Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৫

দাহশয্যা পর্ব ৯৫

দাহশয্যা পর্ব ৯৫
Raiha Zubair Ripti

তখন সকাল সাড়ে সাতটা কি আটটা বাজে। সাল ২০২২,এপ্রিলের ২৭ তারিখ। জঙ্গলের সেই পোড়া বাড়ির সামনে এসে সোলেমানদের গাড়িটা থামতেই সোলেমান হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। লোহার জং ধরা গেট টা ধাক্কা দিয়ে খুলে ভেতরে ঢোকার সময় একবার নজরে আসে পাশে একটা খুঁটিতে বেঁধে রাখা একটা কুকুরটাকে। তার সামনে একটি রক্তমাখা থালা। কুকুরটির মুখেও তখন রক্ত লেগে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তৃপ্তি সহকারে কিছু খেয়েছে।

সোলেমান চলতি পথেই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে চলতে লাগলো। হাতে তার গান। সামনে যেটাকেই পাবে সেটাকেই আজ সোলেমান নিজ হাতে শেষ হবে।
কিন্তু দেখা গেলো সোলেমান কাউকেই পাচ্ছে না। কেউ আসছে না। আঘাত করছে না লুকিয়ে। কি আশ্চর্য!
সোলেমান এদিও ওদিক ছুটতে লাগলো। নিচ তলা খুঁজলো,মেহরিন নেই। এখন দ্বিতীয় তলায় গেলো। সোলেমান এতক্ষণে বুঝে গেছে শেখর পালিয়েছে কিন্তু যাবে কতদূর সে। পুরো ঢাকা শহরে সে পুলিশ,আর্মি,নিজের লোক সব লাগিয়ে দিয়েছে। প্রতিটি রাস্তা প্রতিটি ব্লক চেক করা হচ্ছে। এয়ারপোর্টেও লোক লাগানো আছে। ওর বাংলাদেশের বাহিরে কেনো ঢাকার বাহিরেও যাওয়া অসম্ভব প্রায়।

সোলেমান দ্বিতীয় তলা টা খোঁজার সময় দক্ষিণ দিকের এক বদ্ধ ঘরের কাছটায় আসতেই খুব ক্ষীণ গোঙানির আওয়াজ পেলো। আর এক সেকেন্ড ও সময় নষ্ট না করে সাথে সাথে সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। আর তাতেই পুরো শরীর হিম হয়ে গেলো। তার চোখের সামনে ভাসছে সারা ফ্লোর জুড়ে জমাট বাঁধা রক্ত। আর সেই রক্তের ভেতর মেহরিনের দেহটা পড়ে আছে কুঁজো হয়ে। দৃশ্য টা দেখা মাত্রই সোলেমানের বুকের ভেতর টা অজানা আতঙ্কে দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। এত এত রক্ত! শেখর ওর বউটার সাথে কিছু করে নি তো! ওর বাচ্চা টা সুস্থ আছে তো!
সোলেমানের পৃথিবী যেন এলোমেলো হতে লাগলো। দৌড়ে এসে মেহরিনের রক্তে মাখা দেহটাকে আগলে নিলো দু হাতে চিৎকার করে ইব্রাহিম কে ডাকলো। ইব্রাহিম আসলো। রুমে ঢুকে রক্ত দেখে সেও চমকালো।
এদিকে সোলেমান মেহরিনের গালে হাত দিয়ে বারবার অস্থির গলায় ডেকে যাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটা সাড়া দিচ্ছে না। যন্ত্রণায় ঝাপসা চোখে শুধু একটু দেখলো। অথচ মেয়েটা অনেক কথাই বলতে চাইলো এই শরীর,এই মন নিয়ে। কিন্তু পারলো না। একটুও পারলো না। মুখ ফুটে বলতে পারলো না- আমার সন্তান টা আর নেই সুলতান সাহেব। মেরে ফেলা হয়েছে।

সোলেমান আর ডেকে সময় নষ্ট করলো না। তৎক্ষনাৎ তাকে পাঁজা কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
মেহরিন কে নিয়ে আসা হলো ঢাকা মেডিক্যালে। তার এমন অশোচনীয় অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি করে ইমার্জেন্সি তে নিয়ে যাওয়া হলো। ইব্রাহিম কল দিয়ে মোতালেব ভুঁইয়া কে খবর টা দিয়ে জানালেন যে মেহরিন কে পাওয়া গেছে।
কথাটা শুনে মোতালেব ভুঁইয়া দেহে প্রাণ ফিরে পেলেও পরক্ষণে যখন ইব্রাহিম বলল মেহরিন কে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসা হয়েছে। তখনই তার দুনিয়া থেমে গেলো। ফোনটা কেটেই সানজিদা বেগম,সেরিন আর বাতাসি কে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হয়।
ঢাকা মেডিক্যালের ইমার্জেন্সি করিডোরটা তখন প্রায় যুদ্ধক্ষেত্র। হুইলচেয়ারের চাকা, দৌড়াদৌড়ি করা নার্স, স্ট্রেচারের শব্দ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা। আর তার মাঝখানে সোলেমান দাঁড়িয়ে আছে একদম পাথরের মতো। মেহরিন কে ইমার্জেন্সিতে আনার পর একজন ডক্টর বলল-

