Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮৬ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮৬ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮৬ (২)
Raiha Zubair Ripti

এজওয়ান আর মাহি সন্ধ্যার আগে ফিরেছে নিবাসে। রেস্টুরেন্টে আর তাদের খাওয়া হয় নি। শপিং ব্যাগ গুলো হাতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় সোফায় কাউকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো মাহি। এজওয়ান এগিয়ে গিয়ে হ্যান্ডশেক করলো তার সাথে। মাহিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এজওয়ান তুড়ি মে’রে ইশারায় রুমে যেতে বললো। মাহি চলে গেলো রুমে।
এজওয়ান সোফায় বসতে বসতে ডিজিএফআইয়ের প্রধান আনিসুল হকের উদ্দেশ্যে বলল-

“ আপনি নিবাসে যে?”
আনিসুল হক সোলেমানের আসার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ তোমার ভাইজান আসতে বলেছে। ”
“ ইমার্জেন্সি কিছু হয়েছে?”
সোলেমান বসতে বসতে বলল-
“ খোঁজ পেয়েছেন কে করেছিল এটা?”
“ আসল কালপ্রিট অব্দি পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। যাদের ধরা হয়েছে তারা নিজেরাই নিজেদের দোষ দিচ্ছে। ”
“ অ্যাম শিওর,এখানে বিএনপি জড়িত।”
“ আমারও সেটাই মনে হয়। ওরা না করলে কারা করবে? জামায়াতের তো এত বড় স্পর্ধা নেই যে এমন রণক্ষেত্র বাঁধাবে। ”
“ এখন প্রমাণের জন্য কতদিন অপেক্ষা করতে হবে আমায়? কত প্রাণ গেছে হিসেব আছে?”
” আমরা তো চেষ্টা করছি। খুব সূক্ষ্ণ ভাবে এই প্ল্যান টা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ তারা রাখে নি।”
“ এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে ভালো খবর শোনাবেন। আর শোনাতে না পারলে আমি নিজ হাতে হ্যান্ডেল করবো বিষয়টা। ”
“ ঠিক আছে। আজ আসি তাহলে। আর এই সেই ফাইল। আর নম্বর যেগুলো চেয়েছিলেন। ”

আনিসুল হক চলে গেলেন। সোলেমান সেই ফাইল গুলো নিয়ে বেরিয়ে চলে আসলো। ইয়াসিন বাতাসি কে নিবাসে রেখে গেছে। মাহি বাতাসির জন্য কিনে আনা প্রডাক্ট গুলো তাকে দিয়ে দিলো। আর বলে দিলো কখন কোনটা কিভাবে ইউজ করতে হয়। বাতাসি মাথা নেড়ে স্বীকার করলো। মেহরিন একবার দেখে গেছে বাতাসি কে। বাতাসি যে সেই ফাহাদের বোন জানার পর খুব খারাপ লাগলো। মাহির থেকে শুনেছে বাতাসির গায়ের রং কালো বলে বাতাসি কে কেউ ভালোবাসে না। তার আপন মা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো। বাতাসির সাথে কথা বললো। কি মিষ্টি আদুরে বাচ্চা একটা মেয়ে। তাকে নাকি কালো বলে ইয়াসিন মুখের উপর যা তা বলে! সব শুনে মেহরিনের ইয়াসিনের প্রতি যতটা শ্রদ্ধা কাজ করতে সেগুলো যেন হারিয়ে যেতে লাগলো।

সোলেমান ক্লাবে এসেছে। কিছু নথিপত্র তৈরি করলো। আজ রাতে চট্টগ্রাম যাবে সে আর ইয়াসিন। রাজনৈতিক বিষয়ে কিছু গন্ডগোল হয়েছে। আর দুটো সভাও আছে। মোটামুটি ৩-৪ দিন থাকতে হতে পারে। ক্লাবে কাজকর্ম শেষ করে সে শাহবাগ আসলো। এলাকায় হাঁটাহাটি করে খোঁজ খবর নিতে লাগলো চাঁদাবাজি হয় কি না। শাহবাগ থেকে ঘুরে নীলক্ষেত আসতেই রাস্তায় দেখা হলো মহসীন আলির সাথে। তাকে দেখেই কপাল কুঁচকে আসলো সোলেমানের। মহসিন আলী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলো। সোলেমান পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেলো মহসিন আলী বলছেন-
“ কোথাও গিয়ে শান্তি নেই। চিল শকুন সব জায়গায় এসে হাজির হয়।”
সোলেমান দাঁড়িয়ে গেলো। দু কদম পেছনে এসে বুকে দু হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলল-

“ এক পা তো কবরে চলে গেছে। আরেক পাও কি কবরে পাঠানোর ব্যবস্থা করবো? নাকি শৌচাগার থেকে ল্যাবরা খিচুড়ি এনে পাতে ঢেলে দিব কোনটা?”
মহসীন আলি এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল-
“ কাকে বলছো এসব?”
“ আপনার মতো এক বুইড়া খাটাশ কে। ”
“ যেচে ঝগড়া করছো কেনো আমার সাথে? সমস্যা কি তোমার? যেখানে যাচ্ছিলে যাও না।”
“ যাচ্ছিলামই তো। কিন্তু আপনি তো যেতে দিলেন না। চুম্বক দিয়ে আঁটকে দিলেন। তা এখানে কেনো আপনি? চাঁদা তুলতে এসেছেন? ” সোলেমান রাস্তার ধারে থাকা দোকানদার রে বলল-“ এই তোমাদের থেকে কি চাঁদা নিচ্ছিলো এই চাঁদাবাজ মহসিন? নিলে শুধু জানাবে। পাছার কাপড় রাখবো না তার পেটাতে পেটাতে। ”
মহসিন ক্ষোভে ফেটে উঠলো।

