এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৭
নুসরাত ফারিয়া
-“আজ তুমি এত খুশি কেন ভাইয়া?”
ছোট বোনের কথা শুনে রাত ড্রাইভিং করতে করতে জবাব দিল, -“কারণ আজ তোর প্রেয়ারের বড় ভাইয়ের ডিভোর্স।”
কথাটা শুনে তিথি চমকে উঠল। অস্থির গলায় বলল,
-“এটা কী বলছো তুমি? ভাইয়ার ডিভোর্স মানে?”
-“এতে এত অবাক হচ্ছিস কেন? আমি তো দেশের বাইরে বসে থেকেও শিওর ছিলাম, তোর ভাইয়ের আজ হোক বা কাল, বিচ্ছেদ হবে মানে হবেই৷ বাট…এত তাড়াতাড়ি হবে সেটা বুঝতে পারিনি।”
-“তুমি এইভাবে বলছো কেন ভাইয়া? বড় ভাইয়া তো তোমারও ভাই হয়। তার জন্য কি একটুও খারাপ লাগছে না?”
-“না। লাগছে না খারাপ!”
-“তুমি ঠিক মায়ের মতো স্বার্থপর।”
-“তিথিইইই।”
রাত গর্জে উঠল। ভাইয়ের বাজখাঁই গলার ধমকে তিথির চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। বড় ভাইয়া কখনো তাকে ধমকানো তো দূরে থাক, একটা বোকাও দেয়না। অথচ এই মানুষটা তার নিজের মায়ের পেটের ভাই হয়েও তাকে হার্ট করে। এর পিছনেও অবশ্য কারণ আছে। কারণ সে বড় ভাইয়ের আদরের বোন তাই। আর সেও তার আধার ভাইকে ভীষণ ভালোবাসে। তাই তো তার ব্যাপারে খারাপ কিছু শুনতে পারে না। যেমনটা হলো এখন।
-“তোমাদের শরীরে একই বাপের র’ক্ত থাকলেও তোমরা ভীষণ আলাদা। বিশেষ করে তুমি।”
-“মুখ বন্ধ কর। নয়তো গাড়ি থেকে ফেলে দেবো।”
-“দাও না দাও! কে বাঁধা দিয়েছে।”
-“তিথি মাথা গরম করাস না।”
তিথি আর কিছু না বলে সিটে মাথা ঠেকিয়ে রাখল। সে আজ বাড়িতে যাচ্ছে। মূলত পরীক্ষা গতকাল শেষ হওয়ায় কিছুদিনের ছুটি পেয়েছে। তাই বাড়িতে ফিরছে। নিজের ভাইয়াকে দেখে যতটা না খুশি হয়েছিল, এখন তারচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে। উঁহু, এটা নিজের জন্য নয়। বরং তার বড় ভাইয়ার কথা ভেবে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। মানুষটা এই পর্যন্ত তাদের জন্য কি-না কী করেছে! এখনো করে যাচ্ছে। অথচ তার বেইমান মা-বাবা সবকিছু ভুলে গিয়ে দিব্যি স্বার্থপরের মতো জীবনযাপন করছে। অথচ তার বড় ভাই-টা মনের কষ্টে একটু একটু করে শেষ হচ্ছে। তিথির কেন জানি ভাবীর ওপর ভীষণ অভিমান হলো। মেয়েটা একটু থেকে গেলে কী হতো? মানছে তার ভাইটা একটু কঠোর হৃদয়ের মানুষ। কিন্তু তাই বলে এইভাবে বিচ্ছেদ হয়ে যাবে? মেয়েটা তো একটু পারত, মানিয়ে নিয়ে ভাইয়াকে বুঝতে।
তিথি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বিরবির করে বলল,
-“তুমি যদি ভাইয়ার অতীত একটু জানতে ভাবী! তাহলে তুমি কখনো তাকে ছেড়ে যেতে পারতে না। বরং নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসতে। কারণ তোমার স্বামী যে বড়োই ভালোবাসা পাওয়ার কাঙাল!”
