Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৬

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৬

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৬
নুসরাত ফারিয়া

​কুয়াশার পাতলা চাদর সরিয়ে সূর্যের প্রথম কিরণ যখন দিগন্তে উঁকি দেয়, তখন মনে হয় কোনো শিল্পী তার ক্যানভাসে সোনালি রঙের পোচ দিয়েছেন। সেই আলো এসে পড়ে জানালার গ্রিলে, আর ঠিক তার পাশেই রাখা টবের গাছটির ওপর। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো তখন নিছক জল নয়, একেকটা ছোট ছোট হিরে, যা রোদের স্পর্শে ঝিলমিলিয়ে উঠছে। ​মেঠো সুরের মূর্ছনা ​বাতাসে তখনো রাতের হিমেল আমেজ লেগে আছে। সেই শীতল হাওয়া বয়ে যাওয়ার সময় বাঁশঝাড় থেকে একটা সোঁ সোঁ শব্দ আসছে। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে দিয়ে ডেকে উঠল একটা দোয়েল। সেই সুরের রেশ ধরে একে একে চড়ুই, শালিক আর কাকের কোলাহলে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল।
আজ খুব সকাল সকাল বেরিয়েছে আধার। ব্যস্ত হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ছুটে চলেছে তার গন্তব্যের উদ্দেশে। কয়েকটা পথ পাড়ি জমিয়ে একটি রেস্তোরাঁর সামনে থামে। গাড়িটা পার্কিং প্লেসে রেখে ফোন নিয়ে বেরিয়ে এল। তারপর হনহনিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।

-“ইউউ….রাহুল! আ’ম আ রাইট?”
একটি ফাঁকা কর্ণারের টেবিলে বসে থেকে কফি খাচ্ছিল রাহুল। তখন পাশ থেকে বাক্যটি শুনে কপাল কুঁচকে মুখ তুলে চায়। এবং দেখে স্যুটবুট পরিহিত একজন সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। রাহুল মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলল,
-“ইয়েস, আমিই রাহুল। কিন্তু…আপনি?”
-“আধার! আধার খান।”
আধার কোটের বোতাম খুলে সামনের চেয়ারে বসতে বসতে জবাব দেয়। নামটা শুনে রাহুলের কপাল কুঁচকে গেল। সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চাইল,
-“আপনিই তাহলে আমাকে এখানে ডেকেছেন?”
-“হুম।”
-“কিন্তু কেন?”
-“ভেবেছিলাম তুমি অনেক বুঝদার ছেলে। আমার নামটা শোন মাত্রই বুঝে যাবে আমি এখানে কেন ডেকেছি তোমায়। বাট…ভুল ভেবেছি আমি।”
রাহুল একটু নড়েচড়ে বসল। আধার তীক্ষ্ণ চোখে ছেলেটাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে ওয়েটারকে ডেকে কফি অর্ডার দিল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“কেন এমনটা করছিলে তুমি?”
রাহুল বুঝতে পারল লোকটা সব জেনে গেছে। নাহলে কী আজ এইভাবে ডাকতো? তাই সে কথা না ঘুরিয়ে সোজাসাপ্টা জবাব দিল,
-“কারণ আমি তাকে ভালোবাসি।”
আধার তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, -“ভালোবাসলে বুঝি এমনটা করা যায়? তুমি তো রীতিমতো মেয়েটাকে আমার কাছে ভিলেন বানাতে চেয়েছিলে।”
-“এছাড়া আর আমার কাছে কোনো উপায় ছিল না।”
-“উমম…বুঝলাম। তা এটা কেন করলে? সরাসরি তো বলতে পারতে। শুধু শুধু এত নাটক করলে।”
রাহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

-“আমি আলোকে ছোট বেলা থেকেই ভালোবাসি। তবে কখনো সেটা প্রকাশ করতে পারিনি। কারণ মেয়েটা প্রেম-টেম করা পছন্দ করত না। ও তো বিয়ে পাগল ছিল। তাই আমিও ঠিক করেছিলাম আমার ভালোবাসার মানুষকে বিয়েই করে নিবো। তাই তো লেখাপড়া শেষ করা মাত্রই নিজের ক্যারিয়ার গড়তে শুরু করলাম। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু মাঝপথে আপনি এসে আমার প্রিয় মানুষটাকে কেঁড়ে নিলেন। দুনিয়ায় এত এত মেয়ে থাকতেও কিনা আপনার আমার ময়নাকেই বিয়ে করতে হলো?
যখন রহিতের মুখে মেয়েটার বিয়ের কথা শুনলাম, তখন এক মূহুর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমার শরীর থেকে কেউ হৃদয় বের করে নিয়েছে। বিশ্বাস করুন, ভীষণ কষ্ট হয়েছে।আমি চেয়েও তখন দুবাই থেকে ফিরতে পারিনি। আমার শরীরটা অন্য কোথাও থাকলেও আমার মনটা সারাক্ষণ ওই মেয়েটার কাছেই ছিল। আমি প্রতিটা মূহুর্তে ছটফট করেছি। বলতে চেয়েছি আমি তাকে খুব করে ভালোবাসি৷”
একটু থেমে পুনরায় বলল,

