দাহশয্যা পর্ব ৮৯
Raiha Zubair Ripti
পরন্ত এক বিকেল..আকাশ টা মেঘলা। আজও হয়তো বৃষ্টি আসবে। সোলেমান আর মেহরিন একটু আগেই প্রেমার কবরস্থান থেকে নিবাসে ফিরে সুইমিংপুলে পা ডুবিয়ে বসে আছে। মেহরিন দেখতে চেয়েছিল সেদিন প্রেমার কবর টা,সেজন্য আজ নিয়ে যাওয়া। কবরস্থানে দেখাশোনা যিনি করেন তার সাথে কথাবার্তা বলে প্রেমা আর প্রেমার মায়ের কবরস্থানে বেড়া দিয়েছে সেই সাথে খুঁটিতে কার কবর এটা চেনার জন্য নাম ঠিকানা লিখে দেওয়া হয়েছে বোর্ডে। মেহরিন আর সোলেমান অনেকক্ষণ বসেছিল কবরের সামনে। মেহরিনের জীবনে এই এক আফসোস। সে প্রেমা নামক রমণী টাকে স্বচক্ষে দেখতে পারে নি। একটু যদি কখনো তার সাথে মেহরিনের দেখা হতো! বোধহয় আল্লাহ চায় নি মেহরিন প্রেমা কে দেখুক। মেহরিন দোয়া করলো প্রেমার জন্য। আল্লাহ যেন তাকে বেহেস্তের সর্বোচ্চ মাকামে ঠাই দেন। কবরস্থানের সব কাজ শেষে সোলেমান কবরস্থানের লোকটাকে কিছু টাকা দিয়ে আসলো। প্রেমার চল্লিশা হয় নি এখনও। উনি যেন সেটা করার ব্যবস্থা করে। এতিম আর রাস্তার পথশিশু দের খাবারের ব্যবস্থা করে। লোকটা মাথা নেড়ে স্বীকার করে। সোলেমান শেষবার প্রেমার কবর টাকে দেখে চলে যায়। ঝড়ের মতো আসা মেয়েটা ঝড়ের মতোই বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
সোলেমান মেহরিনের হাতের উপর তার ভেজা হাত রাখতেই চমকে উঠে।
“ কিছু ভাবছিলে নাকি? ”
মেহরিন দু দিকে মাথা নেড়ে বলল-
“ না। ”
“ তাহলে চমকালে যে?”
“ আচমকা ঠান্ডা ভেজা হাত দিয়ে ধরলে চমকাবো না?”
“ আসো পুলে গোসল করি। এই তুমি সাঁতার জানো তো?”
“ গ্রামে বড় হওয়া মেয়ে আমি। সাঁতার জানবো না?”
“ আমি আগে জানতাম না। ছোট বেলায় এই পুলেই একদিন পড়ে গিয়েছিলাম। ”
“ পা পিছলে? নাকি গোসল করতে নেমে?”
“ না,পা পিছলে পড়ি নি। আর গোসল করতেও নামি নি। আমি আজকের মতোই বসেছিলাম সেদিন রাতে। হুট করে কি যে হলো আচমকা পানিতে পড়ে গেলাম। মনে হয়েছিল কেউ হয়তো ধাক্কা দিয়েছে। কিন্তু কেউ তো ছিলো না আশেপাশে। আম্মা আমাকে খুঁজতে খুঁজতে বাহিরে এসে দেখে আমি পানিতে নাকানিচুবানি খাচ্ছি। পরে আম্মা নিজেই পানিতে নেমে আমাকে বাঁচায়। আম্মা ঠিক সময় এসে না উঠালে হয়তো সেদিনই ম’রে যেতাম। ”
“ মা কি আগে এ বাড়িতে থাকতো? ”
“ আমার আম্মা তো শুরু থেকেই এ বাড়িতে থাকে। এই বাড়ি তো আমার আম্মারই। নানাজান বানিয়েছিল বাংলাদেশে আসার পর ।
“ তাহলে উনি এখন নওগাঁয় থাকে কেন ?”
“ কোথায় নওগাঁ থাকে? কার কথা বলছো তুমি? ”
“ কেনো আপনার আম্মার কথাই তো বলছি। ”
“ তুমি কি আফিয়া সুলতানের কথা বলছো? ”
“ হুমম। ”
“ উনি তো আমার বায়োলজিকাল মা না। ”
আচমকা এমন কথা মেহরিনের কানে যেতেই মেহরিন ভয় পাওয়ার মতো চমকে উঠলো। বায়োলজিকাল মা না মানে! কি বলছে কি উনি? তাহলে কি সৎ মা?
“ আপনার বায়োলজিকাল মা না মানে!”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো মেহরিনকে এমন ভাবে বিস্ময় হতে দেখে।
“ কেনো তুমি জানতে না এটা?”
“ না তো। ”
“ আফিয়া সুলতান আমার নিজের মা না। ”
“ বাবার সেকেন্ড ওয়াইফ তাহলে উনি?”
“ না তো। ”
মেহরিনের মাথা ঘুরাতে লাগলো। সেকেন্ড ওয়াইফ না আবার উনার মা-ও না। তাহলে আম্মা ডাকে কেনো? আর আমিরুল সুলতানের তো ওয়াইফ আফিয়া সুলতান,তাহলে?
“ আমি কিছুই বুঝতেছি না সুলতান সাহেব। বুঝিয়ে বলুন। আফিয়া সুলতান তো আমিরুল সুলতানের ওয়াইফ। আর আমিরুল সুলতান তো আপনার বাবা। তাই না?”
“ না তো,আমিরুল সুলতান আমার বাবা না। উনারা দু’জন আমার চাচা চাচি। ”
“ কিহ!”
