Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮৯ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮৯ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮৯ (২)
Raiha Zubair Ripti

এজওয়ান ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে মাহি কে খাম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে এগিয়ে আসলো। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি হয়েছে? কোনো সমস্যা? ”
মাহি হাতের খাম টা দেখিয়ে বলল-
“ ইনভাইটেশন লেটার এসেছে। আমাকেও ইনভাইট করলো যে আপনার সাথে। আমাকে কি তারা চিনে?”
“ এজওয়ান সুলতানের ওয়াইফ তুমি। তোমাকে ইনভাইট করবে না?”
“ ওহ্। কিন্তু আপনাকে করলো কেনো ইনভাইট? ওখানে তো যতদূর শুনেছি যারা অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন খাতে বিশেষ কোনো অবদান রেখেছে তাদের জন্য এই আয়োজন। ”

“ আমাকে ছাড়া সম্ভব না এই আয়োজন, সেজন্য ইনভাইট করেছে। তুমি যাচ্ছ তো আমার সাথে?”
“ নিয়ে গেলে অবশ্যই যাব। ”
“ ওকে। এখন প্রচুর ক্ষুধা লেগেছে। কি খাবে বলো? ”
“ ক্ষুধা লেগেছে আপনার। আর জিজ্ঞেস করছেন আমাকে যে আমি কি খাব?”
“ কারন আমাকে এখন রান্না করতে হবে সেই অনুযায়ী । ”
মাহির চোখ বড় বড় হয়ে আসলো। এজওয়ান সুলতান কি না রান্না করবে!
“ উল্টো বললেন বোধহয়। আপনার কি খেতে ইচ্ছে করছে বলুন আমি এনে দিচ্ছি। ”
এজওয়ান ভেজা চুল গুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলল-
“ আর ইউ শিওর? ”
“ অফকোর্স। ”
“ আই ওয়ান্ট টু টেস্ট ইয়োর গ্লসি লিপস। ক্যান আই ট্রাই?”
মাহি চোখ পাকিয়ে তাকালো। এজওয়ান হো হো করে হাসতে হাসতে নিচে কিচেন রুমে আসলো। এজওয়ানের পেছন মাহিও আসলো।

“ আপনি সত্যি রান্না করবেন?”
“ কেনো বিশ্বাস হচ্ছে না?”
“ না। আপনি সরুন আমি করছি। ”
“ নো। আমার কিচেন রুম তুমি এলোমেলো করে ফেলবে,নোংরা হয়ে যাবে। আবার সেটা আমাকেই পরিষ্কার করতে হবে। এনার্জি নাই এত। আর তাছাড়া তুমি রাঁধতে জানো না। ”
“ কে বললো? আমি মোটামুটি পারি রাঁধতে। ”
“ মোটামুটি, ভালো তো আর না। যাও ফ্রেশ হয়ে আসো তুমি। ততক্ষণে আমার রান্না হয়ে যাবে। ”
মাহি মুখ বাকিয়ে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। এজওয়ান এপ্রন টা পড়ে ফ্রিজ থেকে মাংস আর ক্যাবিনেট থেকে সবজি বের করে ট্রাফল পাস্তা , ওয়াগিউ স্টেক, মাশরুম ভেলাউটে,রাতাতুই স্ট্যাক বানিয়ে খাবার টেবিল সাজিয়ে ফেললো।
পুরো ড্রয়িং রুম খাবারের গন্ধে মৌমৌ করছে। মাহি ভেজা চুল টাওয়াল দিয়ে পেঁচাতে পেঁচাতে নিচে আসতেই এজওয়ান চেয়ার টেনে দিলো বসার জন্য। মাহি বসলো। খাবার গুলো দেখতে তো সুন্দরই লাগছে। খেতে কেমন হবে?
এজওয়ান প্লেটে বেড়ে দিলো। মাহি চামচ নিয়ে খেলো। দারুন তো খেতে। এজওয়ান ছুরি দিয়ে মাংস কেটে কাটা চামিচে তুলে মুখে নিতে নিতে বলল-

“ কেমন?”
মাহি হাতের ইশারা দেখিয়ে বলল-
“ ইটস টু গুড।”
“ যাক ম্যাডামের তাহলে আমার কিছু তো পছন্দ হলো। ”
মাহি খেতে থাকলো। খাওয়া শেষে এজওয়ান সোলেমান কে একটা ফাইল পাঠিয়ে তার নিচে লিখলো-
“ ভাইজান, TAT এর পুরো বায়োডাটা আছে এখানে। দেখে নাও তাকে,সে আসলে কে।”
থালাবাসন গুলো মাহিকে দিয়ে ধুয়ালো এজওয়ান।
সোলেমান তার পরিবারের অ্যালবাম টা হাতে নিয়ে মেহরিন কে দেখাচ্ছে। সোলেমানের নানা নানি থেকে শুরু করে বাপ মা দাদা দাদি চাচা চাচি সব। মরিয়ম সুলতানের ছবিটা দেখলো। আসলেই মহিলা মারাত্মক সুন্দর। তার কাছে তো মেহরিনও কিছু না। সোলেমান এজওয়ান রুমাইসার ছোট বেলার ছবি গুলো কি কিউট। সবার ছবি দেখা শেষে মেহরিন বলল-

