Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (৪)

দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (৪)

দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (৪)
Raiha Zubair Ripti

সোলেমানের কান থেকে হুট করে ফোনটা পড়ে যেতে ভ্রু কুঁচকে ফেললো মেহরিন। চোখ মুখের ভঙ্গিমা পাল্টে গেছে ইতিমধ্যেই। কেমন শক্ত,বিস্ময়কর চাহনি। মেহরিন ফোনের দিকা তাকালো। এখন কলে আছে অনিক ভাইয়া। তবে কিছু বলছে নাকি বলছে না তা শোনা যাচ্ছে না। সেজন্য মেহরিন নিজেই ঝুঁকে ফোনটা তুলতে নিলে তার আগেই সোলেমান ফোনটা তুলে অনিক কে, আসছি বলে কেটে দিলো। মেহরিন উৎসুক শূন্য চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছে। আসছি মানে? মেহরিন যে তার আব্বুর সাথে কথা বলবে। সোলেমান বলাবে না?
সোলেমান টেবিলের উপর থেকে মানিব্যাগ নিয়ে ঠাণ্ডা গম্ভীর গলায় মেহরিনের বা হাতটা ধরে বলল,

” চলো মেহরিন। ”
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো,
” কোথায় যাব আমরা? কোথায় নিয়ে যেতে চাইছেন? ”
সোলেমান ঘাড় ফিরিয়ে মেহরিন কে দেখলো। তারপর ঠান্ডা শীতল চাহনি তে প্রশ্ন করলো,
” তোমার আব্বুকে দেখবে না তুমি? ”
মেহরিন ছলছল নয়নে উপর নিচ মাথা ঝুকালো সাথে। সে তার আব্বুকে দেখবে। তার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কান্না করবে। কি ভয়ংকর স্বপ্নই না সে দেখেছিল। তারপর মেহরিন কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি তে সোলেমানের দিকে তাকালো। সে কৃতজ্ঞ সোলেমানের কাছে। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলো সেই দৃষ্টি তে। বোরকা টা পড়ে আসতে চাইলে সোলেমান বলল,
” সময় নেই। আমাদের তাড়াতাড়ি যেতে হবে মেহরিন। রাস্তায় খুব যনজাট। শিবির দের আন্দোলন হচ্ছে। দেরি হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকবে না। ”
মেহরিনের কানে বাজতে লাগলো, ” দেরি হয়ে গেলে কিছু করার থাকবে না মানে? কিসের দেরি? মেহরিন দেরি করতে চায় না। সে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে হাঁটা ধরলো সোলেমানের সাথে।
সোলেমান গাড়িতে ওঠার আগেই ঢাকা শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ফোন করে রেখেছিল। পুলিশ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি স্তরে তার নির্দেশ পৌঁছে গিয়েছিল। তার গাড়ি দেখামাত্র রাস্তা ফাঁকা করে দিতে হবে। কোনো ব্যারিকেড নয়। কোনো বাধা নয়।
তার গাড়িতে যদি সামান্য আঁচড়ও লাগে, তাহলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কারণ, তার সঙ্গে তার স্ত্রী আছে।

আর মেহরিনের সামনে কোনো বিপদ আসুক এটা সোলেমান কিছুতেই হতে দেবে না। গাড়ি যখন ঢাকার ব্যস্ত রাজপথ ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, মেহরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল—রাস্তার একপাশে অসংখ্য পুলিশ। অন্যদিকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ। কোথাও লাঠিচার্জ চলছে, কোথাও মানুষের ভিড় ছত্রভঙ্গ করা হচ্ছে। কোথাও গরম পানি ছোড়া হচ্ছে।
মেহরিনের বুকটা কেঁপে উঠল। সোনার বাংলা। রাজনীতি টা এত কুৎসিত! কিন্তু মেহরিনের এখন ধ্যান-জ্ঞান সব নওগাঁয় পড়ে আছে। তার বুকটা বাবা বাবা করে ফেটে যাচ্ছে। তারপরও একবার জিজ্ঞেস করলো,
” ওদের মারছে কেনো? আর কিসেরই বা আন্দোলন এটা?”
” গতকাল রাতে শিবিরের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করছে। ”
মেহরিন আর জিজ্ঞেস করলো না তারপর আর কিছু। ঢাকার বুক ছেড়ে গাড়িটা ছুটে চললো নওগাঁর পথে। যতই তারা গাড়িট দিকে এগোচ্ছে ততই যেন মেহরিন বুক অসার হয়ে আসছে। কেন এমন হচ্ছে? এমন দম বন্ধ কেনো লাগছে? উফ কি অসহায় এক যন্ত্রণা। সে সিটে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে বুক হাতাতে লাগলো। তার বুক ফেটে যাচ্ছে কেনো, যেন। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হচ্ছে। হৃৎপিণ্ড টা সজোরে লাফাচ্ছে। মেহরিন হুট করে চোখ মেলে বলে উঠলো,