মেহরিনের মুখের ভঙ্গিমা চেঞ্জ হয়ে গেলো পুরোপুরি। এতদিন ধরে যাদের শ্বশুর শাশুড়ি ভেবে এসেছে তারা তার শ্বশুর শাশুড়ি না!
“ কিন্তু আমি তো জানি উনারা আপনার বাবা মা। তাহলে কি রুমাইসা আপু আপনার আপন বোন না?”
“ রুমাইসা আমার আপন বোনই। চাচা চাচির কোনো ছেলেমেয়ে নেই। আব্বা আর আম্মা মারা যাওয়ার পর তারা দুজন রুমাইসা কে নিজের মেয়ের মতো করে বড় করেছে। ”
“ আপনার আব্বা আম্মা মা-রা গেলো কি করে?”
সোলেমান নিশ্চুপ হয়ে গেলো। তাদের নিকৃষ্ট হত্যার বর্ণনা মেহরিন কে জানাতে চাচ্ছে না। সেজন্য বলল-
“ কারা যেন খু’ন করেছিল। ”
“ এর আগে যে মৃত্যু বার্ষিকী হলো। ওটা কি আপনার আব্বা আম্মার?”
“ হুম। আমার আব্বা আম্মার। ”
“ উনাদের নাম যেন কি?”
“ আমজাদ সুলতান,মরিয়ম সুলতান। ”
“ উনাদের এই নাম সেদিন শুনে খুব পরিচিত মনে হচ্ছিলো। কিন্তু কোথায় শুনেছিলাম মনে পড়ছিলো না। ”
“ বিয়ের দিন শুনেছিলে। বিয়েতে তো আব্বা আম্মারই নাম ছিলো। ”
“ হতে পারে। আমার খেয়াল নেই। কিন্তু ও বাড়িতে কখনও কাউকে কথা বলতে দেখি নি কেনো আপনার আব্বা আম্মা কে নিয়ে?”
“ আম্মা কে নিয়ে দাদাজানের কোনো একটা অসুবিধা ছিলো। আম্মার কাছে শুনেছিলাম আম্মাকে তার পছন্দ ছিলো না। কিন্তু বিশ্বাস করো আমার আম্মাকে অপছন্দ করার কোনো কারন কারো থাকতে পারে আমি বিশ্বাস করি না। তখন কার দিনে আমার আম্মার রূপের সামনে কেউ টিকতে পারে নি। এতটাই সুন্দর আর রূপবতী আর মার্জিত ছিলো যে আম্মা কে নানাজান লুকিয়ে রাখতো। কারো চোখ একবার আম্মার উপর পড়লেই দ্বিতীয় বার দেখার লোভ জন্মাতো। আম্মাকে দাদার পছন্দ ছিলো না বলে আব্বা আম্মাকে নিয়ে ও বাড়িতে থাকে নি। এ বাড়িতেই থেকেছে নানাজানের সাথে। নানাজান জমিদার ছিলো আগে। বাংলাদেশে আসার পর রাজনীতি তে ঢুকে। নানাজানের মাধ্যমেই আমাদের সহ সুলতান পরিবারের রাজনীতির যাত্রা শুরু। সালটা তখন ১৯১২। মোহাম্মদ শাহ ছিলেন ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে যিনি সম্পর্কে আমার নানার বাবা। বয়স তার তখন ২২। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক ব্যবসায়িক মিলনমেলায় বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজাত সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন, সেখানেই তার সাথে পরিচয় হয় ভারতের লাখনউয়ের প্রখ্যাত জমিদার পরিবারের কন্যা ফিরোজা খাতুনের।
তখন ভারত বিভাজন হয়নি, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ নামের কোনো দেশ ছিল না। ঢাকার মতো শহর এবং লাখনউ একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল সাংস্কৃতিক আর সামাজিকভাবে। সেখান থেকেই দেওয়ান ও শাহ পরিবারের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। ফিরোজা খাতুনের পরিবার লাখনউয়ের দেওয়ান পরিবার ছিল।
দেওয়ান পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে মোহাম্মদ শাহের জন্য। কারণ তারা চান ঐ পরিবার থেকে কেউ লাখনউয়ের জমিদারি সামলাবেন, যেহেতু জমিদারি প্রথায় বংশ পরম্পরায় সম্পদ ও কর্তৃত্ব সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯১৪ সালে মোহাম্মদ শাহ ফিরোজা খাতুনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মোহাম্মদ শাহের শাশুড়ি ছিলেন এই জমিদার পরিবারের প্রধান। এক মেয়ে ফিরোজা খাতুন ছাড়া আর কোনো সন্তান ছিলো না। বিবাহের পর মোহাম্মদ শাহ কে লাখনউ গিয়ে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়। তার নামের আগে তখন দেওয়ান শব্দ টা জুড়ে দেওয়া হয়। ১৯১৫ সালের শেষের দিকে গিয়ে তিনি লাখনউয়ের জমিদার হোন। তখন তার নাম হয় দেওয়ান মোহাম্মদ শাহ। মোহাম্মদ শাহের পরিবার ঢাকার বাড়িতেই থাকতেন। যার নাম বর্তমানে সুলতান নিবাস।
১৯২২ সালের দিকে লাখনউয়ে মোহাম্মদ শাহের এক ছেলে হয়। নাম রাখা হয় দেওয়ান নওরোজ শাহ যিনি আমার নানা। ১৯৪৭ সালে ২৫ বছর বয়সে দেওয়ান নওরোজ শাহ মোহাম্মদ শাহের পর জমিদারিত্ব হাতে তুলে নেয়।