খান বাড়িতে আপাতত ছোট্টখাট্টো একটা ঝামেলা চলছে। এর পিছনে রয়েছে তাহমিনা খান। বাড়িতে ফেরার পর থেকেই উনার মুখের বুলি থামেনি। যা ইচ্ছে তাই বলে আধারকে কথা শোনাচ্ছে। সবকিছু শুনেও চুপ করে আছে ছেলেটা। আর এই সুযোগেই এত দিনের মনের বি’ষ সব উগলে দিতে ব্যস্ত তাহমিনা খান। সোবহান খান প্রথমে চুপ থাকলেও পরবর্তীতে আর শান্ত থাকতে পারেননি। তিনিও উচিত জবাব দেন। সবকিছু মিলিয়ে এখন যুদ্ধের ন্যায় গরম পরিবেশটা।
অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর আবহাওয়া ঠান্ডা হয়। আধার রুমে গিয়ে লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে। মাথাটা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে তার। এই একটা কারণে সে বাড়িতে থাকতে চায় না। আগে খুব একটা বাড়িতে আসতো না। তার বহু বছর আগে কেনা একটা ফ্ল্যাট রয়েছে। সেখানেই একা থাকত। মাঝেমধ্যে এখানে এসে শুধু দাদাজানের সাথে দেখা করে যেত। কিন্তু কয়েক মাস থেকে সে এখানেই থাকছে। কারণ তার দাদাজান সবসময় চেয়ে এসেছেন, সে এখানে এসে থাকুক। আর সে প্রথম প্রথম কথা না শুলনেও পরবর্তীতে ঠিকই তার দাদাজানের কথা রাখে। কারণ তার জীবন জুড়ে যে ওই একটা মানুষই আছে। তাই তো হাজার কষ্ট হলেও সে মুখ বুঁজে এই বাড়িতে পড়ে থাকে। অথচ তার মনটা সবসময়ই অন্য এক জায়গায় বসবাস করে৷
আজ শেফালি চাচি নেই। তিনি ছুটি নিয়ে কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন। আধার টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে রান্নাঘরে এল। দুপুর পার হতে চলেছে! অথচ খাবার পেটে পড়েনি এখনো। সে ফ্রিজ খুলে দেখল, রান্না করা খাবার আছে কিনা। কিন্তু কিচ্ছু নেই। আধার ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে চাল ধুয়ে রাইসকুকারে বসিয়ে দিল। সে যদি একা হতো তাহলে কখনোই রান্না করত না। শুধু এক মগ কফি বানিয়ে খেয়ে নিলেই হয়ে যেত। তার এমনও দিন যায়, যেখানে সারাদিন পেটে ওই তেঁতো কফি, চা ছাড়া কিছুই পড়ে না। সে চাইলে বাহির থেকে খাবার অর্ডার করতে পারত, কিন্তু দাদাজান বাইরের খাবার খেতে পারেন না। আর সেও চায় না মানুষটা অতিরিক্ত তেলমশলা জাতীয় খাবার খেয়ে শরীর খারাপ করুক। সে আগেই বুঝে গিয়েছিল তার ছোট মা আজ সারাদিনেও রান্নাঘরে পা রাখবে না। উঁহু, সারাদিন নয়! উনার আদরের একমাত্র ছেলে এলে ঠিকই আসবেন। কারণ তিনি তার সন্তানদের জন্যই রান্না করতে বেশি পছন্দ করেন।
আধার কফি খেতে খেতে ভাত, ডাল, সবজি আর ডিম ভুনা করে নেয়। সে যখন দেশের বাইরে ছিল তখনই এসব রান্নাবান্না শেখা। পিএইচডি শেষে দেশে ফেরার পরও মাঝেমধ্যে টুকটাক রান্না করে৷ তবে সেটা প্রয়োজন ছাড়া কখনোই না।
-“একি দাদুভাই তুমি রান্নাঘরে কী করছো?”
সোবহান খান ড্রয়িংরুম পেরিয়ে খোলা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে প্রশ্ন করেন। আধার একপলক তাকিয়ে বলল,
-“ক্রিকেট খেলছি দাদাজান। খেলবে?”