“ যত বড় মুখ না তার তত বড় কথা! বাপের বয়সী লোকের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না?”
“ জানতে আগ্রহী নই। এই ঢাকা ৮ আসনে কোনো চাঁদাবাজিদের জায়গা নেই। ”
“ এই আসন তোমার? ”
“ তা নয়তো আপনার?”
-“ অহংকার করছো এই আসন নিয়ে? ”
“ হু করলাম। ”
“ তাহলে শুনে রাখো সোলেমান। নদীর স্রোত সবসময় এক ভাবে বয় না। উল্টো পথেও বয়… একদিন তোমাকে এই গদি ছাড়তে হবে। আজ যেই গদি নিয়ে তুমি লাফালাফি করছো, সেই গদি শুধু তুমি না তোমার গোটা আওয়ামী লীগ কে তাদের এই গদি ছাড়তে হবে৷ তখন এই দেশ চালাবে বিএনপি। তোমাদের ঠাই তখন আর এই বাংলায় হবে না। কু’ত্তার মতন দেশ ছাড়া করবো আমরা তোমাদের।
মহসিন আলীর কথা শুনে গা কাঁপিয়ে হাসতে ইচ্ছে করলো সোলেমানের। কিন্তু হাসলো না। হাসি টাকে দমিয়ে রেখে বলল-

-” উমমম..New mask but same task. no different … কি ভেবেছেন আওয়ামিলীগ কে তাড়ালে আপনারা চালাবেন দেশ! নাইস জোক্স। আওয়ামী লীগ দেশ চালাতে না পারলে আপনারা বিএনপি ও কখনও দেশ চালাতে পারবেন না। কারন বিএনপি আওয়ামী দুইটা আলাদা দল হলেও ঘটনাক্রমে তারা একই বাপের দুই সন্তান। তাই স্বপ্ন দেখা ছাড়ুন যে আওয়ামিলীগ দেশ ছেড়ে পালালে আপনারা দেশ চালাতে পারবেন। লোকজন তখন স্লোগান দিবে নৌকা আর ধানের শীষ দুই সাপের এক বি’ষ। তাই নিজেরাও পাসপোর্ট রেডি করে রাখুন। আমরা পালানোর সুযোগ পেলেও আপনারা পাবেন না । ”
মহসিন আলীর শরীর জ্বলতে লাগলো। ম’রে না কেনো এই সোলেমান। কই মাছের জান।
সোলেমান আরো কিছুক্ষণ এলাকায় টহল দিয়ে ইয়াসিন কে সাথে করে নিবাসে আসে। ইব্রাহিম নেই। ব্যাটা বউ ছাড়া নড়ে না। বলেছিল বউকে পৌঁছে দিয়ে চলে আসবে। কিন্তু আসে নি। থেকে গেছে। আজ রাতে নাকি রওনা দিবে। ভোরের আগে চলে আসবে। রাতের ডিনার টা সবাই মিলে একত্রে খেলো। ডিনার শেষে ইয়াসিন রুমে গিয়ে তৈরি হয়ে নিলো। বাতাসি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“ আসবেন কবে?”
ইয়াসিন চুল ঠিক করতে করতে বলল-
“ ৪-৫ দিন দেরি হবে। ”
“ ততদিন এখানেই থাকবো?”
“ হু। কেনো পছন্দ হয় নি বাড়ি? অপছন্দ তো হবার কথা না । এমন বাড়িতে তো থাকো নি জীবনে। ”
“ হু ঠিক কইছেন। এমন বাড়িতে জীবনে থাকি নাই। থাকমু কেমনে। বাপ নাই,বাপের টাকা নাই। কপালে যে টিনের ছনের দোচালা একটা ঘর ছিলো এটাই তো অনেক। ওনেই শান্তি আমাগো। ”
“ ঠিক মতো স্কুলে যাবে। তোমার ম্যাডাম যেন আমায় আর ফোন দিয়ে ওসব না বলে। যথেষ্ট টাকা পয়সা ভাঙছি তোমার পেছনে। এভাবে জলে ফেলার জন্য নয়। ”

“ আপনি একটু হিসেব কইরা রাইখেন,কত টাকা ভাঙছেন আমার পেছনে। আমি কাজ করে সব শোধ করে দিব। ”
সোলেমান পাশ দিয়ে রুমের দিকে যাচ্ছিলো। বাতাসির কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেলো। ইয়াসিন কি টাকার খোঁটা দেয় বাতাসি কে? সোলেমান তার স্টাডি রুমে গিয়ে টাকার চেক টা নিয়ে আসলো। এটা আরো আগেই দিয়ে দেওয়া উচিত ছিলো। ইয়াসিন যে এমন করবে তা তো জানা ছিলো না। বাতাসির দিকে চেকের কাগজ টা এগিয়ে দিয়ে বলল-
“ বাতাসি এটা তোমার। ”
বাতাসি চেকের দিকে তাকালো।
“ কিসের চেক এটা ভাইয়া?”
“ টাকার। ”
“ কিসের টাকা?”
“ তোমার ভাইয়ার টিউশনির টাকা। জমিয়ে রেখেছিল। এটার দাবিদার তুমি। ”
বাতাসি চেক টা হাতে নিলো। তার ভাইয়ের টাকা এগুলো! বাতাসি চেকে চোখ বুলাতেই টাকার এমাউন্টে গিয়ে থতমত খেয়ে গেলো। একক দশক শতক করে গুনে দেখলো ২৫ লাখ টাকা!

