দাহশয্যা পর্ব ৮৯ (৩)
Raiha Zubair Ripti
অ্যাওয়ার্ড ফাংশন শেষ হওয়ার পর হলঘরটা ধীরে ধীরে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আলো এখনো ঝলমল করছে, লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে নামকরা অতিথিরা হেঁটে যাচ্ছে, আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ মাঝেমধ্যে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। এজওয়ান বিগত বছরগুলোতে Australian of the Year পাওয়া বিজয়ীদের সাথে কথা বলছিল। তারা তার গবেষণার প্রশংসা করছে, কেউ কেউ কৌতূহল নিয়ে নানা প্রশ্ন করছে। মাহি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আশপাশ টা দেখছে। বাহ্ বেশ নামি-দামি মনে হচ্ছে এজওয়ান কে এখন মাহির। অথচ বাংলাদেশে সে তো এর পুরো উল্টো ছিলো।
ঠিক তখনই এক ভদ্রলোক দ্রুত এগিয়ে এলেন। পরিপাটি স্যুট, কানে ছোট কমিউনিকেশন ডিভাইস। তিনি এজওয়ানের কাছে এসে বললেন-
“ মিস্টার সুলতান, আই’ম মিস্টার ডেভিড হ্যারিস, প্রাইম মিনিস্টারের প্রাইভেট সেক্রেটারি। প্রাইম মিনিস্টার আপনাকে এখনই দেখা করতে বলেছে তার সাথে।”
এজওয়ান কথা বলতে থাকা লোকদের এক্সকিউজ মি বলে সেই সেক্রেটারির সাথে চলে গেলো মাহি কে একটা চেয়ারে বসিয়ে রেখে।
ভিআইপি রেস্ট রুম। প্রধানমন্ত্রী একটা সিল মারা খাম হাতে করে বসে আছে চেয়ারে। এজওয়ান ঢুকতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সময় স্বল্পতার জন্য সরাসরি খামটা এজওয়ানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল-
“ উই নিড ইউ এজওয়ান। আমরা তোমার গবেষণা, তোমার প্রযুক্তিগত অবদান সবকিছুই খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এই ধরনের মেধার প্রয়োজন। আমাদের দেশের জন্য তোমাকে দরকার আমাদের। ”
এজওয়ান প্রথমে বুঝলো না। খামটার বাহির টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল-
“ আমি ঠিক বুঝলাম না ম্যাম। আর এটাই বা কিসের খাম?”
“ এটা ডিরেক্ট কমিশন লেটার । আমরা চাই তুমি রয়াল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সে যোগ দাও। তোমাকে সাধারণ অফিসার হিসেবে নয়, সরাসরি উইং কমান্ডার পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।”
এজওয়ান অবাকই হলো এই কথা শুনে। উইং কমান্ডার , এটা এয়ার ফোর্সের খুবই সম্মানজনক আর শক্তিশালী র্যাঙ্ক। এই দায়িত্বের চাপ থাকে প্রচুর। আর তার পক্ষে কোনো কাজ একটানা করা ধাঁচের মধ্যে নেই। সে তার মন মতো কাজ করে। যখন খুশি তখন করে। এখানে ঢুকলে তাকে পুরোটা সময় এখানেই থাকতে হবে। সব দিক ভেবেই বলল-
“ এটা নিঃসন্দেহে আমার জন্য একটা বড় অপরচুনিটি । কিন্তু দুঃখিত ম্যাম,এই জব অফার টা আমাকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। আমি কখনই ধারা বাঁধা কাজে অভ্যস্ত নই। আমার কাজের ধরন একটু আলাদা। আমি গবেষণা করি, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি। নিয়ম মেনে প্রতিদিন একই কাঠামোর মধ্যে থাকা আমার পক্ষে কঠিন হবে। আর এই প্রফেশন এমন একজন মানুষের জন্য নয় যে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করে।
হ্যাঁ, যদি কখনো টেকনিক্যাল কোনো বিষয়ে আমাকে দরকার হয় আমাকে জানাবেন। আমি অবশ্যই সাহায্য করবো। কিন্তু স্থায়ীভাবে এই চাকরি করা সম্ভব নয়।”
“ ডোন্ট ওয়ারি এজওয়ান। সেটা আমরা জানি। তাই তোমাকে প্রচলিত দায়িত্ব দেওয়া হবে না।
তুমি কাজ করবে Strategic Cyber Defence Division-এর প্রধান উপদেষ্টা হয়ে। তোমাকে যখন দরকার হবে তখনই আসবে, ফোর্সকে গাইড করবে। আর যেহেতু আমি নিজে তোমাকে নিয়োগ দিচ্ছি তাই তোমার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পাবে না। তুমি শুধু রাজি হও। ”
এজওয়ান একটু ভেবে বলল-
“ আমাকে সময় দিন একটু ভাবার জন্য। ”
“ নাও সময়। যত লাগে ততই নাও। তারপর রিপ্লাই টা যেন পজিটিভ আসে। ”
“ আই হোপ। ”
“ এখন আসছি তাহলে। পরে কথা হবে। ওয়াইফ কে নিয়ে এসো একদিন বাড়িতে। ”
“ অবশ্যই। ”
প্রধানমন্ত্রী চলে গেলেন। এজওয়ান খামটা কোটের পকেটে ঢুকিয়ে রুম থেকে বের হতেই প্রফেসর ড্যানিয়েল ম্যাকার্থি এসে সামনে দাঁড়ালো। এজওয়ান আচমকা তাকে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু বলবেন প্রফেসর?”
“ হ্যাঁ। তোমার সাথে কেউ দেখা করতে এসেছে। ”
“ কে?”
“ Australian Security Intelligence Organisation থেকে। ”
“ ASIO! ”
“ হুম। ”
“ ফর হোয়াই?”
“ বলেছিলাম না,তারা তোমাকে তাদের টিমে চাচ্ছে। ”
এজওয়ান কপালে হাত বুলিয়ে বলল-
“ বাট প্রফেসর আপনি তো জানেন সব টা। প্রধানমন্ত্রী এসে এয়ার ফোর্সের Strategic Cyber Defence Division এ জয়েন হওয়ার জন্য বলে গেলো। এখন আবার ASIO থেকে তাদের টিমে চাচ্ছে। আমি একটা মানুষ হয়ে কতদিকে যাব বলুন? তাদের মানা করে দিন। ”
“ শুনছে না। তারা পার্সোনালি কথা বলতে চায় তোমার সাথে। তোমার সব শর্তে তারা রাজি হতেও প্রস্তুত। ”
এজওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ঠিক আছে। কোথায় তারা?”
ভিআইপি কনফারেন্স রুম। সেই রুমে ঢুকতেই এজওয়ান দেখলো কয়েকজন সিনিয়র অফিসার বসে আছে। মাঝখানে বসা ব্যক্তিটিকে সে চিনলো। তার নাম ডানকান লুইস, ডিরেক্টর-জেনারেল অফ অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অরগানাইজেশন । দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একজন। তিনি এজওয়ান কে দেখে উঠে দাঁড়ালেন।
“ মিস্টার এজওয়ান সুলতান অবশেষে আপনার দেখা পাওয়া গেলো।”
এজওয়ান শান্ত গলায় বলল-
“আপনারা আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন?”