তবে ১৯৫০-এর দশকে ভারত সরকার জমিদারি বিলুপ্তি আইনের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা পুরোপুরি শেষ করে দেয়। জমিদার পরিবারগুলো তাদের অধিকাংশ জমি হারিয়ে ফেলে। লাখনউয়ের দেওয়ান পরিবারও এতে অক্ষত থাকেনি। জমিদারি বিলুপ্তির ফলে জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সরকারের হাতে।
অতঃপর, জমিদারি হারিয়ে মোহাম্মদ শাহ তার পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় ফিরে আসেন সুলতান নিবাসে। তখন এটার নাম ছিলো দেওয়ান নিবাস।
১৯৫৭ সালে মোহাম্মদ শাহের এক ব্যবসায়ী বন্ধুর কন্যা হুমায়রা নামের এক নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় নানা দেওয়ান নওরোজ শাহ। এর কিছু বছর পর আমার আম্মা মরিয়ম দেওয়ান জন্মগ্রহণ করেন। আম্মার কোনো ভাই বোন নেই।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মোহাম্মদ শাহ ও নানাজান ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সাহায্য দেন সেই সাথে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তখন তাদের পরিবারের অবস্থান শক্তিশালী হয়। নানা দেওয়ান নওরোজ শাহ ঢাকার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঢাকারই এক সভায় বাবা মানে আমজাদ সুলতানের সাথে দেখা হয় নানাজানের। বাবা তখন সবে দেশে এসে রাজনীতি তে যুক্ত হয়েছে ছাত্রলীগ হিসেবে। নানাজান তাকে এই নিবাসে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কারন দাদাজান রা তখন নওগাঁয় থাকতো। আর বাবা কে রাজনীতির জন্য ঢাকায় থাকতে হতো। বাবা নানাজানের খুব বিশ্বস্ত ছিলো। সেদিক থেকে খুব স্নেহ করতো বাবা কে। এদিকে রাজনৈতিক মিটিং এর জন্য প্রায় বাহির থেকে লোকজন আসতো এখানে। আম্মা কে আর কতদিনই বা লুকিয়ে রাখতে পারতো সবার নজর থেকে। দু একজন দেখে ফেলতো আর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতো। নানাজান এ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তা করতো। অপরিচিত দূরে কোথাও মেয়েকে বিয়ে দিবেন না।
পরে বাবা কে পছন্দ করে মা’য়ের জন্য। বাবার মুখে শুনেছি এসব। আর দাদা শুরু থেকেই এই বিয়ের বিপক্ষে ছিলো। তার মতে মা নাকি বাবার যোগ্য না। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ উল্টো। ধরতে গেলে দাদাজান রাই নানা জানের ধারে কাছেও ছিলো না। এই যে আমার সব সম্পত্তি দেখছো এসব কিছু আমার নানাজানের। এগুলো নানা মারা যাওয়ার পর বাবা সামলিয়েছে। এখন আমি সামলাচ্ছি সাথে চাচা এজওয়ান । তবে সব কিছুর মালিক আমি। মায়ের ছিলো সব। মা মারার যাওয়ার পর আমি আর রুমাইসা মায়ের অর্ধেক সম্পত্তি পেলেও বাবার পুরো সম্পত্তি রুমাইসা একাই পেয়েছে। আর আমারও দরকার ছিলো না বাবার সম্পত্তি। কারন তার সম্পত্তির পরিমান খুবই স্বল্প ছিলো। সুলতান পরিবার থেকে পাওয়া কোনো সম্পত্তি আমার নেই। সব দেওয়ান পরিবারের। আর আমাদের সম্পত্তির উইল সুলতান আর দেওয়ান পরিবারের ওভাবেই বানিয়ে দিয়ে গেছেন নানাজান যে একজনের সম্পত্তি তার ছেলেমেয়ে ছাড়া আর কেউ পাবে না। ছেলেমেয়ে না থাকলে ওয়াইফ পাবে। আর ওয়াইফ মা-রা গেলে তা চলে যাবে রাষ্ট্রের কাছে। ছিনিয়ে বা জোর করে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই অন্যদের। ঐ যে বাড়ির পাশে কবরস্থান দেখছো না? ওটা আব্বা আর আম্মার। আম্মার মৃত্যুর দু মাস পর আমিরুল চাচা দেশে আসে। পরে তিনি রুমাইসার জন্য চাচি কে বিয়ে করে। চাচির কোনো সন্তান হয় নি পরে আর। তাদের কাছে আমি আর রুমাইসাই সব। সেজন্য তাকে আমি আর রুমাইসা মা বাবা ডাকি। ”
মেহরিনের চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। সে এতদিন এসবের কিছুই জানতো না। দাদাজান কেনো পছন্দ করতো না মরিয়ম সুলতান কে?
“ উনাদের খু’ন কারা করেছিলো জানা যায় নি আর?”