” এজওয়ান ভাইয়ার মায়ের ছবি দেখলাম না যে?”
সোলেমান অ্যালবাম টা বন্ধ করে আলমারি তে রেখে বলল-
“ উনার ছবি নেই। ”
“ নেই কেনো?”
“ উনাকে আমরা দেখি নি কখনও। চাচা দেখায় নি। ”
“ না দেখানোর কোনো কারন আছে?”
“ চাচি নাকি পরকীয়া করেছিলো। তার প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। পালিয়ে যাওয়ার পর সেই প্রেমিক উনাকে মে’রে ফেলে। এজওয়ানের তখন বোধহয় ২ বছর ছিলো। প্রেম করে বিয়ে করছিলো তো চাচা। এই ধোঁকা টা মেনে নিতে পারে নি। সেজন্য উনার কোনো স্মৃতি সে রাখে নি জীবনে। এজওয়ান আজ অব্দি দেখে নি ওর মায়ের ছবি। ভীষণ হেইট করে নিজের মা কে। ”

পকেটে থাকা ফোনটায় মেসেজ আসার শব্দ শুনে সোলেমান পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো এজওয়ানের মেসেজ। একটা ফাইল সেই সাথে নিচে একটা মেসেজ। সোলেমান মেসেজ টা পড়ে ফাইল টা ওপেন করতেই TAT এর পুরো বায়োডাটা আর ছবি দেখতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। ফোনটা পকেটে ঢুকাতেই বাশার সুলতান ডাক দিলেন। সোলেমান চাচার কাছে গেলো। বাশার সুলতান বিকেলে একটু শাহবাগের ওদিকে গিয়েছিল। মাঝপথে আলমগীরের সাথে দেখা হলো। মেহরিনের খালু। তিনি রুমাইসার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে চাইছে তার বড় ছেলের সাথে। বাশার সুলতান আলমগীর কে বলেছে আগে সোলেমানের সাথে কথা বলে নিক। সোলেমান রাজি হলে নিয়ে আসুক সমস্যা নেই।

“ কিজন্য ডাকলে?”
“ মেহরিনের খালু কে চিনিস না? আলমগীর? উনি উনার বড় ছেলে তেহরানের জন্য রুমাইসা কে নিতে চাচ্ছে। আমাকে আজ বললো। আমি বলছি সোলেমান রাজি থাকলে সমস্যা নেই। তোর কি সমস্যা আছে?”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে। কপালে স্লাইড করতে করতে বলল-
“ দুটো দিন ভাববার সময় দাও। কথাবার্তা বলে দেখি পার্সোনালি। তারপর। ”
“ আচ্ছা ঠিক আছে। করে দেখ। ”
সোলেমান রুম থেকে বের হয়ে TAT পেজে নক দিয়ে বলল সোলেমান দেখা করতে চায়। আর সেটা এখনই। লোকেশনও পাঠিয়ে দিয়ে সোলেমান চলে গেলো সে জায়গায়।
সন্ধ্যার পর ফিরে রুমাইসার রুমের দিকে গেলো। রুমাইসা তখন ব্যাগ গোছাচ্ছে। সোলেমান দরজায় কড়া নেড়ে ভেতরে ঢুকে বলল-

“ ভাইয়ের উপর কি তোর ভরসা আছে রুমু?”
আকস্মিক এহেন কথায় ভ্রু কুঁচকে ফেলে রুমাইসা।
“ এটা কেমন কথা ভাইয়া! নিজের থেকেও বেশি ভরসা করি তোমায়। ”
“ তাহলে আমি যেখানে তোর বিয়ে ঠিক করবো সেখানে বিয়ে করবি। কোনো প্রশ্ন করবি না। মনে থাকবে?”
রুমাইসার বুকটা ধক করে উঠলো।
“ ডক্টর অয়নের সাথে বিয়ে ঠিক করতে চাইছো ভাইয়া? আমি তো তূর্ণ কে ভালোবাসি। ”
“ ভুলে যা তূর্ণ কে। আর ডক্টর অয়নের সাথেও তোর বিয়ে হচ্ছে না। ”
“ তাহলে?”
“ মেহরিনের কাজিন,তেহরান কে পছন্দ হয়েছে। ছেলেটা ভালো। আর তেহরানের সাথে বিয়ে হলে তুই আমার চোখের সামনেই থাকতে পারবি। ”
রুমাইসা ভীষণ রকমে চমকালো। মুখ ফুটে বেরিয়ে এলো-

“ কিহ! ”
“ হুমম। ”
“ ভাইয়া উনাকে আমার পছন্দ না। ডিজগাস্টিং একটা লোক উনি। ”
“ কিছু করেছে?”
“ সব সময় বেয়াইন বেয়াইন করে মাথা খায়। ”
“ এটা একটা স্বাভাবিক ব্যপার রুমু। আর বেয়াইন ই তো লাগিস। তূর্ণ ছেলেটাকে পছন্দ হয় নি আমার। ”
“ কিহ! তুমি খোঁজ নিয়েছিলে! দেখেছো ওকে?”
“ হুমম। ভাইয়ের উপর ভরসা থাকলে তূর্ণর টপিক টা এখানেই ক্লোজ করে দে। ভাইয়া খারাপ চায় না তোর। ”
“ কিন্তু ভাইয়া…”
“ কোনো কিন্তু না। এই টপিক নিয়ে আর আলোচনা করতে চাই না। ক্লোজ হোক। ক’দিন পর তেহরান রা আসবে তোকে দেখতে মহাদেবপুর। ”
সোলেমান চলে গেলো। রুমাইসার যা রাগ হচ্ছে না তূর্ণর উপর। ও কি ভাইয়া কে মানাতে পারে নি? নাকি বোঝাতে পারে নি? রুমাইসা তূর্ণর নম্বরে কল করলো। তূর্ণ রিসিভ করতেই রুমাইসা সকল রাগ অভিমান উগ্রে দিয়ে বলল-

“ ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছিল আপনার?”
ছোট্ট করে জবাব আসলো।
“ হুম। ”
“ কি বললো?”
“ বললো তূর্ণর সাথে সে তার বোন কে বিয়ে দিবে না। ”
“ কিন্তু কেনো? কি সমস্যা? কিছু করেছেন?যার জন্য ভাইয়া দিতে নারাজ।”
“ তার নাকি তেহরান নামের কোনো এক ছেলেকে পছন্দ হয়েছে তোমার জন্য। কে এই ছেলে?”
“ আমার ভাবির কাজিন। আমার পছন্দ না এই ছেলেকে। ”
“ আমিও বলেছিলাম তোমার ভাইয়া কে যে রুমাইসা রাজি হবে না তেহরান কে বিয়ে করতে। তোমার ভাইয়া বলল সেটা তোমার ভাববার বিষয় না। আমার বোন আমার কথা ফেলতে পারবে না। ”

“ তাহলে এখন কি হবে?”
“ চিন্তা করো না। আমি তূর্ণই বিয়ে করবো তোমাকে। কোনো তেহরান টেহরান করতে পারবে না। ”
“ কি করতে চাইছেন?”
“ তুমি নিশ্চিন্তে মহাদেবপুর যাও। তারপর বাকিটা আমি করছি যা করার। ”
“ আমার ভাই রাগবে এমন কাজ কিন্তু করবেন না। ”
“ ঠিক আছে। আই লাভ ইউ। এখন লাভ ইউ টু বলো।”
“ না বলবো না। আগে বিয়ে হোক তারপর বলবো এবার। ”
তূর্ণ হেঁসে ফেললো এ কথা শুনে। তারপর কে’টে দিলো।
পরের দিন সোলেমান নিজে মেহরিন বাতাসি আর রুমাইসা কে নওগাঁ নিয়ে গেলো। অনেকদিন পর আসলো এ বাড়িতে মেহরিন। আফিয়া সুলতান তো পুরো বাড়ি মাথায় করে নিছে। পুরো বাড়িতে কার্পেট বিছানো। সোলেমান তো থাকবে না। বউ যদি পা পিছলে পড়ে যায় তখন? সেজন্য কার্পেট দিয়ে ঢেকে দিছে। এখন নিজের রুমে বউকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে সোলেমান। আগামীকাল ঢাকায় ফিরবে। তারপর আবার আসবে। মেহরিনের এখনও আড়াই মাস হয় নি। সোলেমান পেটের দিকে তাকিয়ে বলল-

“ তোমার পেট বড় হচ্ছে না কেনো ল্যাদা বউ? ”
মেহরিন হাসলো।
“ আড়াই মাস এখনও হয় নি তো। ওর হাত পা হয় নি। ও কেবল একটা ভ্রুণ মাত্র। ”
” ও আসবে কবে? আমার আর ভালো লাগছে না। এত দেরি হচ্ছে কেনো ওর আসতে? আচ্ছা আমাদের মেয়ে বাবু হবে নাকি ছেলে বাবু? ওদের নাম কি রাখবো আমরা? ঠিক করেছো?”
“ হুমম করেছি তো।”
“ কি বলো বলো। ”
“ মেয়ে হলে মেহরিমা সুলতান রাখবো। আর ছেলে হলে মেহমেদ সুলতান। পছন্দ হয়েছে?”
“ হয় নি আবার? দারুন হয়েছে। ”
সোলেমান মেহরিনের পেটে চুমু খেয়ে বলল-
“ ছেলে মেয়ে যাই হও তুমি আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তুমি শুধু সুস্থ মতো আমাদের বুকে আসবে। আমাদের আর কিচ্ছু চাই না বাবা। শুনছো তো বাবার কথা? মাম্মা আর পাপা লাভস ইউ মোর সোনা। ”
মেহরিন সোলেমানের মাথার চুলে হাত ডুবিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো।
ইয়াসিন আর সুলতান নিবাসে যায় নি। যেহেতু বাতাসি নেই। এখন নিজের বাড়িতে এসেছে। ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে লাইট অন করে সোফায় ক্লান্ত দেহ নিয়ে বসে কপালের উপর হাত ঠেকিয়ে অজান্তেই বলল-

“ এক গ্লাস পানি দাও বাতাসি।”
অপেক্ষা করলো পানি আসার। কিন্তু আসছে না দেখে কপাল থেকে হাত সরিয়ে বিরক্ত চেহারা নিয়ে বলল-
“ কি হলো,পানি আনতে এতক্ষণ লাগে তোমার বাতাসি? তাড়াতাড়ি পানি দাও। তেষ্টা পেয়েছে খুব। বাতাসি,বাতাসিই….”
পরক্ষণেই থেমে গেলো ইয়াসিন। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিজের অবস্থান বুঝতে মনেই পড়লো বাতাসি তো নেই। ও তো নওগাঁ চলে গেছে। নিজেই বসা থেকে উঠে টেবিল থেকে জগ উঠিয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে খেয়ে রুমে আসলো ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হতেই প্রচুর ক্ষুধা অনুভব হলো। রুম থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এসে খাবার টেবিলে তাকাতেই খালি টেবিল চোখে পরলো। বাতাসি থাকলে এখন এই টেবিল খাবারে সাজানো থাকতো। বাজে একটা অভ্যাসে পরিনত করে মেয়েটা এখন গেছে ঘুরতে! রাগ লাগছে। এখন খাবে কি সে? রেগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাহিরে গেলো। হোটেলে গিয়ে ভাত মাছ খেয়ে বের হবার সময় তার ইমনের সাথে দেখা। ইমন সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“ কেমন আছো?”
ইয়াসিন সালামের জবাব দিয়ে বলল-
“ আলহামদুলিল্লাহ ভাই,ভালো আছি। আপনি?”
” হুমম,ভালো আছি। হোটেল থেকে বের হলে যে? খেতে এসেছিলে?”
“ হুম। বাসায় তো রান্না করা হয় নি। ”
“ বাতাসি কোথায়? ছেড়ে দিছো নাকি?”
“ ছেড়ে দিব শীগ্রই। আর বাতাসি নওগাঁ গেছে ভাবির সাথে। ”
ইমনের ভ্রু কুঁচকে আসলো ভাবি ডাক শুনে।
“ মেহরিন?”
“ হ্যাঁ। আমাদের সোলেমান ভাই যে বাপ হতে যাচ্ছে জানেন?”
ইমন ছোটো করে জবাব দিলো-
“ হুমম। ”
মায়ের মুখে শুনেছে মেহরিনের মা হবার সংবাদ টা। বুকের ভিতরে কি যে চিনচিনে একটা ব্যথা হলো সেদিন ইমনের। সারা রাত আর ঘুম হলো না। ভালোবাসার মানুষ ছিলো। সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলো। সেই মেয়েটা অন্য কার স্ত্রী, অন্য কারো সন্তানের মা ও হতে চলছে।

