দাহশয্যা পর্ব ৭০
Raiha Zubair Ripti
সকালে ঘুম থেকে উঠেই সোলেমান ইব্রাহিমের দেওয়া ফোন কলে জানতে পারে ঢাবি তে একটা ছেলেকে ছাত্রলীগের ছেলেপেলে মা’রতে মারতে একেবারে মে’রে ফেলেছে। ক্যাম্পাস জুড়ে বিক্ষোভের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। সোলেমানের কপালে দু ভাজ পড়লো। তর্জনী দিয়ে ঠোঁট চেপে বলল-
“ মারলো কেনো? ”
ইব্রাহিম জানালো-
“ ভারত বিদ্বেষী পোস্ট করেছিল আর ছাত্রলীগ দের উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেছিল। ”
“ ওদের কেউ আদেশ না দিলে তো ওরা মারবে না। পেছন থেকে আদেশ দিয়েছিল কে? ”
ইব্রাহিম কিছুটা চুপ হয়ে গেল। যে দিয়েছিল আদেশ তার নাম শুনলে তো সোলেমান রেগে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে।
“ চুপ কেনো? বল কে বলেছিল? ”
ইব্রাহিম পরপর দুটো ঢোক গিলে বলল-
“ চাচা। ”
সোলেমানের চোখ দুটো চমকে বড় হয়ে গেল।
“ চাচা! কিন্তু উনি তো দেশে নাই। ”
“ বিদেশে বসেই হুকুম দিয়েছে। ”
“ জল এটার কতদূর গড়িয়েছে? ”
“ অনেক দূর। ”
“ তার মানে চাচার জন্য এখন আমার রাজনীতি ক্যারিয়ারের ১২ টা বাজবে তাই তো? ”
“ নিঃসন্দেহে। ”
“ চাচা যে এসব করিয়েছে এর কোনো প্রমান এসেছে সবার সামনে? ”
“ না ওরা স্বীকার করে নি,ওরা জানে না যে চাচা বলেছে ছেলেটাকে দেখতে। ”
“ চাচা কে আমি দেখে নিচ্ছি। ওদের দেখুক প্রশাসন। ”
রাত দুইটায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল ফাহাদ কে হল থেকে বের করে পুলিশে দেওয়া হবে। ফয়সাল চকবাজার থানা পুলিশকে ফোন দিয়ে বলে-
“ হলে একটা শিবির ধরা পড়েছে। এসে নিয়ে যান।”
চকবাজার থানা পুলিশ একটা টহল দল পাঠায় শেরে বাংলা হলের গেইটে। কিন্তু দেরী হওয়ায় গেইট থেকে পুলিশকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
রাত আড়াইটা। ফয়সালের ছেলেপেলে মিলে নিশ্চল ফাহাদ কে তোশকে করে হলের দোতালার সিঁড়িতে এনে রেখে দেয়। সিঁড়ির লাইটের আলোয় ফাহাদেরর খালি গায়ে তখন স্পষ্ট কালো কালো দাগ। সারা শরীরে স্ট্যাম্পের বাড়ির কারণে কালশিটে পড়ে আছে। চোখ বন্ধ। তবে চেহারায় কোন যন্ত্রণার ছাপ নেই। বরং সেখানে প্রশান্তির চিহ্ন। নিষ্ঠুর অমানুষদের এই পৃথিবী ছেড়ে স্রষ্টার সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার প্রশান্তি।
রাত তিনটায় খুনীরা ঢাবির চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আনে। চিকিৎসক ফাহাদের দেহ পরীক্ষা করে ঘোষণা দেন সে মারা গেছে। তড়িঘড়ি করে ক্রিকেট স্ট্যাম্প, তোষক, বালিশ, ফাহাদের ফোন, চাপাতি হলের ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ঢাবির ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির কক্ষে নিয়ে রেখে দেওয়া হয়। ছাত্রলীগের সভাপতি ফাহাদের মৃতদেহ হলের নিচে নামানোর পর তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য চিকিৎসককে চাপ দেন। খুনীরা সিদ্ধান্ত নেয় ফাহাদের লাশ গুম করে ফেলা হবে। কিন্তু ততক্ষণে কিছু শিক্ষার্থী দেখে ফেলায় তার নতুন পরিকল্পনা করেছিল। ফাহাদের লাশের সাথে কিছু মাদক দিয়ে গণপিটুনিতে মারা যাওয়ার নাটক সাজানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জাহিদদের জন্য হয়ে উঠে নি।