“ না। এখনও খোঁজ চলছে। যেদিন ওদের খোঁজ পাবো। সেদিন রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিব আমি সোলেমান। শুধু প্রে করো আমি যেন তাদের খোঁজ টা পাই। আমাদের দুই ভাইবোন কে এতিম করার শাস্তি ভয়াবহ হবে ওদের জন্য। শুধু আমি খোঁজ টা পাই। ”
পরের দিন দুপুরে মাহির অ্যাপার্টমেন্টে একটা খাম আসে। মাহি নিচ থেকে সেটা রিসিভ করে রুমে এসে খুলে দেখে এতে ডিভোর্স পেপার। কিন্তু তার উকিল তো বলেছে কাল পরশু পাঠাবে। তাহলে আজ পাঠালো যে? পাঠিয়েছে তাহলে ভালোই করেছে। কথাটা ভেবে খুশি হতেই ফোনে একটা মেসেজ আসে। মেসেজ টা বাশার সুলতান পাঠিয়েছে। মেসেজে লেখা আছে-
“ ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিয়েছি। সাইন করে আমার ছেলেকে মুক্তি দাও। সাথে নিজেও মুক্ত হও এই জোরজবরদস্তির বিয়ে থেকে। এজওয়ান তোমার কাছেই আছে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি। তাকে দিয়েও সাইন করাও। এটাই চেয়েছিলে তুমি। ”
হাসি গায়েব হয়ে গেলো মাহির মুখের। তারমানে এটা তার উকিল পাঠায় নি! এজওয়ান ভাত ঘুম দিয়েছে। মাহি পাশে দাঁড়িয়ে পিঠে ধাক্কা দিয়ে ডেকে তুললো। এজওয়ান মাহির ডাক শুনে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই চোখের সামনে একটা কাগজ দেখে ভ্রু কুঁচকালো। এজওয়ান অন্য দিকে ঘুরে ঘুমঘুম চোখে বলল-
“ আমার জায়গা সম্পত্তি সব নিজের নামে করিয়ে নিতে চাইছো নাকি? দেখো ধৈর্য ধরো। সব পাবে সব। লিখে দেওয়ার স্কোপ নেই আমার। ”
মাহি এবার পিঠে চিমটি বসালো। এজওয়ান মৃদু শব্দ করলো ব্যথায়।
“ উঠুন। এটা সম্পত্তির উইল না। ডিভোর্স পেপার।”
এজওয়ান লাফিয়ে উঠলো শোয়া থেকে। চোখ ডলতে ডলতে বলল-
“ কি এটা?”
“ ডিভোর্স পেপার। ”
এজওয়ান বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“ তো এখন কি করবো আমি?”
“ সাইন করুন। ”
“ আচ্ছা বেশ দাও। ”
এজওয়ান ডিভোর্স পেপার টা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। কমোডের ভেতর পেপার টা ফেলে দিয়ে তার উপর মুতে দিলো দাঁড়িয়ে। শেষে এক বালতি পানি ঢেলে খালি হাতে ওয়াশরুম থেকে বের হলে মাহি এজওয়ান কে জিজ্ঞেস করলো-
“ ডিভোর্স পেপার কোথায় রেখে আসলেন আবার? তাড়াতাড়ি সাইন করে দিন। ”
এজওয়ান আবার বিছানায় চিৎপটাং হয়ে শুয়ে বলে-
“ খুব জোরে হাগু আসছিলো বুঝছো? তাই হাগু করে ডিভোর্স পেপার দিয়ে পাছা পরিষ্কার করে আসছি। এখন সেই ডিভোর্স পেপার কমোডের ভেতর গড়াগড়ি খাচ্ছে আমার হাগুর সাথে। তুমি তুলে আনতে পারলে গড প্রমিস পেপারে আমি সাইন করে দিয়ে,তোমাকে এই সম্পর্ক থেকে চিরতরে মুক্তি দিয়ে দিব। ”
মাহি ঘৃণায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। ফাজিল বদ বেডায় কি করছে এটা! খবিশের ঘরে খবিশ কোথাকার। এজওয়ান চোখ বন্ধ করে বলল-
“ মনে মনে এত না বকে যাও তুলে নিয়ে আসো। আমি সাইন করে দিচ্ছি। ”
মাহি বালিশ ছুঁড়ে দিয়ে বলল-
“ আমার ভুল হয়ে গেছে আপনার মতো এক বজ্জাতের থেকে ডিভোর্স পাবো এই আশা করাটা। ”
“ কোনো ব্যাপার না। এমন ভুল সবাই করে আমাকে নিয়ে। ”
মাহির ফোনে কল আসলো বাশার সুলতানের। মাহি সেটা রিসিভ করে বেলকনিতে আসতেই বাশার সুলতান জিজ্ঞেস করলো-
“ দিয়োছো ডিভোর্স এজওয়ানকে?”
মাহি দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল-
“ আপনার ছেলে নিজ থেকে আমাকে যেচে ডিভোর্স না দিলে আমার পক্ষে সম্ভব না আপনার ছেলেকে ডিভোর্স দেওয়া। ”
” তারমানে হয় নি ডিভোর্স! ”
“ হয় নি। সে ডিভোর্স পেপার ফেলে দিছে। ”
“ কোথায়?”
এজওয়ান কেঁড়ে নিলো ফোনটা। কানে নিয়ে দাঁত চেপে বলল-
“ কোথায় ফেলে দিয়েছি জানার পর কি সেখানে যাবে? গেলে আসো আমি তোমাকে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। জ্বালিয়ে খাচ্ছ আমাকে রীতিমত তুমি। এমন জাউরা বাপ খুবই কম দেখেছি আমি যে কি না ছেলের বিবাহিত জীবনে শাশুড়ি দের মতো কূটনামি করে। ভালো হয়ে যাও। ভালো হতে টাকা পয়সা কিচ্ছু লাগে না। তোমার যদি লাগে আমাকে বলো আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারপরও ভালো হও। আর ফোন দিবা না আমাদের। ”
বাশার সুলতানের অপমানে মুখটা লাল হয়ে গেলো। বউয়ের জন্য বাপ কে এমন অপমান!