-“দেশে ফেরার পর সর্বপ্রথম ওর বিয়ের খোঁজখবর নিই। ভেবেছি মেয়েটা নতুন সংসারে সুখী রয়েছে। আমি কখনোই চাইনি আমার প্রিয় মানুষটিকে কষ্ট দিতে। তাই তো মনের বিরুদ্ধে গিয়েও আমি মুখ বুঁজে সবকিছু মেনে নিয়েছি। কারণ আমার না পাওয়া ভালোবাসার মানুষটি সুখে আছে। এবং তার সুখে দিনশেষে আমারো সুখ ছিল। তাকে ভালোবেসেছি মানে এই নয় যে, তার স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিবো। আমি কখনোই তার কষ্টের কারণ হতে চাইনি। তাই নিজেকেই সরিয়ে নিলাম। কিন্তু যখন জানতে পারি আলো আপনাকে পছন্দ করে না এবং আপনিও ওকে পছন্দ করেন না। দুজনেই পরিবারের চাপে ও পরিস্থিতির জন্য বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন। ঠিক তখনই আমার মনে একটা আশার আলো জ্বলে ওঠে, আমার না পাওয়া প্রেয়সীকে পাওয়ার আশা!

তারপর আরো ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে প্ল্যান করলাম আপনার মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবো। কারণ আপনি এমনিতেও মেয়েটাকে চান না, তাহলে শুধু শুধু নিজের কাছে রেখে কী লাভ বলুন তো? যেখানে মেয়েটাও খুশি ছিল না। তাই মাঝরাতে তাকে ফোন দিতাম। আর এটাও জানতাম, আলো ভীষণ ঘুমকাতুরে। ওর বিছানায় শুতে দেরি হলেও ঘুমাতে দেরি হয় না। তার ঘুমটাও ছিল মাশাআল্লাহ! পাশের ব্যক্তিকে যদি রাতবিরেত খু’ন করাও হয়, তাহলেও ওর ঘুম ভাঙবে না। আর এটারই সুযোগ নিয়েছি। কারণ আমি শিওর ছিলাম, কলটা আপনিই ধরবেন।
আমাদের মিথ্যে প্রেমের কাহিনী আপনাকে শোনাই। তারপর ফুলও পাঠিয়েছি। সাথে নোটও! তবে সেটা দরজার বাহিরে রাখা হয়েছিল। যেন আপনার হাতেই ওই চিরকুটটা যায়। এবং আপনি রেগেমেগে মেয়েটাকে ডিভোর্স দিয়ে দেন। হাজার হোক, কোনো স্বামীই চাইবে না নিজের অর্ধাঙ্গিনী বিয়ের পরও তার এক্স বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্ক রাখুক কিংবা পরকীয়া করুক। আপনি শুরু থেকেই ওকে দেখতে পারেন না, সবসময় অপমান করেন। ভার্সিটিতেও একই। আর এসব যখন জানবেন, দেখবেন তখন নিশ্চয়ই চুপ থাকবেন না? অবশ্যই মেয়েটাকে ছেড়ে দিবেন। ট্রাস্ট মি! এসব করার মোটেও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। শুধু চেয়েছি আমার পাখিটাকে! এছাড়া আর কিছুই না।”
আধার কফি খেতে খেতে মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনল। তারপর তপ্ত শ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় বলল,

-“তুমি আবেগের বশে এসব ছেলেমানুষী করেছো। আমার জায়গায় যদি অন্য ব্যক্তি হতো তাহলে এই সামান্য ব্যাপারটা কতদূর এগিয়ে নিয়ে যেত, তার কোনো আইডিয়া নেই তোমার। যদি থাকত, তাহলে এমন জ’ঘন্য কাজ করতে পারতে না। তুমি এমন কাজ করে আমাকে সুযোগ করে দিয়েছিলে মেয়েটার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলতে। হ্যাঁ, আমি মানছি মেয়েটাকে পছন্দ করি না। কিন্তু তাই বলে কিছু ফোন কল’স, ফুল, চিরকুট দেখে রিয়াক্ট করব? ভাগ্যিস, ওই জায়গাতে আমি ছিলাম৷ নয়তো তোমার এই পাগলামির জন্য মেয়েটার ওপর দিয়ে কোন ঝড় বয়ে যেত সেটা জানতেও পারতে না।