পুরো ঢাবি ক্যাম্পাস আজ উত্তাল। সোলেমান ফোন কলে কথা শেষ করেই হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আসে। খু’নি দের এখনও ধরা হয় নি। ধরবে যে ফাহাদের হয়ে এখনও মামলা দায়ের করা হয় নি।
সোলেমান ঢাবি তে আসলো। যেহেতু সেও এক সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ই নেতা ছিলো। ভার্সিটির ছেলেপেলে তার উপর চড়াও হলো। সে একজন এমপি হয়ে কেনো তার দলের ছাত্র নেতাদের সামলাতে পারে না। সোলেমানের ইচ্ছে করছে চাচাকে তুলে আছাড় মারতে। তবে রাগ টা সাইডে রাখলো। এখন ছেলেপেলে দের শান্ত করতে হবে। সোলেমান তাদের আশ্বস্ত করে বলল-
“ যারা এর সাথে জড়িত আমি তাদের সর্বোচ্চ সাজা পাওয়ানোর চেষ্টা করবো। আপনারা শান্ত হন। ”
শান্ত হতে বললেই কি তারা শান্ত হয়? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনীতি বয়কট চাইলো তারা। এখন সোলেমান কিভাবে বয়কট করাবে? এই পাওয়ার কি তার হাতে? সে নিজেই রাজনীতি করে বেরিয়েছে এখানে। সোলেমান পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে নিবাসে ফিরে আসলো। চাচাকে ফোন দিচ্ছে কিন্তু ফোন সুইচ অফ।
মাহি খবর পেয়েছে তাদের ভার্সিটিতে একজন খুন হয়েছে। কিন্তু ভার্সিটি তে এসে ছেলেটার মুখটা দেখে চিনতে অসুবিধে হলো না। ইশ এই ছেলেটাকেই ওরা মারলো!
ইমন ও ছুটে এসেছে ঢাবিতে সাথে ইয়াসিন ও। ঢাবির ছেলেপেলের সাথে ইমন ও বিক্ষোভে যোগ দিলো। ইয়াসিন কে বললে ইয়াসিন জানায়- সে আসতে পারবে না। ভাইয়ে শুনলে রাগ করবে।
ইমন আশ্চর্য হলেও পরক্ষণেই মনে পড়লো রাগের কারন টা। তার দলের ছেলেপেলেই তো করেছে এই খু’ন টা। ঘৃণা টা বাড়তে লাগলো। ইমন জানতে পারলো ফাহাদের পরিবার কে এখনও জানানো হয় নি। পরিবার বলতে আছে একটা বোন। আর মা দ্বিতীয় বিবাহ করেছে। বোনের নাম্বার নেই যে জানাবে। ফাহাদের ফোনটা ভেঙে কোথায় ফেলে দিয়েছে খুঁজে পায় নি কেউ। ফাহাদের লাশ টা ক’জন মিলে চট্রগ্রাম নিয়ে গেল। অফিসে ঠিকানা দেওয়া ছিলো কাগজপত্রে। সেখান থেকে নিয়েই তারা ছুটলো। সাথে ইমনও গেলো। বাকিরা ঢাকায় থাকলো আন্দোলনে।
গতকাল রাতে ভাইয়ের আর ফোন না পেয়ে বাতাসি লুকিয়ে রান্না ঘরে এসে ঘুমিয়েছিল। আবার ভোর হতেই মা দেখার আগে বেরিয়ে গেছে নদীর ধারে। হাতের ফোনটা দিয়ে আবার ভাইয়ের নম্বরে কল লাগালো। কিন্তু বন্ধ বলছে। বাতাসি নদীর কিনারায় বসে কেঁদে দিলো। তার ভাই ফোন কেনো ধরছে না? ফোন কি নষ্ট হয়ে গেছে? তাহলে একটু অন্য কারো ফোন দিয়ে ফোন দিক না। ক্ষুধার জ্বালায় পেট জ্বলছে। বাতাসি নদীর পানি দু হাতে নিয়ে চুমুক দিয়ে খেলো। কত-শত নৌকা চলে যাচ্ছে এই নদী দিয়ে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে বিকেল আসলো। কিন্তু ভাইয়ের আর ফোন আসলো না।
