দাহশয্যা পর্ব ৮৭ (৩)
Raiha Zubair Ripti
গাড়ি চলছে ফুল স্পিডে। শরীর কাঁপছে ভয়ংকর ভাবে সোলেমানের। রাগে নাকি অতি কষ্টে তা বোঝা বড় দায়। থেকে থেকে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। ইব্রাহিম পাশ থেকে বারবার বলছে থেমে যেতে। ইব্রাহিম চালাবে গাড়ি। কিন্তু সোলেমান শুনছে না। সে যে বিশ্বাসঘাতকতা শব্দটাকে মারাত্মক ঘৃণা করে। আর সেটাই তার আপন চাচা তার সাথে করেছে! এই চাচা কে সে কিভাবে ফেইস করবে? কিভাবে? রাগে ইচ্ছে করছে সব কিছু তচনচ করে দিতে। কেনো যে সে প্রেমাকে ভালোবাসতে গেলো। না সে প্রেমাকে প্রশ্রয় দিতে দিতে ভালোবেসে ফেলতো আর না মেয়েটার জীবন এভাবে উল্টেপাল্টে যেত আর না এমন কষ্ট যন্ত্রণা নিয়ে এভাবে মরতে হতো। বিয়ের আগে প্রেম ভালোবাসা হারাম তাই বলে খোদা এমন পরিনতি দিবে হারামের! সোলেমান স্টিয়ারিং-এ জোরে ঘুষি দিয়ে বসলো। ইব্রাহিম ও চমকেছে চাচার কথা শুনে। নিজের বাপের মতোই তো ভালোবাসতো সোলেমান তাকে। আর বাশার সুলতান ও তো সোলেমান কে মারাত্মক ভালোবাসা। এজওয়ানের থেকে সোলেমান ই বেশি সময়টা তার সাথে থেকেছে। সেই ছেলেকে এভাবে মিথ্যা বললো! নিবাসে যে আজ একটা ঝড় বইতে যাচ্ছে তা ইব্রাহিম শিওর। এখন এটা সামলাবে কি করে? নিবাস ভর্তি লোকজন।
দুপুরের দিকে মেহরিনের বাবা মা চলে এসেছিল ঢাকা। মেহরিন বাবাকে পেয়েই গুটিশুটি মে’রে বাবার বুকে লেপ্টে ছিলো। কি শান্তি। মেহরিন পৃথিবীতে দুটি পুরুষের বুকে শান্তি খুঁজে পায়। এক বাবা আর দ্বিতীয় তার স্বামী। তার বাবা আসার সময় মোটেও খালি হাতে আসে নি। সাথে করে মেহরিনের পছন্দের খাবার এনেছে। আবার এই সময় মেয়েরা আচার খায়। সেজন্য হরেক রকমের আচার নিয়ে এসেছে।
বাতাসি আর মাহি দূর থেকে দেখছে। তাদের কি কষ্ট হচ্ছে? একটু হিংসে হচ্ছে জীবন নিয়ে? তারা কেউই তো বাবা মায়ের আদর স্নেহ ভালোবাসা পায় নি। তাদের কি খুব মনে পড়ছে বাবা মা কে?
মাহি বাতাসির দিকে তাকালো। কেমন ছলছল নয়নে দেখছে মেহরিন কে। মাহি বা হাতে জড়িয়ে ধরলো বাতাসি কে।
“ খারাপ লাগছে? ”
বাতাসি হাসার চেষ্টা করে বলল-
“ মেহরিন আপা অনেক ভাগ্যবতী তাই না?”
