Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯২ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯২ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯২ (৩)
Raiha Zubair Ripti

আগুন নেভার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে যেটুকু উদ্ধার করা গেল, তা কোনো মানুষের দেহ বলার মতো ছিল না। জ্বলে যাওয়া, বিকৃত, প্রায় চেনার অযোগ্য। ডেনমার্ক পুলিশের ফরেনসিক ইউনিট দেহগুলো নিয়ে যায় কোপেনহেগেন এর মেডিক্যাল এক্সামিনেশন সেন্টারে। সেখানে শুরু হয় শনাক্তকরণের কঠিন কাজ। প্রথমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট,অসম্ভব। চামড়া পুড়ে গেছে। মুখ নেই। ডেন্টাল রেকর্ড আংশিক মেলে, কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার মতো না। শেষ ভরসা ডিএনএ।
ইব্রাহিমকে ডাকা হয়। সোলেমানের ব্যবহৃত ব্রাশ দেওয়া হয়। রিপোর্ট আসতে সময় লাগে। আর সেই সময়টুকু ইব্রাহিমের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা…তারপর রিপোর্ট আসে, ম্যাচ। ১০০ শতাংশ নিশ্চিতভাবে ম্যাচ করেছে ডিএনএ একটা লাশের সাথে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় প্রমাণিত এখন ওটাই সোলেমান।
ইব্রাহিমের ভেতরটা যেন ভেঙে পড়ে। তার বুক থেকে শব্দ বের হয় না। শুধু নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। সে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ে। বিরবির করে ঠোঁটের কোনে আওড়ায়-

“শেষ পর্যন্ত… তোকে খুঁজেই পেলাম…কিন্তু তোকে এভাবে পাওয়ার জন্য কি খুঁজছিলাম আমি, ভাই আমার? তুই তো বলেছিলি… ফিরবি…কিন্তু এ তোর কেমন ফেরা ভাই! ”
ইব্রাহিম দেয়ালে হাত মারে। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে অবিরাম। তার কণ্ঠ ভেঙে আসে।
বাশার সুলতানকে যখন দেহটা দেখানো হয়,তিনি প্রথমে এগোতেই পারেন না। তার পা কাঁপে।
জীবনে অসংখ্য মৃত্যু দেখেছেন তিনি কিন্তু এই মৃত্যু…তার ছেলে সমতুল্য ভাইয়ের ছেলে..তার মৃত্যু কি ভাবে সামলাবে! নিজের ছেলের থেকেও বেশি সময় সে থেকেছে সোলেমানের সাথে। ছেলের মতো মানুষ করেছে। সেই ছেলেটার মৃ’ত দেহ তার সামনে! সামনে রাখা স্টিলের ট্রের ওপর সাদা কাপড় ঢাকা দেহ। ডাক্তার কাপড়টা সামান্য সরায়। কালো… পুড়ে যাওয়া… বিকৃত…বাশার সুলতান হঠাৎ পিছিয়ে যান।

“না…এটা আমার ছেলে না…”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তিনি হাঁটু ভেঙে বসে পড়েন।
দুই হাত বাড়িয়ে দেন,কাঁপা কাঁপা আঙুল দিয়ে ছুঁতে চান সেই পোড়া দেহ।
“সোলেমান…বাপ আমার… তোকে আমি এভাবে হারালাম! ভাইজান ভাবির কাছে কি জবাব দিব আমি! ”
লাশ শনাক্তকরণ করার পর বাংলাদেশে সোলেমানের দেহটা নিয়ে যাওয়ার কথা ওঠে। অনেক প্রসেসিং এর বিষয় উঠে। সম্ভাবনা খুবই কম। দেহের অবস্থা এতটাই খারাপ যে এম্বালমিং সম্ভব হয়নি। কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখিয়ে দেশে পাঠাতে নিরুৎসাহিত করেছে। ইব্রাহিম তোয়াক্কা করলো না দেশের আইন কে। তারা তাদের প্রাইভেট জেটে করে নিয়ে যাবে। কে আটকাবে তাঁদের? মেহরিন,আফিয়া সুলতান,এজওয়ান,আমিরুল,আনোয়ার সুলতান দেখবে না তাদের সোলেমান কে?
ইব্রাহিম যায় কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে। কথা বলতে বলতে আকস্মিক তার মেবাইল ফোনে একটা ফোনকল আসে। অচেনা নম্বর। রিসিভ করে কানে নিতেই পুরে শরীর জমে ঠান্ডা হয়ে যায়! কাঁপা কাঁপা গলায় শুধু জিজ্ঞেস করে –

