দাহশয্যা পর্ব ৮৬ (৩)
Raiha Zubair Ripti
ছোট মেয়ে মা হচ্ছে শুনে মোতালেব ভুঁইয়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে। খবর টা শোনার পর থেকেই তার মুখের উপর থেকে খুশির রেশ সরছে না। আত্মীয় স্বজন সবাইকে ফোন করে বলছে। হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই নগদ,সেজন্য ব্যাংকে গেলেন। দীর্ঘ তিন ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টাকা তুলে সেই টাকা দিয়ে পুরো এলাকায় মাদ্রাসায় মসজিদে মিষ্টি বিলালেন। হুজুরের হাতে হাজার টাকার নোট দিয়ে বললেন তার মেয়ে আর মেয়ের অনাগত সন্তানের জন্য দোয়া করতে। সানজিদা বেগম স্বামীর এত খুশি হওয়া দেখে ভারী হাসলেন। বাচ্চার মতো করছে। মেয়েকে নাকি এখন দেখতে যাবেন ঢাকা। সে মেয়েকে না দেখে স্বস্তি পাচ্ছেন না। সানজিদা বেগমেরও মেয়েকে দেখার ইচ্ছে হলো। বাচ্চা হওয়ার সংবাদ টা শুনে খুশি হওয়ার সাথে সাথে ভয়ও হলো দারুন। সেরিন বাঁধা দিলো আজ যেতে। এমনিতেও বেলা হয়ে গেছে। যেতে যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে। সেজন্য আগামীকাল যেতে বলল। মোতালেব ভুঁইয়া হাসফাস করতে লাগলো। তার ছোট্ট আদরের মেয়ে টা মা হতে যাচ্ছে। পুরো পৃথিবী কে মাইক দিয়ে জানাতে ইচ্ছে করছে তার।
মেহরিন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না যে সে মা হতে যাচ্ছে। পেটের উপর হাত রেখে বোঝার চেষ্টা করছে,আসলেই এই পেটের ভেতর একটা প্রাণ আছে? ডক্টররা তো আর মিথ্যে বলবে না। আর পিরিয়ড টাও তো হয় নি এবার। তারমানে সত্যিই সে মা হতে যাচ্ছে। বিষয় টা বিশ্বাস করার পর থেকেই তার কান্না চলে আসছে বারবার। একটা ছোট্ট প্রাণ তার ভেতরে। আচ্ছা সুলতান সাহেব কি শুনেছে এই সুখবর টা? কেউ কি জানিয়েছে? জানিয়ে থাকলে উনার অনুভূতি টা কেমন? উনি কি আসছেন ছুটে? মেহরিন চাতকের মতো উত্তর জানার জন্য আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো কাউকে। হাতে স্যালাইন লাগানো। উঠতেও পারবে না।
মাহি আসলো কেবিনের দরজা ঠেলে ভিতরে। মেহরিনের পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো-
“ কেমন আছো এখন? কষ্ট হচ্ছে কোনো?”
মেহরিন মাথা দু দিকে মাথা নাড়িয়ে না জানালো। মেহরিন ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো-
“ আপু উনাকে কি খবর টা জানানো হয়েছে?”
“ হু আঙ্কেল তো জানিয়েছে। ”
“ উনি কিছু বলেছেন?”
“ তা তো বলতে পারবো না। ”
মেহরিনের মুখটা ভার হয়ে গেলো। কলেজ ব্যাগ থেকে ফোনটা দিতে বলল বাশার সুলতান দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে বলল- সোলেমান আসছে। মেহরিন চিন্তা করো না।
মেহরিনের বুকের ভেতরটা শীতল হয়ে গেলো। চোখ মুখে স্বস্তির দেখা মিললো। মেহরিন অপেক্ষা করতে লাগলো তার স্বামীর।
বাশার সুলতান মাহি কে নিবাসে পাঠিয়ে দিলো। সুলতান ভিলা থেকে সবাই আসছে এই সুখবর শুনে। মাহি চলে গেলো নিবাসে। নিবাসে এসে রফিকের হাতে হাতে রান্নাবান্না সব করে ফেললো। সুলতান ভিলা থেকে আফিয়া সুলতান, রুমাইসা,আনোয়ার সুলতান, আমিরুল সুলতান চলে আসছে। মাহি খাবার টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিল। এমন সময় দৌড়াতে দৌড়াতে নিবাসের ভেতরে প্রবেশ করলো এজওয়ান। মাহিকে কাজ করতে দেখে মেজাজ বিগড়ে গেলো। এমনি সময় কাজ করে না। আজ এই শরীর নিয়ে কাজ করছে! এজওয়ান গিয়ে হাত থেকে থালাবাসন গুলো টেবিলে রেখে টেনে বলল-
“ একদম কাজ করবে না। রাখো তো এসব। রফিক আছে করার জন্য। ”
মাহি হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল-
“ রফিকি তো সব করেছে। আমি শুধু সাহায্য করছি। ”
“ এই শরীরে কাজ করতে হবে না তোমার। ”
“ এই শরীরে কাজ করতে হবে না মানে?”
