দাহশয্যা পর্ব ৮৭ (২)
Raiha Zubair Ripti
নিবাসের বসার ঘরে থমথমে নীরবতা বিরাজমান। সবার দৃষ্টি আটকে আছে টিভির স্ক্রিনে। গতকাল রাতে রাজধানী তে ভোর রাতে প্রকাশ্যে এক নারীকে আগুনে পু’ড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। টিভির স্ক্রিনে সিসিটিভি ফুটেজ। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শরীরে আগুন নিয়ে এক নারী ছটফট করছে যন্ত্রণায়। মেহরিন বেশিক্ষণ সেটা দেখতে পারলো না। হাসফাস করতে লাগলো। আগুনে পুড়ছে পুরো শরীর! কি যন্ত্রণা টাই না হচ্ছিলো ঐ মেয়েটার। চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে এখনও কানে। আল্লাহ আর মা কে সমানতালে ডেকে যাচ্ছিলো মেয়েটা। কি করুন হয়ে বলছে জ্বলে যাচ্ছে, আমি ম’রে যাচ্ছি,আল্লাহ মেঘ দাও, বৃষ্টি দাও,বাতাস দাও। মেহরিনের দম আঁটকে আসলো। রুমে চলে আসলো তৎক্ষনাৎ। ঢকঢক করে পানি খেলো পুরো এক গ্লাস। এসির পাওয়ার টা বাড়িয়ে দিলো রিমোট দিয়ে। পড়নের ওড়না টা বিছানার এক পাশে রেখে গা এলিয়ে দিলো বাতাসে। এক হাত পেটের উপর। চোখ সবে বুঁজে আসবে এমন সময় হুট করে দরজা খোলার শব্দে চোখ মেলে তাকালো। সোলেমান এসেছে। মেহরিন উঠে বসলো। সোলেমান তার বা হাতে থাকা কোট টা সোফায় ফেলে এলোমেলো পায়ে দ্রুত হেঁটে মেহরিনের কাছে আসলো। ফ্লোরে হাঁটু গেঁড়ে বসে অপরাধীর ন্যায় বলল-
“ খুউব সরি লক্ষীটি । আমি আসতে পারি নি সময় মতো। অপেক্ষা করিয়েছি। খুউব কষ্ট পেয়েছো নিশ্চয়ই? ”
মেহরিন ভরকে গেলো।
“ কষ্ট পাবো কেনো আমি? কাজ ছিলো বিধায়ই তো আসতে দেরি হলো। আর আমি জানি আপনার উপর দিয়ে কেমন চাপ যায়। সারা রাত ড্রাইভ করে চট্রগ্রামে গেছেন। আবার এই নিউজ শুনে ছুটে চলে আসছেন ড্রাইভ করে। আপনি না আসলেও আমি তেমন একটা খারাপ বোধ করতাম না। আপনিও তো মানুষ। কোনো যান্ত্রিক রোবট থোরি না। ”
সোলেমান মেহরিনের পেটের দিকে তাকালো। এই ছোট্ট পেটে তাদের অংশ আছে! সোলেমান পেটের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ চ্যাম্প নিশ্চয়ই রেগে আছে বাবার উপর? একটু ছুঁয়ে আদর করে দেই?”
মেহরিন হাসলো।
“ অনুমতি নেওয়ার কি আছে? আপনার আর আমার মিলে আমাদেরই তো অংশ। ”
সোলেমান হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গিয়েও থেমে গেলো। মেহরিন ভ্রু কুঁচকালো।
“ কি হলো? থেমে গেলেন যে?”
সোলেমান হাতের দিকে তাকালো। তারপর নিজের দিকে।
“ মাটি লেগে আছে। অপরিষ্কার আমি। তোমাদের এভাবে ছুলে তোমরাও নোংরা হয়ে যাবে। জীবাণু ছড়াবে। আমি ধুয়ে আসি আগে বরং?”
মেহরিন তাকলো সোলেমানের হাতে আর শরীরের দিকে। এতো মাটি কেনো লেগে আছে?
” আচ্ছা যান ফ্রেশ হয়ে আসুন আগে। ”
সোলেমান ধীর পায়ে এগিয়ে আলমারি থেকে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে ট্যাব ছেড়ে দিলো। সাথে সাথে প্রেমার কবরের মাটি গুলো ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যেত লাগলো সোলেমানের শরীর থেকে। সোলেমান বডি ওয়াশ দিয়ে ডলে ডলে শরীর পরিষ্কার করতে লাগলো। একটুও যেন মাটি না থাকে। জীবানু ছড়াবে তা না হলে মেহরিনের শরীরে। এই শরীরে,এই বুকে, এই বাহুতে মাথা রেখে জড়িয়ে না ধরলে মেয়টার যে ঘুম হয় না আবার। ডলতে ডলতে শরীরে চামড়া লাল হয়ে গেলো। আয়নায় দেখলো একবার। মনে হচ্ছে এলার্জি উঠেছে।
সোলেমান তোয়েলা দিয়ে ভেজা শরীর মুছে শুকনো কাপড় পড়ে বেরিয়ে আসলো। রুমে পা রাখতেই দেখলো মেহরিন খাবার নিয়ে এসেছে। সোলেমান ভেজা মাথা মুছতে মুছতে বলল-
“ তুমি আনতে গেলে কেনো? এই শরীরে উঠা নামা করা ঠিক না। আমরা নিচের ফ্লোরে শিফট করে যাব কেমন? সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করতে হবে না তাহলে আর। ”
মেহরিন খাবার টা টেবিলের উপর রাখলো।
“ সবে মাত্র দেড় মাস সুলতান সাহেব। আপনি এমন ভাবে বলছেন মনে হচ্ছে আমি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ”
“ দেড় মাস হোক আর এক মাস হোক বা নয় মাস। সতর্কতা অবলম্বন শুরু থেকেই করা উচিত। কোনো রিস্ক নিব না তোমাদের নিয়ে আমি। ”
“ বেশ বেশ। খাবার টা খেয়ে নিন। ”
সোলেমান বিছানায় বসলো।
“ তুমি খেয়েছো?”