“এত ব্লিডিং.. আল্লাহ! ওর ব্লাড গ্রুপ জেনে ব্লাড রেডি করুন কুইক!”
ব্লাড গ্রুপ জেনে ব্লাড ব্যাংক থেকে ও নেগেটিভ ব্লাড আনা হলো। ভাগ্যিস ছিলো এই গ্রুপের রক্ত। ডিউটি ডাক্তার দ্রুত পরীক্ষা করছিলেন। কিছুক্ষণ পর তার মুখের ভাব বদলে গেল। মুহূর্তেই ডাক্তাররা বুঝে যায় ব্যাপারটা স্বাভাবিক না। সেজন্য স্ট্রেচারে শুইয়ে দ্রুত মেহরিনকে ইমার্জেন্সি গাইনি ইউনিটে নেওয়া হয়। তার জামাকাপড় তখন পুরো রক্তে ভেজা। হাতের শিরায় ক্যানোলা ঢুকিয়ে স্যালাইন চালু করা হয়েছে। সিনিয়র গাইনি ডাক্তার রোগীকে দ্রুত পরীক্ষা করেন। তারপর আল্ট্রাসাউন্ড করানো হয়।
মনিটরে যা দেখা যায়, সেটা সবাইকে এক মুহূর্তে থমকে দেয়। জরায়ুর আকার চার মাসের প্রেগন্যান্সির সাথে মেলে, কিন্তু ভেতরের অবস্থা ভীষণ অস্বাভাবিক। টিস্যু ড্যামেজ, অসম্পূর্ণ এক্সপালশন, এবং জরায়ুর ভেতরে ইনজুরির ইঙ্গিত। ডাক্তার নিচু গলায় বলেন-

“পেশেন্ট প্রেগন্যান্ট ছিল।”
ইমার্জেন্সি ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন-
“কত মাস?”
“প্রায় চার মাস,” গাইনি ডাক্তার উত্তর দেন।
“সেকেন্ড ট্রাইমেস্টার।”
তারপরই আরেকটা লেয়ার আসে। কারণ ইনজুরির ধরন দেখে সন্দেহ বাড়ে।
“এটা ন্যাচারাল মিসক্যারেজ না,” সিনিয়র ডাক্তার ধীরে বলেন। “ট্রমাটিক ইনজুরি। খুব সাম্প্রতিক।”
তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত হয় অপারেশনের। মেহরিনকে ওটিতে নেওয়া হয়। ব্লাড ট্রান্সফিউশন শুরু হয়। জরায়ুর ভেতরের অবশিষ্ট টিস্যু পরিষ্কার করা, ব্লিডিং কন্ট্রোল করা, এবং ইনজুরি ম্যানেজ করা সব একসাথে চলছে।
সোলেমান ওটির বাহিরে ঠাই বসে আছে পাথর হয়ে। চোখ তার মারাত্মক লাল। ডক্টররা কিছুই বলছে না। বের ও হচ্ছে না। মেহরিন আর তার বাচ্চা টা ঠিক আছে তো? তখনই করিডরে কয়েকটা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা পায়ের আওয়াজ শোনা যায়।
মোতালেব ভুঁইয়া রা এসেছেন। ইব্রাহিম কে দেখেই তিনি এগিয়ে এসে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলেন –

“ বাবা আমার মাইয়াটা ও ঠিক আছে তো? ওর বাচ্চা,সবাই ঠিক আছে তো? ”
কথাটা বলতে বলতে তার চোখ চলে যায় পেছনে বেঞ্চে বসে থাকা সোলেমানের দিকে। সাথে সাথে চমকে উঠেন তিনি। সোলেমান না মা-রা গেছে? তাহলে? মোতালেব ভুঁইয়া এগিয়ে সোলেমানের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক গলায় বলেন-
“ তুমি না বাবা আগুনে পুড়ে মা-রা গেছ? তোমার চাচা তো আমাদের এটাই বলছিলো। ইব্রাহিম বাবা তুমিও তো এটাই বলছিলা। তাহলে? ”
সোলেমান মাথা উঁচু করে একবার তাকায়। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে-
“ আমি মারা যাই নি আঙ্কেল। আমি বেঁচে আছি। পরে বলবো সবটা। আগে আমার মেহরিন আমার বাচ্চা সুস্থ হোক। ”
মোতালেব ভুঁইয়া বসে পরলো তার পাশে। তখনই ডাক্তার আসলেন। মেহরিনের বাবা স্বামী দুজনই উঠে এগিয়ে গেলেন একসাথে। দুজনই বলতে লাগলেন-

