Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯০

দাহশয্যা পর্ব ৯০

দাহশয্যা পর্ব ৯০
Raiha Zubair Ripti

এজওয়ানের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় বারোটা বেজে গেল। বাইরে তখনো ঝড়-বৃষ্টি তাণ্ডব চালাচ্ছে। চারদিকের বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা। দূরে কোথাও বজ্রপাতের আলো ঝলসে উঠছে, আবার মুহূর্তেই সব গিলে খাচ্ছে গভীর অন্ধকার।
গাড়ির শব্দ কানে আসতেই মাহি বুঝে গেল এজওয়ান এসেছে। সন্ধ্যা থেকে সে লোকটারই অপেক্ষায় ছিল। ঝড়ের কারণে পুরো বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা, নিঃশব্দ, একটু ভুতুড়ে লাগছিল। দরজায় পাসওয়ার্ড টিপে এজওয়ান ভেতরে ঢুকতেই মাহি ঘাড় কাত করে তাকালো।
এজওয়ানের পুরো শরীর ভিজে একাকার। কালো হুডির প্রান্ত বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে মেঝেতে।
মাহি তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে এলো। উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-

“ভিজলেন কী করে?”
এজওয়ান সোজা সিঁড়ি বেয়ে রুমের দিকে যেতে যেতে দীর্ঘ এক শ্বাস ফেলল। ক্লান্ত, ভারী কণ্ঠে বলল-
“সঠিক জানি না।”
এমন কথায় মাহির কপাল কুঁচকে গেল। জানে না মানে? এজওয়ান কীভাবে ভিজেছে সেটা এজওয়ান নিজেই জানে না? সে আর কিছু না বলে উপরে উঠে গেল। রুমে গিয়ে দেখে এজওয়ান ইতিমধ্যে ভেজা জামাকাপড় বদলে ফেলেছে। শুকনো শার্ট পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঝেড়ে দিচ্ছে।
মাহিকে আয়নার ভেতর থেকেই দেখে বলল-
“আমাকে এক মগ কফি এনে দিতে পারবে?”
মাহি ছোট্ট করে মাথা নেড়ে বলল-
“হু… এখনই আনছি।”

মাহি নিচে চলে গেল। রুমে একা দাঁড়িয়ে রইল এজওয়ান। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল গলায় ঝুলে থাকা চেইনের দিকে। পাতলা রুপালি চেইনটা। এই চেইনটা নিয়ে এজওয়ান বাবার কাছ থেকে একটা গল্প শুনেছিল।
বাবা বলেছিলেন এটা নাকি এক নোংরা মহিলা বানিয়েছিল এজওয়ানের জন্য। খুব যত্ন করে, খুব ভালোবাসা দিয়ে… নিজের ছেলের জন্য। সেই মহিলাটা আর কেউ নয়,এজওয়ানের মা।
কতবার যে সে চেইনটা খুলে ফেলে দিতে চেয়েছে!
একবার তো সত্যিই খুলে ফেলে দিয়েছিল।
কিন্তু এক ঘণ্টাও থাকতে পারেনি সেটাকে ছাড়া।
পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছে। শেষে আবার খুঁজে এনে গলায় পরেছে।
আজ প্রায় ঊনত্রিশ বছর ধরে এই চেইনটা তার সাথে আছে। চেইনটা আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল অনেক পুরোনো কিছু ছবি…

তখন তার বয়স মাত্র তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে। সে জানত না পরকীয়া কী,জানত না তার মা আসলে কী করেছে। সবার মা আছে,তার মা নেই কেনো? সবার মা সবাইকে নিতে স্কুলে আসে,তার মা কেনো আসে না? কেনো খাইয়ে দেয় না? কেনো আদর করে গালে কপালে চুমু খায় না? কেনো রাত হলে বুকে জড়িয়ে ধরে কবিতা, গান শোনাতে শোনাতে ঘুম পারায় না।
ছোট্ট এজওয়ান তখন এই চেইনটা বুকে চেপে ধরে কাঁদত মাম্মাম… মাম্মাম… বলে। ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে বেড়াত।

মাকে খুঁজে বেড়াত। অনেক রাত এমন গেছে বাশার সুলতান বাংলাদেশে, আর ছোট্ট এজওয়ান অস্ট্রেলিয়ায় একা ঘুমাতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে পুরো রাত জেগে কাটিয়েছে।
কষ্টের সময় সে মাকে পায়নি। ঠিকমতো বাবাকেও পায়নি। যে বয়সে একটা শিশুর সবচেয়ে বেশি দরকার হয় বাবা-মায়ের আদর, সেই বয়সে এজওয়ান ছিল প্রায় এতিমের মতো।
অস্ট্রেলিয়ার রাস্তায় বের হলেই সে মানুষ ধরে ধরে জিজ্ঞেস করত- তোমরা আমার মাম্মামকে দেখেছো? আমার মাম্মাম কোথায় গেছে জানো?
বাশার সুলতান একদিন তাকে বলেছিলো- “তোমার মাম্মাম স্টার হয়ে গেছে।”
ছোট্ট এজওয়ান তখন নিষ্পাপ চোখে লোকজনকে বলত- আমাকে স্টারের কাছে নিয়ে যাবে? বাবা বলেছে মাম্মাম স্টারের কাছে আছে। আমি একটু মাম্মামকে দেখবো। একটু জড়িয়ে ধরবো। একটু আদর নিয়ে আসবো।
শিশুটার এমন কথা শুনে অনেকেরই বুক ফেটে যেত। মায়ের শূন্যতা তাকে এতটাই ভেঙে দিয়েছিল যে একটানা পনেরো দিন জ্বরে পড়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল তাকে।
শেষ পর্যন্ত বাশার সুলতান আর সহ্য করতে পারেননি।