“ আপাতদৃষ্টিতে দেখলে আসলেই মেহরিন ভাগ্যবতী। ”
“ এমন ভাগ্য আমাদের হয় না কেন? কেউ ভালোবাসতে চায় না। খুবই পঁচা জীবন। আল্লাহ ভীষণ বৈষম্য করছে আমাদের সাথে।”
“ হয়তো। এক জীবনে তো সবাই সুখী হয় না। দুঃখ ও থাকতে হয়। ”
“ সুখ তো নাই আপু। চোখ মেলে তাকালেই শুধু দেখি দুঃখ আর দুঃখ। এত দুঃখ নিয়ে মানুষ বাঁচে! মানুষের যদি দুইটা জীবন হইতো। আল্লাহ রে বলতাম দ্বিতীয় জীবনে অন্তত এই রকম কালো আর মা বাবার ভালোবাসা বিহীন পাঠিও না। এই জীবনে বেঁচে থাকার চেয়ে কুকুর হওয়াটাও যেন উত্তম। ”
সোলেমান অস্থির ভঙ্গিতে রুমে প্রবেশ করলো। মোতালেব ভুঁইয়া কে দেখে সালাম দিলো। আসতে অসুবিধে হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করলো। মোতালেব ভুঁইয়া জবাব দিলো। সোলেমান মেহরিনের কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো- কোনো অসুবিধে হচ্ছে কি না,খারাপ লাগছে কি না। মেহরিন না জানাতেই সোলেমান ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকলো। মোতালেব ভুঁইয়া চলে গেলেন।
সোলেমান ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হতেই মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
“ মেয়ে গুলো কে কি বাঁচাতে পেরেছেন?”
সোলেমান এগিয়ে এসে পাশে বসে বলল-
“ সবাই কে পারি নি বাঁচাতে। শেখর আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল পতিতালয় । কিছু জন আগুনে পুড়ে মারা গেছে আর কিছু জন আহত হয়েছে। বাকিরা বেঁচে আছে। ”
“ আপুর স্বামী ধরা পরে নি?”
“ না শু’য়োরের বাচ্চা পালিয়েছে। আগে থেকেই হয়তো বুঝতে পেরেছিল আমি আসবো। তবে জানো আজ আমি একটা সত্যের মুখোমুখি হয়েছি। এতদিন আমি একটা মিথ্যা কে সত্য ভেবে এসেছিলাম। ”
“ কি?”
“ প্রেমা আমাকে ঠকায় নি মেহরিন। আমি তোমায় বলেছিলাম ও আমায় ঠকিয়ে শেখর কে বিয়ে করছে। কিন্তু না। প্রেমা তার মা কে বাঁচাতে শেখর কে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। শেখর ওর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছে। প্রেমার মায়ের ক্যান্সার ছিলো। চিকিৎসার জন্য টাকার দরকার ছিলো। ওর বাপ দেয় নি টাকা। প্রেমা নিবাসে এসেছিল সাহায্য চাইতে কিন্তু পায় নি। সেদিনও পায় নি। পরশু যে এসেছিল পরশুও পায় নি। ”
মেহরিন চমকে উঠলো।
“ পরশু এসেছিল!”
“ হু । কিন্তু তাকে প্রতিবার ফিরিয়ে দিয়েছে কে জানো? ”
“ কে?”
“ আমার চাচা। আপন চাচা। যাকে আমি বাবার পর সবচেয়ে বেশি ভরসা করেছি। ভালোবেসেছি। সেই চাচা প্রেমা কে বারবার তাড়িয়ে দিয়েছে। প্রেমা বিয়ে করার আগে নাকি চাচা কে ফোন করেছিল। তার বিয়ের কথাটা জানিয়েছিল। বলেছিল আমাকে জানাতে। আমাকে নাকি ও কন্টাক্ট করতে পারছিলো না। কিন্তু জানো চাচা আমাকে এই বিষয়ে কিচ্ছু জানায় নি। চাচা চুপ ছিলো। আমাকে দিনের পর দিন প্রেমার প্রতি বিষিয়ে তুলেছিল। আমার জন্য ঐ মেয়েটা কত কিছু সাফার করেছে মেহরিন। মেয়েটার মা বিয়ের আগেই মা-রা গিয়েছিল। কিন্তু তাকে জানানো হয় নি। মায়ের মৃত্যুর তিনদিন পর নাকি জেনেছে যে তার মা আর নেই। আর জানো মেয়েটা কে মা ডাক শুনতে দেয় নি ঐ শেখর। দু’বার নাকি জোর করে অ্যাবোর্শন করিয়েছে। আর সেই বাচ্চা গুলোকে আবার কুকুর দিয়ে খাইয়েছে। ভাবতে পারছো! তারপর জরায়ু কেটে একেবারে পঙ্গু করে দিছে। আর নিয়মিত অত্যাচার তো করতোই। এরপর বস্তায় বেঁধে পতিতালয় নিয়ে গিছে। সেখানে পরপুরুষের সাথে শুতে না চাইলে নির্মম ভাবে মেরে কাটা শরীরে মরিচের গুঁড়ো দিয়েছে। আমার এখন কি করা উচিত মেহরিন বলো। মেয়েটা কে আমি কি বলি নাই! মুখে যা আসছে তাই বলছি। অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। কোনো ভাবে কি আমি দায়ী প্রেমার মৃত্যুর জন্য? ”
মেহরিনের গা শিউরে উঠলো প্রেমার বিষয়ে সবটা শুনে। আপনা-আপনি হাত চলে গেলো তার পেটে। দু দু’টো বাচ্চা কে তার গর্ভ থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে! আবার কুকুর দিয়ে খাইয়েছে ঐ ছোট্ট প্রাণ গুলোকে। এত নিকৃষ্ট মানুষ ছি! তাকে মেরে আবার কাটা গায়ে মরিচের গুঁড়ো দিত! আবার এত যন্ত্রণা পেয়ে মা-রা গেল মেয়েটা! জীবন এত কষ্টের ছিলো তার! সেজন্য কি মেহরিন একতরফা সোলেমানের মুখে প্রেমার কথা শোনার পর ওমন শক্ত হতে পারে নি! প্রেমা কে দোষী বলে এটা ওটা বলতে পারে নি!