“ আপনার এখন কি অবস্থা ইমন ভাই? কাজ টাজ করেন?”
“ হুম। কোচিং সেন্টারে ছেলেমেয়ে দের পড়াই। ”
“ এখনও শিবিরে আছেন?”
“ হুমম। ”
” কেন যেচে শিবিরে যোগ দিলেন ভাই? ”
“ এমনি। ”
“ সাবধানে থাকবেন। জানেন তো শিবির করেন সেটা জানলে বা চিনলে কি হয়। ”
“ কি আর হবে,বাতাসির ভাই ফাহাদের মতো আমাকেও মেরে ফেলবে তোমরা।”
“ আমরা কেনো মা’রতে যাব আপনাকে? আপনি তো আমাদের ক্ষতি করছেন না। ”
“ তাহলে ফাহাদ কি ক্ষতি করেছিল তোমাদের ইয়াসিন? সে তো শিবিরও করতো না। অথচ তোমার সোলেমান ভাইয়ের লোকেরা মে’রে ফেললো তাকে। ”

“ এখানে সোলেমান ভাইয়ের কি দোষ? যাদের দোষ ছিলো তাদের তো শাস্তি দেওয়াই হয়েছে। ভাই তো জানতোও না এই বিষয়ে। ”
“ সবাই তো শাস্তি পায় নি ইয়াসিন। তোমার সোলেমান ভাই নিজের চাচা কে বাঁচিয়ে নিয়েছে। সে-ই তো হুমুক দিয়েছিল ফাহাদ কে মা’রার জন্য। আর তোমার ভাইজান নিজের চাচা কে বাঁচিয়ে বাকিদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করলো। ”
ইয়াসিন অবিশ্বাসের সহিত বলল-
“ মাথা ঠিক আছে নাকি আপনার? চাচা বা সোলেমান ভাই এসবের সাথে জড়িত না। চাচা জড়িত থাকলে কি সোলেমান ভাই ছেড়ে দিত নাকি?”

“ দিলো তো ছেড়ে। হয়তো তার রাজনৈতিক ক্যরিয়ার নিয়ে টানাটানি হবে বলে। যাই হোক অন্ধ হয়ে যেও না দলের জন্য। আমার দল অন্যায় করলে আমার আওয়াজ তাদের বিরুদ্ধেও উঠবে। বাতাসি যেদিন জানবে তার ভাইয়ের আসল হত্যাকারী তোমরা ছিলে,সেদিন না জানি মেয়েটা কি করে বসে। ভাই হারা মেয়ের আপন বলতে এই পৃথিবীতে তুমিই ছিলে। সেই তোমাকেই সেদিন ও ঘৃণা করবে। একটাই জীবন,সেটাও যদি মানুষের ঘৃণা আর রুহের হায় নিয়ে বাঁচো তাহলে এই জীবনের আর কি মূল্য রইলো। আসি বুঝলে। নিজের খেয়াল রেখো।”
ইমন চলে গেলো। ইয়াসিনের কপালে দু ভাজ এখনও বিদ্যমান। সে তো জানে আওয়ামিলীগের ছাত্রলীগের কাজ ছিলো এটা। কিন্তু এটা আসলে বাশার চাচা করিয়েছে! সোলেমান ভাই জানতো এটা! ভাই বললো না তো তাকে। ভাই তো কখনও অন্যায়ের সাথে আপোষ করে না। ভালো মানুষদের মারেও না। তাহলে?

সিডনির কিংক্রশ শহর। আজ অনেক দিন পর গুঞ্জন উঠেছে। মনস্টারের সাথে কাজ করা হেয়াল টিভিতে অস্ট্রেলিয়ান অফ দ্যা ইয়ার অনুষ্ঠান টার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো। কক্ষের ভেতর বসে থাকা মনস্টারের পার্টনারকে বলল-
“ আমাদের কিন্তু এই অ্যাপ্স টা দরকার। তাহলে আমরা সব কিছুকে কন্ট্রোল করতে পারতাম। মনস্টার কে কি জানিয়েছেন এই অ্যাপ্স টার বিষয়ে? ”
“ সে জানে। ”
“ আজ নাকি অনুষ্ঠানে এই অ্যাপ্স আবিষ্কারক কে সেটা জানা যাবে। মনস্টার কে বলুন টাকা দিয়ে ঘুষ দিয়ে অ্যাপ্সটা সব এক্সেস নিয়ে নিতে।”
“ টাকা দেওয়ার দরকার পরবে না। সকল এক্সেস আমাদের হাতের মুঠোয় আসবে খুব শীগ্রই। মনস্টার নিজেই নিয়ে আসবে। সে কোনো কাঁচা খেলোয়াড় না। তাকে তুমি আমি শিখিয়ে দিতে পারি না। তার বুদ্ধির কাছে আমি তুমি দুজনই চুনোপুঁটি। তাই তাকে নিয়ে কথা বলিও না। ”
“ আচ্ছা। তো ঐ বুড়ি মহিলাকে কি করবো আমরা? অবস্থা তো খারাপ। খায় না ঠিক মতো।।ছেলে ছেলে করে হেদিয়ে মরছে সবসময়। ”