“ না খাইয়ে রেখেছে আমাকে মনে হয় আপনার? আম্মা আপু একটু পরপর এটা ওটা নিয়ে এসে খাইয়ে দিয়ে গেছে। আপনি নিশ্চিন্তে খান। ”
সোলেমান সেই যে গতকাল রাতে খেয়ে বেরিয়েছিল আর খাওয়া হয় নি।
“ আমাকে খাইয়ে দিলে তোমার কষ্ট হবে? এই হাতে খেতে ইচ্ছে করছে না। ”
“ একটুও না। ”
মেহরিন হাত ধুয়ে চেয়ার টেনে সোলেমানের সামনে বসে খাইয়ে দিতে লাগলো। খাওয়া শেষে সোলেমান ফ্লোরে বসে মেহরিনের পেটে আলতো করে হাত রাখলো। সাথে সাথে কেমন শীতল এক ঠান্ডা অনুভূতি শিরদাঁড়া দিয়ে বেয়ে গেলো। বাবা হওয়ার সুখ এত সুন্দর! এত ঠান্ডা, এত মিষ্টি একটা অনুভূতি! সোলেমান ক’টা চুমু খেলো মেহরিনের পেটে। তারপর পেটের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ক্যান ইউ হিয়ার মি, বেবি? অ্যা’ম সো সরি। তোমার আসার সংবাদ শুনে আমি সময় মতো আসতে পারি নি তোমার কাছে। সেজন্য খুব রাগ করেছো নিশ্চয়ই? প্লিজ ডোন্ট বি অ্যাংরি উইথ মি। পাপা লাভস ইউ। পাপার ভালোবাসার মানুষ বলতে তো তুমি আর তোমার মাম্মাম ছাড়া আর কেউ নেই। ”
মেহরিন সোলেমানের চুলের ভাজে হাত ডুবিয়ে দিয়ে বলল-
“ কম করে না হলেও ১০০ বার হয়তো সরি বললেন আসার পর। আপনার সন্তান আর আপনার সন্তানের জননী এবার সত্যি সত্যি রাগ করে বসবে। তখন হাজার বার সরি বললেও তাদের রাগ গলবে না। ”
সোলেমান কোমর জড়িয়ে ধরলো। পেটের সাথে মাথা ঠেকিয়ে বলল-
“ এই এত সুন্দর একটা সংবাদ শোনানোর জন্য তোমাকে আমি কিভাবে ধন্যবাদ জানাই বলো তো? পুরো এলাকায় কি মিষ্টি বিলানো হয়েছে? সবাই কি জানে আমি বাপ হচ্ছি?”
মেহরিনের মনে পড়ে গেলো এজওয়ানের কান্ড। শব্দ করে হাসতে লাগলো মনে পড়ার পর থেকে। সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো হাসির শব্দে।
“ হাসছো কেনো? মিষ্টি দেয় নি?”
মেহরিন হাসি থামিয়ে বলল-
“ হাসছি কেনো শুনবেন? এজওয়ান ভাইয়া কি করেছে জানেন?”
“ ঐ বেয়াদব আবার কি করেছে?”
“ আপনার ভাই পুরো এলাকায় মিষ্টি বিলিয়ে এসেছে। ”
“ জীবনে একটা কাজের কাজ করলো এই প্রথম। ”
“ আহা শুনুন না। কিসের মিষ্টি দিয়েছে জানেন?”
“ চাচা হওয়ায় নিশ্চয়ই? ”
“ না না। বাপ হওয়ার খুশিতে। পরে বাসায় এসে শুনে সে চাচা হচ্ছে। বেচারার মুখটা দেখার মতো ছিলো। আবার রাস্তার যত এতিম ছেলেপেলে ছিলো তাদের ও নিবাসে নিয়ে আসছিলো খাওয়াবে বলে। পুরো এলাকার জানে ভাইয়া বাবা হচ্ছে। ”
মেহরিন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবে এমন অবস্থা। সোলেমান তাকিয়ে দেখলো সেই হাসি। হাসলে কি সুন্দর লাগে। অথচ মেহরিন এভাবে প্রাণ খুলে উচ্ছ্বাস নিয়ে তেমন হাসে না।
“ পুরো কথা শুনে নি নিশ্চয়ই? ”
“ হু চাচা বলছে, আমি দাদু হতে যাচ্ছি। ব্যাস আর বাকি কথা শুনে কে। ভাইয়া ভেবে নিলো মাহি আপু হয়তো। ”
“ আধপাগল ছেলে একটা।”
“ তবে উনি অনেক ভালো। সহজ সরল। ”
সোলেমানের মুখ গম্ভীর হয়ে আসলো। ছোট করে শুধু বলল-
“ হু অনেক ভালো। ”
মেহরিন জড়িয়ে ধরলো সোলেমানের গলা। কোলের উপর বসে বলল-
“ আপনি বেশি ভালো। ”
“ কে বলে আমি ভালো? খুব খারাপ আমি। ”
“ আমি বলি। আর মেহরিন কিন্তু মিথ্যা বলে না কখনো হু।”
“ একটু কঠোর হতে পারো না আমাকে নিয়ে? শাসন করো আমাকে। একটু অবহেলা করলেই দিবে ধড়াম ধড়াম করে কটা চ’ড় গালে।”
“ আহারে চুমু খাওয়া গালে নাকি চ’ড় মারবো। বাই দ্যা ওয়ে কি কাজে আটকা পড়ে গেছিলেন? বললেন না তো? তখন যে বললেন ফিরে এসে বলবেন। ”
সোলেমানের গম্ভীর মুখটা আরো গম্ভীর হয়ে গেলো। একদম কালো মেঘের মতো বিষাদ ছেপে গেলো।
“ শুনতেই হবে। ”
“ আপনার ইচ্ছা। ”
“ রাগ বা খারাপ লাগবে না তো?