আচ্ছা! তোমার শুধু এইটা কেন মনে হয়েছিল, আমি ওসব দেখে ডিভোর্স দিবো? আমি চাইলে মেয়েটাকে অপমান করতে পারতাম, তার চরিত্র নিয়ে কথা তুলতাম বা গায়েও হাত তুলতে পারতাম! সবার সামনে মেয়েটা হ্যানস্তা হতো। এগুলো কী হওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল? তুমি মেয়েটার ভালো করতে গিয়ে অজান্তেই ক্ষতি করার চেষ্টা করেছো। মনে রাখবে, সবকিছুর ভালো দিক হয়না। আমরা যেটাকে সামান্য ভাবি, ওটাই অন্যের কাছে ভয়ংকর কিছু। মাঝেমধ্যে করা ছোট্ট ভুলেও পস্তাতে হয়। ইউ নো? সবাই ভালো মানুষ না!”
রাহুল শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল৷ মানুষটা কিছু ভুল বলেনি তো। সবটা ঠিকই বলেছে। সে এক মূহুর্তের জন্য অন্ধ হয়ে ভুল করে ফেলেছে। এর জন্য যদি মেয়েটার ক্ষতি হতো, তখন সে কী করত? নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারত?
আবারো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রাহুল। সে একটু বেশি বেশিই করে ফেলেছে। না চাইতেও মেয়েটার চরিত্রের দিকে অন্যকে আঙুল তোলার সুযোগ করে দিয়েছিল। এটা ভাবতেও এখন নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। কেন যে ওসব করতে গেছিল! কিন্তু…সে তো বাধ্য হয়ে করেছে ওসব। যা করেছে শুধু নিজের না পাওয়া ভালোবাসার মানুষটিকে একটু পাওয়ার আশায়! তাই এতকিছু ভেবে দেখেনি! অথচ এই মানুষটা সবটা দেখেশুনেও শান্ত। যেন আগে থেকেই জানত, মেয়েটা এমন কাজ করতেই পারে না!

-“আমি যা করেছি সেটা ভুল ছিল। কিন্তু আমার ভালোবাসায় কোনো ক্রুটি নেই। আপনি শুধু আমার প্রিয় মানুষটিকে আমাকে দিয়ে দিন। আমি কথা দিচ্ছি, ওকে সুখে রাখব। দরকার হলে তার পরিবারের হাত-পায়ে ধরে আমি তাকে চাইব। তবুও আমার আলোকে চাই। আপনি ওকে এই মিথ্যে সম্পর্কের মাঝখান থেকে মুক্ত করে দিন। আমি সারাজীবন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। আমার ভালোবাসার মানুষটির বিনিময়ে আমি সবকিছু করতে রাজি আছি।”
রাহুল একনাগাড়ে কথাগুলো বলে। আধার কফিতে লম্বা চুমুক দিয়ে গমগমে গলায় বলল,
-“ম’রতে পারবে?”
লোকটার এহেন কথা শুনে রাহুল ভ্যাবাচ্যাকা খেল। এ আবার কেমন প্রশ্ন?
-“কী হলো? জবাব দাও! ভালোবাসার জন্য নিজের জীবন দিতে পারবে?”
-“আত্মহ’ত্যা করা মহা পাপ!”
আধার ঠোঁট বাঁকালো। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
-“এই ভালোবাসাতে কী পাও বলো তো? শুধু শুধু কেন নিজের সুন্দর জীবনকে ধ্বংস করো? এই যে তুমি ওই মেয়েটাকে একতরফা ভালোবাসো, অথচ দিনশেষে কী পেলে? একবুক কষ্ট ছাড়া আর কিছুই না। তুমি এমন ভালোবাসা বাসলে যে নিজের মনের কথাটাও বলতে পারলে না। এ কেমন প্রেম? এসব মরীচিকার পিছনে না ঘুরে নিজের লাইফটা এনজয় করো। সবে তো জীবন শুরু, এখন যদি জীবনটা উপভোগ না করো তাহলে শেষ বয়সে গিয়ে বড্ড আফসোস করবে।”

-“ভালোবাসা এটা অদ্ভুত একটা তৃপ্তি। আপনি হয়তো কখনো কাউকে ভালোবাসনি, তাই এমন কথা বলছেন। আমরা কখন, কোথায়, কাকে, কোন সময়ে মন দিয়ে বসব সেটা নিজেরাও জানি না। কারণ মন কোনোকিছুর বাঁধা মানে না। আমাদের অজান্তেই আমাদের হৃদয়টা বেইমানি করে বসে। না চাইতেও মনটা অন্য কাউকে খুব করে চেয়ে বসে। যেখানে আমাদের কারোই হাত থাকে না। আপনার জীবনে কেউ এলে আপনিও তখন তাকে পাওয়ার জন্য উম্মাদ হবেন৷ হাজার হোক, হৃদয়ের ওপর কারোরই দখলদারি চলে না!”
আধার চোখমুখ কুঁচকালো। সামনে থেকে নজর সরিয়ে বাইরে নিক্ষেপ করল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে আওরাল,
-“আধারের জীবনে এমন দিন কখনোই আসবে না! দরকার হলে ওই মূহুর্তটাই পাল্টে দেবো।”