ডানকান লুইস সরাসরি বললেন-
“হ্যাঁ। ”
“ কি জন্য,বলুন। ”
“ আমরা চাই তুমি আমাদের সাথে কাজ করো।”
এজওয়ান হালকা হাসল।
“ আজকে দ্বিতীয়বার এই প্রস্তাব শুনছি। একটু আগে প্রধানমন্ত্রী আমাকে এয়ার ফোর্সে যোগ দিতে বললেন। ”
ডানকান মাথা নেড়ে বললো-
“আমরা জানি।”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো সে কথা শুনে।
“ জানেন?”
“ হ্যাঁ। কারণ আমরা সেই সিদ্ধান্তেরই অংশ।”
“ জানার পরও তাহলে ASIO থেকে এই জবের অফার করার কি মানে? ”
“ কারন তোমাকে আমাদের সংস্থার জন্যও লাগবে। ”
“ আমি মানুষ একজন হয়ে দু জায়গার হয়ে কিভাবে কাজ করবো? আমাকে কি রোবট মনে হয় আপনার? নাকি দুই সত্তার মানুষ? এটা অসম্ভব। আমাকে হয় আপনাকে চুজ করতে হবে আর না হয় প্রধানমন্ত্রীর অফার টা। এখন আমি নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর অফার টা রিজেক্ট করে আপনাদের অফার টা এপ্রুভ করবো না। ”
ডানকান লুইস টেবিলের ওপর হাত রেখে একটু ঝুঁকে মৃদু হেঁসে বললেন-
“শুনো এজওয়ান তুমি আমাদের প্রস্তাবটাও গ্রহণ করে নাও। তুমি অফিসিয়ালি কাজ করবে রয়াল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্স-এর অধীনে। কিন্তু তোমার গবেষণার প্রকৃতি এমন যে তা সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত।
এই কারণেই আমরা চাই তোমাকে ASIO এর স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স কনসালট্যান্ট হিসেবে রাখতে। তুমি এয়ার ফোর্স অফিসারই থাকবে।
কিন্তু তোমার কাছে থাকবে টপ-লেভেল সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স। যখন প্রয়োজন হবে, আমরা তোমার প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত পরামর্শ নেব। সরকারি ভাষায় এটাকে বলা হয় এক্সটার্নাল ক্লিয়ারড স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইজার। তোমার মতো মানুষ খুব কম আছে, মিস্টার সুলতান।
এই কারণেই দুই সংস্থাই তোমাকে চায়। সেজন্য বলছি একটু ভেবে দেখো। দেশের জন্য ভাবো। ”
“ ভাববার জন্য সময় চাই আমার। ”
“ নাও,সমস্যা নেই আমাদের। আশাহত করো না শুধু। ”
এজওয়ান আরো টুকটাক কথাবার্তা বলে বেরিয়ে গেলো। মাহি বোর হয়ে যাচ্ছিলো,আর একটা ছেলে বারবার মাহিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিলো। সে নিয়ে মাহি বিরক্তির চরম পর্যায়ে। এজওয়ান আসতেই যেন স্বস্তির শ্বাস ফেললো। এজওয়ান এগিয়ে এসে মাহির হাত ধরে বলল-
“ কোনো সমস্যা হয় নি তো তোমার সুইটহার্ট? ”
মাহি দু দিকে মাথা নাড়লো। যার মানে হয় নি সমস্যা।
“ ওকে তাহলে বাড়ি ফেরা যাক?”
মাহি ছোট করে হু বললো। এজওয়ান মাহি কে নিয়ে হলরুম থেকে বের হয়ে বাহিরে আসার পথে সেই ছেলের উদ্দেশ্যে বলল-
“ চোখ অন্য কোথাও ফেলো। এই মেয়ে এজওয়ান সুলতানের। ২য় বার নজর আসলে চোখ আর চোখের জায়গায় থাকবে না। লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়ে যাচ্ছি। ”
এজওয়ান মাহি গাড়ির কাছে আসতেই আকস্মিক একটা মেয়ে দৌড়ে আসলো এজওয়ানের কাছে। জড়িয়ে ধরে বলল-
“ কংগ্রেস মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। উই আর প্রাউড অফ ইউ। ”
মাহির ভ্রু কুঁচকে আসলো। মেয়েটার মুখ দেখে নি এখনও। কিন্তু এভাবে জড়িয়ে ধরার কি মানে। এজওয়ান ও প্রথমে চিনতে পারে নি মেয়েটা কে। পরে গলার স্বর শুনে চিনতে পারলো। সাথে সাথে বুক থেকে সরিয়ে বলল-
“ ফ্লোরা তুমি! অস্ট্রেলিয়ায়! আসলে কবে?”
মেয়েটার মুখ টা এবার দেখতে পেয়ে মাহি চমকালো। এই তো সেই মেয়ে যাকে সাফওয়ানের সাথে দেখেছিলো। এই মেয়ে এজওয়ানের পরিচিত!
ফ্লোরা মেকি হেঁসে বলল-
“ হুম অস্ট্রেলিয়া। এসেছি দু সপ্তাহ হলো। ”
“ আঙ্কেল গিয়েছিল?”
“ না। সে আমাকে রিজেক্ট করে দিয়েছে। তার জীবনে নাকি অন্য এক নারী আছে। আর আমি অবশ্যই জেনেশুনে এমন পুরুষ কে বিয়ে করতে যাব না যে অন্য নারী কে ভালোবাসে তাই না?”
“ নাম বলে নি মেয়েটার?”
“ না জানার চেষ্টা করেছিলাম। বলে নি। ”
“ ওকে। ইউ ডিজার্ভ বেটার। ”
“ আই নো। হু ইজ শি?”
এজওয়ান মাহির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ মাই ওয়াইফ। ”
“ নাইস। ”
“ আচ্ছা এখন আসছি তাহলে। পরে কথা হবে। ”
“ ওকে,বাই। ”
এজওয়ান মাহি কে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। মাহি তখনও আকাশকুসুম ভেবে চলছে। এজওয়ান সেটা বুঝতে পেরে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল-
“ মনে কোনো প্রশ্ন থেকে থাকলে জিজ্ঞেস করে ফেলো। ”
মাহির ভাবনায় ভাটা পড়লো।
“ ঐ মেয়েটা কে ছিলো? ও কে তো আমি সাফওয়ানের সাথে দেখেছিলাম। ”
“ ও আমার ফ্রেন্ড ফ্লোরা। খুবই মিষ্টি আর মিশুক একটা মেয়ে। ”
“ কেমন মেয়ে সেটা তো জানতে চাই নি। ”
“ তা জানতে চাও নি ঠিক। নিজ থেকেই বললাম একটু। ”
“ সাফওয়ান অব্দি গেলো কি করে?”
“ আমার মাধ্যমে গেছে। সাফওয়ানের বাবা ভালো মেয়ের সন্ধান করছিলো তাই ফ্লোরার কথা বলেছি। বাট শ্লা এতো খারাপ যে এখনও বিবাহিত এক মেয়েকে ভালোবেসে যাচ্ছে। ”
“ আর একটু সময় দিন। আশা করছি সাফওয়ানও মুভ অন করে ফেলবে। ”
“ সাফওয়ান ও? মানে তুমিও মুভ অন করছো?”
