ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৫+৪৬
তানিশা ভট্টাচার্য্য
কলকাতার ব্যস্ত জীবনে ফিরে আসার পর দিনগুলো যেন দ্রুতবেগে কেটে যেতে লাগল। ফেব্রুয়ারি মাস মানেই পরীক্ষার মাস, আর চৌধুরী নিবাসের অন্দরমহলে এখন কেবলই বইয়ের পাতার শব্দ। তানভীর ক্লাস ইলেভেনের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তাই সে এখন বই খাতার গোলকধাঁধায় বন্দি।
অন্য দিকে, ঋষির কলেজের পাঠ চুকেছে। সে এখন আর্ভিকের পাশে দাঁড়িয়ে অফিসের গুরুদায়িত্ব সামলাচ্ছে। তবে শত ব্যস্ততার মাঝেও আর্ভিক তানভীর পড়াশোনার সবটুকু খেয়াল নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। অফিসের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে আর্ভিকের প্রথম কাজই হলো তানভীর পড়ার টেবিলে উঁকি দেওয়া। কোনো কঠিন অঙ্ক যখন তানভীকে নাজেহাল করে ছাড়ে, আর্ভিক তখন ধীরস্থিরভাবে পাশে বসে তাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়। ওর সহজ ব্যাখ্যায় জটিল অঙ্কগুলোও যেন মুহূর্তেই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ইংরেজিতে কোনো সমস্যা থাকলে সোহাগও সাহায্য করে।
আর্ভিকের নজরদারি কেবল পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নেই। তানভী যাতে পরীক্ষার চাপে অসুস্থ হয়ে না পড়ে, সেজন্য সে একটা রুটিন তৈরি করে দিয়েছে। কখন তানভী খাবার খাবে, কখন টানা পড়ার পর রেস্ট নেবে—সবই আর্ভিকের নখদর্পণে। মাঝে মাঝে পড়ার ফাঁকে আর্ভিক নিজেই ফলের রস বা এক বাটি ড্রাই ফ্রুটস নিয়ে ওর রুমে হাজির হয়।
পরীক্ষা দিয়ে এসে পড়ন্ত বিকেলে তানভী জানালার বাইরে কলকাতার ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু ক্লান্ত বোধ করছে, তখন আর্ভিকের একটা ছোট্ট টেক্সট এল—”মন দিয়ে পড়, আর কয়েকটা দিন মাত্র”—টেক্সট টা পড়ে তানভীর শরীরে নতুন করে এনার্জি ফিরে এল।
পরীক্ষার মাঝে দু-দিনের বিরতি পেয়েছে তানভী। এই দুদিনের ছুটির পর একাউন্ট্যান্সির পরীক্ষা তাই এই সময়টা সে খুব ভালো ভাবে কাজে লাগাবে বলে ভেবে নিল। তাই কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়া শুরু করে দিয়েছে সে। সকাল থেকে একাউন্ট্যান্সির জটিল ছকে মাথা খুঁড়তে খুঁড়তে ঠিক যখন ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁল, তখন ওর পেটের ভেতর খিদেটা জানান দিতে শুরু করল। বইপত্র গুছিয়ে তানভী নিচে নামল, তখন বৈঠকখানায় বড়মা অর্থাৎ রাখী রায়চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয়।
রাখী রায়চৌধুরী তানভীকে দেখে একটু অবাক হয়েই বললেন
-“কী রে গুল্লু? এত সকালে নিচে যে! কিছু লাগবে তোর?”
তানভী পেটে হাত বুলিয়ে করুণ মুখে বলল
-“হ্যাঁ বড়মা, খুব খিদে পেয়েছে। মনে হচ্ছে পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।”
রাখী রায়চৌধুরী হেসেই খুন
-“আচ্ছা আয়, বস। আমি খাবার দিচ্ছি। তবে তার আগে একটা কাজ করবি মা?”
তানভী কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে বলল
-“হ্যাঁ বড়মা বলো না, কী করতে হবে?”
রাখী রায়চৌধুরী রান্নাঘরের দিকে এগোতে এগোতে বললেন
-“একটু তোর আর্ভিক ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর তো, দুপুরে ও কী খাবে? আমি কি রুটি বানাব নাকি পরোটা? তাহলে সেই মতো আমি ব্যবস্থা করতাম।”
তানভী ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
-“কেন বড়মা? উনি কী ভাত খান না। দুপুরবেলা কেউ রুটি-পরোটা খায় নাকি?”
রাখী রায়চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
-“আরে পাগলি মেয়ে, কাল যে শিবরাত্রি! শিবরাত্রির আগের দিন নিয়ম অনুযায়ী একবার মাত্র ভাত খেতে হয়,আর সম্পূর্ণ নিরামিষ খেতে হয়। আর তোর আর্ভিক ভাই রাতে ভাত খায়।”
তানভী আরও অবাক হয়ে গেল
-“তাতে আর্ভিক ভাইয়ের কী সম্পর্ক? উনি তো এসব মানেন না নিশ্চয়ই!”
রাখী রায়চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন
-“ভুল জানিস গুল্লু। তোর আর্ভিক ভাই মহাদেবের অনেক বড় ভক্ত, সে প্রতি সোম-শুক্রবার ব্রহ্ম মুহূর্তে উঠে স্নান করে শিব মন্দিরে পুজো দিতে যায়, আর নিয়ম করে প্রতি বছর শিবরাত্রির উপোস করে।”
তানভী যেন আকাশ থেকে পড়ল। আর্ভিকের মতো একজন আধুনিক, গম্ভীর আর বাস্তববাদী মানুষ শিবরাত্রির উপোস করে? বিশ্বাসই হতে চাইছে না ওর। ও অস্ফুট স্বরে বলল
-“আর্ভিক ভাই শিবরাত্রি করেন! সত্যি বলছো বড়মা?”
-“হ্যাঁ রে বাবা। যা, ওকে একটু জিজ্ঞেস করে আয়। ও বোধহয় নিজের রুমে নেই, তিন তলার জিমে গেছে শরীরচর্চা করতে। ওখানেই পাবি।”
বড়মার কথামতো তানভী তিন তলার দিকে পা বাড়াল। তানভীর মাথায় তখন হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ও শুনেছে শিবরাত্রির উপোস মানে অনেক কঠোর উপোস। আগের দিন একবার অন্ন আহার, তারপর ব্রতের দিন নির্জলা উপোস করে চার প্রহরে বাবার মাথায় জল ঢালা। সারা রাত জেগে মহাদেবের আরাধনা করে পরের দিন চতুর্দশী তিথি ছাড়ার পর তবেই উপোস ভাঙা। এই কঠিন কাজটা আর্ভিক ভাই করেন কী করে? এসব ভাবতে ভাবতেই তানভী জিমের দরজার কাছে পৌঁছে গেল।
ভেতরে ঢুকতেই তানভী একদম থ মেরে দাঁড়িয়ে গেল। জিমের ভেতরে তখন আর্ভিক কঠোর পরিশ্রমে মগ্ন। ওর পরনে একটা কালো রঙের ফিটেড জিম ওয়েস্ট আর শর্টস। আর্ভিক তখন মেঝেতে হাত রেখে পুশ-আপ দিচ্ছিল। ওর প্রতিটি পেশি যেন পাথর খোদাই করা মূর্তির মতো জেগে উঠেছে। সারা শরীর ঘামে ভেজা, সেই ঘামের কণাগুলো জিমের কৃত্রিম আলোয় মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। আর্ভিকের পুরুষালি ব্যক্তিত্বে ঘরের পরিবেশটা যেন একদম বদলে গেছে। আর্ভিকের এই সুঠাম বডি আর একাগ্রতা দেখে যেকোনো মেয়েই যে জ্ঞান হারাবে, তানভীরও এর ব্যাতিক্রম হল না। ও দরজার পাশে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল, মুখ দিয়ে একটা কথা বের করার ক্ষমতাও যেন সেই মুহূর্তের জন্য হারিয়ে ফেলেছে।
ভেতরের গুমোট গরমে আর্ভিকের শরীরের ঘাম চুইয়ে মেঝেতে পড়ছে। প্রতিটি পুশ-আপের সাথে ওর পিঠের পেশিগুলো ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে, আবার সটান হয়ে যাচ্ছে। তানভী ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল, ওর হৃদস্পন্দন তখন নিজের কানেই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। আর্ভিক উল্টো দিকে মুখ করে ব্যায়াম করছিল, কিন্তু হঠাৎই ওর ভরাট কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল
-“কিছু বলবি নাকি?”
তানভী চমকে উঠল,সে ভাবলো
“আর্ভিক ভাই তো উল্টো দিকে ঘুরে আছেন, তবে আমাকে কী করে দেখলেন? ওনার পিঠে কী কোনো অদৃশ্য ক্যামেরা আছে?”
তানভী কোনো উত্তর দিতে পারল না আর্ভিকের প্রশ্নের, ওর গলার কাছে যেন কিছু একটা আটকে গেছে। আর্ভিক উঠে দাঁড়াল। তারপর মন্থর গতিতে, শিকারি নেকড়ের মতো তানভীর দিকে এগোতে শুরু করল। ওর সেই ঘামে ভেজা, সুঠাম দেহের বলিষ্ঠতা দেখে তানভী অজান্তেই এক পা এক পা করে পিছিয়ে যেতে লাগল।
পেছাতে পেছাতে হঠাৎ তানভীর পিঠ গিয়ে ঠেকল দেওয়ালে। পালানোর আর কোনো পথ নেই। কিন্তু আর্ভিক থামল না। ও একদম তানভীর একদম খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তানভীর মনে হচ্ছে সে পালাতে পারলে বাঁচে। আর্ভিক হঠাৎ হাতটা বাড়িয়ে দিল, তানভী ভয়ে আর উত্তেজনায় দু-চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। ও ভাবল, হয়তো আর্ভিক হয়তো ওকে কিছু করবে। কিন্তু পরক্ষণেই একটা কাপড়ের খসখসে শব্দ হলো। তানভী এক চোখ খুলে দেখল, আর্ভিক তানভীর ঠিক কানের পাশ থেকে দেওয়ালে ঝোলানো তোয়ালেটা টেনে নিয়েছে।
আর্ভিক তানভীর একেবারে কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল
-“চোখ বন্ধ করলি কেন? আমি কি বাঘ যে তোকে এখনই খেয়ে ফেলব?”