“ কোথায়…!”
তারপর ইব্রাহিম চলে যায়।
বাংলাদেশে খবর পাঠানো হয়ে গেছে সোলেমান আর পৃথিবীতে নেই। ডিএনএ ম্যাচ করেছে। তারা লা’শ বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। সবাই এই নিউজ টা শুনে থ হয়ে যায়। আফিয়া সুলতান হাসপাতালেই ব্রেইন স্টোক করে। একদিকে মেহরিন আরেকদিকে আফিয়া সুলতান, অন্য দিকে সোলেমানের মৃত্যুর খবর। আরেক দিকে মাহি। যদিও মাহির বিষয় টা এজওয়ান ইব্রাহিম ছাড়া কেউ জানে না। একটা মানুষের পক্ষে কতদিকে ছোটা যায়! কেউ আফিয়া সুলতান কে নিয়ে দৌড়া দৌড়ি করলো কেউ মেহরিনের কাছে থাকলো।

ইতি বেগমের থেকে ইমন সোলেমানের মৃত্যুর খবর শুনেছে। সাথে সাথে সে থমকে যায়। কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকে। মুখ থেকে ইন্না-লিল্লাহ বেরিয়ে আসে। মেহরিনের কি অবস্থা জিজ্ঞেস করলে জানায় মেয়েটা হার্ট অ্যাটাক করে হসপিটালে ভর্তি। ইমনের বুক অসার হয়ে আসে কথাটা শুনে। মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা, তার উপর স্বামীর এমন খবর শুনে হসপিটালে ভর্তি! অথচ যেই স্বামীর জন্য তার এত ভালোবাসা,সেই স্বামী যে জঘন্য একটা মানুষ। ইমনের স্মৃতি পটে হয়তো শয়তানের আবির্ভাব হলো। কেনো যেন মনে হলো এই বুঝি খোদা মেহরিন কে পাওয়ার একটা সুযোগ দিলেন। পরক্ষণেই নিজের ভাবনা কে নিজেই সে ধিক্কার জানালো। কারো মৃত্যুর খবর শুনে এটা কি করে ভাবলো ইমন! ইমন আজ কালের ভেতরে মহাদেবপুর আসবে জানালো।
বাশার সুলতান দেহ দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য সব কিছু ঠিক করলে ইব্রাহিমের ফোন আসে। বাশার সুলতান রিসিভ করে জিজ্ঞেস করে-

“ কোথায় তুই? আমার উপর সবটা একা ফেলে কোথায় চলে গেলি? ”
“ চাচা,সোলেমানের দেহটা দেশে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। ”
বাশার সুলতান চমকালো। এই ছেলেটাই তো এতক্ষণ লাশ নিয়ে যাবে বলে চেঁচামেচি করলো। এখন কি হলো আবার?
“ কেনো?”
“ চাচি,মেহরিন অ্যাটাক করে হসপিটালে ভর্তি হয়েছে সোলেমানের মৃত্যুর খবর শুনে। এখন এই পুড়ে যাওয়া দেহ নিয়ে গেলে ওদের কি বাঁচানো সম্ভব হবে বলেন? দাফনের কাজ এখানেই সমাপ্ত করুন। ”
” ভাইজান ভাবি মেহরিন সোলেমান কে দেখবে না তাহলে শেষবার?”
“ দেখার জন্য কিছু আছে চাচা সোলেমানের সাথে? নেই তো। একটা পুড়ে যাওয়া হাড়গোড় দেখা কতটা কষ্টের জানেন? মেহরিন, চাচি সামলাতে পারবে না নিজেদের। ”