“ ভাইয়া এটা আমার ভাইয়ার না। আমার ভাইয়ার এত টাকা নেই। আপনার ভুল হচ্ছে। ”
“ স্কলারশিপ থেকে দেওয়া হয়েছে। এটা তোমার ভাইয়ারই। যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে খরচ করো। কেউ কিছু বলবে না। ” শেষের কথাটা দাঁত চেপে বলল সোলেমান।
সোলেমান চলে যেতেই বাতাসি চেক টা উল্টেপাল্টে দেখে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আমার ভাইয়ার স্কলারশিপের টাকা! ভাইয়ার টাকা দিয়ে আমি কি করবো? আপনি রেখে দেন আপনার কাছে । এখান থেকে কেটে রাইখেন। ”
“ তোমার ভাইয়ার টাকা আমি রাখবো কেনো? তোমাকে দিছে তুমি ভাঙো ইচ্ছে মতন। ”
সোলেমান রুমে এসে দেখলো মেহরিন হাত পায়ে ময়েশ্চারাইজার লাগাচ্ছে। কয়েকদিন ধরে শরীর টা ভালো লাগছে না। দূর্বল দূর্বল লাগে। মুখটাও কেমন শুকিয়ে গেছে। সোলেমান গিয়ে পেছনে দাঁড়ালো। মেহরিন ইশারায় বিছানা দেখালো। সোলেমান ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো। ব্লু কালারের শার্ট কালো রঙের প্যান্ট রাখা আছে। সোলেমান পকেট থেকে ফোনটা বের করে সাইলেন্ট মুডে করে পাল্টে নিলো পোশাক। মেহরিন এগিয়ে এসে গলায় টাই বেঁধে দিলো। সোলেমান বউয়ের মুখের দিকে তাকালো। ভার হয়ে আছে। সোলেমান জানতে চাইলো-

“ মুখ ভার কেনো? কি হয়েছে? কোনো সমস্যা? খারাপ লাগছে আবার? চলো ডক্টরের কাছে যাই। ইদানীং দূর্বল লাগে তোমাকে। ”
মেহরিন সোলেমানের বুকে মাথা ঠেকালো। ডক্টরের কাছে যেতে ইচ্ছে করে না। মেহরিন শক্ত করে সোলেমানের শার্ট খামচে ধরে বলল-
“ আচ্ছা আমিও যদি বাতাসির মতো দেখতে হতাম, তাহলে আপনিও কি আমাকে ইয়াসিন ভাইয়ার মতো অবহেলা করতেন? ভালোবাসতেন না? আমাকে ভালোবাসার কারন কি তাহলে আমার সৌন্দর্য? সেজন্যই কি সেদিন ডিভোর্স দিতে গিয়েও আর দেন নি ডিভোর্স?
সোলেমান মুচকি হাসলো। এই বিষয় নিয়ে মন খারাপ তার বউয়ের! মেহরিনের কপালে দুটো চুমু খেয়ে বলল-
“ তোমাকে ভালোবাসার কারন ৯৯% তোমার বিহেভিয়ার আর ১% পার্সেন্ট সৌন্দর্য। সৌন্দর্য টা পরে নজরে এসেছে। আগে নজরে এসেছে তোমার বিহেভিয়ার। তোমাকে ভালোবাসার কারন সেই ৯৯% ই। নট ১%। এখন সেই ১% কে ৯৯% এর সাথে তুলনা করলে তো ১% তলিয়ে যাবে মেহরিন। ”
“ পৃথিবীর সবাই সৌন্দর্যের পূজারি। খুবই জঘন্য এটা।”
“ হু। এখন হাসুন ম্যাডাম। একটু পর তো চলেই যাব। বউয়ের ভার মুখ দেখে গেলে কি আমি ঠিক থাকতে পারবো বলুন?”
“ খুউব পারবেন। জানা আছে আমার। ”
“ সবজান্তা তুমি?”
“ কিছু কিছু জানি। ”

ট্রেন চলছে তার নিজস্ব গতিতে। প্রেমা জানালার পাশের এক সিটে বসে আছে। হাতে বিদ্যমান ইকবালের দেওয়া ব্যাগটা। ট্রেনে ঢোকার পর খেয়াল করেছে এর ভেতর কয়েকটা হাজার টাকার নোটও আছে। সাথে আছে একটা চিরকুট। তবে প্রেমা তা খুলে দেখে নি সেটা। কেনো যেন সাহস হলো না। কি আছে তা জানার কৌতূহল হলেও অজানা এক ভয়ে তা দমে গেল। ট্রেন টা ১ টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে থামে। প্রেমা ট্রেন থেকে নেমেই মানুজন কে জিজ্ঞেস করে কাছের এক থানায় গেলো। থানায় তেমন পুলিশ নেই। আছে এক কনস্টেবল যিনি বাহিরে দাঁড়ানো। প্রেমা এগিয়ে গেলো। কনস্টেবল কে উদ্দেশ্য করে বলল-

