হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৬
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
ঘড়িতে তখন সকাল নয়টা বেজে ত্রিশ মিনিট। ব্যাস্ত পায়ে বাড়িতে ফিরে এলেন মির্জা বাড়ির কর্তা, কর্তিগন। ইকরা ও হুমায়রা মনে হাজার প্রশ্ন চাপা রেখে তাদের উদ্দেশ্যে সালাম দিলো। সালামের জবাব নিয়ে ইয়াসমিন বেগম হুমায়রাকে বললেন,
“ হুমায়রা একটু আমার রুমে এসো তো। ”
“ জ্বি, আসছি আম্মু। ”
ইকরার দিক এক পল প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শাশুড়ির পিছন পিছন হাঁটা দিলো হুমায়রা। ইয়াসমিন বেগম বোরকা খুলে হুমায়রাকে ভিতরে ডাকলেন। সন্দিহান মনে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো হুমায়রা।
“ বসো। ”
তার পাশে জায়গা দেখিয়ে বললেন ইয়াসমিন বেগম। বাধ্য মেয়ের মতো বসল হুমায়রা। এর মাঝেই ত্রস্ত পায়ে রুমে হাজির হলেন নাজমিন বেগম। দুই জা একবার চোখাচোখি করলেন। পরপর নাজমিন বেগম বলা শুরু করলেন,
“ আজকে ইকরাকে দেখতে আসবে। যেহেতু দুদিন বাদেই রোজা তাই এখনি সব হবে। ছেলে একজন ইমাম। আমার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে- একবারে লাখে একজন। ইকরাকে গতকাল আমার চাচি দেখে প্রস্তাব রেখেছেন। তোমার শ্বশুর বলছেন আগে ইকরার সম্মতি নিয়ে তাদেরকে জানাতে। এখন তুমি গিয়ে আগে ইকরার সাথে এ বিষয়ে একটু আলোচনা করে দেখো। যদি মত থাকে তাহলে আমরা কথা বলবো। আর পরীক্ষা নিয়ে কোনো টেনশন করার দরকার নেই। ছেলে এতে অমত করবে না উল্টো ওঁর পড়ালেখায় আরও সাহায্য করতে পারবে। এতে ইকরার ও সুবিধা হবে। ”
মনোযোগ সহকারে সব কথা শুনলো হুমায়রা। বরাবরের মতোই বিনয়ী স্বরে উত্তর করল,
“ আচ্ছা আমি কথা বলে দেখছি। ”
“ ইকরার কী নিজস্ব কোনো পছন্দ আছে? তোমার সাথে তো সবই বলে। ”
তড়িৎ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে নিষেধ করল হুমায়রা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন নাজমিন বেগম। বললেন,
“ আচ্ছা এখন তাহলে যাও তুমি। আর হ্যাঁ কৃশানকে আজকে বাসায় থাকতে বলো। ”
বড়ো জায়ের কথায় সায় জানিয়ে ইয়াসমিন বেগমও বললেন,
“ হ্যাঁ, তাকে বাসায় থাকতে হবে। আর ইকরার আগে তার কাছে যাও নাহলে এখনি ঢ্যাং ঢ্যাং করে চলে যাবে সে। আমার মেয়ে কখনও আমাদের মতে নিষেধাজ্ঞা জানাবে না তা আমি জানি। ”
হ্যাঁ সূচক মাথা দুলিয়ে উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরলো হুমায়রা। সেও জানে ইকরা বিয়েতে অমত করবে না। তাই আগে কৃশানের কাছে যাওয়ার জন্যই পা বাড়াল।
সকাল থেকেই মুড চাঙ্গে উঠে আছে কৃশানের। চোখে, মুখে বিরক্তি নিয়েই ভার্সিটির জন্য রেডি হচ্ছে সে। শার্টের সবগুলো বোতাম খোলা হওয়ায় ক্ষণে ক্ষণে বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে উড়ছে তা। গায়ে পারফিউম স্প্রে করে হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নিলো। পরপর পিছু ঘুরে হুমায়রাকে দেখতেই বিরক্তি আকাশ ছুঁলো ছেলেটার। এমনিতেই সকাল থেকে এই মেয়েকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে এক দন্ড ঘুমাতে পারেনি। মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু প্রশ্নের মেলা,
“ আজকাল এই মেয়েটার সামনে আসলে কেন দুর্বল হয়ে পড়ে সে? কেনই বা মেয়েটার চিন্তায় ইদানিং নিজের বন্ধুদের সাথে আড্ডা ফেলে বাসায় চলে আসে? আর গতকাল রাতে মেয়েটার জন্য মনের ভিতর যেই ব্যাকুলতা উপলদ্ধি করেছে- এর পরে তো তার মনে হচ্ছে মেয়েটা তাকে নিজের আয়ত্বেই না নিয়ে ফেলে! সেটা সে কখনোই হতে দেবে না। নিজের বিন্দাস লাইফের মধ্যে কোনো নারীর দখলদারি সে কখনোই মানবে না। এখন থেকে এই মেয়ের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ”