“ বলে তো দেখুন। ”
“ ভেবে বলছো তো?”
“ আপনি বলুন নির্দ্বিধায়। ”
“ প্রেমা কে তা তো জানো? ”
মেহরিনের নামটা কানে আসার সাথে সাথে চিনে ফেললো।
“ আপনার প্রাক্তন না? ”
“ হু। ”
“ কিছু হয়েছে? হুট করে তার কথা বলছেন যে? ”
“ প্রেমা ম’রে গেছে মেহরিন। ”
মেহরিনের মুখ দিয়ে ইন্না-লিল্লাহ বেরিয়ে আসলো। আশ্চর্যান্বিত গলায় বলল-
“ কিহ! কিভাবে! আর আপনিই বা জানলেন কি করে? ”
সোলেমান সবটা খুলে বলল। মেহরিনের কপাল কুঁচকে আসলো সব শুনে।
“ জানো মেহরিন আমি না প্রথমে চিনতে পারি নি প্রেমা কে। পুরো শরীর আগুনে পোড়া ছিলো। আর মুখটাও এসিডে ঝলসানো ছিলো। ইব্রাহিম বলায় চিনেছি। কেমন যে দেখাচ্ছিলো প্রেমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। ”
মেহরিনের গা কেঁপে উঠলো। কিছুক্ষণ আগেও তো দেখলো একজন কে পুড়তে।
“ ইশ,কিভাবে হলো এসব? এমন করুন,এমন জঘন্য মৃত্যু! ”
“ ওর স্বামী করেছে যতদূর জানি। বলেছিলাম না ওর স্বামী আমার বিরোধী দলের। অবৈধ কাজ করতো। ওটাই হয়তো প্রেমা জেনেছিল। সেজন্য আগুনে পু’ড়িয়ে মারলো। ”
“ ছি! কি নিকৃষ্ট লোক! আমার যতদূর মনে পড়ে আপনি বলেছিলেন প্রেমা আপু আপনাকে ঠকিয়ে শেখর নামের লোকটা কে বিয়ে করেছিল নিজ পছন্দে,ভালোবেসে। আগে জানতো না উনি খারাপ লোক!”
“ জানি না। ওর বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ভালোবেসে, জেনেশুনেই তো বিয়ে করেছে। তাহলে কেনো মারলো শেখর। ”
“ আপনার কি খারাপ লাগছে? আপনি কি ওখানেই ছিলেন এতক্ষণ? ”
“ আমার কি খারাপ লাগা উচিত মেহরিন? জানো ওর লাশ টা কেউ নিতে আসে নি। ওর বাবা কে ফোন করে বলা হলো মেয়ের লাশটা নিয়ে যেতে,দাফনের ব্যবস্থা করতে। ওর বাপ কি বললো জানো? বললো আমার সময় নেই। মরেছে ভালো হয়েছে। ওর লাশ টা ওভাবেই কবর স্থানে ফেলে দিয়ে এসো। ”
মেহরিন চমকে উঠলো এ কথা শুনে। এক বাবা নিজের মেয়ের মৃ’ত লাশ নিয়ে এভাবে বলতে পারলো!
“ উনার বাবা এমন কথা কেনো বলল! মেয়ের লাশটা নিতে আসেনি আর? উনার মা? কোনো আত্মীয় স্বজন?”
“ না আসে নি। বলেছিলাম না,ওর বাবা ওদের দেখতো না। প্রেমার আর কেউ নেই। ওর মা মা-রা গেছে অনেক আগে। যেটা আজ জানলাম। ”
“ তাহলে উনার দাফন কে করলো? দাফন হয়েছে তো? নাকি হয় নি? ”
সোলেমান নিজের দু হাত দেখিয়ে বলল-
“ এই হাত দিয়ে ওর দাফন সেরে এসেছি মেহরিন।”
মেহরিন তাকালো হাতের দিকে।
“ আমার সেজন্য দেরি হয়ে গেছে মেহরিন। নইলে বিশ্বাস করো আমি আরো আগে চলে আসতাম। ”
মেহরিন স্তব্ধ হয়ে গেলো। তার স্বামী নিজেও যে এক প্রকার থাকতে বাধ্য হয়েছে তা চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
একজন মৃত মানুষের দাফন করা ফরজ দায়িত্ব। আর সেটি যত দ্রুত করা যায়, ততই উত্তম। মানুষটা জীবনে পাপী ছিল কি না, না কি বিশ্বাসঘাতক ছিল সেটা মুখ্য নয়। মৃত্যুর পরে সে কেবল একজন মানুষ, আল্লাহর বান্দা।
মেহরিন ধীরে বলল-
“ আপনি যদি সেদিন চলে আসতেন, তাহলে হয়তো তার দাফনের কাজটাই হতো না। সে আপনার প্রাক্তন হতে পারে, কিন্তু সবার আগে সে একজন মানুষ। একজন মৃত মানুষ। তার পাশে কেউ ছিলো না। অন্তত আপনি তো ছিলেন।”
“ রাগ করলে না? ”
মেহরিন একটু থেমে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল-
“ রাগ করবো কেনো? যে জীবিত থাকতেই রাগ করি নি। তার মৃ’ত্যুর খবর শুনে রাগ করবো? রাস্তায় যদি কোনো অপরিচিত মানুষ আমার সামনে মৃত্যুবরণ করতো আমি কি উপেক্ষা করে চলে আসতে পারতাম? না, পারতাম না। যতটুকু সামর্থ্য থাকতো, ততটুকু তো করতামই। আর চেনা কেউ হলে তো আরও বেশি করতাম। কারণ মানবতা সম্পর্কের চেয়ে বড়। আপনি একজন মানুষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। হয়তো সম্পর্কের জায়গায় অনেক ক্ষত আছে, কিন্তু মানবতার জায়গায় আপনি হেরে যাননি। আর সেটাই আমার কাছে বড়। আপনি যদি তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাকে ওভাবে ফেলে রেখে চলে আসতেন তাহলে সবচেয়ে খারাপ বোধহয় আমারই লাগতো। ”
সোলেমান বাহ হাতে জড়িয়ে কাছে টেনে আনলো মেহরিন কে। মেহরিন স্বামীর বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলল-
“ জানেন আমি আজ নিউজে দেখছি একজন কে পুড়তে। অনেক আহাজারি করছিল। কিভাবে অসহায় হয়ে করুন গলায় বারবার আল্লাহ কে ডেকে মেঘ বৃষ্টির আবদার করছিলো। কেউ আসলো না তাকে সাহায্যা করতে! ”
সোলেমান ঘাড় বেঁকিয়ে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ও…ওটাই প্রেমা…”
মেহরিন চকিতে চমকে উঠলো। ওটা প্রেমা! কি করুন ছিলো আর্তনাদ গুলো!
