দাহশয্যা পর্ব ৭২
Raiha Zubair Ripti
দীর্ঘ কয়েক ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে ইয়াসিন সন্ধ্যার আগ দিয়ে এসে পৌঁছায় চট্রগ্রাম। কিন্তু ফাহাদ মোস্তফার বাড়ি কোনটা সেটা খুঁজে পাচ্ছে না। এলাকার লোকদের জিজ্ঞেস করে করে অবশেষে বাড়ি কোনটা খুঁজে পেলো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে তখন। চট্রগ্রাম নামার সাথে সাথেই আকাশ টা মেঘলা হয়েছিল। এখন সেটা প্রচণ্ড রকমের কালো হয়ে গেছে। বাতাস বইছে। বোঝাই যাচ্ছে খুব জোরে করে ঝড় উঠবে।
ইয়াসিন টাকার ব্যাগ টা সামলে নিয়ে ফাহাদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ডেকে উঠলো –
“ এটা কি ফাহাদ মোস্তফার বাড়ি? আছেন কেউ? ”
মতিন ঘড় থেকে বেরিয়ে বলল-
“ হ্যাঁ আছি। কিন্তু আপনে কেডা? ”
ইয়াসিন নিজের পরিচয় দিয়ে বলল-
“ আমি ঢাকা থেকে এসেছি। ফাহাদের বোন আছে বাড়িতে? ”
মতিন জানে না বাতাসি বাড়ি আছে কি না। ঘর থেকে বউকে ডেকে বলল-
“ বাতাসি কি বাড়ি আছে? ”
বাতাসির মা জানালো-
“ না। ”
ইয়াসিন জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায় গেছে? ”
বাতাসির মা বেরিয়ে আসলো রুম থেকে।
“ বাতাসিরে দিয়ে কি করবেন? কেডা আপনে? ”
“ ক্ষতিপূরন দিতে এসেছি। ”
মতিন আর বাতাসির মা একে ওপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলো।
“ কিসের ক্ষতিপূরন? ”
“ ফাহাদের। ”
“ কি আছে ক্ষতিপূরনে। ”
“ টাকা। ”
চোখ মুখ জ্বলে উঠলো টাকার লোভে তাদের দু’জনের।
“ কত টাকা? ”
“ ২৫ লাখ। ”
আকাশ থেকে যেন টুপ করে পড়লো তারা। মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। ২৫ লাখ টাকা! এই টাকায় তো তাদের পুরো একটা জীবন চলে যাবে।
বাতাসির মা এগিয়ে গিয়ে হাত টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ দেন। ”
ইয়াসিন ব্যাগ টা পেছনে নিয়ে বলল-
“ আপনাকে দেওয়া যাবে না। ”
বাতাসির মা ভ্রু কুঁচকালো।
“ আমারে দিবেন না মানে? তাইলে কারে দিবেন। আমি ফাহাদের মা। ”
“ আপনি যেই হোন। এই টাকার আসল হক ফাহাদের বোনের। আপনাদের দেওয়া বারন। ওর বোন কে ডেকে আনুন। আমি তাকে টাকা গুলো দিয়ে চলে যাব। ”
“ বাতাসিরে ক্যান দিবেন ওর মা বেঁচে থাকতে? ”
মতিন এগিয়ে এসে বলল কথাটা। ইয়াসিন বিরক্ত হলো।
“ আমাকে যা বলা হইছে তাই বললাম। আপনাদের দেওয়া যাবে না। ফাহাদের বোন না আসলে আমি টাকা নিয়ে চলে গেলাম। ”
বাতাসির মা স্বামীর পানে তাকালো। মতিন ইশারায় কিছু বলল। বাতাসির মা বলল-
“ ডাইকা আনতাছি দাঁড়ান। ”