“ মেহরিন এখন কেমন আছে? আর সন্তান? সে কেমন আছে? ওতো রক্ত বের হলো কেনো? কি হয়েছিল? ”
ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বললেন,
“রোগীর শরীরে সিভিয়ার ব্লিডিং হয়েছে। আমরা যতটুকু বুঝেছি, উনি প্রায় চার মাসের প্রেগন্যান্ট ছিলেন। কিন্তু খুব অল্প কিছু ঘণ্টা আগে জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানো হয়েছে বলে সন্দেহ করছি।”
কথাটা শুনেই সোলেমান দু কদম পিছিয়ে গেলো। ইব্রাহিম ধরে ফেললো। গর্ভপাত করানো হয়েছিল তার ঐ টুকু বউটার! সেজন্য ওতো রক্ত ছিলো ফ্লোরে! শেখর এটা কি করলো! জানোয়ার টা ওর নিষ্পাপ সন্তান টাকেও রেহাই দিলো না!
মোতালেব ভুঁইয়া থমকে গেলেও তিনি এখনো আকুল হয়ে আছেন মেয়ের অবস্থা জানার জন্য। সানজিদা বেগম চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। তার মেয়েটার সাথে এত করুণ কাজ করা হয়েছে! সেরিন নিজের মুখ চেপে ধরে নিচে বসে পড়ল। বাতাসির চোখ পুরো ফাঁকা হয়ে গেছে। মোতালেব ভুঁইয়া জিজ্ঞেস করলেন –

“ আমার মাইয়া টা কেমন আছে? ”
ডাক্তার আবার বললেন-
“ উনার অবস্থাও খুব একটা ভালো না বললেই চলে। জরায়ুর ভেতরে ইনজুরি আছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা এখন ব্লিডিং বন্ধ করার চেষ্টা করছি। নেক্সট টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স খুব ক্রিটিক্যাল।”
দীর্ঘ ২৪ ঘন্টা পর মেহরিনের জ্ঞান ফিরলো। সোলেমান খবরটা পেয়েই ছুটে দৌড়ে হসপিটালে আসে। এতক্ষণ সে ঐ পোড়া বাড়িতে তার সন্তানের দেহটা পাগলের মতো খুঁজছিল। শেখর কে তো এখনো পাওয়া যায় নি। পাওয়া গেলে তার মুখ থেকেই জানতে পারতো। পুরো আশপাশ টা সে কোদাল দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখেছে। নাহ্ কিচ্ছু নেই। ক্লান্ত হয়ে ঐ কুকুরটার পাশেও বসেছিল সে। কুকুরটার শরীরে হাতও রেখেছিল। কুকুরটাকে বলেছিল-
“ তুই কি দেখেছিস রে আমার সন্তানটার দেহ ওরা কোথায় রেখেছে? বল না কোথায় রেখেছে। আমি দেখতে চাই,ছুঁতে চাই,কোলে নিতে চাই,বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে চাই,ক্ষমা করো না কখনো বাবা কে। বাবা তোমাকে বাঁচাতে পারে নি। ”
কুকুরটা তখন সেই থালাটা জিহ্বা দিয়ে চাটতে শুরু করলো। সন্তানটাকে নিয়ে তাদের কত স্বপ্ন কত আশা ছিলো। শেখর সব তচনচ করে দিলো! বাপ হতে দিলো না তাকে! আকাশ-পাতাল এক করে কাঁদতে চেয়েও আর কাঁদতে পারছে না। সোলেমানের ঝাপ্সা টলমল দৃষ্টি তখন অদূরে। তার ভাবনার আশেপাশেও নেই যে তার বাচ্চার দেহটাকে শেখর কুকুর দিয়ে খাওয়াতে পারে।

ইয়াসিন,আমিরুল সুলতান,আফিয়া সুলতান ও এসেছে। তারা সোলেমান দেখে চমকালো। আফিয়া সুলতান ছেলের বুকে দৌড়ে চসলেন। কপালে সারা মুখে চুমুতে ভরিয়ে দিলেন। তার ছেলেটা বেঁচে আছে! মেহরিনের জ্ঞান ফেরার পর সর্বপ্রথম সোলেমানই দৌড়ে ঢুকলো কেবিনে। তখন মেহরিন বেডে, মুখে অক্সিজেন মাক্স,হাতে স্যালাইন। চোখ বন্ধ করা নাকি খোলা বুঝা গেলো না। ভেতরে একজন নার্স ও আছে। সোলেমান এগিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়াতেই মেহরিনের চোখের পাপড়ি নেড়ে উঠলো। চেয়ার টেনে সোলেমান বসে মেহরিনের হাত ধরবে আর তখনই মেহরিন আস্তেধীরে তার কাঁপা হাত দিয়ে মুখ থেকে অক্সিজেন মাক্স টা খুলে নার্স কে ডেকে বলল –
“ আ…আমার আ..আব্বা কে ডেকে দিন । আমি তিনি ব্যতিত আর কারো সাথে দেখা করতে চাই না। ”
সোলেমানের বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। নার্সটা দরজার কাছে গিয়ে বলল-

“ রোগীর বাবা কে? ”
মোতালেব ভুঁইয়া সাথে সাথে সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন-
“ আমি,আমি মেহরিনের বাবা। ”
“ রোগী আপনার সাথে দেখা করতে চায়। ”
মোতালেব ভুঁইয়া চোখের জল মুছে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। সোলেমান তখনও ঠাই বসা ছিলো। মোতালেব ভুঁইয়া কে দেখে সে উঠে দাঁড়ায়। মোতালেব ভুঁইয়া এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল-
“ মা, মেহরিন আমার। যন্ত্রণা হচ্ছে এখনো? আমারে ক্ষমা করে দাও মা। আমি যদি সেদিন তোমারে একা রেখে না যাইতাম,তাহলে এসব কিচ্ছুই হতো না তোমার সাথে। তোমার বাবার জন্য তোমার এই অবস্থা। ”
মেহরিন তাকালো তার বাবার মুখের দিকে। তার এখন আর আকাশ-পাতাল এক করে কান্না আসছে না। সব কান্না ফুরিয়ে গেছে। অনুভূতি শূন্য হয়ে গেছে। পাশ থেকে সোলেমান এগিয়ে আসতে চাইলে মেহরিন তৎক্ষণাৎ বাবার হাত চেপে ধরে বলল-