এজওয়ান গাল টেনে নেকুপুষুসুন্টুনিমুন্টুনি টা বলে একটু ঝুঁকে মাহি কে শূন্যে তুলে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল-
“ থ্যাংক ইউ তোমাকে তরিকুলের বেটি। অনেক অনেক থ্যাংক ইউ। আমি যে এই খবরটা শুনে কি যে খুশি হয়েছি। হায় মেরি মা। আমি বাপ হতে চলছি। ও মাই গুডনেস। ” এজওয়ান মাহি কে দাঁড় করিয়ে পেটের কাছে চুমু খেয়ে বলল-
“ আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো তোমার কাছে তরিকুলের বেটি। তুমি জানো না তুমি আমায় কি শুনিয়েছো। ”
ভিলার সবাই হতবাক এজওয়ানের পাগলামি দেখে। রুমাইসা কপাল চাপতে চাপতে এগিয়ে এসে বলল-
“ ভাই তুমি ভুল শুনছো। ”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো। আশেপাশে এতক্ষণ সে খেয়ালই করে নি।
“ মাহি ভাবি মা হতে যাচ্ছে না। মা হতে যাচ্ছে মেহরিন। আর বাপ হচ্ছে ভাইজান। তুমি না। ”
এজওয়ানের মাথায় যেন কেউ একশো কেজির একটা বস্তা ফেলে দিলো। অবিশ্বাস্য চাহনি নিয়ে মাহির দিকে তাকালে মাহি ইশারায় জানালো রুমাইসা যা বলছে তা সত্যি। এজওয়ান দু হাত দিয়ে দু কান চেপে ব্যথাতুর গলায় চিৎকার করে বলল-
“ নাআআআ এটা আমি মানিইইই নাআআআআ।”
“ কিন্তু এটাই সত্যি। ”
এজওয়ান সোফায় বসে পড়লো ঠাস করে। সে যে বাপ হওয়ার খুশিতে ঢাকার ৮ আসনের রাস্তার দুস্থ এতিম মানুষদের নিবাসে আসতে বলছে। এক বেলা খাওয়াবে। আর তাছাড়া সে যে মাইক দিয়ে দিয়ে রটিয়ে দিয়েছে বাপ হওয়ার সংবাদ টা। এবার কি হবে? সবাই জানবে বাপ সে না তার বড় ভাই হচ্ছে। এই দুঃখ এজওয়ান এখন কোথায় রাখবে?
এদিকে দারোয়ান এসে জানালো দল বেঁধে বেঁধে লোকজন আসা শুরু করছে নিবাসে। মাহি জিজ্ঞেস করলো- কি জন্য আসছে।
এজওয়ান আর বলতে পারলো না। দারোয়ান বলল- স্যার বাপ হতে যাচ্ছে সেই খুশিতে ভোজনের আয়োজন করেছেন।
“ কিন্তু আপনার স্যার তো বাপ হচ্ছে না। ”
এজওয়ানের এখন চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। তার বলতে ইচ্ছে করছে আমার ভুল হয়ে গেছে। বোঝা উচিত ছিলো এজওয়ান তোর জীবন এত সহজ সরল নয়। তুই ব্যাটা বাপ হওয়ার যোগ্য না। যোগ্য প্রার্থী বাপ হচ্ছে। এজওয়ান রুমে চলে যেতে যেতে বলল-
“ খাবার চলে আসলে তাদের দিয়ে বিদায় করে দিবি। মানসম্মান হাটে বিক্রি করে আসছি। নেই আর,সব শ্যেষ। ”
আমিরুল সুলতান ভাইস্তার চুপসানো মুখ দেখে কষ্টই পেলেন। এজওয়ান চলে যেতেই দারোয়ান বলল- এজওয়ান পুরো এলাকায় মিষ্টি বিলিয়েছে।
মাহি স্পিচলেস হয়ে গেছে সব শুনে। আধপাগল? উঁহু পুরোই পাগল।
নিবাসে খাওয়াদাওয়া করে সবাই হসপিটালে আসলো মেহরিনের সাথে দেখা করতে প্লাস নিবাসে নিয়ে যেতে। অথচ এত এত মুখের ভীড়ে মেহরিন খুঁজতে লাগলো শুধু একটি মুখ। সেই মুখই অনুপস্থিত। এতক্ষণে তো তার এসে যাওয়ার কথা। আমিরুল সুলতান সোলেমান কে না দেখে বাশার সুলতান কে জিজ্ঞেস করলো-
“ কিরে সোলেমান কোথায়? ও কি পায় নি খবর টা?”