-“তুমি আর ভালো হলে না আধার!”
-“তোমার নাতি কবেই ভালো ছিল?”
-“ছিলে তো, ছোট বেলায় ভীষণ আদুরে ছিলে।”
-“আর এখন বাঁদর হয়ে গেছি, তাই তো?”
সোবহান খান হেঁসে বললেন, -“হয়তো।”
আধার কিছু না বলে নিজের কাজে মন দেয়। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বলল,
-“ডাইনিংয়ে বসো, আমি আসছি।”
-“আজ বউ থাকলে হাত পু’ড়িয়ে রান্না করতে হতো না।”
-“ঠিক বলেছো। তোমার জন্য পাত্রী দেখা শুরু করছি তাহলে।”
-“আমার বউ না, তোমার বউয়ের কথা বলছি।”
-“ওহহ! আমার বউও আছে? জানতাম না তো।”
নাতির ত্যাড়ামি দেখে সোবহান খান বেশ বিরক্ত হলেন৷ এই ছেলেটা এমন কেন? একটু কী ভালো হওয়া যায় না? এইজন্যই তার নাতবউ দু’চোখে দেখতে পারে না এই বদমাশটাকে! সবসময় উল্টাপাল্টা কথা বলে ভালো মুড বিগড়ে দিতে ওস্তাদ।
সোবহান খান আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ডাইনিংয়ে গিয়ে বসলেন। আধার এক এক করে খাবারের পাত্রগুলো নিয়ে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখল। তারপর নিজ হাতে দাদাজানকে খাবার বেড়ে দিল৷
-“কোথায় যাচ্ছো?”
সোবহান খান খেতে খেতে খেয়াল করলেন, আধার প্লেটে খাবার সাজিয়ে নিয়ে কোথাও একটা যাচ্ছে। তাই তিনি কপাল কুঁচকে উপরোক্ত বাক্যটি বলে। আধার পিছনে না ফিরে একটি বন্ধ দরজার রুমের দিকে যেতে যেতে ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,
-“তোমার ছোট বউমাকে খাবার দিতে। উনি আমাকে পর ভাবলেও তো আমি আর উনাকে পর ভাবতে পারি না দাদাজান।”
❝কি করে বলবো তোমায়
আসলে মন, কি যে চায়
কেন সে পালিয়ে বেড়ায়
তোমার থেকেই…
কি করে বলবো তোমায়
কেন এ মন হাত বাড়ায়
আবারও হারিয়ে সে যায়
তোমার থেকেই…
তুমি জানতে পারোনি
কতো গল্প পুড়ে যায়
তুমি চিনতে পারোনি
আমাকে হায়…❞
আলো নিজের গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে পড়ন্ত বিকেলে, ছাঁদের দোনলায় বসে থেকে দোল খেতে খেতে গুনগুন করে গান গাইছে। তার যখন খুব বেশি মন খারাপ হয়, তখন সে একা একা গান গায়। তারপর কিছুটা হলেও মনটা হালকা হয়। সে চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিয়ে গাইলো আরো কয়েকটি লাইন—
~পথ ভুলে গেছি চলে, দূরের কুয়াশায়
তবু আমার, ফিরে আসার সত্যিই নেই উপায়
তুমি আমার জিতের বাজি, তুমিই আমার হার…!~
মেয়েটার মিষ্টি কণ্ঠস্বরে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে। বাতাসে উড়ছে তার খোলা চুল, স্কার্টের সাদা ঘের! কালো টপসের ওপর ঝুলছে সফেদ জর্জেট ওড়না। যেটার একাংশ অবহেলায় মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। অথচ মেয়েটার সেদিকে কোনো ধ্যান-মগ্ন নেই। সে তো এখন এক অন্য জগতে হারিয়ে গেছে। তবে মেয়েটিকে বেশিক্ষণ নিজের গানে মত্ত থাকতে না দিয়ে হঠাৎই ছাঁদের দরজা ধরাম করে খুলে গেল। মৃদু আওয়াজে আলোর কণ্ঠের সাথে সাথে হাত জোড়াও থেমে গেল।
-“রাহুল ভাইয়া….আপনি এখানে?”