পরীক্ষা শেষে বান্ধবীদের সাথে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এল আলো। তারা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় তামান্না বলে উঠল,
-“এই তোরা শুনেছিস? ওই শ্লার শয়তান বেটাসহ তার সাঙ্গপাঙ্গরা এখন সিটি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে।”
আলো কপাল কুঁচকে জানতে চাইল,
-“কার কথা বলছিস?”
পাশ থেকে ফারাহ্ বলল,
-“সজনের ডাটা! মানে সুজন মোল্লা।”
আলো চমকে উঠে বলল,
-“কেন? কী হয়েছে?”
-“গতকালে রাতে সুজন খুব বাজেভাবে এক্সিডেন্ট করে, আর ওর সাঙ্গপাঙ্গদের কে জানি ধোলাই করেছে। হয়তো কারোর সাথে আবার ঝামেলা পাকিয়েছিল। এদের কাজই তো নষ্টামি করে বেড়ানো। যা হয়েছে ঠিকই হয়েছে। ওদের একটু শিক্ষা হওয়ার উচিত ছিল।”
তামান্নার কথা শেষ হতেই পাশ থেকে শালুক বলে উঠল,

-“শুধু কী তাই? শুনলাম তাদের সবাইকে ভার্সিটি থেকে কোনো কারণে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এবার থেকে ভার্সিটিতে সবাই শান্তি মতো থাকতে পারবে। কোনো প্যারা নাই!”
সবার কথা শুনে আলো ভাবুক হয়ে গেল। কোনোভাবে এসবের পিছনে কী ওই লোকটার হাত আছে? না, না, সে এসব কী ভাবছে? হয়তো মানুষটা ওদেরকে বহিষ্কার করানোর পিছনে আছে। এছাড়া আর কিছুই না। একদৃষ্টে ভালোই হয়েছে শয়তানগুলোকে তাড়িয়ে। নয়তো তার মতো আরো মেয়ে হ্যারেস হতো। আলো এসব ভেবে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
-“তোরা যা, আমি একটু পর আসছি।”
-“কেন? এখানে থেকে কী করবি?”
তামান্নার কথা শুনে আলো বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
-“প্রেম করব!”
-“এ্যা ঢং! বিয়াত্তা মহিলা নাকি প্রেম করবে।”
-“তোরা যাবি এখান থেকে?”
-“যাচ্ছি, যাচ্ছি! তবে দুলাভাই দেশে ফিরলে বলে দিবো, তার বউ ভার্সিটিতে এসে কী কী করে।”
সবাই হাসতে হাসতে চলে গেল আর আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

-“মাঝপথে এইভাবে বাঁশের মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
পিছন থেকে ভেসে আসা পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে আলো চট করে ঘুরে তাকায়। একজোড়া তীক্ষ্ণ কালো মণির সাথে দৃষ্টি বিনিময় হতেই আলো নজর সরিয়ে নিল। আধার গম্ভীর মুখে চোখের চশমা খুলে, হাতে থাকা পরীক্ষার খাতাগুলো নিয়ে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল।
-“শুনুন….!”
মিষ্টি কণ্ঠে এত আদুরে ডাক শুনে অটোমেটিক আধারের পা জোড়া শ্লথ হয়ে যায়। এতে সে নিজেই বিস্মিত! এই মেয়ের কণ্ঠে কোনো জাদু-টাডু আছে নাকি? কারোর কণ্ঠস্বর যে এত মোহনীয় হতে পারে সেটা এই বাচাল মেয়েটাকে না দেখলে জানতেই পারত না।
স্যারকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে আলো তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“ধন্যবাদ স্যার!”
আধার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় পিচ্চি মেয়েটার দিকে। যে কি-না তার বুক সমান! সে কিছুটা সময় নিয়ে নজর সরিয়ে জানতে চাইল,

