণে। তার বাবা সব সময় বলেছে কখনও চোখের জল ফেলবে না৷ চোখের জল ফেলা মানে নিজের দূর্বলতা মানুষকে জানানো।
সোলেমান নিবাসের ভেতরে চলে আসলো। নিজের রুমের ভেতর ঢুকে আলমারি খুলে বাবার ছবিটা বের করলো। কালো স্যুটবুট পরিহিত টগবগে এক যুবক। সোলেমানের থেকে কোনো অংশে কম না দেখতে। আমজাদ সুলতানেরই তো রক্ত সোলেমান। বাপের মতই হবে ছেলে এটাই স্বাভাবিক। সোলেমান ছবিটার উপর হাত বুলালো আলতো করে। মৃদু স্বরে বলে উঠলো-

-” বাবা কতদিন, কতদিন দেখিনা তোমায়,কেউ বলে না তোমার মতো, কোথায় খোকা ওরে বুকে আয়……
এতিমখানায় খাবার জামাকাপড় দিতে দিতে রাত হয়ে যায়। সাতটার পর বাসায় ফিরে এজওয়ান আর তার চাচা দাদা রা। এজওয়ান কে দেখেই মাহি জিজ্ঞেস করলো-
-” আচ্ছা আমজাদ সুলতান তো আপনার চাচা।
-” হুমম তো?
-” আমজাদ সুলতানের বউ বাচ্চা নেই?
এজওয়ান হাত ঘড়িটা খুলতে খুলতে বলল-
-” কেনো সেসব জেনে তুমি কি করবে?
-” নাহ্ এমনি কৌতূহল হলো জানার।
-” এত কৌতূহল থাকা একদমই ভালো না মাহি।
-” ওনার বউ বাচ্চা নেই?
-” বউ নেই। মা’রা গেছে।
-” বাচ্চা আছে তাহলে?
-” হুমম।
-” ক’জন?
-” এক ছেলে এক মেয়ে।
-” তারা ছিলো না কেনো তাদের বাবার মৃত্যু বার্ষিকী তে?
-” কে বলেছে তারা ছিলো না? ছিলো৷ ছেলে জিয়ারত করেছে চাচার কবরে।
-” বাসায় আসলো না কেনো?
-” তুমি গোয়েন্দা?
-” না কেনো?

-” এত প্রশ্ন কেনো করছো? যাও বরের জন্য কফি বানিয়ে আনো। বরের সেবাযত্ন করো।
-” আমি চাকর না আপনার৷
-” বরের সেবাযত্ন করলে কেউ চাকর হয় না৷ ভাবির থেকে কিছু শেখো। ভাইজান বাড়ি থাকলে কত সেবাযত্ন করে।
ভাইজানের কথা শুনতেই মাহির মনে পড়লো-

দাহশয্যা পর্ব ৩৭

-” সোলেমান সাহেব আসলো না কেনো আজ?
এজওয়ান এবার টোটালি বিরক্ত হলো।
-” এখন আবার আমার ভাইজান কে নিয়ে কেনো পড়লে! সে তার কাজ ঠিকমতই করতেছে ঢাকাতে। বর রেখে বরের ভাইকে নিয়ে এত মাথা ঘামিও না তো বিরক্ত লাগে।

দাহশয্যা পর্ব ৩৯