হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৭
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
বাড়িময় সরগম, লোকজনের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠেছে মির্জা বাড়ির ড্রয়িং রুমটা। প্রতিদিন বিকেলের দিকে যেখানটায় নিঃস্তব্ধতা বিরাজ করে আজ সেখানে খুশির আমেজ পড়েছে। ইয়াসমিন বেগম এর পুরো চাচার(আপন নয়,বাড়ির পাশের) পরিবার এসেছেন ইকরাকে দেখতে। যদিও উনারা বলেছিলেন ছেলে ও তার মা- বাবাকে পাঠাতে তবে নিজের চাচার পরিবার বিদায় ইয়াসমিন বেগম বারবার ফোন করে বলেছেন যেন প্রত্যেকে আসে। তার এতো অনুরোধে আর না এসে পারেন নি উনারা।
ইয়াসমিন বেগমের চাচা বেঁচে নেই, চাচি নূরনাহার বেগম ও তার এক ছেলে নাসির মোল্লা, তার স্ত্রী হালিমা বেগম। তাদের দুই ছেলে এক মেয়ে। বড়ো ছেলে হুজাইফা আল উমর- যার জন্য ইকরাকে পছন্দ করা হয়েছে। ছোট ছেলে আবদুল্লাহ আল আজাদ। একমাত্র মেয়ে খাদিজাতুল কোবরা- ক্রমানুসারে পরিবারের মেজো সন্তান। বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক একটা বাচ্চাও আছে।
বাড়িতে প্রবেশ করে চেনা মুখগুলো দেখে কপাল কুঁচকে গেলো কৃশানের।
“ এগুলো এখানে কী করছে? আর আজকে না ইকরাকে দেখতে আসার কথা! এক মিনিট, তাহলে কী এরাই সেই আত্মীয় যাদের কথা হুমায়রা সকালে বলছিল? এরাই দেখতে এসেছে ইকরাকে? ”
দরজার সামনে কৃশানকে এমন চিন্তিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভিতর থেকে নূরনাহার বেগম বলে উঠলেন,
“ আরে এটা কী আমাদের সেই ছোট নাতিটা? কথায় কথায় রেগে আগুন হয়ে যেত যে? ”
বৃদ্ধার কণ্ঠে সম্বিৎ ফিরল কৃশানের। সকলের উৎসুক দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হলো তার উপর। সবার দৃষ্টিতেই প্রশ্ন। সেই ছোট বেলার পর কৃশানকে কেউই দেখতে পায়নি। যার দরুণ চিনতে একটু দ্বিধা হচ্ছে। নাসির মোল্লা আঙুল তাক করে জানতে চাইলেন,
“ কৃশান…? ”
“ হ্যাঁ। ”
না চাইতেও উত্তর করল কৃশান। পরপর সবগুলো দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে হাঁটা দিল রুমের উদ্দেশ্যে। একবার আড় চোখে পুরো ড্রয়িং রুমে খুঁজল কাঙ্ক্ষিত একটা মুখ। তবে তার অস্তিত্বও নেই সেখানে।
“ ফুপি ওঁটা কে? ”
খাদিজার প্রশ্ন কানে পৌঁছাতেই থমকে গেলো কৃশানের চলন্ত পা যুগল। তৎক্ষনাৎ পিছু ঘুরে তাকাল সে। দেখল রান্নাঘরের দিকে আঙুল তাক করা খাদিজার।
রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে মাত্র সেখানে উপস্থিত হলেন ইয়াসমিন বেগম। তার হাতে খাবারের ট্রে এগিয়ে দিয়েছে হুমায়রা। মানুষজন আসার পর থেকে একবারও রান্নাঘর থেকে বের হয় নি সে। শুধু মাঝে মাঝে রান্নাঘরের দোয়ার অব্দি খাবার এগিয়ে দিয়েছে। তাও আবার এক হাতে হিজাব দিয়ে মুখ ঢেকে। যেখানে নিজের শ্বশুরদের সামনে যাওয়া থেকেই বিরত থাকার চেষ্টা করে। সেখানে এতগুলো মানুষের সামনে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না। বুঝ হওয়ার পর নিজের মামা ব্যাতিত আর কোনো পুরুষের সামনে যায়নি সে। তবে ভাগ্যক্রমে সেদিন সামনে পড়েছিল বখাটে কৃশানের। এখন সেই পুরুষটাই তার স্বামী।
ভাইয়ের মেয়ের প্রশ্নে ইয়াসমিন বেগম মুচকি হেসে উত্তর করলেন,
“ ওঁটাও আমাদেরই মেয়ে। আমার ছে….. ”
কথা সম্পূর্ন করতে পারলেন না ইয়াসমিন বেগম। তার আগেই নূরনাহার বেগম বলে উঠলেন,
“ আরে তোর আরেকটা মেয়ে আছে আগে বলবি ইয়াসমিন? তো সেও কী মাদ্রাসায় পড়ে? ”
“ হুঁ, ইকরার সাথেই পড়ে। ”
মুগ্ধ হলেন বৃদ্ধা। আজকাল এমন মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। যেহেতু চোখের সামনে মেয়ে পেয়েই গেছেন তাই সে সুযোগটা আর হাত ছাড়া করতে চাইলেন না তিনি। বললেন,
“ মাশাআল্লাহ, একটা কাজ করলেই তো পাড়ি আমার দুই নাতির জন্য তোর দুই মেয়েকে নিয়ে……”
“ ওঁ শুধু এ বাড়ির মেয়ে নয়। এ বাড়ির বউ। ”
আকস্মিক একটা ভরাট স্বর ভেসে আসলো পিছন থেকে। থেমে গেলো সরব পরিবেশ। সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল সেই কণ্ঠের মালিক। কৃশানের কথা শুনে নূরনাহার বেগম চুপসে যাওয়া মুখে বললেন,
“ এ বাড়ির বউ! ও আচ্ছা নাজমিনের ছেলের ব…..”
“ এ বাড়ির ছোট ছেলের বউ! আর আপনারা যে কাজে এসেছেন সে কাজ করুন। আশেপাশে নজর দেওয়া ভালো লক্ষন নয়। ”
আবারও সেই একই গলার জোরে জবান থামল বৃদ্ধের। এবার কথাটা আজাদের দিক তাকিয়ে বলল কৃশান। চোখে মুখে তার এক অদ্ভুদ কাঠিন্য। কৃশানের ওমন দৃষ্টিতে রান্নাঘরের থেকে চোখ সরিয়ে আনল তৎক্ষনাৎ। তখন মেয়েটার চোখ দেখেই মুগ্ধ হয়েছিল সে। বোনের কাছে জানতে চেয়েছিল মেয়েটা কে? তার কথাতেই হুমায়রার পরিচয় জানতে চেয়েছিল খাদিজা।
এরপর থেকে সেই রমণীকে দেখার উদ্দেশ্যে বারবার রান্নাঘরের দিক তাকাচ্ছে ছেলেটা- যা চোখ এড়ায়নি কৃশানের। তার এমন ত্যাড়া কথায় অসুন্তুষ্টি ফুটে উঠলো বৃদ্ধার মুখে। জলিল মির্জা ছেলের দিকে শাসানো চোখে তাকালেন। সেদিকে লাপাত্তা কৃশান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে খলিল মির্জা বললেন,
“ এটা আমাদের কৃশানের বউ। আমার ছেলের বউ ঠিক করা আছে ঈদের পর এসে বিয়ে করবে। ”
“ ওহ, আচ্ছা তাইতো বলি তোমাদের আরেক মেয়ে থাকলে আমি দেখলাম না কেন! ”
এ ব্যাপারে কেউই আর কোনো কথা বাড়ালেন না। নাজমিন বেগম ও ইয়াসমিন বেগম সবার উদ্দেশ্যে খাবার এগিয়ে দিলেন। অতঃপর আপ্যায়নে মগ্ন হলেন বাড়ির কর্তা কর্তি গণ।
