দাহশয্যা পর্ব ৮৮
Raiha Zubair Ripti
সেই মধ্য রাতে ডক্টর এনে তারপর মেহরিন কে স্বাভাবিক করা গেছে। এখন হাতে স্যালাইন লাগানো। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার সামনেই বাড়ির সকলে দুশ্চিন্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোলেমান মেহরিনের মাথার কাছে বসা। মেহরিনের মাথায় হাত বুলাচ্ছে। এর আগেও এমন হয়েছিল। সোলেমান গিয়েছিল দেখতে হসপিটালে। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার কারন যে এমন বাচ্চাকে ঘিরে তা জানা ছিলো না। রুমের নীরব গুমোট ভাবটা সোলেমান ভেঙে দিয়ে বলল-
“ মেহরিন এরকম স্বপ্ন কেনো দেখে আঙ্কেল? আর কবে থেকে দেখে? ডক্টর দেখান নি? দেখালে তারা কি বলেছে?”
মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের পায়ের কাছে বসে ছিলেন। সোলেমানের কথা শুনে বলল-
“ দেখিয়েছি। যখন যে যেখানে নিয়ে যেতে বলছে নিয়ে গেছি। মহাদেবপুরের একটা কবিরাজ ডক্টর বাদ নেই যে দেখাই নি। তারা ব্যাখ্যা দিতে পারে নি এটার। ডক্টর মেডিসিন দিলো। বললো সময়ের সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক আর হচ্ছে না। ”
সোলেমান পকেট থেকে ফোনটা বের করে লুকা কে ফোন করলো।
আজ এত গুলো দিন পর লুকা সোলেমানের ফোন পেয়ে বেশ চমকালো।
“ জ্বি স্যার বলুন। কোনো সমস্যা? ”
সোলেমান সোজা কথায় গেলো।
“ ওয়ার্ল্ডের বেস্ট সাইকিয়াট্রিস্ট,বেস্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট,বেস্ট সাইকোঅ্যানালিস্ট সবার সাথে কথা বলো পার্সোনালি। আর তাদের বাংলাদেশে আসতে বলো আর্জেন্ট। যত টাকা চায়, যা চায় সব দাও। তারপরও তাদের বাংলাদেশে আসতে বলো আর সেটাও ২৪ ঘন্টা সর্বোচ্চ গেলে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে। কথা ক্লিয়ার? ”
“ জ্বি স্যার ক্লিয়ার। আমি কথা বলছি।”
লুকা ফোন কেটে দিলো। ইন্টারনেট গুগল সব ঘেঁটে ওয়ার্ল্ডের বেস্ট সাইকিয়াট্রিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, সাইকোঅ্যানালিস্টদের নম্বর কালেক্ট করে তাদের সাথে পার্সোনালি দেখা করলো। এবং জানালো এসএস তাদের বাংলাদেশে যেতে বলেছে বিশেষ কারনে। এরজন্য তারা যা চাইবে তাই দেওয়া হবে। তারা রাজি হলো। তিনজনের একটা টিম গঠন করা হলো। খরচ বাবদ তাদের পে করতে হলো ১২ কোটি ২০ লাখ টাকা। টাকা পাওয়ার সাথে সাথে তাদের প্রাইভেট জেটের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলো।
খুব বেলা করে মেহরিনের ঘুম ভাঙলো। চোখ মেলে তাকাতেই আচমকা এতো গুলো মুখ কে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভরকে গেলো। উঠে বসতে গেলে সানজিদা বেগম এসে ধরে পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে আধশোয়া করে শোয়ালো। আফিয়া সুলতান গালে হাত রেখে বলল-
“ এখন কি খারাপ লাগছে তোমার? ”
মেহরিন দু দিকে মাথা নাড়ছে। যদিও তার মাথা ব্যথা করছে খুব। সানজিদা বেগম জানে এখন মেহরিনের মাথা ব্যথা করবে। সেজন্য ড্রেসিং টেবিল থেকে তেলের বোতল টা নিয়ে মাথার তালুতে ঘষে দিলো। আফিয়া সুলতান স্যুপ বানাতে গেলো মেহরিনের জন্য। রুমাইসা এসে আরেক পাশে বসলো মেহরিনের। গলা জড়িয়ে ধরে বলল-
“ কি হয়েছিল তোমার মেহরিন? ওমন করছিলে কেনো? আমরা কত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম জানো? ভাইয়া পাগল হয়ে গিয়েছিল। ”
মেহরিন চোখ মেলার পর সোলেমান কে দেখে নি। চাতক হয়ে এদিক ওদিক খুঁজলো।
“ ভাইয়া নিচে গেছে। কারা নাকি আসছে। তাদের সাথে কথা বলছে। ”
মেহরিন ভ্রু কুঁচকালো। কারা আসছে?