“ আপনার বাপ কিন্তু আপনার ভালোর জন্যই পাঠিয়েছিল ওটা। ”
এজওয়ান ফোনটা হাতে গুঁজে দিয়ে ধমক দিয়ে বলল-
“ চুপ থার্ডক্লাস বউ। তোর এত ভালো মন্দ ভাবতে হবে না আমার। আমি জানি আমার কিসে ভালো আর কিসের মন্দ। ”
মাহি কথা বাড়ালো না। ফোনটা নিয়ে মোহনা কে ফোন করলো। গতকাল রাতে কথা বলেছিল। তরিকুল চৌধুরীর ব্যবসাটা সে দেখাবে। সেটা নিয়ে শাকিলের সাথে কথা বলতে বলেছিল মাহি মোহনা কে। এখন মোহনা জানাচ্ছে শাকিল নাকি দিবে না। মাহি অবাক হলো সে কথা শুনে। হোয়াট দ্যা ফাক! শাকিল বা দেওয়ার কে? মাহি শাকিল কে ফোন করলো। শাকিল রিসিভ করলো না। এজওয়ান মাহির রাগান্বিত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু হয়েছে?”
“ শাকিল ভাই তরিকুল চৌধুরীর বিজনেস আমাকে সামলাতে দিতে নারাজ। তারমতে আমি নাকি সামলাতে পারবো না। আর তাছাড়া আমি নাকি বাড়াবাড়ি করলে বিজনেস ভাগ করে ফেলবে। আপুর টা নিয়ে নিবে। ”
“ তাতে সমস্যা কোথায়? তোমার আপুর টা নিয়ে নিক। তোমার যতটুকু পাওনা সেটুকু তুমি কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নাও। শাকিল সেটাও দিতে অস্বীকার করলে বাকিটা আমি দেখে নিচ্ছি।”
“ হুম তাই করবো। ”
“ গুড। আমি উকিলের ব্যবস্থা করছি। ”
এজওয়ান ফোন করে একটা উকিল কে বলে দিলো সব ব্যবস্থা করতে। আর এটাও জানিয়ে দিলো এজওয়ান রা শাকিলের সাথে কোনো পার্টনারশিপে নেই। শাকিলের পরিবর্তে মাহি চৌধুরীর সাথে তারা পার্টনারশিপে যাবে। বিকজ অফ এজওয়ানকে ছাড়া মাহির পক্ষে সম্ভব না বিজনেস টা রান করা।
এরমধ্যে মেহরিনের প্রি-টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। আজ তার রেজাল্ট দিলো। রেজাল্ট দেখে মন খারাপ। বাকিসব পরীক্ষা গুলো ফাস্টক্লাস হলেও বায়োলজি তে ফেল এসেছে। ক্লাসের সবাই ফেল করেছে এই সাবজেক্টে। ঊর্মি তো রেজাল্ট দেখে হতবাক মেহরিনের। সে ভেবেছিল মেহরিন অন্তত পাশ করবে। কিন্তু না সোলেমান নিজের বউ কেও ফেল দিয়েছে। মেহরিন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এসে গাড়িতে বসলো। সোলেমান বউয়ের মুখের এমন এক্সপ্রেশন দেখে জিজ্ঞেস করলো-
– “ কি হয়েছে? মুখ এমন বাংলার ঙ এর মতো কেনো? ”
মেহরিন সোলেমানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ জানেন না কি হয়েছে?”
“ না তো। ”
“ আপনি আমাকে প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় বায়োলজি তে ফেল দিয়েছেন কেনো?। ”
সোলেমান এবার বুঝলো বিষয় টা। হাই তুলতে তুলতে বলল-
“ তা কত পেয়েছো?”
“ ৩২.৯৯। ৩৩ ও পাই নি। ”
“ ভালো মার্কই তো পেয়েছো। পুরো ক্লাসের হায়েস্ট মার্ক তোমারই। তোমার উচিত খুশি হওয়া। তা না করে গুষা করছো স্বামীর সাথে।”
“ আমি জীবনে ৯০ এর নিচে মার্ক পাই নি এক্সামে। সেই আমাকে কি না আপনি ফেল দিলেন! ”
“ হু দিলাম তো।”
“ কেনো দিলেন? এত কম মার্ক পাওয়ার মতো এক্সাম তো আমি দেই নি। ”
“ সবাই কে ফেল দিয়েছি। সেখানে তোমাকে পাশ দিলে বিষয় টা খারাপ দেখায় না?”
“ খারাপ দেখাবে কেনো? আমার যা প্রাপ্য আমাকে তাই দিতেন। ”
“ তোমার প্রাপ্য টাই তো তোমাকে দিলাম ৩২.৯৯। ইউ ডিজার্ভ হায়েস্ট নম্বর।”
“ পয়েন্ট ১ এর জন্য ফেল দিছেন। আবার বলছেন আমি এই নম্বর ডিজার্ভ করি!”
“ বাকিরা তো ২০-২৫ পেয়েছে। তোমাকে ফেল করালেও তাদের থেকে কিন্তু বেশি নম্বরই দিয়েছি। এখন তোমাকে একা যদি পাশ দিতাম তাহলে তো আমার পাপী ভণ্ড স্টুডেন্ট গুলো বলতো বউ দেখে পাশ দিয়েছি তোমায়। সেই কথা শুনতে কি তোমার ভালো লাগতো?”
“ স্টুডেন্ট দের শায়েস্তা করার জন্য তাই বলে ইচ্ছে করে ফেল করাবেন বউ কে! এ কেমন স্বামী আপনি”
“ খুবই ইনোসেন্ট, কিউট, লয়্যাল,হ্যান্ডসাম, আর ড্যাশিং স্বামী তোমার।
“ নিজের প্রশংসা নিজে করছেন?”
