পৌষপার্বণ পর্ব ১৫
Irfa Mahnaj
পৌষ এখন একদম সুস্থ। পুরো ফিটফাট হয়ে বসে আছে। সুস্থ হবে নাই বা কেনো মধ্যরাত থেকে শুরু করে ভোরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত পার্বণ পৌষের সেবা করে গেছে।
স্বামীর সেবা পেয়ে একেবারে চাঙ্গা হয়ে গেছে পৌষ। নিজের সেই চঞ্চল চিত্তে ফিরে এসেছে সে।
আজ পৌষরা ফিরে যাবে। আগামী কালকে যেহেতু রোযা শুরু তাই এখানেই তাদের ঘোরাঘুরির ইতি টানতে হচ্ছে।
— ওই মহিলা নিজের সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছিস তো?
আকস্মিক ভূতের মতো নিজের কানের কাছে কারো কথা বলা শুনে লাফিয়ে উঠে পৌষ। কটমট করে তাকিয়ে পার্বণকে বলে,
— এভাবে কে ভূতের মতো কথা বলে রে?
পৌষের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর ফুলে ওঠা নাকের ডগায় আঙ্গুল দিয়ে টোকা দিয়ে বলে,
— আমি বলি।
— তুই তো বলবিই কারণ তুই তো সত্যিই ভূত।
— ঠিক বলেছিস। পেত্নীর জামাই তো ভূতই হবে।
পৌষ যেইনা কিছু বলতে নিবে তখনই ওকে থামিয়ে দেয় পার্বণ। বলে,
— স্টপ ইয়ার। এখন ঝগড়া করতে চাচ্ছি না। তোর সব নিয়েছিস তো?
পার্বণের ক্লান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে পৌষ ও আর কথা বাড়ায় না। জানায়,
— হুম সব নেয়া শেষ।
— ঠিক আছে তাহলে যাওয়া যাক।
তারপর সবাই পুঁটি আর শুঁটকির কাছ থেকে বিদায় নেয়। বিদায়ের সময় পুঁটি অনেকবার বলে আরো কয়েকটা দিন থেকে যাওয়ার কথা।
চৈত্র তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলে। চৈত্র যখন পুটির সাথে এই ব্যপারে কথা বলছিল তখন পাশে দাড়ানো ভাদ্র মনে মনে ভাবে,
— আর থাকতে বইলেন না আন্টি। দেখা যাবে আপনাদের বাকি খাট ও ভেঙ্গে গেছে।
এদিকে শুঁটকি ফুপিয়েই যাচ্ছে। ছেলেটা পার্বণের সাথে খুব মিশে গেছে। পার্বণও তেমন।
পার্বণ হচ্ছে এমন ছেলে যেখানে যাবে সেখানেই সবার মন কেড়ে নিবে। সবার সাথে সখ্যতা গড়ার এক অদম্য ক্ষমতা আছে ছেলেটার মাঝে।
— কিরে বেটা আর মতো কাদবি? এই কক্স বাজার সমুদ্র সৈকতের থেকে তো তোর চোখে পানি বেশি। আমার শার্টে তো সুনামি বইয়ে দিবি।
পার্বণের এরুপ রসিক কথা শুনে কান্নার মাঝেও শুঁটকি হেসে দেয়। ওর সেই প্রাণবন্ত হাসি মন খুলে দেখে পার্বণ।
— পার্বণ ভাই আপনি কিন্তু আসবেন আবার।
— আবার জিগায়। প্রথম বাসর এখানে সারলাম আবার প্রথম হানিমুন ও এখানেই সারবো।
প্রথম কথা জোড়ে বললেও শেষের কথা একদম নিচু আওয়াজে বলে পার্বণ। তাই শুঁটকি আর শুনতে পায়নি।
অতপর শুঁটকির থেকে বিদায় নিয়ে নিজের পোটলা পুটলি নিয়ে হাটা লাগায়। চোখের দৃষ্টি এদিক ওদিক ঘুরিয়ে অবশেষে দেখতে পায় নিজের হাসের বাচ্চা বউকে।
যে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে সবার আগে আগে হাঁটছে। পার্বণও দেরি না করে কেঙ্গারুর মতো এক লাফে বউয়ের কাছে চলে যায়।
— সাধে কি তোকে ভূত বলি! যখন তখন এভাবে কোথা থেকে টপকে পড়িস বলতো?
চকচকে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে দিয়ে জবাব দিলো পার্বণ,
— যেখান থেকেই টপকে পড়ি না কেনো গন্তব্য কিন্তু তুই।
বেশ ভাব নিয়ে কথাটা বলে পার্বণ। কপালে পড়ে থাকা মাথার চুল গুলো পিছনের দিকে ঠেলে দেয় সে।
পার্বণের কান্ডকারখানা গুলো ছোট ছোট চোখ করে পর্যবেক্ষণ করছে পৌষ। তারপর নিজেও হেসে দেয়।
বিড়বিড় করে বলে,
— পাগল ছেলে।
পৌষের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে পার্বণ বলে,
— একান্তই তোর।
একটা ছেলে তার শক্ত মুঠোয় খুব যত্নের সাথে আগলে ধরে আছে একটা মেয়ের হাত। দুজন পাশাপাশি হাঁটছে সমুদ্রের কোল ঘেঁষে।
দিনের আলোয় ঝলমলে চারদিক। প্রকৃতির এক অপার্থিব সৌন্দর্যে বেষ্টিত। আর এরুপ পরিবেশে দুজন মানব মানবী দুষ্টু মিষ্টি খুনশুটি করতে করতে একে অপরের হাতে হাত রেখে হাঁটছে।
এই সুন্দর দৃশ্য ফ্রেম বন্দি করছে পৌষ পার্বণের পিছু হাঁটতে থাকা চৈত্র। মুখ থেকে তার বেরিয়ে আসে,
— হায় হায় কারো নজর জানি না লাগে!