তার ভাবনার মাঝেই হুমায়রা মুচকি হেসে বলল,
“ ভার্সিটি যাচ্ছেন? ”
“ নাহ, ভন্ডামি করতে যাচ্ছি। সর সামনে থেকে। ”
বলেই হুমায়রা পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। সাথে সাথেই পিছন ডাকলো হুমায়রা,
“ শুনুন না, একটা কথা। ”
চেষ্টা করা সত্বেও ডাকটা উপেক্ষা করতে পারল না কৃশান। সে যেতে চাইলেও পা জোড়া যেন সায় দিচ্ছে না এমন মিষ্টি ডাকটা উপেক্ষা করার। অগ্যতা পিছু ফিরল। গম্ভীর স্বরে বলল,
“ কী চাই…? ”
নিকট এগিয়ে গেলো হুমায়রা। মানুষটাকে দেখে মনে হচ্ছে বড্ডো রেগে আছে। কথাটা বলতে কেমন যেন ভয় লাগছে মেয়েটার। তবুও সাহস নিয়ে বলল,
“ বলছি যে আজকে কী ভার্সিটি তে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে? আজকে নাকি ইকরাকে দেখতে আসবে…..”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না হুমায়রা। তাকে থামিয়ে দিয়ে কৃশান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ তো আমি কী করবো? তাদের সামনে গিয়ে নৃত্য পরিবেশন করবো? ”
“ না মানে, আপনি আজকে বাসায় থেকে গেলে ভালো হতো। ”
“ তোর কী মনে হচ্ছে না তুই আজকাল একটু বেশিই বেড়েছিস? আমার উপর হুকুমদারি করার সাহস কোথায় পাস তুই? ”
হুমায়রার দিক এগোতে এগোতে বলল কৃশান। মানুষটার সেই আগের রূপ দেখে মনে ভয় হানা দিলো মেয়েটার। তবে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে উত্তর করল,
“ আপনি যা ভাবছেন তা নয়, আসলে ওঁনারা যদি এসে মেয়ের ভাইকে বাসায় না দেখে তাহলে ব্যাপারটা কেমন না? আবার হচ্ছে আপনাদের আত্মীয়। ”
সামনে থাকা রমনীর এতো শান্ত স্বরে বলা কথাগুলোও যেন সহ্য হলো না কৃশানের। শক্ত হাতে হুমায়রা দুবাহু ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল সে। কঠোর স্বরে বলল,
“ আমাকে দেখলে কী তোর আর দশটা সংসারী ছেলের মতো মনে হয়? যে তুই যা বলবি আমি তাই শুনবো। জ্ঞান দিস তুই আমায়,ভাবছিস টা কী তুই? দুদিনের এই ভালো রূপ দেখিয়ে আমায় বশে এনে ফেলবি? সাধু পুরুষ বানিয়ে ফেলবি? তবে কান খুলে শুনে রাখ, কোনো নারীর জন্য এই বখাটে কৃশান কখনো নিজের বিন্দাস লাইফ ছাড়বে না। এসব সংসার টংসার এর প্যারায় আমি নেই। আমার থেকে দুরে থাকবি। ”
বলেই হুমায়রাকে ধাক্কা মেরে ধুপধাপ পায়ে রুম ত্যাগ করলো কৃশান। অকস্মাৎ মানুষটার এমন কঠোর আচরনের কারণ খুঁজে পেলো না মেয়েটা। বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে রইলো স্বামীর প্রস্থানের দিক। সে পথে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“ দেখা যাক আমার মোনাজাতের জোর কতদূর! ”
কাঠ ফাটা রোদ, ভ্যাপসা গরমে গা জ্বলে যাবার জোগাড়। গাছের পাতা যেন নড়তে ভুলে গেছে। খাঁ খাঁ রোদ্দুরে তপ্ত হয়ে আছে মাঠ ঘাট।
ভার্সিটির প্রাঙ্গণে বসে আছে চার বন্ধু। সবায়ই বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে কৃশানের দিক। ছেলেটা আসার পর থেকে এই অব্দি একের পর একের সিগারেট ধরিয়েই যাচ্ছে। সবাই একটা হলেও ক্লাস করেছে অথচ সে যাবে বলেও ক্লাসে যায়নি। কেন এমন করছে, কী হয়েছে? সেটাও বলছে না।
“ কিরে আর কতো ফুঁকবি? আজকে আর কোথাও যাবি না, দুপুরের খাবার কখন খাবি? ”