“ কিন্তু….”
“ এটাই ভালো হবে চাচা। ”
“ ঠিক আছে। তাহলে তাড়াতাড়ি আয়। জানাজা আর দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে এখানে। ”
“ আপনি করুন। আমি একটু পুলিশ স্টেশনে আছি। জানাজার আগেই ফিরবো। ”
বাশার সুলতান তাদের লোক দিয়ে কোপেনহেগেনের এক মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারে সোলেমানের জানাজার আয়োজন করা হয় ।এদিকে জানাজা হয়ে যায় কিন্তু ইব্রাহিম আসে না। বাশার সুলতান অবাক হয়। জানাজা শেষে ইব্রাহিম আসে। বাশার সুলতান জিজ্ঞেস করে-

“ এত দেরি হলো কেনো?”
“ স্টেশনে পুলিশ দের সাথে কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেলো। সোলেমানের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের তো ধরতে হবে। ”
জানাজা শেষে কোপেনহেগেনের মুসলিম কবরস্থানে সোলেমানের কবর দেওয়া হয়। কবর দেওয়া শেষে ইব্রাহিম বাশার সুলতান কে বলে-
“ চাচা আপনি এখন দেশে চলে যান। আমার ডেনমার্কে থাকা লাগবে। ”
বাশার সুলতান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে –
“ কি জন্য? ”
“ সোলেমানের খুনি দের ধরতে হবে না? আমি কি ওদের ছেড়ে দিব? জঘন্যতম মৃত্যু উপহার দিব। আপনি দেশে ফিরে চাচা চাচি মেহরিন কে সামলান। আমি এদিকটা সামলাচ্ছি। ”
বাশার সুলতান কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে পরে রাজি হলো। বাশার সুলতান চলে গেলো। ইব্রাহিম আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশান্তির সহিত হেঁসে বলে-
“ থ্যাংক ইয়্যু সো মাচ আপনাকে সৃষ্টি কর্তা…. থ্যাংক ইয়্যু সো মাচ….”

হাসপাতালের কেবিনটা নিস্তব্ধ। শুধু মনিটরের বিপ… বিপ… শব্দটা মাঝেমধ্যে নীরবতাকে কেটে দিচ্ছে। সাদা বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে মেহরিন। মুখটা ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকনো… চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ।
তিন দিন। পুরো তিনটা দিন সে এইভাবেই অচেতন ছিল। নিঃশ্বাস চলছে ঠিকই, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছিলো যেন কোনো মৃত মানুষ শুয়ে আছে।
চতুর্থ দিনের ভোরে, জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হালকা রোদ এসে পড়লো তার মুখে। চোখের পাতায় কাঁপন ধরলো। ধীরে ধীরে আঙুল নড়লো… তারপর একসময় ভারী চোখ দুটো খুলে গেলো।
প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছিল না মেহরিন। ঝাপসা দৃষ্টি, মাথা ভারী… চারপাশে ডাক্তার, নার্স, তার মা,বাবা সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে।