“ ও জানো মৃ’ত্যুর আগে আমাকে একটা কথা বলে গেছে। ”
“ ক…কি?”
“ ও বার বার বলছিলো মেয়ে গুলো কে বাঁচাতে। ”
“ উনার মেয়ে? ”
“ না। ওর সন্তান আছে কি না তা তো জানি না। আছে? কি জানি। ইব্রাহিম হয়তো খোঁজ নিচ্ছে। ওর কোনো সন্তান থাকলে তো হয়তো বলতো। হয়তো এই মেয়ে গুলো কে বাঁচাতে বলেছে। ”
সোলেমান ছবি গুলো বের করে দেখালো। মেহরিন দেখলো ছবি গুলো। কয়েকজন কিভাবে মেয়েদের উপর অত্যাচার করছে।
“ এরা কারা? আর এটা কোথায়?”
“ মনে হচ্ছে কোনো যৌন পল্লী। ”
মেহরিনের চোখ বড় হয়ে আসলো। আর তখনই সোলেমানের ফোনটা বেজে উঠলো। সোলেমান তাকিয়ে দেখলো ইব্রাহিম করেছে ফোন। রিসিভ করলো। ইব্রাহিম জানালো—
“ কান্দাপাড়া পতিতালয়ে এসব অবৈধ কাজ করছে শেখর। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের উপজাতি, অসহায় দুঃস্থ মেয়েদের প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসতো। তারপর জোর করে এসব কাজ করাতো। প্রেমাকেও হয়তো সেখানেই নেওয়া হয়েছিল। ”
সোলেমানের কপালে দু ভাজ পরলো।
“ শেখর নিজের বউকে নিয়ে গিয়েছিল পতিতালয়! এত নিকৃষ্ট ঐ অধম!”
“ হুম। যেহেতু প্রমাণ আছে সেহেতু আমাদের দেরি করা মানে ঐ মেয়েদের জীবন কে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়া। শেখর হয়তো এতক্ষণে জেনে গেছে প্রেমার বিষয় টা। আর সে চুপ করে থাকবে না। পালাবে নিশ্চিত। ”
“ আনিসুল হক কে জানা। তার ফোর্স রেডি করতে বল। ”
“ ঠিক আছে রাখছি। ঘুমিয়ে পর তুই। ”
সোলেমান ফোন কেটে দিলো। মেহরিন তাকিয়ে রইলো মুখের দিকে। সোলেমান বুকে টেনে এনে বলল-
“ তুমি এসবে জড়িও না। চিন্তা করবে শুধু। আমি পরে সবটা জানাবো নিজে জেনে নেই। অনেক কিছুর হিসেব মিলছে না আমার। ”
মেহরিন সোলেমানের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল-
“ স্বামীরা এত খারাপ হয়! যে নিজের স্ত্রী কে পতিতালয় নিয়ে যায়, পুড়িয়ে হ’ত্যা করে! ”
“ খারাপ তো খারাপই। সে ছেলে হিসেবেও খারাপ,ভাই, স্বামী, বাবা সব হিসেবেই খারাপ। ”
“ উনার জন্য আমার খারাপই লাগছে। আচ্ছা উনি সত্যি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তো! মন বলছে আমরা যা দেখি, যা শুনি তার বাহিরের অন্য কোনো কাহিনি আছে। তা না হলে হুট করে আপনাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর উনি ওভাবে উনাকে বিয়ে করবেন! ”
“ জানি না ঘুমাও। ভোর হবার আগে একটু ঘুমিয়ে নাও। ”
ঘুমাও বললেই কি ঘুম চলে আসে? কত কি ঘুরপাক খাচ্ছে এই ছোট্ট মাথায়। মেহরিনের তার স্বামী কে নিয়ে চোখ বন্ধ করে এই বিশ্বাস টুকু এত দিনে হয়ে গেছে যে তাকে হাজারো রমণীর ভীড়ে ছেড়ে দিলে তার স্বামী তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে। তার কাছেই ছুটে আসবে। তার জীবনের সবটা জুড়ে এখন মেহরিন। হ্যাঁ সোলেমান বলেছিল-“ I will never forget my first love. ”
কাউকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসলে ওপর পক্ষের মানুষ যতই বিশ্বাসঘাতকতা করুক নিজের ভালোবাসা টা তো মিথ্যা ছিলো না। সেটা ভুলে যাওয়া মানে নিজের ভালোবাসার উপর প্রশ্নবিদ্ধ করা। পাস্ট কম বেশি সবারই থাকে। আর মেহরিন বিশ্বাস করে সোলেমান অতীত ধরে থেমে নেই। সে বর্তমান কে নিয়েই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রেমার হত্যার একটা সুষ্ঠু বিচার হোক। যেই মেয়ে মৃ’ত্যুর মুখেও অন্যদের বাঁচানোর কথা বলতে পারে সেই মেয়ে কি সত্যি এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল? মেহরিনের কাছে কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকছে। মনে হচ্ছে এর পেছনে অন্য কিছু আছে। যেটা বোঝা যাচ্ছে না।