একদিন ছেলেকে বসিয়ে তিনি তার মায়ের সব কাহিনি খুলে বলেছিলেন। তার মা তাদের ভালোবাসে নি। তাদের ছেড়ে চলে গেছে অন্য পুরুষের সাথে। সেই পুরুষ তার মা কে মেরে ফেলছে।
তখনও এজওয়ান বিশ্বাস করতে চাইত না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সত্যিটা তাকে মেনে নিতেই হলো। সে বুঝতে পারল,তার মা সত্যিই একজন প্রতারক ছিল। সে বাশার সুলতানকে ঘর জামাই করে রেখেছিল। বাশার সুলতান কে নিজের পরিবারের সাথে যোগাযোগ টাও করতে দিত না তার মা। কারণ এজওয়ানের নানা ছিলেন ফ্রান্সের খুব প্রভাবশালী একজন মানুষ। টাকা, সম্পদ, জমিজমা কোনো কিছুরই অভাব ছিল না তাদের।
প্রেম করে বিয়ে করেছিল বলে বাশার সুলতান প্রায়ই স্ত্রীর সব কথা মেনে নিতে হতো। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিল এজওয়ানের মা। ভালোবাসার আড়ালে ধীরে ধীরে একটা পরিবারকে ভেঙে দিয়েছিল সে। আর তার ভাঙা টুকরোগুলো নিয়েই মায়ের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে বড় হয়েছে এজওয়ান। এই জীবনে এজওয়ান দুটি জিনিস কে ঘৃণা করে। এক মা আর দুই পরকীয়া।
অথচ এজওয়ান সেই ঘৃণিত মায়ের শেষ স্মৃতি টুকু সাথে করেই ঘুরে বেড়াচ্ছে দীর্ঘ ২৯ টা বছর। মাহি কফির মগ টেবিলের শব্দ করে রাখতেই এজওয়ান তড়িঘড়ি করে চেইন টা শার্টের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখে। মাহি এজওয়ান কে চেইনটা তড়িঘড়ি করে লুকাতে দেখে কপাল কুঁচকালো।
এজওয়ান বা হাত দিয়ে কফির মগ টা হাতে তুলে নিতেই মাহি জিজ্ঞেস করলো-

“ আপনার গলার চেইন টা কিন্তু সুন্দর। কোথা থেকে বানিয়েছিলেন?”
এজওয়ান কফির মগে চুমুক বসিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-
“ তোমার চাই এমন চেইন?”
“ না। ডিজাইন টা অনেক ইউনিক তো তাই জিজ্ঞেস করা। ”
“ সম্ভবত ফ্রান্সের কোনো এক নামকরা সেকরা বানিয়েছিল একজনের কথা মতো। ”
“ কার?”
এজওয়ান কফির মগ টা টেবিলের উপর রেখে বিছানায় শুয়ে বলল-
“ আছে কেউ একজন। গুড নাইট। ”
মাহি এগিয়ে আসলো। গুড নাইট মানে? ডিনার করবে না এই লোক?
“ খাবেন না আপনি?”
এজওয়ান ছোট্ট করে জবাব দিলো –
“ না। ল্যাব থেকে খেয়ে আসছি। ”
মাহি নিচে নেমে খাবার গুলো ঢেকে বাতি নিভিয়ে রুমে আসলো। এজওয়ান তখন ঘুমে চলে গেছে। মাহি তপ্ত শ্বাস ফেলে পাশে এসে শুয়ে পরলো।
সকালে ঘুম ভাঙলো মাহির অ্যালার্মের তীক্ষ্ণ আওয়াজে। ঘুম জড়ানো চোখে হাত বাড়িয়ে ফোনটা অন করতেই স্ক্রিনে সময় ভেসে উঠলো ৫:৪৫।

একটা দীর্ঘ হাই তুলে পাশ ফিরে তাকাতেই হঠাৎ থমকে গেলো সে। বিছানার অন্য পাশটা খালি।
এজওয়ান নেই। মাহি কপাল কুঁচকে আবারও তাকালো। লোকটা সাধারণত এত সকালে ওঠে না। গভীর ঘুমেই থাকে এই সময়। একটু অবাক হয়েই ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলো সে।
নিচে নেমে ড্রয়িংরুমে চোখ বুলালো। পুরো বাড়ি অদ্ভুত নীরব। এজওয়ানের কোনো চিহ্ন নেই।
মাহি ভাবলো হয়তো বাইরে গেছে। তাই প্রধান দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলতে হাত বাড়ালো। কিন্তু দরজায় হাত দিতেই বুঝলো পাসওয়ার্ড ছাড়া এটা খোলা সম্ভব না। আর মাহি পাসওয়ার্ড জানে না।
একটু বিরক্ত হয়ে পাশের জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালো সে। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়ায়নি। চারপাশে হালকা কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাস। কিন্তু বাইরে কোথাও এজওয়ানের দেখা নেই।
মাহির কপালের ভাঁজ এবার আরও গভীর হলো।
হঠাৎ তার মনে পড়লো জিম রুমে নেই তো?
ধীরে ধীরে সেই দিকেই হাঁটা দিলো সে।

জিম রুমের দরজার কাছে যেতেই ভেতর থেকে ভারি ধাতব শব্দ ভেসে এলো। মাহি দরজাটা আস্তে করে ঠেলে খুললো।ভেতরের দৃশ্যটা দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
এজওয়ান তখন ডাম্বেল নিয়ে ওয়ার্কআউট করছে। তার গায়ে শুধু কালো ট্রেনিং ট্রাউজার, উপরের শরীর সম্পূর্ণ খোলা। তীব্র একাগ্রতায় সে ডাম্বেল তুলছে আর নামাচ্ছে।
প্রতিবার ওজন তুলতেই তার কাঁধের পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠছে। বাহুর শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বুকের প্রশস্ত পেশী ওঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসে।
জিমের হালকা আলোয় তার শরীরের প্রতিটা গঠন যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অনেকক্ষণ ধরে একটানা ব্যায়াম করার কারণে তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ঘামের ছোট ছোট বিন্দু কপাল বেয়ে গড়িয়ে গালে নেমে আসছে। কিছু ফোঁটা বুকের উপর দিয়ে নেমে শক্ত পেশীর রেখা অনুসরণ করে নিচে গড়িয়ে পড়ছে।

চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে পড়ে আছে। শ্বাস একটু ভারি।
ডাম্বেলটা নামিয়ে রেখে এজওয়ান দুই হাত দিয়ে মাথার চুল পেছনে ঠেলে দিলো। সেই মুহূর্তে তার বুকটা আরও প্রসারিত হয়ে উঠলো। মাহি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো।
এজওয়ান ঘাড় বেঁকিয়ে মাহি কে দেখে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো- কিছু বলবে?
মাহি দু’দিকে মাথা নেড়ে না জানিয়ে ব্রেকফাস্ট বানাতে গেলো।
এজওয়ান টাওয়াল দিয়ে ঘর্মাক্ত শরীর মুছে বোতল থেকে পানি খেতেই পকেটে থাকা ফোন টা বেজে উঠলো। এজওয়ান পকেট থেকে ফোন টা বের করে দেখলো ফ্লোরা ফোন করেছে। এজওয়ান রিসিভ করে কানে দিতেই ফ্লোরা ওপাশ থেকে বলল-

“ হ্যালো এজওয়ান? ”
“ হু বলো। ”
“ ফিটজরয় কি চলে গেছো তোমরা? নাকি সিডনি তেই আছো। ”
এজওয়ানের কপাল কুঁচকে আসলো।
“ আমরা তো ফিটজরয় তেই আছি। সিডনি তে থাকতে যাব কেনো? ”
“ কাল কতবার করে ডাকলাম তোমার ওয়াইফ কে শুনলো না। ”
“ কোথায়? মলে?”
“ না। সিডনি তে দেখেছি তোমার বউ কে। সেজন্যই তো ফোন করলাম এখন তো দেখি চলে গেছো তুমি। ”
“ বাট কাল তো মাহি সিডনি তে যায় নি। ও কে তো আমি মলে নামিয়ে এসেছিলাম। কখন দেখেছো সিডনি তে?”
“ বিকেলের দিকে হবে। লম্বা ওভার কোট পড়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। আমি পাপার সাথে ফোনে কথা বলে ওপর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তখনই দেখলাম। আমি ভেবেছি তুমিও এসেছিলে ওর সাথে। এখন তো মনে হচ্ছে তুমি জানোই না মাহি যে সিডনি এসেছিল। ”

“ আমাকে বলে যায় নি। আচ্ছা এখন রাখছি আমি। পরে ফোন করবো। ”
এজওয়ান কেটে দিলো ফোন। টাওয়ার টা কাঁধে চেপে নিচে আসলো। মাহি ডিম পোস আর ব্রেড সাজাচ্ছে প্লেটে। এজওয়ান চেয়ার টেনে বসে বলল-
“ কি কি শপিং করলে কাল? ”
মাহি আচমকা শপিং এর কথা শুনে চমকে উঠলো। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল-
“ মেয়েদের জিনিসপত্রই কিনিছি। ”
“ ওহ আচ্ছা। শপিং মল থেকে কি আর কোথাও গিয়েছিলে?”
“ ন…না তো। ”
“ আচ্ছা। ”
“ কেনো কি হয়েছে?”
“ ফ্লোরা বললো তোমাকে নাকি সিডনি তে দেখেছে। তোমাকে ডেকেছেও। তুমি নাকি তার ডাক শুনো নি। ”
মাহি জুশ মুখে নিয়ে বলল-

“ ন..না আমি শপিং মলেই ছিলাম। ”
“ দেখি কি কি কিনলা। ”
“ মেয়েলি জিনিস আপনি দেখে কি করবেন? ”
“ দেখা বারন? ”
“ না, বারন কেনো হবে। স্কিন কেয়ার প্রডাক্ট কিনেছি। ”
এজওয়ান আর কিছু বললো না। ফোনটা হাতে নিয়ে সিআইডি ব্যুরো তে মেসেজে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো- সাফওয়ান কোথায় এখন।
রিপ্লাই আসলো- সাফওয়ান ব্যুরোতেই আছে। এজওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেললো। তাহলে মাহি সিডনি তে কি করতে গিয়েছিল?

প্রিয়তমা রুমু…
ভালোবেসে তোমাকে আমি রুমুই ডাকবো, হু? এতো বড় নামে ডাকতে আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগে। রুমাইসা নামটা যতই সুন্দর হোক, আমার কাছে তুমি শুধু রুমু।
তুমি হয়তো জানো না, তোমাকে আমি অনেক আগেই দেখেছি… ফেসবুকে কথা বলারও আগে।
সেদিন ছিল একটা বিয়ের অনুষ্ঠান। আমিও সেখানে আমন্ত্রিত ছিলাম। মানুষের ভিড়, আলো ঝলমলে সাজসজ্জা, হাসি-আড্ডা সবকিছুর মাঝেও হঠাৎ আমার চোখ থমকে গেলো এক জায়গায়।
তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে একটু দূরে। কি অপরূপ লাগছিলো তোমাকে জানো? সত্যি বলছি, ওই মুহূর্তে আশেপাশের সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। সারাটা সময় আমি শুধু তোমার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিলো, এত মানুষের মাঝে তুমি একাই আলাদা একটা আলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তখন তোমার নাম জানতাম না। এটাও জানতাম না তুমি আমাদের এমপি সাহেবের একমাত্র আদরের বোন। পরে কারো কাছ থেকে তোমার নামটা জানতে পারলাম। ঢাকায় ফিরে প্রথম কাজই ছিল তোমাকে খোঁজা।
ফেসবুকে সার্চ দিলাম। কিন্তু বিপদ হলো। এই নামে তো শ’খানেক আইডি! কোনটা তোমার, তা বোঝার উপায় নেই। তার ওপর তোমার আইডি আবার লক করা। তখন প্রোফাইল পিকেও ছিল তোমার ব্যাক সাইডের একটা ছবি। মুখ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছিল না।