“ এ…এই লো…লোকটাকে বের হয়ে যে…যেতে বলো আ…আব্বু। আমি এই লোকটার মুখটাও দেখতে চাই না কোনোদিন। ”
সোলেমান কিছু বলার জন্য উদ্যোত হলেই মেহরিন হাতের স্যালাইন খুলতে খুলতে বলল-
“ উনাকে আমার সামনে থেকে না সরালে আমি নিজেই এই অবস্থায় উঠে যেতে বাধ্য হবো আব্বু। ”
নার্স এসে মেহরিন কে শান্ত করার ব্যবস্থা করলেন। সোলেমান কে চলে যেতে বললেন। মোতালেব ভুঁইয়া বুঝলেন না মেয়ে তার এমন করছে কেনো? তিনিও মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মেয়ে শান্ত হলেন না। উত্তেজিত হতে শুরু করলো। আর এই অবস্থায় উত্তেজিত হওয়া মানে আবার ব্লিডিং যন্ত্রণা শুরু হওয়া। সোলেমান অনিচ্ছা থাকা স্বত্বে মেহরিনের জন্য বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে। সোলেমান চলে যেতেই মেহরিন শান্ত হলো। চোখ বুজলো। কার্নিশ বেয়ে গড়ালো অশ্রু। মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন।
সোলেমান বের হয়ে আসলো। এক এক করে সবাই মেহরিন কে দেখে আসলো। মেহরিন কারো সাথে আর একটা কথাও বললো না। সে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে ছিলো কেবিনের ছাঁদের দিকে।
ইব্রাহিম এগিয়ে এসে সোলেমানের কাঁধে হাত রাখতেই সোলেমান তাকে জড়িয়ে ধরে বলল-

“ জানিস মেহরিন আমার সাথে কথা বলে নি ইব্রাহিম। তাকায়ও নি। আমার মুখ নাকি কোনোদিন দেখবে না। এ কেমন সাজা ওরা আমাকে দিলো রে ! কিসের সাজা আমি পেলাম। ওরা আমার রক্ত,আমার অনাগত সন্তান টাকেই মেরে ফেললো ! এরচেয়ে ওরা আমার শরীরে মাংস কেটে নিত । যতটা পারতো নিত । বিশ্বাস কর আমি বাঁধা দিতাম না । একটা টু শব্দও করতাম না । কিন্তু ওরা আমাকে হারানোর জন্য আমার নিরপরাধ সন্তানটারে মেরে ফেললো ইব্রাহিম । ”
সোলেমান ইব্রাহিম কে ছেড়ে দাঁড়ালো। হাতের মুঠো শক্ত করে আবার বলল-
“ আমি কাউকে ছাড়বো না,কাউকেই না। এমনকি চাচা তোমাকেও না। আজ তোমার জন্য আমার এই দশা। অনেক ভালোবাসছিলাম তোমাকে। বাবার জায়গায় বসিয়েছিলাম। সেটারই সুযোগ নিয়ে তুমি আমাকে নিঃস্ব করে দিচ্ছো। তোমরা সব কটা মরবে আমার হাতে। সব কটা মানে সব কটা। একটারও ছাড় নেই এবার। ”
পুলিশ স্টেশন থেকে সোলেমান কে খবর দেওয়া হলো শেখর কে তারা পুরান ঢাকার একটি রাস্তা থেকে আটক করেছে।
সোলেমান কথাটা শোনামাত্রই পুলিশ স্টেশনে গিয়ে শেখর কে তুলে আনে কসাইখানায়। শেখরের আজ মৃত্যুর ভয় হচ্ছে। এভাবে ধরা পরে যাবে বুঝতেও পারে নি। সে সোলেমানের হাত পা ধরলো। জান ভিক্ষা চাইলো। সোলেমান কি সেসব শোনার মানুষ? স্ট্যাম্প দিয়ে একাধারে দু ঘন্টা পেটালো। মারতে মারতে জিজ্ঞেস করলো-

“ আমার সন্তান কে কেনো মেরেছিস? বল কেনো মেরেছিস? ওর কি দোষ ছিলো? তোর শত্রুতা তো ছিলো আমার সাথে। তাহলে কেনো তোরা প্রথমে আমার বোন তারপর আমার স্ত্রী সন্তানের দিকে হাত বাড়ালি? ”
“ আমার ভুল হয়ে গেছে সোলেমান। মাফ করে দে। ”
“ এটা ভুল? মাফ করে দিব তাও আবার তোকে! নেভার। আমার সন্তানের দেহটার সাথে তোরা কি করেছিস বল। ”
শেখর জবাবে বলল-
“ জানি না,জানি না ঐ নার্সরা কোথায় নিয়ে গেছে। সত্যি আমি জানি না। ”
“ কেনো এমনটা করেছিস? ”
“ তোকে কেবল হারানোর জন্য। আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছিস তুই। কুকুরের মতো পালিয়ে বাঁচতে হচ্ছিলো আমাকে। সেজন্য, হ্যাঁ সেজন্য। ”
“ আর কে কে আছে তোর সাথে? তোর বাপ? ”
“ না না আর কেউ নেই আমার সাথে। সবটা আমি একাই করেছি। ”