“ মনস্টার আসবে হয়তো কাল। যা করার সে করবে ঐ বুড়ির। ”
এজওয়ান আজ ব্লাক প্যান্ট,সাদা শার্ট, তার উপর ব্লাক স্যুট পড়েছে। একদম সাহেবিয়ানা সাজ। এই সাজে মাহি এজওয়ান কে দেখে নি বললেই চলে। সব সময় ব্ল্যাক জ্যাকেটে ছন্নছাড়া বেশে থাকতো। মাহি কাভার্ড থেকে একটা কালো ফ্লোর-লেংথ ইভনিং ওয়েস্টার্ন গাউন বের করলো। যেটার হাতা স্লিভলেস। পেছনে গলা টা অনেক বড়। আর ড্রেসটার লং পায়ের পাতা পর্যন্ত হলেও ড্রেসের সামনে এক পাশ উরু পর্যন্ত কাটা। চোখে নীল লেন্স লাগালো। এজওয়ানের ও নীল চোখ। চুল গুলো কে স্ট্রেট করে হাল্কা মেক-আপ করে পুরোপুরি রেডি হয়ে আয়নায় আরেকবার নিজেকে দেখার জন্য তাকাতেই দেখলো এজওয়ান তাকিয়ে আছে। মাহি ঠোঁটে আরেকটু লিপলস দিয়ে বলল-
“ এমন বাজে ১৮+ নজরে না তাকিয়ে থেকে বলুন কেমন লাগছে আমাকে?”
এজওয়ান এক হাত পকেটে গুঁজে হেঁটে এসে মাহির পেছনে পিঠ ঘেঁষে দাড়িয়ে কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল-

Blue eyes hypnotize
teri kardi ae mainu
I swear, chhoti dress mein
bomb lagdi mainu
Glossy lips, uff, yeh tricks,
baby, lagdi ae killer
Oh, yeah, oh, yeah,
qatal kare tera bomb figure
মাহি বাহু দিয়ে খোঁচা দিলো এজওয়ানের বুকে। এজওয়ান হেঁসে দিলো।
“ লজ্জা পেলে নাকি সুইটহার্ট? ”
মাহি টেবিল থেকে ব্যাগ তুলে নিয়ে বলল-
“ চলুন। ”
এজওয়ান ডান হাত এগিয়ে দিলো, মাহি তার বাম হাত। এজওয়ান মাহির হাত মুঠোয় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। তাদের গন্তব্য মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড হলরুমে পদার্পণ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল পর্দা আর ঝকঝকে আলো। প্রাচীর বরাবর সোনালি ও নীল রঙের আলো ফুটানো, যা মঞ্চের দিকে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। মঞ্চের পেছনে বড় স্ক্রিনে চলছিল অনুষ্ঠানের লোগো আর কিছু সংক্ষিপ্ত ভিডিও। সোসাইটির জন্য কাজ করা উদ্ভাবক ও সমাজসেবীদের স্বীকৃতি।
হল রুমের বাহিরে এক লম্বা লাল কার্পেট বিছানো ছিল, যা হলরুমের প্রবেশদ্বার থেকে মঞ্চ পর্যন্ত বিস্তৃত। অতিথিরা সেই কার্পেট ধরে হেঁটে যাচ্ছে ভেতরে। মিডিয়ার লোক দিয়ে ভরে গেছে। এজওয়ান গাড়ি থেকে নেমে মাহি কে বের হওয়ার জন্য দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দিলো। মাহি এজওয়ানের হাত ধরে বেরিয়ে আসতেই কিছু ছেলেমেয়ে এগিয়ে আসলো Aj বলতে বলতে। এজওয়ান তাদের দিকে তাকালো। তার ভার্সিটির ফ্রেন্ড এরা। দূর থেকে বাহাদুর দৌড়ে আসলো। এজওয়ান কে জড়িয়ে ধরে বলল-

“ অগ্রীম কংগ্রাচুলেশনস। ”
এজওয়ান হাসলো। বাকি সব বন্ধুরা হাই হ্যালো করলো। মেয়েরা তো হা হয়ে তাকিয়ে আছে। মাহি সেদিক পানে একবার তাকালো। একজন জিজ্ঞেস করলো-
“ সাথে এটা কে Aj? ”
এজওয়ান মুচকি হেঁসে বলল-
“ মাই লাইফ লাইন। ”
“ গার্লফ্রেন্ড?”
“ নো। মাই ওয়াইফ। ”
মেয়েগুলে একসাথে চিৎকার করে বলল-
“ কিহ! তুমি বিয়ে করছো!”
“ ইয়েস,সুন্দরী লেডিসগন।”
“ কবে!”
“ দু বছর হতে চললো। ”