হয়তো তোমার আইডিটা আমার সামনেও এসেছিল…কিন্তু চিনতে না পেরে আমি স্ক্রোল করে চলে গিয়েছিলাম। পরিচিত কারো কাছে গিয়ে তোমার আইডি চাইতে কেমন যেন লজ্জা লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো সবাই বুঝে ফেলবে আমার মনের কথা। তাই আর কাউকে জিজ্ঞেস করিনি। বিষয়টা সেখানেই থেমে গেলো।
তবুও, অদ্ভুতভাবে তোমার খোঁজ নিতে ইচ্ছে করতো মাঝে মাঝে। কিন্তু কখনো ভাবিনি,যাকে আমি এতো হন্যে হয়ে খুঁজেছি…সেই মেয়েই একদিন নিজে থেকে এসে আমার পেজের কমেন্টে হাজির হবে! সেদিন তুমি প্রোফাইল পিক বদলিয়েছিলে। তোমার মুখটা স্পষ্ট ছিল।
বিশ্বাস করো, নাম আর ছবিটা দেখেই তোমাকে চিনতে এক সেকেন্ডও লাগেনি। সেদিন আমার কি যে খুশি লাগছিলো, তা ভাষায় বোঝাতে পারবো না। মনে হচ্ছিলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মুহূর্তটা যেন আমারই জীবনে এসে দাঁড়িয়েছে। যাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি চুপিচুপি…সেই মেয়েই কিনা আমার ডাই-হার্ট ফ্যান! তাই আর দেরি করিনি। তোমার কমেন্টে রিপ্লাই দিলাম। সেখান থেকেই শুরু হলো আমাদের কথা বলা।
আস্তে আস্তে কথা বাড়তে লাগলো। আমি চেষ্টা করছিলাম বুঝতে, আমাকে নিয়ে তোমার অনুভূতিটা ঠিক কেমন। আর যেদিন বুঝলাম ইউ লাইক মি।

ইশ! সেদিন আমার কি অবস্থা হয়েছিল জানো?
মনে হচ্ছিলো এখনই যদি কুয়াকাটার সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে বসি!
চাঁদ-তারাকে ডেকে বলি- “দেখো, পৃথিবীটা কত সুন্দর! আমার ভালোবাসাকে আমার কাছেই এনে দিয়েছে।”
সেদিন সন্ধ্যায় আমি মসজিদে গিয়েছিলাম।
পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে হুজুরের হাতে দিলাম। বললাম-
“হুজুর, আমাদের জন্য একটু দোয়া করবেন?”
হুজুর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
“কিসের দোয়া?”
আমি বললাম-
“আমার প্রেম… আমার রুমু যেন আমারই হয়ে থাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।”
আমার কথা শুনে হুজুর হেসে ফেললেন। তারপর মাথায় হাত রেখে বললেন-
“আল্লাহ ভালো রাখুক তোমাদের।”

সেই রাতটা আমি মসজিদেই কাটিয়েছিলাম। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়লাম। সিজদায় মাথা রেখে শুধু একটাই দোয়া করলাম রবের নিকট-আমার রুমুকে আমার থেকে কখনও দূরে করো না।”
রুমু…একটা কথা বলি? তুমি যখন আমাকে সামনে থেকে দেখবে…দয়া করে আমাকে প্রত্যাখ্যান করো না। আমি যেমন, আমাকে তেমন করেই মেনে নিও?
শোনো,আমি আগামীকাল নওগাঁ আসছি।
আমরা দেখা করবো। আমি তোমাকে একটা শাড়ি পাঠিয়েছি। ওটাই পরবে। আর কানের পাশে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ ফুল গুঁজে নিও। আমি সাদা শার্ট পরে আসবো। তারপর তোমাকে আমি প্রাণ ভরে দেখবো। হয়তো সেই মুহূর্তেই বুঝে যাবো,

এই পৃথিবীতে আমার সব চাওয়ার নাম শুধু রুমু।
তারপর যদি তুমি আমার হাতটা ধরো…
তবে মনে মনে শুধু এই কথাটাই বলবো-
এগো হাতে ধইরা ছাইড়ো না হাত, সামনে আগাইয়া…
ছাড়িয়া যাইয়ো না বন্ধু মায়া লাগাইয়া,
জীবন খাতায় প্রেম কলঙ্কের দাগ লাগাইয়া…
ছাড়িয়া যাইয়ো না বন্ধু মায়া লাগাইয়া…
ইতি তোমার..
~ তূর্ণ।
রুমাইসা তূর্ণর পাঠানো চিঠিটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে মিনিট দশেক হবে। লোকটা তাকে আগে থেকেই পছন্দ করে! বিয়ে বাড়িতেও দেখেছে! রুমাইসার মাথা ভনভন করছিলো ঐ টুকু পড়ে। শাড়িটা মেলে শরীরে জড়িয়ে ধরলো। তার তূর্ণ পাঠিয়েছে এই শাড়ি! রুমাইসা মুখ ডুবিয়ে দিলো শাড়ির মাঝে। তারপর হোয়াটসঅ্যাপে তূর্ণ কে ভয়েস পাঠিয়ে বলল-

“ আমি পরবো আপনার পাঠানো এই শাড়ি। কানের কাছেও গোলাপ ফুল গুঁজবো। তারপর আপনাকে দেখবো। আর শুনুন তূর্ণ সাহেব। আপনাকে প্রত্যাখ্যান করার প্রশ্নই আসে না। আপনার জীবন খাতায় প্রেম কলঙ্কের দাগ দাগাইয়া.. ছাড়িয়ে যাবো না আমি মায়া লাগাইয়া।”
বাতাসি দূরে সোফায় বসে বসে রুমাইসার কাণ্ড দেখছে। এতো খুশি লাগছে রুমাইসা কে! অথচ তিনদিন পর নাকি তেহরান রা আসবে তাকে দেখতে।
বাতাসি তপ্ত শ্বাস ফেলে নিচে আসলো। আফিয়া সুলতান তখন মেহরিনের মাথায় তেল মালিশ করে দিচ্ছে। বাতাসি কে দেখে বলল-