“মেহরিন… মা আমার… শুনতে পাচ্ছো বাবার কথা?” কাঁপা গলায় ডেকে উঠলো মেহরিন কে মোতালেব ভুঁইয়া ।
মেহরিনের চোখে হালকা পানি জমলো। ঠোঁট কাঁপলো… শব্দ বের হতে চাইছে, কিন্তু আঁটকে যাচ্ছে। মাথাটা, বুকটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। হঠাৎই যেন সব মনে পড়ে গেল। একটা ঝটকা খেলো তার বুকের ভেতর।
মেহরিন হঠাৎ উঠে বসতে চাইল। কিন্তু শরীর সায় দিলো না। অস্থির গলায় বলল-
“ উ…উনি কোথায়…? আমার… আমার স্বামী…?”
কেউ উত্তর দিল না। মুখ চেপে চোখ জল গড়াচ্ছে সবার। এই নীরবতাটাই যেন তার বুক চিরে দিল।
“ আব্বা,চুপ কেনো তুমি? বলো না…! উনি তো আসবে বলছিল… এই সপ্তাহেই… বলছিল না…?”
মেহরিনের কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে, নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে। মোতালেব ভুঁইয়া মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল-
“ আম্মা শান্ত হও। শান্ত হও তুমি। তোমার শরীর ভালো না। ডাক্তার উত্তেজিত হতে মানা করছে। ”
মেহরিন শুনলো না।
“ তুমি আগে বলো আব্বু চাচা যা বলছে সব মিথ্যা বলছে। উনার কিছু হয় নাই। উনি সুস্থ আছে। বলো আব্বু বলো। ”

মোতালেব ভুঁইয়ার চোখ গাড়ি জল গড়ালো। কি বলে স্বান্তনা দিবে মেয়েকে? তারা নিজেরাও পেয়েছে এই খবর টা সেদিন। আফিয়া সুলতান ব্রেণ স্টোক করে হসপিটালে ভর্তি। পরপর দুই ছেলে মেয়ের মৃত্যু কোন মা-ই বা সহ্য করতে পারে? আমিরুল সুলতান আর আনোয়ার সুলতান সেখানে। বাশার সুলতান দেশে আসছেন। এখনো পৌঁছায় নি দেশে। আর ইব্রাহিম ডেনমার্কে। সোলেমানের লা’শ শনাক্ত করা হয়েছে। শরীর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বাংলাদেশে আনা সম্ভব নয়। এই লা’শ দেখার মতো না। সেজন্য ডেনমার্কেই দাফনের কাজ সম্পাদন করা হয়েছে।
তার মেয়েটার বয়সই বা কত? ১৯ বছর বয়স। বিয়ের এখনো দু বছরও হয় নি। কদিন পর তার ঘর আলো করে সন্তান আসার কথা। কত সুখের সংসার ছিলো তার মেয়েটার। অথচ এক নিমিষেই তা কি থেকে কি হয়ে গেল! স্বামী হারা হয়ে গেল তার মেয়েটা। সেই শোক সহ্য করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাক করে তিনদিন হসপিটালে ভর্তি ছিলো।
জীবন এতটাও দুর্গম! তার মেয়ের সাথে এমনটা করতে পারলো! তার কলিজার টুকরাকে এখন সামলাবে কি করে সে?
মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের মাথায় হা বুলিয়ে বললেন-

“ সত্য কঠিন হলেও মেনে নিতে হবে মা। সোলেমান বাবা আর….”
পরের মুহূর্তেই মেহরিন চিৎকার করে কেঁদে উঠলো-
“ না-আ-আ…! এটা মিথ্যা! মিথ্যা কথা বলছো তোমরা…! উনি আমাকে ফেলে যেতে পারে না… উনি কথা দিয়েছিল…! উনি আসবে… আমার কাছে আসবে…!”
মেহরিন এবার দুই হাত পেটের ওপর শক্ত করে চেপে ধরলো –
“দেখো… তোমার আব্বু আসবে… না? বলো… আসবে না? উনি তো আমাদের রেখে যেতে পারে না… তোমার আব্বু তো বলেছিল আমাদের কাছে ফিরে আসবে। বলেনি বলো? বলেছিল তো। তাহলে কেনো তোমার বাবা আসছে না? কেনো সবাই এসব উল্টাপাল্টা কথা বলছে ! ওরা কি জানে না তোমার বাবা তোমাকে আর আমাকে ছেড়ে থাকতে পারে না। তুমি আসতে বলো না তোমার বাবা কে। মায়ের কষ্ট হচ্ছে। তোমার কষ্ট হচ্ছে। আমাদের কষ্ট তোমার বাবা সহ্য করতে পারে না। ”