রতন শিকদার ফোন করে শেখর কে জানালো প্রেমা ম’রে গেছে। তবে মরেছে গিয়ে সেই সোলেমানদের কাছে। কথাটা শোনার পর থেকেই শরীর জ্বলে যাচ্ছে শেখরের। শালি মরলো তো মরলো প্রাক্তনের কাছে গিয়ে মরলো! ঐ শালার ব্যাটা আবার সন্দেহ করে বসলে তো আরেক ঝামেলা। তার উপর এখানে প্রমাণ বলতে আছে কিছু ফাইল। শুধু কি ফাইল নিয়েই পালিয়েছিল প্রেমা! নাকি আরো কিছু ছিলো সাথে? আরো কিছু নিলেও সেগুলো কি সোলেমানের হাতে? শালার ইকবাল টাকেও তো মে’রে ভুল হলো। বাঁচিয়ে রেখে আরে টর্চার করলে হয়তো জানা যেত।
চিন্তায় মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে। শেখর পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল দিলো। ফোন রিসিভ হতেই শেখর বলল-
“ শুনেছো সব কিছু? এখন কি করবো? সোলেমান যা ডেঞ্জারাস, জানো তো। এই অব্দি এসে পড়বে না তো?”
“ আমি নজর রাখছি। আপনি প্রিপেয়ার্ড হয়ে থাকুন। সেই সাথে একটা সুখবর শুনুন। ”
“ এত দুঃসংবাদের মাঝে সুখবর কি আবার?”
“ সোলেমান বাপ হতে যাচ্ছে। ”
“ এখানে সুখবরের কি হলো আমার জন্য? ”
“ বসে বসে ভাবুন। রাখছি।”
ফোন কেটে গেলো। শেখর বুঝলো না। সোলেমান বাপ হচ্ছে তাতে শেখরের কি?
ইমন পেনড্রাইভ টা হাতে নিয়ে বসে আছে। কি আছে এতে জানার কৌতূহল হচ্ছে বটে তবে অন্যের জিনিস এভাবে দেখাটা কি ঠিক হবে? কিছু শিবির প্যানেলের ছেলেপেলে এসে বসলো ইমনের পাশে। হাতে পেনড্রাইভ দেখে বলল-
“ কিসের পেনড্রাইভ এটা ইমন ভাই?”
ইমন সেদিন রাতের ঘটনা টা খুলে বলল। একটা ছেলে ইমনের হাত থেকে পেনড্রাইভ টা খুলে নিয়ে ল্যাপটপে কানেক্ট করলো। ইমন বাঁধা দিতে চাইলো। কারো জিনিস এভাবে দেখাটা ঠিক না। ছেলেগুলো শুনলো না। দেখা যাক না কি আছে এতে। যার পেনড্রাইভ তার যদি কোনে এড্রেস থাকে তাহলে যোগাযোগ করে দেওয়া যাবে। হ্যাঁ এটা মন্দ কথা বলে নি। তারা চেক করতে করতে একটা ফাইলে ঢুকলো সেখানে অসংখ্য ভিডিও দেখা যাচ্ছে। তবে কিসের সেটা দেখে নি। একটা ভিডিওর ক্লিপে ঢুকে দেখলো একটা মেয়েকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে একটা রুমে নেওয়া হচ্ছে। তার কিছুক্ষণ পরই পুরুষ ঢুকে যাচ্ছে সেই রুমে। দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। তারপর চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে। মেয়েটা বারবার ছেড়ে দিতে বলছে এমন প্রায় ৩০-৩৫ টা ভিডিও। কিন্তু তাদের চোখ আঁটকে গেলো একটা ভিডিওর একটা লোকের ছবি তে। তারা চাওয়াচাওয়ি করলো একে ওপরের মুখের দিকে। তারপর ল্যাপটপ টা নিয়ে হেড অফিসে চলে গেলো। ইমন বুঝলো না। তাদের পেছন পেছন হেড অফিসে গেলো। প্যানেলের প্রধানের সামনে ল্যাপটপ টা রেখে বলল-
“ ভাই দেখুন বিএনপি মহসিন আলীর ছেলে এটা। মেয়েদের দিয়ে যৌন পল্লীতে খারাপ কাজ করায়।”
প্যানেলের প্রধান দেখলো ভিডিও টা। বিএনপি তো তাদের ও বিরোধী দল। আর বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রমান পাওয়া গেলে কেউই বসে থাকে না। তারাও থাকলো না। ইমন তার ফেসবুক একাউন্ট দিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রমান সমেত ভিডিও, শেখরের ছবি গুলো ভাইরাল করে দিলো। মুহূর্তের মধ্যে মিডিয়া জগৎ তোলপাড় হয়ে গেলো। কেউ বলছে ফেক,কেউ বলছে আওয়ামী লীগের চক্রান্ত। ইচ্ছে করে ফাঁসাচ্ছে বিএনপি কে নিচা দেখানোর জন্য। আবার কেউ বলছে এগুলো জামায়াতের প্ল্যান। নানান মুনির নানান মতের সৃষ্টি হলো।
ভিডিও টা চলে গেলো ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ে। সোলেমান নিউজ টা দেখে তাকে ফোন করে বলল-
“ আর প্রমাণ লাগবে? মিডিয়া তোলপাড়। শেখর পালানোর আগে ধরা চাই। নিজের স্ত্রী কে গত পরশু রাতে পু’ড়িয়ে হত্যা করেছে। আমি চাচ্ছি পুরো বিষয় টা আইনের মাধ্যমে হোক। আমি আমার নিয়মে করলে কিন্তু বডি খুঁজে পাবেন না। সাথে জবাবদিহিতা করার জন্য কিছু বলার মতোও থাকবে না। তখন সামলাতে পারবেন তো?”
