Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮৭

দাহশয্যা পর্ব ৮৭

দাহশয্যা পর্ব ৮৭
Raiha Zubair Ripti

সোলেমান শূন্য চোখে দেখে যাচ্ছে প্রেমার মৃ’ত পুড়ে দগ্ধ হয়ে যাওয়া লাশ টা । মানতে অবিশ্বাস্য হলেও সোলেমান কে মেনে নিতে হচ্ছে প্রেমার এই মৃ’ত্যুটা। সোলেমান বেশ অনেকক্ষণ ধরে ঝিম ধরে বসে রইলো। প্রেমার দিকে তাকিয়ে থেকেই এবার ইব্রাহিম কে বলে উঠলো-
“ রতন শিকদার কে ফোন করে উনার মেয়ের দাফনের শেষ কাজগুলো সম্পূর্ণ করার ব্যবস্থা করতে বল ইব্রাহিম। আমাকে এখন যেতে হবে.. মেহরিন অপেক্ষায় আছে। আমি না হয় আবার আসবো। ওর জানাজায় সামিল হবো। ”
ইব্রাহিম ফোন করলো রতন শিকদার কে। প্রথম কলে রিসিভ হলো না। ২য় কলে রিসিভ হলো। ইব্রাহিম জানালো তার মেয়ের মৃ’ত্যুর বিষয় টা। অন্য সব বাবা হলে এতক্ষণে আকাশপাতাল এক করে ফেলতো কান্না করে মেয়ে হারানোর শোকে। কোনো বাবার পক্ষে সম্ভব না নিজের আগে নিজের সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনার। কিন্তু রতন শিকদারের ব্যপারে বিষয় টা উল্টো ঘটলো। তিনি জানার প্রয়োজন বোধ টুকু করলো না কি করে তার মেয়েটা মা-রা গেছে। একটু গলায় কাঁপনও ধরলো না। কথা বলার সময় কথা গুলো আঁটকালোও না। বুকের ভেতর সন্তান হারানোর হাহাকারও শোনা গেলো না। বরং তার কন্ঠে স্পষ্ট শোনা গেলো বিরক্তিকর ভাব। যেন প্রেমা ম’রে যাওয়ায় সে ঝামেলা মুক্ত হলো। হাফ ছাড়লেন। সেই সাথে বলে দিলেন-

“ মরে গেছে সেজন্য আমি কি করতে পারি?”
ইব্রাহিম আশ্চর্যান্বিত হলো এক বাবার মুখে তার সন্তান কে নিয়ে এমন কথা শুনে।
“ কি করবেন মানে! আপনার মেয়ে মা-রা গেছে। আপনার কিছু যায় আসছে না? ”
“ না আসছে না। বরং শান্তি লাগছে। ”
“ আপনি বাবা নাকি অমানুষ? মেয়ের মৃত্যু তে শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন। এমন অমানুষ দের ঘরে কেন যে খোদা সন্তান পাঠায়। আপনি কি আপনার মেয়ের দাফনের কাজ করবেন না? প্রেমার আর কেউ আছে বলে তো জানি না। আপনার স্ত্রী কোথায়?”
“ আমার সময় নেই। আর তাছাড়া আমি এখন শহরের বাহিরে। ওর মায়ের কবরের পাশে ফেলে দিয়ে আসো ওর লাশ। কেউ না কেউ দেখে তুলে কবর দিয়ে দিবে । তা না হলে ওভাবেই থাকুক পড়ে। ”
ইব্রাহিম চমকালো। প্রেমার মা মা-রা গেছে! কবে মা-রা গেলো! ইব্রাহিম তো একবার খোঁজ নিয়ে জেনেছিল মহিলার চিকিৎসা হচ্ছে। তাহলে কি তখন মা-রা গিয়েছিল? আর বাঁচে নি!