বাতাসিট মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে কবরস্থানের দিকে গেলো। দিনের অর্ধেকটা সময় বাতাসি ভাইয়ের কবরস্থানের পাশে বসে থাকে। পাতা পরিষ্কার করে। একা একাই কবরের সাথে কথা বলে,কাঁদে। বাতাসির মা বাতাসির কাছে এসে বলল-
“ এই ওঠ। বাড়ি চল। বৃষ্টি আইবো। ”
বাতাসি মায়ের পানে তাকালো। তারপর আকাশের দিকে। কখন রাত হয়ে আসলো বুঝলোই না সে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তেছে। বাতাসি বসা থেকে উঠে দাঁড়াতেই তীব্র বাতাস শুরু হয়ে মুশলধারে বৃষ্টি নামতে শুরু করলো। সর্বাঙ্গ ভিজে যেতে লাগলো বাতাসির বৃষ্টির পানিতে। বাতাসির মা তাড়া দিয়ে হাঁটতে লাগলো আগে আগে। মায়ের পেছন পেছন বাতাসিও ছুটলো।
মুশলধারে বৃষ্টি নামায় ইয়াসিন আশ্রয় নিয়েছে কুঁড়ে ঘরের বারান্দায়। গোবরের গন্ধ নাকে আসায় পেট তার মুচড়ে উঠছে। কি বিদঘুটে গন্ধ। বৃষ্টি পড়ায় তা আরো জঘন্য হয়ে নাকে আসছে। বৃষ্টি ছিটা এসে পড়ছে বাতাসের বারি তে ইয়াসিনের শরীরে। আবার বারান্দা ফুটা,পানি পড়ছে। টাকার ব্যাগ টা ভিজে যাবে। মতিন সেটা দেখে বলল-
“ আপনে রুমের ভিতরে যান। তাইলে ভিজবেন না। ”
ইয়াসিন তাই করলো। অন্ধকার রুমের ভেতর টায় ঢুকে এক পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ঘুমে চোখে দেখছে না ঠিকমতো ইয়াসিন। এমন ঠান্ডা ঝড়বৃষ্টি হলে ইয়াসিনের কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে ইচ্ছে করে। ফোনের স্ক্রিনের আলোয় পাশেই কাঠের চৌকি দেখে সেটায় বসলো হেলান দিয়ে। কিছুক্ষণ বসে অপেক্ষা করতে করতে তার চোখ লেগে আসে। আর খুলে রাখতে পারে না।
বাতাসির মা আর বাতাসি ভিজে বাড়ি আসে। বাতাসির মা নিজেদের রুমে গিয়ে জামাকাপড় পাল্টে নেয়। আর বাতাসি কে বলে জামাকাপড় পাল্টে নিতে। বাতাসি কুঁড়ে ঘরের দিকে চলে আসে। বারান্দার রশি থেকে জামাকাপড় নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। বাতাসির মা ইয়াসিন কে দেখতে না পেয়ে বলল-
“ ঐ ছ্যামরা গেছে গা? ”
“ না। ”
“ কই তাইলে? ”
“ কুড়ে ঘরে। ”
“ বাতাসি না ঐ ঘরের দিকে গেলো জামাকাপড় বদলাইতে ! ”
কথাটা শেষ করেই বাতাসির মা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে কুঁড়ে ঘরের দিকে তাকালো। মতিনও বেরিয়ে আসলো। দরজা লাগানো ভেতর থেকে। বাতাসির মা দৌড়ে যেতে চাইলে মতিন আঁটকে দেয়।
“ আটকাইলেন ক্যান? ”
“ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসছে। ”
“ কি? ”
মতিন ফিসফিস করে কিছু বলল। বাতাসির মায়ের মুখ শক্ত হয়ে যায়, তারপর ঠোঁটে আসে এক কপট হাসি।
“এইরকম করলে টাকা পাবো ?”