“ তুমি জেগে উঠার ১ মিনিট আগেই গেছে। আমি বলে আসছি তুমি উঠে পড়েছো। ”
রুমাইসা চলে গেলো। মেহরিন মায়ের বুকের উপর মাথা রেখে গা এলিয়ে দিলো। কি ক্লান্ত লাগছে এই দেহটায়। ছোট্ট করে ডাকালো-
“ আম্মা..”
“ হুম,মা বলো। কষ্ট হচ্ছে কি?”
“ এই স্বপ্ন বোধহয় একদিন আমাকে সত্যি সত্যি মেরে ফেলবে আম্মা।
সানজিদা বেগম মাথায় চুমু খেয়ে বলল-
“ কিচ্ছু হবে না মা। কিচ্ছু হবে না। আমি আর তোর বাবা তোর কিচ্ছু হতে দিব না। ইয়া আল্লাহ এই স্বপ্ন কবে আমার মেয়ের পিছু ছাড়বে? একটু রহম করো আমার মেয়েটার উপর। তার এক চুল পরিমান কষ্টও যে আমরা সহ্য করতে পারি না। ”
সোলেমান হন্তদন্ত হয়ে রুমে প্রবেশ করলো। এগিয়ে মেহরিনের কাছে আসতেই সানজিদা বেগম উঠে দাঁড়ালো। মেয়ে আর মেয়ের জামাইয়ের মাঝে থাকাটা কেমন দৃষ্টি কটু লাগে। সেজন্য রুম থেকে চলে গেলেন। সোলেমান মেহরিনের মাথাটা বুকের সাথে মিশিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিলো। মেহরিন বোধহয় গুনতে পারলো সোলেমানের বুকের প্রতিটি স্পন্দন।
“ কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তার কোনো ধারনা আছে তোমার? ”
মেহরিন মৃদু হাসলো।
“ এটুকুতেই এত ভয় পাচ্ছেন। তাহলে যখন আমি সত্যি সত্যি মরে যাব তখন কি করবেন? ”
সোলেমান আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ধমকের সুরে বলল-
“ বাজে কথা বলা বন্ধ করবে তুমি? কিচ্ছু হবে না তোমার। আমি হতেই দিব না কিচ্ছু তোমার। ”
“ নিয়তি আমি আপনি কেউ বদলাতে পারি না। আমি আপনাকে খুব কষ্ট দেই তাই না?”