“ ওর আম্মার কবর টা কোথায়?”
“ আজিমপুরে। আর তোমরা ওকে কোথায় পেলে? মরলো তো মরলো,তাও আবার তোমাদের কাছে গিয়েই মরলো!”
“ সেটা আপনার না জানলেও চলবে। আপনার হাতে সময় খুবই কম। আপনার মতো অমানুষ দের কে গলা টিপে মে’রে ফেলা উচিত। সন্তান জন্ম দেন ঠিকই কিন্তু সেই সন্তানদের জন্য বাপ হওয়ার চেয়ে হয়ে উঠেন অভিশাপ, পাপ। ভালো থাকুন। শুনেছি আপনার আর কোনো ছেলেপেলে নেই। শেষ বয়সে মৃত্যুর সময় মুখ অব্দি পানি পাবেন তো? তেষ্টায় না আবার ম’রে যান। ”
ইব্রাহিমের মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গেছে। সোলেমানের পাশে এসে দাঁড়াতেই সোলেমান উঠে যেতে যেতে বলল-

“ আমি এখন আসছি। ”
“ প্রেমার বাবা অস্বীকার করে দিছে। প্রেমার দাফনকাজ করতে পারবে না। তার সময় নেই। বলে দিয়েছে কবরস্থানে লাশ টা ফেলে আসতে। কেউ না কেউ দেখে কবর দিয়ে দিবে। আর তা না হলে এভাবেই ফেলে রাখতে বলছে। ”
দরজা অব্দি গিয়ে সোলেমানের পা থেমে গেলো। রতন শিকদার এমন কথা বলেছে! এক বাপ তার মেয়ের মৃত্যুর কথা শুনে এভাবে বলল! যতই খারাপ হোক বাপ,তাই বলে কি একটুও কষ্ট একটুও খারাপ লাগবে না! সৎ বাপ তো না আর।
“ এমন টা কেনো বললো? ”
“ জানি না। উনার কথার টোন শুনে মনে হলো মেয়ের মৃত্যুতে তিনি বেশ স্বস্তি পেয়েছেন। ”
“ ওর মা’কে জানিয়েছিস?”
“ ওর আম্মা বেঁচে নেই। মহিলার কবরের পাশেই ফেলে আসতে বলছে আজিমপুর। ”
“ এখন তাহলে প্রেমার দাফন কাফনের কাজ করবে কে?”
ইব্রাহিম ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো। এটা কেমন কথা বললো সোলেমান? প্রেমার দাফন কাফনের কাজ কে করবে মানে! তারা কি করতে পারে না এই ব্যবস্থাটা? তাদের কি সেই সামর্থ্য নেই যে একটা মৃ’ত মানুষের দাফন কাফনের ব্যবস্থা তারা করতে পারবে না!

সোলেমান নিজেও হতভম্ব হয়ে গেলো এ কথা বলে। কিভাবে বের হলো এই কথা! মস্তিষ্কে সংঘর্ষ বাঁধছে বারবার। একদিকে সদ্য বাবা হওয়ার সংবাদ, অন্য দিকে প্রেমার এই অবস্থা! আবার জরুরি মিটিং গুলো ফেলে এসেছে। সেখানেও হয়তো একটা গ্যাঞ্জাম লেগে গেছে। যদিও মিটিং এর গ্যাঞ্জাম নিয়ে সোলেমান এক ফোঁটাও ভাবছে না। এখন একটা মানুষের ব্রেইন কত দিকেই বা ছুটবে? জীবন তাকে সবসময় এমন পর্যায়ে এনে কেনো ফেলে! যেখানে তাকে প্রতিবার দুটো অপশনের ভেতরে একটা কে চুজ করতে হয়!
এই যেমন মেহরিনের জন্মদিন, প্রিয়তমাদের জন্মদিন নিয়ে তাদের প্রিয়তমদের কত কল্পনাজল্পনা থাকে। অথচ এই দিনে সোলেমানের বাবার মৃত্যু বার্ষিকী। সোলেমান ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে। তার বাবার কবর জিয়ারত করতে ব্যস্ত থাকে। অথচ সোলেমান চায় তার প্রতিটি দিন মেহরিন নামক রমনী টাকে দিতে। কিন্তু বাস্তবতা তাকে বারবার ভিন্ন কিছু দেয়।