-“কিসের জন্য?”
আলো জিহ্বা দিয়ে নিজের শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
-“ওই বদমাইশগুলোকে বহিষ্কার করার জন্য।”
-“এখানে তোমার জন্য কিছু করা হয়নি। যা করা হয়েছে সবটাই ভার্সিটির রেপুটেশনের জন্য করা হয়েছে।”
আলো ফিচেল হেঁসে বলল, -“সমস্যা নেই স্যার। আমি এতেই হ্যাপি!”
আধার কিছু না বলে সামনে পা বাড়ায়। আলো তখন আবারো ডেকে উঠল,
-“স্যার?”
আধার বিরক্তিতে পিছনে ফিরে শুধাল, -“কী সমস্যা তোমার?”
আলো ডান হাতের দিকে ইশারা করে বলল,
-“ওখানে কি হয়েছে?”
আধার ভ্রু কুঁচকে নিজের ব্যান্ডেজ পেঁচানো হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“যেটাই হোক! তাতে তোমার কী?”
আলো হতাশ হলো। কাঁধের ব্যাগ চেপে ধরে নামতে নামতে বিরবির করে বলল,
-“কিছু না।”

সময়ের সাথে সাথে পেরিয়েছে পাঁচটা দিন। আলোর পরীক্ষা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তারপর থেকে বাড়িতে বসে আছে। ভার্সিটিতে যায়নি তিনদিন। আর না শশুর বাড়িতে ফিরেছে। এতে অবশ্য তার বাবাই তাকে যেতে দেননি। এটা নিয়ে সে কোনোরকম প্রশ্ন করেনি। কারণ তারও কেন জানি খান বাড়িতে যেতে মন টানে না। ওখানে গেলে আবারো সে একা হয়ে যাবে। কেউ তাকে চায় না, ভালোও বাসে না। অথচ এই বাড়িতে তাকে ভালোবাসার মতো মানুষের অভাব নেই। সবকিছু থেকেও আলো তার দাদাজানকে খুব মিস করে। কারণ ওই একটা মানুষই তো তাকে ভালোবাসত, আগলে রাখত। কিন্তু আজকাল কিছুই তার ভালো লাগছে না। সবকিছুতে বড্ড অনিহা চলে এসেছে।

আলো আজও বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠল। এখানে এসে অলসে পরিণত হয়েছে। সাথে কিছুটা স্বাস্থ্যও বেড়েছে। সারাদিন আজাইরা শুয়ে-বসে থাকলে যেটা হয় আরকি। সে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বাহিরে এল। তখন ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে দশটা ছুঁইছুঁই। আলো হামি তুলে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই চমকে উঠল। কারণ খান বাড়ির সকলে উপস্থিত সেখানে। সবার নজর তার উপর পরার আগেই মেয়েটা তড়িঘড়ি করে রুমে চলে গেল। টি-শার্ট, প্লাজু চেঞ্জ করে সেলোয়ার-কামিজ পরে নিল। তারপর মাথায় ওড়না দিয়ে বেরিয়ে যায়।
ড্রয়িংরুমে এসে আলো বড়দের উদ্দেশ্যে সুন্দর করে সালাম দিল। মায়া, ছায়া নেই। তারা স্কুল-কলেজে গিয়েছে। আর রহিত ভাইয়া অফিসে। সবটা ঠিক থাকলেও কালো স্যুটবুট পরিহিত দুজন উকিল-কে দেখে আলোর যা বোঝার তাই বোঝা হয়ে গেল। সে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার দাদাজানের দিকে তাকায়। মানুষটা থমথমে মুখে চুপচাপ বসে আছে। তাহমিনা খানও রয়েছে। তবে আজ উনার চেহারা একদম শান্ত এবং স্বাভাবিক। হয়তো তিনি এই সিদ্ধান্তে মনে মনে ভীষণ খুশি!
আলো ধীর পায়ে সোবহান খানের সামনে এসে ফ্লোরে হাঁটু ভেঙে বসে দু’হাতের ওপর হাত রেখে অস্ফুটস্বরে বলল,

-“আমার ওপর খুব অভিমান তাই না দাদাজান? আমি বলেছিলাম ফিরবো, কিন্তু কথা রাখতে পারলাম না। আমি যে বড্ড নিরুপায় দাদাজান। তুমি প্লিজ কষ্ট পেও না। আমি তোমার নাতবউ হয়ে না থাকতে পারলেও নাতনি হয়ে সারাজীবন থাকব। যেমনটা আগে ছিলাম।”
সোবহান খানের বুকের ভেতরটা ছটফট করছে। সাথে ভীষণ অপরাধবোধও কাজ করছে। শুধু মাত্র আজ তার জন্য মেয়েটার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। তিনি যদি এমনটা না করতেন তাহলে হয়তো আজ মেয়েটা অন্য কোথাও সুখে, শান্তিতে সংসার করত। এমন মিথ্যে সম্পর্কের মধ্যে জড়াতে হতো না। যেখানে কষ্ট ছাড়া আর কিছুই নেই।
মতিউর রহমান গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তিনি কিছুদিন আগেই জেনেছে ডিভোর্সের কথা। সয়ং আধারই সবটা জানিয়েছে তাদেরকে। আর আজ তাদের মতামত নিয়েই উকিলসহ হাজির খান পরিবার। যেই পরিবারে নিজের আদরের মেয়ে সুখে নেই, সেই পরিবারে উনারাও তাদের সন্তানকে রাখতে চায় না। বরং আর কিছুদিন পর মতিউর রহমানই ডিভোর্স দেওয়ার কথা তুলতেন। কারণ তিনি চান না, তার বড় মেয়ে আর ওই বাড়িতে যাক! দিনশেষে সবার আগে তার সন্তানদের সুখ, শান্তি আগে। তারপর বাকিসব।