“ কে বলে এ কথা? বরং আমিই তোমাকে কষ্ট দেই।”
“ জানেন এই স্বপ্ন যখন দেখি তখন আমার শ্বাস আঁটকে আসে। মনে হয় আল্লাহ আমাকে বারবার মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। খুব কষ্ট হয়। উনি কি আমার উপর কোনো ভাবে রুষ্ট? আমার বাচ্চাটা ঠিক মতো সুস্থ ভাবে আমার বুকে আসবে তো? আমার ভয় হচ্ছে। ”
“ কিচ্ছু হবে না আমাদের বেবির। সাথে তোমারও কিছু হবে না। আমি ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দের সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা আসছে। দেখালেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ”
“ তাই হয় যেন। আমি আর চাই না এই স্বপ্ন দেখতে। ”
সোলেমান পরপর কয়েকটা চুমু খেলো মেহরিনের মাথায়।
দুপুরের পরপর তেহরান তানভীর আর তানজিলা বেগম আসলো সুলতান নিবাসে। মেয়েটা মা হতে চলছে খবর টা শুনে সেদিনই চলে আসবে কিন্তু তেহরান টা আসতে দিলো না। বললো খালা খালু আগে আসুক। তানভীর দের এই প্রথম আসা এই বাড়িতে। রাজপ্রাসাদের চেয়েও সুন্দর। তানজিলা বেগম আসার সময় মেহরিনের জন্য এক জোড়া কানের দুল নিয়ে আসছে স্বর্ণের। সেটা মেহরিন কে দিলো। তেহরান রুমাইসা কে দেখেই লম্বা করে টেনে সালাম দিয়ে বলল-
“ কেমুন আছুইন বেয়াইন সাইবা?”
রুমাইসার কষ্ট হয় বুঝতে তেহরানের কথার ভাষা। কেমন অশিক্ষিত অশিক্ষিত লাগে। সেও তো নওগাঁর। কই সে তো নওগাঁর ভাষায় কথা বলে না।
“ ভালো আছি। আপনি?”
“ ভালো আছি। ঢাকায় আইয়ুন অথচ আইত্তো গো বাড়িত যাইয়ুন না। আবার আত্তিরা যা আন্নের আত্মীয় লাগি, কোনোদিন তো ফোন দিয়ে খোঁজখবর দি লন না। ”
“ আসলে আপনাদের নম্বর নেই আমার কাছে। ”
“ মেহরিনের কাছে আছে তো। আপনি চাইলেই পাইতেন।”
রুমাইসা বিরক্ত হলো। কি ঠেকা তার যোগাযোগ রাখার?
“ আমার নম্বর লইন। ”
রুমাইসা নম্বর টা নিলো হোয়াটসঅ্যাপে এড করে। চলে যাওয়ার সময় বলে গেল-
“ আমার সাথে কথা বলার সময় ভদ্র ভাষায় কথা বলবেন। কি আইছুন মাইছুন খাইছুন এসব বলেন? সবার সাথে তো ভদ্র ভাষাতেই কথা বলেন। ”
“ সবাই তো আর আপনার মতো বেয়াইন লাগে না আমার। আপনি বলে কোন ট্রাভেল এজেন্সির খোঁজ করতে বলছিলেন আমায়?”
রুমাইসা সাথে সাথে পেছনে ফিরলো। হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এসে বলল-
“ পেয়েছেন তার খোঁজ? ”
“ এই নামে কেউ নাই ঢাবি তে। একে তো অনলাইনে পরিচিত। তার উপর দেখেন নি শুনলাম তাকে। না দেখেই আপনি বিয়ে অব্দি চলে গেছেন তার সাথে! ভেরি গুড! আজকাল কার জামানায় এমন বোকা মেয়েও হয়! এক পপুলার ফিগার আপনাকে কি বললো না বললো আপনি তা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে তার উপর মরিয়া হয়ে গেলেন! আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর আপনাকে হয়তো বোকা বানাচ্ছে ঐ লোক। তা না হলে সমানে কেনো আসবে না? ”
কথাগুলো তিক্ত সত্যি হলেও রুমাইসার রাগ হলো।
“ আপনাকে জ্ঞান দিতে বলছি আমি?”