” পা…পানি। পানি আছে পানি? ”
সোলেমান ডেস্ক থেকে পানির বোতল বের করলো। মেহরিন ঢকঢক করে খেয়ে নিলে। সোলেমান তাকালো মেহরিনের সমুদ্রের ন্যায় উত্তাল ঢেউয়ের মুখটার দিকে। গতকাল দুপুর থেকে না খাওয়া। ও বাড়িতে যাওয়ার পর নিশ্চয়ই আর কিছু খেতে পারবে না। সেজন্য সোলেমান একটা হোটেলের কাছে গাড়িটা থামালো। তারপর নেমে মেহরিনের জন্য খাবার নিয়ে আসলো। মেহরিন প্রথমে খেতে অসম্মতি জানলেও সোলেমান যখন বললো,
” তোমার আব্বুর জন্য হলেও একটু খাও মেহরিন। ”
আব্বুর নাম শুনেই মেহরিন খাবার মুখে দিলো এই ভয়ে যে তার বাবা যদি তার এই শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখে তাহলে খুব কষ্ট পাবে। সে তাড়াহুড়ো করে খেতে লাগলো। সোলেমানের বুকটা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হতে লাগলো। মেয়েটা যখন সত্যি টা জানবে তখন কি হবে!
মেহরিন সব খাবার খেতে পারলো। তিনভাগের এক ভাগ খেলো বাকিটা ওভাবে রেখেই জানালা দিয়ে হাত ধুয়ে পানি খেয়ে সিটে মাথা ঠেসে চোখ বন্ধ করলো। আজ মেডিক্যালের রেজাল্ট দিবে সন্ধ্যার দিকে। সব দুশ্চিন্তা একবারে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে মেহরিন কে। যদি চান্স না পায় বাবা কি খুব বকবে তাকে? বা খুব কষ্ট পাবে নিশ্চয়ই সে?

ওহ্ মেহরিন তুমি কবে থেকে নিজের প্রতি এমন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেললে? উত্তর টা ভীষণ সোজা। যবে থেকে সে বিবাহ নামের এক শিকলে বন্দী হলো। তবে থেকেই তার মধ্যে এসব উপসর্গ ধরা দিয়েছে।
মেহরিন বি কনফিডেন্ট। তুমি বাজে পরীক্ষা দাও নি। যথেষ্ট ভালো এক্সাম দিয়েছো। তোমার বাবা তোমায় বলেছে চেষ্টা না করে হেরে যাওয়ার চেয়ে চেষ্টা করার পর হেরে গেলে বুঝে নিবে আল্লাহর পরিকল্পনা হয়তো তার চেয়েও উত্তম। তোমার জন্য তার থকেও উত্তম কিছু লিখে রেখেছে। যা ইহকাল বা পরকালে পাবেই পাবে।
মেহরিন রেজাল্টের চিন্তা ঝেড়ে ফেললো মাথা থেকে। আজ আর আগামী টা সে নওগাঁ থাকবে। সোলেমানের হাতে পায়ে ধরে বলবে। নিশ্চয়ই মানা করবে না?
এমন শত-শত ভাবনার পর তাদের গাড়িটা দুপুর তিনটার দিকে এসে থামলো অলংকাপুর গ্রামের ভুঁইয়া বাড়ির গেটের সামনে। মেহরিন বাড়ির দিকে তাকাতেই থমকে গেলো। এত মানুষ কেনো এসেছে? কি হয়েছে তাদের বাড়িতে? তড়িঘড়ি করে গাড়ির দরজা খুলে বাহিরে আসলো মেহরিন। আশেপাশে তাকালো। কেউ বাড়ি থেকে বের হচ্ছে তো কেউ ঢুকছে। নিজের বাড়িটাই নিজের কাছে অচেনা লাগছে খুব। সে আতঙ্কিত বুকে সোলেমানের দিকে তাকালো।