“ মেবি। ”
“ যাইহোক ও কে নিয়ে ভাবার জন্য আমার কাছে আর টাইম নেই। ও শুধু আমার সংসারের আশেপাশে না আসলেই হলো। আসলে ট্রাস্ট মি আই উইল কিল হিম। এবার আর বাঁচাবো না। ডিরেক্ট উপরে পাঠিয়ে দিব। ”
“ এসব কথা আপনার মুখে মানাচ্ছে না। এমন কথা সাফওয়ান বললে মানাতো। বিকজ অফ আপনি… ”
“ আই নো আমি তোমাকে জোর করে বিয়ে করছি। নাও, আই হ্যাভ নো রিগ্রেটস। আমার জিনিস আমি কেঁড়ে নিতেই পছন্দ করি। ওসব হিরোদের মতো ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়ার মানুষ অন্তত এজওয়ান সুলতান না। সে মানুষ মে’রে হলেও নিজের জিনিস নিজে বুঝে নিতে জানে। আর তোমার বিষয় উঠলে তো কোনো কথাই নেই। তোমার জন্য আমি ঠিক কতটা নিচে নামতে পারি তার কোনো ধারণা তোমার নেই মাহি। তাই আমার সামনে ভুলেও নিজের এক্স কে ডিফেন্ড করতে এসো না। ”
মাহি বাহিরে তাকিয়ে বলল-
“ আপনি অযথা উত্তেজিত হচ্ছেন। ”
“ বিষয়টা যখন তোমাকে ঘিরে তখন তো উত্তেজিত হওয়া ইট’স নরমাল বেইবি। ”
“ আমি সাফওয়ান কে ডিফেন্ড করি নি। ”
“ করো নি বলেই এখনও অক্ষত আছো। ”
মাহি এবার এজওয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ মানে?”
“ মানে তোমার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করি নি গাড়ির ভেতরই। সেজন্য বলছি অক্ষত আছো। ”
“ উল্টাপাল্টা কি করতেন? মারতেন?”
এজওয়ান চোখ টিপে মুচকি হেঁসে বলল-
“ লাভ বাইট একটা হলেও তো দিতাম। ”
মাহি মুখ ফিরিয়ে নিলো। এজওয়ান গাড়িতে স্লো ভলিউমে গান ছেড়ে দিলো। মাহি পরিবেশ টাকে নরমাল করার জন্য বললো-
“ বক্সে গান বাজানোর কি দরকার? আপনার নিজের গানের গলাই তো যথেষ্ট ভালো। ”
“ তো এখন কি আমায় গান গাইতে বলছো? ওকে আই হ্যাভ নো প্রবলেম। আমার আবার এই কাউয়া মার্কা গলায় গান গাইতে হেব্বি মজা লাগে। ”
~কতটা হাত বাড়িয়ে দিলে
তোমার মন ধরা যায়
কতটা পথ পাড়ি দিলে
তোমার প্রেম ছোঁয়া যায়
পাব কি পাব না জানি না
তোমাকে তো বুঝিনা
তবু তোমার প্রেমে আমি পড়েছি
বেচেঁ থেকেও যেন মরেছি
তোমার নামে বাজি ধরেছি,ধরেছি…..
মাহি গাড়ির জানায় হাত ঠেকিয়ে হাতের তালুর উল্টো পিঠ ঠোঁটে সামনে রেখে বলল-
“ নাইস সং। আপনার গানের চয়েস লিস্ট গুলোও সুন্দর। ”
“ আই নো,আই নো। ঠিক আমার মতোই সুন্দর তাই না?”
মাহির খেয়াল সম্পূর্ণ টা বাহিরের দিকেই ছিলো। এজওয়ানের কথার তালে তালে বলল-
“ মেবি। ”
এজওয়ান মুচকি হাসলো। বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামতেই মাহি নেমে পড়লো। এজওয়ান গাড়িটা পার্কিং-এ রেখে এসে দরজায় পাসওয়ার্ড টাইপ করে দরজা খুললো। মাহি ভ্রু কুঁচকালো। সে খেয়ালই করে নি এটা। গতকাল তো পাসওয়ার্ড লাগে নি তার দরজা খুলতে। তাহলে আজ লাগছে যে।
“ গতকাল তো পাসওয়ার্ড ছিলো না দরজায়। ”
“ ছিলো। ”
“ না ছিলো না। আমি খাম নেওয়ার সময় যখন দরজা খুললাম তখন পাসওয়ার্ড লাগে নি। ”
“ কারন আমি ছিলাম,তাই লাগে নি। ”
“ কিভাবে?”
“ দরজায় কলিং বেল বাজা মাত্রই আমার ফোনে নোটিফিকেশন এসেছে। আমি ফোন থেকেই দরজা আনলক করেছিলাম। সেজন্যই তোমার খুলতে পাসওয়ার্ড লাগে নি। ঢুকেছে এখন মাথায়?”
“ ওহ্। তো পাসওয়ার্ড দেওয়ার কি দরকার? তালা লাগালেই তো হয়। এটা তো আর বাংলাদেশ না যে চোর এসে তালা ভেঙে জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। ”
“ তোমার মতো তো আর আমার মাথাটা মোটা না। কারন আছে বলেই দিছি। ”
মাহি মুখ ভেংচালো।
“ অনুষ্ঠানে বউ কে নিয়ে কি সুইট সুইট কথা বাপ্রে। আর বাড়ি ফিরেই আসল রূপ দেখিয়ে দিচ্ছেন। ”
এজওয়ান ভেতরে ঢুকে বলল-
“ একটু ভালো মানুষ সাজছি এর চেয়ে বেশি আর কিছু না। আই হেট ইউ। ”
“ মি টু। ”
“ শালি নিমকহারামি। ”
মাহিও এবার বলে বসলো-
“ শালা নিমকহারাম। ”
এজওয়ানের পা থেমে গেলো। পেছন ফিরে হাতের অ্যাওয়ার্ড টা নিচে রেখে বলল-
“ তবে রে..”
মাহি দৌড়ে সোফার পেছনে আসলো। এজওয়ান মাহি কে ধরার চেষ্টা করছে।
“ আপনি বকেছেন বলেই তো আমিও আপনার পথ অনুসরণ করলাম। ”
“ তাই? ওরে আমার শিষ্য। এই নাও তোমাকে আমি চুমু দেওয়া দেখাচ্ছি। তুমিও তাহলে এখন আমাকে চুমু ব্যাক দাও। ”
কথাটা বলেই এজওয়ান মাহিকে ধরে সোফায় বসিয়ে টাইট একটা চুমু খেলো গালে। তারপর নিজের গাল দেখিয়ে বলল-
“ নাও এবার ব্যাক করো। ”
মাহি ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। কিন্তু এজওয়ানের শক্তির কাছে কি আর মাহি পারে? পরিশেষে ছাড়া পাওয়ার জন্য গলায় কামড় বসিয়ে দিলো।
এজওয়ান ব্যথায় চোখ খিঁচে ধরলো। হাতের বাঁধন ঢিলে হতেই মাহি সরে গেলো। এজওয়ান গলায় হাত দিয়ে সোফায় বসে বলল-
“ ওরে হাই লেভেলের ন’টি রে। চুমুর বদলে লাভ বাইট! ”
মাহি ভ্রু কুঁচকালো।
“ আপনি আমাকে আবার বকলেন! ”
“ কই না তো। ”
“ ন’টি কি তাহলে?”