“ দিয়েছি তো ভাই। ও তো বললে আসছে। কিন্তু এতো দেরি কেনো হচ্ছে বুঝলাম না। ”
“ ফোন দিয়ে দেখ তো। ”
বাশার সুলতান ফোন দিলেন। রিং হচ্ছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না।
“ ধরছে না ফোন। ”
“ ইয়াসিন কে ফোন করে দেখ। ”
ইয়াসিন কে ফোন করলো। ইয়াসিন জানালো তাকে ফেলেই সোলেমান চলে গেছে। সে এখন বাসে করে ঢাকা ফিরছে।
দুশ্চিন্তায় ঘিরে ধরলো মেহরিন কে। ফোন কেনো রিসিভ করবে না সে? আরো কিছু চেক-আপ করিয়ে মেহরিন কে নিবাসে নিয়ে যাওয়া হলো ১২৪ নম্বর কেবিন বার্ন ওয়ার্ডের পাশ দিয়ে। যেই কেবিনেই ছিলো মেহরিনের স্বামী সোলেমান।
হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তীব্র অ্যান্টিসেপটিকের গন্ধ। সাদা টাইলসের মেঝেতে আলো ঝলমল করছে, তবু পরিবেশটা কেমন ভারী নিস্তব্ধ, চাপা আতঙ্কে মোড়া। দূরে কোথাও মনিটরের টুপটাপ শব্দ, নার্সদের পায়ের আওয়াজ, আর মাঝেমধ্যে স্ট্রেচার ঠেলার ধাতব শব্দ কানে এসে লাগে।
একই হাসপাতালের ভিন্ন একটি সেক্টর, বার্ন ইউনিট। এটা যেন অন্য এক জগৎ। এখানকার বাতাস সবচেয়ে ভারী। এখানে পোড়া চামড়া আর ওষুধের তীব্র গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
করিডোরে লাল বাতি জ্বলছে, দরজার বাইরে সতর্কবার্তা- Critical Care: No Entry Without Permission। ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায়, কাঁচের দেয়ালের আড়ালে কারো জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি চলতে থাকা এক লড়াই।
আইসিইউর বেড নম্বর ১২৪। সেখানে শুয়ে আছে একটা দেহ। মানুষ বলা যায় কি না, বোঝা কঠিন।
তার পুরো শরীর পুড়ে গেছে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত সাদা গজ আর ব্যান্ডেজে মোড়া। কোথাও কোথাও ব্যান্ডেজের ভেতর লালচে দাগ ছড়িয়ে উঠেছে। ত্বক বলে কিছু নেই। যেখানে ছিলো, সেখানে এখন দগ্ধ মাংসের চিহ্ন। দুই হাত ঝলসে গেছে এতটাই যে আঙুলগুলো আলাদা করে বোঝা যায় না। বুকের উপর মনিটরের তার জড়িয়ে আছে। যন্ত্রগুলোই যেন প্রমাণ দিচ্ছে বাহ্যিক ভাবে মৃ’ত মনে হলেও, সে এখনো বেঁচে আছে।
মুখের জায়গাটায় ব্যান্ডেজের স্তর আরও মোটা। এসিডে গলে ঝলসে যাওয়া চামড়ার উপর চিকিৎসকেরা যত্ন করে গজ পেঁচিয়ে রেখেছে। চোখ দুটো ফোলা, একটা পুরোপুরি ঢেকে গেছে। ঠোঁটের রেখা আর নাকের অবয়ব প্রায় মুছে গেছে। চেনার কোনো উপায় নেই। এ যেন কোনো পরিচয়হীন দগ্ধ দেহ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আগুন তাকে কতটা নির্মমভাবে স্পর্শ করেছে। চুল নেই মাথায়। আগুন তার সর্বাঙ্গকে গ্রাস করেছে। এই মানুষটাকে দেখলে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাবে ভয়ে। এতোটাই ভয়াবহ লাগছে তাকে দেখতে।
মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। শ্বাস নিতে গেলে কষ্টে তার বুক হালকা কেঁপে ওঠে। মনিটর থেকে শব্দ ভেসে আসছে বিপবিপ…
বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইব্রাহিম। তার চোখ লাল, পলক ফেলতে ভুলে গেছে যেন। সামনে তাকিয়ে আছে, কিন্তু ঠিক কী দেখছে সে নিজেও জানে না। এই দেহটার ভেতর যে এখনো প্রাণ আছে এটা বিশ্বাস করাও কঠিন।
ঠিক তখনই দ্রুত পায়ে করিডোর পার হয়ে আসে সোলেমান। তার হাঁটায় অস্থিরতা, মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু ১২৪ নম্বর কেবিনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁচের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা একটা পরিচিত অবয়ব চোখে পড়তেই থেমে গেল সে।
ঘাড় একটু বাঁকিয়ে ভালো করে তাকালো। ইব্রাহিম কে দেখলো মনে হলো যেন। হ্যাঁ—ইব্রাহিমই তো!
কিন্তু… বার্ন ওয়ার্ডে কেনো?
কৌতূহল আর অজানা আশঙ্কা মিশে গেল তার মনে। বুকের ভেতর হালকা কাঁপন নিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো সে। পেছন থেকে আসতে আসতে ডাক দিল—
“ইব্রাহিম! তুই এখানে?”
ইব্রাহিম চমকে উঠলো। কণ্ঠস্বরটা চিনতে পেরে ধীরে পেছন ফিরে তাকালো। সোলেমান এগিয়ে এলো। প্রথমে ইব্রাহিমের মুখের দিকে তাকালো, তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি গেল বেডের দিকে।
আর তারপরই সে থেমে গেল। বিছানায় শুয়ে থাকা দেহটা দেখে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো। সাদা ব্যান্ডেজে মোড়া, পুড়ে যাওয়া সেই শরীর… মুখে অক্সিজেন মাস্ক… নিস্তেজ হাত। ছেলে নাকি মেয়ে চেনা যাচ্ছে না।
“ এটা কে ইব্রাহিম ?”