“ আফসান সাহেব আছে?”
কনস্টেবল ওসি স্যারের নাম শুনে পাশে তাকায়। বোরকা পরিহিত প্রেমা কে একবার আপাদমস্তক দেখে বলল-
“ আপনি কে? আর স্যার কে খুঁজছেন কেনো?”
“ আমার উনার সাথে দরকার ছিলো। আছে উনি?”
“ স্যার তো চা খেতে গেছে। ”
“ ফিরবেন কখন? একটু ফোন করে আসতে বলুন। ”
কনস্টেবল ফোন বের করতে করতে বলল-
“ আপনি কি স্যারের পরিচিত কেউ?”
“ না। ”
কনস্টেবল একটু দূরে গিয়ে কথা বলে আসলো। জানালো তিনি আসছেন। প্রেমা কে বসতে বললো ভেতরে গিয়ে। প্রেমা বেঞ্চে বসলো। আফসান সাহেব আসলেন। তার কেবিনে যাওয়ার সময় প্রেমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন।
প্রেমা তাকে দেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-

“ আফসান সাহেব আপনি?”
“ জ্বি। ”
“ আমি প্রেমা। আমাকে একটু সাহায্য করুন আপনারা। ”
আফসান সাহেব চেয়ার টেনে বসে বলল-
“ কি সাহায্য বলুন। ”
প্রেমা প্রমান গুলো আফসান সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-
“ আমার স্বামী একজন ক্রিমিনাল। নারী পা’চারকারী। তার একটা পতিতালয় আছে। সেখানে নারীদের শোষণ করে। আপনারা গিয়ে মেয়ে গুলোকে বাঁচান। তাদের জোর করে রাখা হয়েছে সেখানে। ”
আফসান সাহেব ছবি আর পেনড্রাইভ টা হাতে নিয়ে বলল-
“ আপনার স্বামী কে?”
“ শ..শেখর। ”
আফসান সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন।
“ মহসীন আলির ছেলে?”
“ হু। ”

আফসান সাহেব ছবি গুলো বের করে দেখলেন। তারপর পেনড্রাইভ টা ল্যাপটপে কানেক্ট করে দেখলেন। এতে যা প্রমাণ আছে তাতে নিঃসন্দেহে শেখর কে ফাঁসির দড়ি তে ঝুলানো সম্ভব।
“ আপনি এই প্রুফ গুলো কোথায় পেলেন?”
“ ঐ অমানুষ টা আমাকেও পতিতালয় নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই পাওয়া। এক ভাই আমাকে সাহায্য করেছে। আপনারা সাহায্য করবেন আমায়? করুন একটু সাহায্য। আমি কথা দিয়ে এসেছি ওদের বাঁচাবো। ”
আফসান সাহেব উঠতে উঠতে বললেন-
“ আমি উপর মহলের সাথে একটু কথা বলে আসি আগে। আর শক্ত ফোর্স ও তো রেডি করতে হবে। ”
“ জ্বি তাড়াতাড়ি করুন। ”
আফসান সাহেব উঠে বাহিরে আসলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে শেখরের নম্বরে কল করলো। শেখর চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। সামনেই ইকবালের দু হাত ধরে রেখেছে দু’জন। একের পর এক মা’র পড়ছে তার শরীর জুড়ে। প্রেমা কোথায় সেটা বারবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে কিন্তু ইকবাল অনড়। বলছে না। আর তাতে মারের মাত্রা যেন আরো বেশি হলো। আকস্মিক ফোন আসায় বিরক্ত হয়ে রিসিভ করলো। আফসান সাহেব বলল-

“ শেখর, আফসান বলছি আমি। ”
“ বলেন। ”
“ তোমার বউ আসছে। ”
শেখর চমকে উঠলো। সেই সাথে মুখের কোনে ফুটলো বাঁকা হাসি।
“ কি জন্য গেছে আপনার কাছে?”
“ প্রমাণ নিয়ে এসেছে, তোমাকে ধরিয়ে দিতে। খুব স্ট্রং প্রমাণ বুঝলে? ফাঁসি কনফার্ম তোমার। তা আসবো তোমায় ধরতে?”
শেখর বাঁকা হাসলো। প্রেমার খোঁজ এভাবে পেয়ে বসবে কে জানতো!
“ টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি অ্যাকাউন্টে। আর লোক পাঠাচ্ছি। ততক্ষণ শুধু প্রেমা কে আঁটকে রাখুন। ”
“ ঠিক আছে। ”
শেখর ইকবালের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে মাথার চুল গুলো টেনে ধরে বলল-
“ এতো প্ল্যান এত চেষ্টা করেও তো কোনো লাভ তোর হলো না ইকবাল। আমি তো পেয়ে গেছি প্রেমা কে। এবার বাঁচাবে কে প্রেমা কে? তুই তো থাকবি না বাঁচানোর জন্য। ”