“ হ পাবো ।”
বাতাসির মা প্রথমে রাজি না থাকলেও টাকার লোভে রাজি হয়ে গেল। আস্তে করে কুঁড়ে ঘরের দিকে গিয়ে বাহির থেকে শিকল লাগিয়ে পাড়াপ্রতিবেশিকে ডাকতে লাগলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে।
বাতাসি জামাকাপড় অন্ধকারে বদলে তাক হাতড়ে খুঁজে হারিকেন আর গ্যাস ম্যাচ খুঁজে বের করে সেটা জ্বালালো। রুমটা এখন আলোকিত হয়েছে। বাতাসি হারিকেন হাতে নিয়ে পেছন ফিরে। চোখ ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকাতেই একটা অপরিচিত ছেলেকে খাটে শুয়ে থাকতে দেখে বাতাসির শরীর টা ভয়ে কাঁপতে থাকে। এই লোক কে? হাত থেকে হারিকেন টা পড়ে যায়। কানে দু হাত চেপে যতটা পারে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে বাতাসি।
ইয়াসিন আকস্মিক কোনো মেয়েলি চিৎকার শুনে চোখ মেলে তাকায়। মাটির এক প্রান্তে হারিকেন পড়ে আছে। ইয়াসিন আধশোয়া থেকে উঠে দাঁড়ালো। দেখলো একটা মেয়ে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াসিন এগিয়ে আসতে লাগলো। বাতাসি সেটা বুঝতে পেরে দরজার শিকল খুলে দরজা খুলতে চাইলে দেখলো বাহির থেকে লাগানো। বাতাসির আত্মা বেরিয়ে আসার উপক্রম। ভয়ে প্রাণ টা চলেই যায়। দরজায় হাত দিয়ে শব্দ করতে লাগলো বাতাসি। আর বলতে লাগলো-
“ দরজা খুলো। দরজা খুলো না কেউ। ও মা দরজা খুলো। ”
ততক্ষণে বাতাসির মা লোকজন ডেকে তাদের উঠানে আসে। বাতাসির মা বাতাসির চিৎকার শুনে বলল-
“ দেখো তোমরা। নষ্টামি করতেছিল পরপুরুষ লইয়া। বাইরে থিকা লাগায় রাখছি। তোমরা তো বিশ্বাস করবা না সেজন্য ডাইকা আনছি তোমাগো। ”
ইয়াসিন বাকহারা হয়ে গেছে। বাহির থেকে দরজা লাগিয়েছে কে? আর এই মেয়ে এভাবে কাঁদছে কেনো? ইয়াসিন এগিয়ে এসে দরজায় কড়া নেড়ে উচ্চ আওয়াজে বলল-
“ দরজা লাগিয়েছে কে? দরজা খুলন। ”
বাতাসি পাশ থেকে দূরে সরে গিয়ে সিটিয়ে যায়।
গ্রামের লোকজন এগিয়ে আসে। দরজার সিটকানি বাহির থেকে খুলে তারা ভেতরে ঢুকে দেখে বাতাসির রুমে একটা অচেনা ছেলে।
ইয়াসিন এক সাথে এত মানুষ হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে দেখে ভরকে যায়। বাতাসি তখনও কাঁদছে। লোকজন ছি ছি করা শুরু করছে । বাতাসির মা বাতাসির চুল টেনে ধরে বলল-
“ মা’গি পিক ফেলানোর আর জায়গা পেলি না? বাড়ির ভেতরই পর পুরুষ লইয়া ফেললি! ”
বাতাসি ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো।
“ আমি কিছু করি নাই মা। ”
“ তাইলে এই ব্যাডা আর তুই এক রুমে কি করস?”
