Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৭১

দাহশয্যা পর্ব ৭১

দাহশয্যা পর্ব ৭১
Raiha Zubair Ripti

ফাহাদ হত্যার আসামীদের মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইমন সুলতান পরিবারের বিরুদ্ধে কোনো প্রমানই পায় নি। জিহাদ হাল ছেড়ে দিয়েছে এ বিষয়ে। ভার্সিটি খুলে যাওয়ায় পড়াশোনা তে মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু ইমনের মন বলছে সুলতান পরিবার এর পেছনে আছে। হয়তো কোনো প্রমাণ তারা রাখে নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে গিয়ে বসলো ইমন। কয়েক দিন ধরে সে মেসে থাকা শুরু করেছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আছে ৫০-৬০ হাজার টাকা। যা ইমন বেতন থেকে একটু একটু করে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তাই তেমন অসুবিধায় এখনও পড়তে হয় নি তাকে। ইমন যোহরের নামাজ আদায় করে মেসের দিকে ফিরছিল। রাস্তায় কিছু লোক দেখে দাঁড়িয়ে যায়। এরা মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলে। পড়নে পাঞ্জাবি মাথায় টুপি। ইমন কে দেখে তারা সালাম দিয়ে কাছে আসলো। সাথে সাথে এক মিষ্টি আতরের সুগন্ধ ভেসে আসলো নাকে। ইমন সালামের জবাব দিলো। তাদের মধ্যে থাকা একজন ছেলে নাম মঈনুল। সে ইমন কে চিনতে পেরে বলে উঠলো-

“ আপনি উনি না? যে ফাহাদ হত্যায় প্রতিবাদ করেছিলেন আমাদের সাথে? ”
ইমন মাথা নেড়ে বলল-
“ জ্বি । আপনারা ছাত্রশিবির? ”
ছেলেপেলে আশেপাশে তাকালো।
“ জ্বি। ”
“ কোথাও যাচ্ছেন নাকি? ”
“ জ্বি। আমরা সভায় যাচ্ছি। ”
ইমন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-
“ কিসের সভা? ”
“ কর্মী সভা। আমাদের ছাত্রশিবির দের অনেক নিয়মশৃঙ্খলার ভিতর দিয়ে যেতে হয়। আমাদের নিত্যদিনের কাজের রিপোর্ট তাদের দেখাতে হয়। তো সেখানেই যাচ্ছি। ”
ইমন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-

” আমি যেতে পারবো? ”
ছেলেগুলো একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলো। ইমন আস্বস্ত করে বলল-
“ আমি কাউকে বলবো না। বিশ্বাস করতে পারেন আমাকে। ”
ছেলেপেলে আচ্ছা ঠিক আছে বলে হাঁটা ধরলো।
ইমন তাদের পেছন পেছন গেলো। তারা বাংলা বাজারের দিকে গেলো। তিন তলা এক বিল্ডিং এর দোতলায় উঠলো। একটা মধ্যম আকৃতির হল রুম। ইমনের বুঝতে বাকি নেই এটা লুকিয়ে গোপনে হচ্ছে। কারন ৯০ দশকের পর থেকে শিবিরের প্রকাশ্য দখলদারিত্ব ভেঙে পড়েছে, বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রতিপক্ষ সংগঠন বিশেষ করে আওয়ামী ও ছাত্রলীগের কারনে তারা ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রকাশ্যে বৈঠক বা চা-চক্র করে না। কারন আওয়ামিলীগের শত্রু শুধু বিএনপি না। সাথে জামায়াত ও।
শিবিরের সংগঠন ইসলামভিত্তিক,শৃঙ্খলা, পড়াশোনা, নামাজ, দাওয়াতে জোর দেয়; আওয়ামী লীগের মতো উশৃঙ্খল রাজনীতি তারা করে না। এই নৈতিক অবস্থানই ছাত্রসমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় এবং আওয়ামী লীগের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপি যতটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য, জামায়াত ততটা নয়—আর ইসলামী আন্দোলনই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বড় বাধা।