ইকবাল কেঁপে উঠলো। প্রেমা কে সে এত চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলো না! প্রেমা সেই শেখর দের লোকের হাতে গিয়েই পড়লো! ইকবাল আকুতি মিনতি করলো। প্রেমা কে যেন ছেড়ে দেয়। প্রেমার যেন কিছু না করে। কিন্তু শেখর শুনলো না। মারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো ইকবালের। ইকবালের দেহ অসার হয়ে আসতে চায়। এত গুলো মানুষের সাথে কি পারা সম্ভব? পল্লীর মেয়ে গুলো ভয়ে কেঁপে উঠছে। কি নির্মম ভাবেই না ইকবাল কে মারছে বিরতিহীন । শরীরে মাইরের দাগে কালসিটে হয়ে গেছে। মুখ দিয়ে র’ক্ত বের হচ্ছে। পূর্ণা এসেছিল থামাতে। কিন্তু তাকেও এলোপাতাড়ি মেরেছে মনি। শেষে সিমরান কে নিয়ে বাজে কিছু করার হুশিয়ারি দিলে পূর্ণা দমে যায়। মেয়ে কে বাঁচাতে সব অন্যায় গিলে খায়। বাকি মেয়ে গুলো আর সাহস পায় নি কিছু করার বা বলার। রাতভর অন্ধকার সেই রুমের ভেতর থেকে শুধু বেরিয়ে এলো ইকবালের অসহায় আর্তনাদ আর আর্তচিৎকার। সেই চিৎকারে নিজেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টা তার ছিলো না । সে মা’র খেতে খেতেও বারবার প্রেমার নাম জপছে মুখে। তার মুখে ব্যথায় চেয়েও অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট।

আফসান সাহেব ফোন টা কেটে শ্বাস ফেললো জোরে। অ্যাকাউন্ট টা এবার ভারী হবে। খোশমেজাজে ভেতরে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে বলতে যাবে- সব রেডি। আর তখনই খেয়াল করলো প্রেমা নেই। সাথে সেই ছবি,ফাইল,পেনড্রাইভ টাও নেই। আফসান সাহেব চিৎকার করে কনস্টেবল কে ডাকলো। ডেকে জিজ্ঞেস করলো মেয়েটা কোথায়? কনস্টেবল জানালো – মেয়েটা একটু আগেই বেরিয়ে গেছে।
চেয়ারে লাথি দিয়ে উঠলো আফসান। গর্জে বলল-
“ যেতে দিলে কেনো?”
“ আমি তো ভেবেছি কাজ শেষ তাই চলে গেছে। ”
“ এখনই খুঁজে বের করো ঐ মেয়েকে। ঐ মেয়েকে আমার চাই। গো। ”
কনস্টেবল আরো দুজন পুলিশ নিয়ে ছুটলো প্রেমা কে খুঁজতে।

নীরব রাস্তা,মানুষজন তেমন নেই, অসহায় দেহটা নিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছে প্রেমা। ব্যথায় জর্জরিত দেহ নিয়ে দৌড়াতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও মাইলের পর মাইল প্রেমা দৌড়ে চলছে। আফসান সাহেব যে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবে প্রেমা বুঝতে পারে নি। সব শেখরের লোক। ন্যায় বলতে কিছু নেই এদের! অথচ ন্যায়ের জন্যই তো কাজ করে। প্রেমা দৌড়াতে দৌড়াতে খেয়াল করলো পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে আফসান সাহেব। প্রেমা এবার কি করবে? ভেবে পাচ্ছে না। কোথায় যাবে? কার কাছে সাহায্য চাইবে? পুলিশের উপর থেকে তো বিশ্বাস টা চলে গেল। পরিচিত তো আর কেউ নেই প্রেমার। তাহলে? প্রেমার সোলেমানের কথা মনে পড়লো । সোলেমানের কাছে সাহায্য চাইলে পাবে? পাবে নিশ্চয়ই। প্রেমা কে না করুক। শেখর কে তো সাজা দিবে। যেহেতু বিরোধী দল। আর মেয়ে গুলোর কথা বললে তো বাঁচাবেই। এতটা পাষাণ হবে না সোলেমান।

প্রেমা এক বুক আশা নিয়ে ছুটলো সুলতান নিবাসের দিকে। সেই যে মায়ের অসুস্থতার সময় এসেছিল প্রথম। আজ এই নিয়ে আসলো দ্বিতীয় বার। প্রথমবার খালি হাতে ফিরেছিলো। আজ হয়তো প্রেমা খালি হাতে ফিরবে না। প্রেমা নিবাসের গেটের সামনে দাঁড়ালো। ভেতর থেকে লাগানো গেট। প্রেমা গেটে শব্দ করে বলল-
“ কেউ আছেন? আছেন কেউ? একটু সোলেমান কে ডেকে দিবেন? বলুন প্রেমা এসেছে। ”
দারোয়ান প্রেমার গলার স্বর শুনে ঘুম থেকে উঠে বাহিরে আসলো। একটা বোরকা পরিহিত মেয়েকে দেখে বলল-
“ কে আপনি?”
“ আ..আমি প্রেমা। ”
“ কি চান? এখানে কেনো?”
“ সোলেমান আছে বাড়ি? একটু ডেকে আনুন না। তার সাহায্যের দরকার আমার। ”
“ সোলেমান স্যারকে রাতে ডাকাডাকি করতে নিষেধ করছে। তার বকা খাওয়ার ইচ্ছে নাই আমার। ”
“ একটু আনুন না ডেকে। বাড়িতে আর কেউ নেই? চাচা নেই? তাকে ডেকে আনুন। একটা ফোন দিন তাদের।”
দারোয়ান প্রেমার আহাজারিতে আর না পেরে প্রথমে সোলেমান কে কল করলো। একবার বাজলো। কিন্তু রিসিভ হলো না। এবার বাশার সুলতান কে দিলো। ফোনটা কে’টে কে’টে যাবে এমন সময় বাশার সুলতান ফোন টা রিসিভ করলো। দারোয়ান কে জিজ্ঞেস করলো-