“ কিছু চাই তোমার? ”
বাতাসি মাথা নেড়ে না করলো। বলল-
“ একটু বাহিরে,মানে বাগানে যাব। ”
“ ঠিক আছে যাও। ”
বাতাসি বাগানে আসলো। হরেক রকমের ফল ফুল সবজির গাছ। বাতাসি একটা একটা করে ফুলের গাছ ছুঁয়ে সবজির গাছ ছুঁয়ে দিচ্ছে। ভালো লাগছে তার এই বাগানে। কেমন ফ্রেশ ফ্রেশ স্নিগ্ধ শান্তি অনুভূতি। বাতাসি একটা পাকা টমেটো ছিঁড়ে ওড়নায় মুছে মুখে দিতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে পুরুষালি গলায় ভেসে আসলো-
“ গাছের ফল ধুয়ে খেতে হয় মিস। তা না হলে জীবাণু ঢুকে যায় পেটে। ”
বাতাসির আর মুখে দেওয়া হলো না টমেটো। পেছন ফিরে তাকিয়ে কন্ঠের মালিক কে দেখতে চাইলে দেখামাত্রই চমকে উঠে। এ তো সেই লোক। সুলতান নিবাসে দেখেছিল।
অয়ন বুঝতে পারে নি এটা বাতাসি। সেজন্য চমকিত অবস্থায় চোখ থেকে সানগ্লাস টা নামিয়ে বলল-

“ ব্লাক ডায়মন্ড আপনি!”
বাতাসি তার এমন নাম শুনে কপাল কুঁচকে ফেললো। ব্লাক ডায়মন্ড বলছে কেনো? বাতাসি চোখ নিচু করে বলল-
“ আমার একটা নাম আছে। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। কি নাম বলুন শুনি তাহলে। ”
“ বাতাসি। ”
“ বাতাসি! ইউনিক আর আনকমন নাম তো। বাতাস বলে ডাকি? আপনি বাতাসের মতো। মনে হয় একটু বাতাস হলেই আপনি উড়ে যাবেন বাতাসের সাথে। ”
বাতাসি তাকালো অয়নের দিকে। অপমান করেছে নাকি এই লোক?
“ অপমান করলেন নাকি?”
“ আস্তাগফিরুল্লাহ, এই শব্দ আমার সাথে যায় না।”
“ আপনি এখানে যে?”
“ শুনলাম রুমাইসার নাকি বিয়ে। ”
“ হুমম। আপনার সাথে হওয়ার কথা ছিলো না?”
“ পুরোপুরি হওয়ার কথা ছিলো না। জাস্ট কথা উঠেছিল। তো রুমাইসার নাকি কাকে পছন্দ তার সাথে হচ্ছে বিয়ে?”
“ না। মেহরিন আপুর কাজিনের সাথে হচ্ছে। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। এখানে দাঁড় করিয়েই কি কথা বলাবেন সব? ভেতরে যেতো বলছেন না যে?”
“ বাড়ি টা তো আমার না। আপনি ভেতরে গেলে যান। মানা তো করি নি আমি। ”
অয়ন চলে গেলো ভেতরে। বাতাসিও পেছন পেছন নিজের রুমে আসতেই দেখলো তার বাটন ফোন টা অনবরত বাজছে। বাতাসি ফোনটা ওয়ারড্রবের উপর থেকে নিয়ে দেখলো তার বান্ধবী ফোন করেছে। বাতাসি রিসিভ করে কানে নিলো।

“ হু বল। ”
ওপাশ থেকে বাতাসির বান্ধবী বলে উঠলো-
“ কি খবর তোর?”
“ ভালো, তোর?”
“ ভালো। ঢাকা আসবি কবে?”
“ দিনক্ষণ ঠিক নেই। ”
“ জামাই ছেড়ে কেউ বাহিরে থাকে? ভাইয়া কে নিয়ে যেতিস সাথে করে। ”
“ তার কাজ ছিলো। ”
“ খেয়াল রাখিস ভাইয়ার উপর। দিনকাল যা হচ্ছে চারিদকে। তিন্নি ম্যাডামের সাথে গতকাল রাতে ভাইয়াকে দেখলাম। দুজনে মিলে হোটেলে খাবার খাচ্ছে। তাদের মধ্যে কিছু নেই তো আবার?”
বাতাসির ভ্রু কুঁচকে আসলো।

“ কি থাকবে তাদের মাঝে?”
“ বোকা নাকি তুই? বুঝিস না কি থাকার কথা বলছি? তোর অনুপস্থিতিতে ভাইয়া আবার তিন্নি ম্যামের সাথে…”
“ মাথা ঠিক আছে তোর? কিসব আজেবাজে কথা বলছিস? উনি এমন কিছু করতেই পারেন না। ”
“ হইছে ফাফর কম দে তো। আজকাল কার পুরুষ গুলো সুন্দরী বউ রেখেই পরকীয়া করে আর সেখানে তো ভাইয়া তোকে মানেই না। সেদিনও তো নীলক্ষেতে দেখলাম। দেখিস আমার ধারণাই সঠিক বের হবে। উনি সত্যি… ”
“ চুপ কর তুই মিথি। ”
“ আচ্ছা যা,তোর আমার মুখের কথা বিশ্বাস করতে হবে না। আমি তোকে ছবি পাঠাবো। হোয়াটসঅ্যাপ আছে না?”
“ না। বাটন ফোন আমার। ”
“ একটা স্মার্ট ফোন কিন। তারপর আমার পাঠানো ছবি গুলো দেখিস। ”
বাতাসি হা না কিছু না বলেই ফোন কে’টে দিলো। তারপর নিজের সাইড ব্যাগ টা চেক করে দেখলো হাজার দশেক টাকা আছে। সোলেমান যে চেক দিয়েছিলো সেখান থেকে বাতাসি ২০ হাজার টাকা তুলে ছিলো। ১০ হাজার টাকার মধ্যে একটা নরমাল ফোন কিনবে বাতাসি। সাইড ব্যাগ নিয়ে রুমাইসার কাছে গেলো। রুমাইসা তখন টিভি দেখছিলো। বাতাসি এসে বলল-