“ তুমি তো করো না। তাই নিজের টা না হয় নিজেই করি।”
মেহরিন কথাই বললো না আর। এই রেজাল্ট যদি তার বাপ দেখতো তাহলে মেহরিন লজ্জায় দুদিন না খেয়ে থাকতো হয়তো।
দু’দিন পর রুমাইসা আর মেহরিন কে নিয়ে সোলেমান শপিং মলে আসলো। মেহরিন আর রুমাইসা নওগাঁ চলে যাবে। আফিয়া সুলতান পাঠাতে বলছে। টুকটাক শপিং শেষ করে ফেরার পথে ঝুম বৃষ্টি হলো। রুমাইসার এই ঠাডা পড়া গরমে এমন ঝুম বৃষ্টি দেখে ভেজার ইচ্ছে হলো। সেজন্য ভাই কে বলল-
“ ভাই গাড়ি থামাও। আমি ভিজবো। ”
সোলেমান না করলো। ঠান্ডা লেগে যাবে ভিজলে। কিন্তু রুমাইসা কি সে কথা শোনার মানুষ নাকি? সে বকবক করে করে সোলেমান কে রাজি করালো। এখন সে একা ভিজবে না। মেহরিন যেহেতু ভিজতে পারবে না তাই রুমাইসা এখন ভাইকে নিয়েই ভিজবে। সোলেমান আর ফেলতে পারলো না বোনের কথা। গাড়ি এক সাইডে দাঁড় করিয়ে বোনের সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলো। মেহরিন গাড়ির ভেতর থেকে দু ভাই বোনের বৃষ্টি বিলাস দেখলো। রুমাইসা লাফিয়ে লাফিয়ে ভিজছে। আর সোলেমান বোনের খুনসুটি দেখছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আর হাসছে। পাগলি টার যখন বিয়ে হয়ে যাবে তখন এসব বায়না আর তাকে করবে না। স্বামী করবে। তার স্বামী কি তার বোন কে অবহেলা করবে? সোলেমান মেরেই ফেলবে তার বোন কে অবহেলা করলে।
রুমাইসা ভিজতে ভিজতে চটপটির দোকানে গেলো ভাইকে নিয়ে। সোলেমান নিজে খাবে না। কিন্তু গাড়িতে বউ আছে। বউয়ের জন্য এক প্লেট নিয়ে গেলো। রুমাইসা এখন একা একা খাচ্ছে।
তেহরান ভার্সিটি শেষে বাড়ি ফেরার পথে বৃষ্টির কবলে পড়েছিলো। ভিজে যাওয়ায় ভিজে ভিজেই বাড়ি ফিরছিলো বন্ধু দের সাথে। হুট করে রুমাইসা কে ভেজা শরীরে ফুসকা খেতে দেখে এগিয়ে গেলো। লম্বা করে সালাম টেনে নিজের উপস্থিতি জানান দিলো। রুমাইসা বিরক্ত হলো। এটার সাথেই শুধু দেখা হয় বারবার। বেয়াইন বেয়াইন বলে মাথা খাবে।
রুমাইসা একটা ফুসকা তেহরানের গালে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল-
“ চুপচাপ ফুচকা খান, বেয়াইন বেয়াইন বলে আমার মাথা না খেয়ে। ”
তেহরান হকচকিয়ে গেলো।
“ তাহলে কি বলে আপনার মাথা খাব বলে দিন।”
“ কিছুই বলতে হবে না। আপনি খান, আমি বরং গেলাম। পর পুরুষের সাথে কথা বলি না। ”
তেহরান সে কথা শুনে মুখ ভেঙালো। বিরবির করে বলল-
“ এ্যাহ আসছে পর পুরুষের সাথে কথা বলে না। আরেক দিক দিয়ে ম্যাডাম যে আরেক পর পুরুষের সাথে সংসার বেঁধে ফেলছে না দেখেই। তার বেলায় কিছু না।”
রুমাইসা হেলতে দুলতে হাঁটতে হাঁটতে আকস্মিক বৃষ্টির পানিতে পা পিছলে পড়ে যেতে নিলে একটা হাত এসে ধরে ফেলো। রুমাইসা ভেবেছিলো তেহরান হয়তো এটা। সেজন্য ধন্যবাদ বলার জন্য পেছন ফিরতেই অচেনা এক পুরুষ কে দেখে হকচকিয়ে গেলো। সুঠাম দেহের অধিকার। দেখতে সুন্দরই। বৃষ্টির পানিতে পুরো শরীর ভেজা। সাদা শার্ট টা ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। লোকটা রুমাইসা কে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বলল-
“ দেখে শুনো হাঁটাহাটি করো ইডিয়েট। ”
তারপর চলে গেলো। রুমাইসা হকচকিয়ে গেলো। ইডিয়েট বললো তাকে! কত বড় সাহস! আপনি ইডিয়েট। আপনার চৌদ্দ গুষ্টি ইডিয়েট।
দূর থেকে তেহরান দেখলো দৃশ্য টা। চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। হাতে থাকা ফুচকার প্লেট টা ফেলে দিয়ে বাসার দিকে হাঁটা দিলো।
রুমাইসা আর মেহরিন রা নিবাসে চলে আসে। রুমাইসা রুমে এসে ভেজা জামাকাপড় পাল্টে ওয়াইফ অন করতেই তূর্নর মেসেজ আসে। সে একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। রুমাইসা ভিডিওটা অন করতেই দেখলো তূর্নর আলমারি ভরা শাড়ি আর শাড়ি। সেই সাথে ভয়েস এড করা।
“ তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার আজ ১২ মাস। প্রতি মাসে আমি মাস গুনেছি তোমার নামে শাড়ি কিনে। আশা করি সব পছন্দ হবে। বিয়ের পর এগুলোর দাবীদার একমাত্র তুমি। ”
রুমাইসা লজ্জায় লাল নীল হয়ে গেলো। ছোট্ট করে মেসেজ পাঠালো –
“ কাল আমি নওগাঁ চলে যাচ্ছি।”
সেন্ট হলো কেবল। একটু পর সোলেমান আসলো। একটু পার্সোনাল কথাবার্তা বলতে চায় সে রুমাইসার সাথে। রুমাইসা নির্দ্বিধায় বলতে বললো। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ ডক্টর অয়ন কে তোর কেমন লাগে?”