“ এত রাতে ফোন দিচ্ছিস কেনো?”
“ স্যার একজন আসছে। সোলেমান স্যারের সাথে দেখা করতে চাইতেছে। স্যারে তো রুমে ঢোকার পর ডাকতে মানা করছে। কি করমু?”
বাশার সুলতান বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।
“ কে এসেছে? ”
দারোয়ান মেয়েটার দিকে তাকি জিজ্ঞেস করলো-
“ নাম কি আপনার?”
“ প্রেমা। ”
“ নাম প্রেমা স্যার। ”
নামটা শুনতেই কপালে দু ভাজ পড়লো। এগিয়ে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলো প্রেমাকে। এই মেয়ে এত গুলো বছর পর এখানে কেনো? সোলেমান এই মেয়েকে দেখলে তো রাগে ফেটে পড়বে। আর মেহরিন ও তো আছে। এই মেয়ে কি সোলেমানের সংসার ভাঙার জন্য আসছে নাকি? তাই হবে। বাশার সুলতান গম্ভীর গলায় বলল-

“ চলে যেত বল এই মেয়েকে। সোলেমান আসবে না। সোলেমান ব্যস্ত তার বউকে নিয়ে। এই মেয়ে যেন নিবাসের আশেপাশে না থাকে। আমার সোলেমানের সংসার নষ্ট করতে এসেছে। ”
দারোয়ান ফোন কে’টে দিলো। প্রেমা আশাতীত চাহনি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ সোলেমান আসছে?”
“ না,স্যার আসবেন না। আপনাকে চলে যেতে বলছে। আপনি চলে যান। আপনারে এখানে দেখলে রাগারাগি করবে আমার সাথে। আপনে চলে যান। ”
প্রেমা আশাহত হলো। সোলেমান আসবে না! এত ঘৃণা, এত রাগ! এই সুলতান নিবাসের গেট বারবার খালি হাতে ফেরালো তাকে। কোনো সাহায্যই সে পেলো না সুলতান বংশের থেকে। একটু যদি আসতো সোলেমান, তাহলে মেয়েগুলো কে বাঁচাতে পারতো। কিন্তু সোলেমান আসলো না। চলে যেতে বলল! কি নিঠুর! একটু কি ভুলে আসা যেত না? একটু আসতে ভুলে সোলেমান। প্রেমা ভগ্ন হৃদয় নিয়ে শেষবার সুলতান নিবাসের দিকে তাকালো।

“ আমার যখন খুব দরকার হয় তখন আমি তোমাকে পাই না সোলেমান। সেদিনও পাই নি। আজও পেলাম না। তুমি ভীষণ নিষ্ঠুর পুরুষ। যাকে যখন ভালোবাসো তখন জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসো। আর যখন যাকে ঘৃণা করো তখন তার দিকে ফিরেও তাকাও না। একটু যদি ফিরে তাকাতে তাহলে এই আমাকে চিনতে। আমি তোমাকে ঠকাই নি। শুনতে পাচ্ছ? আমি ঠকাই নি তোমায়। এই জীবন আমাকে ঠকিয়েছে । তুমি সুখে থাকো। আর আসবো না কোনোদিন তোমার কাছে সাহায্য চাইতে। বউ পরিবার নিয়ে হাসিখুশি থাকো। আর হ্যাঁ, তোমার বউ যেন আপদে বিপদে সব সময় তোমায় ডাকলে সাথে সাথে পায়। আমার মতো যেন আহাজারি করতে না হয়। আমি প্রেমিকা ছিলাম তাই মেনে নিয়েছি। বউ কিন্তু মানবে না। তুমি আমার কল্পনার প্রেমিক পুরুষটিই রয়ে গেলে। আসি। তুমি সাহায্য করলে না তাতে তো আর আমি বসে থাকতে পারি না। আমাকে ছুটতে হবে। আমার সেই বোন দের বাঁচাতে হবে। ইকবাল ভাইকেও….চলি। ”
প্রেমা শেষ বার সুলতান নিবাসের দিকে তাকালো। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পরছে। চোখের জল আর ফুরায় না চোখ থেকে। প্রেমা জল টুকু মুছে হাঁটা ধরলো উল্টো ঘুরে।
সোলেমান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলো ঠিকঠাক করে নিলো। মেহরিন বসে বসে দেখছে। সোলেমান হাত ঘড়ি টা পড়তে পড়তে বলল-