ইব্রাহিমের গলা যেন কেউ চেপে ধরে রাখলো। নামটা উচ্চারণ করার মতো শুব্দ যেন সে আর খুঁজে পাচ্ছে না। সোলেমান ফের জিজ্ঞেস করলো-
“ কি রে,বল এটা কে? তোর পরিচিত কেউ? ধূর চুপ করে আছিস কেনো? মেহরিন ও এই হসপিটালে আছে। শুনেছিস আমি বাপ হতে চলছি? ”
ইব্রাহিম চমকে উঠলো এই খবর শুনে। সে শুনে নি এই খবর। সোলেমান ইব্রাহিম কে চুপ থাকতে দেখে বিরক্ত হলো। চলে যেতে যেতে বলল-
“ ধূর তুই চুপই থাক। আমি চললাম। ”
সোলেমান দরজা অব্দি গিয়েছে। ইব্রাহিম খুব ধীর গলায় অনেক কষ্ট করে উচ্চারণ করলো।
“ সোলেমান। ”
সোলেমান পিছু ফিরলো। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো। ইব্রাহিম জিহবা দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নিয়ে বলল-
“ এ..এটা প..প্রেমা।”
নামটা কান অব্দি আসতেই কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন শরীর শীতল হয়ে গেলো সোলেমানের। ধরজার হাতল ধরে থাকা হাত টা ফস্কে নেমে পড়লো। অবিশ্বাস্য ঠেকছে তার। প্রেমা হবে কি করে? না না মিথ্যা কথা। সোলেমানের কন্ঠ দেবে গেলো। নামটা উচ্চারণ করতে পারছে না। ভারসাম্য হারিয়ে পিছলে যেতে লাগলে ইব্রাহিম এসে ধরে ফেললো। সোলেমান অবিশ্বাস্য চাহনি নিয়ে তাকালো। ইব্রাহিম কে বলতে বললো এটা মিথ্যা। তুই মিথ্যা বলছিস। কিন্তু ইব্রাহিম অসহায় চোখে তাকিয়ে জানালো সে মিথ্যা বলছে না। এটা সত্যি প্রেমা। সোলেমানের তারপরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। হ্যাঁ সে প্রেমা কে ঘৃণা করে। তাকে অভিশাপ দিয়েছিল যেন সুখী না হয়। কিন্তু সোলেমান তো এমন অবস্থা তার চায় নি! ইব্রাহিম ধরে নিয়ে আসলো। সোলেমান দেখলো প্রেমাকে। চেনার তো উপায় নেই যে এটা প্রেমা। কি দেখে সে বিশ্বাস করবে এটা প্রেমা? সোলেমান কোনো রকমে উচ্চারণ করলো-
“ ক…কিভাবে হলো? তুই পেলি কোথায়? ”
ইব্রাহিম পকেট থেকে কয়টা ছবি বের করে দিলো। যেগুলো রাস্তার ধারে পেয়েছিলো। সোলেমান দেখলো সেই ছবিগুলো। ছবি গুলো তে শেখর কিভাবে অত্যাচার করছে মেয়েদের উপরে তার প্রমাণ। সোলেমান একবার ছবি তো একবার ইব্রাহিমের দিকে তাকাচ্ছে।
আনুমানিক ভোর চারটা কি সাড়ে চারটা। শহর যখন গভীর ঘুমে ডুবে আরামদায়ক শীতল ঘরে মানুষ স্বপ্নে নিমগ্ন। তখন সেই শহরের নির্জন রাস্তায় পাগলের মতো ছুটছে প্রেমা। শ্বাস ফেলার সময় নেই, থামার সাহস নেই। শুধু বাঁচার তাড়না।
একটু যদি কেউ সাহায্যের হাত বাড়াত! তাহলে হয়তো মেয়েটা বেঁচে যেত। যে দু’চারজন সাহায্য করতে চেয়েছিল, তাদের ছিল না সেই ক্ষমতা। আর যাদের ছিল ক্ষমতা, তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
পেছনে পুলিশের সাইরেনের শব্দ, সঙ্গে শেখরের পাঠানো হিংস্র লোকগুলো,যারা হায়েনার মতো তাড়া করছে। প্রেমা একবারও দাঁড়িয়ে শান্তভাবে শ্বাস নিতে পারেনি। দৌড়াতে দৌড়াতে ধানমন্ডি পেরিয়ে আসতেই তার পা যেন আর সাড়া দিল না। হাঁপাতে হাঁপাতে থমকে যেতেই চারদিক থেকে ঘিরে ধরল শেখরের লোকজন।
প্রেমার হাতে তখনও শক্ত করে ধরা শেখরের বিরুদ্ধে জোগাড় করা প্রমাণগুলো। ওগুলোই ছিল তার শেষ ভরসা, শেষ অস্ত্র। লোকগুলো প্রথমে শান্ত গলায় চাইলো সেই প্রমাণ গুলো। কিন্তু প্রেমা অস্বীকার জানালো তা দিতে। তাতেই বদলে গেল তাদের মুখের ভাষা। একজন ফোন বের করে শেখরকে খবর দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সেই ফাঁকে প্রেমা আবার দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ধরা পড়ে গেল। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসার সময় ছবিগুলো হাত থেকে ফসকে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে গেলো অগোচরে।
ওপাশ থেকে শেখরের কণ্ঠ ভেসে এলো,কঠিন, নির্মম। প্রেমা আবার পালাতে চাইছে শুনেই সে আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না। ঠান্ডা গলায় বলল, “শেষ করে দাও। পু’ড়িয়ে দাও। আর এমনভাবে করো, যেন ওর কিছুই বোঝা না যায়।”
ছেলেগুলো প্রথমে প্রেমার হাত থেকে প্রমাণগুলো ছিনিয়ে নিল। তারপর গাড়ির ভেতর থেকে একটা বোতল বের করল। ঢাকনা খুলতেই বাতাসে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