ফ্রেশ হয়ে কোনোমতে গায়ে একটা টিশার্ট জড়িয়ে আবারও ড্রয়িং রুমে এলো কৃশান। ঘরে কিছুতেই মন টিকছে না তার। বারবার মনে হচ্ছে ঐ লাফাঙ্গাটা আবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে না তো। হলোও তাই ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই দেখতে পেলো আজাদ উঁকি ঝুঁকি দিয়ে রান্নাঘরের দিক তাকাচ্ছে। মেজাজ চওড়া হলো ছেলেটার। পা বাড়াতে নিবে তখনি কল এলো রবির নাম্বার থেকে। মেজাজ একেবারে চারশ আশিতে পৌঁছাল। তবে ফোন ধরল। বলল,
“ অসময়ে ফোন দেওয়া কী তোর হরমোন গত স্বভাব! ”
“ এই লাফাঙ্গা, কোথায় আছিস তুই? কখন আসছিস আড্ডায়? ”
“ আড্ডার মায়েরে বৃদ্ধা আঙুল, এইদিকে আমার সংসার নিয়া টানাটানি, তে আসছে আড্ডা নিয়া! ফোন রাখ কুলাঙ্গা কোথাকার! ”
বলেই আঙুল চেপে ফোন রেখে দিলো সে। ওপাশের ব্যাক্তির উত্তর শোনারও প্রয়োজন বোধ করল না। নিজে কী বলেছে এসবেও গ্রাহ্য করল না।
ড্রয়িং রুমে তখন নারী দের উপস্থিতি নেই, সবাই ইকরার ঘরে গেছে। আর উমরের বাবাকে নিয়ে বাইরের পরিবেশ দেখাতে গেছেন জলিল মির্জা ও খলিল মির্জা। সে ধপ করে এসে বসল আজাদের পাশে। একেবারে রান্নাঘর আড়াল করে বসেছে। অসময়ে কৃশানের এমন আগমনে ঘাবড়ে গেলো আজাদ। আমতা আমতা করে বলল,
“ আরে কৃশান ভাই আপনি! ”
“ বয়স কতো তোর? ”
কৃশানের শক্ত চেহারা দেখে গলা শুকিয়ে কাঠ হলো যুবকের। মেকি হেসে বলল,
“ বাইশ। ”
“ দু বছরের জুনিয়র! ”
কাধে হাত রেখে বলল কৃশান। ঠোঁটে হাসি থাকলেও চেহারার মাঝে এক অদ্ভুত কঠোরতা ফুটে উঠছে তার। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আজাদের কানের কাছে মুখ নিলো। ধারালো স্বরে বলল,
“ বয়সের পার্থক্যটা মাত্র দুবছরের হলেও তোমার দুটো চোখ তুলে ফেলতে আমার দুমিনিট সময় লাগবে না জুনিয়র। আমি কিন্তু তোমাদের মতো সাধু পুরুষ নই। সুতরাং চোখে লাগাম টানো, বেঁচে থাকার স্বপ বুনো। ”
বলেই প্যান্ট এর পকেটে হাত দিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে রান্নাঘরের দিক চলে গেলো কৃশান। তার যাওয়ার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আজাদ। এমন কঠিন কথা আজ অব্দি শুনে নি ছেলেটা।
“ এই বারবার ওদিকে কেন যাচ্ছিস তুই? ”
সহসা পরিচিত মানুষটার কণ্ঠ পেয়ে কর্মরত হাত টা থেমে গেলো হুমায়রার। তড়িৎ গতিতে পিছু ফিরে তাকালো সে। কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দেখতে পেয়ে মুখে হাসি ফুটলো। বলল,
“ আপনি কখন এলেন? ”
মেয়েটার ক্লান্ত মুখপানে চেয়ে আর ঘাড়ত্যাড়া উত্তর দিলো না কৃশান। বলল,