তারপর আর কোনো কথা বলারই সুযোগ দিলো না সোলেমান তাকে। হাতে ছুড়ি তুলে নিয়ে শেখরের সারা শরীরে লম্বা বরাবর কেটে মরিচের গুঁড়া লাগিয়ে দিলো। শেখর তখন আর্তনাদে ফেটে পড়ছে। সোলেমান এতেও থেমে নেই। সে শেখরের শরীরে টা। স’মিল মেশিনের উপর হাত পা বেঁধে টেনে উঠালো। এই মেশিন দিয়ে কাঠ কাটা হলেও সোলেমান আস্ত জীবন্ত মানুষ কাটে। শেখর নিজের আসন্ন মৃত্যু কে সামনে থেকে দেখছে। এক মিটার দূরেই তার মৃত্যুর অবস্থান। সে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য বলল-
“ মারিস না আমায় সোলেমান। জান টা ভিক্ষা দে আমায়। ”
সোলেমান হাসলো সে কথা শুনে। চপাট করে একটা চড় শেখরের গালে বসিয়ে বলল-
“ আমার সন্তানটার জান ফিরিয়ে দে। কথা দিচ্ছি আমিও তোর জান ভিক্ষা দিব। পারবি? যদি পারিস আমি তোকে ছেড়ে দিব। ”

সোলেমান জানে শেখর পারবে না। আর সোলেমান ও শেখর কে ছাড়বে না। সেজন্য আর সময় নষ্ট করলো না। স’মিলের মেশিন নিয়ে কাঠ কাটার মতো শেখরের দেহটাকেও সে কেটে শরীর থেকে আলাদা করে ফেললো। পুরো রুম রক্তে ভেসে গেলো। দেহটা কাটা শেষে সোলেমান সেগুলো কে ছেলেপেলে দিয়ে পুড়িয়ে বারবিকিউ করে রাস্তার সকল কুকুর দের দিয়ে খাওয়ালো।
তারপর আবার হসপিটালে আসতেই সোলেমান জানতে পারলো ডিসচার্জের পর মেহরিন নওগাঁ তার বাবার বাড়িতে চলে যাবে। সে সুলতান ভিলা বা সুলতান নিবাসে আর কোনোদিন যাবে না। সদ্য সন্তান হারানোর শকেই হয়তো মেয়েটা এমন করছে,এটাই ভাবতে লাগলো সকলে। সোলেমান কথা বলার চেষ্টা করলো কিন্তু মেহরিন তার সিদ্ধান্তে অটল। সোলেমান কেবিনে আসতেই সকলে বের হয়ে যায়। তখন সোলেমান কেবিনের দরজা আঁটকে দিয়ে মেহরিনের সামনে দাঁড়ায়। মেহরিন উঠে চলে যেতে চাইলে সোলেমান চেপে ধরে বুকের সাথে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে-

“ সবে নিজের সন্তানকে হারিয়েছি। এরপর তুমিও যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও, তাহলে কীভাবে বাঁচবো বলো তো? ”
মেহরিন সোলেমানের বুকের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে অতি ঠান্ডা গলায় বলল-
“ বাঁচতে না পারলে ম’রে যান। ”
সোলেমানের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেলো।
“ মেহরিন,ছেড়ে যেও না আমায়। থেকে যাও আমার সাথে। ”
“ নিজের সন্তানের খুনির সাথে আর থাকি কি করে বলুন তো? বিশ্বাস করুন ঘৃণায় আমি মরেই যাব। ইতিমধ্যে তো মনের দিক দিয়ে মরেই গেছি বলুন নিজের গর্ভজাত সন্তানটিকে হারিয়ে। দেহের দিক দিয়ে পুরোপুরি ভাবে মরে গেলে ল্যাটা চুকে যেত। যেহেতু দেহটা মরে নি,সেহেতু আপনার সাথে থেকে গেলে আমার সেই দেহেরও মৃত্যু ঘটে যাবে। আর আমার মৃত্যু আমার বাপ সইতে পারবে না। আমি পেরেছি। পেরেছি বলেই বেঁচে আছি। দয়া করে আমার বাপের খুনি হইয়েন না। আপনার পাপের সাজা আমি পাইছি,আমার সন্তান পাইছে,এখানেই শেষ। আমার বাপ অব্দি আসলে সেটা একদম ভালো হবে না আপনার জন্য। আপনি দূরে থাকুন আমাদের থেকে। কাছে আসার চেষ্টা করবেন না। ঘেন্না লাগে আপনি আশেপাশে থাকলে সেই বাতাস সেই উপস্থিতি কে। ”
সোলেমানের হৃদয় টা চূর্ণবিচূর্ণ হতে লাগলো মেহরিনের প্রতিটি কথায়।