তানভী কোনোমতে ঢোক গিলল, ওর মুখ দিয়ে কোনো কথা বলল না। সে মনে মনে বলল
“আপনি বাঘের থেকেও বেশি কিছু।”
আর্ভিক তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। তারপর নির্লিপ্ত গলায় জিজ্ঞেস করল
-“কী জন্য এখানে এসেছিস?”
তানভী আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল
-“বড়… বড়মা জিজ্ঞেস করছিল, দুপুরে আপ…আপনি রুটি খাবেন না পরোটা?”
আর্ভিক কিছুক্ষণ তোয়ালে দিয়ে নিজের মুখ আর চওড়া বুক মুছল। তারপর আবার আচমকা তানভীর দিকে এগিয়ে এল। তানভী দেওয়ালে আরও সেঁটে গেল। আর্ভিক এবার তানভীর ঠিক মাথার পাশে দেওয়ালে হাত রেখে ওর ওপর একটু ঝুঁকে দাঁড়াল। আর্ভিকের শরীর থেকে আসা তপ্ত উত্তাপ আর পুরুষালি ঘ্রাণ তানভীকে দিশেহারা করে দিচ্ছিল।
আরভিক তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল
-“এরকম তোতলাচ্ছিস কেন? তোকে কতবার বারণ করেছি আমতা আমতা করে কথা না বলতে! ভালো করে কথা বলতে পারিস না? যা, বড়মাকে বল আমি পরোটা খাব।”
আর্ভিকের গভীর চাউনি তানভীকে যেন সম্মোহিত করে ফেলল। ও কোনোমতে মাথা নেড়ে জিম থেকে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এল।
জিম থেকে একপ্রকার দৌড়ে পালানোর পর তানভী যখন বড়মার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ওর বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। কোনোমতে দম নিয়ে ও হাঁপাতে হাঁপাতে বলল
-“বড়মা… আর্ভিক ভাই পরোটা খাবেন।”
রাখী রায়চৌধুরী অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন
-“ঠিক আছে মা, কিন্তু তুই এমনভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন? কী হয়েছে তোর?
-“কিছু না বড়মা।”
-“আচ্ছা আয়, আগে খাবারটা খেয়ে নে।”
তানভী নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
-“না বড়মা, আমার আর একদম খিদে নেই, আমি পরে খাব।”
কিন্তু বড়মা কি আর সে কথা শোনেন? ওনার কড়া শাসনে তানভীকে শেষমেশ জলখাবার খেতেই হলো। খাবার টেবিলে বসেও ওর মনের ভেতর বারবার জিমে ঘটে যাওয়া দৃশ্যটা ভাসছিল।
খাওয়া শেষ করে তানভী বসার ঘরের সোফায় একটু গা এলিয়ে দিয়েছিল মাত্র, ঠিক তখনই সিঁড়িতে ভারী জুতোর শব্দ শোনা গেল। আর্ভিক স্নান সেরে অফিসের জন্য একদম ফিটফাট হয়ে নিচে নামছে। ওর পরনে ইস্ত্রি করা ঝকঝকে নেভি ব্লু শার্ট, চোখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। সোফায় তানভীকে বসে থাকতে দেখেই আর্ভিক দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা যেন তীরের মতো তানভীর দিকে ধেয়ে এল। কটমট করে তাকিয়ে আর্ভিক বলল
-“তোর পড়াশোনা নেই? পরশুদিন ফাইনাল পরীক্ষা আর তুই এখানে নবাবনন্দিনীর মতো সোফায় বসে আরাম করছিস? এবার যদি পরীক্ষায় এক নম্বরও কম এসেছে, তবে তোকে তুলে এক আছাড় দেব। মনে থাকে যেন!”
আর্ভিকের বাজখাঁই গলা আর আছাড় দেওয়ার হুমকিতে তানভীর তন্দ্রা এক নিমেষে উধাও। কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পেল না ও; সোফা ছেড়ে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটল। তানভীর দৌড় দেখে আর্ভিকের গম্ভীর মুখে এক চিলতে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। আর্ভিক জানে, এই একটু ভয় না দেখালে মেয়েটা শেষ মুহূর্তে ঢিলেমি দেবে। এরপর আর্ভিক ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে মাকে তাড়া দিয়ে বলল
-“মা, খাবার দাও। আজ অফিসে খুব জরুরি মিটিং আছে, তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে।”
রাখী রায়চৌধুরী হাসিমুখে ছেলের পাতে গরম পরোটা তুলে দিলেন। আর্ভিক দ্রুত খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
পড়ন্ত বিকেলে আকাশটা ঠিক যেন আবির মাখা। শীতের শেষ আর বসন্তের শুরুর এই সন্ধিক্ষণটায় বাতাসে এক অদ্ভুত উদাসীনতা থাকে। তানভী ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখছিল, দূরে গঙ্গার বুকে সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। বিকেলের নরম সোনাঝরা আলো ওর মুখে এসে পড়তেই এক মায়াবী আবেশ তৈরি হলো।
হঠাৎ তানভীর নজর গেল কোণের দিকে রাখা একটা ছোট টবে। সেখানে একটা টকটকে লাল গোলাপ ফুটে আছে। মাস কয়েক আগে আর্ভিক নিজ হাতে এই চারাটা ওর জন্য এনে দিয়েছিল। গোলাপটার দিকে তাকিয়ে তানভীর মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা, যেদিন আর্ভিক চারাটা হাতে দিয়ে বলেছিল— “গাছটা তোর মতো তানভী; বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় খুব নরম, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য কাটার মতো জেদও ওর ভেতরে আছে। যত্ন করিস এটাকে।” সেদিনের পর থেকে তানভী রোজ নিয়ম করে গাছটার দেখাশোনা করে, কিন্তু গ্ৰামে থেকে আসার পর আর পরীক্ষার ব্যাস্ততায় সে গাছটার কথা ভুলে গেছিল। তানভী গাছটার কাছে গেল গাছটার গোড়ায় অনেক আগাছা জন্মেছে সেগুলো কে পরিষ্কার করে জল দিল। তানভী আনমনেই গোলাপের পাপড়িটা একবার ছুঁয়ে দেখল; বিকেলের নির্জন ছাদে আর্ভিকের স্মৃতিটুকু যেন ওর মনের পাতায় এক পশলা বসন্তের হাওয়া দিয়ে গেল।
রাত তখন প্রায় সাড়ে নয়টা। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে আর্ভিকের গাড়ির শব্দ শোনা গেল। নিজের ঘরে একাউন্ট্যান্সির জটিল লেজার নিয়ে বসে থাকলেও তানভীর কান ছিল দরজার দিকে। আর্ভিক আজ বেশ দেরি করে ফিরেছে। তানভীর একটা বড় অঙ্ক কিছুতেই মিলছে না, ব্যালেন্স শিটটা যেন এক অবাধ্য ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তানভী ভাবল “আর্ভিক ভাই সবে অফিস থেকে ফিরলেন, এখন যাওয়া কি ঠিক হবে?” কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, কালই পরীক্ষা, এই সমাধানটুকু না পেলে আজ রাতে ওর চোখে ঘুম আসবে না।
সাহস সঞ্চয় করে তানভী আর্ভিকের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা সামান্য ভেজানো ছিল, ভেতর থেকে আলোর রেখা এসে পড়েছে করিডোরে। তানভী আলতো করে ধাক্কা দিতেই দেখল ঘর ফাঁকা, তবে ওয়াশরুম থেকে জলের শব্দ আসছে। তানভী দ্বিধা না করে আর্ভিকের ধবধবে সাদা চাদর পাতা বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আর্ভিকের ফোনটা বেজে উঠল। একবার রিং হয়ে কেটে যাওয়ার পর আবার কল এল। তানভী ভাবল, হয়তো কোনো জরুরি কল, তাই সে কৌতূহলবশত ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল—অচেনা নম্বর। কিছু একটা ভেবে তানভী ফোনটা কানে তুলল। ওপার থেকে এক গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এল
-“আমি কি মিস্টার এভি রয়-এর সঙ্গে কথা বলছি?”
নামটা শুনেই তানভীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। কোচিং থেকে ফেরার পর একদিন অভিক সাহেব যখন টিভি দেখছিলেন তখন নিউজ চ্যানেলে এই ‘এভি রয়’ নামটা ও শুনেছিল। আর্ভিক ভাইয়ের সাথে এই নামের কী সম্পর্ক? তানভী গলা ঝেড়ে সংক্ষেপে উত্তর দিল
-“সরি, রং নাম্বার।”
বলেই ফোনটা কেটে দিল। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে তানভী দ্রুত ফোনটা যথাস্থানে রেখে আগের মতো শান্ত হয়ে বসল। আর্ভিক বের হয়ে এল,পরনে কালো টি-শার্ট আর ছাই রঙের ট্রাউজার। ভেজা চুলগুলো কপালের ওপর অবাধ্য হয়ে ঝুলে আছে, সেখান থেকে দু-এক ফোঁটা জল চুইয়ে পড়ছে। তানভীকে দেখে আর্ভিক বিন্দুমাত্র অবাক হলো না, বরং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে বলল
-“কী ব্যাপার ম্যাডাম? এত রাতে হঠাৎ এই গরীবের ঘরে আপনার পদার্পণ?”
তানভী অপরাধী মুখে অঙ্কটা এগিয়ে দিয়ে বলল
-“আর্ভিক ভাই, এই জায়গাটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না।”
আর্ভিক তানভীর পাশে বসতেই তানভী নিচু স্বরে বলল
-“সরি, আপনি সবে ফিরেছেন, তার মধ্যেই আমি বিরক্ত করতে চলে এলাম।”
আর্ভিক একবার রাগী চোখে তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“এই মেয়ে! আমি কি তোকে কিছু বলেছি? অকারণে ক্ষমা চাওয়াটা কি তোর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে?”
আর্ভিকের নিপুণভাবে পেন নিয়ে কয়েক মিনিটে অঙ্কটা সমাধান করে দিল। বোঝানো শেষ হলে তানভী যখন ওঠার তোড়জোড় করছে, তখনই ওর ফোনের কথা মনে পড়ল। ও মৃদু স্বরে বলল
-“আর্ভিক ভাই, আপনার ফোনে একটা কল এসেছিল। আপনি ওয়াশরুমে ছিলেন বলে আমি ধরেছিলাম।”
আর্ভিক দরজার দিকে এগোচ্ছিল কফির আনতে, কিন্তু তানভীর কথা শুনে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। ঘুরে তাকিয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল
-“কে কল করেছিল?”