“ ঘুমিয়ে পড়ুন ম্যাডাম। আমি এখন চলে যাব। ”
“ রাত করে ড্রাইভ করে যাওয়া টা কি ঠিক?”
“ কিচ্ছু করার নেই। তুমি খেয়াল রেখো নিজের। আমি ফোন করবো টাইম টু টাইম। কলেজে দিয়ে আসবে গার্ড। ”
মেহরিন মাথা নাড়ালো। সোলেমান এগিয়ে এসে গালে কপালে অসংখ্য চুমু খেয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। সোলেমান রুম থেকে বের হতেই মেহরিন গিয়ে জানালার সামনে দাঁড়ালো। সোলেমান আর ইয়াসিন গাড়িতে উঠলো। সোলেমান জানে মেহরিন জানালার এখানে এসে দাঁড়াবে। সেজন্য তাকালো। মুচকি হেঁসে হাত নাড়ালো। মেহরিনও হাত নাড়ালো। সোলেমান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো। মেহরিন তার যাওয়া দেখলো।
সোলেমানের গাড়িটা নিবাস থেকে বেরিয়ে লম্বা রাস্তা ধরে ডানের রাস্তা দিয়ে চলে গেলো। আর প্রেমা চলে গেলো ঠিক তখনই বামের রাস্তা টা ধরে। এত কাছে থেকেও কেউ জানলো না তারা কাছাকাছিই ছিলো।
সোলেমান যাত্রা পথে দেখলো কয়েকজন লোক দৌড়ে দৌড়ে ছুটছে। তবে সেদিকে বেশি তেমন ধ্যান দিলো না। সে ড্রাইভে মনোযোগ দিলো।

প্রেমা এখন কি করবে ভাবতে লাগলো। রমনা থানায় যাবে? ওখানে যে শেখরের কেউ নেই তার কি গ্যারান্টি? প্রেমা হাঁটতে হাঁটতে ইঁটের সাথে বেঁধে রাস্তায় পড়ে গেলো।
ইমন ঐ রাস্তা দিয়ে হেঁটে মসজিদ থেকে বাড়ি ফিরছিলো। এত রাতে একটা মেয়েকে ওভাবে রাস্তায় পড়ে যেতে দেখে চমকালো। ব্যথায় মৃদু শব্দ করছে। ইমন এগিয়ে আসলো। প্রেমা রাস্তার লাইটের আলোয় দেখলো তার পায়ের বুড়ো আঙুল থেকে নোখ উঠে গেছে। গলগল করে র’ক্ত বের হচ্ছে। কাউকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রেমা তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। শেখরের লোক নয় তো? রাস্তায় ফাইল ছবি সব ছড়িয়ে আছে। প্রেমা সেগুলো কোনোরকমে উঠিয়ে হাঁটা ধরলো খোঁড়াতে খোঁড়াতে। ইমন অবাক হলো। রাস্তায় তাকাতেই দেখলো একটা পেনড্রাইভ আছে পড়ে। সেটা উঠাতে উঠাতেই দেখলো মেয়েটা আর নেই। কোন দিকে চলে গেল মেয়েটা? ইমন আশেপাশে তাকালো। খুঁজলো। মেয়েটাকে পেলো না। এখন এই পেনড্রাইভের কি করবে? কতক্ষণ অপেক্ষা করলো। আসলো না মেয়েটা। ইমন পেনড্রাইভ টা নিয়েই চলে গেল বাসায়।

একটা সুন্দর সকাল। আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে। ১৪ ফেব্রুয়ারী, ভালোবাসা দিবস। অথচ মেহরিনের ভালোবাসার মানুষটা তার কাছে নেই। মেহরিন ভোরে স্বামীর সাথে ফোনে কথা বলে ফজরের নামাজ টা আদায় করে রান্না ঘরে এসে দেখলো বাতাসি সবজি কাটছে। সকাল থেকে শরীর টা তার ভালো নেই। আবার দূর্বল দূর্বল লাগছে। হয়তো ঠিক মতো ঘুম হয় নি সেজন্য। মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
“ তুমি কাটছো কেনো? সরো দেখি। হাত কে’টে ফেলবে তো। ”
বাতাসি সরলো না। না সরেই বলল-
“ আমার অভ্যাস আছে আপু। হাত কাটবে না। ”
মেহরিন সরিয়ে দিলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ যাও স্কুলের সময় হয়ে গেছে। বের হতে হবে তো নাকি?”
বাতাসি দেখলো আসলেই সময় হয়ে গেছে। রুমে গিয়ে স্কুল ড্রেস পড়ে রেডি হয়ে নিলো। মেহরিন ব্রেকফাস্ট বানিয়ে টেবিলে সাজিয়ে নিজেও রোডি হয়ে নিলো। রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট করে বাতাসি কে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। ড্রাইভার বাতাসি কে তার স্কুলে নামিয়ে দিয়ে মেহরিন কে তার কলেজে নামিয়ে দিলো।

মেহরিন ধীর পায়ে তার ক্লাস রুমে গেলো। সোলেমানের ক্লাস অন্য টিচার নিয়েছে। টিফিনের আগ অব্দি সকল ক্লাস গুলো মেহরিন ঠিকঠাক করলো। টিফিন পিরিয়ডে যখন গ্র্যান্ড ফ্লোরে আসবে তখন ঘটলো এক বিপত্তি। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুট করে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলো। বাংলা ম্যাম যাচ্ছিলো ঐ করিডর দিয়ে। একটা মেয়েকে পড়ে যেতে দেখে দৌড়ে এগিয়ে আসে। দু হাতে আগলে তুলে ডাকে। কিন্তু সারা আসে না। ছাত্র ছাত্রী দের ভীড় লেগে যায়। ম্যাম পানি আনতো বললো কাউকে। এক টা মেয়ে পানির বোতল নিয়ে আসলো। ম্যামটা মেহরিনের মুখের নিকাব সরিয়ে পানির ছিটা দিলো। কিন্তু জ্ঞান ফিরলো না। সবাই এই প্রথম মেহরিনের ফেস দেখলো। হা হয়ে গেছে। এত সুন্দর এই মেয়ে!
ম্যাম আর সময় নষ্ট করলো না। মেহরিন কে হসপিটালে নিয়ে যেতে বলল। মেহরিনের বাড়ির সবাইকে ফোন করে বলা হলো মেহরিন এডমিট হসপিটালে। বাশার সুলতান, মাহি ছুটে আসলো। ডক্টরের সাথে কথা বললে ডক্টর জানালো- নতুন অতিথি আসছে পরিবারে। মেহরিন মা হতে যাচ্ছে। সেজন্য একটু দূর্বলতার কারনে মাথা ঘুরে গেছে। সাবধানতা অবলম্বন করতে বলছে ডক্টর। কম্পলিকেটেড খুব। অল্প বয়সে মা হয়ে গেছে।

