হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৫
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
নিস্তব্দ মির্জা বাড়ি অন্ধকার চিরে সহসা আলোর তরঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এক এক করে জ্বলে উঠলো বাড়ির প্রতিটি বাল্ব। সাদা কিরণ খেলা করতে লাগল প্রতিটি কানায় কানায়। সেই আলোর সংস্পর্শে এসে কৃশানের মোবাইলের গোলাকার ছোট্ট অংশে জ্বলতে থাকা আলোটা ফিকে হয়ে এলো। আঙুলের ডগা স্ক্রিনে চেপে তা অফ করে দিলো কৃশান। পরপর হাঁটা দিলো রুমের উদ্দেশ্যে। ততক্ষণে হুমায়রার চা বানানো শেষ। দুটো কাপে চা ঢেলে সেও রওনা হলো।
প্রকৃতির শীতলতায় কেমণ একটা ঠান্ডা ভাব বিরাজ করছে রুমজুড়ে। বারান্দার পর্দার ফাঁক গলে ক্ষণে ক্ষণে প্রবেশ করছে শান্তিময় হাওয়া। সেই ঠান্ডা হাওয়ার বিপরীতে ধোঁয়া উড়া দুটো গরম কাপ নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো হুমায়রা। একটা নিয়ে স্বামীর সামনে ধরলো। বিছানার এক পাশে হেলান দিয়ে মনোযোগ দিয়ে ফোন স্ক্রোল করছিল কৃশান। ফোনের উপর চোখ রেখেই নিরেট স্বরে বলল,
” তুই খা আমি খাবো না। ”
“ পরে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে, খেয়ে নিন। ”
“ বললাম তো খাবো না! ”
“ শুনলাম তো! শুধু এক কাপ খেয়ে নিন আর সাধবো না। ”
চোখ তোলে হুমায়রার মুখপানে চাইলো কৃশান। কিছু বলতে নিবে এর আগেই মেয়েটা ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলল,
“ একটু খেলে কী হয়? ”
“ না খেলে কী হয়? ”
” আমার চা বানানো টাই জলে যাবে! ”
ভ্রু কুঁচকে গেলো ছেলেটার। তা দেখে হুমায়রা কথা ঘুরিয়ে বলল,
” না মানে আপনি লাইট না ধরলে তো আমি চা বানাতেই পারতাম না। এখন আপনিই যদি না খান তাহলে হয়? ”
কথা শেষ হতেই আবারও হাচি দিয়ে উঠলো হুমায়রা। তার লালিত মুখের দিক তাকিয়ে আর কথা বাড়াল না কৃশান। ফোন রেখে হাত বাড়িয়ে কাপটা নিলো। তার বালিশের মতো ফোলা হাত খানা চোখে পড়তেই আঁতকে উঠলো হুমায়রা। বিস্ময় নিয়ে বলল,
” হায় আল্লাহ, হাতে কী হয়েছে আপনার? ”
“ তোর শত্রু চুমা দিছে! ”
বোকা বনে গেলো মেয়েটা। ঠোঁট উল্টে বলল,
“ অ্যা..! ”
“ কথা না বাড়িয়ে চা খা। নয়তো আমারটাও তোকেই খাওয়াবো। ”
ধমক খেয়ে খাটের অপর পাশে গিয়ে বসল হুমায়রা, ঠিক স্বামীর বরাবর। কৃশান যেই না কাপটা মুখের সামনে নিলো ওমনিই সাবধান বাণী ছুঁড়ল,
“ ফুঁ দিয়ে খাবেন নাহলে জিভ পোড়ে যাবে। ”
কৃশান চা খেতে নিষেধ করায় মেয়েটা ভাবছে সে হয়তো চা খেয়ে অভ্যস্থ নয়। অভ্যস্ত হবেই বা কী করে? ভালো জিনিস মুখে নেয় কী এই মানুষটা? কৃশান গ্রাহ্য করলো না তেমন একটা। তা দেখে হুমায়রা আবারও বলল,
“ সাবধানে খাবেন। ”
কথা শেষে বেখেয়ালি নিজেই ফুঁ ছাড়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দিলো। অত্যুষ্ণতায় সাথে সাথেই জিভ জ্বালা করে উঠলো মেয়েটার। কণ্ঠনালি থেকে বেড়িয়ে এলো অস্পষ্ট আর্তনাদ।
সেদিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো কৃশান। সেই হাসির শব্দে নিস্তব্ধ কক্ষটাকে কোনো এক রূপকথার জগত মনে হলো হুমায়রার কাছে, যেখানে দুঃখের কোনো চিহ্ন নেই। নিজের জ্বালা ভুলে মানুষটার হাস্যজ্জ্বল মুখপানে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। চোখের পলক যেন আজ পড়তে ভুলে গেছে। সৃষ্টিকর্তা বুঝি এতো সুন্দর একটা মুহূর্তও লিখে রেখেছিল তার নসিবে?