“ কিছুক্ষণ আগে! ”
“ ওহ, সবার সাথে দেখা হয়েছে? ”
“ হুঁ, তুই এটা বল বারবার ওদিকে যাচ্ছিস কেন? ”
ওদিক বলতে রান্নাঘরের দক্ষিণ দিকটাকে বুঝাচ্ছে কৃশান। দক্ষিণ দিক গেলে ড্রয়িং রুম থেকে তাকে দেখা যায়। অবশ্য মুখ দেখা যায় না শুধু পিছনটা দেখা যায়। তবে এই ব্যাপারটাও সহ্য হচ্ছে না কৃশানের। তার কথায় চোখ ছোট ছোট করে তাকাল হুমায়রা। আবারও সেদিক যেতে যেতেই বলল,
“ ওখানেই তো সব রাখা! এখানে তো শুধু চুলা টাই আছে! ”
মেয়েটা দু’ তিন কদম গেলো কী গেলো না এর আগেই কোমড়ের মধ্যে অনুভব করল এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত। বিদ্যুৎ শক খাওয়ার মতো কেঁপে উঠল তার তনু দেহ খানা। বিস্ময়ে চোখ জোড়া হাঁসের ডিমের মতো আকার ধারন করল। ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে নিবে এর আগেই পায়ের নিচ থেকে মাটির অস্তিত্ব সরে গেলো। নিজেকে হাওয়ায় অনুভব করতেই ভয়ে দুহাতে ঝাপটে ধরল স্বামীর দুকাঁধ। বাক হারাল মেয়েটা। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সামনের পুরুষটির দিকে।
রান্নাঘরের একেবারে উত্তর দিকে এনে হুমায়রাকে নামিয়ে দিল কৃশান। পরপর নিজে দক্ষিণ দিকটায় গিয়ে দাঁড়াল। বলল,
“ কী লাগবে বল আমি দিচ্ছি। খবরদার ওদিক থেকে নড়বি না। ”
হামায়ার কানে ঢুকলে তো সেসব কথা! মেয়েটা তখনও ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। নিজেকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে হচ্ছে কোনো স্বপ্নের রাজ্যে চলে গেছে সে। কৃশানের কান্ড আর কথা শুনে একেবারে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যেন আজ নড়লেই ব্যালান্স হারাবে।
এইদিকে হুমায়রার এমন দৃষ্টিতে সম্বিৎ ফিরল কৃশানের। সে এতক্ষন কী করেছে কী বলেছে- মনে পড়তেই আফসোসে চোখ মুখ খিচে নিল সে। হাত দিয়ে ঘাড় ডলে তাকাল ড্রয়িং রুমের দিক। দেখল আজাদ এখনও একই জায়গায় বসে তবে চোখ তার অন্যদিকে। কিন্তু এই ছেলেকে বিশ্বাস নেই। তাই এখান থেকে তার নড়া ঠিক হবে না।
“ কিন্তু সে কেন এতকিছু ভাবছে মেয়েটাকে নিয়ে? কোনোভাবে কী জেলাস ফিল হচ্ছে তার! ”
মস্তিষ্কের এমন ভাবনায় প্রবল নিষেধাজ্ঞা জানাল তার কঠোর মন।বলল,
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৬
“ ধুর, তার কেন জেলাস ফিল হতে যাবে? আর এমনিতেও এ মেয়েটা এখন এ বাড়ির বউ যদিও সে মানে না। কিন্তু এ বাড়ির সবাই তো মানে এবং তার বোনের বান্ধবী হিসেবে মেয়েটাকে কুনজর থেকে বাঁচানো কোনো ভুল নয়। ”
মস্তিষ্ক কে নিজের মতো বুঝিয়ে ধমিয়ে দিল সে। অব্যাহত রইল নিজের কাজে। তবে আসলেই কী তাই..?