মেহরিন চুপ করে রইলো। কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার নিজেরই তে খারাপ লাগছে,সোলেমানের তো আরো লাগবে।
“ উনার কোনো ছবি আছে সুলতান সাহেব ? আমি উনাকে দেখতে চাই। এমন এক দুখিনী মেয়েকে বেঁচে থাকতে দেখার সৌভাগ্য হয় নি আমায়। একটু দেখতে চাই। ”
“ তার কোনো ছবি আমার কাছে আর নেই। সব পু’ড়িয়ে ফেলছি সেদিন। কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই আর।”
একটা ছবিও নেই! মেহরিনের তাহলে দেখা হলো না এই নারী কে! তাকে দেখার তীব্র ইচ্ছে হচ্ছে যে।
“ তাহলে তার কবরস্থানে নিয়ে যাবেন আমায়? ”
“ আচ্ছা নিয়ে যাব। তুমি এখন রেস্ট নাও আমি আসছি একটু।”
“ কোথায় যাবেন এখন?”
“ চাচার কাছে। ”
মেহরিনের বুকটা ধক করে উঠলো।
এজওয়ান বিরস মুখে আয়নায় নিজের চেহারা টা মনোযোগ দিয়ে দেখছে। শালার চাঁদের গায়ে কলঙ্কের দাগ থাকতে পারে কিন্তু এজওয়ানের এই সুন্দর হ্যান্ডসাম মার্কা মুখে একটা দাগও নেই। এতটাই পরিষ্কার ফেইস। কিন্তু তরিকুলের বেটির মুখে তো মাঝেমধ্যে দু একটা পিম্পল উঠে। বেয়াদব যে সেজন্য।
এজওয়ান ময়েশ্চারাইজার লাগালো মুখে। মাহি জামাকাপড় ভাজ করতে করতে এজওয়ান কে বলল-
“ আচ্ছা আমরা বাংলাদেশ আসবো কবে আবার? মেহরিনের বাবু হওয়ার আগে আসবো না?”