পরের মুহূর্তে সেই তরল জিনিসটা ছুঁড়ে মারা হলো প্রেমার মুখের দিকে। এই তরল জিনিস টা ছিলো এসিড। আকস্মিক সেই এসিড মুখের উপর পড়তেই প্রেমার মনে হলো,যেন একসাথে হাজার সূর্যের আগুন তার মুখমণ্ডলে বিস্ফোরিত হয়েছে।
চামড়া গলে যাচ্ছে, চোখে অন্ধকার নেমে আসছে, চিৎকার গলায় আটকে যাচ্ছে।
ভোরের নিস্তব্ধতা তখনও অটুট। দূরে আজানের সুর ভেসে আসার কথা,কিন্তু সেই মুহূর্তে প্রেমার কানে কেবল নিজের ছিন্নভিন্ন নিঃশ্বাসের শব্দ।
মুখে নিক্ষিপ্ত সেই তরল আগুনে তার চামড়া যেন সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্রোহ করে উঠল। চোখের সামনে সব ঝাপসা। সে চিৎকার করতে চাইল কিন্তু কণ্ঠ থেকে বের হলো এক বিকৃত, ভাঙা শব্দ। এ কেমন যন্ত্রণা হচ্ছে? এই যন্ত্রণার সাথে তো আগে পরিচিত হয় নি প্রেমা। প্রেমা মুখ জাপ্টে ধরে রাস্তায় বসে পড়লো। এবার গলায় সমস্ত চাপ দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো পাগলের মতো। এমন যন্ত্রণাই যদি দেওয়ার ছিলো আল্লাহ তাহলে কেনো এই ছোটাছুটি, কেন এই বাঁচার শেষ আশা দেখালে? প্রেমা চিৎকার করতে লাগলো। মা মা বলে চেঁচিয়ে ডাকলো। কই মা তো আসছে না। প্রেমার যে মুখটা জ্বলে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে প্রাণ পাখি টা বেরিয়ে যাবে। কোথায় তুমি প্রেমার মা? প্রেমা তোমাকে ডাকছে। তুমি অন্তত আসো তোমার এই অভাগী মেয়েটাকে সাহায্য করতে। কেউ আসলো না।
সাথে লোকগুলোও থেমে থাকলো না। শেখরের নির্দেশ ছিল স্পষ্ট। তারা প্রেমাকে রাস্তার ধারে ফেলে গাড়ি থেকে কেরোসিন তেলের বোতল টা বের করে তার পোশাকের ওপর ঢেলে দিলো। প্রেমা তখনও বুঝে নি যে তার শরীরে কেরোসিন তেল ঢালা হয়েছে। যদি বুঝতো তাহলে ঐ ভাবেই ছুটে পালাতো। একজন ম্যাচ জ্বালালো। সেই ক্ষুদ্র শিখাটা কয়েক সেকেন্ড বাতাসে কাঁপল। তারপর ছুঁড়ে ফেললো প্রেমার শরীরে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন লেলিহান হয়ে উঠল। প্রেমা অনুভব করলো আরেক নতুন যন্ত্রণা। সর্বাঙ্গ শরীর যে এবার জ্বলে যাচ্ছে। প্রেমার শরীর যেন আর শরীর নেই, এ যেন এক চলমান চিতা। আগুনের শিখা তার গায়ে লেপ্টে যাচ্ছে, কাপড় ধরে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। প্রেমা বুঝতে পারলো না কোথায় বেশি জ্বলছে,মুখে, বুকে, হাতে, নাকি আত্মায়।
তার মনে হচ্ছিল প্রতিটা স্নায়ু আলাদা আলাদা করে পুড়ছে। তার প্রতিটা শ্বাস যেন আগুন টেনে নিচ্ছে ভেতরে। সে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে চাইল। উন্মাদের মতো হাত নেড়ে আগুন নেভাতে চাইল। কিন্তু হাতের চামড়া এতটাই ক্ষতবিক্ষত যে স্পর্শেই অসহনীয় যন্ত্রণা। তার গলা ফেটে চিৎকার বেরোচ্ছে,অসহায় আর্তনাদ। একটু বাঁচার অন্তিম প্রচেষ্টা। প্রেমা আর্তনাদ করে চিৎকার করবে নাকি আল্লাহ,মা কাউকে ডাকবে? প্রেমা ডাকলো। আল্লাহ কে ডাকলো, মা’কে ডাকলো। এই জীবনে যতগুলো মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে সবাইকে একএক করে ডাকলো। ডেকে ডেকে বলল-
“ এই যন্ত্রণা আমার সহ্যের বাহিরে। আল্লাহর দোহাই লাগে, কেউ তো এসো আমাকে বাঁচাতে। আল্লাহ কাউকে তো পাঠাও। এতোটা নিষ্ঠুর অন্তত তুমি হইও না। আমি যে মরে যাচ্ছি। আমি ম’রে গেলে ওদের কে বাঁচাবে? আমি যে কথা দিয়ে এসেছি। কথার খেলাপ কিভাবি করি? ইয়া আল্লাহ বৃষ্টি দাও, মেঘ দাও,ঝড় বাতাস,কিছু তো দাও। আমি আর পারছি না। আমার শরীর জ্বলে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গ। আমি ম’রে যাচ্ছি খোদা। ”
সেই পথ দিয়েই ফিরছিলো ইব্রাহিম। আচমকা রাস্তায় আস্ত এক মানুষকে পু’ড়তে দেখে রীতিমত বিস্ময় হয়ে যায়। পুড়তে থাকা মানুষটার সামনে থেকেই একটা গাড়িতে কয়জন লোক উঠে চলে গেলো। ইব্রাহিম তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বের হলো। পুড়ে যাওয়া মানিষটার সামনে এসে দাঁড়ালো। প্রেমা একপলক তাকালো। চিনলো তাকে। ইব্রাহিম ভাই এটা! প্রেমা কোনোরকমে উচ্চারণ করলো-
“ ই…ইব্রাহিম ভ…ভাই,আ…আমাকে বাঁচান। আ…আমি প্রেমা। ”