অসময়ে মানুষটাকে সশরীরে এখানে দেখে কিছুটা অবাক হয় আলো। কারণ লোকটা কখনোই হুটহাট করে আসে না। কিন্তু আজ কেন জানি মানুষটাকে এলোমেলো দেখাচ্ছে। চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে, ঘামার্ত চেহারাটা লালচে, ইন করা শার্টের অর্ধেক অংশ বাইরে, দুটো বোতামও খোলা। সবসময় পরিপাটি থাকা মানুষটিকে আজ এমন ছন্নছাড়া রূপে দেখে ভরকালো মেয়েটা। ফের জানতে চাইল,
-“আপনি ঠিক আছেন ভাইয়া?”
-“ঠিক নেই পাখি! একদম ঠিক নেই আমি।”
রাহুল মেয়েটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অস্থির গলায় বলে। আলো ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“কেন? কী হয়েছে আপনার?”
-“সেটা তো তুমি বলবে, তোমার কী হয়েছে।”
-“মানে ঠিক বুঝলাম না!”
-“কেন করলে এমন? কেন ওই আধার খানকে ডিভোর্স দিলে না, কেনোওও??”
আলোর কপাল কুঁচকে গেল। তাহলে কী তার বিয়ের কথা জানে এই লোকটা? উমম…হতে পারে। নাহলে কী আর এসব জানতে পারত? সে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে গিটারটা দোনলায় রেখে উঠে দাঁড়ায়। তারপর শান্ত গলায় বলে,
-“আমার নিজেরও এটার সঠিক উত্তর জানা নেই। ওইসময় যেটা ঠিক মনে হয়েছে—আমি সেটাই করেছি, দ্যাটস ইট!”
একটু থেমে পুনরায় বলল,
-“কিন্তু আপনি এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
-“কারণ….কারণ তুমি তো ওই লোকটাকে পছন্দ করো না, আর না তার সাথে সংসার করতে চাও। তাহলে কেন এমন পাগলামি করলে আলো? তুমি ওই লোকটার থেকেও ভালো কাউকে ডিজার্ভ করো। ওই লোকটা সবসময় তোমাকে অপমান করে, কথা শোনায়, একটুও সহ্য করতে পারে না। সবকিছু জেনেশুনেও তুমি কেন আবারো ওই নরকের মধ্যে পা রাখলে? ওই লোকটা কী কোনোভাবে তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করছে?”
রাহুলের কথা শুনে আলো হতবাক হয়ে গেল। এই পাগল ছেলেটা এসব কী আবোলতাবোল বলছে? আধার স্যার ব্ল্যাকমেইল করবে? তাও তাকে? হাস্যকর ব্যাপার!
-“আই নো উনি আমাকে লাইক করেন না। আমিও উনার ওই গাম্ভীর্যকে পছন্দ করি না। উনাকে দেখে কিছু না হলেও উনার ত্যাড়ামিতে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়৷ সবসময় ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলবে। উনাকে একটা প্রশ্ন করেও শান্তি নেই। উল্টো আপনার মাথাটাই নষ্ট করে দিবে৷ মানছি মানুষটা একটু অদ্ভুত টাইপের! কিন্তু তাই বলে…খারাপ নয়। আধার স্যার যথেষ্ট ভালো একজন মানুষ। আর আমার সাথে ত্যাড়ামি, অপমান করলেও কখনো হার্ট করেন নি কিংবা খারাপ ব্যবহার করেন নি। উনি তো আগে থেকেই আমাকে দেখতে পারতেন না, আর আমিও উনার পিছনে এই পর্যন্ত কম লাগিনি। বলতে গেলে আমার নিজের দোষেই মানুষটাকে শত্রু বানিয়েছি। আর স্যার শুধু আমার সাথেই ওমন করেন, এর বাহিরে তো অন্য মেয়ের দিকে তাকানোরও প্রয়োজন মনে করেন না। উনি আমাকে যতই অপছন্দ করুক, কিন্তু কখনো অবহেলা করেন নি। বিপদের সময় সবসময় ওই অদ্ভুত লোকটাকেই নিজের ঢাল হয়ে সামনে পেয়েছি। উনি একটু হলেও আমাকে আগলিয়েছে, যত্ন করেছে। শুধু নিজের মনটাই দিতে পারেননি।”
শেষের কথাটা আস্তে বলে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আলো। সে যতই মুখে লোকটাকে বকাবকি করুক না কেন, দিনশেষে ওই লোকটাকেই তার এখন ভালো লাগে।
-“তুমি আধার খানকে চাইলেও কিন্তু তোমাকে আধার খান একটুও চায় না।”
রাহুলের কথা শুনে আলো কিছু না বলে পাশে ঘুরে খোলা আকাশের দিকে তাকায়। যেই মানুষটাকে পাবে না জেনেও তার বেইমান মনটা সেই মানুষটাকেই বেহায়ার মতো চেয়ে বসে আছে। এর থেকে কষ্টের আর কী আছে?