“ ফোর্স রেডি আছে। ইতিমধ্যে তারা বের হয়েও গেছে। ”
“ গুড। আমি আসছি।”
সোলেমান সকালে মেহরিনের সাথে ব্রেকফাস্ট করলো। ব্রেকফাস্ট শেষে রেডি হলো। বের হওয়ার আগে বাড়ির প্রতিটি ম্যেড কে বলে গেলো কোনো কিছুর জন্য মেহরিন কে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে না হয়। তার দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকবে। যা চাইবে সাথে সাথে এনে হাজির করবে। পরিবারের সাথে কিছু গুরত্বপূর্ণ কথাবার্তা বললো মেহরিন কে নিয়ে। পুরো এলাকায় ফের মিষ্টি বিলাতে বলল। আর দুপুরের মধ্যে মেহরিনের বাবা মা-ও চলে আসবে। আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি যেন না হয়। পরিশেষে সব কিছুর ব্যবস্থা করে মেহরিনের কপালে গাঢ় এক চুম্বন একে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো। ফিরতে কিছুটা লেট হতে পারে।
মহসিন আলীর বাসার সামনে মিডিয়া আর আইনের লোকে ভরে গেছে। তাদের কানে খবরও এসে গেছে আগুনে পুড়তে দেখা ভিডিওর মেয়েটা এ বাড়ির বউ। তোপের মুখে পড়ে গেছে মহসিন আলী। তাকে পুলিশ আপাতত ধরে নিয়ে গেলো।
এদিকে শেখরের মাথায় হাত। মেয়ে গুলো কে নিয়ে পালানোর সময়টা অব্দি নেই। আর ফোনের ওপাশ থেকে জানালো গা ঢাকা দিতে আপাতত। মেয়েগুলোর চিন্তা ছেড়ে দাও। শেখর বাহিরে তালা মে’রে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেলো।
ডিজিএফআইয়ের সদস্য রা এখানে পৌঁছেই দেখলো আগুন ধরিয়ে দিছে বাড়িতে। ভেতর থেকে চিৎকারের আওয়াজ আসছে ভেসে। তারাতাড়ি তারা ফায়ারসার্ভিস কে কল করে ডেকে এনে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করলো।
পূর্ণা আর তার মেয়েকে রুমে বন্দী করে রেখে গেছে শেখর। বেচারির রুম অব্দি এখনও আগুন আসে নি। তবে বাহিরে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে বুঝলো খারাপ কিছু ঘটছে। দরজায় বার বার ধাক্কা দিতে লাগলো। মেয়েটাও কাঁদছে। কেউ এসে দরজা খুলে দিলো। আর কেঁদে কেঁদে ভয়ার্ত গলায় বলল- আগুন লেগেছে পূর্ণা। আমরা এবার বাঁচবো কি করে? ম’রে যাব আমরা! প্রেমা কি আর আসবে না?”
পূণা চমকে উঠলো। আগুন লাগিয়ে দিছে শেখর! মেয়েটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এই ছোট্ট প্রানটাও দগ্ধ হয়ে পুড়ে মরবে তার সাথে! আর তখনই আগুনের একটা অংশ এসে পড়লো কিছুদূরে ছুটতে থাকা একটা মেয়ের উপর। সাথে সাথে মেয়েটা চেঁচাতে চেঁচাতে পুড়তে লাগলো। পূর্ণা ছুটে যেতে চাইলো। পাশের মেয়েটা আঁটকে দিলো। অতো আগুনের মধ্যে এই মেয়েটা যাবে! সিমরান যে কোলে।
আগুনের তাপে শরীর ঝলসে যাওয়ার মতো অবস্থা। দিপা পূর্ণা কে নিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেলো।
এদিকে মনি দিকবিদিকশুন্য হয়ে গেছে। শেখর টা তাকেও তালাবদ্ধ করে রেখে পালিয়েছে। যার জন্য তার এই জীবন টা বিলিয়ে দিয়েছিল সেই শেখর তাকে এভাবে ধোঁকা দিলো! মৃত্যুর ভয় হচ্ছে মনির। এই মৃত্যুর ভয়ে এক এক করে তার সকল পাপের দৃশ্য গুলো মনে পড়ছে। একটা আগুনের ফলক এসে পড়বে গায়ে এমন সময় পূর্ণা এসে টেনে সরিয়ে নিলো। আকস্মিক এমন টানে মনি পড়ে যেতে যেতেও সামলে নিলো। ঘাড় বেঁকিয়ে পূর্ণা কে দেখে মনে পড়লো কত অত্যাচারই না করেছে সে এই পূর্ণার উপর সকলের উপর। আর সেই পূর্ণাই তাকে বাঁচাচ্ছে!