“ আপু চলো না একটু বাজারে যাই। একটা ফোন কিনবো। ”
রুমাইসা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“ কিসের ফোন কিনবা তুমি?”
“ একটা টাচ মোবাইল কিনবো। ”
“ আচ্ছা চলো। ”
রুমাইসা ঘর থেকে নিজের সাইড ব্যাগ সাথে নিয়ে বের হবার সময় ডক্টর অয়নের সাথে দেখা। তিনি ওদের দু’জনকে বাহিরে যেতে দেখে বলল-
“ কোথায় যাচ্ছো তোমরা?”
“ বাজারে ফোন কিনতে বাতাসির। ”
“ আমিও যাই তাহলে? ফোন সম্পর্কে তোমাদের থেকে বেশ ভালোই বুঝি। ”
রুমাইসা আসেন বলে হাঁটা ধরলো। তারা সুলতানপুর থেকে হেঁটেই বক চত্বরে আসলো। সেখান থেকেই একটা ফোনের দোকানে ঢুকে অয়ন একটা ভালো ফোন দেখাতে বললো। দোকানদার লাখ টাকার ফোন দেখালে বাতাসি সাথে সাথে বলে বসলো-

“ এত দামের না। আমাকে ৮-১০ হাজারের মধ্যে দেখান ফোন। ”
“ এই দামের ফোন বেশি দিন ইউজ করতে পারবেন না ব্লাক ডায়মন্ড। ”
“ না পারলাম। আমাকে এই দামের মধ্যেই কিনতে হবে। ”
“ টাকার সমস্যা থাকলে আমি দেই? পরো না হয় সময় সুযোগ বুঝে ব্যাক দিবেন। ”
“ না। আপু তুমি দেখো ফোন। ”
রুমাইসা দেখলো ফোন। ১০ হাজারের মধ্যেই একটা ফোন কিনে দেওয়া হলো বাতাসি কে। ফোন কেনা শেষে বাহিরে ফুচকা দেখে রুমাইসা আর নিজেকে আঁটকে রাখতে পারলো না। এগিয়ে এসে খেতে আরম্ভ করলো বাতাসি কে নিয়ে। ডক্টর অয়ন ও এগিয়ে আসলে রুমাইসা ফুচকাওয়ালা কে বললো তাকেও এক প্লেট দিতে। ডক্টর অয়ন হুটহাট খায় খুচকা। তাই না করলো না। খাওয়ার মাঝে রুমাইসা তিন জনের সেলফি তুললো। সেই সেলফি বাড়ি ফিরে আবার স্টোরি তেও দিলো। সাথে সাথে তার মেসেঞ্জার হোয়াটসঅ্যাপ ভরে গেলো। তূর্ণ, তেহরান আর ইয়াসিনের মেসেজে।

তূর্ণ বলছে- এ আবার কে? কাজি নাকি?
তেহরান বলছে- বেয়াইম সাহেবা,ছবির এই ব্যাডা তো বহুত হ্যান্ডসাম আছে। তা এই কি সেই আপনার তূর্ণ?
ইয়াসিন বলতেছে- ডক্টর অয়ন নওগাঁ গেছে? তোমরা তিনজন আবার ঘুরতেও বের হইছো? ফুচকাও খাচ্ছো! এদিকে তোমার এই ভাইটা যে না খেয়ে থাকে। খোঁজ নিছো কখনও? স্বার্থপর কোথাকার।
রুমাইসা হতবিহ্বল হয়ে গেছে ইয়াসিনের এমন কথা শুনে। ইয়াসিন ফোন হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখছে স্টোরি টা। বাতাসি মেয়েটার এখন মাথা থেকে কাপড় সরে গেছে। সামনে দিয়ে বুকের উপর মেলে রাখা। চুল গুলো ছাড়া! আবার স্ট্রেট ও করছে! মুখে একটা গ্লাসি গ্লাসি ভাইব দিচ্ছে। আগের তুলনায় কিঞ্চিৎ স্বাস্থ্য হয়েছে। ইয়াসিন স্টোরি তে রিপ্লাই করলো- ফালতু লাগছে সব কটাকে।
রুমাইসা এংরির ইমোজি পাঠালো। সোলেমান এসে সামনে বসতেই ইয়াসিন ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নিলো। সোলেমান মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে। একটু আগেই সংসদ থেকে ফিরেছে।
ইয়াসিন বারবার কিছু বলতে চাচ্ছে,কিন্তু গলার কথাটা আর মুখে আসছে না। অনেক ক্ষন হাসফাস করে এবার অধৈর্য হবার সাথে সাথে খানিকটা বিরক্ত নিয়েই বলল-

“ ভাই ভাবিরা ঢাকা আসবে কবে? অনেক দিন তো হলো গেছে। এবার তো চলে আসা উচিত। ”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো ইয়াসিনের এমন কথা শুনে। দু দিনও হয় নি সে নওগাঁ থেকে ঢাকা এসেছে। এরমধ্যে নাকি অনেক দিন হয়ে হেছে!
“ কোথায় অনেকদিন হলো? দু’দিন হয়েছে কেবল। আর তাছাড়া আমার বউ কবে আসবে না আসবে তাতে তোর কি? ”
“ আমার আবার কি হবে। এমনি জিজ্ঞেস করলাম। কবে আসবে সেটা বলেন তাহলে।”
“ যেদিন আমার মন চাইবে সেদিন। ”
“ আপনার মন চাইবে কবে?”
“ যেদিন তোর ভাবির মন চাইবে। ”
“ ভাবির আবার মন চাইবে কবে?”
সোলেমান এবার রাগান্বিত হলো। ব্যাটা এতো জিজ্ঞেস করছে কেনো?
“ সমস্যা কি তোর? আমার বউ যেদিনই আসুক। তোর এতো মাথা ঘামানো দেখে তো সন্দেহ হচ্ছে। কি হয়েছে কি তোর? ”