বাতাসি বালির উপর শুয়ে পড়লো। নৌকা গুলোর দিকে তাকিয়ে গাইলো-
কইলজা আমার পুইড়া গেল, গেল রে
ভাইয়ের দেখা পাইলাম না, পাইলাম না
ছিলাম রে কতই আশা লইয়া
ভাই না আইলো গেল গেল,
রথের মেলা চইলা
তোরা কে যাস কে যাস……
সুজন মাঝিরে ভাইরে কইয়ো গিয়া
না আসিলে স্বপনেতে দেখা দিত বইলা…
দৌড়াতে দৌড়াতে সিহাব আসলো বাতাসির কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-
“ আপা আপা। মায় তোমারে বাড়ি যাইতে বলছে। ”
বাতাসি সিহাবের গলা শুনে শোয়া থেকে উঠলো। চোখের পানি মুছে বলল-
“ সত্যি মায় আমারে বাড়ি যাইতে বলছে! মা’রবো না তো আমারে? ”
“ না মারবো না। ”
বাতাসি শরীরে লেগে থাকা বালি গুলো ঝেড়ে মুখে হাসি ফুটালো। ভাইয়া বলছে কিছু ফোন দিয়ে? তাই আম্মা বাসায় যাইতে বলল!
বাতাসি সিহাবের হাত ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। বাড়ির সামনে আসতেই বাড়ির উঠানে লোকজনের ভীড় দেখে ভ্রু কুঁচকালো বাতাসি। সিহাব রে জিজ্ঞেস করলো-
“ এত মানুষ ক্যান বাড়িতে? কোনো অনুষ্ঠান নাকি? ”
সিহাব বলল-
“ ফাহাদ ভাই আইছে। ”
কথাটা শোনা মাত্রই বাতাসির চোখ মুখে খুশির ঝিলিক দেখা গেল। বাতাসি দৌড়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। মানুষের ভীড় ঠেলে আসতেই চৌকাঠের সামনে খাটিয়া দেখে দাঁড়িয়ে গেল। খাটিয়ে কেনো এখানে? কে মরেছে? বাতাসি পাশে তাকালো। তার মা তো ম’রে নি। ঐ যে মরাকান্না কাঁদছে। চৌকাঠে হাত কপালে ঠেকিয়ে তার সৎ বাবা বসে আছে। তার কোলে সুমাও আছে। আর সিহাব ও তার লগেই। তাহলে খাটিয়ায় কে? বাতাসি খাটিয়ার দিকে আঙুল তাক করে বলল-
“ আমাগো বাড়িতে খাটিয়া ক্যান? আমার ভাই না বলে আইছে? কই আমার ভাই কই? ভাইয়া কোথায় তুমি? কাল কতবার করে ফোন দিলাম ধরলা না ক্যান? ”
ইমন পাশ ফিরে তাকালো মেয়েলি গলার আওয়াজ শুনে। বয়স কত হবে সতেরো কি আঠারে। এটাই ফাহাদের বোন?
বাতাসির মা বাতাসির দিকে তাকালো। বাতাসি এগিয়ে এসে বলল-
“ ও মা কাঁদতেছ কেনো? কি হইছে মা? তোমার কি বুকে কষ্ট হইতাছে? ভাইরে বলবো নি ঔষধ এনে দিতে। তুমি কাইন্দো না। ”
বাতাসির মা আরো জোরে কান্না করতে শুরু করলো। বাতাসি সবার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আশ্চর্য মায় কান্দে ক্যান? আমার ভাই কই? আপনারা দেখছেন কেউ আমার ভাই রে? ”
জাহিদ এবার এগিয়ে আসলো। খাটিয়ার পাশে থাকা স্ট্রেচারের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ তোমার ভাই এখানে শুয়ে আছে। ”
কথাটা কানে যেতেই বাতাসি হাতের ইশারা লক্ষ করে তাকালো। খাটিয়ার পাশে স্ট্রেচারে ইঙ্গিত করলো কেনো! ওখানে শুয়ে আছে মানে! বাতাসির টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে ইমন এসে ধরে ফেলে। বাতাসি বোধহয় এখনও একটা ঘোরের মধ্যে আছে। উনি ওটা কি বললো!