“ মেবি না। একেবারে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ফিরবো আমরা দেশে।”
“ কিসের বাচ্চা? ”
“ কেনো তোমার আমার।”
“ এত চটজলদি কেনো আপনার বাচ্চা নিয়ে? মানুষ তো বিয়ের ৪-৫ বছর পর বাচ্চা নেয়। আর আপনি বিয়ের পর থেকেই শুরু করছেন। বাচ্চা দেওয়ার মালিক আল্লাহ। ”
এজওয়ান চোখ বড় বড় করে তাকালো মাহির দিকে। এ কোন সুরে কথা বলছে মাহি! এজওয়ান এগিয়ে এসে কপাল গালে হাত রেখে বলল
“ এই তুমি ঠিক আছো? ভূতে টূতে ধরে নি তো আবার? অস্বাভাবিক লাগছে তোমাকে। ”
মাহি বিরক্ত হলো। হাত সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ অস্বাভাবিক কেনো লাগবে? আপনার বাচ্চা চাই ওকে ফাইন। তবে এখনই না। আমি বাচ্চার জন্য প্রস্তুত না এখন। আর ২-১ বছর যাক। আমাদের সম্পর্কের উপর ডিপেন্ড করবে সব টা। ”
“ ঠিক আছে,ঠিক আছে। তাই সই। এখন সেই খুশিতে বলুন ম্যাডাম আমি আপনার জন্য কি করিতে পারি? ”
“ কিচ্ছু করতে হবে না। লাইট টা নিভিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। আর আমাকেও ঘুমোতে দিন। ”
এজওয়ান লাইট নিভিয়ে এসে মাহির পাশে শুয়ে পড়লো মাহির দিকে ঘুরে। মাহি উল্টো দিকে ঘুরে চোখ বুজে আছে। এজওয়ান বিরবির করে বলল-
“ আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না তরিকুলের বেটি। ইউ আর অ্যা লায়ার। ”
🌸
বাড়িতে মেহমান বলেই সোলেমান বাড়িতে ঢুকার সাথে সাথে কোনো প্রকার সিনক্রিয়েট করে নি। তাই বলে যে কিছু বলবে না তা তো নয়। সোলেমান কে যেতে দেখে ইব্রাহিম ও তার পিছু পিছু আসলো।
বাশার সুলতান ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত ছিলো তখন। পুরো এলাকায় আবার মিষ্টি বিলাতে বলছে। সোলেমান কে দেখামাত্রই ফোনটা কে’টে হাসি মুখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরপ বলল-
“ সব ব্যবস্থা করা শেষ। নিশ্চিন্তে মেহরিনের সাথে থাক।”
সোলেমান বাশার সুলতান কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিলো।
“ আমাকে নিশ্চিন্তে থাকার নাম করে আমার পিঠ পেছন ছু’রি বসাতে তোমার একবারও বিবেকে বাঁধলো না চাচা?”
বাশার সুলতান ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে।
“ তের পিঠ পিছে ছু’রি বসিয়েছি মানে? কি করেছি আমি?”
“ মনে পড়ছে না? পড়ছে না মনে এখন? পরশু রাতে কি করেছো? ৯ বছর আগে কি করেছো? প্রেমা তোমার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল না? তুমি সাহায্য করলে না কেনো? এই তোমার কারনে প্রেমা এই পৃথিবীতে আর নেই। ”
বাশার সুলতান চমকালো। হু শুনেছে নিউজে প্রেমা আর নেই। কিন্তু পিঠ পিছে ছুরি কিভাবে বসালো?
“ আমি বুঝতে পারছি না সোলেমান। কি বলছিস?”
সোলেমান আর নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারলো না। সামনে থাকা ফুলদানি আর টি-টেবিলে সজোরে লাথি বসিয়ে বলল-
“ একদম ন্যাকা সাজবে না চাচা,খবরদার। আমি কিন্তু খুব কষ্টে নিজের রাগ কন্ট্রোলে এখনও রেখেছি। কন্ট্রোল হারিয়ে ফেললে কিন্তু তোমাকে আঘাত করতেও দু’বার ভাববো না। তাই ন্যাকা সেজো না। কেনো তুমি আমাকে বলো নি প্রেমা তোমাকে তার বিয়ের খবর জানিয়েছিল। আমাকে জানাতে বলেছিল। তুমি জানাবে বলে কেনো আর জানালে না আমায়? ”