-“আর একবার ভেবে নিলে কী হয় না বাবা?”
মিসেস আলেয়া রহমান অসহায় কণ্ঠে আধারের দিকে তাকিয়ে বলে। তিনি চাইছেন না তার মেয়েটার সংসার এইভাবে ভেঙে যাক। হাজার হোক মা তো! চোখের সামনে মেয়ের জীবনটা এলোমেলো হতে দেখতে চান না। তাই তো তিনি শুরু থেকেই আপত্তি করছিলেন৷ কিন্তু স্বামীর ভয়ে বেশিকিছু বলতেও পারছেন না।
আধার লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, -“আপনাদেরকে এইভাবে নিরাশ করার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। আর আপনাদের মেয়েও চাইছে না এই সম্পর্কের মাঝে থাকতে। আশা করছি আপনারাও চাইবেন না, আপনাদের আদরের কন্যা কষ্টে থাক। আমি আপনাদের মেয়ের জন্য সঠিক মানুষ নই। ও আরো ভালো ব্যক্তিকে ডিজার্ভ করে। যে কিনা তাকে শুধুই ভালোবাসবে৷”
আলো ঠোঁট কামড়ে এতিওতি তাকিয়ে চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করছে। অজানা কারণে তার হৃদয়টা ছিঁড়ে যাচ্ছে। উফফ! এত কষ্ট কেন হচ্ছে তার? সামান্য ডিভোর্সই তো। তারপর সে মুক্ত পাখি! অথচ তার দমটাই বন্ধ হয়ে আসছে।
-“আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। যা করার জলদি করুন উকিল সাহেব।”
তারেক হোসেনের দিকে তাকিয়ে তাহমিনা খান গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন। তারেক হোসেন তার সহকর্মী রাফিকে ইশারা করলেন। রাফি ফাইলব্যাগ থেকে নীল-সাদা ডিভোর্স পেপার বের করে সামনে থাকা ছোট কাঁচের টি-টেবিলের ওপর রাখল। তারপর একটা কলম নিয়ে আধারের দিকে বাড়িয়ে বলল,

-“নিন, সাইন করুন।”
আধার কলমটা নিয়ে অদূরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকায়। ভাবছে হয়তো মেয়েটা কিছু বলবে। কিন্তু কিছুই বলল না, বরং চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে সহসাই সাইন করে দিল। যেহেতু সে বিয়ের দিনই সমস্ত মোহরনা পরিশোধ করে দিয়েছিল, তাই এটার কোনো ঝামেলা নেই। তাকে সাইন করতে দেখে উপস্থিত কেউই কিছু বললেন না। যেখানে বাড়ির মেয়ে ডিভোর্স দিতে রাজি, সেখানে তারা বাঁধা দিয়ে কী করবেন?
-“নাও মা! এখন তুমি সাইন করো।”
তারেক হোসেন আলোর উদ্দেশ্যে বলেন। আলো ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল। এইটুকু পথ হাঁটতেই মনে হলো তার পা জোড়া পাথর হয়ে যাচ্ছে। সামনে কদম ফেলতেও কষ্ট হচ্ছে। সে কোনোমতে পা জোড়া টেনেটুনে নিয়ে গিয়ে টি-টেবিলের সামনে হাঁটু ভেঙে বসল। মাথার ওড়নাটা আরো টেনে নিয়ে ঘোমটা দিল। কারণ তার চোখদুটো ভীষণ জ্বলছে। যেকোনো সময় আঁখি জোড়া বেইমানি করতে পারে। তাই সে দ্রুত কলম তুলে নিল হাতে। কিন্তু তার ডান হাত ভীষণ বাজেভাবে কাঁপছে।