” এত মানুষ কেনো আমাদের বাড়িতে? কি হয়েছে? ”
সোলেমান কিছু বললো না। কেবল তার হাতটা ধরে ভেতরে ঢুকলো। বাড়ির ভেতর এরচেয়েও বেশি মানুষ। মেহরিন আর সোলেমান কে দেখে সবাই তাদের দিকে তাকালো। কিছু দূরে গাছের নিচে বসে তার মা আর বোন পাগলের মতো আহাজারি করে কাদছে।
তার মা আর বোন কাঁদছে কেনো? বুকটার মধ্যে যেন কেউ গরম শিসা ঢুকিয়ে দিলো। সে দৌড়ে মা আর বোনের দিকে ছুটে গেলো। মাকে বুকের সাথে আগলে ধরে বলল,
” আম্মু এই আম্মু। কাঁদছো কেনো? এই আপু কি হয়েছে কাঁদছো কেনো? বাড়িতে এত মানুষ কেনো? আব্বু কোথায়? গতকাল রাতে ফোন দিলাম। আজ সকালেও দিলাম। আব্বুর ফোন বন্ধ কেনো ছিলো? আমার কি দুশ্চিন্তা হয় না? এই কথা বলো তোমরা। কাঁদছো কেনো? কি হয়েছে। ”
পাশেই নিরন্তর ভঙ্গিতে কোলে মেয়েটাকে নিয়ে অনিক ভাইকে এগিয়ে আসতে দেখে মেহরিন তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

” অনিক ভাই আম্মু আর আপু কাঁদছে কেনো? কি হয়েছে? সবাইকে দেখতে পাচ্ছি। আব্বুকে কেনো দেখতে পাচ্ছি না? আমি আব্বুর সাথে দেখা করতে আসছি। আব্বু কি ভেতরে আছে? ”
অনিক কিছু বলতে পারলো না। তার গলা রোধ হয়ে আসছে। বাবা সমতূল্য শ্বশুরটা তার অকালেই তাদের ছেড়ে চলে গেলো! এই সত্য টা মেনে নেওয়া কঠিন।
মেহরিন বাড়ির দিকে ছুটে যেতে চাইলে অনিক বলে উঠলো,
” ভেতরে বাবা নেই মেহরিন। ”
মেহরিন দাঁড়িয়ে গেলো। পিছু ফিরে বলল,
” ভেতরে বাবা নেই মানে? তাহলে বাবা কোথায়? ”
অনিক আঙুল দেখিয়ে বলল, ” ওখানে। ”
অনিকের হাতের ইশারা দেখে মেহরিন সেদিক পানে তাকালো। তাদের কাঁঠাল গাছের নিচে কিছু মানুষজন দাঁড়িয়ে আছে গোল হয়ে। কিছু একটা ঢাকা পড়ে আছে তাদের মাঝখানে। কি আছে ওখানে? মেহরিন এতক্ষণ খেয়াল করে নি। তারপর কৌতূহল হয়ে যত সেদিক পানে এগোতে লাগলো ততই মেহরিনের বুক অজানা এক ভয়ে দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। মেহরিন এত জোরে জোরে করে তার বাবা কে ডাকলো। ওখানে থাকলে কি ভীড় ঠেলে তার বাবা আসতো না তার কাছে? অনিক ভাইয়া মিথ্যা বলছে। ওখানে নিশ্চয়ই তার বাবা নেই। তবে মেহরিনের পা থামতে চাইছে না। সে ভীড় ঠেলে ঢুকে দেখলো একটা খাটিয়ার উপর সাদা কাপড়। তার নিচে একটা শরীর।
কোনো মানুষ আছে এটার নিচে? মেহরিনের চিন্তা ভাবনাতেও নেই যে এখানে তার বাবা আছে। এক মুরব্বি বললো,