মেহরিনের কান্না থামছিল না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, বুকটা ধড়ফড় করছিল। চোখ দিয়ে টানা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
“আল্লাহ…! আমায় এভাবে ভেঙে দিও না… উনাকে ফিরিয়ে দাও আমার কাছে আল্লাহ…! তুমি পারো না এমন কোনো কাজ নেই খোদা, রহম করো একটু। আমার আর আমার সন্তানের উপর। ”
মেহরিনের কণ্ঠে আর্তনাদ, বুক ফাটা হাহাকার।হাসপাতালের সেই কক্ষটা কান্নার শব্দে ভারী হয়ে উঠলো। বাতাসি কাঁদছে। সাড়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ঊর্মিও কাঁদছে। তিনটা দিন ধরে সে-ও হাসপাতালে।
মেহরিন একসময় ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে বিছানায় ঢলে পড়লো, তবুও তার ঠোঁট কাঁপছিলো। বারবার বলছিলো-
“ আপনি বলেছিলেন… আমাকে একা রাখবেন না… তাহলে এখন কোথায় গেলেন…ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনি। আমি আপনার সব অপেক্ষা মেনে নিব। তারপরও ফিরে আসুন দয়া করে।”
চোখের কোণ বেয়ে ধীরে ধীরে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো আবার। কিন্তু এবার অচেতনতার জন্য না। অসহ্য ব্যথা আর ক্লান্তিতে।

রাস্তায় চলন্ত গাড়ির ভেতর এজওয়ানের সারা শরীর কাঁপছে। ভয়ংকর ভাবে কাঁপছে। একদিকে প্রিয়তমা আরেক দিকে বাপ সমতুল্য বড় ভাইয়ের মৃত্যুর খবর তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে। মেহরিন যে হার্ট অ্যাটাক করেছে সে খবর কানে আসে নি। কানে আসলে হয়তো আরো দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধতো মস্তিষ্কে ভাবি আর ভাবির অনাগত বাচ্চা কে নিয়ে। এজওয়ান ব্লু মাউন্টেইনস অঞ্চল টায় যাওয়ার পথে কমপক্ষে ৫ বার গাড়ি থামিয়েছে। তার পক্ষে একা যাওয়া সম্ভব না। কোনো মতেই সম্ভব না। এজওয়ান নিজের মধ্যে নেই। তার মাথায় হাজারও চিন্তা ভয় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার কোনো ভুল পদক্ষেপের কারনে মাহিকে সাফার করতে হতে পারে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। ডানকান লুইস কে ফোন করে বলল-
“ আই ওয়ান্ট ওয়ান হান্ড্রেড পুলিশ অফিসার্স রাইট নাউ। ইট্‌স অ্যান ইমার্জেন্সি। সেন্ড দেম হিয়ার। ”
এজওয়ান লোকেশন পাঠিয়ে দিলো।
রাতটা যেন আজ ইচ্ছে করেই আরও কালো হয়ে নেমেছে। ব্লু মাউন্টেইনস পেরিয়ে লিথগো এর নির্জন সড়কগুলোতে এখন শুধু সাইরেনের প্রতিধ্বনি। একটার পর একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামছে। হেডলাইটগুলো অন্ধকার চিরে আলো ফেলছে ঝোপঝাড়, ভাঙা ঘর, জঙ্গলের গভীরে। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছে অফিসাররা। এজওয়ান দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে। চোখ লাল, চোয়াল শক্ত। হাত কাঁপছে, কিন্তু কণ্ঠ না।
New South Wales Police Force-এর অফিসাররা দ্রুত ঘিরে ফেললো পুরো এলাকা।
রেডিওতে নির্দেশ ভেসে উঠছে-