“ ভাই আমার খাইতে সমস্যা হয়। জামাকাপড় ধুতে সমস্যা হয়। ”
“ তো,তোর জামাকাপড় কি আমার বউ এসে ধুয়ে দিবে? তোকে রেঁধে খাওয়াবে?”
” না তা করতে যাবে কেন আপনার বউ। ”
“ তাহলে?”
“ আমার বউটা যে নিয়া গেছে আপনার বউ। ফেরত দিয়ে যাইতে বলেন। আমার অসুবিধা হচ্ছে প্রচুর। ”
সোলেমান এবার জানতপ চাইলো-
“ কে তোর বউ?”
“ কেন জানেন না আপনি?”
“ না তো। ”
“ ভুলে গেছেন? আমারে যে গাছের সাথে বেধে বিয়ে পড়ায় দিছিলো বাতসির সাথে। ”
“ বাতাসি তোর বউ?”
“ তো?”
“ কি জানি। জীবনে তো বউ বলে স্বীকার করতে দেখলাম না। বাই দ্যা ওয়ে তোদের ডিভোর্স টা যেন কবে হচ্ছে? ”
“ কথা বলি নাই এখনও উকিলের সাথে। ”
“ ঠিক আছে আমি কথা বলে নিব উকিলের সাথে। ”
ইয়াসিন এবার ফোঁস করে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-

“ আপনার কথা বলতে হবে কেনো? আমার ডিভোর্সের বিষয় আমি বলে নিব। আর তাছাড়া ভাই আপনার কাছে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিলো। ”
“ হু বল। ”
“ ভাই বাতাসির ভাইয়ের হত…..”
সোলেমানের পকেটে থাকা ফোন টা বেজে উঠলো । থানা থেকে ফোন করেছে। সোলেমান ফোন কানে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। ইয়াসিন ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো। আর হলো জিজ্ঞেস করা তার।
সোলেমান গাড়িতে উঠে ওসি কে ফোনে জিজ্ঞেস করলো-
“ পেয়েছেন খোঁজ শেখর কোথায়?”
“ শেখর বাংলাদেশে নেই সোলেমান। ”
“ নেই মানে! কোন দেশে গেছে? আর কিভাবে গেলো?”
“ কোনো প্রাইভেট জেটে করে গেছে। কেউ পেছন থেকে তার ব্যবস্থা করে দিছে। কোন দেশে আছে জানা যায় নি। ”
“ ওর বাপ জানে না কিছু?”
“ না। ”
“ সামির?”
“ ঐ ছেলেও জানে না। মা-রা হয়েছিল। বারবার এক কথা জানে না। তারপরও ওদের উপর ২৪ ঘন্টা নজর রাখা হয়েছে। ”

“ ঠিক আছে। আপনাদের দ্বারা যে কিছু হওয়া সম্ভব নয় তা আমার আগেই বোঝা উচিৎ ছিলো। রাখছি। ”
সোলেমান ফোন কে’টে দিলো। এজন্যই সে পুলিশ দিয়ে কোনো কাজ করাতে চায় না। সে নিজ হাতে শাস্তি দিতে চায়। শেখর জাস্ট তার হাতের নাগালে আসুক শুধু। ওর যে কি হাল সোলেমান করবে তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
সোলেমান বায়তুল মোকাররমে আসলো। আজ অপূর্ণা মুসলমান হচ্ছে শুনেছে। অপূর্ণা থেকে নাম করন করে পূর্ণা করা হয়েছে। সোলেমান দেখা করলো পূর্ণার সাথে। রমনার পাশেই একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সোলেমান। সাথে এনজিও তে কাজের ব্যবস্থাও। সোলেমান পূর্ণার মেয়েটাকে কোলে নিলো। টুকটাক কথা বার্তা বললো। তারপর চলে গেলো। পূর্ণা মাগরিবের আজান শুনেই বাড়ি ফিরে ওজু করে আজ প্রথম বারের মতো নামাজ আদায় করলো। মোনাজাতে রবের নিকট দু হাত তুলে প্রেমা কে স্মরণ করলো। তার জন্য আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানালো জান্নাতের। ইহকালে সুখ পেলো না। পরকালে যেন এখন আল্লাহ তার সকল গুনাহ মাপ করে দিয়ে সুখ দেয়। যেই সুখের আশায় মেয়েটা মরণ চাইতো প্রতিনিয়ত। রব যেন এবার প্রেমাকে কবুল করে নেয়। হাশরের ময়দানে যেন সবচেয়ে সুখী রমণী হিসেবে পূর্ণা প্রেমা কে দেখে।

কদিন আগেই এজওয়ান PUBG Mobile National Championship Australia–এ অংশগ্রহণ করার জন্য ফর্ম ফিলআপ করেছে। আগামী সপ্তাহ থেকেই টুর্নামেন্টের মূল ম্যাচগুলো শুরু হবে। তাই এই ক’দিন সে প্রায় সময় পেলেই ফোন হাতে নিয়ে প্র্যাকটিস করছে, কখনো স্ট্র্যাটেজি দেখছে তো কখনো গেম খেলছে।
সন্ধ্যার সময়টায়ও ঠিক তেমনই। এজওয়ান বিছানার উপর আধশোয়া হয়ে ফোনে মনোযোগ দিয়ে পাবজি খেলছিল। স্ক্রিনের দিকে তার পুরো মনোযোগ। ঠিক তখনই মাহি রুমে ঢুকে এসে শান্ত গলায় বলল-
“ আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।”
এজওয়ান চোখ না তুলেই, পুরো দৃষ্টি ফোনের স্ক্রিনে রেখেই বলল-
“হু, বলো।”
মাহি একটু বিরক্ত গলায় বলল-
“সিরিয়াস কথা। মনোযোগ দিন আমার দিকে।”
এবার এজওয়ান ফোনটা হাতেই নিয়ে বিছানা থেকে নেমে গেল। রুমের কোণের দোলনায় গিয়ে বাবু হয়ে বসে পড়ল। তারপর দোল খেতে খেতে বলল-
“ নাও এবার পুরো দৃষ্টি তোমাতেই দেব। বসো দেখি। ঘাড় উঁচু করে তোমার মুখের দিকে তাকাতে সমস্যা হচ্ছে। ”
মাহি ফ্লোরের দিকে তাকালো।
“কোথায় বসবো ফ্লোরে?”
এজওয়ান দোলনার দিকে ইশারা করল। মাহি আবার তাকিয়ে দেখলো দোলনার পুরো জায়গাটাই এজওয়ান দখল করে বসে আছে।
মাহি ভ্রু কুঁচকে বলল-