প্রেমার দাফনকাফনের ব্যবস্থাটা সোলেমান রাই করলো। প্রেমার তো কেউ নেই পৃথিবীতে। সে মরলে তার দাফন কাফন হতো কি না এ নিয়েও প্রেমা মাঝেমধ্যে সংশয়ে থাকতো। শেখর রা জীবনেও দিত না একটা সুস্থ দাফন। হয়তো কোনো জঙ্গলে নিয়ে ফেলে আসতো তার দেহ টা। আর তা না হলে কোনো নরখাদক কে দিয়ে দিত আহার করার জন্য। সেজন্যই বোধহয় আল্লাহ তায়ালা প্রেমার মৃত্যু টা সোলেমান দের কাছে এনেই দিয়েছে। অন্তত একটা সুন্দর শেষ যাত্রা না হোক,সুস্থ ভাবে কবর অব্দি তো যেতে পারবে সব নিয়ম মেনে এটাই বা কম কিসে?
এরমধ্যে ইব্রাহিম আবার কোথা থেকে যেন একটা ফুটেজ এনেছে। সোলেমানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল- প্রেমা গতকাল নিবাসে এসেছিল জানিস এ বিষয়ে?”

সোলেমান চমকালো এমন কথা শুনে। তার চমকানো দেখে ইব্রাহিম বুঝলো জানে না সে। ইব্রাহিম ফুটেজ টা তাকে দেখতে বলে চলে গেলো হসপিটালের সব ফর্মালিটির কাজ শেষ করতে।
সোলেমান চেক করে দেখলো এটা সুলতান নিবাসের বাহিরের সিসিটিভির ফুটেজ। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বোরকা নিকাব পড়া প্রেমা এসেছিল। দারোয়ান কে বারবার বলছিল সোলেমান কে ডেকে দিতে। চাচাকে ডেকে দিতে। দারোয়ান কাউকে ফোন করলো। প্রথম ২ বার রিসিভ হলো না। তারপরের কল টা রিসিভ হলো। কারো সাথে কথা বললো। কথা বলা শেষে দারোয়ান প্রেমাকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দিলো। প্রেমা চলে যাওয়ার ২ মিনিট পরই দেখা গেলো সোলেমান বেরিয়ে গেলো গাড়ি নিয়ে।
সোলেমানের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, প্রথম ফোনটা হয়তো সোলেমান কে করেছিল। চট্টগ্রাম পৌঁছে খেয়াল করেছিল। কল আর ব্যাক করে নি সে। কিন্তু ২য় ফোনটা কাকে করেছিল দারোয়ান?
সোলেমান চুল খামচে ধরলো নিজের মাথার। ফোনটা কেনো সে ধরলো না তখন! জানতে তো পারতো কেনো এসেছিল এতগুলো বছর পর প্রেমা তার কাছে। আর একটু আগে কেনো সে বের হলো না!
ইব্রাহিম আসতেই সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-

“ দারোয়ান আমাকে একবার ফোন করেছিল। আমি খেয়াল করি নি তখন। কিন্তু ২য় ফোন কাকে করেছিল জানিস?”
“ হু। ”
“ কাকে?”
“ চাচা কে। চাচাই তাড়িয়ে দিছে প্রেমা কে। আমি খবর নিয়েছিলাম প্রেমাকে হসপিটালে ভর্তি করানোর পরই। ও শেখরের বিষয়ে কিছু জানে। ও বারবার বলছিলো মেয়ে গুলো কে বাঁচাতে। শেখরের কোনো খারাপ ব্যবসা আছে হয়তো। যদি চাচা তাড়িয়ে না দিত প্রেমা কে। তাহলে হয়তো মেয়েটা আজ বেঁচে থাকতো। ”
সোলেমান চাচার নাম শুনে ফোঁস ফোস শব্দ করে শ্বাস ফেলতে লাগলো ঘনঘন। হ্যাঁ চাচার প্রেমাকে শুরু থেকেই অপছন্দ। তাই বলে সাহায্য চাইতে আসা কাউকে এভাবে গেট থেকে ফিরিয়ে দিবে!একটু তো শুনতো মেয়েটা কেনো এসেছে। যেখানে সুলতান নিবাসের গেটে একটা কুকর আসলে তাকে খাবার না দিয়ে খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। সেখানে চাচা প্রেমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিলো! প্রেমার এই মৃত্যুর জন্য কি তাহলে অজান্তে সোলেমান নিজেও দায়ী! মাথা ভনভন করতে লাগলো। ইব্রাহিম পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো।
“ তুই শান্ত হ। তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। আমি দেখছি সব। তুই শান্ত হ আগে। প্রেমার কাফনের কাজ সম্পূর্ণ হইছে। এবার দাফনকাজ করতে হবে আমাদের। বি স্ট্রং। ”