“ সন্তান কি তোমার একার ছিলো সে? আমার ছিলো না? ও তো আমারই রক্ত ছিলো মেহরিন। কিভাবে এই কথা বললে! বুক কাঁপলো না একবারও? ”
“ না কাঁপলো না। বাপ হওয়ার কোন দায়িত্ব পালন করেছেন আপনি? পেরেছেন নিজের সন্তান কে বাঁচাতে? গর্ভে ধারণ করেছিলাম আমি। মরন যন্ত্রণা সহ্য করেছি আমি। গর্ভ থেকে টেনে বের করা হয়েছে আমার। তাহলে সেই সন্তান আপনার হয় কি করে? কেবল রক্ত ছিলো আপনার সেজন্য? ”
সোলেমান আদ্যোপান্ত দেখলো মেহরিন কে। মেহরিন এমন শক্ত শক্ত কথা কখনোই বলে না। সে সন্তান হারা মা হলে সোলেমান ও তো সন্তান হারা বাপ। মেহরিনের যেমন কষ্ট হচ্ছে তেমন সোলেমানেরও হচ্ছে। মেহরিনের হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে বলল-

“ আমি স্বীকার করে নিচ্ছি আমি বাবা হিসেবে ব্যর্থ। পারি নি নিজের সন্তান কে বাঁচাতে। আজীবন আমি এই দায় মাথায় নিয়ে বয়ে বেড়াবো। তুমি যেওনা আমায় ছেড়ে। তুমি বলে দাও আমি কি করলে তুমি আমায় ছেড়ে যাবে না। আমি তাই করবো। তুমি যা যা বলবে সব শুনবো। ”
“ পারবেন আপনি আমাকে আমার ৭২ ঘন্টা আগের জীবন টা ফিরিয়ে দিতে? পারবেন আমার সন্তানটার দেহটাকে ঐ কুকুরের পেট থেকে বের করে আমার গর্ভে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে? পারবেন? ”
সোলেমানের কানে বাজতে লাগলো তখন একটা কথা। মেহরিন ওটা কি বললো! তার সন্তানের দেহ কুকুরের পেটে!
“ কি বললে তুমি একটু আগে মেহরিন! আমার সন্তান কোথায়? ”
মেহরিন ধরা গলায় বলল-
“ কুকুরের পেটে,শুনেছেন কখনো? শুনেন নি। আজ শুনুন নওয়াজ সোলেমান সুলতান। আমার সন্তানের ঠাই হয়েছে এক কুকুরের পেটে। ”

সোলেমানের হৃদয়টা টুকরো টুকরো হতে লাগলো। এতদিন সে মানুষের মাংস খাইয়েছে আর আজ তার সন্তান কে খেয়েছে কোনো কুকুর!
কথায় আছে না টিট ফর ট্যাট? পৃথিবী কে তুমি যা দিবে। পৃথিবীও তোমাকে তাই ব্যাক দিবে। নাও এবার নওয়াজ সোলেমান সুলতান পৃথিবী তোমার জিনিস তোমাকেই ফেরত দিতে শুরু করেছে। আর পৃথিবী যখন দিতে শুরু করে তখন একদম নিঃস্ব বানিয়ে ছাড়ে। তোমার ক্ষেত্রেও এটা ব্যতিক্রম হবে না নওয়াজ সোলেমান সুলতান।
সোলেমান ফের সেই পোড়া বাড়িতে যায়। রাম দা হাতে হাতে নিয়ে। সন্তান হারানোর শোক কি কোনো পিতা আর সইতে পারে? তার উপর যদি কোনো পিতা শুনে তার অনাগত সন্তানের অস্তিত্ব কোনো কুকুরের পেটে! সোলেমান ও পারছে না। না পেরে সে ওই কুকুরটিকে নিজ হাতে রাম দা দিয়ে হ’ত্যা করে,কুকুরটির দেহ পেট ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে, পাগলের মতো তার সন্তানের ভ্রূণ খুঁজতে থাকে। সোলেমান খুঁজে আর সন্তানের দেহ কোনটা বুঝে উঠতে পারে না। সে শুধু পাগলের মতো সারা শরীর হাত তার কুকুরের খণ্ডাংশ নাড়িভুড়ি গুলো হাতড়ে হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করে কোনটা তার সন্তানের ভ্রূণ।