বাশার সুলতানের এবার মনে পড়লো। সে গা ছাড়া ভাব নিয়েই বলল-
“ সেটা নিয়ে আমার কোনো খারাপ লাগা কাজ করছে না। ঐ মেয়ে তোর বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখতো? ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন বাজে। বাপে একশো একটা জায়গায় গিয়ে মেয়ের বয়সী মেয়েদের সাথে গিয়ে ওঠাবসা করে। তার উপর বিএনপি। এমন মেয়ে কে জেনেশুনে আমি তোর বউ হতে দিতাম! হ্যাঁ আমি মেনে নিয়েছিলাম তোর রাগারাগি তে আর না পেরে। যখন শুনলাম ওর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, আমার মনে হলো হচ্ছে হোক আমাদের পরিবার টা শান্তি পাবে। ওর সাথে বিয়ে হলে কি ভেবেছিস শান্তি মতো সংসার করতে পারতি? শেখর ওর বাপ,প্রেমার বাপ শান্তি দিত আমাদের? আর তারচেয়ে বড় কথা প্রেমার বিয়ে হয়ে গেছে বলেই মেহরিন কে পেয়েছিস জীবনে। বউ নিয়ে ঝগড়া না করে করছিস প্রাক্তন কে নিয়ে! ”
সোলেমান দাঁত চেপে বলল-
“ আমি প্রেমা কে নিয়ে ঝগড়া করছি না তোমার সাথে। ঝগড়া করছি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা নিয়ে। ”
“ বেশ করেছি করছি। সন্তানের ভালোর জন্য যদি এমন বিশ্বাসঘাতকতা আরো করতে হয় তাহলে আমি আরো করবো। ঐ মেয়েকে এমনিতেও আমার পছন্দ ছিলো না। যে গেছে সে গেছে তাকে নিয়ে তর্ক করে কি চাচার সাথে বিরোধ করতে চাচ্ছিস? আর সেদিন রাতে তাড়িয়ে দিয়েছি কারন আমি চাই না প্রেমার ছায়াটাও তোর আর মেহরিনের উপর পড়ুক। পুরোনো প্রেম তো বলা তো যায় না,তুই যদি আবার প্রেমার দিকে ছুটে যাস,তখন মেহরিনের কি হবে? । ”
সোলেমান এবার আর না পেরে চাচার পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরে বলল-
“ চাচা,মুখ সামলে কথা বলো। আমাকে কি তোমার ক্যারেক্টারলেস মনে হয়? তুমি নিজের দোষ স্বীকার না করে আমাকে দোষারোপ করছো! ”
ইব্রাহিম ছাড়িয়ে আনলো সোলেমান কে। এখন চাচা ভাইস্তার মধ্যে এভাবে ঝগড়া করে কি হবে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।
“ সোলেমান শান্ত হ। এখন রাগারাগি করে কি হবে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। চাচা তো মারে নি। হ্যাঁ চাচা তাড়িয়ে দিছে সাহায্য করে নি। সেটা অবশ্যই দোষের। কিন্তু আসল দোষী তো শেখররা। ওরাই প্রেমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছে। ওরাই মেরেছে। ”
“ তাই বলে আমি চাচাকে মাফ করে দিব? উনি প্রতিবার দোষ করবে আর তার দায়ভার সবসময় আমাকেই নিতে হবে?”
“ সেটা কখন বললাম। তুই রেগে আছিস। বউয়ের কাছে যা। মাথা ঠান্ডা কর।”
“ এই লোকটাকে যেন আমার চোখের সামনে না দেখি। দেখলেই আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। ”
“ বেরিয়ে যেতে বলছিস আমাকে এই বাড়ি থেকে?”
সোলেমান জবাব না দিয়ে চলে গেল। বাশার সুলতান সোলেমানের যাওয়া দেখে বলল-
“ দেখছিস কেমন প্রাক্তন কে নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করলো! ঐ মেয়ের কি কোনো যোগ্যতা আছে ওর বউ হওয়ার? ও কোথায় আর মেহরিন কোথায়? বউয়ের জন্য ওর পরান পোড়ে না। পরান পোড়ে প্রেমিকার জন্য! ঐ মেয়ে ম’রে গিয়েও শান্তি দিলো না। অশান্তি ঢুকিয়ে দিয়ে মরলো।”
“ আহ চাচা থামবেন? আপনি নিজের দোষ স্বীকার করুন। আপনার দোষ আছে এখানে। ”