নামটা কানে বাজতে লাগলো ইব্রাহিমের। পাগলের মতো দৌড়ে ছুটে আসলো গাড়িতে। পানির বোতল বের করলো। ঢালো প্রেমার শরীরে। কিন্তু এক বোতল পানিতে কি আর দেহের আগুন নিভে? ইব্রাহিম পাগলের মতো চিৎকার করে করে ডাকতে লাগলো- কেউ কি আছেন। সাহায্য করুন। প্রেমা জ্বলে যাচ্ছে। একটু পানি আনুন কেউ। ইব্রাহিম শরীরে কোট টা খুলে সেটা দিয়ে আগুন নিভাতে চাইলো। কিন্তু আগুন নিভছে না। প্রেমার এক একটা আর্তনাদ ইব্রাহিমের গা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ইব্রাহিম রাস্তার ধারে একটা পানির কল দেখতে পেলো। পাশে এক বন্ধ চায়ের স্টলে পেলো বালতি। ইব্রাহিম সেই বালতি নিয়ে পানি ভরে ভরে প্রেমার শরীরে দিতে লাগলো। এমন করে ৬-৭ বালতি পানি প্রেমার শরীরে ঢালার পর আগুন নিভে। ততক্ষণে প্রেমার শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে যায়। শরীরের চামড়া সব পু’ড়ে গেছে। শরীরে পোশাক নেই। রাস্তার ধারে থরথর করে কাঁপতে লাগলো প্রেমার পুড়ে যাওয়া নগ্ন শরীর টা। ইব্রাহিম প্রেমার ঠিক কোথায় ধরবে? খুঁজে পেলো না জায়গা। পকেট থেকে ফোন বের করে অ্যাম্বুলেন্স কে আসতে বললো। তারা ধরে প্রেমাকে হসপিটালে নিয়ে আসে। ইব্রাহিম অ্যাম্বুলেন্সের পেছন পেছন আসার সময় খেয়াল করলো গাছের পাশে কিছু ছবি জাতীয় জিনিস পড়ে আছে। ইব্রাহিম সেগুলো উঠালো। দেখলো সেই ছবি গুলো। তাতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। প্যান্টের পকেটে ভরে ছুটলো হসপিটালে।
সোলেমান অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে প্রেমার দিকে। খুব জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে প্রেমা। চোখের পাতা বন্ধ। ডক্টর জানালো শরীরে ৭০ শতাংশ পুড়ে অকেজো হয়ে গেছে। সোলেমানের শরীর টা কাঁপছে। আজ তো তার সবচেয়ে খুশির দিন ছিলো। কিন্তু এটা কি হলো? এই মেয়ে এভাবে এইখানে! সোলেমান প্রেমার দিকে ঝুঁকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-
“ তোকে বলেছিলাম আমার সামনে জীবনে না আসতে। তোর এই মুখ আমাকে কোনোদিন না দেখাতে। তাই বলে তুই এভাবে আমার সামনে আসবি প্রেমা! এসিডে ঝলসে যাওয়া মুখ,আগুনে পুড়ে যাওয়া দেহ নিয়ে! এই তোকে যে আমার চিনতে খুব কষ্ট হচ্ছে রে প্রেমা। একটু চোখ মেলে তাকা। তাকা আমার দিকে। কথা বল। কিরে তাকা না। শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা? বল না কেনো হলো এমনটা তোর সাথে? তুই তো ভালো থাকার জন্যই আমাকে ছেড়েছিলি তাহলে? তাহলে এই অবস্থা কেনো আজ তোর? আমি অভিশাপ দিয়েছিলাম। চেয়েছিলাম তুমি কোনোদিন যেন সুখী না হোস,কিন্তু তোর এই পরিনতি তো আমি কোনো দিন চাই নি। আমি চাই নি তোর মৃত্যু। একটু তাকা। কিছু বল। চুপ থাকিস না। ঐ শেখর কেনো এমনটা করলো তোর সাথে? ”
কথা গুলো কি প্রেমার মস্তিষ্ক অব্দি পৌঁছালো? কে জানে হয়তো গেলো। সেজন্য হয়তো চোখের পাতা পিটপিট করে নড়লো। অনেক চেষ্টা করলো খোলার। খুলতে সক্ষম ও হলো। চোখ খুলতেই যে সে সোলেমান কে দেখতে পাবে তা হয়তো কল্পনাতেও ভাবে নি। অনেক কিছু তার বলতে ইচ্ছে করছে কিন্তু শরীর তাকে বলতে দিচ্ছে না। সোলেমানের চোখ মুখ আহত। প্রেমার এই অবস্থা দেখে কি সোলেমানের কষ্ট হচ্ছে? বুক ফেটে যাচ্ছে? প্রেমা যে কত ডাকলো তাকে। কই সোলেমান তুমি তো আসলে না। প্রেমা চোখের মনি এদিক ওদিক ঘুরালো। বুঝার চেষ্টা করলো সে কোথায়। বুঝলো একটা কাঁচের রুমে। প্রেমার যন্ত্রণা হলো। তেষ্টাও পেলো বোধহয়? শরীরের যন্ত্রণা আর তেষ্টার যন্ত্রণা মিলে একাকার হয়ে গেলো। কাউকে কি বলবে আমার শরীরে একটু বরফ দিবে? খুব পুড়ছে। আমি সহ্য করতে পারছি না। কিন্তু বলতে পারলো না। সোলেমানের দিকে তাকিয়ে নিভু নিভু গলায় বলল-
“ এ…এসেছো তুমি! ”
সোলেমান প্রেমার গলার স্বর শুনে কেমন একটা হয়ে গেলো। কি করবে বুঝতে পারছে না। কেমন যেন পাগল পাগল লাগছে।
“ স…সোলেমান শোনো। ”
সোলেমান আরো এগিয়ে আসলো। দ্রুততর গলায় বলল-
“ বল আমি শুনছি। ”
“ আমার যখন চলে যাওয়ার সময় হলো,তখন তোমার সময় হলো আমার কথা শোনার! আমার শেষ একটা ইচ্ছে, রাখবে তুমি?”