-“জানি না, অচেনা নম্বর। তবে লোকটা এভি রয়-এর খোঁজ করছিল।”
মুহূর্তের জন্য আর্ভিকের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল ও নিজেকে সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে জিজ্ঞেস করল,
-“তুই কী বললি?”
-“আমি বললাম রং নাম্বার।”
আর্ভিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-“ঠিক আছে। অঙ্ক তো বোঝা হয়েছে, এবার নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমো। কাল পরীক্ষা।”
তানভী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আর্ভিক দ্রুত ফোনটা তুলে নিয়ে বেলকনিতে বেরিয়ে এল। কুয়াশাচ্ছন্ন কলকাতার রাতের দিকে তাকিয়ে ও সেই অচেনা নম্বরে আবার কল করল।
চৌধুরী নিবাসের বিশাল লোহার গেটটা পেরিয়ে তানভী ভেতরে পা রাখল, ওর মনের ভেতর পরীক্ষার শেষ হওয়ার এক পরম স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বস্তি মুহূর্তেই আনন্দে রূপ নিল যখন এক ছোটখাটো ঝড় ধেয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল। তৃষাণ! তানভী অবাক হয়ে ভাইকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে ওর গালে একটা গভীর স্নেহের চুমু খেয়ে বলল
-“তৃষু! তুই এখানে? কবে এলি?”
তৃষাণ দিদির হাত ধরে টানতে টানতে বলল
-“দিভাই, তোকে ছাড়া কি আমার হোলি জমে? প্রতিবার তো আমরা একসাথেই রঙ খেলি, তাই বাবাকে বলে সোজা এখানে চলে এলাম। চল, তোর জন্য কত কী এনেছি দেখবি!”
ভেতরে ঢুকতেই বড়মা স্নেহের হাসি দিয়ে বললেন
-“গুল্লু এসেছিস? যা মা, হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়।”
তানভী উপরে গিয়ে চটপট তৈরি হয়ে নিচে আসতেই দেখল, বৈঠকখানা যেন রঙের দোকান! লাল, নীল, সবুজ, হলুদ থেকে শুরু করে হরেক রকমের আবির আর সাথে বাহারি পিচকারি। তানভী হেসে বলল
-“পুরো দোকানটাই তুলে এনেছিস নাকি রে তৃষু?”
তৃষাণ খিলখিল করে হেসে উঠল। তানভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই একমুঠো গোলাপি আবির তানভীর গালে মাখিয়ে দিয়ে সে এক দৌড়! তানভীও ছাড়ার পাত্রী নয়; ও একহাতে গোলাপি আর অন্যহাতে হলুদ আবির নিয়ে ভাইয়ের পিছু ধাওয়া করল। বাড়ির উঠোনে, যেখানে গাড়ি পার্ক করা থাকে, সেখানে শুরু হলো দুই ভাই-বোনের লুকোচুরি। হঠাৎ তৃষাণ এক মুঠো আবির তানভীকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ল, কিন্তু তানভী নিপুণভাবে সরে যেতেই সেই গোলাপি আবির গিয়ে আছড়ে পড়ল ঠিক গাড়ি থেকে নামা এক দীর্ঘকায় মানুষের ওপর।
আর্ভিক! কালকে দোল পূর্ণিমা তাই জন্য আজ অফিস তাড়াতাড়ি ছুটি হয়েছে বলে সে সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছে। ওর ধবধবে সাদা শার্টে এখন গোলাপি রঙের এক বিমূর্ত আলপনা। মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তানভী আর তৃষাণের হৃৎপিণ্ড যেন গলা দিয়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। আর্ভিক স্থির হয়ে গাড়ির দরজায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর্ভিকের শীতল, নিরাসক্ত দৃষ্টিটা ওদের ওপর নিবদ্ধ। তৃষাণ ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আর্ভিক ধীর পায়ে এগোতে শুরু করল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি অশনি সংকেত। আর্ভিক সরাসরি এসে দাঁড়াল তানভীর একদম সামনে। তানভীর দু-হাত তখনও আবিরে মাখা। আর্ভিক কোনো কথা না বলে তানভীর ডান হাতটা আলতো করে ধরে নিজের বাম গালে ছোঁয়াল। হাতের সেই গাঢ় গোলাপি আবির মুহূর্তেই আর্ভিকের গাল রাঙিয়ে দিল। তানভী নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল আর্ভিকের সেই মায়াবী রূপ। এরপর আর্ভিক যেন আরও একধাপ এগিয়ে এল; তানভীর খুব কাছে ঘেঁষে এসে নিজের গাল দিয়ে তানভীর গালটা ঘষে দিল। এক অপার্থিব রোমান্টিক আবেশে তানভীর শরীর শিউরে উঠল। আর্ভিকের গালে লেগে থাকা আবির তানভীর গালে লেগে গেল।
এরপর আর্ভিক পিছন ফিরল তৃষাণের দিকে। তৃষাণ তখন কাঁপতে কাঁপতে আবিরের প্যাকেটটা উঁচু করে ধরল তার দিকে। আর্ভিক কোনো কথা না বলে প্যাকেটটা ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিল এবং পুরোটা আবির তৃষাণের মাথায় উপুড় করে ঢেলে দিল। তৃষাণ মুহূর্তেই এক গোলাপি ভূত হয়ে গেল! আর্ভিক এক চিলতে বিজয়ের হাসি হেসে গাম্ভীর্য বজায় রেখেই ভেতরে ঢুকে গেল। তৃষাণ ভূত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলল
-“দিভাই, আর্ভিক ভাইয়া কিছু বলল না দেখলি?”
তানভী শুধু অস্ফুট স্বরে বলল
-“হুম, দেখলাম তো।”
কিন্তু মনে মনে বলল— ‘বাপরে! এই রাবণটা এত ভালো মানুষ কবে থেকে হলো?’ আর্ভিকের গালের সেই ছোঁয়াটা তখনো তানভীর গালে আগুনের মতো জ্বলছে, যা বসন্তের এই বিকেলের চেয়েও অনেক বেশি রঙিন।
ফ্রেশ হয়ে আর্ভিক ঘর থেকে বেরোচ্ছিল, রাখী রায়চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন
-“কোথায় যাচ্ছিস বাবা?”
আর্ভিক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল
-“মা, নীলাদ্রি আর প্রেম ডাকল, ওদের ওখানই যাচ্ছি।”
রাখী রায়চৌধুরী সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। আর্ভিক বেরিয়ে যাওয়ার পর ওপরতলায় তানভীর রুমে তখন হাসির রোল। গোল্ডির সাথে খুনসুটিতে মেতেছে তৃষাণ আর তানভী। ঠিক সেই সময় তানভীর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রিকি আর মেঘাদ্রির নাম—দুজনে কনফারেন্স কলে হাজির।
রিকি ফোনের ওপার থেকে চিৎকার করে উঠল
-“কিরে তানভী! কাল কিন্তু হোলি সেলিব্রেশন মিস করা চলবে না। বিশাল বড় মাঠে প্যান্ডেল হয়েছে, গান-বাজনা আর রঙের তুফান ছুটবে!”
তানভী একটু ইতস্তত করে বলল
-“তোরা তো জানিসই রে, ভিড়ভাট্টা আমার একদম সয় না। অত লোকের মাঝে যেতে ইচ্ছে করে না।”
মেঘাদ্রি তখন কোমল স্বরে বলল
-“সব বছর তো একা একাই খেলিস, এবার না হয় আমাদের সাথে একটু মজা করলি? দেখবি ভালো লাগবে। আসিস কিন্তু!”
তানভী অস্ফুট স্বরে বলল
-“আচ্ছা ঠিক আছে, আর্ভিক ভাইকে বলে দেখব উনি যদি নিয়ে যান তবে যাব।”
ওদিকে নীলাদ্রিদের ড্রয়িংরুমে আড্ডা জমে উঠেছে। নীলাদ্রির মা হালকা কিছু খাবার দিয়ে গেছেন, আর আর্ভিক কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। কথায় কথায় নীলাদ্রি আর্ভিক কে জিজ্ঞেস করল
-“কিরে ভাই, কালকের কী প্ল্যান? আসছিস তো মাঠে?”
প্রেম পাশ থেকে টিপ্পনী কাটল
-“আরে ভাই, তুই কার কাছে আবদার করছিস? এই আর্ভিক গত নয় বছরে কি একবারও হোলি খেলেছে? ও তো রঙের ধারেকাছেও ঘেঁষবে না।”
আর্ভিক কফির কাপটা নামিয়ে রেখে খুব সহজ গলায় বলল
-“কাল আসব আমি।”
মুহূর্তের জন্য ঘরে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল। প্রেম আর নীলাদ্রি যেন নিজেদের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। যে আর্ভিক রায়চৌধুরী রঙের নাম শুনলে দু-হাত দূরে থাকে, তার মুখে এ কী কথা! প্রেম তো রীতিমতো আর্ভিকের কপালে আর গলায় হাত দিয়ে দেখতে শুরু করল। আর্ভিক বিরক্ত হয়ে বলল
-“উফ! কী করছিস কী প্রেম?”
প্রেম অবাক হয়ে বলল
-“দেখছি তোর শরীর ঠিক আছে কি না! তুই হোলি খেলবি বলছিস?”
নীলাদ্রি ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে বলল
-“বিশেষ কারণ তো একটা আছেই।”
প্রেম বাঁকা হেসে চোখ টিপে বলল
-“হুমমম, বুঝেছি! আসল কারণ তো তানভী, তাই তো?”
আর্ভিক মুখটা গম্ভীর করে বলল
-“এরকম ভাবে বলার কী আছে? তুই যেন সোহাগের সাথে রঙ খেলবি না!”
প্রেম হো হো করে হেসে উঠে আড়চোখে আর্ভিককে বলল,
-“আরে ভাই কুল! ঠিক আছে, আগে আমারা তোকে ভূত বানাবো, তারপর না হয় বউয়ের সাথে খেলিস। এত বছরের ইচ্ছা তোকে রঙ মাখিয়ে ভূত বানানোর সেটা পূরণ করতে হবে না!”