মেহরিন নিবাসে আসার পর সবাই এক এক করে দেখে যাচ্ছে আর কংগ্রেস জানাচ্ছে। এজওয়ান বিষন্ন মুখে মেহরিন কে কংগ্রেস জানাতেই মাহি পাশ থেকে বলে উঠলো-
“ আপনি খুশি হননি যে চাচা হতে যাচ্ছেন? ”
মেহরিন তাকালো এজওয়ানের মুখের দিকে। এজওয়ান কটমট করে তাকায় মাহির দিকে। শালির বেটি মেহরিনের সামনেই জিজ্ঞেস করছে। অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। মেকি হেঁসে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ভাবি এই ছাগলের কথা সিরিয়াসলি নিয়েন না। আমি মেলাআআআআ খুশি। এত খুশি যে দেখুন চার আলিফ টেনে প্রকাশ করছি। আমার ভাইজান বাপ হবে আর আমি এজওয়ান সুলতান অখুশি থাকবো কোন শালির বেটি ভাবে এই কথা? তার কপালে ঝাঁটার বাড়ি। আপনি রেস্ট নিন ভাবি। আমি বরং আসি।।”
এজওয়ানের পেছন পেছন মাহিও চলে গেলো। রুমাইসা দৌড়ে এসে এজওয়ানের করা সব কাহিনী গুলো খুলে বলল। সব শুনে মেহরিন হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারলো না।
এই এজওয়ান ছেলেটা এমন কেনো! সব সময় বেশি বেশি বুঝে বসে থাকে। তারপর নিজেই বাঁশ খায়। মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-

“ তোমার কি উনার সাথে কথা হয়েছে আপু? শুনেছি উনি আসছেন। কিন্তু কোথায়? এখনও আসছে না যে। ফোনও তো রিসিভ করছে না। জানো কিছু?”
“ ভাইয়া কে আমিও কল দিছিলাম। কিন্তু রিসিভ হয় নি। হয়তো এখনও রাস্তায় আছে। চিন্তা করো না। এসে যাবে। ”
মেহরিন মন কে শান্ত করার চেষ্টা করলো। কিন্তু কেনো যেন শান্ত হচ্ছে না। বারবার অস্থির অস্থির লাগছে। উনি সহিসালামত নিবাসে আসুক জলদি।
মেহরিন রুমে এসে জামাকাপড় বদলে পাতলা সুতিজামা পড়ে নিলো। তার পড়ার টেবিলের চেয়ার টা টেনে বসলো। বেডে থাকা ফোনটা তখন বেজে উঠলো। মেহরিন তাকিয়ে দেখলো বাড়ি থেকে ফোন করেছে। মেহরিন রিসিভ করে কানে নিলো । ফোনের ওপাশ থেকে তার আব্বার গলার আওয়াজ ভেসে আসলো। অস্থির গলায় বলছে-

“ আম্মা এখন শরীর কেমন আছে তোমার? বেশি খারাপ লাগছে কি? তোমার আপা আমারে যাইতে দিলো না আজ। বললো কাল যাইতে। খুব কি খারাপ লাগছে? বাবা আসি তাহলে এখন?”
মেহরিনের বুকটা শান্ত হলো বাবার কন্ঠস্বর শুনে। পৃথিবীতে এই একটা মানুষ যে কি না কখনো মেহরিন কে অপেক্ষা করায় না বরং মেহরিনের জন্য সর্বদা অপেক্ষা করে।
“ আব্বা শান্ত হও। আমার শরীর এখন ভালো। কোনো কষ্ট হচ্ছে না। আর আপা ঠিকই বলছে। তুমি এই রাত করে এসো না ঢাকা। ধীরেসুস্থে কাল এসো। তোমার আম্মাটা এখন ভালো আছে। চিন্তামুক্ত হও। ”
“ যাক আলহামদুলিল্লাহ। আমার মাইয়াটা ভালো আছে। আম্মা তুমি কিছু খাইবা? কিছু খাইতে ইচ্ছে করছে? এই সময় অনেক কিছু খাইতে ইচ্ছে করে। তুমি কও। আমি আসার পথে নিয়ে আসবো। তুমি শুধু বাবারে হুকুম করবা আম্মা। ”