বাশার সুলতানের খুশি দেখে কে! সোলেমান বাপ হতে যাচ্ছে! সে দাদু হচ্ছে! সে তড়িঘড়ি করে সোলেমান কে ফোন করে সুখবর টা দিলো। তারপর মহাদেবপুর সুলতানপুর দিলো খবরটা। সোলেমান চট্টগ্রাম এসে পৌঁছেছে কিছুক্ষণ আগেই। এখন ফ্রেশ হয়ে মিটিং এর জন্য রেডি হতে যাচ্ছিলো। আকস্মিক ফোনে চাচার এহেন কথা শুনে পাথর হয়ে গেলো। মেহরিন প্রেগন্যান্ট! সে বাবা হতে যাচ্ছে! ভোরেই তো কথা হলো তাদের। এরজন্যই কি মেয়েটার মুখ ওমন শুকিয়ে গিয়েছিল। কিসের মিটিং আর কিসের সভা? সোলেমান ফোনটা কোনোরকমে কেটেই রওনা দিলো ঢাকার উদ্দেশ্যে।
বাশার সুলতান সবাইকে ফোন দিয়ে শেষে এজওয়ান কে দিলো। এজওয়ান ফ্লোরার সাথে কথা বলছিলো। বাপের ফোন পেয়ে কেটে দিচ্ছিলে। কিন্তু বাশার সুলতান বারবার ফোন দিচ্ছে। এজওয়ান বিরক্তের সহিত রিসিভ করে বলল-

“ বারবার ফোন দিচ্ছ কেনো? দেখছো না কেটে দিচ্ছি? ব্যস্ত আছি। পরে ফোন দাও। ”
বাশার সুলতান আত্মহারা হয়ে বলল-
“ রাখ তুই তোর ব্যস্ততা। সুখবর আছে।”
“ কি সুখবর? নিশ্চয়ই তুমি দাদু হতে যাচ্ছ না। যেদিন হতে পারবে সেদিন বলিও সুখবর।”
“ গাধার বাচ্চা রে সত্যি সত্যি আমি দাদু হতে যাচ্ছি। আমাদের বাড়িতে ছোট্ট সদস্য আসছে। ”
এজওয়ান বিজলির মতো চমকে উঠলো। আবার মনে পরলো তার বাপ হয়তো মজা নিচ্ছে।
“ মজা করো না তো। মজার মুডে নাই। ”
“ আরে সত্যি আমি দাদু হতে যাচ্ছি। ”
এজওয়ান এবার সত্যি সত্যি সিরিয়াস হয়ে বলল-
“ আসলেই তুমি দাদু হতে যাচ্ছ? সিরিয়াসলি?”
“ হুম। আর তুই…”
এজওয়ান শেষ করতে দিলো না পুরো কথাটা। ধৈর্য হয় নি শোনার। অধৈর্য এজওয়ান বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে নিজেই বলল-

“ আর আমি বাপ হতে যাচ্ছি তাই না? ও মাই গুডনেস। আমি বাপ হতে যাচ্ছি। হায় আল্লাহ এতো খুশি লাগছে কেনো! তরিকুলের বেটির যত্ন করো বাবা আমি আসছি। আমি আসছি। ”
এজওয়ান ফোন কেটে দিলো। বাশার সুলতান হতভম্ব হয়ে গেলো। এজওয়ান বাপ হতে যাচ্ছে সেটা কখন বললো? ও তো চাচা হতে যাচ্ছে।

দাহশয্যা পর্ব ৮৬ 

এজওয়ান ফ্লোরার বাসা থেকে বের হলো। তার হাত পা কাঁপছে খুশিতে। বিশ্বাস হচ্ছে না সে বাবা হতে যাচ্ছে! তরিকুলের বেটি তাহলে প্রেগন্যান্ট হলো! রাস্তার লোকদের ধরে এজওয়ান চিমটি কাটতে বলছে তার শরীরে। সবাই চিমটি দিচ্ছে। এজওয়ান ব্যথা পাচ্ছে। তারমানে এটা সত্যি। কোনো ভ্রম না। এজওয়ান তার ভাইয়ের সব চ্যালাদের ডাক দিলো। ডেকে এনে ঢাকার ১৫০ টা দোকানের সব গুলো মিষ্টি কিনে পুরো এলাকায় রাস্তা ঘাটে যাকে পাচ্ছে তাকেই বিতরণ করলো এজওয়ান, বাবা হওয়ার খুশিতে। তরিকুলের বেটি আর দূরে যেতে পারবে না এবার এজওয়ানের থেকে।

দাহশয্যা পর্ব ৮৬ (৩)