মেয়েগুলোর মুখ একদম বেলুনের মতে চুপসে গেলো। ক্রাশ টা বিয়ে করে ফেলছে! হ্যাঁ বউটা সুন্দর। কিন্তু তারাও তো সুন্দর।
এজওয়ান মাহি কে নিয়ে লাল কার্পেটে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করার পথে মিডিয়ার লোক গুলো ছবি তুললো।
ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় মঞ্চের দুই পাশে সিলভার ও ক্রিস্টালের সজ্জা, ফুলের অরেঞ্জ ও সাদা আর্কেড বাউন্সিং লাইটে ঝলমল করছে। মঞ্চের সামনের সারিগুলো ভেলভেট চেয়ারে বসানো অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের জন্য, পেছনের সারি সাধারণ দর্শকের । এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি,রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা ও নির্বাচিত বিজয়ী আর তাদের পরিবার সহ সাধারণ নাগরিক সবাই উপস্থিত।
একজন অর্ধবয়স্ক লোক এজওয়ান কে দেখে এগিয়ে এসে বলল-
“ ওয়েলকাম ডিয়ার। তোমারই অপেক্ষায় আমরা। প্রধানমন্ত্রীর পাশের সিটে গিয়ে বসো। উনি স্পেশালি ওটা তোমার জন্য খালি রেখেছেন। ”
এজওয়ান মাহিকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে যেতেই প্রধানমন্ত্রী এজওয়ানের দিকে তাকালে এজওয়ান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে-

“ অ্যাম এজওয়ান সুলতান ম্যাম।”
প্রধানমন্ত্রী উঠে দাঁড়ালো। হেঁসে এজওয়ানের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল-
“ তোমার সাথে পরিচিত হবারই অপেক্ষায় ছিলাম। উই আর প্রাউড অফ ইউ। ”
“ থ্যেংক ইউ ম্যাম। ”
প্রধানমন্ত্রী এজওয়ান কে সিটের বসার জন্য বলে পাশে মাহি কে দেখে বলল-
“ সিট। হু ইজ শি?”
এজওয়ান পরিচয় করিয়ে দিলো-
“ মাই ওয়াইফ ম্যাম। ”
মাহি এতক্ষণ চমকিত চোখে তাকিয়ে ছিলো। একজন প্রধানমন্ত্রী এভাবে ট্রিট করছে এজওয়ান কে! হ্যাঁ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সোলেমানের বেশ ভালো সম্পর্ক। বিকজ অফ সে পলিটিকাল পার্সোন। বাট এজওয়ান তো এখানে পলিটিক্স করে না। তাহলে তাকে নিয়ে প্রাউড ফিল করার কি আছে?
মাহি হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলো। করিডোরের ভেতর থেকে কন্ট্রোল লাইট ম্যানেজাররা মঞ্চের আলো ও প্রেজেন্টেশন ঠিক সময়ে পরিবর্তন করছে। হল রুম ভর্তি মানুষ। স্ক্রিনে অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীদের নাম ও সংক্ষিপ্ত অবদান দেখানো হচ্ছে, সেই সাথে সবাই কে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সবাই মুখিয়ে আছে একজনের জন্য। আর সেটা হলো AI চালিত স্মার্ট সিটি মনিটরিং অ্যাপ্সের আবিষ্কারক।
মাহি নিজেও অপেক্ষা করছে তাকে দেখার জন্য।
হলরুম নীরব হয়ে আছে। তাদের সকল অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাইকে ভেসে আসলো-

“ আপনাদের আর অপেক্ষা করাবো না আমরা। আমাদের দেশ সহ আরো দুটি দেশে সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে, তাদের প্রতিটি মুভমেন্ট প্রশাসনের নিকট তুলে ধরে সাহায্য করার মাধ্যমে দেশের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস মুক্ত করতে যার বিশাল অবদান আছে, সেই ব্যক্তি আজ নিজ থেকে আপনাদের সামনে উপস্থিত হবেন তার প্রাপ্য সম্মাননা গ্রহন করতে। ওকে সো, লেইডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, ইট ইজ নাউ টাইম টু অনার অ্যা ব্রিলিয়ান্ট মাইন্ড হুজ ডেডিকেশন টু রিসার্চ হ্যাজ ব্রট প্রাইড অ্যান্ড রিকগনিশন। দ্যা অস্ট্রেলিয়ান অফ দ্যা ইয়ার ২০২২, বেস্ট রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড প্রাউডলি গোজ টু- ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট অ্যান্ড প্রোমিনেন্ট রিসার্চার, এজওয়ান সুলতান। প্লিজ ওয়েলকাম হিম টু দ্যা স্টেজ!”

সাথে সাথে করতালির আওয়াজে ভরে উঠলো হল রুম। মাহির কানে এজওয়ানের নাম টা আসতেই মাহির মুখের ভঙ্গিমা পাল্টে যায়। আনক্সপেক্টটেড কিছু ঘটলে যেমন হয়, মাহির ও তেমন। হাত তালি দিতে গিয়ে তাকালো এজওয়ানের মুখের দিকে। এজওয়ানের দৃষ্টি সামনে। মাইকে আবার ভেসে আসলো। এজওয়ান কে স্টেজে আসতে বলছে। এজওয়ান স্যুটের কলার ঠিক করে এক হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে স্টেজের দিকে গেলো। পেছনে থাকা প্রতিটি দর্শক এজওয়ানের মুখ দেখার অপেক্ষায়। যারা নাম শুনে চিনেছে তাদের অবস্থাও মাহির মতোই। অবিশ্বাস্য!
এজওয়ান স্টেজে উঠে সামনে ফিরলো। হাজার হাজার মুখ এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং উঠে আসলেন। স্টেজে উঠে এজওয়ান কে অ্যাওয়ার্ড টা তুলে দিলেন। করতালি এখনও থামছে না। মাহিও অবিশ্বাস্যের সহিত করতালি দিচ্ছে। এজওয়ান এতো ট্যালেন্টেড একজন মানুষ! এজওয়ানের কানে লাগলো করতালির আওয়াজ গুলো। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মাইক এগিয়ে দিলো এজওয়ান কে তার এই সাফল্যের পুরো জার্নি টা তুলে ধরার জন্য। এজওয়ান স্মিত হেসে মাইকটা হাতে নিয়ে বলতে লাগলো-