মেহরিন মৃদু হাসলো।
“ কিচ্ছু লাগবে না আব্বা। তুমি শুধু আসো খালি হাত পায়ে। তোমাকে দরকার আমার। কতদিন তোমায় জড়িয়ে ধরি না বলো তো? আব্বা শরীর কেমন আছে তোমার? ভালো তো?”
“ দেখছো ফোন দিছি মাইয়ার শরীরের খোঁজ খবর নিতে। মাইয়া উল্টো আমার শরীরের খবর নিচ্ছে। আম্মা আমি ভালো আছি। ”
সানজিদা বেগম ফোন কেঁড়ে নিলেন। একাই শুধু মেয়ের সাথে কথা বলছে। তাকেও তো বলতে দিতে হবে।
“ মেহরিন মা আমার, সত্যি কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো?”
“ না মা কষ্ট হচ্ছে না। ”
“ তোর শ্বশুর বাড়ির সবাই গেছে ঢাকা?”
“ হ্যাঁ আসছে। ”
“ জামাই কই? একবারও ফোন দিলো না। ব্যস্ত খুব?”
পাশ থেকে মোতালেব ভুঁইয়া বিরক্তিকর মুখে বলল-
“ আহ্ মেহরিনের মা তুমিও না! জামাই ব্যস্ত হবে না? বাপ হতে যাচ্ছে। ”
“ হু সেটাও ঠিক। মেহরিন জানিস তোর বাপ নানা হচ্ছে শুনে কি করছে। ”
“ কি করছে?”

“ হাতে টাকা ছিলো না নগদ। সেজন্য তোর বাপ সেই ব্যাংকে গিয়ে তিনঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর টাকা তুলে পুরো এলাকায় মিষ্টি বিলাইছে।”
মেহরিনের মুখ গম্ভীর হয়ে আসলো। এমন পাগলামি কেউ করে? কতগুলো টাকা খরচ করলো তার বাপ।
“ এত টাকা খরচ করার কোনো মানে হয় মা আব্বার? টাকা গুলো এভাবে খরচ না করে কি আব্বা তার শরীরে পেছনে ব্যয় করতে পারতো না?”
মোতালেব ভুঁইয়া কেড়ে নিলো ফোন।
“ আমার সব টাকা তো তোমাদেরই। তোমাদের জন্যই তো জমাইছি। তোমাদের পেছনে ভাঙবো না আমি তাহলে কার পেছন ভাঙবো?”
“ তোমার জন্যও কিছু ভাঙো। আমাদের দিতে দিতে তো তুমি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছ। তুমি শুধু দোয়ায় রাখো আমাদের, আর কিচ্ছু লাগবে না।”
“ দোয়া সবসময়ই করি আম্মা। ধরো বোনের সাথে কথা কও। গাল ফুলিয়ে বসে আছে সেরিন। ”
মেহরিন ফোনে আবার কল আসতে দেখে তাকালো ফোনের দিকে। সোলেমানের নম্বর টা দেখে মুহুর্তে হাসি ফুটলো মুখে। ফোনটা আবার কানে নিয়ে বলল-

“ আব্বা আমি একটু পর ফোন দিতেছি। উনি ফোন দিচ্ছে।”
কেটে দিলো ফেন। মোতালেব ভুঁইয়া সেরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ কেটে দিছে ফোন। জামাই বলে ফোন করছে। পরে দিবে ফোন। ”
মেহরিন সোলেমানের ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে দ্রুত গলায় বলল-
“ আসসালামু আলাইকুম। কোথায় আপনি? আর কতক্ষণ লাগবে ফিরতে?”
সোলেমান খাটিয়ার দিকে তাকালো। যেটা কেবলই মসজিদ থেকে আনা হইছে। সোলেমান নরম স্বরে আস্তে করে সালামের জবাব দিলো। স্বামীর এমন গলা শুনে মেহরিনের কপাল কিঞ্চিৎ কুঁচকে আসলো। এমন গলায় সোলেমান একমাত্র কথা বলে যখন সিরিয়াস কিছু হয়।