আর্ভিক এবার গম্ভীর গলার আড়ালে গভীর আবেগ মিশিয়ে বলল
-“কোনো মতেই নয়! কাল সর্বপ্রথম আমি আমার সোনা বউয়ের হাতেই রঙ মাখব, তারপর বাকি সব।”
প্রেম আর নীলাদ্রি হাসিতে ফেটে পড়ল। প্রেম ইয়ার্কি করে বলল
-“বাহ্! যে মানুষটা এতদিন রঙ এড়িয়ে চলত, সে এখন সোহাগী বর হওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া! প্রেমের টানে পাথরও দেখি গলে জল হয়!”
ওদের হাসাহাসির মাঝে আর্ভিক শুধু জানলার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কালকের সেই রঙিন সকালটার ছবি আঁকতে লাগল।
বসন্তের প্রথম আলো চৌধুরী নিবাসের বারান্দায় এসে পড়ছে, চারপাশের বাতাসে এক মাতাল করা আবিরী গন্ধ। তানভী আজ খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নিল সে; পরনে ধবধবে সাদা রঙের একটি কুর্তি সেট। সাদার ওপর সূক্ষ্ম কাজ করা।
একটা রুপোলি থালায় হরেক রঙের আবির সাজিয়ে তানভী প্রথমে নিজের রুমে থাকা গোপাল ঠাকুরের কাছে গেল। পরম ভক্তিতে গোপালকে রঙের ছোঁয়া দিয়ে প্রণাম সেরেছে মাত্র, এমন সময় ঘরের দরজায় এক দীর্ঘ ছায়া পড়ল। আর্ভিক দাঁড়িয়ে আছে। ওর পরনেও আজ সাদা পাঞ্জাবি। বিছানায় তখনও তৃষাণ অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আর্ভিক ধীর পায়ে এগিয়ে এল তানভীর দিকে। ওর হাতে থাকা ছোট প্লেটটা লাল আবিরে টইটম্বুর।
তানভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্ভিক এক মুঠো লাল আবির তানভীর দু-গালে সযত্নে মাখিয়ে দিল। আর্ভিকের আঙুলের তপ্ত ছোঁয়ায় তানভীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। আর্ভিক মৃদু হেসে বলল
-“কাল তো আমাকে রঙ মাখিয়ে ভূত বানিয়েছিলি, আজ আমার পালা। শুভ দোল পূর্ণিমা, তানভী!”
তানভীও হার মানার পাত্রী নয়। ও নিজের থালা থেকে দু-মুঠো আবির নিয়ে আর্ভিকের সুঠাম দু-গালে লেপে দিল। লাল আবিরের রঙে আর্ভিকের মুখাবয়ব যেন আরও মায়াবী হয়ে উঠল। তানভী নিচু হয়ে আর্ভিকের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করতে গেলে আর্ভিক তড়িৎগতিতে সরে দাঁড়িয়ে বাধা দিল। গম্ভীর স্বরে বলল
-“বারবার বারণ করেছি না, পায়ে হাত দিবি না একদম!”
এরপর আর্ভিক ঘুমন্ত তৃষাণের দিকে এগিয়ে গেল
-“তোজো বাবু, ওঠো! হোলি খেলতে যাবে না?”
হোলি শব্দটা কানে যেতেই তৃষাণ স্প্রিংয়ের মতো বিছানায় উঠে বসল। দু-চোখ কচলাতে কচলাতে বলল
-“আর্ভিক ভাইয়া! চলো চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
নিচে নেমে ওরা বড়দের আশীর্বাদ নিল। রাখী রায়চৌধুরী আর অভিক সাহেবের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম সেরে ওরা তিনজন যখন সদর দরজায় পৌঁছাল, তখন ঋষির সাথে দেখা হল। তানভী এগিয়ে গিয়ে ঋষিকে প্রণাম করতে চাইলেও ঋষি ম্লান হেসে বাধা দিল। ও আলতো করে তানভীর কপালে একটু আবিরের টিপ পরিয়ে দিল। তানভী এক গাল হেসে ঋষির গালে রঙ লাগিয়ে জিজ্ঞেস করল
-“ভাইয়া, তুমি যাবে না আমাদের সাথে?”
ঋষি শুধু মাথা নেড়ে বলল
-“না রে, তোরা যা। আমি বাড়িতেই আছি।”
তানভী আর কথা বাড়াল না, ঋষির নিভৃতচারী স্বভাবের কারণটা ওর অজানা নয়। বাইরে তখন আর্ভিকের বুলেট বাইকটা গর্জন করে উঠল। তৃষাণ মহানন্দে বাইকের সামনের ট্যাঙ্কের ওপর চড়ে বসল। আর্ভিক হেলমেটটা ঠিক করে নিয়ে তানভীকে পেছনে বসার ইশারা করল।
বাইক যখন সেই বিশাল ময়দানটায় পৌঁছাল, তখন চারপাশটা যেন এক রঙের মহোৎসব! বড় বড় স্পিকারে ধুমধাড়াক্কা গান বাজছে, আর আবিরের মেঘে আকাশটা রঙিন হয়ে আছে। চারদিকে চেনা-অচেনা মানুষের ভিড়, হুল্লোড় আর হাসির ফোয়ারা। আর্ভিক বাইক থামিয়ে হেলমেটটা খুলতেই রিকিরা সবাই ধেয়ে এল। তানভী সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকাল, তারপর আর্ভিকের আত্মবিশ্বাসী চোখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে পা বাড়াল সেদিকে।
মাঠের আবহাওয়া তখন বসন্তের উন্মাদনায় মাতোয়ারা। মাইকে তারস্বরে বাজছে গানের তাল, আর বাতাসে উড়ছে আবিরের রঙিন মেঘ। প্যান্ডেলের নিচে ভিড়টা যেন এক রামধনু হয়ে জমেছে। রিকি আর মেঘাদ্রিকে দেখা গেল এক কোণে। মেঘাদ্রির ফর্সা গালে নীল আবিরের ছোঁয়া দিয়েছে রিকি। মেঘাদ্রি যখন একটু কপট রাগ দেখিয়ে চোখ রাঙাল, রিকি তখন সুযোগ বুঝে ওর কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল
-“রঙ তো অনেকেই মাখাবে মেঘাদ্রি, কিন্তু আমার দেওয়া এই নীল আবির টুকু তোর স্মৃতিতে ধ্রুবতারা হয়ে থাকুক।”
মেঘাদ্রি লাজুক হেসে রিকির দিকে আবির ছুঁড়ে দিতেই শুরু হলো এক খুনসুটি ভরা রোমান্টিক লুকোচুরি। পাশে দাঁড়িয়ে প্রেম আর সোহাগ তখন হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে।
মাঠের মাঝখানে তখন অন্য কাণ্ড! তৃষাণ হাতে একটা বড় সাইজের পিচকারি নিয়ে আর্ভিক কে তাক করে এগোচ্ছিল। ও লক্ষ্যস্থির করে পিচকারি টিপতেই আর্ভিক নীলাদ্রির সাথে কথা বলতে পাশ কাটিয়ে সরে গেল, আর সেই লাল রঙের ধার গিয়ে পড়ল এক অচেনা বাচ্চা মেয়ের ফ্রকে। মেয়েটি কোমর বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠল
-“ও পচা দাদা! আমায় ভেজালে কেন? দাঁড়াও, মজা দেখাচ্ছি!”
মেয়েটি পাল্টা পিচকারি নিয়ে তেড়ে আসতেই তৃষাণ চিল-চিৎকার করে এক দৌড়ে গিয়ে লুকোল তানভীর পিছনে। মেয়েটির পিচকারি থেকে বেরোনো রঙের ফোয়ারা তানভীকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করল না; সেকেন্ডের মধ্যে তানভীর ধবধবে সাদা কুর্তিটা ভিজে একদম গায়ের সাথে লেপ্টে গেল।
আর্ভিক নীলাদ্রি আর প্রেমের সাথে কথা বললেও ওর দৃষ্টি ছিল সবসময় তানভীর ওপর। আর্ভিক এক মুহূর্তের জন্য গিয়েছিল ওদের জন্য শরবত আনতে। ফিরে আসতেই আর্ভিকের কপালে ভাঁজ পড়ল। ও দেখল তানভী তখন ভিজে একসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভিজে কাপড়ে ওকে জবুথবু লাগছে। আর্ভিক দু-গ্লাস শরবত তানভী আর তৃষাণের হাতে ধরিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল
-“তোর তো এই অবস্থা! আর হোলি খেলতে হবে না, চল বাড়ি ফিরি।”
তানভী আমতা আমতা করে বলল
“আর্ভিক ভাই, সবে তো এলাম…আর একটু খেলি না।”
আর্ভিক কোনো প্রতিবাদ শুনল না। ও জানে তানভী এই ভিজে কাপড়ে বেশিক্ষণ থাকলে নির্ঘাত জ্বর বাঁধাবে। আর্ভিক ওদের নিয়ে হাঁটা দিতেই চারপাশ থেকে নীলাদ্রি আর প্রেম চেঁচিয়ে উঠল
-“একি আর্ভিক! মাত্র এক ঘণ্টা হলো এলি, এর মধ্যেই মাঠ ছাড়ছিস?”
আর্ভিক ফিরে তাকিয়ে ছোট করে জবাব দিল
-“এক ঘণ্টাই যথেষ্ট।”
আর্ভিকের অটল জেদের সামনে আর কেউ কথা বলার সাহস পেল না। আর্ভিক একপ্রকার আগলে নিয়ে তানভী আর তৃষাণকে গাড়ির দিকে নিয়ে চলল।
গাড়িতে ওঠার আগে আর্ভিক একবার তানভীর দিকে তাকাল। ভিজে কুর্তিতে কাঁপতে থাকা তানভীকে দেখে ওর চোখের মণি দুটো যেন একটু বেশিই আর্দ্র হয়ে উঠল। আর্ভিক নিজের রুমালটা বার করে তানভীর কপালে লেগে থাকা রঙের ফোঁটাটা মুছিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল
-“বাড়ি গিয়েই আগে গরম জলে স্নান করবি, বুঝেছিস?”