“ শেষ ইচ্ছে মানে? এই তোর কিচ্ছু হবে না। ওয়ার্ল্ডের বেস্ট হসপিটালে নিয়ে যাব। তুই সুস্থ হয়ে যাবি। ”
“ উঁহু। সময় নেই আমার। আমার কথাগুলো একটু শুনো। ইকবাল ভাইকে বাঁচবে? ঐ মেয়েগুলোকে একটু বাঁচাবে? আমি কথা দিয়েছি তাদের বাঁচাবো। আমি তো থাকবো না। ওরা আমার অপেক্ষায় থাকবে জানি। এই টুকু সাহায্য অন্তত আমাকে করো। ”
“ সব করবো আমি। তুই কথা বলিস না। ইব্রাহিম ডক্টর কে ডাক দে। ও অক্সিজেন মাক্স কেনো খুলছে। ”
“ কিচ্ছু হবে না খুললে। তুমি কি আমার হাতটা একটু ধরবে সোলেমান? অনেক দিন হলো ছুঁইয়ে দেখি নি তোমায়। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। নিজ থেকে ছোঁয়ার ক্ষমতা নেই। ধরবে একটু? ”
সোলেমান হাতের দিকে তাকালো। কোথায় ধরবে? ধরার মতো তো কোনো জায়গা নেই। সব তো পুড়ে সেদ্ধ হয়ে গেছে। এই হাতে হাত রাখলে প্রেমা ব্যথা পাবে না? সোলেমান হাল্কা করে রাখলো তার কাঁপতে থাকা হাতটা। প্রেমা অনুভব করতে পারে নি হয়তো সেই ছোঁয়া। শরীরের যন্ত্রণার কাছে এই ছোঁয়ার অনুভব টা মিলিয়ে গেলো হাওয়ায়। প্রেমার বলতে ইচ্ছে করলো একটু পানি খাওয়াবে? খুব তেষ্টা পেয়েছে। মৃত্যুর সময় কি সবারই এমন তেষ্টা পায়? একটু দাও না কেউ পানি। কিন্তু বলতে পারলো না। তার চোখে ভেসে উঠলো মায়ের মুখ,ইকবাল ভাই,সেই মেয়েগুলো,তার সন্তান গুলো,তার আম্মা আর সন্তানরা তাকে ডাকছে। প্রেমার ভেতর আত্মা টা বারবার বলছে-
“ আমাকে ক্ষমা করে দিবেন ইকবাল ভাই। আমাদের আর দ্বিতীয় বার সাক্ষাৎ হলো না। কথা দিয়েও সেই কথা আমি রাখতে পারলাম না। দোষ নিয়েন না আমার। আমি কাউকে বাঁচাতে পারি না। না নিজেকে আর না অন্য কাউকে।…প্রেমা একটু থেমে তার মৃ’ত বাচ্চাদের উদ্দেশ্য করে বলল- “ আমার মানিকরা। পৃথিবীতে তোদের ছুঁইয়ে দেখতি পারি নি। এবার মা তোদের বুকে জড়িয়ে আদর করবে খুব। নানুকে খুব জ্বালিয়েছো তাই না? আর জ্বালিও না। আম্মা, আম্মা দেখো আমি আসছি তোমার কাছে। তোমাদের বলেছিলাম আমি আসবো। দেখো কথা রেখেছি। এবার আমাকে তোমরা সুখ দিও সুখ? আমি বড় তেষ্টায় আছি। ভালোবেসো কিন্তু খুউব?”
তার চোখ দিয়ে পানি গড়ালো অন্তিম সময়ে। পৃথিবীতে এসেছিল প্রেমা চোখে জল নিয়ে,পৃথিবী থেকে বিদায়ও নিলো প্রেমা সেই একই ভাবে চোখে জল নিয়ে। সেদিন তার কানের কাছে আজান দিয়ে তাকে এই পৃথিবীতে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিলো। আর আজ প্রেমা ঠোঁটের কোনে শেষবারের মতো কালিমা তাইয়্যিবা
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) পড়ে পৃথিবীকে চিরতরে বিদায় জানালো।
এই সেই প্রেমা যে জীবিত থাকতে সুখ কাকে বলে জানে নি। জীবন তাকে বারবার ঠকালো। তারপরও সে আল্লাহর উপর আস্থা রেখেছিল। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তার আল্লাহ সব ঠিক করে দিবে। সেই দিনটা বুঝি আজই? প্রেমা বাঁচার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শরীর আর সায় দিলো না। সে এবার তার হার নীরবে মেনে আত্মসমর্পণ করলো। যৌন পল্লীর ওরা কি জানতে পারবে প্রেমা আর নেই? সে তাদের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কথা দিয়ে কথা রাখে নি। পালিয়ে গেছে চিরতে।
এখন থেকে পৃথিবী কে নিয়ে প্রেমা আর কোনো প্রকার অভিযোগ জানাবে না। আল্লাহ কে ডেকে ডেকে আর ভিক্ষা চাইবে না মৃত্যুর জন্য। এই পৃথিবীর সবাই হয়তো প্রেমাকে ভুলে যাবে। কেউ আর মনে রাখবে না। মনে রাখার মতো তো প্রেমা কিছু করে নি। পৃথিবীর সবাই জানে প্রেমা বিশ্বাসঘাতক এক নারী। তার মৃত্যু তে নিশ্চয়ই কেউ কাঁদবে না? হু কাঁদবে না। প্রেমা পৃথিবীর উদ্দেশ্যে রেখে গেলো এক চিরন্তন বাক্য-