মাদ্রাসার ছাত্ররা যারা কুরআন হাদীস থেকে ইসলামের জ্ঞান অর্জন করে । তারা কনোদিন ধর্মনিরপেক্ষ হতে রাজি হবে না। তারা বলবে না ধর্ম যার যার উৎসব সবার। তারা উল্টো বলবে ধর্ম যার যার উৎসবও তার তার।
তাই আওয়ামী লীগ নানা উপায়ে জামায়াত ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে।
মাদ্রাসার ডিগ্রি মান না দেওয়া, সামরিক–বেসামরিক চাকরি থেকে দূরে রাখা, বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ সীমিত করা, নানা অজুহাতে অনুমোদন বন্ধ করা ইত্যাদি।
এদের একমাত্র উদ্দেশ্য ইসলামী শিক্ষা দুর্বল করা ও সমাজের মধ্যে আলেম সমাজের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা। অথচ আজ পর্যন্ত কোথাও কোনো প্রমাণ বের করতে পারেনি যে, মাদ্রাসা ও আলেমগণ এসবের সাথে জড়িত।
টানা তিনঘণ্টা ইমন মনোযোগ সহকারে তাদের কথা শুনলো। প্রতিটি মানুষের ব্যবহার এত অমায়িক যা বলার বাহিরে। ইমনের মনে এখন একটাই কথা আসতেছে। তারা এত ভালো তাহলে রগ কাটে কেনো? শিবিরের নামের আগে এই ট্যাগটা ব্যবহার করে লোকজন। খুব একটা ভালো চোখেও দেখে না তাদের দেশবাসী। ইমন কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বলল-

“ আমার একটা কথা জানার ছিলো। ”
ইমনের কথায় বক্তৃতায় ব্যাঘাত পেলেন শিবিরের এক প্রবীণ নেতা। তিনি জিজ্ঞেস করলো-
“ কি জানতে চাও? ”
“ আমি আজ প্রথম এসেছি আপনাদের এখানে। আপনাদের আচার-আচরণ কথাবার্তা দেখে শুনে আমার মনে হয় না আপনাদেরকে যেভাবে খারাপ বলে উল্লেখ করে তারা আপনারা ততটাও খারাপ। আচ্ছা আপনাদের শিবির নামের আগে রগ কাটার ট্যাগ টা কেনো দেওয়া হয়েছে? ”
লোকটা মুচকি হেঁসে বলল-
“ তাহলে তো ফিরে যেতে হবে ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ। ”
“ কেনো কি ঘটেছিল সেদিন? ”
“ সেদিন রাবিতে শিবিরের নবাগত সংবর্ধনা ছিলো। সেই সংবর্ধনায় ছাত্রলীগসহ কয়েকটি সংগঠন হামলা করে। এতে শিবিরের ৪ জন মারা যায়। এতে সাধারণ ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদে নামলে ছাত্রলীগ পাল্টা অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। তখন ফেসবুক,ইউটিউব ছিল না, সেজন্য সত্য দেখানোর সুযোগও ছিল না। বরং পত্রিকা,রেডিও শিবিরের নামেই উল্টাপাল্টা নিউজ ছাপাত, আর মানুষ তা-ই বিশ্বাস করত।
যে কোনো ঘটনার প্রমাণ না পাওয়ার আগেই বলা হতো শিবির জড়িত। পরে নির্দোষ প্রমাণ হলেও মানুষের মনে থেকে যেত আগের বদনাম।