একজন এসে ফাহাদের মুখের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে দিলো। বাতাসি ভাইয়ের চেহারা টা দেখতে পেলো। ঐ তো তার ভাই। ওভাবে শুয়ে আছে ক্যান? বাতাসি পাগলের মতন দৌড়ে ছুটে গেল। ভাইয়ের গালে দু হাত রেখে ডেকে উঠলো –
“ ও ভাই তোমার কি হইছে? ভাই চোখ খুলো। তুমি কাল ফোন ধরলা না ক্যান আমার? কতবার ফোন দিলাম। মায় যে আমারে বাড়ি থেকে বের করে দিছিলো। ও ভাই শুনতেছো? ”
বাতাসি ভাইয়ের মুখে কালচিটে মারের দাগ দেখে চমকালো। চিৎকার করে বলল-
“ আমার ভাইয়ের মুখে এগুলা কি হইছে? এমন মাইরের দাগ ক্যান? কেরা মারছে আমার ভাইরে? আমার ভাই কইছিল সামনের মাসে বাড়ি আইবো। কি হইছে এটা আমার ভাইয়ের? ভাই উঠো। ”
বাতাসি ভাইয়ের দেহ টা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে গগনবিদারী চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। বাতাসির চিৎকারে আশেপাশে থাকা লোকজনের চোখেও জল চলে আসলো। এই অভাগীর যে এই এক ভাই ছাড়া আপন বলতে কেউ ছিলো না এই দুনিয়ায়। এখন সেই ভাইটাও চলে গেল! ছেলেটা অনেক ভদ্র সভ্য ছিলো। স্বপ্ন ছিলো দু চোখ ভরা। একদিন অনেক টাকা রোজগার করবে আর বোন কে নিয়ে আলাদা হয়ে যাবে।
সেই স্বপ্ন গুলো এখন দুঃস্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল!
মহিলা গুলো টেনে নিয়ে যেতে চাইলো বাতাসিকে। কিন্তু বাতাসি ভাইয়ের শরীর জড়িয়ে ধরলো।
“ আমারে আমার ভাইয়ের কাছ থে আলাদা কইরো না তুমরা। আমার ভাই আমারে ছাইড়া যাইতে পারে না। আমার ভাই কথা দিছিলো আমারে সব সময় আগলায় রাখবো। ভাই কথার খেলাপ করলো! ”
লোকজন জিজ্ঞেস করলো ইমন দের। কারা মেরেছে?
জাহিদ সব খুলে বলল কারা মে’রেছে। একজন বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলো-
” এমনে মারলো ক্যান আমাগো ফাহাদ রে? ”
“ ভারত বিদ্বেষী পোস্ট করছিল সেজন্য। ”
“ কি পোস্ট করছাল ফাহাদ যে তার জন্য ওরা মারলো? ”
“ ইলিশ মাছ নিয়ে,জ্বালানি নিয়ে,হলে ছাত্র লীগের আধিপত্য নিয়ে। ”
বাতাসির কানে শুধু বাজলো ইলিশ মাছের কথাটা। বাতাসি খাইতে চাইছিল ইলিশ মাছ। তার জন্যই তার ভাই ম’রে গেল!