“ গুড ইভনিং এনিওয়ান। এন্ড থ্যাংকিউ। আই অ্যাম ট্রুলি অনার্ড টু স্ট্যান্ড হিয়ার টুনাইট অ্যান্ড অ্যাকসেপ্ট দ্যা অস্ট্রেলিয়ান অফ দ্যা ইয়ার ২০২২ – বেস্ট রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।
আমার আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে আমার একগুঁয়ে জেদ, কঠোর অধ্যবসায় আর আমার অভ্যন্তরীণ অদম্য আগ্রহ। তবে শুরুটা সহজ ছিল না।
আপনারা জানেন আমি অস্ট্রেলিয়ার একজন নাগরিক। এখানেই আমার জন্ম, এটাই আমার পৈতৃক নিবাস। আসলে সত্যি কথা বলতে আমার জন্ম হয় মূলত ফ্রান্সে। আমার বাবা একজন বাংলাদেশী। আমার বাবা একজন ফ্রান্সের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন রিলেশন করে। ফ্রান্সে একটা দূর্ঘটনা ঘটায় আমার বাবা আমাকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসে। তখন বয়স আমার দুই বছর।

তখন থেকেই আমার বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, বন্ধু ও পরিবেশ, সবই অস্ট্রেলিয়ায়। আমার বাবা বাশার সুলতান একজন বাংলাদেশের পলিটিকাল পার্সন সেই সাথে বিজনেসম্যান ও। তার পক্ষে কখনই সম্ভব ছিলো না আমার সাথে ২৪ ঘন্টা অস্ট্রেলিয়া থাকার। তাকে বাংলাদেশ সুইজারল্যান্ড ডেনমার্ক সহ বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করতে হতো। যার ফলে আমাকে পরিবার ছেড়ে এই অস্ট্রেলিয়াতেই একা থাকতে হতো। আমাকে দেখাশোনা করতো তখন ন্যানি। আমার ফ্রেন্ড সার্কেল ও খুবই কম। এই নিঃসঙ্গতা আমাকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে দিয়েছে। ছোট থেকেই আমার খুব ইচ্ছে ছিলো আমি পুরো পৃথিবীর কোনো একটা অংশকে কন্ট্রোল করবো। সেটা কোন অংশ তা আমি ছোট বেলাতেই ঠিক করে রেখেছিলাম। ছোট থেকেই আমার বাবা আর আমার বড় ভাই নওয়াজ সোলেমান সুলতান সব সময় আমাকে দূর থেকে সাপোর্ট করেছে এই বিষয়ে। শৈশব থেকে এত এত দূর্নীতি আর এত কিছু দেখে বড় হয়েছি যে আমার বিতৃষ্ণা জাগতো দেশের এমন সিস্টেম দেখে। কিভাবে দূর্নীতি এই অনিয়ম সমাজকে দুর্বল করে দিয়েছে টাকা আর ক্ষমতাশালী উচ্চ ব্যক্তিরা। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমি এই দূর্বল সমাজ কে পরিবর্তন করবো। মুখোশের আড়ালে থাকা ক্ষমতাশালী উচ্চ ব্যক্তিদের টেনে হিঁচড়ে জন সম্মুখে এনে দাঁড় করাবো। তাদের সাজা পাওয়া ব্যবস্থা করবো নিজ হাতে। সেজন্য দিন রাত এক করে আমি এই অ্যাপ্স টা তৈরি করেছি। এন্ড পরিশেষে নাউ আই অ্যাম সাকসেস। ”
এজওয়ান হাতে থাকা অ্যাওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে বলে-

“ দ্যিস অ্যাওয়ার্ড রিপ্রেজেন্টস মাই ফাইভ-ইয়ার্স অফ ডেডিকেশন, রিসার্চ, অ্যান্ড আনওয়েভারিং পার্সোনাল এফোর্ট। আই হ্যাজ ডান ইট অল অন মাই ওন, অ্যান্ড আই উড লাইক টু অ্যাকনলেজ দ্যা কাউন্টলেস পিপল হু ওয়ার্ক টায়ারলেসলি টু মেক আওয়ার নেশন সেফার অ্যান্ড করাপশন-ফ্রি। ”
ফের করতালি তে ভাসলো হলরুম। হঠাৎ একজন সাংবাদিক মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
“এজওয়ান সুলতান আপনার মা-বাবা কি আজ এসেছে আপনার এই সাফল্য দেখতে? এসে থাকলে কোথায়? আমরাও সেই সৌভাগ্যবান বাবা মা কে দেখতে চাই। যার আপনার মতো সন্তান আছে। ”
এজওয়ানের চোখে অল্প নীরবতার ছাপ পড়লো। ধীরে ধীরে উত্তর দিলো-
“ আমার বাবার স্ত্রী সে মৃ’ত। আর আমার বাবা এখন বাংলাদেশে আছেন। তবে আমি জানি তিনি টিভির পর্দায় আমাকে দেখছে। এবং এটাও জানি, তিনি আমাকে এই জায়গায় দেখে খুবই উচ্ছ্বাসিত। ”
সবার মুখ কেমন হয়ে গেলো বাবার স্ত্রী বলায়। মা বললো না একবারও।