“Team Alpha,north ridge cover করো। Team Bravo, old warehouse sweep করো। কেউ যেন জঙ্গলের বাইরে বের হতে না পারে।”
এজওয়ান এগিয়ে এলো। চোখ দুটো অসম্ভব লাল।
“লাইভ অবস্থায় খোঁজা চাই তাকে… যেভাবেই হোক।”
ঘন জঙ্গল। ভেজা মাটি। পায়ের নিচে শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ। টর্চের আলো অন্ধকার ভেদ করে এগোচ্ছে। অফিসাররা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। কেউ ঝোপ সরাচ্ছে, কেউ পুরোনো কাঠের ঘর চেক করছে,কেউ পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচে নামছে। আর প্রতিবার ভেসে আসছে-
“Clear! Negative! Nothing here!”
প্রতিটা শব্দ এজওয়ানের বুকের ভেতর ধাক্কা মারছে। সে নিজেও থেমে নেই। পাগলের মতো খুঁজছে জঙ্গলের আনাচে-কানাচে।
অন্যদিকে,ঘন ঝোপের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় মাহি। নিঃশ্বাস ভারী, গলা শুকিয়ে কাঠ। পায়ের নিচে কাঁটা বিঁধছে, কাপড় ছিঁড়ে গেছে কয়েক জায়গায়।মাহির শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। পা কাঁপছে, তবু থামার উপায় নেই। মাহি দৌড়াচ্ছে। জঙ্গলের ভেতর, অন্ধকারের ভেতর, মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে। পেছনে ভারী বুটের শব্দ। লোকগুলো থেমে নেই। মাহি কে ধরার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। ভেসে আসে কিছুক্ষণ পরপর ভারী গলা-

“ওইদিকে গেছে! ধর! পালাতে পারবে না!”
মাহির ঠোঁট ফেটে গেছে। হাতের কাটা জায়গা থেকে রক্ত জমে শক্ত হয়ে আছে। একবার অন্ধকারে পা হড়কে পড়ে গেলো সে।
মাটি ছুঁয়ে আবার উঠে দাঁড়ালো। দাঁত চেপে নিজেকে বলল-
“আর একটু মাহি… আর একটু…”
এজওয়ান এবার মাইক দিয়ে মাহিকে ডাকতে লাগলো মাহিকে-
“ মাহি! তরিকুলের বেটি তুমি যেখানে আছো… আওয়াজ দাও! আমি এসে গেছি! ভয় পেও না,আমি আছি,তুমি জাস্ট একবার নিজের উপস্থিতির সিগন্যাল দাও!”
কণ্ঠটা পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো। সেই মুহূর্ত মাহি থেমে গেলো এক সেকেন্ডের জন্য। চোখ বড় হয়ে গেলো। এজওয়ানের গলা শুনলো মনে হলো না? মাহি একটু দাঁড়িয়ে ভালোভাবে শুনে দেখলো হ্যাঁ ওটা এজওয়ানই গলা।
মাহির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। চোখে পানি চলে এলো অজান্তেই। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না। ঝোপ সরিয়ে, কাঁটা উপেক্ষা করে দৌড়াতে লাগলো সেই আওয়াজের দিকে।
এজওয়ান সড়কের উপর উঠে এসে মাহিকে ডাকছে আর পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে এদিক ওদিক তাকিয়ে।
রাস্তার ধারে এসে হোঁচট খেতে খেতে বেরিয়ে এলো মাহি। অন্ধকার জঙ্গল পেরিয়ে সামনে দেখা গেলো অসংখ্য লাইট… পুলিশের গাড়ি… আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মানুষ…এজওয়ান।