“ ভাই আমি আর জীবনে ইলিশ খাইতে চামু না।তুমি ফিরা আসো। আল্লাহর দোহায় লাগে তুমি ফিরা আসো। আমার জন্য ওরা তোমারে মারলো ভাই। আমি তোমারে ছাড়া বাঁচমু কেমনে? আমার কথাডা ভাবলা না একবার ও? আমার তো বাপ মা কেউ নাই। ছিলো শুধু একটা তুমি ভাই। সেই তুমিও চইলা গেলা আমরে রাইখা! আমি তো এতিম হইয়া গেলাম। কেউ রইলো না আর আমার। ”
হুজুর আসলো ফাহাদ কে গোসল করানোর জন্য। বাতাসি কে জোর করে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো।
বাতাসির মা ছেলের নাম ধরে বিলাপ করছে। এত ভালোবাসা তো আগে কেউ দেখে নি ছেলেমেয়ে জন্য।
ফাহাদ কে গোসল করিয়ে সাদা কাফনের কাপড়ে ঢেকে খাটিয়ায় শুয়ানো হলো। বাতাসি বিধ্বস্ত হয়ে মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে বসে নির্নিমেষ চোখে দেখলো। তার ভাই যে আর নেই সেটা মানতেই পারছে না বাতাসি। এরজন্য গতকাল তার ভাই ফোন ধরে নাই।
ওরে কুলাঙ্গার যারা বাতাসির ভাই ডারে মারলি তোরা কি জানিস না এই পৃথিবীতে এই অভাগী বাতাসির ফাহাদ ভাই ছাড়া আর কেউ নাই! তোরা ফাহাদ কে মে’রে ফেলার সাথে সাথে একটা নিষ্পাপ বোকা অবহেলিত মেয়েটাকেও মে’রে ফেললি।
গ্রামের সকল লোকজন এসে জড়াও হইছে। ফাহাদের জানাজা পড়ানো শুরু করা হলো। ইমন জাহিদ রা ওজু করে ফাহাদের জানাজায় দাঁড়ালো। জানাজা শেষে যখন কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে ফাহাদ কে তখন বাতাসি আর বসে থাকতে পারলো না। ফাহাদের খাটিয়া বহন করছে ইমন,জাহিদ,মতিন আর একজন। বাতাসি গিয়ে মতিনের পা চেপে ধরে বলল-
“ বাজান নিয়া যাইয়েন না আমার ভাই ডারে। ঐ কবরে কেমনে থাকবো আমার ভাই? অনেক কষ্ট হইবো। ”
দুজন মহিলা এসে টেনে ধরলো বাতাসি কে। ইমন এক ঝলক তাকালো বাতাসির দিকে। কেনো যেন বাতাসির মধ্যে ঊর্মি কে দেখতে পেলো। তার মৃত্যুর সময়ও বুঝি এভাবেই কান্না করবে ঊর্মি!
ফাহাদ কে নিয়ে চলে যাওয়া হলো। এলাকার কবরস্থানে দাফন করে ফের বাতাসি দের বাড়ি আসলো। বাতাসির মায়ের সাথে কথা বলে জানাল- এটা একটা হত্যা কাণ্ড। তারা যেন মামলা করে। বাকিটা তারা দেখে নিবে।
মতিন মামলার কথা শুনে ইনিয়েবিনিয়ে না করলো। করতে পারবে না। ইমন রেগে গেলো এ কথা শুনে। জাহিদ কে বলল-
“ উনাদের করা লাগবে না। বাতাসি করবে। বাতাসি কোথায়? ”
ইমন আশেপাশে তাকালো বাতাসি কে খুঁজলো। বাতাসি নেই। একজন জানালো বাতাসি কবরস্থানের দিকে গেছে।
ইমন জাহিদ ছুটলো কবরস্থানে। এসে দেখলো ভাইয়ের কবর টা দু হাতে জড়িয়ে ধরে বাতাসি কাঁদছে। আর কেঁদে কেঁদে বলছে-
“ আমার ভাইরে যারা মারছে আল্লাহ তুমি তাদের বিচার কইরো। আমার ভাইরে কত কষ্ট দিয়াই না মারছে। তার চেয়ে কয়েক হাজার গুন বেশি কষ্ট তুমি দিও। ”
জাহিদ এসে টেনে উঠালো বাতাসি কে। চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল-
“ এই বাতাসি শোন। তোর ভাইয়ের অপরাধী দের শাস্তি চাস তো? ”
বাতাসি কবরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো।
“ চল এখনই মামলা করবো আমরা। ”
চট্রগ্রাম থানায় সেই রাতে একটা মামলা করা হলো। ইমন বাতাসির দিকে তাকালো। মেয়েটা এখনও কান্না করছে। আহারে কেউ রইলো না আর মেয়েটার!