“ আমি ফ্রী তে জ্ঞান দিতে পছন্দ করি।”
“ আমার প্রয়োজন নেই। আর আমি ধোঁকা খাই আর বাঁশ খাই দ্যাট নান অফ ইউর বিজনেস। ”
“ আমার খারাপ লাগে,এমন সুন্দর সুন্দর রমণী দের কেউ ফাঁদে ফেলছে শুনলে। যাই হোক জীবন আপনার চয়েস আপনার। আপনি কাকে বেছে নিবেন। আসি,কখনো প্রয়োজন হলে ডাক দিয়েন। আমি সদা হাজির আপনার জন্য। ”
তেহরান তানভীর কে নিয়ে চলে গেলো।
বিকেলে গড়াতেই সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে সেই সাইকিয়াট্রিস্ট দের কাছে গেলো। তারা একান্ত আলাদা করে মেহরিনের সাথে কথা বলতে চাইলো সোলেমান সোজা মানা করে দিলো। ডক্টররা সোলেমানের সামনেই কথা বললো। কথা বলে বুঝলো এটা মেহরিনের ছোট বেলা থেকেই হয়ে আসছে। আর বছরে একবার করে দেখে। আর দেখার পরই তার শরীর খারাপ হয়ে যায়। তারা এটাও জানলো যে মেহরিনের ছোট বেলায় এমন কোনো ট্রমার ঘটনা নেই যেটা ধরে তারা এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারে। সাইকিয়াট্রিস্ট আপাতত ওষুধ দিলো ঘুম ঠিকমতো হওয়ার জন্য। তবে সোলেমান জানালো মেহরিন প্রেগন্যান্ট। মেডিসিন খেলে বেবির ক্ষতি হবে কি না। সাইকিয়াট্রিস্ট জানার সাথে সাথে ঔষধ চেঞ্জ করে pregnancy-safe sedative দিলো। তবে খুব সীমিত ডোজে নিতে হবে। সাইকোলজিস্ট Cognitive Behavioral Therapy
দিবে। স্বপ্ন দেখার পর কিভাবে রিল্যাক্সেশন হতে হয় সেই টেকনিক শেখাবে। যার জন্য সময় লাগবে ৮–২০ সেশন সাধারণত। সাইকোঅ্যানালিস্ট আপাতত সময় নিয়ে মেহরিনের স্বপ্নের প্রতীকী অর্থ বিশ্লেষণ করবে। তারপর কিছু বলবে। তবে সোলেমান কে পার্সোনালি ডেকে নিয়ে বলল। যেহেতু সে বারবার বাচ্চাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে। আর মেহরিনও মা হতে চলছে তো সাবধানতা অবলম্বন করতে বললো। কারন মাঝেমধ্যে অনেক স্বপ্নই আছে যেগুলো বিশ্লেষণ করলে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তখন সেটা জীবনেরই একটা অংশ হয়ে যায়। হয়তো কোনো ইঙ্গিত এটা।
সোলেমান গম্ভীর ভাবে শুনলো। তবে তার ভেতরে বইছে ঝড়। জীবনের অংশ হয়ে যায় মানে!
“ এর প্রতিকার কি সেটা বলুন। আপনাকে নিশ্চয়ই হাল ছেড়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে আসা হয় নি এখানে।”
“ আমি চেষ্টা করবো এর প্রতিকার বের করার। যদি না পারি তাহলে এই ক্যরিয়ার জগৎে এই আমার প্রথম হার। ”
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে চলে আসলো। গাড়িতে উঠে তারা নিবাসের দিকে আসার পথে রাস্তায় আইসক্রিমের ভ্যান দেখতে পেলে মেহরিন আইসক্রিম খেতে চাইলো। সোলেমান মানা করলো না। মেহরিনের যা চাই সোলেমান তাই এনে দিবে। একটুও না করবে না। সোলেমান গিয়ে ভ্যানিলা আইসক্রিম নিয়ে আসলো। মেহরিন খেতে খেতে কি হলো কে জানে হুট করে সোলেমানের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে দিলো। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ শরীর খারাপ লাগছে নাকি আবার?”
“ উঁহু। ”
“ তাহলে?”
“ কিছু চাই। ”
“ তুমি কি চাও,বলো আমায়। ”
“ আমার জন্য এক আকাশ সমান ভালোবাসা। ”
“ অথচ আমি এটা দিতেই যত কার্পণ্য করি তাই না?”