সব দলের প্রোগ্রাম কে বলা হয় দলীয় প্রোগ্রাম। আর আমাদের প্রোগ্রাম কে বলা হয় গোপন বৈঠক। সবার আন্দোলন কে বলা হয় আন্দোলন আর শিবির নামলে বলা হয় তাণ্ডব। অন্যান্য সংগঠনের বেলায় ব্যবহার করা হয় ছাত্রনেতা আর শিবির দের বেলায় মিডিয়া ব্যবহার করে শিবির ক্যাডার! অন্য সংগঠনের বই কে বলা হয় সাহিত্য পাঠ,আর শিবির দের বই কে বলা হয় জিহাদি বই। উদাহরন স্বরূপ বলা যায় ফাহাদ হত্যার ঘটনা। সে কিন্তু শিবির ছিলো না। কিন্তু তাকে শিবির ভেবেই পিটিয়ে মা-রা হয়েছে। সে শিবির না এটা প্রমান হওয়ার পরই ছাত্রজনতা তারজন্য রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু সে যদি সত্যি শিবির হতো তাহলে জীবনেও আন্দোলন হতো না আর না কেউ সাজা পেত। বিষয় টা এমন যে শিবির হলে তাকে হত্যা করা জায়েজ। জামায়াত কে আওয়ামিলীগ প্রথমে নেতৃত্ব শূন্য করেছে যাতে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে। আর শিবির দের মিথ্যা মামলায় আসামী করে গুম খু’ন করছে। আর দেশবাসীর কাছে প্রেজেন্ট করেছে তারা রাগ কাটে! এটা পসিবল? শিবির মারার জন্য রগ কেনো কাটতে যাবে হাত পায়ের? হাত পায়ের রগ কাটতে হলে তো আগে হাত পা মুখ বেঁধে তারপর কাটতে হয়। যদি মা’রার ইচ্ছেই হয় তাহলে তো চাকু বা ছু’রি ডিরেক্ট পে’ট দিয়েই ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। তারজন্য রিস্ক নিয়ে এত সময় অপচয় করে হাত পায়ের রগ কাটে কোন পাগল বলো? এটা একটা রীতিমত বানোয়াট কথা তাদের। কোথাও দেখেছো তোমরা নিজ চোখে তাদের রগ কাটতে? কোনো প্রমান আছে? নেই। ”

ইমন কোনো ভাবনা চিন্তা ছাড়াই বলল-
” আমি আপনাদের দলে যোগদান দিতে চাই। ”
“ উড়ে এসে জুড়ে বসার কোনো সুযোগ নেই এখানে। তুমি যদি যোগদান দিতে চাও তাহলে তোমাকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য করে তারপর আসতে হবে। ”
“ আমি প্রস্তুত। ”
প্রবীণ নেতা মঈনুলের দিকে তাকিয়ে বলল তাকে সমর্থক ফ্রম টা এনে দিতে। মঈনুল উঠে গিয়ে এনে দিলো। ইমন সব কিছু পূরণ করলো। মঈনুল ফ্রম টা নিয়ে নেতার হাতে দিলো। উনি ফর্ম টা একবার পড়ে বলল-
“ ওরা সব শিখিয়ে দিবে তোমায়। আল্লাহর পথ থেকে সরো না কখনও। ভুলবে না এক আল্লাহ ব্যতিত তোমার কেউ নেই এই পৃথিবীতে । দুদিনের দুনিয়ায় ভোগ বিলাসের লোভে পড়ে তার দ্বিন কে অস্বীকার করো না। নামাজ কালাম, কুরআন পাঠ করবে সব সময়। তোমরা নবীন রাই আমাদের ভরসা। তোমরাই এগিয়ে নিয়ে যাবে আমাদের। আমরা আর আছিই বা কতদিন? তারপর তো দলের সব দায়দায়িত্ব তোমাদের উপরই এসে পরবে। ”
ইমন সৌজন্যমূলক হাসি উপহার দিয়ে বলল-

“ ইনশাআল্লাহ আমি আপনার কথা মনে রাখবো।”
সোলেমান চাচা কে ফোনে না পেয়ে লুকা কে ফোন করলো। লুকা ফোন রিসিভ করতেই সোলেমান বলল-
“ চাচা কোথায় লুকা? ”
লুকা জানালো-
“ আপনার চাচায় ম’রার মতন ঘুমাচ্ছে স্যার। কতবার ডাকতে গিয়ে ফিরে আসলাম। মনে হয় ঔষধ খেয়েছে। ”
“ তাড়াতাড়ি চাচাকে ডেকে উঠাও। বলো মিটিং আছে আজ একটা। ”
লুকা ভ্রু কুঁচকালো। তার জানা মতে আজ তো কোনো মিটিং এর সিডিউল নেই।
“ স্যার আপনার হয়তো ভুল হচ্ছে। আজ কোনো মিটিং এর সিডিউল নেই। ”
“ আছে লুকা। মালিক কে? আমি না তুমি? ”
“ আপনি। ”