-“আলো?”
-“হুম?”
-“আধার খানকে ডিভোর্স দাও। আমি সবকিছু ব্যবস্থা করে দিচ্ছি!”
একথা শুনে আলো চট করে পিছনে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, -“আমার ডিভোর্স নিয়ে আপনার এত মাথা ব্যথা কেন?”
-“কারণ আমি তোমার ভালো চাই।”
-“কিন্তু আমি ডিভোর্স চাই না।”
-“কেন?”
-“উনাকে অন্য কারোর সাথে দেখতে পারব না। আমি চাই না আধার স্যার অন্য কোনো মেয়ের হোক। তাই যেভাবে আছি, ওভাবেই থাকতে চাই ভাইয়া। প্লিজ আপনি আর এই বিষয়ে কিছু বলবেন না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিন।”
রাহুল এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“তুমি পাগল হয়ে গেছো। যেই মানুষটা তোমাকে বউ বলে মানে না, তুমি কিনা সেই মানুষটাকেই চাচ্ছো? আর ইউ ম্যাড?”
আলোর এতক্ষণের সব ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। মেয়েটা হঠাৎই চিল্লিয়ে উঠে বলল,
-“হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি পাগল হয়ে গেছি। আর এমনটা কেন হয়েছি জানেন? নিজের এই জ’ঘন্য হৃদয়টার জন্য। ব্রেন বলে ওই লোকটার থেকে দূরে যেতে, কিন্তু এই বেইমান মন সেটাতে সায় দেয় না। আপনি ঠিকই বলেছেন, আমি সত্যিই উন্মাদ। নাহলে কী ওমন একটা শয়তানকে চাইতাম? যাকে আমি পছন্দ করি না, কিন্তু তাকেই আমি দিনশেষে অনুভব করি। ওই বাড়িতে যতদিন ছিলাম, ততদিন ওই লোকটার পাষাণ বুকের মাঝে ঘামটি মে’রে থেকেছি। মাঝেমধ্যে নিজ থেকেই কাছে গিয়েছি। কারণ উনার বুকে মাথা রাখলে সুখ, সুখ মনে হতো। তখন কেন জানি উনাকে খুব আপন আপন লাগত। হয়তো এইটাই পবিত্র বিয়ের অদৃশ্য বাঁধন। আমি মানি বা না মানি, তবুও তো উনি আমার স্বামী। তাহলে কী করে পারতাম উনাকে অন্য কারোর হতে দেখতে? মেয়েরা আর যাই করুক, কখনো নিজের স্বামীর ভাগ দিতে পারে না। আমি জানি না আমার কী হয়েছে। আর কেনই বা এমন করছি। শুধু জানি ওই আধার খান আমার না হলে অন্য কারোরও না….কারোর নাআআআ!”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে এক ছুটে চলে গেল আলো। অন্যদিকে রাহুল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার শূন্য দৃষ্টি দরজার দিকে। হঠাৎই সে অস্ফুটস্বরে বিরবির করে বলে উঠল,
-“তুমি অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছো আধার খান-কে!”