“ সেজন্যই তো এটা পাওয়ার জন্য আমি রোজ ম’রি। আচ্ছা একটা সত্যি কথা বলবেন? একদমই আমাকে মিথ্যা আশ্বাস দিবেন না। ”
“ আমি তোমাকে কখনই মিথ্যা আশ্বাস দেই নি মেহরিন। ”
“ If i die first, will you forget me…?”
সোলেমান টেনে শক্ত করে মিশিয়ে নিলো মেহরিন কে নিজের সাথে। কপালে চুমু খেয়ে সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল-
“ I will die with you too…”
“ মিথ্যা কথা।”
“ কোনটা মিথ্যা কথা?”
“ এই যে আমার সাথে ম’রে যাবেন এটা। ”
“ তুমি তো সাইন্সের স্টুডেন্ট। তাহলে বলো হৃদয় যদি শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায় তাহলে কি মানুষ বাঁচে? ”
“ আমি আপনার হৃদয়? ”
“ এই কলুষিত শরীরের একমাত্র পবিত্র হৃদয় তুমি মেহরিন তাবাসসুম। ”
“ আমি পবিত্র? ”
“ পৃথিবীর একমাত্র পবিত্র মেয়েটাই বোধহয় আমার বউ। যার কোনো কলঙ্ক নেই। চাঁদের উচিত তোমাকে দেখে হিংসে করা। ”
“ চাঁদ কিন্তু সুন্দর। ”
“ তোমার সৌন্দর্যের কাছে চাঁদ ও ফিকে আমার কাছে। ”
মেহরিন চোখ বন্ধ করে লজ্জা মুখে বলল-
“ আমার হাসি পায় এসব কথা শুনলে। এত রোমান্টিক মুডে কেনো আপনি হু? ”
সোলেমান হো হো করে গা দুলিয়ে হাসলো মেহরিনের কথা শুনে।
“ তুমি আমার মুডের ১২ টা বাজিয়ে দিলে মেহরিন তাবাসসুম। এই অপরাধের জন্য এখন তোমাকে কোন সাজায় দণ্ডিত করা যায় বলো। ”
মেহরিন গুটিশুটি হয়ে সোলেমানের সাথে লেপ্টে রইলো।
নিবাসে আসার পর সোলেমান মেয়ে ম্যেড দুজন কে ডেকে এনে বলে দিয়েছে মেহরিনের কাছ থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও না সরতে। মেহরিনের কিছু খেতে ইচ্ছে করলে তারা বানিয়ে খাওয়াবে। আর বেছে বেছে খাওয়াবে। মেহরিন গোসল করতে গেলে জামাকাপড় ওয়াশরুমে রেখে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকবে। কোনো কাজ যেন মেহরিন কে করে নিতে না হয়। একমাত্র মেহরিনের নিজস্ব পার্সোনাল কাজ ব্যতিত। যেগুলো অন্য কারো পক্ষে করে দেওয়া সম্ভব না। সোলেমানের কথার হেলফেল হলে সবকটার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।
সোলেমানের এমন কড়া হুকুম শুনে তারা মাথা নাড়লো। সোলেমান মেহরিন কে রুমে নিয়ে এসে বিছানায় বসাতেই মেহরিন বলল-
“ আপনাকে দেখলে নির্ঘাত কেউ পাগল বলবে। ”
“ বললে বলুক। তাতে আমার কি যায় আসে?”
“ রিলাক্স হন তো। ”
“ রিলাক্স বলতে আমার জীবনে কোনো শব্দ নেই।”
“ এখন আবার কোথাও যাবেন?”