“ ইংরেজি তে বলছি,ন’টি। আর ন’টি মিনস দুষ্টু। ”
মাহি ফ্রেশ হতে উপরে চলে গেলো। এজওয়ান পড়নে থাকা কোট টা খুলে বিরবির করে বলল-
“ তোমারে খাস বাংলা ভাষাতেই গালি দেওয়া উচিত সুইট হার্ট। ”
এজওয়ান রুমে এসে দেখলো মাহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেক-আপ রিমুভ করছে। এজওয়ান কোট টা বিছানায় ফেলে শার্ট খুলে ওয়াশরুমে গেলো গোসল করতে। গোসল শেষে শুধু একটা সাদা টাওয়াল পেঁচিয়ে বাহিরে আসলো। এজওয়ান আসতেই মাহিও ঢুকলো। এজওয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল গুলো বা হাত দিয়ে ঝাড়া দিয়ে বেলকনিতে আসলো। মাহি গোসল শেষে জামাকাপড় পড়তে গিয়ে বুঝলো সে জামাকাপড় সাথে করে নিয়ে আসে নি। এখন এজওয়ানের কাছে চাইলে বদ লোক জামাকাপড় দেওয়ার নাম করে ভেতরে এসে বসে থাকবে। আর বলবে আমার সামনেই চেঞ্জ করো। মাহি দরজাটা একটু ফাঁকা করে পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে দেখলো এজওয়ান নেই। স্বস্তির শ্বাস ফেললো। টাওয়াল পেঁচিয়ে রুমে এসে আলমারি টা খুলতেই আকস্মিক এজওয়ানের গলার স্বর ভেসে আসলো। মাহির শরীর সাথে সাথে বরফ হয়ে গেলো। বদ লোক এখন ইচ্ছে করে তাকে হ্যারাস করবে।
এজওয়ান দরজা খোলার আওয়াজ পেয়েই পেছনে তাকিয়েছিল। মাহি কে শুধু টাওয়ালে ভেজা চুলে দেখে বেলকনিতে আর থাকা সম্ভব হয় নি। সেজন্য রুমে এসে বলল-
“ হেই সে’ক্সি লেইডি। এভাবে বাহিরে এসেছো কেনো? ঠিক থাকতে দিবা না নাকি আমাকে?”
মাহি জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে দৌড় দিতে চাইলে এজওয়ান মাহির পেছন থেকে টাওয়াল টেনে ধরে। মাহি দাঁড়িয়ে যায়।
“ কোথায় পালাচ্ছো?”
“ ছাড়ুন আমাকে। ”
“ ফর হোয়াই?”
“ জামাকাপড় পড়ে আসতে দিন। ”
“ তুমি তো আর জামাকাপড় বিহীন নেই। উই আর সেম লুক,সি। ”
মাহি আড় চোখে তাকালো। সেও টাওয়াল পেঁচানো। মাহি টাওয়াল থেকে এজওয়ানের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল-
“ উফ ছাড়ুন না আমাকে। ”
“ নো। ”
“ আমি কি জামাকাপড় পরবো না তাহলে?”
“ আমি তো বলি পরার দরকার নেই। যেটা আছে শরীরে সেটাও খুলে ফেলো। আমি কি পর পুরুষ নাকি যে আমার সামনেও তোমার টাওয়াল পেঁচিয়ে থাকতে হয়। ”
“ ছাড়ুন তো আমার লজ্জা লাগছে এভাবে। ”
“ না। খুলো,খুলো বলছি। এক্ষুনি খুলো। আমিও খুলছি। ”
কথাটা বলেই জোরে টাওয়াল ধরে টান দিলে মাহি এবার পেছন ফিরে বলল-
“ লুইচ্চা বেডা,খবিশ বেডা ছাড়ুন আমার টাওয়াল। আপনার শরম না-ই থাকতে পারে। তাই বলে কি আমার শরম নাই?বেশরম কোথাকার…”
এজওয়ান মাহি কে টেনে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলল-
“ আগে একটা ছবি তুলে নেই ওয়েট। তারপর জবাব টা দিচ্ছি। ”
এজওয়ান ফোনটা নিয়ে মেরোরে দু’জনের ছবি তুললো। তারপর মাহি কে ছেড়ে দিতেই মাহি দৌড়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে নিলে এজওয়ান নিজের টাওয়াল টা সামনের দিক থেকে মেলে ধরে বলল-
“ ইয়েস আমি বেশরম। তোমার স্বামী একটা বেশরম। এই নাও,দেখো,দেখো। তাকাও এদিকে। দেখতে পাচ্ছো কিছু? লুক তরিকুলের বেটি লুক। ”
মাহি পেছন ফেরার সাথে সাথে এজওয়ান টাওয়াল চেপে ধরলো। মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“ লুচ্চা লোভী মেয়ে। দেখার জন্য আবার পেছনে তাকায়। ”
মাহি ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। এজওয়ান অফ হোয়াইট রঙের টাওজার আর ঢিলে একটা হাফ হাতার শার্ট পড়ে। ততক্ষণে মাহি ড্রেস পড়ে চলে আসে। এজওয়ান অ্যাওয়ার্ড টা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরুতে নিলে মাহি বলল-
“ কোথায় যাচ্ছেন? ”
“ আসো এক সাথে যাই। ”
মাহি এজওয়ানের পেছন পেছন আসলো স্টাডি রুমে। এক পাশে কাঁচের একটা বড় আলমারি। তার ভেতর অসংখ্য অ্যাওয়ার্ড। মাহি সেগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-
“ কার এগুলো?”
“ এ কেমন প্রশ্ন? কার হতে পারে এগুলো? ”
“ আপনার!”
“ ইয়েস বেইবস। ”
এজওয়ান অ্যাওয়ার্ড টা নিয়ে যথাস্থানে রেখে আসলো। মাহি জিজ্ঞেস করলো-
“ কয়টা আছে এখানে?”
“ আজকের টা নিয়ে ১৪৯ টা। ”
“ কিহ! ১৪৯!”
মাহি গুনে দেখলো। আসলেই ১৪৯ টা আছে।
“ এতো পুরষ্কার কিসের?”