রাত গভীর। অথচ একজন যুবক এলোমেলো ভাবে কার ড্রাইভ করে রাস্তায় ছুটে চলেছে। কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়ে যাবার পর যুবকটি হঠাৎই ব্রেক কষলো তার খুব চেনা পরিচিত এক জায়গায়। তারপর গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে সামনে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর পথ এগিয়ে আসতেই চোখের সামনে স্পষ্ট হলো এক লাইনে রাখা চারটে কবর।
আধার লম্বা শ্বাস নিয়ে কাছে এল। প্রথম কবরের পাশে দুই হাঁটু ভেঙে বসল। আজ তার ভীষণ মন খারাপ। তাই তো ছুটে এসেছে নিজের আপনজনদের কাছে। আধার ঠোঁট কামড়ে ডান হাতটি বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিল কবর। তারপর ভাঙা ভাঙা গলায় অস্ফুটস্বরে ডেকে উঠল,
-“আ-আম্মু!”
বিপরীত পাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। আর আসবেও না কখনো। আধার জোরে শ্বাস নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আজ তোমার ছেলের খুব মন খারাপ আম্মু, খুউউউব। অথচ তুমি এসে জানতে চাইলে না, কেন তোমার আদরের ছেলের মন খারাপ! ছোট বেলার মতো বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সব দুঃখ, কষ্ট এক নিমিষেই গায়েব করে দিলে না। তুমি কী আমাকে ভুলে যাচ্ছো? নাকি এতদিন আসিনি তাই অভিমান করেছো? আচ্ছা সরি! খুব, খুব সরি আম্মু। প্লিজ তুমি আর রাগ, অভিমান করে থেকো না। এবার থেকে তোমার অবাধ্য সন্তান বাধ্য হওয়ার চেষ্টা করবে ইনশাআল্লাহ।”
আধার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উঠে দ্বিতীয় কবরের কাছে গিয়ে বসে। তারপর হাত রেখে শান্ত গলায় বলে,
-“আমার অদেখা ছোট্ট ভাই! কেমন আছিস? নিশ্চয়ই বড় ভাইকে মিস করিস? উমম…আমিও তোদেরকে ভীষণ মিস করি। কিন্তু আফসোস, তোরা সবাই স্বার্থপরের মতো আমাকে একা রেখে পালিয়ে গেলি। আমি এমনই একজন অভাগা ভাই যে নিজের ছোট্ট ভাইকে জীবন্ত অবস্থায় দেখতে পারিনি। পৃথিবীতে আসার আগেই ওই নীল আকাশে মা-ছেলে মিলে উড়াল দিলি। অথচ আমার কথা একটিবারের জন্যও ভাবলি না। জানিস? মাঝেমধ্যে না আমার ভীষণ অভিমান হয় তোদের উপর। ইচ্ছে করে না, এখানে এসে তোদের সাথে মনের কথাগুলো শেয়ার করতে। কিন্তু কী করব বল? আমি তো আর তোদের মতো স্বার্থপর নই। তাই বেহায়া, নির্লজ্জের মতো সবসময় ছুটে আসি। নয়তো বুকের ভেতরটা হাসফাস করে৷ দম বন্ধ বন্ধ লাগে। আচ্ছা তুই এখন ঘুমিয়ে থাক, আমি আর তোকে ডিস্টার্ব করব না।”
আধার কথাগুলো বলে তৃতীয় কবরের কাছে যায়। তারপর একই ভঙ্গিতে বসে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“বোন আমার! ভাই তোকে অনেক মিস করে। বিশেষ করে তোর হাতের পোড়া রুটিগুলোকে।”
একটু থেমে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
-“তুই এমন একজনরে ভালোবাসলি বোন, যার জন্য আমি হারালাম নিজের একমাত্র কলিজা টুকরো বোনকে। আচ্ছা? তোর একটুও কী আমার কথা মনে হয়নি? একবারের জন্যও ভাবিসনি তোকে হারিয়ে তোর ভাই ঠিক কতটা কষ্ট পাবে। মা, ভাইকে হারানোর পর তো তুই-ই ছিলিস আমার বেঁচে থাকার কারণ। এই ছোট্ট তোকে আঁকড়ে ধরেই তো যুদ্ধ করে বেঁচে ছিলাম। অথচ তুই? তুই কী করলি হুহ্? একটা বেইমানের জন্য নিজের ভাইয়ের ভালোবাসাকেই তুচ্ছ করে পালিয়ে গেলি? আমার ভালোবাসার কাছেও কী ওই জানো/য়ারের ভালোবাসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তোর কাছে?