সোলেমান গাড়ি থেকে বের হয়ে দেখলো আগুন ততক্ষণে নিয়ন্ত্রণে চলে আসছে। তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ছে সদস্য রা। দু একজন কে টেনে টেনে বের করছে। কারো মৃ’ত দেহ। কারো আধপোড়া শরীর। সোলেমান এগিয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলো-
“ জীবিত নেই কেউ?”
“ মেবি আছে। ”
“ তাদের বের করুন আগে। তা না করে মৃত দের দেহ টানছেন! ”
“ করা হচ্ছে বের। ”
সোলেমান বাড়িটার দিকে তাকাতেই এবার দেখলো বেঁচে থাকা মেয়েদের বের করা হচ্ছে। একটা বাচ্চা মেয়েও আছে কোলে। মেয়েটা গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। ওর কিছু হয়েছে!
পূর্ণা মেয়েটাকে আঁকড়ে ধরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে দিপার সাথে বের হলো। তাদের পেছন পেছন আর ক’জন বের হলো। মনি বের হতে পারে নি। আগুনে তার শরীর পুড়ে গেছে। পূর্নার সাথে ৭-৮ জন বের হতে পেরেছে। তাছাড়া বাকি সবাই আগুনে পুড়ে আহত হয়েছে আর তা না হলে ম’রে গেছে। হয়তো কারো এখনও শ্বাস আছে। পূর্ণা বের হয়ে প্রশাসন কে দেখতে পেয়ে প্রেমা কে খুঁজতে লাগলো। প্রেমা নিয়ে এসেছে এদের নিশ্চয়ই? প্রেমাকে কি জানে ইকবাল ভাই আর নেই?
পূর্ণা হন্যে হয়ে প্রেমা কে চোখ দিয়ে খুঁজতে লাগলো। কেউ পাশ দিয়ে যেতেই প্রেমা জিজ্ঞেস করলো-
“ প্রেমা কোথায়? ও কে দেখছি না কেনো? প্রেমা নিয়ে এসেছে না আপনাদের? একটু ডেকে আনুন প্রেমা কে। কথা আছে। ”
সোলেমান এই নাম শুনে দাঁড়িয়ে গেলো। পেছন ফিরে দেখলো পূর্ণা কে।
“ প্রেমা! চিনেন আপনি তাকে?”
“ হু চিনি। ও কোথায়? একটু ডেকে আনুন না। আচ্ছা ও ঠিক আছে তো? শেখর ওর কিছু করে নি তো? সুস্থ আছে মেয়েটা? আর আপনি কে?”
সোলেমান থমথমে গলায় বলল-
“ আমি সোলেমান। ”
কথাটা শুনে পূর্ণা মুখ পানে তাকিয়েছিল। এটা সোলেমান! সেই সোলেমান! যাকে প্রেমা ভালোবাসতো!
“ আপনিই সেই সোলেমান! প্রেমার সোলেমান! প্রেমা কোথায়? ”
“ প্রেমা আর নেই। মরে গেছে। ”
কথাটা ধারালো সূচের মতো এসে বিঁধলো পূর্ণার কানে। প্রেমা ম’রে গেছে! দু পা পিছিয়ে পড়ে যেতে নিলে দিপা ধরে ফেললো। সিমরান কে কোলে নিতেই পূর্ণা অবিশ্বাস্য গলায় বলল-
“ না এ..এটা হতে পারে না। বলুন মিথ্যা ক..কথা এটা। প্রেমা মরতে পারে না। ”
ইব্রাহিম এগিয়ে এসে বলল-
“ এটা সত্যি কথা। আগুনে পু’ড়িয়ে মারা হয়েছে। প্রেমা মা-রা গেছে গতকাল রাতে। ”
ইব্রাহিম সবটা খুলে বলল। সবটা শুনে পূর্ণার দেহে কাঁপন ধরে গেলো। সেই সাথে আকাশের দিকে তাকালো। প্রেমা আর নেই! অবিশ্বাস্য! মেয়েটা মরে গেল! এই জীবনে মেয়েটা আর সুখ পেলো না! পূর্ণা গগনবিদারী চিৎকার করতে করতে বলল-
“ এমন টা তো হবার কথা ছিলো না প্রেমা। তুমি মরে যাবে বলে তো পালাও নি। আমি যদি জানতাম তুমি মরে যাবে তাহলে বিশ্বাস করো, কখনোই আমি তোমাকে পালাতে সাহায্য করতাম না। তুমি তো বলেছিলে আসবে,আমাদের বাঁচাবে। আমরা তো বেঁচে গেলাম। কিন্তু তুমি তো বাঁচলে না প্রেমা! ”
কথাগুলো বলে পূর্ণা ছুটে গেলো সেই পোড়া বাড়ির দিকে। সোলেমান আর ইব্রাহিম বাঁধা দেওয়ার জন্য তারাও ছুটলো। পূর্ণা পাতাল ঘরের সেই মাগুর মাছের পুকুরের সামনে আসলো। হাঁটু গেঁড়ে পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ইকবাল ভাই, ও ইকবাল ভাই শুনতে পাচ্ছেন? প্রেমা আর নেই। আমাদের প্রেমা ম’রে গেছে ইকবাল ভাই। এই পৃথিবীতে আপনিও নাই। আমাদের প্রেমাও নাই। একে একে সবাই চলে গেলেন… আমাদের একা ফেলে। এভাবেই যদি চলে যাওয়ার ছিলো। তাহলে কেন এত লড়াই করলেন? কেন এত কষ্ট সহ্য করলেন? আমাদের মুক্তির জন্য? এই মুক্তি আমাদের চাই না, ইকবাল ভাই। এমন শূন্য মুক্তি নিয়ে আমরা কী করব? আপনারা ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনারা….”