“ তোদের চোখে দোষী হলেও। আমি আমার চোখে কোনো দোষ দেখতে পাচ্ছি না। যা করেছি সবার ভালোর জন্যই করেছি। ওর তো খোদার নিকট শুকরিয়া আদায় করা উচিত। ঐ মেয়ে চলে গেছে বলেই মেহরিনের মতো মেয়ে আসছে ওর জীবনে। ”
“ আপনার সাথে আমি কথায় পারবো না চাচা। আমি চলি। ”
ইব্রাহিম ও চলে গেলো। সোলেমান রুমে এসে একটার পর একটা সিগারেট খেয়েই যাচ্ছে। এমন সময় একটা মেসেজ আসলো ফোনে। সোলেমান চেক করে দেখলো- ডক্টর অয়ন বাংলাদেশে আসছে।
সোলেমান কিছু বললো না। মেহরিন কে ডিনারের পর মেডিসিন খেয়েছে বলে তাড়াতাড়ি ঘুম চলে আসায় ঘুমিয়ে গেছে। সোলেমান শেষ সিগারেট টা ফেলে দিয়ে ওয়াশরুম থেকে মুখটা ওয়াশ করে মেহরিনের পাশে এসে শুয়ে পড়লো।
নিশুতি রাত। ঘড়ির কাঁটা আড়াইটার ঘরে এসে থেমে আছে তখন । চারদিক এতটাই নিস্তব্ধ যে নিজের শ্বাসের শব্দও অস্বস্তিকর লাগা শুরু করেছে। দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ ডাকে রাতের শরীর কেঁপে ওঠে আবার থেমে যায়। শহরটা এখন ঘুমিয়ে। বাতাসও যেন পা টিপে টিপে হাঁটছে।
দোতলার এক বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়ামূর্তি। আলো জ্বালানো হয়নি। চাঁদের ম্লান আলোয় শুধু অস্পষ্ট অবয়ব। হাতে ফোন। স্ক্রিনের নীলচে আলো মাঝেমধ্যে তার চোখে ঝলক ফেলে। সেই চোখে অদ্ভুত এক কঠোরতা, হিসেবি শীতলতা।
ফোনের ওপাশে কেউ বলছে।
“ বাবা হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে খুব? এতো সুখ তো ও ডিজার্ভ করে না। বাবা হতে চায় কিভাবে? ”
এপাশের কণ্ঠটা চাপা, কিন্তু ধারালো শোনালো-
“ ওর এই ইচ্ছে টা ইচ্ছেই থেকে যাবে।”
কথাটা বলেই বেলকনির রেলিং আঁকড়ে ধরে সে সামান্য ঝুঁকে পড়ে। নিচের অন্ধকারে তাকিয়ে একটু থামে। তারপর ঠোঁটের কোণে টান পড়ে।
“ও বাপ হয়ে যাওয়া মানে কী জানো? ও বাপ হওয়া মানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ হয়ে যাওয়া। আর সেটা আমি কখনই চাই না। ও নিকৃষ্ট মানুষ। ওর নিকৃষ্ট হয়েই থাকতে হবে। যার জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে, সে কি আর অবৈধ কাজ ছেড়ে থাকতে পারে? মোটেই না। বৈধতা ওর জন্য নিষিদ্ধ। ও বাপ হয়ে গেলে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। বাবা হওয়ার দায়িত্বের ভারে নুয়ে পড়বে। তখন ওর মনুষ্যত্ব জেগে উঠবে। ভালো হওয়ার চেষ্টা করবে। আমার জন্য সময় থাকবে না। আমাকে আর সাহায্য করবে না। আর আমি কি সেটা জেনেশুনে হতে দেব? কখনই না। ও কে আমার দরকার। খুব দরকার। আমার লক্ষ্যে পৌঁছানোর একমাত্র হাতিয়ার ও। ওর স্বপ্ন? ওর ইচ্ছে? ওর বাপ হওয়া সব আমার হাতে বন্দী। ওকে আমি যেভাবে নাচাবো, ও সেভাবেই নাচবে। ও কোনোদিন বাপ হতে পারবে না। আমি নিশ্চিত করবো এটা। সব ব্যবস্থা করা আছে। ডোন্ট ওয়ারি। তবে এখন রাখছি। দেওয়ালেরও কান আছে। কেউ শুনে ফেললে বিপদ। যখন তখন ফোন করো না।”
এই নিস্তব্ধতার আড়ালে আজ একটা ভবিষ্যৎ ধ্বংসের পরিকল্পনা পাক খাচ্ছে।
আর কোথাও, অজান্তে, কেউ হয়তো স্বপ্ন দেখছে বাবা হওয়ার…
যার স্বপ্নটাকে খুব ঠান্ডা মাথায় গলা টিপে মারার শপথ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেউ।
“ এত রাতে বেলকনিতে কার সাথে কথা বলছো তুমি তরিকুলের বেটি? কে ফোন করেছে?”