“ খেলাধুলা, গান,পড়াশোনা, প্রজেক্ট, বেস্ট স্টুডেন্ট সব মিলিয়ে এই আমার ২৯ বছরের এচিভমেন্ট এগুলো। ”
“ বাহ্! নোবেল পুরষ্কার টাই পাওয়া বাকি তাহলে আপনি। ”
“ আশা করছি সেটাও পেয়ে যাব। ”
“ নামি-দামি মানুষ,পেতেও পারেন। অসম্ভব কিছু না। আমাকে কাল একটু শপিংমলে যেতে হবে। ”
“ আমাকেও বের হতে হবে। তো তোমাকে শপিংমলে পৌঁছে দিয়ে আমি ল্যাবে যাব। ”
“ ওকে। ”
সোলেমান আজ ঢাকা ব্যাক করবে। সেজন্য আফিয়া সুলতান নিজ হাতে ছেলের পছন্দের সব খাবার রেঁধে খাইয়েছে। বিকেল হতেই সোলেমান চলে যায়। যাওয়ার আগে বউকে জড়িয়ে ধরে ছিলো অনেকক্ষণ। পেটে চুমু খেয়ে বাচ্চার উদ্দেশ্যে বলে গেছে-
“ বাবা,ভালো বাচ্চা হয়ে থাকবে। মাম্মাম কে কষ্ট দিবে না একটুও। আমি কিন্তু মাম্মামের সাথে নেই। তুমি থাকছো। তাই মাম্মাম কষ্ট পেলে কিন্তু আমি তোমাকেই বকুনি দিব। তুমি মাম্মামের খেয়াল রাখবে শুধু। আর আমি তোমাদের খেয়াল রাখবো। ডিল ডান? ”
মেহরিন হেঁসেছে সে কথা শুনে। বাপ হওয়ার সংবাদ শুনে ব্যাডার এমন পাগলামি দেখে মেহরিন না হেঁসে পারে না।
চলে আসার সময় মেহরিন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো। সোলেমান গাড়িতে উঠে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে চলে যায়।
বাতাসি আজ মিষ্টি কালারের একটা কুর্তি পড়েছে। রুমাইসা কিনে দিয়েছে তাকে। তারপর বিকেলে আকাশ টা একটু মেঘলা হতেই সোলেমান যাওয়ার পর তারা ছাঁদে উঠে ক’টা ছবি তুলেছে। বলা বাহুল্য বাতাসিকে এখন আর আগের মতো গাইয়া ক্ষ্যাত লাগে না। তাকে এখন যথেষ্ট স্মার্ট লাগে। রুমাইসার সাথে সে স্কিন কেয়ার করে। পার্লারে যায়। জীবন টা সুন্দর লাগছে বাতাসির এখন।
রুমাইসা তার আর বাতাসির কয়েকটা ছবি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ছেড়ে দিলো। সাথে ক্যাপশনে লিখে দিলো-
❝ সৌন্দর্যে পাগল পুরুষরা কি আর বুঝে কৃষ্ণাঙ্গ কালো মেঘের নারীর হৃদয়ের গভীরতা? ❞
পিক ক্যাপশন আপলোড করার সাথে সাথে তূর্নর একটা পোস্ট সামনে আসলো। সেখানে তেহরানের ছবি। ছবি টা এমন যে তেহরান মাথায় গামছা বেঁধে গরুর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটা সম্ভবত মেহরিন দের। ক্যাপশন দেওয়া-
“ এই গরু চোর কে কেউ পেলে সেখানেই পেটানো শুরু করবেন। কত বড় সাহস গরু চোর আমার বউ চুরি করতে চাচ্ছে। ”
রুমাইসা কমেন্ট বক্সে গিয়ে কমেন্ট চেক করলো। সবাই মজা নিচ্ছে তেহরান কে নিয়ে। তেহরানের আইডিরও একটা কমেন্ট চোখে আসলো। তেহরান কয়েকটা রাগের ইমোজি দিয়ে বলেছে-
“ আপনার সাহস তো কম না আপনি আমার ছবি নিয়ে এভাবে মিমিক্রি করছেন। কোনো ভদ্র ঘরের ছেলেরা এমন ফাজলামো করে না। আর আপনার বউ চুরি করেছি মানে? শ্যি ইজ মাই উডবি। ”
তূর্ণ একটা হাহা দিয়ে বলেছে-
“ তোমার উডবি? বাট শ্যি ইজ মাই ওয়াইফি! সো দূরে থাকো তার থেকে। পরের বার এর চেয়েও বাজে কিছু করবো। ”
রুমাইসার কপালো হাত। সাথে সাথে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ আসলো তেহরানের।
“ এই বেয়াইন আপনার অনলাইনে পাতানো সংসারের মিথ্যা স্বামী এসব কি শুরু করছে? থামতে বলুন। আমাকে গরু চোর, বউ চোর বলছে। আমার পরিচিতরা অলরেডি ফোন করা শুরু করছে আমাকে। ”
“ আমি দেখছি। ”
মেসেজ টা সেন্ট করে রুমাইসা তূর্ণ কে ফোন করলো। আর বললো পোস্ট ডিলিট করতে। এভাবে একজন কে হ্যারাস করার কি মানে? তূর্ণ সাথে সাথে ডিলিট করলো না। দেড় ঘন্টা পর ডিলিট করলো। ততক্ষণে পুরো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে ছবি টা। তেহরানের ফ্রেন্ড রা ছবির আর ক্যাপশন টা পরে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর বলছে-
“ একেই বলে অতি চালাকির গলায় দড়ি। ”
তেহরান কুশান ছুঁড়ে মারছে তাদের উপর। তানভীর বোকা বসে বসে দেখছে। কিন্তু কিছুই বুঝছে না। সৈকতের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ হাসছো কেনো তোমরা এমন বোকার মতো? কি হয়েছে কি?”
তেহরান সৈকত কে শাঁসালো। সৈকত সেটার তোয়াক্কা না করে ছবিটা তানভীর কে দেখিয়ে বলল-
“ দেখ তূর্য দেখ,তোর ভাই গরু চোর,সাথে কার যেন বউও চোর, হা হা হা!”
তানভীরের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। ফোনটা নিয়ে দৌড়ে মা কে দেখাতে চলে গেলো।
সন্ধ্যার পরপর সুলতান নিবাসে দুটো পার্সেল আসলো। একটা আমিরুল সুলতানের নামে,আরেকটা রুমাইসার নামে। রুমাইসা তখন বাতাসি কে নিয়ে স্কিন কেয়ারে ব্যস্ত নিজের রুমে। আমিরুল সুলতানই রিসিভ করলো পার্সেল গুলো। নিজের পার্সেলের উপরে ডিয়ার শ্বশুর মশাই নাম টা দেখে হকচকিয়ে গেলো। শ্বশুর বলতে তো মেহরিনের। তারমানে কি মেহরিন আনিয়েছে? আমিরুল সুলতান মেহরিন কে ডেকে জিজ্ঞেস করলো পার্সেল টা সে পাঠিয়েছে কি না। মেহরিন না জানালো। আমিরুল সুলতান রুমাইসার পার্সেল টা তার হাতে দিয়ে বলল রুমাইসা কে দিয়ে আসতে। তারপর নিজের পার্সেল টা কৌতূহল নিয়ে খুলতে লাগলো। একটা চিঠি আর একটা ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবি। চিঠিটা খুলে দেখলো তাতে লেখা আছে—
“ ডিয়ার শ্বশুর আব্বা…
পত্রের শুরুতে আমার সালাম নিবেন। আশা করি ভালো আছেন। আপনার সাথে সরাসরি কথা বলার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু কিভাবে যে বলবো সেটা বুঝে উঠতে উঠতেই শুনলাম আপনার মেয়ের নাকি বিয়ে ঠিক করছেন তেহরান নামের এক ছেলের সাথে। দেখুন শ্বশুর আব্বা আপনার মেয়েকে আমি অনেক ভালোবাসি। আপনার মেয়েও সেম। সেও আমাকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু আপনার ছেলে আমাদের এই সম্পর্ক মানতে নারাজ। তার কাছে তেহরান কে ভালো লেগেছে। আমি আপনার ছেলের সাথে তর্ক করি নি। সুমুন্দি মানুষ,তর্ক করা সাজে না। সেজন্য শ্বশুর আব্বার কাছে বিচার চাচ্ছি। আপনার মেয়েটাকে বড্ড ভালোবাসি আমি। অন্যত্র বিয়ে না দেওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি। বিশ্বাস করুন,আপনার মেয়েকে আমি সর্বদা আগলে রাখবো। কোনো দিন কষ্ট পেতে দিব না। ধরুন ভিক্ষা চাচ্ছি। ভিক্ষা হিসেবেই দিয়ে দিন না আপনার মেয়েটাকে আমার হাতে। সামনে তো ঈদ। ফিতরা, যাকাত মনে করে হলেও দিয়ে দিন। আল্লাহর কসম বলছি তার অযত্ন হবে না আমার কাছে।
অতএব বিনীত পার্থনা এই যে আপনি আমাকে আপনার ছেলের মতো রিজেক্ট করবেন না। আমার এই আবেদন টা মঞ্জুর করে বাধিত করবেন। আর হ্যাঁ পাঞ্জাবি টা আমাদের বিয়ে যেদিন পাকা করবেন সেদিন পড়বেন। আপনার সাথে ম্যাচিং করে সেম পাঞ্জাবি কিনেছি আমি।
আপনার একমাত্র মেয়ের জামাই
~ তূর্ণ…
আমিরুল সুলতান হতবিহ্বল হয়ে গেলো এই চিঠিটা পরে। সাথে সাথে সোলেমান কে ফোন করলো। সোলেমান সবে ঢাকার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে, বাবার ফোন পেয়ে রিসিভ করে হ্যালো বলতেই এপাশ থেকে আমিরুল সুলতান বলল-
“ সোলেমান তূর্ণ টা কে? তূর্ণ আর রুমাইসা একে ওপর কে ভালোবাসে? কথাটা সত্য? আর তুই তূর্ণ কে রিজেক্ট করেছিস কেনো? ছেলেটা আমার কাছে বিচার দিয়েছে। ”
সোলেমান বিরক্তের সহিত কপাল স্লাইড করলো। বিরবির করে বলল আহাম্মক একটা।
“ হ্যাঁ রিজেক্ট করেছি। কি বিচার দিয়েছে শুনি?”