হুমায়রাকে এভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসি থেমে গেলো কৃশানের। তৎক্ষনাৎ নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনলো। হুমারাকে তখনও তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ মুখে গাম্ভীর্যতা এনে বলল,
“ এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছিস কেন? অশ্লীল নারী! ”
সম্বিৎ ফিরল মেয়েটার। কৃশানের শেষের কথাটা শুনে চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। বলল,
” কী বললেন? ”
“ কিছু না। কথা না বলে চা শেষ কর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ”
বলেই চায়ের কাপে চুমুক বসালো সে। হুমায়রাও আর কথা বাড়াল না। সাবধানতা বজায় রেখেই চা খাওয়ায় মন দিলো। ঠান্ডা পরিবেশ, হাতে গরম চায়ের কাপ আর সাথে নিজের একান্ত ব্যাক্তিগত পুরুষ- এ যেন এক আকাশকুসুম বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে তার নাগালে। চা খাওয়ার শেষ পর্যায়ে হুমায়রা বলে উঠলো,
“ উমম, হাবিজাবি না খেয়ে প্রতিদিন রাতে ঘরে এসে এমন একটা চায়ের আড্ডা দিলেও মন্দ হয় না বলুন? ”
এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ নিক্ষিপ্ত হলো মেয়েটার উপর। সেই দৃষ্টিতে ঘাবড়াল না রমনী। মুচকি হেসে বলল,
“ আদেশ বা নিষেধাজ্ঞা নয় প্রস্তাব করলাম আরকি। ”
“ মদ খেয়ে প্রতিদিন ঘরে ফিরে তোকে মেরে তুন্দুরী বানালেও মন্দ হয় না বল? ”
ভিতরের উচ্ছাসটা ধপ করে নিভে গেলো হুমায়রার। মুখটা চুপসে গিয়ে ফুটো বেলুনের মতো হয়ে গেলো। তার মুখের এমন পরিবর্তনেও কেন যেন হাসি পেলো কৃশানের। আজ তার কী হয়েছে কে জানে! সবকিছু তে এমন সুখ সুখ লাগছে কেন? আর এমন হাসতেই বা মন চাচ্ছে কেন!
মলিন মুখে বসা থেকে উঠে পড়ল হুমায়রা। খালি কাপগুলো নিয়ে উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরলো। তা দেখে কৃশান বলে উঠলো,
“ কিরে কিছু বললি না যে? ”
” আপনাকে প্রস্তাব দেওয়াই ভুল হয়েছে আমার। ”
রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো হুমায়রা। সেদিকে তাকিয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো কৃশান। বড্ডো বেশিই ঘুম পাচ্ছে তার। অতঃপর হুমায়রা কাপগুলো রেখে এসে শুয়ে পড়লো। মধ্যবর্তী দূরত্বটা রয়ে গেলো আগের মতোই।
রাতের শীতলতা কাটিয়ে হালকা উষ্ণতার পরশ নিয়ে মেঘমালা ভেদ করে উঁকি দিলো দিবাকর। কিছু মেঘেরা লালাভ বর্ণ ধারণ করে এক অপরূপ সৌন্দর্যে সাজিয়ে তুলেছে নীলিমাকে। ক্ষণে ক্ষণে পাখিদের কিচিরমিচির জানান দিচ্ছে এক নতুন দিনের।
ঘুমের মাঝেই সহসা নিজের হাতের মধ্যে ঠান্ডা কিছু অনুভব করল কৃশান। মনে হচ্ছে কেউ যেন আলাদা বাতাস দিচ্ছে তার হাতে। পরপর দুবার একই অনুভূতি হতেই চোখ খুলে তাকালো সে। হুমায়রাকে হাতের মধ্যে ফুঁ দিতে দেখে এক লাফে শুয়া থেকে উঠে পড়ল। বলল,
“ এই তুই কী করছিলি? ”
আকস্মিক ঘটনায় ভরকে গেলো হুমায়রা। কিছুক্ষণ স্বামীর সন্দিহান চেহারার পানে তাকিয়ে ধাতস্ত হয়ে বলল,
“ আরে আপনার হাতে দোয়া পড়ে ফুঁ দিচ্ছিলাম! ”
“ এসব ঝাড় ফুঁক করে আমায় বশ করতে চাইছিস না তো তুই? ”
“ ইয়া আল্লাহ, কী বলছেন এসব! ”
“ তোকে বিশ্বাস নেই! এর জন্যই তো আজকাল তুই সামনে আসলেই……”
বলতে গিয়েও থেমে গেলো ছেলেটা। তাকে মাঝপথে থামতে দেখে হুমায়রা অনুসরণ করে বলল,