“ আপনার কি কিছু হয়েছে? গলার স্বর এমন শোনাচ্ছে কেনো?”
“ মেহরিন…আমাকে কি আর দুটো ঘন্টা সময় দিতে পারবে? আমি এখনই ফিরতে পারছি না। একটা কাজে আঁটকে গেছি। কষ্ট পাবে খুব? মাত্র অল্প কিছু সময় দাও। ”
“ সিরিয়াস কিছু হয়ে থাকলে আপনার যত সময় লাগে আপনি নিন। আমার সমস্যা নেই। কি হয়েছে শুধু সেটা বলুন। চিন্তা হচ্ছে খুব। ”
“ উঁহু চিন্তা করো না। এই শরীরে চিন্তা করা উচিত না। আমি ফিরে তারপর সবটা বলি?”
“ আচ্ছা সমস্যা নেই। ”
“ আর বাবু কে সরি বলে দিও। বাবা সময় মতো আসতে পারে নি তার সাথে দেখা করতে। বাড়ি ফিরে তার সব অভিযোগ শুনবো আমি। দুটো ঘন্টা শুধু তাকে ম্যানেজ করে নাও। বাবা চলে আসবে ততক্ষণে। ”
“ আচ্ছা, আপনি কাজ সেরে আসুন। আমরা অপেক্ষা করবো ততক্ষণ। কোনো সমস্যা হবে না আমাদের। ”
“ অ্যাম সরি। ”

“ এই সরি কেনো বলছেন। আপনি তো আসবেন বলেছেন। আমার একটুও খারাপ লাগছে না। বরং দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো আপনি ফোন ধরছিলেন না বলে। এখন চিন্তামুক্ত থাকতে পারবো। ”
“ Thank you so much. Congratulations to us,we’re going to be parents! ”
মেহরিন কিঞ্চিৎ হাসলো।
“ রাখছি তাহলে। দ্রুত কাজ সেরে ফিরুন।”
“ হু। ”
মেহরিন কেটে দিলো ফোন। কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে এখন স্বামীর সাথে কথা বলে। ওদিকে আপুও নাকি রাগ করে বসে আছে। মেহরিন ফোন করলো বোন কে।
সোলেমান ফোনের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিলো। যেতে পারছে না সেজন্য ফোন করলো। নইলে মেয়েটা দুশ্চিন্তা করবে। আর সোলেমান চায় না এই সময়ে বউ তার দুশ্চিন্তা করে নিজের আর বাচ্চার জীবন ঝুঁকিতে ফেলুক।

প্রেমার শরীরের এমন অবস্থা ছিলো যে তার মৃত্যুর পর শেষ গোসল তো দূরের কথা তায়াম্মুম টাও করা সম্ভব হয় নি। কারন শরীরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্থ ছিলো না। চামড়া নেই। সব পুড়ে গেছে। মুখের ও যাচ্ছে তাই অবস্থা। অথচ এই মুখটা দেখলে আগে যে কোনো পুরুষের এক দেখাতেই পছন্দ করে ফেলার মতো সৌন্দর্য্য ছিলো। শরীরের ব্যান্ডেজ সমেতই প্রেমার আগুনে দগ্ধ হওয়া দেহ টা কাফনে মুড়ে হসপিটালের পাশের মসজিদের মাঠে প্রেমার জানাজার নামাজ পড়ানো হয়। তবে তার জানাজায় তেমন মানুষ হয় নি। এত রাত হয়ে গেছে। তারপর আবার আকাশ টাও মেঘলা হয়েছে। মসজিদে থাকা কয়েকজনা মিলেই জানাজা পড়া হয়েছে। সোলেমান ইব্রাহিম দু’জনই পড়েছে। তারপর প্রেমার দেহ টাকে আজিমপুর কবরস্থানে আনা হয়। হ্যাঁ সোলেমান ইব্রাহিম দুজনই প্রেমার খাটিয়ার ভার বহন করেছিলো।
ইব্রাহিম জানালো এখানে প্রেমার আম্মার কবর আছে। সোলেমান তাকিয়ে দেখলো। রাতের অন্ধকারে কবর গুলো দেখতে ভয়ংকরই লাগে। তার উপর আকাশ টা করেছে মেঘলা। ঝড় বৃষ্টি হতে পারে। অথচ গতকাল যখন প্রেমা সৃষ্টি কর্তার কাছে ঝড় বৃষ্টি বাতাসের আবদার করেছিল। তখন তো ঝড় বৃষ্টি বাতাস কোনোটাই হলো না। তাহলে আজকে হওয়ার কি মানে?