তানভী শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল।
হোলির রঙিন হুল্লোড় শেষ হতে না হতেই একটা ধূসর বিষণ্ণতা গ্রাস করল তানভীকে। রঙ খেলে আসার পর দুপুর থেকেই তার শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল, বিকেলের দিকে সেই অস্বস্তি রূপ নিল প্রবল কম্পনে। রাত তখন আটটা। জানলার বাইরে বসন্তের বাতাস বইলেও তানভীর মনে হচ্ছিল হাড়কাঁপানো শীত। একটা ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে ও যখন নিজের রুমে কুঁকড়ে শুয়ে ছিল, তখনই আর্ভিক তৃষাণকে ওর বাড়িতে রেখে ফিরে এল। সারা বাড়ি খুঁজেও তানভীকে না পেয়ে আর্ভিক যখন তানভীর রুমের দরজায় দাঁড়াল, ওর বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
-“তানভী?”
আর্ভিক মৃদু স্বরে ডাকল। কোনো সাড়া নেই। আর্ভিক ধীর পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে বসল। উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আর অস্ফুট গোঙানি শুনে আর্ভিক যখন তানভীর কপালে হাত রাখল, তখন ওর হাতটা যেন আগুনের ছোঁয়ায় ছ্যাঁৎ করে উঠল। তানভীর গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। আর্ভিক আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। চিৎকার করে মাকে ডাকল ও। রাখী রায়চৌধুরী রুমে ঢুকে আঁতকে উঠলেন
-“একি! বিকেলেও তো মেয়েটা ভালো ছিল, হঠাৎ এমন জ্বর এল কী করে?”
আর্ভিক নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
-“মা, তুমি ওর কাছে বসো। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি। আর তুমি ওর জন্য হালকা কিছু খাবার নিয়ে এসো, খালি পেটে ওষুধ দেওয়া যাবে না।”
রাখী রায়চৌধুরী খাবার আনতে গেলে আর্ভিক সন্তর্পণে তানভীকে পাঁজাকোলা করে বসাল। জ্বরের ঘোরে তানভী চোখ মেলতে পারছিল না, ওর মাথাটা বারবার আর্ভিকের চওড়া কাঁধে ঢলে পড়ছিল। রাখী রায়চৌধুরী খাইয়ে দেওয়ার পর আর্ভিক নিজ হাতে ওকে ওষুধটুকু খাইয়ে দিল। এরপর মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল
-“মা, সারাদিন তোমার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। তুমি যাও, বিশ্রাম নাও। আজ রাতে আমি ওর কাছে থাকছি।”
রাখী রায়চৌধুরী আপত্তি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আর্ভিকের অনড় দৃষ্টির সামনে তিনি হার মানলেন। সারারাত চলল এক নীরব যুদ্ধ। আর্ভিক এক মুহূর্তের জন্য দুচোখের পাতা এক করেনি। কখনো ভিজে রুমাল দিয়ে তানভীর কপালে জলপট্টি দিচ্ছে, কখনো ওর পায়ের তলায় তেল মালিশ করে দিচ্ছে। মধ্যরাতে জ্বরের উত্তাপ যখন মাত্রা ছাড়াল, আর্ভিক পরম যত্নে তানভীর মাথা ধুইয়ে দিয়ে সন্তর্পণে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে ভিজে চুলগুলো শুকিয়ে দিল, যাতে আবার ঠান্ডা না লাগে। সারারাতের এই সেবায় আর্ভিকের নিজের চোখে ক্লান্তি নামলেও একমুহুর্তের জন্য ঘুমায়নি।
পরদিন সকাল সাতটা। দিনের আলো ঘরে ঢুকতেই আর্ভিক দেখল তানভীর গায়ের উত্তাপ অনেকটাই কমেছে, ওর শ্বাস-প্রশ্বাস এখন স্বাভাবিক। সারারাতের বিনিদ্র যন্ত্রণার পর আর্ভিকের নিজের এখন একটু সতেজ হওয়া প্রয়োজন। ও দ্রুত একটা শাওয়ার নিয়ে নিচে নামল। ডাইনিং টেবিলে রাখী রায়চৌধুরী কে দেখে ও ধীর গলায় বলল
-“মা, এক কাপ কফি দাও। অফিসে বেরোতে হবে।”
রাখী রায়চৌধুরী উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞেস করলেন
-“গুল্লু কেমন আছে রে?”
আর্ভিক জানালার বাইরের উজ্জ্বল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল
-“এখন ঠিক আছে। তবে ওকে এখন একদম দৌড়ঝাঁপ করতে দিয়ো না। খাওয়া-দাওয়ার ওপর কড়া নজর রেখো।”
জলখাবার খেয়ে আর্ভিক বেরিয়ে গেল অফিসের জন্য।
জানালার পর্দা চিরে আসা চড়া রোদ তানভীর চোখের পাতায় পড়ল, তখন ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারোটা ছুঁয়েছে। ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করতেই মাথাটা বনবন করে ঘুরে উঠল ওর। শরীরের প্রতিটি হাড় যেন বিদ্রোহ করছে, এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর দুর্বলতা ওকে শয্যাশায়ী করে রাখতে চাইছে। তবুও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে বিছানা থেকে উঠে গিজার চালিয়ে গরম জলে স্নান সেরে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ফ্যাকাশে মনে হচ্ছিল ওর, যেন এক রাতের ঝড়ে কোনো সজীব লতা নুয়ে পড়েছে।
ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখল বসার ঘরে রাখী রায়চৌধুরী নিবিষ্ট মনে টিভি দেখছেন। তানভীকে দেখেই তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন
-“গুল্লু! উঠেছিস মা? আয়, আমার কাছে এসে বোস। আমি তোর খাবার নিয়ে আসছি।”
রাখী রায়চৌধুরী যত্ন করে ওকে হালকা কিছু খাবার খাইয়ে দিলেন। খাওয়া শেষে তানভী বড়মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।
-“এখন কেমন লাগছে মা?”
রাখী রায়চৌধুরী শুধোলেন। তানভী চোখ বুজেই উত্তর দিল
-“হ্যাঁ বড়মা, এখন অনেকটা ভালো। জ্বরটা বোধহয় আর নেই।”
রাখী রায়চৌধুরী মৃদু হেসে তানভীর চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন
-“জ্বর থাকবে কী করে মা? তোর আর্ভিক ভাই যে কাল সারারাত এক ফোঁটা চোখের পাতা এক করেনি। রাতভর তোর সেবা করেছে ও।”
কথাটা শোনামাত্রই তানভী তড়িৎস্পৃষ্টের মতো উঠে বসল। বিস্ময়ে ওর চোখদুটো গোল গোল হয়ে গেল।
-“আর্ভিক ভাই? কাল সারারাত… আমার সেবা করেছেন?”
রাখী রায়চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন
-“হ্যাঁ রে। ও ছোট থেকেই তোর প্রতি বড্ড বেশি কেয়ারিং। তোর সামান্য আঁচ লাগলেও ও সইতে পারে না। জানিস গুল্লু, তুই যখন একদম ছোট্ট ছিলি, আর্ভিক সবসময় তোকে আগলে রাখত। তোকে কাঁধে বসিয়ে ও সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াত। আর বলত— ‘দেখো মা, এটা আমার লিটল প্রিন্সেস’। তোর যখন এক বছর বয়স, একবার খুব জ্বর হয়েছিল তোর। আর্ভিক তখন নিজে ছোট হয়েও আমার সাথে সারারাত জেগে ছিল। কালকেও আমাকে তোর কাছে থাকতেই দিল না। জেদ করে নিজে রাত জাগল।”
বড়মার প্রতিটি শব্দ তানভীর হৃদয়ে এক একটা ঢেউ তুলছিল। যে মানুষটাকে ও সারাক্ষণ রাগী, গম্ভীর আর ‘রাবণ’ বলে মনে করে, তাঁর আড়ালে এমন এক সমুদ্রসম মমতা লুকিয়ে আছে? আর্ভিক ভাইয়ের সেই নিভৃত সেবার কথা ভেবে তানভীর বুকের ভেতরটা এক অজানা আবেশে ভরে উঠল। ও মনে মনে ভাবল
“আর্ভিক ভাই আমার জন্য এতকিছু করেছেন? অথচ আমি শুধু ওনার শাসনের দিকটাই দেখেছি!”
রাখী রায়চৌধুরী আবার হাসতে হাসতে পুরনো স্মৃতি হাতড়ালেন
-“তুই তো সারাক্ষণ ওর ওপর রাগ করতিস, আবার খেলার সঙ্গী হিসেবেও ওকেই চাইতিস। মনে আছে, একবার আর্ভিকের জন্মদিনে তোদের আসতে দেরি হচ্ছিল বলে আর্ভিক কেক কাটবে না বলে জেদ ধরে বসে ছিল? সমস্ত নিমন্ত্রিত অতিথি দাঁড়িয়ে রইল, অথচ তুই না আসা পর্যন্ত ও কেক কাটলই না!”
তানভী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
-“আর্ভিক ভাইয়ের জন্মদিন কবে বড়মা?”
রাখী রায়চৌধুরী একটু অবাক হয়ে তাকালেন
-“ভুলে গেছিস? ১৫ই আগস্ট। আমাদের স্বাধীনতা দিবসেই তোর আর্ভিকের জন্ম।”
তানভী একটা অপ্রস্তুত আর বোকা হাসি হাসল। ওর মনের আয়নায় এখন ভেসে উঠছে আর্ভিকের সেই শান্ত গম্ভীর মুখটা। আর্ভিকের প্রতি তানভীর এক গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোলাগায় মনটা সিক্ত হয়ে উঠল।
সন্ধ্যার আবছায়া তখন আকাশ ছাপিয়ে চৌধুরী নিবাসের অলিন্দে নেমে এসেছে। ঠিক ছয়টার সময় আর্ভিকের গাড়িটা এসে থামল। সারাদিনের অফিসের ধকল আর বিনিদ্র রজনীর ক্লান্তি ওর চোখেমুখে স্পষ্ট থাকলেও, বাড়ি ঢোকার মুহূর্তে আর্ভিকের অস্থির দৃষ্টিজোড়া কারোর একটা অনুপস্থিতি অনুভব করে কুঁচকে গেল। সারা ড্রইংরুমে একবার চোখ বুলিয়ে নিল, কিন্তু যে মুখটি দেখার প্রত্যাশায় ওর মনের গহন কোণে এক অস্থিরতা কাজ করছিল, তাঁর দেখা মিলল না। রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রাখী রায়চৌধুরী বেরিয়ে এলেন। ছেলেকে দেখে এক গাল হেসে বললেন
-“এসে গেছিস বাবা? যা ফ্রেশ হয়ে আয়, আমি তোকে কফি দিচ্ছি।”
আর্ভিক কোনো উত্তর না দিয়ে তার হাতে থাকা বিরিয়ানির প্যাকেটটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। গম্ভীর অথচ উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল
-“মা, তানভী কোথায়? রুমে আছে ? ওর শরীর এখন কেমন আছে? জ্বর এসেছিল আর?”