“ আমি চিনি না। জানি না উনি এই রুমে ক্যামনে আইছে। বিশ্বাস করেন আপনেরা। ”
“ ছি বাতাসি ছি। ভাই মরার লগে লগে এমন বাজারি হয়ে গেলি! কে এই পুলা? ”
ইয়াসিন সহ্য করতে পারলো না। কি তখন থেকে আজেবাজে কথা বলছে এরা? এগিয়ে আসতে চাইলে তিজন পুরুষ ইয়াসিন কে ঝাপটে ধরে। পকেট থেকে ফোন বের করে নিয়ে নেয়।
বাতাসির মা কান্নার ভান করে বলে-
“এই মাগিরে লইয়া আমরা মুখ দেখাম কেমনে পাড়ায়? আমার মরা ভাগ্য, মাইনষে থুথু দিতাছে ঘরের দুয়ারে।”
মতিন গলায় গামছা পেঁচিয়ে বসে আছে, লোকজনের দিকে তাকায়ও না। শুধু বলল-
“মান-সম্মান বাঁচাইতে হইলে বিয়া ছাড়া উপায় নাই।”
ইয়াসিন চমকে উঠে একথা শুনে। পাগল নাকি এরা? বিয়ে! সে তো কিছুই করে নি। ইয়াসিন কথা বলতে চাইলে লোকজন তাকে কথা বলার সুযোগ ই দেয় না। মুখ খুলতে চাইলেই লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে-
“এই ছ্যামরা শহর থেইকা আইছে, মেয়েরে ফুসলাইছে! এক ঘরে পাইছি তগো!”
গ্রামের মোড়ল এগিয়ে এসে বলল-
“ এইসব কামে বিচার একটাই। মাইয়া রে রাতের অন্ধকারে ধরা হইছে, এখন সমাজের চোখে এই মাইয়া আর পবিত্র নাই। বিয়া হইলেই দুইপক্ষের ইজ্জত বাঁচে।”
বাতাসি মায়ের পায়ে পড়ে যায়। আহাজারি করে আকুতিভরা দৃষ্টি নিয়ে বলে- তারা কিছু করে নি। বাতাসি চিনে না উনাকে। তাদের মধ্যে কিছু হয় নি। ”
কিন্তু কেউ শুনলো না বাতাসির কথা। ইয়াসিন কে চেপে ধরে রেখেছে কথা বলার জন্য ফের মুখ খুললেই গাছের সাথে বেঁধে রাখে ইয়াসিন কে।
ইয়াসিনের মনডায় বলতাছে শালার ব্যাটাদের পশ্চাৎ দেশের লুঙ্গি তুলে চলা দিয়ে পিটাতে। ঢাকা হলে গায়ে হাত দেওয়া তো দূর চোখ রাঙানোর সাহস পেত না।
লোকজন বলল কাজি ডেকে আনার জন্য। কথাটা শুনে ইয়াসিন চোখ বড়বড় করে বলল-
“ এই না খবরদার কাজি ডাকবেন না। আমি কোনো অন্যায় করি নি। আর এই মেয়েকে তো আমি চিনিই না।
ইয়াসিন ভালো করে তাকালো বাতাসির দিকে। গায়ের রং কালো। এই রঙ কে মোটেও শ্যামলা বলে না। কালো মানে কালোই। ইয়াসিনের শরীরের রং হলুদ ফর্সা। সে কি করে এমন কালো মেয়ে বিয়ে করবে? সোলেমান ভাই বলছে ঢাকা ফিরলে সুন্দর মেয়ে দেখে বিয়ে করায় দিবে। সেখানে এই মেয়েকে বিয়ে অসম্ভব।
লোকজন ইয়াসিনের কথা না শুনে কাজি ডেকে আনে। ইয়াসিন ফোন চায় সোলেমানের সাথে কথা বলার জন্য কিন্তু ফোন দিতে চায় না লোকজন। তারপর কে যেন ফোনটা হাতে নিয়ে বলল-
“ কারে ফোন দিবি তুই? ”
“ আমার ভাইরে। দেন ফোন। ”
লোকটা দিলো না। কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে ফোন আসলো। সোলেমান ফোন করেছে। ইয়াসিন টাকা গুলো পৌঁছে দিয়েছে কি না ঠিকমতো সেটা জানার জন্য। মোড়ল ফোন আসা দেখে বলল-