অসংখ্য কবর এখানে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কবরস্থান বলে কথা। কবরস্থানে কথা বলে রেখেছিল ইব্রাহিম। তারা প্রেমার মায়ের কবরস্থান খুঁজে তার পাশে প্রেমার কবর খুঁড়ে রেখেছে। কখনো দেখা হয় নি সোলেমানের প্রেমার আম্মাকে। মহিলা কিভাবে মরেছে সেটাও জানে না। সোলেমান ইব্রাহিম সহ আরো দু’জন মিলে প্রেমার দেহটা কে কবরে নামালো। প্রেমার মুখ কাফনে মোড়ানোর পর আর সোলেমানের দেখা হয় নি। নিজ হাতেই মাটি ঠেলে দিলো কবরে। শরীরে সেই সময় মাটি লেগে গেছে।
প্রেমা এখন নিশ্চয়ই খুব শান্তি পাচ্ছে? তার মায়ের পাশেই তাকে শায়িত করা হলো। মায়ের বুকে কি এতক্ষণে মেয়েটা আছড়ে পড়ছে গিয়ে? তার সন্তান দুটো কি তাকে দেখা মাত্রই দৌড়ে ছুটে এসেছে? প্রেমা তাদের জড়িয়ে ধরে খুব আদর করছে নিশ্চয়ই? মায়ের সাথে গল্প জুড়ে দিছে মেয়েটা? সে কি সুখ পাচ্ছে সুখ?
মাটি দেওয়া শেষে সোলেমানের কি যেন একটা হলো বসে রইলো কবরের পাশে। আর জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগলো। হাসফাস লাগছে। সে বেরিয়ে যেতে চায় কবরস্থান থেকে। অথচ শরীর সাই দিচ্ছে না। অসার হয়ে আসছে। কবরস্থানে আসলেই সোলেমানের এমন হয়। আজও ব্যতিক্রম নয়। ইব্রাহিম হুজুরের সাথে কথা বললো কবর থেকে কিছুটা দূরে। তখন খেয়াল করলো সোলেমান কেমন এলোমেলো ভঙ্গিতে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কবরের দিকে।

ইব্রাহিম ফোন বের করে সময় দেখলো। রাত বাজে দেড় টা। এবার বাড়ি ফেরা উচিত তাদের। কাল না হয় আবার আসবে। কবরের চারিপাশে বেড়া দিতে হবে।
ইব্রাহিম গিয়ে তেরপল টা দিয়ে প্রেমার কবর টা ঢেকে দিলো। ঢেকে না দিয়ে গেলে বৃষ্টির হলে সব ধুয়ে গড়িয়ে যাবে। শেষে তেরপলের সাইড দিয়ে ইটা দিয়ে ভাড়া দিলো। তারপর এসে সোলেমানের কাঁধে হাত রাখতেই সোলেমান চমকে উঠলো। তড়িঘড়ি করে বসা থেকে উঠে বলল-
“ আমাকে যেতে হবে। যেতে হবে আমাকে। আমি আর এখানে থাকতে চাই না। ”
“ হু চল। ”
সোলেমান হাঁটা ধরলো। তীব্র এক বাতাসের সাথে ভেসে আসলো এক গলার স্বর। মনে হলো প্রেমা বলল-

দাহশয্যা পর্ব ৮৬ (৩)

“ এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে সোলেমান? ”
সোলেমান হাঁটতে হাঁটতে অজান্তেই বলল-
“ হুমম। সময় নেই আর।”
“ আমার জন্য তোমার কবেই বা সময় ছিলো সোলেমান? সেদিনও ছিলো না। আর আজও নেই।”
সোলেমান চকিতে পেছন ফিরে তাকালো। মৃ’ত মানুষ কখনও কথা বলে? না বলে না। ভ্রম এটা। সোলেমান আর ফিরে তাকালো না পেছনে। চলে গেলো মেহরিনের কাছে।

দাহশয্যা পর্ব ৮৭ (২)