“ হু। মিটিং আছে। সেদিন ফেলে এসেছি। সেটাই করতে যেতে হবে। ”
“ আচ্ছা সাবধানে যান। ”
“ আর তুমিও সাবধানে থেকো। এখন তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও। তুমি আমার ওয়াইফ ও।”
মেহরিনের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।
“ হোয়াট! ”
সোলেমান হাত ঘড়ি পড়তে পড়তে বলল-
“ কি হোয়াট? মুডে আছি কিন্তু। ”
“ স্ত্রীর ইংরেজি শব্দ ওয়াইফ। ওয়াইফের বাংলা শব্দ স্ত্রী । তাহলে তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও,তুমি আমার ওয়াইফও বলার কি মানে? একটা বললেই তো হতো।
সোলেমান কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে-
“ বেডি তোমার প্রেমে পইড়া আমি সব গুলায় খাইয়া এখন চোখে সাদা সর্ষে ফুল দেখতেছি। সব তোমার দোষ। বলতে চাচ্ছিলাম তুমি শুধু এখন আমার স্ত্রী নও বাচ্চার মা ও। ”
মেহরিন হাসতে হাসতে বলল-
“ পাগল বেডা।”
“ তোমার কারনে। এখন আসি। ”
দু দিন মোতালেব ভুঁইয়া আর সানজিদা বেগম মহাদেবপুর চলে গেলেন। সেরিন টা একা একা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বাচ্চা নিয়ে। আফিয়া সুলতান, আনোয়ার সুলতান,আমিরুল সুলতান ও চলে গেলেন। এরমধ্যে ঊর্মি চলে এসেছে। ঊর্মি নওগাঁ ছিলো আশায় ছিলো হয়তো ইমন আসলে তার সাথে দেখা করবে। কিন্তু ইমন ঊর্মি বাড়ি এসেছে শুনে আর যায় নি। ব্যস্ততা বলে এড়িয়ে গেছে।
ক’টা দিন ধরে শেখর চোরের মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মহসিন আলী কে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আপাতত তিনি জেলে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শেখর কোথায়। আর কোথায় কোথায় তারা,কতজন কে পাচার করেছে। মহসিন আলী কিছুটা বললো আর কিছুটা বলতে পারলো না। শেখরের জন্য একটা নতুন সিম আর নতুন ফোন পাঠিয়েছে একজন। শেখর সেটা হাতে পেয়েই একজন কে ফোন করলো। ওপাশের মানুষ টা হয়তো শেখরের কলেরই অপেক্ষায় ছিলো।
“ ঠিক আছেন? ”
শেখর একটু চড়াও হলো।
“ ঠিক থাকি কিভাবে? তুমি আড়ালে লুকিয়ে কলকাঠি নাড়ছো। আর আমাকে তার খেসারত দিতে হচ্ছে। আর ঐ ভিডিও ছবি গুলো পাবলিশ করেছে কে?”
“ শিবিরের এক ছেলে। নাম ইমন। ”
“ ঐ ছেলে এসব পেলো কোথায়? ওরে আমি সামনে পেলে খু’ন করে ফেলবো। ”
“ মাথা ঠান্ডা করুন। এটার ও এক ব্যবস্থা করা হবে।”
“ এসির নিচে থেকে অন্যকে বলছো মাথা ঠান্ডা করতে! স্বার্থপর কোথাকার। ”
“ হাইপার হচ্ছেন অযথা। আমি আপনার দেশ ছাড়ার সব ব্যবস্থা করেছি। আপনি দেশ ছাড়ুন। বাকিটা আমি দেখছি। সুলতান পরিবারের সব কটার ঘুম আমি হারাম করে দিব। এর জন্য যত খু’ন করতে হয় আমি করবো। নির্দোষের প্রাণ নিতে হলে আমি নিব। সুলতান বংশ আমি নির্বংশ করে ছাড়বো। ”
“ পরিস্থিতি ঠান্ডা না হওয়া অব্দি আমাকে আর বাংলাদেশে আসতে বলবে না। আর আব্বার কি করবে? উনি তো জেলে আছে। ”
“ থাকুক কদিন জেলে। বিষয় টা ধামাচাপা পড়ে গেলে আমি ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবো। ”
“ আর সামির? ও কে কি সাথে নিয়ে যাব?”