” শেষ বার বাবাকে দেখে নাও মা। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম আমরা। ”
মেহরিন থমকে দাঁড়াল। তার চোখ স্থির হয়ে গেল। বাবাকে শেষবার দেখে নাও মানে? কী বলছে কি উনি? এটা তার আব্বু না। হতেই পারে না। তার আব্বু তো বেঁচে আছে।
সকালেও সে ফোন করেছে। আব্বুর ফোন বন্ধ ছিল।
কিন্তু ফোন বন্ধ থাকা মানেই তো মানুষ মারা যায় না! মেহরিন পেছনে সরে এলো। এবার তার কণ্ঠ একটু জোরালো হলো।
“ না না এটা আব্বু না। আমি জানি এটা আব্বু না।”
অনিকের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে উঠল।
“অনিক ভাই, বলুন এটা আব্বু না।”
অনিক মুখ ফিরিয়ে নিল। তারপর হঠাৎ যেন কারও কথা মনে পড়ে গেল। মেহরিন ছুটে সোলেমানের কাছে গেল।
তার জামার কলার আঁকড়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
“আপনি বলুন। বলুন এটা আমার আব্বু না। আপনি তো বলেছিলেন আমাকে আব্বুর কাছে নিয়ে যাবেন!আপনি বলেছিলেন আমি আমার আব্বুকে দেখব! আমার আব্বুকে খবর দিন। বলুন মেহরিন এসেছে। ”

সোলেমান চোখ বন্ধ করল। তার মুখের সেই পাথুরে দৃঢ়তা ভেঙে পড়ল মুহূর্তেই। তার চোখে মুখে ভয়ংকর, অসহায় ভয়। মেহরিনের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। মেহরিন আবার সাদা কাপড়টার দিকে তাকাল। চারপাশের মানুষগুলো কান্নায় ভেঙে পড়ল। মেহরিন সবার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“কাঁদছো কেন তোমরা? কাঁদবে না, খবরদার। ওটা আমার আব্বু না।
এক মুরব্বি মোতালেব ভুঁইয়ার মুখের সামনে থেকে সাদা কাপড়টা সরিয়ে দিলো। মেহরিনের চোখ প্রথমে মুখের ওপর পড়ল না। সে দেখতে চাইছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখ স্থির হয়ে পড়লো বাবার মুখের দিকে। এটা যে সত্যি সত্যি তার বাবা! ঐ তো অবিকল সেই মুখ,সেই ঠোঁট। কিন্তু তার আব্বুর মুখে তো কোনো কালসেটে মারের দাগ নেই। এই মুখে আছে। তাহলে এটা তার আব্বু না।
” অনিক ভাই এটা আমার আব্বু না। দেখুন না আমার আব্বুর মুখে তো কোনো মারের কালসিটে দাগ নেই। আমার আব্বুর মুখ নূরের মতো আলোকিত। ”
সোলেমান তাকালো এবার সাহস করে মুখের দিকে। আসলেই মুখে ঠোঁটের কোনো মারের কালসিটে দাগ। কে মেরেছে তাকে?
অনিক ভগ্ন হৃদয়ে গলা ধরা কণ্ঠে বলল,

” এটা আমাদের বাবা মেহরিন। গতকাল রাতে ঢাকা থেকে ফেরার পথে ডাকাতের দল রা বাবা কে একা পেয়ে তার সবকিছু লুট করে মেরেছে। ইমন বাবাকে হসপিটালে এডমিট করেছিল। তারপর জানালো উনি মারা গেছে। আমি খবরটা পাওয়া মাত্রই রাতেই ঢাকা যাই। তারপর বাবার লাশ টা নিয়ে আসি।”
মেহরিনের চোখের সামনে যেন পৃথিবীটা দুলে উঠল। তার আব্বুকে মেরেছে! ঐ নরম কুঁচকে ভয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শরীটা মার খেয়েছে। কিভাবে, কতটা শক্তি নিয়ে মারলে একজন মানুষ সেখানেই মা-রা যায়! মেহরিনের মন তারপরও মানতে নারাজ। মনে হচ্ছে একটু পরই তার বাবা উঠবে। একটু পর উঠবে। তাই না?
কিন্তু সবাই নিশ্চুপ। মেহরিন বুঝে গেল। কিছু একটা ভেঙে গেল তার ভেতরে। সে এক চিৎকার দিয়ে বাবার বুকে মাথা রেখে দিল। তার বাবার উষ্ণ বুকটা আজ ঠান্ডা। কোনো স্পন্দন নেই। কোনো হৃদস্পন্দন নেই। কিন্তু মেহরিন বিশ্বাসই করতে চাইলো না।
কিছু মৃত্যু চোখের সামনে দেখেও মানুষ বিশ্বাস করতে পারে না। কিছু মানুষকে হারানোর সত্যিটা মেনে নেওয়ার চেয়ে—