এই দেখ! এই হাতদুটো দিয়েই তোকে একটু একটু করে বড় করেছিলাম। তখন যদি জানতাম তুই অন্যের জন্য নিজের জীবন দিবি, তাহলে বিশ্বাস কর কখনো তোকে ভালোবাসতাম না। কারণ ভালোবেসে দিনশেষে কি পেলাম তোদের থেকে? শুধু এক বুক হাহাকার, আফসোস আর কষ্ট ছাড়া কিছুই না। তোকে রেখে যখন অস্ট্রেলিয়ায় যেতে হয়েছিল, তখন কষ্টে বুকটা ছিঁড়ে গিয়েছে। আমি যেতে চাইনি তোকে ছাড়া, কিন্তু তোর বাপ আমাকে বাধ্য করেছে। আমি উনার কাছে কি চেয়েছিলাম? শুধু চেয়েছি তোকে যেন একটু আগলে রাখে। আমি কয়েক বছর পরই তোকে আমার কাছে নিয়ে যাবো। কারণ আমি জানতাম, দাদাজান ছাড়া আর কেউই তোকে ভালোবাসত না। সবকিছু ঠিকই তো চলছিল! তাহলে কেন তুই মাঝখান থেকে হারিয়ে গেলি? ওই বেইমানটাকে এত না ভালোবাসলেও পারতি বোন আমার। কারণ তুই দিনশেষে ভালোবেসে পেলি শুধু মৃ’ত্যু! আর ওই ছেলে পেল সুখ। এমন ভালোবাসার কী খুব প্রয়োজন ছিল তোর? উঁহু, মোটেও ছিল না। তবুও তুই হেরে গেলি এক বেইমানের মিথ্যে ভালোবাসার কাছে!”
অপর প্রান্তের রমণী নিশ্চুপ। আধার কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বিরবির করে বলল,
-“ভাই তোকে ভালোবাসে বোনু। এখনো খুব ভালোবাসে!”
আধার শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চর্তুথ কবরের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
-“সবকিছু আপনার জন্য হয়েছে মি. আশরাফ খান! আপনার জন্য আমার সুখের পরিবারটা এক ঝটকায় ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি আধার কখনোই আপনাকে ক্ষমা করব না, কখনোই না।”
আধার ঘৃ’ণায় মুখ সরিয়ে নিয়ে তার মায়ের কবরের পাশে গিয়ে বসল। আজ রাতটা এখানেই থাকবে। তার মায়ের কাছে! আধার আলতো করে কবরের ওপর মাথা রাখল। হয়তো অনুভব করার চেষ্টা করল নিজের জন্মদাত্রীকে। ছেলেটা কেমন শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাঙা গলায় আওরাল,
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৬
-“কতগুলো বছর হয়ে গেল, তোমার বুকে মাথা রাখি না আম্মু!”
অতঃপর চারিদিকে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল৷ বাতাসের দাপটও বাড়ল। অথচ আধার আবেশে চোখ বুজে অনুভব করল, সে তার মায়ের বুকের মাঝে মাথা রেখে শুয়ে আছে। হঠাৎই তার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। একই সাথে চোখের কুর্ণিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রুও গড়িয়ে পড়ল। কে বলেছে সে এতিম? এই তো তার পুরো পরিবার রয়েছে এখানে। তার মা, বাবা, ভাই, বোন…সবাই আছে। অথচ সবাই থেকেও সে দিনশেষে পৃথিবীতে বড্ড একা। কারণ তার সুখের পরিবার বহুবছর আগেই তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে ওই দূর আকাশে। এখন হয়তো সেও নিজের জীবনের অন্তিম প্রহরের দিন গুনছে….

Porer prat tha taratari dio plz ☹️
Porer prat tha taratari dio