“ তাহলে যেটা বলছি সেটা করো। মিস্টার পান্ডের সাথে মিটিং আছে আজ একটা। তাড়াতাড়ি পাঠাও। ”
লুকা ফোন কেটে বাশার সুলতানের কাছে গেল। বাশার সুলতান উপর হয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। লুকা পাশে দাঁড়িয়ে জোরে ডাকলো। উঠলো না বাশার সুলতান। লুকা এবার মাইক এনে ডাকলো। বাশার সুলতান ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। আশেপাশে ভয়ার্ত চাহনি নিয়ে তাকিয়ে সামনে লুকা কে দেখে কুশান ছুঁড়ে দিয়ে বলল-
“ হতচ্ছাড়া এভাবে ডাকছিস কেনো? ”
“ স্যার ফোন দিয়েছিল। আপনার ফোন বন্ধ কেনো? আজ পান্ডের সাথে মিটিং আছে। আপনাকে যেতে বলল। ”
বাশার সুলতান বালিচের নিচ থেকে ফোনটা বের করলো। চার্জ নেই সুইচ অফ। ফোনটা চার্জে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেডি হলো। বের হওয়ার আগে ফোনটা অন করে সোলেমান কে ফোন করলো। সোলেমান চাচার ফোনের অপেক্ষা তেই ছিলো। ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-

“ তুমি ফাহাদ ছেলেটাকে মা’রার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলে কেনো? ”
বাশার সুলতান ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ কোন ফাহাদ? ”
“ চোখে মুখে পানি দিয়ে আসো। ”
“ দিছি। ”
“ তাহলে চিনছো না কেনো? ঢাবির সেই ফাহাদ। যাকে মা’রার জন্য তোমায় বলা হয়েছিল। ”
“ আমাকে তো মা’রার জন্য বলে নি। বলেছিল ছেলেটা কে সেটা দেখার জন্য। আর উদ্দেশ্য কি সেটা জানার জন্য। সেজন্য সেন্ট্রালে বলেছিলাম ছেলেটা কে, তার উদ্দেশ্য কি সেটা যেন জানে। মনে করেছিল শিবির বোধহয়। ”
“ তোমার মাথা। ওরা মা’রতে মা’রতে মে’রে ফেলছে একেবারে। তোমার নামও উঠছিল সেখানে। তোমার নাম মিডিয়ায় এসে গেলে কি হতো জানো? আমার রাজনীতির ১৪ টা বেজে যেত। ”

“ আশ্চর্য আমি কি মে’রে ফেলতে বলছি নাকি? আমাকে যা বলা হয়েছিল উপরমহল থেকে সেটাই বলেছি ওদের। এখানে আমার কি দোষ? আর তাছাড়া এর আগেও তো উপর মহলের আদেশে কত-শত মানুষ মা-রার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মার্চেই না মা’রা হলো। তাহলে এত হাইপার হচ্ছিস কেনো? যার দলে চলছি আমরা তারা যা বলবে তাই তো করতে হবে আমাদের। ”
“ আচ্ছা ঠিক আছে তুমি মিটিং অ্যাটেন্ড করো। ”

সোলেমান ফোন কেটে দিলো। বাশার সুলতান ফাইল নিয়ে অফিসের দিকে গেলো।
সোলেমান সেদিন ওমন তাড়াতাড়ি করে চলে গেল কেনো তার মানে টা সেদিন না বুঝলেও মেহরিন আজ বুঝলো। যেহেতু মেহরিনের কোনো সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট নেই আর টিভিও খুব কম দেখে সেজন্য তৎক্ষণাৎ জানতে পারে নি ফাহাদ হত্যার ঘটনা টা। আজ শ্বশুর আর দাদা শ্বশুরের বলা কথায় জানতে পারলো। কোনো এক ছেলে বিনা দোষে মা-রা গেছে। আর যারা মে’রেছে তারা তার স্বামী শ্বশুর দের দলেরই লোক। কিন্তু ভিতরে কি হয়েছিল তা জানে না। সব দোষীই সাজা পেয়েছে এটা শুনে কিছুটা শান্তি পেলেও খারাপ লাগাটা বেশি। মেহরিন রাজনীতি তেমন বুঝে না বললেই চলে। সে তার শ্বশুর, দাদাশ্বশুর, স্বামী কে ভালো দেখছে বলেই তার ধারণা তাদের দলের সব খারাপ না হলেও কিছু ভালো। হাতের ৫ আঙুল ই তো আর সমান হয় না।
মেহরিন রুমে এসে সোলেমান কে ফোন করলো। সোলেমান ফোনে কারো সাথে কথা বলছিল। বউয়ের ফোন পেয়ে ফোনের ওপাশে কাউকে বলল-