বাতাসি কে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তারা ঢাকা চলে আসে।
সোলেমান সন্ধ্যায় অতর্কিতে ঢাবি প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন অফিসারের সঙ্গে দেখা করল। ২০ জন কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে ফাহাদ হত্যার ঘটনায়। সোলেমান সেই ২০ জনের নাম ঠিকানা নিয়ে চলে আসলো ইব্রাহিমের বাড়ি। বাগানের চেয়ারে বসে কফির মগে চুমুক দিলো। মাথা ব্যথায় ইচ্ছে করছে মাথাটা শরীর থেকে আলাদা করে দিতে। কখনও চাচা তো কখনও চাচার ছেলে তার ১২ টা বাজিয়ে দিচ্ছে। কি দরকার ছিলো মেরে ফেলার ছেলেটাকে? মিথ্যা তো বলে নি কোনো কথা। দু চারটা চড় মে’রে না হয় সাবধান করে দিতি। তা না এমন মারা মারছে যে মরেই গেল ছেলেটা।
“ এখন কি করবি সোলেমান? ”
সোলেমান কফির মগ টা রেখে বলল-
“ কি করবো আর আমি? চাচা ফোনই তো ধরছে না। ”
“ চাচার কাজ টা কিন্তু মোটেই ঠিক হয় নি। ভাই এভাবে কে মারে? জা’নোয়ারের মতন করে পিটাইছে ছেলেটাকে। পুরো শরীরে কালসিটে দাগ পড়ে গেছে। ”
“ ছেলেটা নির্দোষ ছিলো বলেই একটু খারাপ লাগতেছে। কিন্তু আমার রাজনীতি ক্যারিয়ারের কথাও ভাবতে হবে আমায়। এক ছেলের জন্য নিশ্চয়ই আমি খেলার মাঠ থেকে ছিটকে পড়ে যেতে চাইবো না। চাচা দেশে আসুক তাকে যা করার আমি করছি। মিডিয়াতে যেন তার নাম না আসে বলে রাখলাম। ”
ইমন হেঁটে এদিক টায় আসছিলো। কিন্তু সোলেমানের লাস্ট কথাগুলো শুনে চমকে উঠলো। তার চাচার নাম মিডিয়াতে আসতে বারন করলো কেনো? তার চাচা জড়িত এই হত্যা কাণ্ডের সাথে?
ইমন দ্রুত পায়ে হেঁটে আসলো। সোলেমান ইব্রাহিমের সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
“ আপনার চাচা কি এই হত্যা কাণ্ডের সাথে জড়িত সোলেমান সাহেব? ”
সোলেমান মাথা উঁচু করে সামনে তাকালো। ইমন কে দেখে বলল-
“ না। তোমার কেনো মনে হলো চাচা জড়িত? ”
“ না আপনি যে বললেন মিডিয়াতে তার নাম যেন না আসে। কেনো আসতে বারন করলেন? ”
সোলেমান ইব্রাহিমের দিকে তাকালো। ইশারায় বুঝালো এটা কে সামনে থেকে সরা। আর বুঝিয়ে বল কিছু।
ইব্রাহিম ইমন কে সাইডে নিয়ে বলল-
“ তুমি যা ভাবছো তেমন কিছুই না ইমন। ”
“ তাহলে মিডিয়াতে নাম আসতে বারন করলো কেনো? আপনারা কিছু লুকাচ্ছেন তাই না? ”
“ আরে বাবা কি লুকাবো তোমার থেকে? তোমাকে বলা হলো তো চাচা জড়িত না এসবে। যারা জড়িত তাদের তো ধরা হয়েছেই। শাস্তিও পাবে। ”
“ যাদের ধরা হয়েছে তারা তো জাস্ট গুটি ছিলো। কিন্তু উপর থেকে যারা চাল দিচ্ছে তাদের তো ধরা হয় নি। দেখুন স্যার আমি ঐ ছেলের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ঐ ছেলের এক ছোট দুঃখী বোন ছাড়া আর কেউ নাই। আমি ঐ ছেলের হত্যার বিচার চাইবো। যদি আপনারা এর ভেতর জড়িত থাকেন তাহলে আমি আপনাদের বিপরীতে চলে যেতে দু’বার ও ভাববো না। ”