“ ছেলেটা পড়াশোনা করছে। করতে দিন। ও কে দিয়ে কাজ আছে আমার। ”
“ একেই ওর হাত নেই। কৃত্রিম হাত। উল্টাপাল্টা কিছু করাইও না। নইলে দেখা যাবে ঐ মাদার*দ রা আবার ওর শরীর থেকে মাথাটা আলাদা না করে দেয়। ”
“ ডোন্ট ওয়ারি। এমন জাল এবার বিছিয়েছি, সুলতান পরিবারের ধ্বংস নিশ্চিত। সাপও মরবে আবার লাঠিও ভাঙবে না। ”
“ অল দ্যা বেস্ট। ”
দুপুরের দিকে মেহরিনের কিছু একটা খেতে ইচ্ছে করতেছে। কিন্তু কি খেতে ইচ্ছে করতেছে বুঝতে পারছে না। মিষ্টি নাকি টক নাকি ঝাল?
মেহরিন আচার মুখে দিলো। কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছে না। ঝালঝাল নুডলস নিলো। এটাও খেতে ইচ্ছে করছে না। ফ্রিজ থেকে মিষ্টি দই বের করলো। এগুলোও খেতে পারলো না। মায়ের হাতের পায়েস মিস করতে লাগলো খুব।
মাহি এসে পাশে বসলো। মেহরিনের বিষন্ন মুখ দেখে বলল-
“ কিছু হয়েছে নাকি? শরীরে উপর দিয়ে যা যাচ্ছে তোমার আজকাল। ”
“ না তেমন কিছু হয় নি। মায়ের হাতে পায়েস খেতে ইচ্ছে করছে খুব। অথচ আম্মু থাকার সময় এই ক্রেভিংস টা আসলো না।
“ পায়েস খাবে? আমার চেনা একটা রেস্টুরেন্টের নিউ ব্রাঞ্চ ওপেন হয়েছে আজ। ওখানে সব কিছুতে অফার দিচ্ছে আজকের জন্য। বিভিন্ন আইটেমের ডেজার্ট পাওয়া যায়। অর্ডার দেই?”
“ না থাক। বাহিরে জিনিস খেলে উনি বকবেন । ”
“ আরেহ্ কিছু হবে না। আমি বরং আজকের দুপুরের খাবার টা সেখান থেকে অর্ডার দেই। ”
ঊর্মি এসে পাশে বসতে বসতে বলল-
“ ভালোই হবে। বাহিরের খাবার খেতে দেয় না উনি। এই উছিলায় খেতে পারবো। ”
বাশার সুলতান পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। বাহির থেকে খাবার আসবে শুনে দাঁড়িয়ে গেলেন।
“ বাহির থেকে খাবার আসবে মানে? বাসায় কি খাবার নেই? ম্যেড কি রাঁধে নি দুপুরে? ”
“ রেঁধেছে। ”
“ তাহলে বাহিরের খাবারের কথা উঠছে কেনো? আনহাইজেনিক খাবার দাবার সব। ”
“ আঙ্কেল কিচ্ছু হবে না। একটা দিনই তো। ”
“ সোলেমান জানতে পারলে পুরো বাড়ি মাথায় নিয়ে নিবে। এমনিতেই ছেলে আমার উপর রেগে আছে। মাহি এমন কিছু করো না ওর কথার বাহিরে। তখন তোমাকেও বকবে। তোমার খেতে ইচ্ছে করলে তুমি খাও। মেহরিন কে নিয়ে ভাবার জন্য তার ম্যেডরা আছে। মেহরিনের কিছু খেতে ইচ্ছে করলে তারা বানিয়ে দিবে। ”
মাহি আচ্ছা বলে রুমাইসা কে জিজ্ঞেস করলো সে খাবে কি না। রুমাইসা না জানলো। মাহি শুধু নিজের আর ঊর্মির জন্য খাবার অর্ডার দিলো। তার ভেতর কুনাফা আর পায়েস। পায়েসের নাম বলে দিলো। কোন পায়েস টা নিতে চায় । আর সাথে কাচ্চি।
অর্ডার দেওয়ার ত্রিশ মিনিট পর খাবার দিয়ে গেলো ডেলিভারি ম্যান।
মাহি টেবিলে সাজালো নিজের আর ঊর্মির জন্য। মেহরিন কে ডাকলো কিন্তু মেহরিনের ইচ্ছে করলো না কাচ্চি খেতে। উপরে উঠে চলে যেতে নিলে মাহি ডেকে বলল-
“ মেহরিন পায়েস বা কানাফা টা চাইলে ট্রাই করে দেখতে পারো ক্রিভিং নেস টা কমে যায় কি না। ”
মেহরিনের খুব খেতে ইচ্ছে করলো। মেহরিন যেহেতু কুনাফা খাবে না। তাই মাহি পায়েসের বাটি টা এগিয়ে দিয়ে বলল-
“ এটা ট্রাই করো। আমার ফেবারিট পায়েস এটা। ”
মেহরিন তাকিয়ে দেখলো কেমন ক্রিমি ক্রিমি দেখতে।
“ কি পায়েস এটা?”