“ কাজটা যেন ঠিক মতো হয়। ”
ফোনকল কেটে বউয়ের ফোন রিসিভ করলো। লম্বা করে সালাম দিয়ে বলল-
“ কি অবস্থা? ”
মেহরিন সালামের জবাব দিয়ে বলল-
“ জ্বি ভালো। আপনার? ”
“ প্যারার মধ্যে আছি অনেক। এতক্ষণে তো শুনেছো বিষয় টা। ”
“ জ্বি শুনলাম। নির্দোষ একটা প্রাণ অকালেই ঝড়ে গেল। শুনেছি আপনাদের দলের লোকজন ই করেছে এই কাজ। ”
“ হুমম। আমিও তাই তো শুনলাম। ”
সোলেমান টোটালি না জানার মতন ভান করলো যেন সে শুধু উপর উপর দিয়ে জেনেছে তার দলের লোক জড়িত। কিন্তু এখানে যে তার চাচাও জড়িত তা বুঝতেই দিলো না মেহরিন কে।
“ জঘন্যতম সাজা দেওয়া উচিত এদের। মানুষ হয়ে মানুষ মা’রতে এদের বিবেকে বাঁধে না? ”
“ ভুলে গেলে নাকি মানুষ যেমন সৃষ্টির সেরা জীবন তেমনই তারা সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীবও। তাই মানুষের দ্বারা সব সম্ভব। ”

” আপনি সুলতান সাহেব এসবে জড়াবেন না দয়া করে। আগে মনুষ্যত্ব পরে বাকি সব। মনুষ্যত্ব কে বেঁকিয়ে দিয়ে নিকৃষ্ট জীবে পরিনত হবেন না কোনোদিন। ”
“ যদি কখনও হয়ে যাই। তাহলে কি করবে তুমি? ”
“ আল্লাহ না করুক। সেই দিন যেন না আসে আমার জীবনে। আপনাকে ছাড়তে আমার কষ্ট হবে সুলতান সাহেব। স্বামী খারাপ এটা মানতে পারবো না। আপনাকে জায়গা দিয়েছি আমার বাবার পরে। তাহলে বুঝতে পারছেন তো বাবার পর আপনিই এক ব্যক্তি যাকে ঘিরে আমার বর্তমান ভবিষ্যৎ। ”
“ আচ্ছা যাও হবো না খারাপ,হবো না নিকৃষ্ট তোমার সামনে। আমি তোমার শ্রেষ্ঠ স্বামী হয়ে থাকবো। খুশি? ”
“ জ্বি। ”
“ খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করবে। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে। আর শোনো। ”
“ বলুন। ”

“ কোনো এক সুলতান সাহেব বলে তার একমাত্র বিবিজান কে মারাত্মকভাবে ভালোবাসে। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় এক পথিক আমায় বলল। আমি তো আর তার বিবিজান কে চিনি না। পর পুরুষের বউকে বলে কথা। তুমি চিনলে তার বিবিজান কে বলে দিও তো তার সুলতান সাহেবের কথাটা। তাহলে খুব উপকার হতো। ”
মেহরিন হেঁসে বলল-
“ দেখা হলে জানিয়ে দিব। আল্লাহ হাফেজ। ”
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইয়াসিন এতিমের মতো ভাই আর আর ভাইয়ের বউয়ের কথাগুলো শুনলো। আহা আজ তার একটা বউ থাকলে সেও এভাবে রোজ ফোন দিয়ে ভালোবাসার দু চারটা কথা বলতো। কিন্তু এই জীবনে একটা প্রেমও করতে পারলো না সে সোলেমান ভাইয়ের জন্য। কাউরে পছন্দ হলেই ভাইয়ে কড়া চোখে তাকিয়ে বলে- ইয়াসিন নজর ঠিক কর। পরপুরুষের বউয়ের দিকে কিসের নজর? আশ্চর্য তাদের মধ্যে তো কেউ ইয়াসিনেরও বউ হতে পারতো। তা না সোলেমান শুধু বাঁধা দেয়। ইয়াসিন দূর্বল দের মতো হেঁটে এসে বলল-