তানভী বিরিয়ানি বলতে অজ্ঞান। জ্বরের তিতকুটে স্বাদে ওর মুখের রুচি চলে গেছে নিশ্চিত, তাই অফিস থেকে ফেরার পথে আর্ভিক ওর প্রিয় খাবারটি সাথে করে নিয়ে এসেছে, যাতে প্রিয় স্বাদে অন্তত মেয়েটার মুখে একটু হাসি ফোটে। কিন্তু রাখী রায়চৌধুরী বিরিয়ানির প্যাকেটটা হাতে নিয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন
-“সে তো নেই রে বাবা। তোর রুদ্র আঙ্কেল এসে বিকেলে ওকে নিয়ে গেল। পরীক্ষা শেষ, তাই কদিন নিজের বাড়িতে গিয়ে থাকবে বলে মেয়েটা চলে গেল।”
কথাটা শোনামাত্র আর্ভিকের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাতের মুঠোটা অজান্তেই একবার বন্ধ হয়ে আবার খুলে গেল। মনের ভেতরে একরাশ অভিমান আর ক্রোধের মেঘ যেন মুহূর্তেই ঘনীভূত হলো। তানভী একবার দেখা করার প্রয়োজনটুকুও মনে করল না? এক মুহূর্তের জন্য আর্ভিকের মনে হলো, সারা বাড়ির নিস্তব্ধতা যেন তাকে কে উপহাস করছে। আর্ভিক কিছু না বলে নিজের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় রাখী রায়চৌধুরী পিছন থেকে ডাকলেন,
-“তুই মুখ-হাত ধুয়ে আয়, খাবার দিচ্ছি আমি।”
আর্ভিক এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তারপর পিছনে না ফিরেই কাঠখোট্টা গলায় বলল
-“আমার কিছুই লাগবে না মা, আমাকে ডেকো না।”
নিজের রুমে ঢুকে আর্ভিক সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। সেই শব্দটা যেন শূন্য বাড়িতে একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে গেল।
রাতে রাখী রায়চৌধুরী বারংবার আর্ভিককে খাওয়ার জন্য ডাকলেন, কিন্তু দরজার ওপার থেকে শুধু একটাই উত্তর এল
-“খিদে নেই মা, আমায় ডেকো না।”
আর্ভিকের এই খিদের চেয়েও বড় এক শূন্যতা ওর বুকের ভেতর হাহাকার করছে।
অন্যদিকে, নিজের বাড়িতে ফিরেও তানভীর এক মুহূর্তের জন্য শান্তি নেই। ওর সারাক্ষণ মনে হচ্ছে, আসার আগে অন্তত একবার আর্ভিক ভাইয়ের সাথে দেখা করে আসা উচিত ছিল। আর্ভিক ভাই যে ওর জন্য সারারাত জেগেছিল, সেই কৃতজ্ঞতাটুকুও জানানো হলো না। মনের ছটফটানি কমাতে তানভী ফোনটা হাতে নিল। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে আর্ভিকের চ্যাটে গিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে একটা লম্বা মেসেজ টাইপ করল।
“আর্ভিক ভাই, আমি জানি আপনি হয়তো আমার ওপর খুব রেগে আছেন। বলে না এসে খুব বড় ভুল করেছি আমি। আসলে বাবা হঠাৎ এসে নিয়ে এল আমায়। কিন্তু আমার মনটা পড়ে আছে ওখানেই। আপনি কাল সারারাত জেগে আমার জন্য যা করেছেন, সেটার জন্য আমি চিরঋণী। আপনার শরীরটা ঠিক আছে তো? প্লিজ রাগ করে থাকবেন না, একবার মেসেজটা দেখে অন্তত একটা রিপ্লাই দেবেন। আপনার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।”
মেসেজটা লিখে সেন্ড করে দিল। কিন্তু ঘণ্টা পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সেই মেসেজে ‘ব্লু টিক’ পড়ল না। আর্ভিক সিন করেনি। তানভী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা পাশে রেখে দিল ভাবল হয়তো উনি খুব ব্যস্ত। কিন্তু দিন দুই কেটে যাওয়ার পরও যখন মেসেজের কোনো উত্তর এল না, এমনকি সিন-ও হলো না, তখন তানভীর দুশ্চিন্তার বাঁধ ভেঙে গেল। ও রুমে একা বসে থাকে, চোখ ভিজে আসে বারবার। রুদ্র বাবু মেয়ের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন। তিনি রুমে ঢুকে মেয়ের পাশে বসে বললেন
-“কী হয়েছে মামণি? দুদিন ধরে দেখছি তোমার মনটা খারাপ। কেউ কি কিছু বলেছে?”
তানভী আর সামলাতে পারল না। বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল
-“বাবা, আমি আর এখানে থাকতে পারছি না। আমি ও-বাড়িতে যেতে চাই।”
রুদ্র বাবু অবাক হয়ে কারণ জানতে চাইলে তানভী মাথা নিচু করে ইতস্তত করে বলে ফেলল ওর মনের কথাটা
-“বাবা তুমি কথাটা শুনে রাগ করো না। আসলে আমি আর্ভিক ভাইকে ভালোবেসে ফেলেছি। কখন কেন আর কী ভাবে এর উত্তর নেই আমার কাছে। প্লিজ বাবা আমায় আর্ভিক ভাইকে এনে দেবে?”
রুদ্র বাবু রেগে যাওয়ার বদলে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি হাসলেন।
-“আর্ভিকের মতো ছেলে তোমার জন্য পাওয়া ভাগ্যের কথা মামণি। কিন্তু বিয়ে তো দুজনের সম্মতিতে হয়। তুমি আর্ভিককে ভালোবাসো ঠিকই, কিন্তু আর্ভিক তোমাকে কী চোখে দেখে সেটা জানতে হবে। আর তোমার তো বয়স মাত্র সতেরো। যদি আর্ভিক তোমাকে সত্যি ভালোবাসে, তবে তোমার বিয়ের বয়স হলে আমি নিজে তোমাদের চার হাত এক করে দেব।”
বাবার আশ্বাস পেয়ে তানভী যেন হাতে চাঁদ পেল। এক বুক আশা নিয়ে সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। তানভী জানে না আর্ভিক তাকে ভালোবাসে কি না কিন্তু রুদ্র বাবুর দেওয়া প্রতিশ্রুতি যেন তানভীকে এক আলাদা প্রশান্তি দিল।
ওদিকে, চৌধুরী নিবাসে আর্ভিক তখন জীবন্ত এক পাথর। সকালে অফিস যায়, রাতে ফেরে। কারো সাথে কোনো কথা নেই, এমনকি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে দু-দণ্ড বসা নেই। রাখী রায়চৌধুরী ছেলের এই কঠোর মৌনতা দেখে চোখের জল ফেলেন।
দুপুরের রোদটা জানলার পর্দা চিরে খাওয়ার টেবিলে এসে পড়লেও তানভীর মনের আকাশ তখনো মেঘলা। থালায় সাজানো ধোঁয়া ওঠা ভাতের ওপর হাতটা নিস্পন্দ পড়ে আছে, খাবারের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। তৃষাণ পাশে বসে মনের আনন্দে খাচ্ছে, দোয়েল ব্যানার্জী মেয়ের পাতে বড় বড় মাংসের পিস তুলে দিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন
-“কিরে সোনাই? খাচ্ছিস না কেন? দুদিন ধরে দেখছি কিছুই মুখে তুলছিস না। শরীরটা কি আবার খারাপ লাগছে?”
রুদ্র বাবু মেয়ের চোখের কোণের বিষণ্ণতাটুকু পড়তে পারলেন। তিনি শান্ত স্বরে বললেন
-“তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও মামণি, আজ বিকেলেই তোমাকে ও-বাড়িতে রেখে আসব।”
বাবার কথাটি কানে যেতেই তানভীর নির্জীব চোখে যেন এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে গেল। ও মুহূর্তেই সজীব হয়ে উঠে দ্রুত খেতে শুরু করল। দোয়েল ব্যানার্জী রুদ্র বাবুর কথায় অবাক হয়ে বললেন
-“সে কী! মেয়েটা মোটে দুদিন হলো এল, এখনই পাঠিয়ে দেবে?”
রুদ্র বাবু মনে মনে হাসলেন, তারপর গম্ভীরভাবে বললেন
-“সামনে ক্লাস টুয়েলভ, উচ্চমাধ্যমিকের প্রস্তুতি নিতে হবে। পড়াশোনায় ঢিলেমি দিলে চলবে না। তাছাড়া মামনি এখানের থেকে ওখানে বেশি ভালো থাকবে।”
বিকেলের পড়ন্ত আলোয় রুদ্র বাবু তানভীকে চৌধুরী নিবাসে নামিয়ে দিয়ে গেলেন, তখন তানভীর বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে। তানভী সারা বাড়িতে তৃষ্ণার্ত চোখে কাউকে খুঁজে বেড়াল, কিন্তু কোথাও আর্ভিকের দেখা নেই। হয়তো সে তখনো অফিসের কাজে ব্যস্ত। এক বুক প্রতীক্ষা নিয়ে তানভী নিজের রুমে গিয়ে জানালার ধারে বসল। বাইরের গোধূলির আলোটা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে, আর তানভী গুনছে সেই মুহূর্তের ক্ষণ, যখন আর্ভিকের গাড়ির পরিচিত গর্জন বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে ওকে জানান দেবে—তার ‘অভিমানী রাবণ’ বাড়ি ফিরেছে।
কিছুক্ষণ পর গাড়ির পরিচিত হর্নের শব্দ কানে আসতেই তানভীর বুকের ভেতরটা খুশিতে নেচে উঠল। ও একছুটে নিচে নেমে এল, ঠোঁটের কোণে একরাশ অমলিন হাসি, যে হাসি কেবল আর্ভিকের জন্য তোলা থাকে। তানভী ভেবেছিল আর্ভিক হয়তো ওকে দেখে অবাক হবে, হয়তো একটু হাসবে। কিন্তু বাস্তবে যা হলো, তার জন্য তানভী প্রস্তুত ছিল না। আর্ভিক বাড়ি ঢুকে সবার সাথে কথা বলল, অথচ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তানভীর দিকে একবার ফিরেও দেখল না।
তানভী অস্ফুট স্বরে বলতে চেয়েছিল
“কেমন আছেন আর্ভিক ভাই?”