“ কথা কইতে দাও। সমস্যা কি কথা কইলে? ”
ফোনটা দিলো ইয়াসিনের কাছে। ইয়াসিন ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে সোলেমান বলল-
“ টাকা বুঝিয়ে দিয়েছিস? ”
ইয়াসিন কান্নার মতো গলায় বলল-
“ ভাই আমারে গাছের লগে বাইন্ধা রাখছে। আমারে বলে এক কাইল্লা ছেরির লগে বিয়া দিয়া দিব। ভাই আমারে বাঁচান। আমি এই বিয়া করতে চাই না। ”
সোলেমান সহসা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে আসলো –
“ হোয়াট! বেঁধে রেখেছে তোকে গাছের সাথে! ”
“ হ ভাই। কাজি নিয়া আসছে। আমি বিয়ে করবো না ভাই। দরকার পড়লে সারাজীবন অবিবাহিত থাকবো। তাও ভাই বাঁচান আমায়। ”
আমি আসছি বলে সোলেমান ফোন কাউকে দিতে বলে। ইয়াসিন ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ ধরেন ভাইজান কথা বলবে। ”
গ্রামের মোড়ল ফোনটা নিলো কানে। সোলেমান ওপাশ থেকে বলল-
“ কি হয়েছে কি? আপনারা জোর করে বিয়ে দিতে চাইছেন কেনো? ”
” আপনের ভাই পাপ করতে গেছিল এই বাড়ির মাইয়ার লগে। এক ঘরে পাইছি এখন বিয়াতো করতেই হইবো। নইলে এই মাইয়ারে বিয়া করবো কেডা? ”
“ দেখেন আমি আসতেছি। ততক্ষণ বিয়ে দিবেন না। আমি এসে এই সমস্যার সমাধান করতেছি। ”
“ আইতে থাকেন আপনে। ”
কথাটা মলেই মোড়ল ফোন কেটে দিয়ে কাজির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ কাজি বিয়া পড়ান শুরু করো। ”
কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করলো। বাতাসি তখনও কাঁদছে। একজন বাতাসির ওড়না ঠিক করে দিলো। কাজি বাতাসি কে কবুল বলতে বললে বাতাসি চুপ হয়ে থাকে। বাতাসির মা পেছন খেতে চুলের মুঠি ধরে টান দিয়ে বলে-
“ কবুল বল। না কইলে কিন্তু তোরে এই বাড়ি থেকে বের করে দিমু। তখন রাস্তায় রাস্তায় কাটানো লাগবো। এরচেয়ে বিয়া কইরা চইলা যা। বিয়া না করলে তোর একদিন কি আমার একদিন।
বাতাসি ভয়ে দুঃখে কষ্টে বলে দেয় কবুল। ইয়াসিন কে কাজি কবুল বলতে বললে ইয়াসিন রাস্তার দিকে তাকায়। ইয়াসিন এই আশায় আছে সোলেমান এসে তাকে রক্ষা করবে এই বিয়ে করা থেকে। কিন্তু ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার পথ তো পাঁচ মিনিটের না। এমন ঘটনা ইয়াসিনের সাথে ঘটবে জানলে জীবনেও ইয়াসিন আসতো না এখানে। ইয়াসিন কে কবুল বলতে না দেখে লোকজন আরো চড়াও হয়। মা’রতে আসলে ইয়াসিন থামিয়ে দেয়। মা’ইর খাবে বিনা দোষে কেনো? সে বিতৃষ্ণা থেকে বলে দেয় কবুল। বাতাসি হয়ে গেলো ইয়াসিনের অর্ধাঙ্গিনী। যাকে সে কোনোদিন মানতে পারবে না নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে।