পেছন থেকে সোলেমান গম্ভীর গলায় রেগে দাঁত চেপে বলল-
“ এই এটাকে বের কর তো। আমার চোখের সামনে যেন না দেখি। এসে থেকেই মাথা খাচ্ছে। তোর ভাই মরছে? তোর ফ্রেন্ড লাগে ঐ ছেলে? কিছুই তো লাগো না। তাহলে এত পুড়ছে কেনো? আসছে আমাদের বিপরীতে দাঁড়াতে। ”
ইব্রাহিম ইশারায় ইমন কে আপাততঃ চলে যেতে বলল। ইমন ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আমি আর আপনার দেওয়া জব টা করছি না আজ থেকে। আমি নিশ্চিত আপনাদের মাঝে থাকা কেউ এসবে জড়িত। আর আমি ইমন সেটা প্রমাণ করেই ছাড়বো। ”
ইমন বেড়িয়ে গেল বাড়ি থেকে। ইব্রাহিম কপাল হাত দিয়ে চেপে ধরলো।
ইমন সোজা গিয়ে জাহিদের সাথে দেখা করলো। জাহিদ কে গিয়ে বলল সুলতান পরিবারের বাশার সুলতান হয়তো জড়িত আছে এসবে। জাহিদ আর ইমন পুলিশের কাছে গেল। পুলিশ কে সব খুলে বলতেই পুলিশ জানালো যেহেতু প্রমান নেই তাই তারা কিছু করতে পারছে না সরাসরি তবে ইনভেস্টিগেশন করবে তারা।
ইমন জাহিদ চলে গেল। পুলিশ ওদের চলে যাওয়া দেখে সোলেমান কে ফোন করলো। সোলেমান পুলিশের ফোন পেয়ে ভ্রু কুঁচকালো।
“ কি হইছে? ”
“ দুজন ছেলে আসছিল। বলল আপনারা চাচা জড়িত আছে ফাহাদ হত্যার সাথে। ”
“ ইমন নামের কেউ এসেছিল? ”
“ জ্বি। ”
“ প্রমান আছে চাচা জড়িত এসবে? ”
“ আপনার চাচার ফোন কলের প্রুফ পাওয়া গেছে। আপাততঃ আমিই জানি। তাকে উপর মহল থেকে বিষয় টা দেখতে বলেছিল। আপনার চাচা সেজন্য ঢাবির ছাত্রলীগের সভাপতি কে বলেছিল বিষয় টা দেখতে। তারা দেখার নাম করে মে’রে ফেলছে ছেলেটাকে। এখন আপনি কি চান ? ফাহাদ হত্যার সাথে যারা জড়িত তাদের সবার সবাই শাস্তি পাক। নাকি তাদের সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত আপনার চাচাকে এসব থেকে বাঁচিয়ে নিজের রাজনীতি ক্যারিয়ার টা বাঁচাতে চান?
সোলেমান অকপটে জবাব দেয়-
“ আই ওয়ান্ট সেভ মাই পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার। তার জন্য যদি চাচা কে শাস্তি পাওয়ার থেকে আড়ালে ক্ষমতা প্রয়োগ করে বাঁচাতে হয় তাহলে বাঁচাবো। বাকিদের শাস্তির ব্যবস্থা করুন। আর চাচাকে বলেছিল কে বা’ল পাকনামি করতে? ”
দাহশয্যা পর্ব ৬৯
“ উপর মহল থেকেই কেউ একজন বলেছিল। সেই নাম জানতে পারি নি আমি। আপনারা চাচা মারাত্মক ভুল করেছে। ”
“ আই নোও দ্যাট। কিন্তু তার জন্য আমি আমার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার নষ্ট করতে চাই না। চাচাকে বাদ দিয়ে যা করার করুন। ফাহাদ নামের ছেলেটার পরিবারের দায়িত্ব নিব। মোটা অ্যামাউন্টের টাকা দিব। তাতে সারা জীবন তাদের আরামসে কে’টে যাবে। ”