আচমকা ডক্টর অয়নের নাম শুনে ভ্রু কুঁচকালো।
“ ভালোই লাগে ভাইয়া। খারাপ কিছু তো দেখি নি।”
“ অনেকটা তো বড় হয়েছিস। পছন্দের কেউ আছে? ”
“ হুট করে এসব জিজ্ঞেস করছো যে?”
“ বিয়ে ঠিক করার আগে এসব জিজ্ঞেস করে নিব না?”
রুমাইসা চমকে উঠলো।
“ বিয়ে! ”
“ অবাক হচ্ছিা কেনো? ডক্টর অয়নের সাথে ঠিক করতে চাচ্ছি। আপত্তি আছে কোনো?”
“ অবশ্যই আছে আপত্তি। আমি একজন কে ভালোবাসি ভাই।”
সোলেমানের সটান হওয়া কপালে দু ভাজ পড়লো।
“ কাকে ভালোবাসিস তুই?”
“ তূর্ণ কে। ”
“ কে এই তূর্ণ?”
“ চিনি না। ”
“ হোয়াট! চিনিস না আবার বলছিস ভালোবাসিস! কিভাবে পরিচয় হলো?”
রুমাইসা হাত কচলাতে কচলাতে বলল-
“ ফেসবুকে। ব্লগার ও। তুমি হয়তো চিনবে। TAT নামের পেজের মালিক। ”
সোলেমান হয়তো দেখেছিল পেজ টা। ফিড ঘাটার সময় হয়তো এসেছিল। আর রুমাইসার রিয়াক্টও শো করেছিল।
“ ঐ ছেলেও তোকে ভালোবাসে?”
“ হুমম। বাট সামনে আসছে না কেনো জানি।”
ফ্রট নয় তো! সোলেমান চুপচাপ বের হয়ে গেলো রুম থেকে। তারপর ফোন টা বের করে এজওয়ান কে কল করে বলল TAT পেজের ওনার কে আসলে। সেটা যেন খুঁজে বের করে।
সোলেমান চলে যেতেই রুমাইসা তূর্ণ কে ফোন করলো। ফোন ঢুকছে না। সেজন্য মেসেজ পাঠালো যে তার বাড়িতে তার বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। তূর্ণ যেন তার বাপ ভাইদের সাথে কথা বলে। কথা না বললে তার বাপ ভাই যেখানে বিয়ে দিয়ে দিবে। রুমাইসা সেখানেই বিয়ে করে ফেলবে বিনাবাক্যে।
রুমাইসা আর মেহরিন নওগাঁ চলে যাবে শুনে বাতাসির মন টা ভার হয়ে গেলো। সে একা একা এই নিবাসে থাকবে! কিন্তু পরক্ষণেই যখন রুমাইসা জানালো বাতাসি কেও নিয়ে যাওয়া হবে তখন ওর খুশি দেখে কে। জামাকাপড় গুছাতে শুরু করলো। ইয়াসিন দরজার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাতাসি কে জামাকাপড় গোছাতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। দরজায় হাত ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
“ মেহরিন আপুদের সাথে। উনাদের বাড়িতে। ”
“ আমাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলে একবারও?”
বাতাসি এবার পেছন ফিরলো।
“ আপনাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে কেনো আমার? ”
“ তে জিজ্ঞেস করতে হবে না? আমি এখনও তোমার…. ”
“ স্বামী বলতে চাইছেন? বাট আপনি তো আমাকে বউ হিসেবে মানেন না। তাহলে আমি কোথাও যাই বা না যাই তাতে তো আপনার কোনো অসুবিধে হবার কথা না। ”
“ হ্যাঁ মানি না। তাই বলে কি তোমাকে ফেলে দিয়েছি আমি? আমার একটা রেসপনসেবলিটি আছে না?”
“ সেটার থেকেও আজ থেকে আপনাকে মুক্ত করে দিলাম। আপনার আর দায়িত্ব পালন করতে হবে না। ”
ইয়াসিনের রাগ হলো। কি হয়েছে কি এই মেয়ের? এমন চ্যাটাং চ্যাটাং কথা কেনো বলছে? ইয়াসিন বাতাসির কব্জি শক্ত করে চেপে ধরে বলল-
“ এই এতো চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলা কোথা থেকে শিখেছো? এতো দেমাগ কাকে দেখাচ্ছো তুমি? কি এমন আছে তোমার মাঝে যেটার জন্য তোমার এত দেমাগ? ”
বাতাসি ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো।
“ লাগছে আমার। ”
যদিও ইয়াসিন ব্যথা পাওয়ার জন্য ওভাবে ধরতে চায় নি। হাত ছেড়ে দিয়ে বলল-
“ জবাব দাও আগে।”
“ জবাব তো দিলামই। আপনি আমার বিষয়ে আর কথা বলবেন না। আপনি আপনার মতন থাকুন। আর আমি আমার মতো। ”
“ ডিভোর্স না দেওয়া অব্দি কি করে আমার মতন আমি থাকি? ”
“ তাড়াতাড়ি দিয়ে দিন। আমি অপেক্ষা করছি তারজন্য। ডিভোর্স দিয়ে হুর পরী বিয়ে করুন গিয়ে। ”
“ করবোই তে। ”
“ হু করুন। ”
“ রূপ নেই অথচ চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। ”
“ ভাগ্যিস রূপ নেই। রূপ থাকলে বোধহয় আপনার মতই কুৎসিত একটা হৃদয় আমার হতো। আল্লাহ আপনাকে রূপ দিলেও সুন্দর এলটা হৃদয় দেয় নি। যেটা আমাকে দেওয়া হয়েছে। ”
ইয়াসিন রাগে ফুঁসত ফুঁসত বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। বাতাসির এমন পরিবর্তন মোটেও মেনে নেওয়ার মতো না । এমন ভাবে কথা বলে মনে হয় ইয়াসিন তার জীবনের কাটা। উপড়ে ফেলতে পারলেই বাঁচে। অথচ এই কথা তো বলে ইয়াসিন।
দুপুরের দিকে তানজিলা বেগম ছেলেকে রেগেমেগে ভিজে বাড়িতে ফিরতে দেখেছিল। এখন রাতেও তেমনই রাগ জমে আছে চোখ মুখে। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো-
“ এমন বোম হয়ে আছিস কেনো? কি হয়েছে?”