আলো সই করার জন্য পেপারে কলম ঠেকায়। কিন্তু সাইন করতে পারছে না। উল্টো তার এক চোখ থেকে টপটপ করে দুফোঁটা অশ্রু পড়ল তালাকনামার মাঝে। মেয়েটার মনের অবস্থা টের পেয়ে নীলিমা রহমান এগিয়ে এসে পাশে বসলেন। এবং মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে কণ্ঠে বললেন,
-“তোমার হাতে এখনো সময় আছে সোনা। তাই যা করবে একটু ভেবেচিন্তে করো। আমরা তোমার পাশে আসি যেকোনো পরিস্থিতিতেই!”
আধার এক দৃষ্টিতে মেয়েটার তিরতির করে কাঁপতে থাকা হাতটার দিকে তাকিয়ে আছে। সে দূর থেকেও বুঝতে পারছে মেয়েটা নীরবে কাঁদছে। কিন্তু কেন এমন করছে মেয়েটা? যেখানে ও নিজেই তার কাছে সর্বপ্রথম ডিভোর্স চেয়েছে। আর সে দিয়েছে! তাহলে এখন এত দ্বিধা কেন?
❝তুমি শুধু একটিবারের জন্য মুখ ফুটে বলো, ডিভোর্স চাও না। আমি আধার খান কথা দিচ্ছি, কখনো বিচ্ছেদ চাইব না!❞

মন থেকে অজান্তেই বেরিয়ে আসা অপ্রত্যাশিত বাক্যগুলো শুনে নিজেই তাজ্জব বনে গেল আধার। সে চোখের পলক ঝাপটিয়ে নজর সরিয়ে নিল। তখন তারেক হোসেন মেয়েটার হাবভাব দেখে বলে উঠলেন,
-“আমার অভিজ্ঞতা বলছে তোমাদের দুজনের আরো সময় প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করে কোনো কাজই করা ঠিক নয়। তোমরা বরং একে অপরকে বোঝার জন্য সময় নাও। তারপর নাহয় এসব কাজ এগোনো যাবে। আমি আপাতত এই পেপারটা নিজের কাছেই রাখছি। কোথাও কোনো নোটিশ পাঠাবো না। তোমরা যদি নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় না আসো, তাহলে আমি নিজে এসে তোমাদের সাইন নিয়ে যাবো। ততদিন না-হয় নিজেদের মনকে ভালো করে বুঝো।”
উকিলের কথা শুনে তাহমিনা খান বলে উঠলেন,
-“এখানে এত ভাবাভাবির কি আছে? কেউ কাউকে চায় না, তাহলে সেখানে সমঝোতা করার প্রশ্নই ওঠে না। আর এ্যাই মেয়ে! ডিভোর্স চেয়ে এখন সাইন করছো না কেন? তাড়াতাড়ি সই করো। আর আমার ছেলেটাকে মুক্তি দাও। অনেক হয়েছে তোমার নাটক, আর না!”
আলো ছলছল চোখে তার বাবার দিকে তাকায়। সে এখন কী করবে বুঝতে পারছে না। বড়মুখ করে তো বারবার ডিভোর্স চেয়েছে, কিন্তু এখন পাওয়ার পর এত কষ্ট হচ্ছে কেন? তাহলে কী সে মন থেকে এটা কখনোই চায়নি? হয়তো!!
মেয়ের চোখের ভাষা পড়তে একটুও অসুবিধা হলো না মতিউর রহমানের। তিনি উঠে এসে মেয়ের কাছে বসতেই আলো কলম রেখে বাবার বুকের মাঝে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করল। এখানে খান বাড়ির কেউ না থাকলে হয়তো এতক্ষণে মেয়েটা হাউমাউ করে কেঁদেও দিত।

-“সোনা মা আমার! তুমি কি চাও আমাকে বলো। তুমি যদি চাও আরো সময় নিতে তাহলে তা-ই হবে। আমরা কেউ তোমাকে জোর করব না।”
আলো নীরবে তার বাবার বুকের শার্ট ভেজাচ্ছে। সে আসলে নিজেই জানে না…কী চায়! অন্যদিকে, তারেক হোসেন পেপারটা হাতে তুলে নিয়ে পাশে বসা আধারের উদ্দেশ্যে ফিসফিসিয়ে বললেন,
-“ডিভোর্সের এত তাড়া কিসের হ্যাঁ? সংসার করবে না ঠিক আছে। বউকে বাপের বাড়িতে বসিয়ে রাখো। ডিভোর্স দিলেই শুধু সম্পর্ক নষ্ট হয় না, আরো অনেক উপায় আছে। যেখানে তোমাদের সংসারটা শুরুই হলো না, সেখানে দুজনে মিলে অহেতুক ভাঙার চেষ্টা করছো। ডিভোর্স না দিয়ে বিচ্ছেদের আগুনে পুড়তে থাকো, তারপর বুঝতে পারবে তোমরা আসলেই কী চাও। আর আমি তো আছিই! কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না। তাহলে এত চিন্তা করছো কেন? যেভাবে চলছে ওইভাবে চলতে দাও। আর এটাও যদি মানতে না পারো, তাহলে ছোট বেলার মতো আবারো দেশ ছেড়ে চলে যাও। আর তোমার বউ অন্য ব্যাডার সাথে প্রেম করুক। তারপর নাহয় তোমাদের জন্য আবার নতুন করে পেপার রেডি করব। কেমন??”

আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলল, -“আপনি কী আমার সাথে মজা করছেন আঙ্কেল?”
-“মজা তো তোমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে করছো আমার সাথে। একজন সাইন করার সময় নিজের নাম না লিখে অন্যের নাম লিখেছে, আর একজনের হাতের মিরকি বেরাম উঠেছে। এগুলো মজা নয়তো আর কী হুম?”
তারেক হোসেন কথাগুলো বলে পেপারে ইশারা করে ধীর কণ্ঠে শুধাল, -“তোমার নাম যে আষাঢ় মাস, সেটা জানা ছিল না। তা এই নতুন নামটা কবে রাখলে? আর রাখলেও যখন, তখন আতিকা দিয়ে দাওয়াত দিলে না কেন? পোলাও, মাংস তো মিস হয়ে গেল।”
আধারের মুখাবয়ব শক্ত হয়ে গেল। সে চট করে ডিভোর্স পেপার নিয়ে একটানে ছিঁড়ে, দুভাগ করে লোকটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“নিন আপনার পোলাও আর মাংস!”
তারেক হোসেন মনে মনে হাসলেন। তবে গম্ভীর মুখে বললেন, -“এখন দশ হাজার টাকা জরিমানা দাও হে ছোকরা!”
আধার বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ফেললো। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তাহমিনা খান বললেন,

-“ডিভোর্স পেপার ছিঁড়লে কেন আধার?”
-“জানি না।”
আধার সোজাসাপ্টা জবাব দেয়। তাহমিনা খান চিল্লিয়ে উঠলেন,
-“তুমি আসলে কী চাও বলো তো!”
-“জানি না।”
বলেই আধার উঠে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই আলো ডেকে উঠল,
-“দাঁড়ান স্যার!”
আধার দাঁড়াল, তবে পিছু ফিরলো না। আলো উঠে এক ছুটে রুমে চলে গেল। তারপর আলমারি খুজে একটা খাম ও অনেকগুলো গহনার বক্স নিয়ে এসে তাহমিনা খানের সামনে রেখে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“এগুলো নিয়ে যান মা। আমার দরকার নেই।”
তারপর খাম নিয়ে স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-“এখানে আপনার দেওয়া চেক রয়েছে। এটাও নিয়ে যান।”
আধার একপলক মেয়েটার রক্তিম, ফুলে ওঠা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, -“এটা তোমার হক!”
-“যেখানে আমাদের সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই সেখানে এটা নেওয়ারও কোনো অধিকার নেই। আমি সময় নিয়েছি মানে এই না যে, আপনার সংসারে ফিরবো। তাই এটা নিজের কাছেই রাখুন!”
-“তোমাকে সময় দিয়েছি মানে এই নয় যে, বউ হিসেবে মেনে নিয়েছি। তোমার সময় যবে শেষ হবে, তখন বইলো। আমি এসে ডিভোর্স পেপারসহ এইটাও নিয়ে যাবো। ততদিন ভালো থাকো, আর অন্যকে জ্বালানো বন্ধ করো। আল্লাহ হাফেজ!”
একথা বলে আধার হনহনিয়ে চলে গেল। সে আজ নিজের ওপর ভীষণ বিরক্ত! এইদিকে তাহমিনা খান গহনার বক্সগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। এইগুলো বিয়েতে দেওয়া হয়েছিল মেয়েটাকে। আলো তার দাদাজানের কাছে এগিয়ে গিয়ে খাম বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

-“এটা নাও দাদাজান। বাড়িতে ফিরে তোমার নাতির মুখের ওপর ছুঁড়ে মা’রবে। ওকে?”
সোবহান খান উঠে দাঁড়িয়ে হাসলেন। তারপর মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-“তুমি যেদিন খান বাড়িতে ফিরবে, ওইদিন নিজ হাতেই নাহয় এই কাজটা কইরো। এখন আসছি নাতবউ। ভালো থেকো, আর শীঘ্রই ফিরে এসো। তুমি ছাড়া খান বাড়িটা একদম ফাঁকা ফাঁকা লাগে।”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৫

আলো প্রতিত্তোরে কিছু বলল না। সোবহান খান সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। উনার সাথে তারেক হোসেন ও রাফিও যান! সবাই চলে যেতেই আলো ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“পারলাম না বাবা! পারলাম না মুক্ত হতে। দিনশেষে তোমার স্বার্থপর মেয়ে নিজের বেইমান হৃদয়ের কাছে হেরে গেল। খুব বাজেভাবে হেরে গেল। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু না চাইতেও হয়ে গেল….!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৭

2 COMMENTS

Comments are closed.