“ কি দোলনা কিনে আনছেন, দেখছেন চোখে সেটা? আপনি বসা মাত্রই তো পুরো জায়গা দখল করে নিয়েছেন। তাহলে আমি কোথায় বসবো? আপনার মাথায়?”
এজওয়ান একটুও দেরি করলো না। হঠাৎ হাত বাড়িয়ে মাহিকে টেনে নিজের কোলের উপর বসিয়ে বলল-
“শালি, আমার মাথায় না বসে কোলে বস। তাহলে ১৮+ ফিল আসবে। আর খেলতেও সুবিধা হবে। আই মিন দুজনেরই পাশা খেলতে সুবিধা হবে।”
মাহি চোখ বড় বড় করে তাকালো। পাশা মানে কি বোঝালো এই লোক? উঠে যেতে চাইলে এজওয়ান টেনে বসিয়ে বলল-

“ বসে থাক ছ্যমড়ি। আমি পাবজি খেলার কথা বলছি। এই দেখ হাতে। ”
মাহি তাকিয়ে দেখলো সত্যিই ফোনের স্ক্রিনে পাবজি গেম চলছে।
মাখি মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“পিচ্চি পোলাপানের মতো এসব খেলছেন কেনো?”
এজওয়ান হালকা হাসলো।
“সামনে টুর্নামেন্ট আছে। নাম দিয়েছি। আর এসব খেলায় আমি আবার উস্তাদ। প্রফেসব বললো এজওয়ান জয়েন হয়ে যাও। আমাদের ভার্সিটির নাম ডাক এনে দাও। তাই জয়েন হলাম। তুমি চাইলে আমার সাথে খেলতে পারো। দেখবে, শেষে হেরে যাবে।”
মাহি গম্ভীর মুখে বলল-
“এমন ফালতু খেলা আমি পারি না। আসল কথায় আসা হোক।”
এজওয়ান এবার সত্যিই একটু মনোযোগ দিল।
“আচ্ছা বলো, শুনছি।”
মাহি ধীর গলায় বলল-
“আমাকে আমেরিকা যেতে হবে।”
কথাটা শুনে এজওয়ানের হাত থেমে গেল। ফোনের স্ক্রিনে চরিত্রটা তখনও দৌড়াচ্ছে, কিন্তু তার আঙুল আর নড়ছে না।এজওয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো-

“আমেরিকায় যাবে কেনো?”
“আপনি তো জানেন, আমি বিভিন্ন জায়গায় ট্রাভেল করতে পছন্দ করি। অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়েকজন যাচ্ছে। আমিও তাদের সাথে যাব।”
এজওয়ান একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল-
“ফিরবে কবে?”
“সপ্তাহখানেক লাগবে ফিরতে।”
কিছুক্ষণ ভেবে এজওয়ান বলল-
“ঠিক আছে। আমি তোমার সাথে গার্ড পাঠাবো।”
মাহি তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল-
“না না, তার দরকার নেই।”
এজওয়ান গম্ভীর গলায় বলল-
“দরকার আছে। তুমি তো হারিয়ে যাওয়ার এক্সপার্ট।”
মাহি হালকা হাসলো।
“হারাবো না। আপনার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবো। আর ফেরার পথে আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ নিয়ে আসবো।”

“কি সারপ্রাইজ?”
“বলে দিলে সারপ্রাইজ থাকে নাকি?”
“ আমিও যাই তোমার সাথে তাহলে আমেরিকা। আমি দেখি আমার বউ কেমন ট্রাভেলার। ”
“ নেক্সট টাইম শিওর নিয়ে যাব। এবার আরেকটা কথায় আসি?”
“ আসো। ”
“ আচ্ছা আপনার ঐ এআই চালিত স্মার্ট সিটি মনিটরিং অ্যাপ্স টা কিভাবে চালানো যায়? ”
“ হঠাৎ ওটার কথা জিজ্ঞেস করছো যে? ”
“ না এমনি। কৌতূহল শুধু। ওটার এক্সেস কাদের কাছে?”
“ ফুল এক্সসেস আমার কাছে। আর হাফ প্রশাসনের কাছে। ”
“ ওহ্। এই অ্যাপ্স এখনও কেউ কিনতে চায় নি আপনার কাছে?”
“ চেয়েছে তো অনেক দেশ। তবে দেই নি। আমার সৃষ্টি আমি কোথাও সেল করবো না। তোমার কাছেও না। ”
মাহির কপালে দু ভাজ পড়লো সে কথা শুনে। মাহি উঠে যেতে যেতে বলল-
“ কি আশ্চর্য আপনার অ্যাপ্স আমি কিনতে যাব কেনো? আপনার জিনিস মানেই তো আমার জিনিস। ভুলে গেছেন কথাটা? কেনার তো প্রশ্নই আসে না। ”

মাহি চলে যেতেই এজওয়ান বাকা হাসলো। দোলনা ছেড়ে উঠে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দু হাত পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সহিত বলল-
“ আমি জানি তোমার কি উদ্দেশ্য। আর এটাও জানি হু আর ইউ। তোমার আইডেন্টিটি আমি শুরু থেকেই জানি। তোমাকে মাহি চৌধুরী আমি এমনি এমনি বিয়ে করি নি। তুমি আমার কাছে জাস্ট বা হাতের বুড়ো আঙুল। আমি একটু জোরে শ্বাস ফেললেই তোমার অস্তিত্ব এই পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু আমি সেটা চাই না। আমি চাই না তুমি পৃথিবী থেকে বিলীন হও এত তাড়াতাড়ি।

দাহশয্যা পর্ব ৮৯ (৩)

❝ আমি জানি তোমাকে আমার বাঁচিয়ে রাখার
সিদ্ধান্ত টা হবে আমার ধ্বংসের একমাত্র কারন।
তারপরও আমি সেই ধ্বংস কে গ্রহণ করবো।
তোমার হাতে আমার ধ্বংস ফরজ।
আমি তা কবুল করে নিলাম। ❞

দাহশয্যা পর্ব ৯০ (২)