কিন্তু সেই কথাটুকু আর্ভিকের কানে পৌঁছানোর আগেই আর্ভিক নির্লিপ্ত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। অবহেলাটা তীরের মতো তানভীর বুকে গিয়ে বিঁধল। রাতে খাবার টেবিলে বসেও একই দৃশ্য। আর্ভিক ঋষি আর অভিক সাহেবের সাথে অফিসের কথা আলোচনা করছে, রাখী রায়চৌধুরীর সাথে হাসিমুখে কথা বলছে। কিন্তু একবারের জন্যও ওর দৃষ্টি তানভীর দিকে গেল না। যা দেখে তানভীর খুব কষ্ট হচ্ছে।
খাওয়া শেষে আর্ভিক নিজের রুমে ল্যাপটপ নিয়ে কাজে মগ্ন ছিল। তানভী দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে খুব অপরাধী মুখে আর্ভিক কে ডাকল
-“আর্ভিক ভাই?”
আর্ভিক ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই গম্ভীর গলায় শুধোল,
-“কী চাই?”
তানভী মিনমিন করে বলল
-“ভেতরে আসব?”
-“না। যা বলার ওখানেই দাঁড়িয়ে বল। আমার অনেক জরুরি কাজ আছে।”
আর্ভিকের এই অনভ্যস্ত রুক্ষতা তানভীর সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছিল। যে মানুষটা সবসময় ওকে এই রুমে অবাধ প্রবেশাধিকার দিয়ে রেখেছে, আজ সে ওকে ভেতরে আসার অনুমতি পর্যন্ত দিচ্ছে না! তানভীর দু-চোখ ফেটে কান্না নেমে এল। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল
-“সরি আর্ভিক ভাই… আর কখনো এমন করব না। প্লিজ একবার ক্ষমা করে দিন!”
আর্ভিক এবার বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপটা সজোরে বন্ধ করল। রাগী মেজাজে চিৎকার করে উঠে বলল
-“যাবি তুই এখান থেকে? সারাদিন অফিসের ঝক্কি সামলে এসে এখন তোর এই ন্যাকামো আর কান্না আমার অসহ্য লাগছে! যা এখান থেকে, আমায় কাজ করতে দে।”
তানভী আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। চোখের জল মুছতে মুছতে নিজের রুমে গিয়ে দরজায় খিল তুলে দিল। ওদিকে তানভী চলে যেতেই আর্ভিকের পাথরের মতো শক্ত মুখটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ও ল্যাপটপের ওপর মাথা রেখে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর্ভিকের চোখের কোণেও তখন নোনা জলের আভাস। শূন্য ঘরে তাকিয়ে আর্ভিক অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল
-“তোর ওপর রাগ করতে পারি তানভী এটা আমার অধিকার, কিন্তু তোকে ভুলে থাকতে পারি না। তুই চলে যাওয়ার পর এই কয়েকটা দিন আমি কীভাবে বেঁচে ছিলাম, তা যদি একবার বুঝতিস! আমার এই কঠোরতা কেবল তোকে হারানোর ভয়ের আড়াল মাত্র, কারণ তোকে ছাড়া আমি যে বড্ড অসহায়।”
রাতের নিস্তব্ধতা তখন ব্যানার্জী মেনশনের বিশাল অট্টালিকার প্রতিটি কোণে জাঁকিয়ে বসেছে। রুদ্রবাবু যখন ঘরে ঢুকলেন, দেখলেন বেলকনির রেলিং ধরে দোয়েল ব্যানার্জী একদৃষ্টিতে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাইরে বসন্তের ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে। রুদ্রবাবু ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে উনার কাঁধে হাত রাখলেন। হঠাৎ কারো স্পর্শ পেয়ে দোয়েল ব্যানার্জী চমকে উঠলেন, কিন্তু স্বামীকে দেখে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার শান্ত হলেন।
-“কী ভাবছ এত?”
রুদ্রবাবুর গলার স্বরে এক গভীর মায়া জড়িয়ে ছিল। দোয়েল ব্যানার্জী ম্লান হেসে বললেন
-“কিছু না।”
রুদ্রবাবু দীর্ঘক্ষণ উনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন
-“বুঝেছি। সেই পুরনো কথা ভেবে আবার মন খারাপ করছ তো? যা হয়ে গেছে তা তো আর ফেরানো যাবে না। মাঝে মাঝে খুব অপরাধবোধ হয় জানো? সেদিন যদি তুমি আমার কাছে না আসতে, তবে হয়তো আজ তোমার বাবা-মায়ের সাথে তোমার সম্পর্কটা এমন হতো না। আমার জন্য কেন তুমি নিজের সাজানো জীবনটা নষ্ট করলে দোয়েল?”
দোয়েল ব্যানার্জী এবার স্বামীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। উনার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি রুদ্রবাবুর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন
-“এ কেমন কথা বলছ তুমি? তোমাকে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে এসেছি। তোমার সাথে না থাকলে কি আর এমন সুন্দর একটা পরিবার পেতাম?”
রুদ্রবাবু অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বললেন
-“কিন্তু কী দিতে পেরেছি আমি তোমাকে? অঢেল ঐশ্বর্য হয়তো আছে, কিন্তু মানসিক শান্তি দিতে পেরেছি কি?”
দোয়েল ব্যানার্জী এবার হেসেই ফেললেন। স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর আবেগে বললেন
-“কেন? তানভী, তৃষাণ, আর আমাদের এই ছোট্ট সুখী সংসার এই তো আমার পৃথিবী। একজন নারীর এর থেকে বেশি আর কী চাই? স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে মাথা গোঁজার একটা নিরাপদ আশ্রয় থাকলেই তো নারী সার্থকতা খুঁজে পায়। এই সবকিছুই তো তুমি আমায় দিয়েছ।”
রুদ্রবাবু তবুও নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলেন না। নিচু স্বরে বললেন
-“আমার আর তানভীর জন্যই তোমার জীবনটা আজ এমন ছন্নছাড়া। তুমি তোমার মা-বাবার থেকে বঞ্চিত হলে, আর তৃষাণ কোনোদিন তার দাদু-দিদার ভালোবাসা পেল না।”
দোয়েল ব্যানার্জী এবার রুদ্রবাবুর মুখে হাত দিয়ে থামিয়ে দিলেন। দৃঢ় কণ্ঠে বললেন
-“এমনটা বোলো না। তানভী আমার নিজের গর্ভজাত সন্তান না হলেও সে আমার নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি। তৃষাণ আর তানভীকে কখনও আমি আলাদা ভাবে দেখি না। দোষ আমার বাবা-মায়ের, তাঁরা একটা নিস্পাপ ছোট্ট শিশুকে মেনে নিতে পারেনি বলেই আজ এই দূরত্ব। আমার কোনো আক্ষেপ নেই।”
তিনি একটু থামলেন তারপর আবার বললেন
-“অনেক রাত হয়েছে, এবার চলো ঘুমাতে হবে।”
রুদ্রবাবু বুঝলেন, রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড় এক বন্ধনে দোয়েল ব্যানার্জী তাঁদের এই বিশাল সাম্রাজ্যকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন।
পরের দিন সকালে তানভী যখন চোখ মেলল, ওর দু-চোখ তখনো ফোলা। কিন্তু মনের জোর কমেনি। ও ঠিক করল, দোষ যেহেতু ওর, তাই রাবণ-এর মন গলাতে ওকে যদি প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়, তবে তাই করবে। আর্ভিকের এই অভিমান ও ভেঙে ছাড়বেই। তখন তানভী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল, অনেক দেরি হয়ে গেছে! একছুটে নিচে নেমে তানভী রাখী রায়চৌধুরী কে জিজ্ঞাসা করল
-“বড়মা, আর্ভিক ভাই কোথায়?”
রাখী রায়চৌধুরী রান্নাঘর থেকে উত্তর দিলেন
-“সে তো অনেকক্ষণ আগেই অফিস চলে গেছে রে। তুই আয়, জলখাবার খেয়ে নে।”
তানভী সোফায় বসে আনমনে ভাবতে লাগল, কীভাবে ওই রাবণ-এর মান ভাঙানো যায়। হঠাৎ বড়মার বলা একটা কথা ওর মনে পড়ে গেল আর্ভিক ভাই রসমালাই খেতে সবথেকে বেশি ভালোবাসেন। তানভীর মুখে এক চিলতে জয়ের হাসি ফুটে উঠল। যেই ভাবা সেই কাজ, দুপুর থেকেই ও রান্নাঘরে তোড়জোড় শুরু করে দিল। দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে, ছানার ছোট ছোট গোল্লা বানিয়ে তৈরি করল জাফরান মেশানো সুগন্ধি রসমালাই।
সন্ধ্যায় আর্ভিক অফিস থেকে ফিরে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। নিচে রাখী রায়চৌধুরী কে দেখতে পেয়েই ও শান্ত গলায় বলল
-“মা, ভীষণ মাথা ধরেছে, এক কাপ কফি দিয়ে যেও ওপরে।”
আর্ভিক নিজের রুমে চলে যেতেই রাখী রায়চৌধুরী কফি নিয়ে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, তখনই তানভী উনার পথ আটকে দাঁড়াল। হাতে রসমালাইয়ের বাটি নিয়ে বলল
-“বড়মা, কফিটা দাও, আমি উনার রুমে দিয়ে আসছি।”
রাখী রায়চৌধুরী একটু ইতস্তত করে শেষমেশ তানভীর হাতেই কাপটা ধরিয়ে দিলেন। তানভী ধীর পায়ে আর্ভিকের রুমে ঢুকল, আর্ভিক চোখ বুজে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। কফির কাপ আর রসমালাইয়ের বাটিটা টেবিলের ওপর রাখার শব্দে আর্ভিক চোখ মেলল। তানভীকে দেখেই ওর চোয়াল আবার শক্ত হয়ে গেল। কোনো কথা না বলে আর্ভিক জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
তানভী খুব নরম সুরে বলল
-“আর্ভিক ভাই, কফি এনেছি। আর আপনার প্রিয় রসমালাইও বানিয়েছি, একটু খেয়ে দেখুন না।”
আর্ভিক এবার বিরক্ত হয়ে তানভীর দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টিতে একরাশ রুক্ষতা। আর্ভিক গর্জে উঠে বলল
-“তোকে এসব কে করতে বলেছে? আমি কি বলেছি যে আমার জন্য রসমালাই বানাতে ?”