“ আপনার মায়ের নাম বলা যাবে? আর্টিকেল লেখার সময় লাগবে। ”
“ উনার নাম লেখার প্রয়োজন নেই। ”
“ ওকে। আপনি কি আজও একা এখানে? কেউ আসে নি আপনার সাথে?”
“ কে বললো আমি একা? আমার সাথে এসেছে তো। ”
“ কে এসেছে। ”
“ মাই ওয়াইফ। মিসেস মাহি সুলতান। ”
“ আপনি বিবাহিত!”
“ ইয়েস। ”
“ দেখার সুযোগ হবে আপনার সেই সৌভাগ্যবতী স্ত্রী কে?”
“ অফকোর্স। ”
এজওয়ান স্টেজ থেকে মাহির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ মাই লাভ,মাই ওয়াইফি,প্লিজ কাম টু দ্যা স্টেজ। ”
মাহি হকচকিয়ে গেলো তার নাম শুনে। হাত তালি দেওয়া থামিয়ে দিলো। এজওয়ান তাকে ডাকছে স্টেজে! মাহি আসছে না দেখে এজওয়ান নিজেই স্টেজ থেকে নেমে হাত ধরে নিয়ে আসলো স্টেজে। এজওয়ান মাহির হাত ধরেই বলল-

“ ইন্ট্রডিউস মাই ওয়াইফ,মাহি সুলতান। আমার জীবনে আসা একটা জীবন্ত ফুল। আমার ভালোবাসা,আমার জীবন। আমি আমার এই পুরষ্কার টা আমার স্ত্রী মাহি কে উৎসর্গ করছি।”
এজওয়ান অয়াওয়ার্ড টা মাহির হাতে দিলো। মাহি তাকালো। এজওয়ানের অ্যাওয়ার্ড সে নিবে! আর তাকে কেনো উৎসর্গ করছে? এজওয়ান ইশারায় নিতে বললো। তার যা সব তো মাহিরই। মাহি নিলো হাতে অ্যাওয়ার্ড টা। কেমন একটা ফিলিংস হচ্ছে।
সাংবাদিক আবার বলল-

“ কিউট একটা জুটি আপনাদের। ম্যামের অনুভূতি টা কেমন? ”
সাংবাদিক মাইক বাড়িয়ে দিলো। মাহি নার্ভাস ফিল করছে। এজওয়ান পিঠে হাত রেখে বলল-
“ মনে যা আসে বলে দাও। দুর্নাম বদনাম যা ইচ্ছে হয় বলো। সব উন্মুক্ত তোমার জন্য।”
মাহি আড় চোখে তাকালো। মাইক টা হাতে নিয়ে বলল-
“ হ্যা…হ্যালো এভ্রিওয়ান। আশা করছি আপনারা সবাই ভালোই আছেন। ঠিক কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। ভীষণ নার্ভাস লাগছে। কখনও এভাবে এত বড় স্টেজে দাঁড়িয়ে স্পিচ দেই নি। আপনারা যেমন অবাক হয়েছেন আজ এই মঞ্চে এজওয়ান সুলতানকে দেখে, বিশ্বাস করুন আমিও ঠিক ততটাই অবাক হয়েছি।
কারণ সত্যি বলতে কী আমি কখনও ভাবিনি, এজওয়ান সুলতান নামের মানুষ এতটা ট্যালেন্টেড হতে পারে। আমি কল্পনাও করতে পারি নি এই অসাধারণ অ্যাপটা যে তৈরি করেছে, সেটার আবিষ্কারক এজওয়ান হবে। এটা আজ জানার পর আমি সত্যিই বিস্মিত হয়েছি।
হয়তো এর পেছনে একটা কারণও আছে। আমি কখনও তাকে সেভাবে জানার সুযোগ পাইনি… বা হয়তো জানার চেষ্টাও করিনি। আমরা একই ছাদের নিচে থাকলেও আমি যে তাকে পুরোটা চিনতে পারি নি তা আজ আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারছি। ”

মাহি এজওয়ানের দিকে ঘুরে এজওয়ানের অ্যাওয়ার্ড টা এজওয়ানের হাতে দিয়ে বলল-
“ অ্যাম রিয়েলি, রিয়েলি প্রাউড অফ ইউ। আপনার মেধা, আপনার পরিশ্রম, সব কিছু আমাকে আজ ভীষণভাবে মুগ্ধ করছে। এই অ্যাওয়ার্ডের সম্পূর্ণ ক্রেডিট কেবল আপনারই হওয়া উচিৎ। আমি আপনার এই জার্নিতে এক সেকেন্ডের জন্যও ছিলাম না। ”
এজওয়ান অ্যাওয়ার্ডটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। সাংবাদিক আবার বলল-
“ শুনেছি আপনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন টপ স্টুডেন্ট। বিশেষ প্রতিভার অধিকার। খেলাধুলা থেকে শুরু করে গান সব কিছুতেই এক্সপার্ট। আপনার এই সাফল্যের জন্য আপনার গলায় একটা গান শোনা যাক? আপনার গানের গলা অনেক সুন্দর শুনেছি। ”

সাথে সাথে সবার চিৎকার ভেসে আসলো। বললো – Aj একটা গান গাও। প্লিজ প্লিজ।
এজওয়ান সম্মতি জানালো। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে মাহির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ দ্যিস সং ইজ ডেডিকেটেড টু মাই লাভলি ওয়াইফ মিসেস মাহি সুলতান।”
তারপর এজওয়ান খালি গলায় গাইলো-

দাহশয্যা পর্ব ৮৯

tujhe milke laga hai yeh,
tujhe dhundh raha tha main –
tujhme hai kuch aisi subah sa,
jiski khaatir main tha jaga sa
aa tu mere khwaab sajaa ja re……..
dil roye ya ilaahi tu
aaja mere maahi…
maahi maahi maahi,
dhadkano mein maahi,
saaanson mein hai maahi
tu hi hai mere dil ki tamanna,
teri hi yaadein har lamha
de mujhe de apna aanchal,
dhoop mein jalta main harpal
tujhme hai kuch aisi ghata sa,
jiske liye hoon main pyaasa sa
aa tu meri pyaas bujha ja re…
dil roye ya ilaahi tu
aaja mere maahi…

দাহশয্যা পর্ব ৮৯ (৩)