“ এজওয়ান…!”
ভাঙা গলায় নিজের সর্বোচ্চ টা দিয়ে চিৎকার করে উঠলো মাহি। এজওয়ান সেই আওয়াজ শুনে সাথে সাথে পেছন ফিরে তাকালো। তার পৃথিবীর সমস্ত কিছু যেন থেমে গেলো মাহি নাকম রমণী টাকে দেখে। মুখে কিঞ্চিত স্বস্তির হাসি ফুটলো। বুকে হাত চেপে হাঁটু গেড়ে ভেঙে বসলো সড়কের উপর এজওয়ান। ফাইনালি তার তরিকুলের বেটিকে সে পেলো। এজওয়ান জোরে জোরে শ্বাস ফেলে উঠে মাহির দিকে এগোতে নিলে তার নজর যায় মাহির পেছনে। ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে কয়েকটা ছায়া।
হাতে বন্দুক। ট্রিগারে আঙুল। মাহির দিকে তাক করা বন্দুকের নল।
এজওয়ানের চোখ হঠাৎ রক্তিম হয়ে উঠলো। ভয়ে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
সে পুরো শক্তি দিয়ে দৌড়ে ছুটে আসতে আসতে চিৎকার করে বলে উঠলো-
“ এ্যাই! নো নো নো…ডোন্ট শ্যুট!! ডোন্ট শ্যুট হার….খবরদার… না.. বন্দুক নামা! নামা বন্দুক শু’য়োরের বাচ্চারা!! একটা বুলেট বের হলে কসম তোদের নিঃশ্বাস থামিয়ে দিব..!”

মাহি এজওয়ানের কথাগুলো শুনে থেমে দেখার জন্য পেছন ফিরে তাকালো। আর সাথে সাথে দুটো বুলেট এসে বিঁধলো মাহির বুক বরাবর। ঘটনা টা এত দ্রুত হলো যে মাহি সাথে সাথে কিছু বুঝলো না। তার শরীরটা একটা ঝাঁকুনি খেলো। চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেলো। বুকের মাঝখানে আগুনের মতো ব্যথা অনুভব হলো। পড়নের পোশাক রক্তে ভিজে যেতে লাগলো। হাত চলে গেলো সেই ক্ষত জায়গায়। দেখতে পেলো হাতে রক্ত। মাহি এবার সামনে তাকালো। দেখলো এজওয়ান ক্ষ্যাপা সিংহের মতো দৌড়ে আসছে। পুলিশ গুলোও একের পর এক বুলেট ছুড়ছে সেই লোকগুলোর উপর। ক’জন সাথে সাথে হয়তো মা-রা গেলো। আর কজন হয়তো আধমরা হয়ে রাস্তায় রইলো আর তা না হলে পালিয়ে গেলো।

দাহশয্যা পর্ব ৯২ (২)

মাহি আর নিজের শরীরে ভারসাম্য ধরে রাখতে পারলো না। ধীরে ধীরে শরীর ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো পিচঢালা রাস্তার উপর। চোখ বুঁজে আসার আগে অনুভব করলো এজওয়ান মাহির দেহটাকে আগলে নিয়েছিল শক্ত করে তার বুকের সাথে। গালে হাত রেখে অধৈর্য্যের মতো ডেকে চলছিল। অ্যাম্বুলেন্স, গাড়ি, ডক্টর বলে বলে চিৎকার করছিলো। মাহি আর মেলে রাখতে পারে নি চোখ। এজওয়ানের বুকের উপরই ঢলে পড়তেই বুঁজে ফেলে চোখ…..অথচ মাহি চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে চেয়েছিল। দেখতে চেয়েছিল আরো কিছুক্ষণ এজওয়ানের পাগলপনা, অস্থিরতা, তাকে বাঁচানোর সেই মরিয়া চেষ্টা…সবটা….সবটা সে দেখতে চেয়েছিল ভীষণ ভাবে…

দাহশয্যা পর্ব ৯৩

1 COMMENT

Comments are closed.