“ আমি সামনে আসলে….? ”
“ তুই সামনে আসলেই বিরক্ত হই আমি! এখন যা এখান থেকে। ঘুমিয়েও শান্তি নেই ম*রা ”
কথা ঘুরিয়ে ফেললো সে। পরপর আবারও উবর হয়ে শুয়ে পড়ল। সেদিকে কতক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো হুমায়রা। অতঃপর রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
রান্নাঘরে সকালের খাবার তৈরি করতে ব্যাস্ত হুমায়রা ও ইকরা। ইকরাকে বারবার নিষেধ করার পরেও কাজে হাত লাগিয়েছে সে। হুমায়রা বলেছে দুজনের খাবার তৈরি করতে তার কোনো সমস্যা হবে না। অথচ কে শুনে কার কথা। কাজের এক ফাঁকে ইকরা প্রশ্ন করে বসল,
“ গতকাল ছাদে কী চেয়েছিলি? ”
চোখ বড় বড় করে তাকাল হুমায়রা। তার জানামতে ইকরা তো ঘুমিয়ে ছিল তাহলে ওসব জানল কীভাবে? সে সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ তুই কীভাবে জানলি? ”
“ আরেকটু হলে তো পুরো এলাকাবাসীই জেনে যেত। ”
“ মানে! ”
“ মানে আমার বখাটে ভাইয়া ওরফে তোর বখাটে স্বামী কাল যেই ভাবে ডাকছিল তোকে! বাড়ির দেয়াল গুলো যে ফেটে যায় নি এই ঢের! ”
“ উনি আমায় ডেকেছিলেন? ”
“ তো আমি কী মিথ্যা বলছি! আমার ঘুম ও তো ভাইয়ার ডাকেই ভেঙেছে। ”
“ ওহ, ”
“ আমার তো মনে হচ্ছে ভাইয়া তোর প্রেমে ধীরে ধীরে পিছলে পড়ছে। কালকে রাতে তোকে না পেয়ে কেমন অন্যরকম লাগছিল ভাইয়ার চেহারাটা। ”
কেন যেন ইকরার কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারছে না হুমায়রা। তবে বান্ধবী তার মিথ্যে বলবে না এটা সে জানে। তার মানে কী সত্যিই মানুষটা তার খুঁজে ব্যাকুল হয়েছিল? তবে আচরন দেখে তো পুরো উল্টো মনে হয়।
তাদের কথার মাঝেই ঘুম ঘুম চোখে রান্নাঘরে প্রবেশ করল কৃশান। চোখে মুখে তার রাজ্যের বিরক্তি। মাত্র ঘুমাতে নিচ্ছিলো এর মাঝেই আবার ইয়াসমিন বেগম কল দিয়েছেন। শুরু করলে আর থামার নাম নেই তার। বাড়িতে আপাতত তার ফোন ছাড়া আর কোনো ফোন নেই। ইকরার আগে থেকেই ফোন নেই। মাঝে মাঝে দরকার হলে মায়ের ফোন নেয় সে। ফোন দিলেই নাকি বিগড়ে যাবে তাই ফোন দেওয়া হয়নি তাকে। আর হুমায়রা তো এ বাড়িতে আসলই মাত্র কদিন হলো- যার দরুণ তার কাছেও কোনো ফোন নেই। তাই বাধ্য হয়েই ঘুম থেকে উঠে এসেছে ছেলেটা।
“ নেহ, কথা বল। ”
ইকরার নিকট ফোন বাড়িয়ে বলল কৃশান। পরপর যেতে যেতে আদেশ ছুঁড়ল,
“ কথা শেষ হলে মোবাইল রুমে দিয়ে আসবি। ”
মানুষটার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল হুমায়রা। এবেলায় আর তখনকার মতো মুখে মলিনতা নেই। ইকরা কথগুলোা শুনার পর সেটা অজান্তেই উধাও হয়ে গেছে।
ইকরা মোবাইল নিয়েই মায়ের উদ্দেশ্যে সালাম দিলো। সালামের জবাব নিয়ে ইয়াসমিন বেগম মিষ্টি কণ্ঠে শুধালেন,
“ কী করছিস তোরা? ”
” রান্নাঘরে আছি হুমায়রার সাথে। ”
“ ওহ, তা ঐ নবাব পুত্র গতকাল রাতেও কী দেরী করেই এসেছিলেন? ”
“ নাহ, ভাইয়া গতকাল অনেক তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে। ”
“ শুকরিয়া, স্বাভাবিক ভাবেই ফিরেছিল না মাতাল হয়ে? ”
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৪
“ স্বাভাবিক ভাবেই। ”
“ ভালোই। আচ্ছা আমরা আজকেই এসে পড়ছি। ”
“ কেন? ”
“ এমনেই একটা কাজ আছে বাসায় ফিরতে হবে। আলভি দের মামা বাড়িতে যাবো না। ”
“ কী কাজ.? ”
“ আসলেই জানবে। ”