ডিসচার্জের পর মেহরিন সত্যি সত্যি তার বাবার সাথে নওগাঁ চলে গেল। মেহরিন কোনো উদার মনের এক চোখা নির্বোধ নারী নয় যে সে নারী পাচারকারী, তার সন্তানের খুনির সব অন্যায় মেনে নিয়ে তার সাথে মুখ বুঝে শোক ভুলে সংসার করবে। সে যেমন আকাশ সমান,বুক উজাড় করে ভালোবাসতে পারে আবার তেমন ঘৃণাও করতে পারে। মেহরিন নামের মেয়েটা সব পারে। নরম ও হতে পারে তার ব্যক্তিগত পুরুষের জন্য আবার শক্ত হয়ে দূরত্বও বাড়াতে পারে। অন্যায় মানে অন্যায়ই। সেই অন্যায় কখনোই ভালোবাসার পাল্লা দিয়ে মাপার মতো ভুল করা মেয়ে অন্তত মেহরিন নয়।
শক্ত হৃদয়ের পুরুষ টা মেহরিন কে বিয়ে করার পরপরই নরম হৃদয়ের হয়ে গেছে। সেজন্যই বুঝি আঘাতটা এতবার তার দরজায় কড়া নাড়ছে? আগে তো সাহস পায় নি। সব নষ্টের মূল কি তবে তার দূর্বল হৃদয়! হু,দূর্বল হৃদয়ই। যতবার দূর্বল হয়েছে ততবারই আঘাত পেয়েছে। সোলেমান হারাতো হারাতে তো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। এই হৃদয় আরো দূর্বল থাকলে দিনশেষে সর্বশেষ মানুষ মেহরিন টাও বোন সন্তানের মতো হারিয়ে যাবে। আর সোলেমান সেটা চায় না। সে আর দূর্বল হবে না। আগের ন্যায় পাথরের মতো হবে। তাহলে আঘাত কম আসবে,মানুষ কম হারাবে।

এজওয়ান আজ বাড়ি ফিরেছে একগাদা ফাইল হাতে নিয়ে। মাহি তখন রান্না ঘরে নিজের জন্য কফি বানাচ্ছিল। এজওয়ানের উপস্থিতি টের পেয়েছে সে। কফির মগ হাতে এনে এজওয়ানের মুখোমুখি অন্য সোফায় বসতেই এজওয়ান সোফায় গা টা এলিয়ে দিয়ে বলল-
“ মাথাটা প্রচুর ব্যথা করছে তরিকুলের বেটি। ”
মাহি কফির মগে চুমুক বসিয়ে বলল-
“ এখন আমাকে কি করতে বলেন? ”
“ মাথা টিপে দাও। ”
মাহি টি-টেবিলে কফির মগ টা রেখে বলল-
“ আসুন। ”
এজওয়ান বেশ অবাক হলো। মনে হলো দিনের বেলায় চাঁদ উঠেছে হয়তো। ঘোরে চলে যাওয়ার মতো অবস্থা। এজওয়ান উঠে এসে সোফায় শুয়ে মাহির কোলে মাথাটা রাখতে যাওয়ার সময় মাহির কফির মগে একটা চুমুক বসিয়ে দিলো। তারপর শুতে শুতে বলল-

“ এক বাসনে স্বামী স্ত্রী খাবার খেলে মিল মোহাব্বত বাড়ে। তাই এক চুমুক বসিয়ে দিলাম। এখন তুমিও খেয়ে দেখো আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা তড়তড় করে বাড়তে থাকবে। ”
মাহি আর খেলোই না ঐ কফি। এজওয়ানই খেয়ে ফেললো। মাহি মাথা টিপে দিতে দিতে এজওয়ান কে বলল-
“ আপনি এ বাড়িতে উঠেছেন আজ কয় বছর ধরে? আগে কোথায় থাকতেন? এই বাড়ি নাকি আগে বন্ধ ছিলো। পাশের বাড়ির এক প্রতিবেশী বললো। ”
এজওয়ান উঠে বসলো সাথে সাথে। ফাইল গুলোয় হাত লাগিয়ে বলল-
“ তোমাকে বলেছিলাম তো এটা এখন আমার বাড়ি। সেখানে আগে কোথায় থাকতাম,কবে উঠেছি এসব প্রশ্ন কেনো আসছে? আমি তোমাকে যেটুকু জানাচ্ছি সেটুকুই জেনে থেকো। ”
“ সাধারণ একটা প্রশ্ন করেছিলাম আমি। সাধারণ ভাবে উত্তর দেওয়া যেত না? ”
এজওয়ান কিছু বললো না। মনোযোগ দিয়ে ফাইল গুলো খুলে দেখতে লাগলো। মাহি উঁকি দিয়ে ফাইল গুলো দেখার চেষ্টা করে বলল-

“ কি এতো মনোযোগ দিয়ে দেখছেন? কিসের ফাইল এটা? ”
এজওয়ান না তাকিয়েই বলল-
“ মনস্টার, দ্যা শ্যেডো মনস্টারের ফাইল। ”
মাহি নামটা শুনে খানিকটা ভ্রু কুঁচকালো। মনস্টারের বিষয়ে সে অনেক শুনেছে। অনেক মানে অনেক। তার ফাইল এজওয়ান কেনো দেখছে?
মাহি ফাইলটা কেড়ে নিতে চাইলে এজওয়ান থাবা দিয়ে বাঁধা দিয়ে বলল-
“ হোয়াটস রং উইথ ইউ তরিকুলের বেটি? দেখছো না কাজ করছি আমি? ”
“ আরে আমিও দেখি না। আপনি তার ফাইল কোথায় পেলেন? ”
মাহির চোখ গেলো ফাইলের উপর থাকা ASIO এর নামটার উপর। এটা তো একটা গোয়েন্দা সংস্থার নাম।
“ ASIO এর ফাইল আপনার কাছে কেনো? কে আপনি? সত্যি করে বলুন তো। ”
“ অ্যাম ইয়্যুর হাসবেন্ড, দ্যাটস এনাফ ফর ইয়্যু। এর বাহিরে আমার আর কোনো পরিচয় নেই। ”
“ মিথ্যা বাদি। ”
এজওয়ান চোখের দৃষ্টি মাহির থেকে সরিয়ে ফাইলের দিকে তাকিয়ে পানসেচোখে বলল-