“ সে এখন ভিক্ষা চাচ্ছে রুমাইসা কে। বলছে ফিতরা যাকাত হিসেবে দান করুন। ”
“ বলে দাও, কোনো বড়লোক কে আমরা ফিতরা যাকাত ভিক্ষা দি না। এতই যখন রুমাইসা কে ভালোবেসে সামনে আসে যেন। তখন দেখবো রুমাইসা তাকে ভালোবাসে কি না। পঁচা ডিম ছুঁড়ে মারবে ওর উপর,অ্যাম শিওর। ”
“ পঁচা ডিম ছুঁড়ে মারবে কেনো?”
“ সেটা তূর্ণই ভালো জানে। এখন রাখছি ড্রাইভ করছি। ”
সোলেমান কেটে দিলো ফোন।
ইয়াসিনের বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না আর। আসলেই শুধু কালো বাতাসির কথা মনে পড়ে কারন তার নিত্য দিনের কাজকর্ম গুলো বাতাসিই করে দিত। এখন তার আধোয়া জামাকাপড় পড়তে হয়। হোটেলে খেতে হয়। হ্যাঁ আগে নিজের গুলো নিজে করতো। কিন্তু হুট করে একজন সেই দায়িত্ব নিয়ে এখন চলে গেলে সমস্যায় পড়তে হবে না? নিজের কাজকর্ম কি আর নিজের করতে ইচ্ছে করে এখন? রুমের এক সাইডে ঘামে ভেজা অপরিষ্কার জামাকাপড়ের পাহাড় হয়ে গেছে। প্রতিদিন একটা করে খুলে রেখে যায়। হোটেলের খাবার গুলোও এখন কেমন স্বাদহীন লাগে।পুরোই বিরক্ত লাগছে। ক্লান্ত দেহ নিয়ে কোনো রকমে রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। খাবার আনতে মনে নেই। রাতে আর খাবে না। এপাশ ওপাশ করলো। ধূর ভালো লাগছে না ইয়াসিনের। কুশান দিয়ে মাথা চেপে ধরলো। শ্লা তাতেও ভালো লাগছে না। উঠে সিগারেট ধরালো। সিগারেট মুখে নিয়ে বেলকনিতে আসলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। বাতাসি কে কি একবার ফোন করবে? যাওয়ার পর একবারও করা হয় নি ফোন। করবে কি করবে না ভাবতে ভাবতে ইয়াসিন মনের বিরুদ্ধে গিয়ে এবার বাতাসি কে ফোন টা করেই বসলো। দু বার কে’টে যেতেই তৃতীয় বার রিসিভ হলে ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে-
“ হটাৎ করে আজ ফোন দিলেন যে আমাকে,
কোনো দরকার? ”
ইয়াসিন একটা স্বস্তির স্বাস ছাড়লো গলার স্বর শুনে। কিন্তু পরক্ষণেই কোনো দরকার এটা শুনে গম্ভীর গলায় বলে-
“ কি আশ্চর্য, দরকার ছাড়া কি কেউ কাউকে ফোন দিতে পারে না ?”
বাতাসির ভ্রু কুঁচকে আসে সেকথা শুনে।
“ কালো বাতাসির সাথে নিশ্চয়ই খেজুরে আলাপ করার জন্য ফোন দেন নি। কোনো দরকার সেজন্যই ফোন দিয়েছেন। কি দরকার সেটা বলুন”
ইয়াসিন সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসের সাথে ছেড়ে দিয়ে বলল-
“ বাড়ি ফিরবে কবে?”
“ বাড়ি ফিরবো কেনো? আমার কি বাড়ি ফেরার কথা ছিলো? আর তাছাড়া আপনি তো এটাই চাইতেন,আমি যেন আপনার বাড়ি,আপনার জীবন, সব কিছু ছেড়ে চলে যাই। সেটাই তো হচ্ছে। তাহলে আমাকে আবার এটা জিজ্ঞেস করার কি মানে?”
কি আশ্চর্য, বাড়ি ফিরবে না? এখনও তো বাতাসি তার স্ত্রী। শান্ত স্বরেই বলল-
“ ডিভোর্স টা তো এখনও হয় নি। ”
“ সেজন্য কি বারবার অপমানিত হওয়ার জন্য আপনার বাড়িতে পরে থাকতে বলছেন?”