তানভী কাঁপাকাঁপা হাতে বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বলল
-“প্লিজ আর্ভিক ভাই, একটু খেয়ে দেখুন…”
আর্ভিক এবার হাত দিয়ে বাটিটা সরিয়ে দিয়ে বলল
-“একদম ন্যাকামো করবি না তানভী। সারাদিন কাজ করে এসে তোর এই আদিখ্যেতা ভালো লাগছে না। তোকে এখানে কে আসতে বলেছে? এই বাটি নিয়ে এখন এখান থেকে যা! আমি খাব না কোনো কিছু।”
আর্ভিকের এই চরম প্রত্যাখ্যান তানভীর বুকে তীরের মতো বিঁধল। ওড়নার খুঁটে চোখের জল চেপে ও বাটিটা হাতে নিয়ে এক পলক আর্ভিকের দিকে তাকাল। আর্ভিক তখন পাথরের মতো মূর্তির মতো বসে আছে। তানভী আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, রুমে থেকে বেরিয়ে এল। এক বুক কষ্ট দলা পাকিয়ে আসছিল ওর, কিন্তু মনের কোণে জেদটা এখন আরও প্রখর। ও মনে মনে নিজেকে বলল
“আর্ভিক ভাই, আপনি যতই ফিরিয়ে দিন না কেন, আপনার এই পাথুরে হৃদয়ে আমি ভালোবাসার রঙ লাগিয়েই ছাড়ব। আপনার সব রাগ আমি ভাঙাবই।”
রাত তখন গভীর। গোটা চৌধুরী নিবাস নিঝুম অন্ধকারে ডুবে আছে। নিজের ঘরে একা অন্ধকারে বসে আর্ভিক ছটফট করছিল। তানভীকে অতটা রুক্ষভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই এক গভীর অপরাধবোধ ওর বুকের ভেতরটা কুরেকুরে খাচ্ছে। আর্ভিক মনে মনে নিজেকেই বলছিল
“সরি অর্কিড…কিন্তু এত সহজে তো আমি মানবো না বউ।”
কিন্তু পরক্ষণেই তানভীর জলভরা চোখের করুণ মুখটা মনে পড়তেই আর্ভিকের হৃদয়ে একটা মোচড় দিয়ে উঠল। আর্ভিক রাতে কিছু খায়নি, খিদে আর অশান্তির মিশেলে আর্ভিক আর স্থির থাকতে পারল না। হঠাৎই আর্ভিকের তানভীর বানানো রসমালাই এর কথাটা মনে আসে, তাই পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। রান্নাঘরে ঢুকে ফ্রিজটা খুলতেই কাঁচের বাটিতে সেই জাফরান মেশানো রসমালাইটা চোখে পড়ল। আর্ভিক এক চামচ মুখে দিতেই ওর চোখ দুটো প্রশান্তিতে বুজে এল। তানভীর হাতের ছোঁয়ায় রসমালাইটা যেন অমৃত হয়ে উঠেছে। একে একে চারটি রসমালাই তৃপ্তি করে খেয়ে বাটিটা আবার ফ্রিজে রাখল, আর্ভিকের মনের সবটুকু কঠিন বরফ যেন এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতে যাবে, এমন সময় দরজার কাছে কারোর ছায়া দেখে আর্ভিক থমকে দাঁড়াল। সামনে তানভী দাঁড়িয়ে! রাতে জল খেতে উঠে রুমে জল না থাকায় ও রান্নাঘরে এসেছিল। দুজনে মুখোমুখি। আর্ভিক নিজেকে সামলে নিয়ে আবার সেই কঠোর মুখোশটা পরে নিল। তানভীর পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই তানভী মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করল
-“আর্ভিক ভাই? আপনি এত রাতে এখানে কী করছিলেন?”
আর্ভিক এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে কাটখোট্টা গলায় বলল
-“আমি কখন কী করব, কোথায় যাব—তার কৈফিয়ত কি এখন তোকে দিতে হবে নাকি? নিজের বাড়ি, যা ইচ্ছা তাই করব!”
এই বলে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিজের রুমে চলে গেল সে। তানভী কোনো উত্তর দিল না। ও ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে ড্রিম লাইটের আলোয় দেখতে পেল ফ্রিজের পাশেই কালো পাথরের স্ল্যাবটার ওপর সাদা সাদা কয়েক ফোঁটা দুধের ছিটের মতো কিছু পড়ে আছে। তানভী নিচু হয়ে আঙুল দিয়ে তরলটুকু পরীক্ষা করতেই ওর ঠোঁটের কোণে এক মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। এ তো সেই রসমালাইয়েরই ঘন দুধ! তানভী ভাবল বড়মা তো রান্নাঘর একদম পরিষ্কার করে গিয়েছিল, তবে এটা এল কোথা থেকে? ওর বুঝতে আর বাকি রইল না যে, আর্ভিকের কাজ এটা। তানভী মনে মনে তৃপ্ত হল। এক অদ্ভুত জয়ের আনন্দ নিয়ে জলের বোতলটা ভরে তানভী নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
এক সপ্তাহ কেটে গেছে। এই সাতটা দিন যেন তানভীর কাছে সাত বছরের মতো দীর্ঘ মনে হয়েছে। আর্ভিকের পাথুরে মৌনতা আর সুশৃঙ্খল অবহেলা তানভীর সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। ও অনেক চেষ্টা করেছে এই কদিন, ছলে-বলে-কৌশলে আর্ভিকের মান ভাঙাতে কিন্তু আর্ভিক যেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গের আড়ালে নিজেকে বন্দি করে রেখেছে।
আজ বেলার দিকে মেঘাদ্রি তানভী কে ফোন করে জানাল, ওদের স্কুলের এক বান্ধবীর জন্মদিন, সেটা এক রেস্টুরেন্টে সেলিব্রেশন করা হবে, তাই তানভীকেও যেতে হবে সেখানে। আর্ভিক আজ অফিসে যায়নি সকাল থেকে মাথাটা ধরেছে তার, তাই অফিসে ঋষিই সব সামলাচ্ছে। সাহস সঞ্চয় করে তানভী আর্ভিকের রুমের খোলা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ধীর স্বরে বলল
-“আর্ভিক ভাই, মেঘাদ্রি ফোন করেছিল আমাদের এক বান্ধবীর জন্মদিন আজ। ওরা ডাকছে রেস্টুরেন্টে… আমি কি যাব? আপনি কি আমায় একটু দিয়ে আসবেন?”
আর্ভিক ল্যাপটপে কাজ করছিল। ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই গর্জে উঠল
-“আমার কাছে পারমিশন নিতে এসেছিস কেন? সেদিন এখান থেকে বাড়ি যাওয়ার আগে কি আমার অনুমতি নিয়েছিলি? আমি কে হই তোর যে তোকে পৌঁছে দিয়ে আসব?”
তানভী কাঁপাকাঁপা গলায় বলল
-“বড়মা বলেছিল সেদিন বাবার সাথে যেতে… আমি তো আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি তো অফিসে ছিলেন।”
আর্ভিক এবার আরও কঠোর হয়ে বলল
-“তাহলে বড়মাকেই বল তোকে দিয়ে আসতে। আমি পারব না। এখন মাথা খারাপ না করে এখান থেকে যা, আমায় কাজ করতে দে!”
অপমানের তীব্র জ্বালা নিয়ে তানভী নিজের রুমে ফিরে এল। আর পারল না ও। ডুকরে কেঁদে উঠল বিছানায় মুখ গুঁজে। কান্নার বেগ এতটাই তীব্র ছিল যে ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ওদিকে তানভী চলে যেতেই আর্ভিকের বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল। ও নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল
“আর কত? সত্যিই কি আমি ওকে এতটা কষ্ট দিতে চেয়েছিলাম? অনেক হয়েছে আর না।”
নিজের ওপর একরাশ ঘৃণা নিয়ে আর্ভিক উঠে দাঁড়াল। ও পা বাড়াল তানভীর রুমের দিকে। রুমে ঢুকে আর্ভিক যা দেখল, তাতে ওর হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তানভী বিছানায় মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, নিশ্বাস নিতে পারছে না মেয়েটা। আর্ভিক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও দ্রুত গিয়ে তানভীকে নরম গলায় ডাকল।
-“তানভী”
আর্ভিকের গলার স্বর পেয়ে তানভী অবচেতনেই আর্ভিককে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা গুঁজে দিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠে বলল
-“আপনি খুব খারাপ আর্ভিক ভাই! কেন কথা বলছেন না আমার সাথে? আমি কতবার সরি বলেছি, কত কিছু করেছি আপনার জন্য… কেন আমার মেসেজটা পর্যন্ত সিন করেননি আপনি? আমি তো বললাম আর যাব না।”
তানভী অভিযোগ করতে করতে আর্ভিকের শার্টটা নিজের চোখের জলে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। আর্ভিক এবার অত্যন্ত নরম গলায় তানভীর চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৩+৪৪
-“পাগলি মেয়ে! তোর মেসেজ তো আমি সেদিনই দেখেছিলাম। কিন্তু আমার হোয়াটসঅ্যাপের ‘ব্লু টিক’ অপশনটা অফ করা আমার, তাই তুই বুঝতে পারিসনি। আই এম সরি রে… সত্যিই বড্ড বেশি রাগ করে ফেলেছিলাম। আর কাঁদিস না। এবার চটপট রেডি হয়ে নে, আমিই তোকে দিয়ে আসব।”
আর্ভিকের কন্ঠে ক্ষমার সুর পেয়ে তানভীর মনের সব মেঘ এক নিমেষে কেটে গেল। ও অশ্রুসিক্ত চোখে একবার আর্ভিকের দিকে তাকাল, আর্ভিক নিজের দুহাত দিয়ে তানভীর চোখের জল মুছে দিল। এরপর তানভী দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়ে আর্ভিকের বাইকে চেপে বসল। রেস্টুরেন্টে বান্ধবীদের সাথে আনন্দ শেষে আর্ভিক ওকে নিয়ে আবার বাড়ির পথে ফিরল।