“ তোর বাপ মিথ্যা বাদি শালি। যা সর এখন। কাজ করতে দে। পরিচয় কাল দেখাবো তোকে। কাপড় ভিজিয়ে ফেললে খবর আছে । ”
মাহি বিরক্ত হয়ে উঠে চলে গেলো। বেয়াদব ফালতু একটা ছেলে এই এজওয়ান। এই লোক মাহির ভালো কথাই ডিজার্ভ করে না। এজওয়ান মাহির বিরক্তিকর চাহনি দেখে বলল-
“ তরিকুলের বেটি শোনো। ”
মাহি দাঁড়ালো।
“ আসো একটা ইম্পরট্যান্ট কথা বলি তোমাকে। ”

এজওয়ান এমন সিরিয়াস করলো মুখটা কে যে মাহি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করলো,আসলেই হয়তো কোনো ইম্পরট্যান্ট কথাই বলবে। সেজন্য মাহি গিয়ে এজওয়ানের থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বসলো। এজওয়ান মাহির দিকে ঘুরে বলল-
“ আমাদের দুজনেরই উচিত আমাদের এই সম্পর্ক টাকে আরো সুন্দর ভাবে এগিয়ে নেওয়া। আর এটা আমার একার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব নয় তরিকুলের বেটি। তোমার সহযোগিতাও কাম্য এখানে। ”
এজওয়ানের কথা শুনে মাহির কপাল কুঁচকে আসলো। এটা নাকি ইম্পরট্যান্ট কথা! সেও ভাবুক হওয়ার ভান করলো। বেশ অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা ভাবনা করে উত্তরে জানালো-
“ আই থিংক ইয়্যু আর রাইট। আসলেই আমাদের এই ভাঙাচোরা জোড়াতালি সম্পর্ক টাকে ঠিক করা উচিত। ”
তরিকুলের বেটির মুখে পৃথিবীর এমন অষ্টম আশ্চর্য মার্কা কথা শুনে এজওয়ানের চোখ মুখ অবিশ্বাস্যের মতো খুশিতে জ্বলে উঠলো।

“ আমি সিরিয়াসলি বলছি কিন্তু তরিকুলের বেটি। ”
মাহি পাশ ফিরে তাকিয়ে শূন্য অভিব্যক্তি নিয়ে বলল-
“ আমিও সিরিয়াস হয়ে বলছি। ”
এজওয়ান এগিয়ে আসলো। মাহির গা ঘেঁষে বসে মিনমিনে সুরে বলল-
“ তুমিও যখন এই সম্পর্ক নিয়ে সিরিয়াস তাহলে can i fuck you senseless, sweetheart? ”
সাথে সাথে বিদ্যুৎের গতিতে মাহি দাঁড়িয়ে গেলো। সোফা থেকে কুশান তুলে নিয়ে এজওয়ানের মুখে ছুঁড়ে মেরে বলল-
“ আমার সিরিয়াস মুডের ১২ টা বাজিয়ে দিলেন। আমি আর সিরিয়াস হবো না এই সম্পর্ক নিয়ে। এবার আপনি একাই এই সম্পর্ক কে জোড়াতালি লাগিয়ে এগোতে থাকুন সারাজীবন। ”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ সারাজীবন? ”
“ ইয়েস সারাজীবন। ”

এজওয়ান হাত বাড়িয়ে মাহির এমন জায়গায় একটা কষে থাপ্পড় মেরে বলল-
“ ওরে তরিকুলের বেটি কি শোনালে এটা। তারমানে তুমি আমার এই জোড়াতালি মারা সম্পর্কে সারাজীবন থাকতে রাজি! ও মাই গুডনেস। হায়হায় আমি তো খুশিতে আকাশে উড়ে যাচ্ছি সুইটহার্ট। আসো সেই খুশিতে তোমার গালে টাইট করে দুটো চুমু খাই। ”
মাহি ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো এজওয়ান কে। থাপ্পড় মারা জায়গাটা জাস্ট তার জ্বলে যাচ্ছে। জ্বলে যাওয়া জায়গাটা হাত দিয়ে ঘোষতে ঘোষতে চলে যেতে যেতে বলে উঠলো-
“ জায়গাটা হয়তো লাল বানিয়ে হাতের ছাপ বসিয়ে দিয়েছে লম্পটটা। ”
এজওয়ান চিল্লিয়ে বলে উঠলো-

দাহশয্যা পর্ব ৯৪ (৩)

“ কি বললে তুমি তরিকুলের বেটি? জোরে বলো শুনতে পারি নি। ”
মাহি পেছন না ফিরেই বলল-
“ ভালো হতো পারেন না? আজীবনই কি এরকম খারাপ থাকবেন? ”
এজওয়ান হাই তুলতে তুলতে বলল-
“ বেশ, বেশ, I can be your good boy, If you be my bad girl তরিকুলের বেটি। ”

দাহশয্যা পর্ব ৯৫ (২)