অতিষ্ট চিত্তে বলে উঠল রবি। তার কথায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখা গেলো না কৃশানের মাঝে। উল্টো কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল,
“ কষ্ট দিলাম অন্যকে বুক কেন জ্বলছে আমার? এতগুলো সিগারেট খেয়েও বুক জ্বলা কমছে না কেন? কী খেলে ভিতরের জ্বালা কমবে? ”
চোখ ছোট ছোট হয়ে গেলো সকলের। চার জোড়া প্রশ্নসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ হলো তার উপর। সাইফুল কণ্ঠে সন্দেহ নিয়ে জানতে চাইল,
“ কাকে কষ্ট দিয়েছিস? ”
“ তোর নানিকে! ”
কৃশানের এমন ত্যাড়া কথার পৃষ্ঠে কিছু বলার সুযোগ পেলো কেউ। এর আগেই ছেলেটা উঠে দাঁড়ালো। কোনোরূপ কথা ছাড়াই হাঁটা ধরলো। সকলে চেঁচিয়ে বলল,
“ এই কোথায় যাচ্ছিস? ”
“ জানিনা, যেখানে মন যেতে চায় সেখানেই যাবো। শান্তি লাগছে না। ”
বোকা বনে গেলো তিন বন্ধু। এতক্ষন ধরে জায়গা থেকে নড়ানো যাচ্ছিল না আর এখন কিনা নিজে নিজেই চলে যাচ্ছে! তাও তাদেরকে রেখেই? আজকাল কেমন যেন অন্যরকম লাগছে ছেলেটাকে।
মিররের সামনে নীল রঙের একটা থ্রিপিস এর সাথে হিজাব পরে বসে আছে ইকরা। পিছনে দাঁড়িয়ে হিজাবে ঠিকঠাক মতো সেফটিপিন লাগিয়ে দিচ্ছে হুমায়রা। মুখে কোনো প্রসাধনীর স্থান নেই। তবুও চেহারার বাঁকে বাঁকে উপছে পড়ছে এক অন্যরকম মায়া। সেই মায়াময় বদন খানায় দেখা মিলছে খানিক লজ্জার আভা। কেমন যেন ভিতরটা অস্বাভাবিক লাগছে ইকরার। বিয়ের কথা শুনার পর থেকেই মন গহীনে আছড়ে পড়ছে বিভিন্ন মিশ্র অনুভূতি। তবে বিয়েতে কোনো অমত নেই তার। উল্টো পাত্রকে তার আগে থেকেই পছন্দ বললেই চলে।
ছোটোবেলা থেকেই নানু বাড়িতে গেলে লোকটাকে মাঝে মাঝে দেখতে পেতো সে। কখনো কোনো মেয়ের দিক চোখ তুলেও তাকাতো না। বুঝ হওয়ার পর আর দেখা হয়নি অবশ্য। অনেকদিন পর গতকাল আসার সময় হঠাৎ রাস্তায় দেখেছিল। তখনও মাটির দিক চেয়ে হাঁটছিল লোকটা। ইকরার বাবার সাথে কথা বলার মাঝেই একবার চোখ পড়েছিল মানুষটার উপর। এরপর আর ফিরে তাকায়নি সে। কেননা তার মনে লোকটার প্রতি ভালোলাগা কাজ করলেও সেটা নিতান্তই একজন ভালো পুরুষ হিসেবে অন্য কোনো অনুভূতি ছিল না। কিন্তু এখন যে ঐ মানুষটাই তার স্বামী হতে চলেছে ভাবলেই বুক কাঁপছে।
“ মাশাআল্লাহ, একদম হুরপরী লাগছে আমার সখিকে। তোর ভালো পুরুষ দেখলে তো এবার চোখ নামাতে পারবেন না। ”
“ ধুর, এসব বলিস না সখি! আমার লজ্জা লাগছে!”
ইকরার কথায় খিলখিল করে হেসে উঠলো হুমায়রা। তখন ছেলের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার সময় ইকরা বলেছিল, সে চিনে লোকটাকে। অনেক ভালো- এ কথা শুনার পর থেকেই হুমায়রা শুধু কথায় কথায় “ তোর ভালো পুরুষ ” বলে জ্বালাচ্ছে তাকে। বান্ধবীর লজ্জামাখা মুখখানা দেখে মুচকি হাসল হুমায়রা। বলল,
“ আচ্ছা উনারা মিনিট খানেকের মধ্যেই এসে পড়বেন এর আগেই আমি রান্নাঘরে চলে যাই। ”
” ভাইয়া কী আজকেও ভার্সিটি চলে গেছে? ”
চলন্ত পদ যুগল থেমে গেলো হুমায়রার। মনে পড়ে গেলো সকালের কথা। এতক্ষন ব্যাস্ততার মাঝে ওসব মনেই রাখে নি সে। পিছু ফিরে বলল,
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৫
“ হুঁ, ইনশাআল্লাহ এসে পড়বে উনি। চিন্তা করিস না। ”
একই উত্তর সকালে শাশুড়ি মাকেও দিয়েছিল হুমায়রা। কোনো এক অজানা কারণেই তার মন বলছে কৃশান আসবে। এতো কিছুর পরেও কেন এই আশা বেঁচে আছে তার মনে- জানা নেই। শুধু সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করে যাচ্ছে যেন মানুষটা আসে। সময় ফুরালেও তার মন পরিবর্তন হচ্ছে না। হয়তো সৃষ্টিকর্তা তার ডাক কবুল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