সোলেমান চট্টগ্রাম এসে পৌছালো ভোরের আগ দিয়ে। এসে দেখলো ইয়াসিন বসে আছে বরান্দায় মাটিতে। তার পাশেই ফুঁপিয়ে কাঁদছে একটা মেয়ে। সোলেমান কে দেখামাত্রই ইয়াসিন বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলল-
“ আমি কিন্তু এই মাইয়ারে বউ হিসাবে মাইনা নিব না ভাই। আমি ওকে আমার সাথে নিব না। ওদের বইলা দেন। ”
সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ বিয়ে হয়ে গেছে! ”
“ হ। জোর কইরা বিয়া দিছে। ”
সোলেমানের চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। সে যে বললো বিয়ে না দিতে এসে সমাধান করবে। সোলেমান মোড়লের সাথে কথা বললো। জিজ্ঞেস করলো কি কারনে এমনটা করলো।
মোড়ল সব খুলে বলল। সবটা শুনে সোলেমানের কেমন সন্দেহ হলো। ঘাড় বেঁকিয়ে বাতাসির দিকে তাকালো। বাতাসির দিকে তাকালে সর্বপ্রথম যে কারো চোখ যাবে তার গায়ের রং এর দিকে। সোলেমানেরও চোখে সর্বপ্রথম সেটাই ধরা পরলো। মেয়েটা বয়স আনুমানিক মেহরিন বা তার চেয়ে কম হতে পারে। সোলেমান ইয়াসিন কে জিজ্ঞেস করলো-
“ টাকা গুলো কোথায়? ”
ইয়াসিন কুঁড়ে ঘর দেখিয়ে বলল-
“ ঐ ঘরে। ”
সোলেমান ঢুকে টাকার ব্যাগ টা সাথপ নিয়ে বলল-
“ মেয়েটাকে সাথে নিয়ে আয়। ”
বাতাসির মা বাবার চোখ কপালে। যেই টাকার জন্য এসব করলো। সেই টাকাই দেখে নিয়ে যাচ্ছে। মতিন পেছন থেকে বলল-
“ টাকা নিয়ে যাইতাছেন ক্যান? ”
সোলেমান দাঁড়িয়ে যায়।
“ আমার টাকা আমি নিয়ে যাব না? ”
“ এই টাকা না আমাদের ক্ষতিপূরণ? ”
“ আপনাদের ক্ষতিপূরন না। ক্ষতিপূরণ ছিলো ঐ মেয়েটার। ঐ মেয়েটা যখন আমাদের বাড়ির বউ হয়েই গেছে তখন টাকা গুলো আমাদের বাড়িতেই ফিরে আসবে। ইয়াসিন ওকে নিয়ে আয়। ”
ইয়াসিন শেষের কথা শুনে বলল-
“ ভাই আমি কি বলছি শুনেন নাই? আমি এই বিয়ে মানি না। ”
সোলেমান বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল-
“ যেটা বলছি সেটা কর। ”
সোলেমান এক পয়সাও দেয় নি ওদের। ব্যাগ টা নিয়ে গাড়িতে এসে বসে পড়লো। ইয়াসিন বাতাসির সামনে দাঁড়িয়ে মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলল-
“ এই মেয়ে চলো। ”
বাতাসি তাকালো ইয়াসিনের দিকে। চলো মানে? কোথায় যাবে সে? ”
“ কই নিয়া যাইবেন আপনারা আমারে? ”
“ জাহান্নামে। তাড়াতাড়ি আসো। ”
ইয়াসিন হাঁটা ধরলো। এক মহিলা এসে বলল-
“ বইয়া রইছস ক্যা? যা তর জামাইয়ের লগে। ”
জামাই কথাটা এসে বারি খেলো বাতাসির কানে। জামাই মানে স্বামী! তার বিয়ে হয়ে গেছে। একটা অপরিচিত লোক তার স্বামী। তার সাথে চলে যাবে বাতাসি!