মাহি চমকে গেলো এজওয়ানের গলার স্বর শুনে। সাথে সাথে পেছনে ফিরলো।
এজওয়ান ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে হাত রাখতে গিয়ে টের পেয়েছিল বিছানা খালি। সাথে সাথে চোখ খুলে তাকালো। মাহি নেই বিছানায়। বেলকনির দিকপ তাকাতেই দেখলো মাহি কারো সাথে ফোনে কথা বলছে ফিসফিস করে। কি বলছে বুঝা যাচ্ছে না। সেজন্য বিছানা ছেড়ে উঠে এসে বেলকনিতে এসে জিজ্ঞেস করতেই মাহি এমন চমকে উঠলো যে এজওয়ানের ভ্রু কুঁচকে আসলো। মাহি ফোনটা কাটার আগে বলল-
“ আপু সকালে এ নিয়ে কথা বলবো। এখন রাখছি।”
ফোন কেটে এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আপু ফোন করেছিল। ”
এজওয়ান ফোনে সময় দেখলো।
“ এত রাতে! কোনো সমস্যা হয়েছে?”
“ না তেমন কোনো সমস্যা হয় নি। আপুর হাসফাস লাগছিলো। সেজন্য কল করেছে। আপনি উঠলেন যে? ঘুমিয়ে না ছিলেন?”
“ তোমাকে ধরতে গিয়ে বুঝলাম তুমি পাশে নেই। তাই ঘুম ভেঙে গেছে। চলো ঘুমাবে। ”
মাহি হু বলে বিছানায় আসতে যাবে এমন সময় বাহির থেকে সোলেমানের চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে আসলো।
আজ এক বছর পর মেহরিন আবার ঐ স্বপ্ন দেখেছে। অদৃশ্য কিছু হাত ওদের হাওয়ার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দূরে… আরও দূরে…
মেহরিন দৌড়াচ্ছে,যতই দৌড়ায়, বাচ্চা দুটো তত দূরে সরে যায়। শেষ মুহূর্তে ওদের ছোট্ট আঙুল দুটো ছুঁতে গিয়েও পারে না। চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। শুধু শিশুদের কান্নার শব্দটা কানে বাজতে থাকে।
হঠাৎই মেহরিন চিৎকার করে উঠে বসলো।
“বাচ্চা! আমার বাচ্চা…!”
হাপাতে হাপাতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, বিছানার চাদর সরাচ্ছে, হাত দিয়ে পাশটা খুঁজছে যেন সত্যিই কেউ ওদের নিয়ে গেছে।
সোলেমানের তখন সবে চোখটা লেগেছিল।
হঠাৎ এমন চিৎকারে সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো।
মেহরিনের চোখ দুটো লাল, উন্মাদের মতো চারপাশে তাকাচ্ছে। মেহরিন তো এমন মেয়ে না। সোলেমান মেহরিনের বাহু ধরে বলল-
“ কিসের বাচ্চা মেহরিন? কি হয়েছে জান? এমন করছো কেনো?”
মেহরিন সোলেমান কে দেখে সোলেমানের বুকে আঁচড়ে পড়ে হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল-
“ আমার বাচ্চারা। আমার বাচ্চাদের ওরা নিয়ে যাচ্ছে। ওদের নিয়ে যেতে না করুন। আমার কথা শুনছে না। ”
মেহরিনের বাচ্চা! কিন্তু মেহরিনের তো সবে মাত্র দেড় মাস। দুঃস্বপ্ন দেখেছে নাকি?
“ মেহরিন শান্ত হও,আমাদের বেবি এখনও আসে নি পৃথিবীতে। তুমি দুঃস্বপ্ন দেখেছো হয়তো। ইট’স জাস্ট অ্যা ড্রিম। প্লিজ শান্ত হও লক্ষীটি। ”
দাহশয্যা পর্ব ৮৭ (২)
মেহরিনের শরীর টা অতিমাত্রায় কাঁপা-কাঁপি শুরু করে দিলো। এমন অবস্থা হলো যে খিঁচুনি উঠে শরীর খারাপের দিকে চলে গেলো। আকস্মিক মেহরিনের এমন পরিবর্তনে সোলেমানের শরীর জমে গেলো। মেহরিনের গালে হাত দিয়ে উন্মাদের মতো ডাকতে লাগলো-
“মেহরিন! চোখ খুলো… আমার দিকে তাকাও… আম্মা! আব্বা ! ইব্রাহিম…..