“ আপেলের। ট্রাই ইট। তুমিও ফিদা হয়ে যাবে। ”
মেহরিন এক চামচ খেয়ে দেখলো। আসলেই টেস্ট টা দারুন। মেহরিন বাটি দেখিয়ে বলল-
“ সব টুকু খাই?”
“ অবশ্যই। ”
মেহরিন সব টুকু খেলো না,তবে অর্ধেকের বেশি টুকু খেলো। মাহি আর ঊর্মি কাচ্চি শেষে কুনাফা খেলো। মেহরিন পায়েস খাওয়া শেষে এবার বোধহয় তৃপ্তি পেলো। গ্লাসে পানি ঢেলে পানি খেয়ে রুমে চলে গেলো।
সন্ধ্যার পরপর আকস্মিক মেহরিনের পেট ব্যথা শুরু হয়। হাল্কা ব্লিডিং ও হতে দেখা গেলো। এমন অবস্থা হলো যে এই ব্যথা মেহরিন আর সহ্য করতে পারলো না। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো পেটে হাত দিয়ে। তার চিৎকার শুনে রুমাইসা দৌড়ে এসে দেখলো মেহরিন ফ্লোরে শুয়ে পেট চেপে কান্না করছে। রুমাইসা কাছে আসতেই ফ্লোরে হাল্কা রক্তের ছাপ দেখে শরীর হিম হয়ে গেলো। বাচ্চার কিছু হলো না তো আবার! তাড়াতাড়ি চাচা আর ইয়াসিন কে ডাক দিলো।
ইয়াসিন কিছুক্ষণ আগেই এসেছে নিবাসে। ফ্রেস হয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলো। চিরুনি টা রাখতে গিয়ে ভুলবশত কাঁচের গ্লাস টা হাতে লেগে ফ্লোরে পড়ে ভেঙে যায়। বাতাসি সেটাই উঠাচ্ছিল। কিন্তু রুমাইসার চিৎকার শুনে ইয়াসিন ঘুরে পা ফেলতে গিয়ে বাতাসির হাতের উপর পা ফেলে। বেচারি বাতাসির হাতে গ্লাসের কাঁচের টুকরো ছিলো। সেই কাঁচের টুকরো গিয়ে বিধলো হাতে। ব্যথায় মৃদু শব্দ করে উঠলো। ইয়াসিন বাতাসির ব্যথার শব্দ শুনে পেছনে একবার ফিরে বলল-
দাহশয্যা পর্ব ৮৭ (৩)
“ দুঃখ পেলে? দুঃখিত আমি দেখি নি।”
তারপর ইয়াসিন চলে গেলো। বাতাসি হাতের মুঠো খুলতেই গলগল করে হাত দিয়ে র’ক্ত বের হতে লাগলো। ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি। ইয়াসিনের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে-
❝ কি অদ্ভুত! তারা ইচ্ছে করে দুঃখ দিয়ে আলতো হেঁসে জিজ্ঞেস করে – “ দুঃখ পেলে?” ❞