ইয়াসিনের এমন কথা শুনে মাথাটা বিগড়ে গেলো।
“ ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলছো কেনো? এমন ভাবে বলছো যেন তোমার শূন্যতায় আমি ম’রে যাচ্ছি। ”
বাতাসি তাচ্ছিল্যের সহিত হেঁসে বলল-
“ ওমা সেটা আমি কখন বললাম? আপনি আমার শূন্যতায় কেনো মরতে যাবেন। আপনি তো বেঁচে যান আমি মরলে।
ইয়াসিন এবার রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
“ শাটা-আপ। তোমাকে ফোন দেওয়া টাই আমার ভুল হয়েছে। ”
“ যেমন টা ভুল হয়েছিল আমাকে বিয়ে করে। আশা করছি ভুল গুলো এবার সব শুধরে নিবেন।”
“ উপদেশ চাই নি তোমার কাছে। রাখো ফোন। ”
বাতাসি সত্যি সত্যি রেখে দিলো ফোন। ইয়াসিন আশ্চর্য হলো। রেখে দিতে বললো আর ওমনি রেখে দিলো ফোন! বেয়াদব মেয়ে কোথাকার।
ফোনের দিকে একবার তাকিয়ে বিরবির করে বলল-
“ ভালো হইছে না ফোন করে মুডের আরো ১২ টা বাজাইছিস। নে এবার পার্টি কর শ্লা। ”
ইয়াসিন ওয়াইফাই অন করে ফেসবুকে ঢুকলো। দু তিন মিনিট স্ক্রোল করতেই রুমাইসার পোস্ট সামনে আসলো। যেহেতু তারা ফেসবুকে এড আছে। রুমাইসার পাশে ওটা কে! বাতাসি! চেনাই তো যাচ্ছে না। ইয়াসিন অজান্তেই লাভ রিয়াক্ট দিলো ছবি গুলো তে। তারপর কমেন্ট সেকশনে যেতেই এক এক জনের কমেন্ট দেখলো বাতাসি কে নিয়ে। মেয়েটা মায়াবতী তো। মেয়েটা কে হয় আপনার? সিঙ্গেল আছে মেয়েটা? রুমাইসার প্রশংসাও করলো অনেকে। লাস্ট দুটো কমেন্টে চোখ গেলো ইয়াসিনের। একটা তূর্ণ নামের আইডি থেকে আর একটা ডক্টর অয়নের আইডি থেকে।
তূর্ণ লিখেছে- মায়াবতী রূপবতী এক ফ্রেমে! একজন বউ আর একজন ছোট বোন।
ইয়াসিনের মাথা ঘুরে গেলো। কোনজন বউ আর কোনজন ছোট বোন? ডক্টর অয়ন আবার লিখেছে- ব্লাক ডায়মন্ড আর হোয়াইট ডায়মন্ড। নাইস। বাট ব্লাক ডায়মন্ডের মূল্য কিন্তু হোয়াইট ডায়মন্ডের থেকেও বেশি।
ইয়াসিন ফেসবুক থেকে বেরিয়ে আসলো। আজাইরা কথাবার্তা। ঢং মার্কা কথা। কালো মানুষের মূল্য শুধু ফেসবুকের ছুদানির পোয়াদের কাছেই। বাস্তব জীবনে কতটা মূল্য যে দিত তা জানা আছে ইয়াসিনের। গায়ে শার্ট জড়িয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে হোটেলের উদ্দ্যেশে খেতে।
হোটেলে আসার পথে রাস্তায় বাতাসির ম্যাম তিন্নির সাথে দেখা হয়। তিনিই আগে ইয়াসিন কে ডেকে দাঁড় করায়। ইয়াসিন প্রথমে খেয়াল করে নি। তিন্নি দৌড়ের এসে শার্টের হাতা ধরে টান দিতেই খেয়াল করেছে। আকস্মিক কেউ এভাবে শার্ট টেনে ধরারয় বিরক্তির সাথে কিছু বলতে গেলে তিন্নি কে দেখে বলল-
“ এসব কি ধরনের অভদ্রতা? ”
তিন্নি হেঁসে বলল-
“ সরি,এতবার করে ডাকছিলাম শুনছিলেন না বলেই এমন করা। দুঃখিত। ”
“ ডাকছেন কেনো?”
“ কোথায় যাচ্ছেন? ”
“ জাহান্নামে। যাবেন?”
“ নিয়ে গেলে অবশ্যই যাব। ”
ইয়াসিন হাঁটা ধরলো। এমনি শরীর ভরা রাগ। তার উপর এমন ন্যাকা কথাবার্তা ভালো লাগছে না। তিন্নি ইয়াসিনের পেছন পেছন আসতে আসতে বলল-
“ বলুন না কোথায় যাচ্ছেন? ”
“ হোটেলে যাচ্ছি খেতে মা। এবার একটু খ্যান্ত দিন আমাকে। ”
মা ডাক শুনে মুখ টা চুপসে গেলো তার।
“ কেনো বাসায় ভাত নেই? আর বাতাসি আসছে না যে কদিন ধরে স্কুলে। কোনো সমস্যা?”
“ ঢাকা নেই বাতাসি। বাড়ি গেছে। ”
“ ফিরবে কবে?”
“ জানি না। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। ”
ইয়াসিন হাঁটা থামিয়ে দিয়ে বলল-
“ আপনি কোথায় যাচ্ছেন আমার সাথে?”
“ আমিও যাচ্ছি খেতে। চলুন এক সাথে যাই। ”
ইয়াসিন হাঁটা ধরলো। হোটেলে ঢুকে একটা টেবিলে গিয়ে বসলে সেম টেবিলের ওপর পাশে তিন্নি গিয়ে বসলো। ইয়াসিন একবার তাকিয়ে ভাত খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
বাতাসির বান্ধবী কোচিং শেষে ঐ রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলো। হোটেল সামনে পড়ায় কিছু ভাজা পোড়া কেনার জন্য দোকানে আসতেই ভেতরে বাতাসির স্বামী আর তিন্নি ম্যাম কে একসাথে খেতে দেখে ছবি তুলে নিলো বাতাসি কে দেখাবে বলে। তারপর পেয়াজু আর বেগুনি নিয়ে মেয়েটা চলে গেলো বাসায়।
দিনটা আজ শুক্রবার। এজওয়ান ল্যাবে যাওয়ার জন্য একটা ব্লাক হুডি পড়েছে। মাহি অফ হোয়াইটের ভেতরে বেবি পিংক কালারের চেরি ফুলের ফ্লোরাল গাউন পড়েছে। তার লংটা হলো হাঁটুর একটু নিচ অব্দি। পায়ে অফ হোয়াইট শু। মাথায় কাপড়ের হেয়ার ব্যান যেটা সামনে থেকে পেছনে ফেলানো। কিছু বেবি হেয়ার সামনের দিকে বের করা। পুরাই কিউট কিউট বারবি ডল লাগছে এজওয়ানের কাছে। এজওয়ান মাহিকে শপিং মলে নামিয়ে দিয়ে ল্যাবে চলে গেলো। এজওয়ান নতুন কিছু আবিষ্কারের ট্রাই করবে এবার।
বিকেলের দিকে সিডিনির কিং ক্রস শহর টা কালো মেঘের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে গেলো। কিং ক্রস শহরের ডারউইনের জঙ্গলটা তখন তীব্র বাতাসে এলোমেলো। সেই বাতাস কে তোয়াক্কা না করে শো শো আওয়াজ তুলে ছুটে চলছে একটা ব্লাক রঙের গাড়ি। গাড়ি টা গিয়ে থামলো গভীর জঙ্গলের এক পুরোনো দোতলা বাড়িতে। আজ কিছু মেয়ে কে পাচার করা হবে আমেরিকার একটি দ্বিপের উদ্দেশ্যে। যেখানে নারীদের কিনে নিয়ে বিভিন্ন ভাবে শোষণ করা হয়। মনস্টার কালো লম্বা এক ওভারকোট পরে নামলো গাড়ি থেকে। সাথে নামলো বন্দুক হাতে নেওয়া গার্ড। সবাই মনস্টার কে দেখে কুর্নিশ জানালো। মনস্টার সোজা ভেতরে ঢুকে গেলো। নিজের কক্ষে ঢুকে তার পার্টনার কে জিজ্ঞেস করলো-
“ মেয়ে গুলো কে প্রস্তুত করা হয়েছে?”