“ কিল্লাই ডাকছেন ভাই? ”
সোলেমান পেছন ফিরে ইয়াসিন কে দেখে পাশ থেকে টাকার ল্যাগেজ টা বের করে এগিয়ে দিয়ে বলল-
“ এটা চট্টগ্রাম ফাহাদ মোস্তফা নামের ছেলেটার পরিবারের কাছে দিয়ে আসবি। ২৫ লাখের মতো আছে। আশা করি হয়ে যাবে। টাকা গুলো ছেলেটার বোনের কাছে দিবি। শুনেছি মা দ্বিতীয় বিশে করেছে খুব একটা জাতের না। দেখা যাবে টাকা গুলো সে পেলে আরো বেজাত হয়ে যাবে। ”
ইয়াসিন ল্যাগেজ টা হাতে নিয়ে বলল-
“ ভাই আমার একটা আবদার আছে। ”
“ কি? ”

“ আমি চট্টগ্রাম থেকে ফিরে আইলে একটা বিয়া করায় দিবেন। একটা বউয়ের অভাবে সমাজে মুখ লুকিয়ে হাঁটতে হয় সবাই শুধু বলে বিয়ে কবে? আপনারা সবাই বিয়ে করে ফেলছেন। আমি আর কত এভাবে সিঙ্গেল থাকি বলেন। মায় পুতের বউ দেখবার চায়। এবার এ-ই মিসকিনের দিকে মুখ তুলে তাকান একবার ভাই। ”
সোলেমান চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বলল-
“ আচ্ছা যা ফিরে আয়। বিয়ে করায় দিব। ”
“ সত্যি তো? ”
“ হুমম। ”
“ সুন্দরী মাইয়ার লগে কিন্তু বিয়া দিবেন আমার। ”
“ আচ্ছা ঠিক আছে। এবার যা টাকা গুলো দিয়ে আয়। ”
ইয়াসিন খুশি মনে চলে গেল।
তিনঘণ্টা পর এজওয়ান আসলো হাঁপাতে হাঁপাতে। সোলেমান তখন কফি খাচ্ছে। এজওয়ান এসে অস্থির গলায় বলল-

“ ভাইজান আব্বায় বলে এক্সিডেন্ট করছে। ”
সোলেমান সাথে সাথে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো। মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো-
“ হোয়াট! কি করে হলো? ”
এজওয়ান এলোমেলো গলায় কথার তাল হারিয়ে বলল-
“ গাড়ি কন্ট্রোললেস হয়ে পাহাড়ে ঠুকে দিছে। ”
“ চাচার অবস্থা এখন কেমন? ”
“ ইমার্জেন্সি তে ভর্তি করানো হইছে। অবস্থা বলে খুব একটা ভালো না। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। যাবি? ”
“ যাওয়া তো উচিত। কিন্তু…. ”
“ কিন্তু কি? ”
“ লুকা যেতে না করলো কেনো? ”
“ লুকা তোকে বলল চাচার এক্সিডেন্টের খবর? আমাকে তো বললো না এখনও। ”
“ আমি সেটা জেনেই আশ্চর্য হচ্ছি। তুমি জানালে না কেনো এখনও? তার মানে কি আব্বা হুদাই নাটক করতেছে? আমি কিন্তু শুনছি আব্বা ঐ ছেলের হত্যার সাথে জড়িত। সেজন্য ভাং ধরছে এক্সিডেন্টের? ”

” হতে পারে। আমাকে যেহেতু বলা হয় নি। তার মানে ফেক ও হতে পারে। আমি খবর নিচ্ছি। তুই নিবাসে যা। ”
এজওয়ান আচ্ছা বলে চলে গেল। করতেও পারে নাটক তার বাপ। ভণ্ডামি করতে তো তারা সবাই উস্তাদ। হয়তো ভাইজানের হাতে ঠাপ খাওয়া থেকে বাঁচার জন্য নাটক করছে।
সোলেমান কফিটা সম্পূর্ণ শেষ করে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। বা হাত দিয়ে মাথার চুল গুলো ঠিক করলো। তারপর আয়নার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-

দাহশয্যা পর্ব ৭০

“ সরি চাচা। সামান্য চোট। সেরে যাবে। ডোন্ট ওয়ারি ম’রবে না। তোমাকে মা’রার কোনো ইনটেনশন আমার নেই। জাস্ট একটু অতিরিক্ত পকপক করাটা থামানোর জন্য এটা করতেই হলো। বেস্ট ডক্টর হায়ার করেছি। দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে। আই লাবিউ ……

দাহশয্যা পর্ব ৭২