সোলেমান আর ইব্রাহিম পুকুরপাড়ে পূর্ণা কে এভাবে আহাজারি করতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ কে এই ইকবাল?”
পূর্ণা অশ্রু ভরা চোখে সোলেমানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আপনার ভালোবাসা প্রেমা কে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু কে আলিঙ্গন করেছিল যে।”
সোলেমান আশেপাশে তাকালো।
“ ভালোবাসা! ছিলো তবে একটা সময়।
“ এখন আর নেই?”
“ না। সে কেবল মাত্র আমার প্রাক্তন। আমার তাকে পরিচয় দেওয়ার মতো এই একটাই পরিচয় আছে। আমার ভালোবাসার সবটা জুড়ে এখন আমার বউ মেহরিন। ”
“ প্রেমা সত্যি আপনার কেউ না?
“ ঐ যে বললাম প্রাক্তন। ”
পূর্ণা এবার চেঁচিয়ে উঠলো-
“ সেজন্য একটা বার খোঁজ খবর নেন নি এই মেয়েটার। মেয়েটা আদৌও ভালো ছিলো কি না। জানার প্রয়োজন বোধ টুকুও করেন নি। প্রেমাটা এই জীবনে একটুও সুখ পেলো না। এত জনম দুঃখিনী মেয়ে আমি আর দুটো দেখি নি। যদি একটু খোঁজ নিতেন। তাহলে হয়তো প্রেমার এমন অকাল মরন হতো না। ”
“ সে নিজ ইচ্ছেয় আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।”
“ কখনই না। সে কখনই নিজ ইচ্ছায় আপনাকে চেড়ে চলে যায় নি। তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। তার মা কে বাঁচানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে আপনার থেকে দূরে সরে আসতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই মেয়েটা এক জীবনে শুধু আপনাকেই ভালোবেসে গেলো। আর আপনি কি করলেন? ”
সোলেমানের কপালে দু ভাজ পড়লো। তাকে বাধ্য করা হয়েছিল মানে? কে করেছিল?
“ আপনার কথার মানে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ”
পূর্ণা সবটা খুলে বলল। কিভাবে শেখর তার অসহায়ত্বের সু্যোগ নিয়েছে। প্রেমা কিভাবে তার মা কে বাঁচানোর জন্য ভিক্ষা করেছে। কিভাবে সুলতান নিবাসের গেট থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিভাবে প্রেমা বারবার সোলেমান কে ফোন করছিল। কিভাবে প্রেমা বিয়ের আগেও বাশার সুলতান কে ফোন করেছিল যাতে সোলেমান কে খবর টা দেয় আর সোলেমান বিয়ের আগে চলে আসে। কিভাবে বিয়ের পর প্রেমা জানলো তার মা আগেই মৃ’ত ছিলো শেখর জানায় নি। কিভাবে বিয়ের পর প্রেমার উপর অত্যাচার করতো। তার গর্ভ থেকে দু’দু’টি সন্তান টেনে বের করে কুকুরের সামনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল, যেন তারা মানুষ নয়, কোনো অপবিত্র বস্তু। তার জরায়ু কেটে তাকে চিরতরে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়েছিল,যেন তার মাতৃত্বের স্বপ্নটাই অপরাধ। শেষে বস্তায় বেঁধে এনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এই নোংরা পতিতালয়ে। সব টা বললো পূর্ণা সোলেমান কে।
সবটা শুনে সোলেমান নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে হেলে গেলে ইব্রাহিম ধরে ফেললো। এসব কি শুনছে সে! যাকে বাবার আসনে বসিয়েছিল সেই চাচা তাকে ঠকালো! সেদিন তো চাচা তাকে ফোন করে নি। ফোন করেছিল ইব্রাহিম। ইব্রাহিমের মুখে খবর টা শুনেই পাগলের মতো ছুটে এসেছিল। সোলেমান কত আহাজারি করেছিল,প্রেমাকে যাচ্ছে তাই বলে কতকিছুই বলে যাচ্ছিলো। কই তখনও তো চাচা একবারের জন্যও বললে না প্রেমা তাকে ফোন করেছিল। উল্টো বলেছিল – বিরোধী দলের মেয়েকে ভালোবাসছিস,ছোবল তো খেতেই হবে।
কিন্তু আজ সোলেমান জানতে পারছে- ছোবলটা প্রেমা দেয় নি, দিয়েছে নিজের মানুষই। নিজের চাচা! প্রেমা কে সেদিনও তাড়িয়ে দিলো। আর গত পরশুও তাড়িয়ে দিলো চাচা!
দাহশয্যা পর্ব ৮৭
একটা মানুষকে অপছন্দ হতেই পারে সেজন্য এভাবে মৃ’ত্যু যেনেও সেদিকে ঠেলে দিবে চাচা! চাচার জন্য সোলেমান কি না করে? চাচার সকল অন্যায় সকল কিছুই তো সোলেমান নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়। সেই চাচা কি করে এভাবে ঠকাতে পারলো? একদিকে চাচার করা বিশ্বাসঘাতক অন্য দিকে যাকে এত গুলো বছর ধরে বিশ্বাসঘাতকতা ভেবে এসেছিলো সে তো নির্দোষ। সেজন্যই কি চাচা সোলেমান কে বাংলাদেশে আসতে নিষেধ করতো বারবার? প্রেমার নামে এটা ওটা বলে মনটা বিষিয়ে দিত! প্রেমার প্রতি ঘৃণার তাপ বাড়িয়ে দিত! প্রমার মৃত্যুর চেয়েও যেন চাচার এই বিশ্বাসঘাতকতার ব্যথা টা বেশি মনে হচ্ছে সোলেমানের।