তেহরান সোফায় বসে টিভি অন করতে করতে বলল-
“ বয়স হচ্ছে আমার মা। এবার তো সিরিয়াস হও। বিয়ে শাদি দাও আমাকে। নিজ থেকে না বললে তো দেখছি তোমরা জীবনেও আমার বিয়ে দিবে না। এখন তো মাস্টার্স টাও শেষ আমার।”
“ আচ্ছা ঘটক কে বলবো মেয়ে দেখতে। ”
“ ঘটককে বলতে হবে কেনো? আমার একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছে।”
“ কোথাকার মেয়ে পছন্দ করে বসে আছিস তুই?”
“ মেহরিনের ননদ টা কে। ”
“ কিহ! মাথা খারাপ নাকি তোর? এমপির বোন কে পছন্দ হয়েছে! ও বাড়ি থেকে কি দিবে বিয়ে তোর মতো অকালকুষ্মাণ্ডের হাতে?”
“ ইনসাল্ট করছো আমাকে মা। মেহরিন কে দিয়ে আগে বলাও। রাজি হবে দেখো। ”
“ তোর বাপ আসুক আগে। তোর বাপের সাথে পরামর্শ করে নেই। ”
আকস্মিক তানভীর এসে বলল-
“ ভাইয়া তোমার একটা পার্সেল এসেছে নিচে। ”
তেহরান নিচে গিয়ে পার্সেল টা রিসিভ করে উপরে আসতেই তানজিলা বেগম জিজ্ঞেস করলো-
“ কি আছে এতে?”
তেহরান জবাব না দিয়ে রুমে এসে পার্সেল টা খুললো। পার্সেল খুলতেই একটা আকাশী রঙের শাড়ি বের করে আলমারিতে উঠিয়ে রাখলো।
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে এজওয়ান আর মাহি অস্ট্রেলিয়ায় আসে। বিমানবন্দরের ক্লান্তি পেরিয়ে এজওয়ান সরাসরি মাহিকে নিয়ে ওঠে তার নিজের বাড়িতে। যেটা ফিটজরয় এলাকায়। এখান থেকে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব মাত্র ১০–১৫ মিনিট।
পুরো একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি এজওয়ানের। আশেপাশে দু–তিনটা একতলা বাড়ি আছে বটে, কিন্তু সেগুলোও খানিকটা দূরে দূরে,ফলে চারপাশে এক ধরনের নিরিবিলি প্রশান্তি।
মাহির এই শহরে আসা হয়নি কখনও। সে থেকেছে সিডনিতে। তাই মেলবোর্নের আবহ, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর সবকিছুই তার কাছে নতুন।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই মাহি থমকে দাঁড়ায়। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যায়। এত সুন্দর, এত গুছানো, এত পরিপাটি! দেয়ালে মিনিমাল আর্ট, নরম আলোয় ভরা লিভিং রুম, কাঁচের বড় জানালা দিয়ে ভেসে আসা বিকেলের আলো সব মিলিয়ে বাড়িটা পুরো সৌখিনতায় মোড়া।
এই ছোট্ট ডুপ্লেক্সে কী নেই? নিচতলায় ওপেন কিচেন, মার্বেল টপ আইল্যান্ড কাউন্টার, পাশে ডাইনিং স্পেস। আলাদা জিম রুম, ট্রেডমিল, ডাম্বেল, ওয়াল-মাউন্টেড মিরর। বাহিরে ও ছাঁদে দুটো সুইমিংপুল। উপরে দুটো বেডরুম, একটি স্টাডি রুম। বুকশেলফে সাজানো বই,ফাইল, আর দেয়ালে কাগজে নিখুঁতভাবে রাখা হাতে লেখা নোট। কখন কোন কাজ করে এজওয়ান তা সব লেখা। বারান্দায় ছোট্ট বসার জায়গা, টবে লাগানো ল্যাভেন্ডার আর সাকুলেন্ট গাছ।
মাহির ভীষণ পছন হলো এই বাড়ি। এজওয়ান ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে যেতেই বাহির থেকে কলিং বেল বেজে উঠে। মাহি গিয়ে দরজা খুলতেই একটা লোক একটা খাম দিয়ে চলে যায়। মাহি খুলে দেখে তাতে লেখা।
দাহশয্যা পর্ব ৮৮ (৩)
Mr. & Mrs. Ajwan
You are invited to the Australian of the Year Awards Ceremony at Melbourne University.
(Date: Tomorrow. 7pm)