ভাদ্রও একবার সামনে তাকালো। তার মুখেও সন্তুষ্টির হাসি। বিড়বিড় করে বলল,
— দোয়া করি তোরা সারাজীবন এভাবেই একসাথে থাক।
পৌষ পার্বণ ছোট থেকেই একসাথে। কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। একজন দূরে গেলেই আরেকজন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করতো।
যদিও এখন এরকম করে না। আর এসব কথা মনে নেই। থাকলেও যে ওরা শিকার করবে তার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
আর একারণেই বড়রাও ঠিক করে ওদের বিয়ে দিবে। ছোট পৌষ পার্বণকে তাই ভাদ্র চৈত্রের বিয়ের দিনই বিয়ে পড়িয়ে দেয়।
সবাই ভেবে রেখেছিল ওদের বয়স আঠারো হলে তবেই বিয়ের ব্যাপারটা জানাবে। কিন্তু এর আগেই যে এতবড় কাহিনী ঘটে যাবে কে জানতো!
এসব ভেবেই ভাদ্রের বুক চিড়ে বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘশ্বাস।
— কাকে খুঁজছ? আমাকে বুঝি?
চমকে উঠলো বনচাঁপা। পাশে তাকাতেই নজরে এলো হেমন্তের নিষ্পাপ মুখটা।
প্রতিদিনের ন্যায় আজকে পরিপাটি নেই ছেলেটা। চুলগুলো উস্কখুস্ক, চোখ ফোলা ফোলা। মুখে এখনো পানির ফোঁটা লেগে আছে।
বুঝাই যাচ্ছে এই ছেলে সদ্যই ঘুম থেকে উঠে এসেছে। কিছু একটা ভেবে জিজ্ঞেস করেই ফেললো কথাটা।
— ঘুম থেকে উঠে আসা হয়েছে বুঝি?
স্নিগ্ধ, প্রাণবন্ত একটা হাসি দিলো হেমন্ত। ওর এই হাসি দেখে বুঝি বুকটা ধক করে উঠলো বনচাঁপার?
হ্যাঁ উঠলোই তো। নিজের সদ্য জন্মানো এই অনুভূতিটুকু পিষে ফেললো বনচাঁপা। না এই ধরনের কোনো অনুভুতিই সে জন্মাতে দিবে না।
গলা খাঁকারি দিলো বনচাঁপা। ওর কাচুমাচু মুখ দেখে নীরবে ঠোঁট কামড়ে আবারো হাসলো হেমন্ত। যা সম্পূর্ণই বনচাঁপার অগোচরে।
— হ্যাঁ। গতকাল বসন্ত আমার ঘরে ঘুমিয়ে ছিলো। আর ও কেমন জানোই তো। সারারাত বক বক করেছে যার কারণে ঘুমাতে দেরি তাই সকালে উঠতেও দেরি।
— এতো এক্সপ্লেশনের কিছু নেই। আমি এতো কথা জানতে চায়নি।
— জানিতো।
— তাহলে এতো কথা বলার মানে কি?
— আমার ভালো লাগে।
ফোস করে শ্বাস ছাড়ে বনচাঁপা। কিছু না বলেই হাটা দিলে হেমন্তও ওর পিছু পিছু যায়। আজ সাইকেল আনেনি।
গতদিনও আনেনি। বসন্তের সাইকেল নষ্ট হওয়ায় ও হেমন্তেরটা নিয়ে টানাটানি বাজিয়েছে।
এতে অবশ্য হেমন্তের লাভই হয়েছে। এই যে বনচাঁপার সাথে একই রিকশায় যেতে পারে।
পৌষরা না থাকায় সাথে সেইদিনের ঘটনার পর হেমন্তও আর বনচাঁপাকে একা ছাড়ে না। বনচাঁপাও মানা করেনা কারণ বিপদ আপদের তো কোনো সময় হয়না।
হাটতে হাঁটতেই হেমন্ত বলে উঠে,
— বললে না যে?
— কি?
— এই যে কাকে খুঁজছ?
পদযুগল থেমে গেলো বনচাঁপার। ওকে থামতে দেখে তাড়া দেখিয়ে হেমন্ত বলল,
— আরে থেমে পড়লে কেনো চাঁপা?
হেমন্তের চোখের দিকে তাকিয়ে বনচাঁপা বলে,
— কাউকে খুঁজছিলাম না।
— তবে তোমার চোখ অন্য কথা বলে কেনো?
পৌষপার্বণ পর্ব ১৪
অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো বনচাঁপা। নজর এদিক সেদিক ঘুরাতে থাকে। আসলেই সে হেমন্তের খোঁজ করছিলো।
এই দুইদিনেই অভ্যাস হয়ে গেছে কেমন। তাই আজ যখন সময় পার হয়ে গেলেও হেমন্ত আসছিল না তখন হেমন্তের বারান্দায় উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছিলো।
হেমন্ত বোধহয় বুঝলো ব্যাপারখানা। তাই প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
— তাড়াতাড়ি চলো চাঁপা দেরি হয়ে যাবে তো।
বনচাঁপাও সম্মতি জানিয়ে হাটা দিলো হেমন্তের সাথে। আর হেমন্ত আড়ালে মুচকি হাসলো।