মনস্টারের পার্টনার লিস্ট দেখালো। মনস্টার সেটা দেখতেই তার পার্টনার বলল-
“ একটা বৃদ্ধ মহিলাও আছে এবার। আপনি তো অনেক দিন ছিলেন না অস্ট্রেলিয়া। হায়না নিয়ে এসেছিলো উনাকে। উনাকেও পাচার করা হবে এদের সাথে। ”
মনস্টারের কপালে দুটো ভাজ পড়লো। যা আড়ালেই রয়ে গেলো। তারা তো কোনো বৃদ্ধ মহিলা পাচার করে না। তাহলে? মনস্টার দেখতে চাইলো। পার্টনার সেই কক্ষে নিয়ে গেলো। মনস্টারের পায়ে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে কেবল।
বন্দি হয়ে থাকা মহিলা টা পাওয়ার আওয়াজ শুনে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ক…কে এসেছো? কে..? আমার ছেলে এসেছে? ও কে তোমরা জানিয়েছিলে আমাকে যে তোমরা বন্দি করে রেখেছো? ও জানলে তোমাদের শেষ করে দিবে। ”
মনস্টার দরজায় এক হাত ঠেকালো।
“ পাগল মনে হচ্ছে। ”
“ হুমম। ”
“ কোথা থেকে ধরে আনা হয়েছে?”
“ বাংলাদেশ থেকে। ”
“ দেখে তো বাংলাদেশী মনে হচ্ছে না। ”
“ তা বলতে পারবো না। শুধু ছেলে ছেলে করে। ”
“ ঠিক আছে, হায়না কি পাচার করতে বলেছে তাকে?”
“ হ্যাঁ। ”
“ ওকে তাহলে পাঠিয়ে দাও বাকি মেয়েদের সাথে। হায়না এ ব্যপারে আমাকে কিছু জানায় নি কেনো? ”
দুজন লোক এসে মহিলাটা কে ধরে নিতে চাইলে মহিলাটা যেতে চাইলো না। ছোটাছুটি করা শুরু করলো। বারবার ছেলে ছেলে করে মনস্টারের কান ঝালাপালা করে দিলো। মনস্টার এবার স্বয়ং নিজে গিয়েই মহিলাটাকে ধরে টানতে টানতে বাকি মেয়েগুলোর কাছে রেখে আসলো। মনস্টার চলে আসার পথে শুনেছিল। মহিলা টা বারবার করে বলছিলো আমাকে ছেড়ে দাও। আমার ছেলের সাথে দেখা করতে দাও। আমার ছেলেটা কেমন আছে জানি না। ওর কি আমার কথা মনে পড়ে? খুব কাঁদে মা মা করে? ওকে আমি দেখতে চাই। একটু দেখা করাও না। আমার ছেলেটা দেখতে কেমন হয়েছে?
মেয়েদের চোখে জল চলে আসলো এই মহিলার এমন ছেলেকে নিয়ে আহাজারি করতে দেখে। দূর্ভাগা মায়ের দূর্ভাগা ছেলেটা হয়তো জানতেই পারছে না বা কখনো জানতেই পারবে না তার মা’কে কেউ আমেরিকার ভয়ংকর এক জায়গায় পাচার করে দিচ্ছে। যেখান থেকে বেঁচে ফেরা একেবারেই অসম্ভব।
রাতের দিকে বাড়ি ফেরার পথে আচমকা বৃষ্টি নামল। ঝোড়ো বাতাসে রাস্তা প্রায় ফাঁকা। গাড়ি চালাতে চালাতেই এজওয়ান ফোন করলো মাহিকে। ফোন ধরতেই জানতে পারল মাহি বাড়িতেই আছে। কথাটা শুনে ফোনটা কেটে দিল এজওয়ান। আবার মন দিল ড্রাইভিংয়ে। কিন্তু আজ যেন মনটা স্থির থাকছে না তার। স্টিয়ারিংয়ে হাত থাকলেও তার মন বারবার অন্য কোথাও সরে যাচ্ছে। বাইরে তীব্র বাতাস, ঝমঝম বৃষ্টি সবকিছুই অদ্ভুতভাবে অসহ্য লাগছে তার। হঠাৎ মনে হতে লাগলো বুকের ভেতরটা যেন খা খা করছে। যেন অদৃশ্য কিছু একটা তার জীবন থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু মাহি তো ঠিকই আছে… তাহলে এমন লাগছে কেন?
অস্থির হয়ে এজওয়ান ফোন করল তার বাবাকে। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন ধরলেন তিনি। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জানালেন, তিনি একটু আগে ঘুমাচ্ছিলেন। বাবার সাথে দু’একটা কথা বলেই ফোনটা কেটে দিল এজওয়ান। এরপর সে ফোন করল সোলেমানকে। এজওয়ানের কণ্ঠ শুনেই সোলেমান বুঝে গেল কিছু একটা ঠিক নেই।
“কি হয়েছে? তোর গলার স্বর এমন শোনাচ্ছে কেন?”
এজওয়ান ধীরে বলল-
“ জানি না ভাইজান… হঠাৎ করেই কিছু ভালো লাগছে না। অস্থির অস্থির লাগছে।”
“কোথায় তুই? বজ্রপাতের শব্দ পাচ্ছি… সাথে গাড়ির আওয়াজও।”
“ আমি বাইরে… গাড়িতে আছি। ঝড় হচ্ছে।”
সোলেমান বিরক্ত গলায় বলল-
“পাগল নাকি তুই? এমন ঝড়ের মধ্যে ড্রাইভ করছিস?”
“ বাইরের ঝড়ে কিছু হচ্ছে না ভাইজান… আমার ভেতরে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নিজেকে ভীষণ হেল্পলেস লাগছে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সোলেমান বলল-
“আচ্ছা, শান্ত হ। ঝড়টা না থামা পর্যন্ত ড্রাইভ করিস না। গাড়ি কোথাও সাইডে থামা। আমি বাইরে আছি, পরে ফোন করছি।”
ফোনটা কেটে দিলো এজওয়ান।
চারপাশ দিয়ে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, আলো ছড়িয়ে অন্ধকার চিরে সামনে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এজওয়ানের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে। তার হাত স্টিয়ারিংয়ে স্থির, তবু গাড়িটা আর চলছে না। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটাই যেন থমকে গেছে তার চারপাশে। হঠাৎ তার মনে হলো সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না। বুকের ভেতর যেন অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে। তড়িঘড়ি করে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সে। ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিতে লাগল বারবার।
ঝুম বৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্তেই তার পুরো শরীর ভিজে গেল।
ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির সামনে এসে রাস্তায় বসে পড়ল এজওয়ান। বুক চেপে ধরতেই অনুভব করল গালে গরম কিছু। চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে হয়তল। কিন্তু এজওয়ান বোঝার আগেই সেই জল মিশে গেল বৃষ্টির পানির সাথে।
এজওয়ান মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকালো। তারপর হঠাৎ করেই বুকভাঙা কণ্ঠে চিৎকার করে বলে উঠলো-
দাহশয্যা পর্ব ৮৯ (২)
“I need peace… I need to cry… more cry…”
বৃষ্টি আরও জোরে নামতে লাগল, যেন মনে হলো আকাশটাও আজ এজওয়ানের সাথে পাল্লা দিয়ে কাঁদতে চাইলো খুব। কিন্তু আজ হঠাৎ করে কিসের এত যতনা এজওয়ানের? হুট করে ছেলেটা কাঁদতে চাইছে কেনো? একটু শান্তির জন্যই বা এমন মরিয়া হয়ে উঠছে কেনো? তার কি বা হারানোর আছে? সবই তো ভালো আছে। তার কাছেই আছে। তাহলে?