মোড়ল এসে বাতাসি কে বলল-
“ যাস না ক্যা? যা। ”
বাতাসি এলোমেলো পায়ে হাঁটা ধরলো। এইটুকু বুঝে গেছে এই অপরিচিত হয়ে জীবনে আসা স্বামী নামক মানুষটার সাথে না গেলে তার মা আজ মারাত্মক ভাবে অত্যাচার করবে তার উপর।
ইয়াসিনের পাশেই বসলো বাতাসি তবে মাঝখানে দূরত্ব অনেক। গাড়ির জানালা দিয়ে দেখলো শেষবার বাড়িটা।
ইয়াসিন ভুলেও তাকাচ্ছে না বাতাসির দিকে। সোলেমান গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে ইব্রাহিম কে ফোন করে জানালো ইয়াসিনের বিয়ের বিষয় টা। ইব্রাহিম সব শুনে নিবাসে চলে আসে।
দুপুরের দিকে সোলেমান ইয়াসিন বাতাসি কে নিয়ে নিবাসে নামিয়ে গাড়ি নিয়ে পের বেরিয়ে যায় সোলেমান। ইয়াসিন কে একা নিবাসের ভেতর ঢুকতে দেখে এজওয়ান বলল-
“ কিরে একা এসেছিস নাকি? ”
ইয়াসিন এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ না। বাতাসি আছে। ”
এজওয়ান ঠোঁট কুঁচকে বলল-
“ বাতাসি মিনস বাতাসা? ধূর ব্যাটা বিয়ায় বাতাসা খায় নাকি কেউ? মিষ্টি আনতি সাথে। ”
ইয়াসিনের চোখ মুখে রাগ আসলো।
“ ঐ মাইয়ার নাম বাতাসি। ”
এজওয়ান ওহ্ আচ্ছা বলে বলল-
“ বাতাসি কারো নাম হয় জানা ছিলো না। শুনলাম তোরে বলে বাইন্ধা রাখছিল! ভাইরে এই কথাটা শুনে যা হাসি পাইছিলো না যা বলার বাহিরে। মানে ঐ যে মানুষ কট খেলে এভাবেই বিয়ে দেয়। কিছু করতে গেছিলি নাকি? ”
ইয়াসিন রেগে বলল-
“ ভাই মজা করতেছেন আমার লগে? আমি কিন্তু মজার মুডে নাই। আমি কিছু করবো তাও ওর সাথে? রুচি আসবে না ভাই। আমি এই বিয়া মানি না। ওরে বউ মানা সম্ভব না আমার পক্ষে। ”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো।
“ তোর বউ কোথায়? এনেছিস তো সাথে। ”
“ বাহিরে। ”
এজওয়ান মাহির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ নিয়ে আসো তো মাহি। বেয়াদব বউ রেখে একা চলে আসছে। ”
মাহি সদর দরজার কাছে এসে দেখলো গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। পড়নে জামাকাপড় নোংরা ধুলোবালি লাগানো। মাহি এগিয়ে এসে বলল-
“ এসো ভেতরে এসো। ”
দাহশয্যা পর্ব ৭১
আকস্মিক মেয়েলি গলা শুনে বাতাসি চমকে পিছনে তাকালো। এতক্ষণ চারিপাশে টা দেখছিল। কত বড় বাড়ি। ভয় করছিল খুব। মাহি বাতাসি দেখে কিছুটা সময় স্তব্ধ হয়ে গেল। এবার বুঝলো ইয়াসিন কেনো তখন থেকে বলছে এই বিয়ে মানে না। বউ মানবে না বাতাসি কে। মাহি বাহু ধরে ভেতরে নিয়ে আসলো। ভিতরে তিনজন পুরুষ কে দেখে আরে গুটিয়ে গেলো বাতাসি। এজওয়ান ইব্রাহিম একবার তাকিয়ে যা বুঝার বুঝে গেল। এজওয়ান ইশারায় উপরে নিয়ে যেতে বলল।
মাহি বাতাসি কে উপরে এনে বাতাসি কে গোসল করে নোংরা জামাকাপড় পাল্টাতে বলল। সাথে নিজের এক সিট জামাকাপড় দিলে। যদিও বাতাসির ঢিলে হবে। বাতাসি গোসল করে পড়ে নিল মাহির দেওয়া জামাকাপড়।