❝ আমি প্রেমা সারাজীবন শুধু দুঃখই পেয়ে গেলাম। সুখ আর পেলাম কই? সুখ তো তুমি দিলে না খোদা। মৃত্যুটাও দিলে এমন নির্মম! যাও আমি হার মেনে নিলাম। পৃথিবী তুমি জিতে গেছ। এবার কি তুমি খুশি?❞
সোলেমান প্রেমাকে এক দৃষ্টিতে সিলিং এর দিকে তাকাতে দেখে অজানা এক ভয়ে চমকে উঠলো। এবার আর খুঁজলো না প্রেমার কোথায় ধরবে। মুখে ধরলো। মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলতে লাগলো-
“ এই এই প্রেমা তাকা আমার দিকে। তাকা না। এই ইব্রাহিম ওর কি হলো রে? কথা কেনো বলছে না? ডক্টর এই ডক্টর,প্রেমা কথা বলছে না যে। ”
ডক্টর আসলো। প্রেমাকে চেক করে জানালো শ্যি ইজ নো মোর। মেয়েটা যে এতক্ষণ বেঁচে ছিলো এটাই তো মিরাক্কেল ছিলো। কথাটা কানে এসে বাড়ি গেলো সোলেমানের। ভারসাম্য আর ধরে রাখতে পারলো না। মাটিতে বসে পড়লো। প্রেমা আর নেই! মানতে পারছে না।
অন্ধকার কক্ষ। নিথর হয়ে ফ্লোরে পড়ে আছে ইকবালের শরীর টা। এই শরীর টা আর শরীরে জায়গায় নেই। হাত পা ভেঙে গেছে। কে’টে রক্তাক্ত হয়ে গেছে পড়নের জামা। এত মা’র খাওয়ার পরও তার মুখে একটাই কথা- আমাকে যা করার কর। প্রেমার কিছু করিস না। এতেই আরো ক্ষুব্ধ হয়ে যায় শেখর। মা’রার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। হাত পা বেধে সিলিং এর সাথে বেঁধে উল্টো ঝুলিয়ে বিরতিহীন মা’রতে থাকে। মারতে মারতে ওরা ক্লান্ত হয়ে যায়। কিন্তু ইকবাল ক্ষমা চায় না। বলে না আর মেরো না। শেখর ভয়ংকর রেগে উঠে। ছেলেপেলে কে মারতে নিষেধ করে দেয়। ওরা আর মারে না। ছেলেগুলো কে বলল- হাত পায়ের বাঁধন খুলে পুকুরে ফেলে দিতে। যেখানে শেখর আফ্রিকান মাগুর পালে। যেখানে জ্যান্ত মানুষ সেখানে ছেড়ে দিলে মিনিট পাঁচেক সময় লাগে উধাও হয়ে যেতে। ইকবাল কে জ্যান্ত সেখানেই ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। ছেলে গুলো তাই করলো। ইকবালের দেহটাকে ধরে তারা সেই পাতাল ঘরের পুকুরে নিয়ে গেলো। ইকবাল কে ধরে যখন পুকুরে ফেল হবে তখনও শেখর প্রেমাকে নিয়েই ভাবছে। সে বিরবির করে বলছে-
“ আমি যদি বেঁচে থাকতাম তাহলে আপনাকে একটা সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারতাম। কিন্তু আমি দুঃখিত। ইচ্ছে থাকলেও তা পূরণ করার সাধ্য আমাকে দিলো না আপনার আল্লাহ। আমি বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম আপনার জন্য।কিন্তু পারলাম না। জীবনের রেস থেকে আমাকে বিদায় নিতেই হলো। যদি কখনও আমাদের পরপারে দেখা হয়, সেদিন আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিবেন প্রেমা। বিদায় পৃথিবী বিদায়। ধন্যবাদ তোমায়। এক পাপীর এমন মৃ’ত্যুই প্রাপ্য ছিলো। ”
ইকবালের দেহ টাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হলো পানিতে। মাগুর মাছ গুলো এসে খেতে থাকলো ইকবালের সেই দেহটাকে। একটা শব্দও ভেসে আসলো না ইকবালের।
আমি চিৎকার করে কাঁদিতে
চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার
বুকের ব্যথা বুকে চাপায়ে
নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার
কতটুকু অশ্রু গড়ালে হৃদয় জলে সিক্ত,
কত প্রদীপ শিখা জ্বালালেই
জীবন আলোয় ত্রিপ্ত।
কত ব্যথা বুকে চাপালেই
তাকে বলি আমি ধৈর্য,
নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ……
দাহশয্যা পর্ব ৮৬ (২)
ইকবাল জানলো না প্রেমা আর এই পৃথিবীতে নেই। ওপর দিক দিয়ে প্রেমাও জানতে পারলো না ইকবাল ও আর নেই পৃথিবীতে। সময়ের হিসেব করে দেখা গেলো পৃথিবীর দুই দিকে থাকা এই দুইটি মানুষ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালের পহেলা ফাগুন বিশ্ব ভালোবাসার দিবসে বিকেল ৪ টা বেজে ৫২ মিনিটের ৩৫ সেকেন্ডে একই সাথে পৃথিবীর কাছে হার মেনে পরাজিত হয়ে,পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে, না ফেরার দেশে পাড়ি জমালো।