মিথ্যেকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকাই তখন সহজ মনে হয়।
আর মেহরিনের কাছে তার আব্বুর মৃত্যু ছিল ঠিক তেমনই এক অসম্ভব সত্য। সে দুই হাত দিয়ে বাবার বুক চাপড়াতে লাগল। এই চিরন্তন সত্য টা মেহরিন মানবে কি করে? মরেই তো যাবে। প্রথমে সে তার সন্তানটাকে হারালো। তারপর আজ বাবাটাও চলে গেলো।
এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা কি কঠিন! মানুষ হারাতে হারাতে মেহরিন তো সবই হারিয়ে ফেলতে লাগলো। পৃথিবী একটু নিস্তার দাও এই বাচ্চা মেয়েটাকে। সে যে তোমার মতো নিষ্ঠুরতম পৃথিবীকে এখনো চিনে না।
মেহরিনের মাথার উপর থেকে ওড়না সরে গেছে। কাঁধ থেকে খসে ওড়নার এক প্রান্ত মাটিতে পরলো। পুরুষ গুলো দৃষ্টি সরিয়ে সাইডে সরে গেলো। বাবা আর মেয়েকে সাময়িক কিছু সময় তারা দিলো একান্তে থাকার জন্য। এরপর তো আর পারবে না। এক মহিলা এসে ঠিক করে দিলো মেহরিনের ওড়না। মেহরিন চিৎকার করে বাবার দু গালে হাতে রেখে বলতে লাগলো,

“আব্বু…! এই আব্বু…! আমার লক্ষী আব্বু। উঠো না। দেখো আমি দেখা করতে আসছি তোমার সাথে। তুমি কথা বলবে না আমার সাথে। একটু চোখ মেলে তাকাও। তুমি না আমার আব্বু? আমি তোমার মেয়ে। তোমার মেহরিন। আমি ডাকলে তুমি তো আমার ডাকের সাড়া না দিয়ে থাকতে পারো না। তবে আজ কেনো নিশ্চুপ হয়ে আছো তুমি তুমি হ্যাঁ? আমার বুক ফেটে যাচ্ছে আব্বু। আমি সবকিছু শূন্যতা মানতে পারলেও তোমার শূন্যতা কি দিয়ে পূরণ করবো? তোমার শূন্যতা পূরণ করার মতো তোমার মতো কেউ নেই এই পৃথিবীতে। একটু দয়া করো আমার উপর। তুমি ছাড়া কিভাবে বাঁচবো আমি,আম্মু আর আপু? এভাবে কেউ যায়? বলো এভাবে নিজের মেয়েটাকে এতিম করে রেখে যায় কেউ? তুমি না বলেছিলে, আমার চোখে একফোঁটা পানি আসতে দেবে না? তাহলে আজ আমার পুরো পৃথিবীটাই ভাসিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছ কেন? প্রথমে আমার সন্তান টাকে আল্লাহ নিয়ে নিল। সেই আগুনে আমি প্রতিদিন পুড়েছি, আব্বু। প্রতিটা নিশ্বাসে মরেছি। সেই ক্ষত এখনো রক্ত ঝরায়। আর সেই ক্ষতের রক্ত শুকানোর আগেই তুমিও চলে গেলে? এতটুকুও মায়া হলো না আমার জন্য? এতটাই বোঝা হয়ে গিয়ে ছিলাম আমি? বলেছিলে, ‘আমি বেঁচে থাকতে তোকে কেউ কাঁদাতে পারবে না।’ দেখো আব্বু… আজ তুমি নিজেই আমাকে এমন কান্না উপহার দিয়ে গেলে, যা কোনোদিন থামবে না। এখন আমি কাকে আব্বু বলে ডাকব? কার হাত ধরে হাঁটব? কার কাছে গিয়ে বলব, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে’? কে আমার মাথায় হাত রেখে বলবে, ‘মা, আমি আছি’?একবার… শুধু একবার চোখ খুলে তাকাও না, আব্বু। দেখো, তোমার মেহরিন কাঁদছে। তুমি তো কোনোদিন আমাকে শক্ত হতে শেখাওনি। মানুষ চিনতে শেখাওনি। নিষ্ঠুর পৃথিবীর সঙ্গে লড়তে শেখাওনি। তাহলে এই হিংস্র পৃথিবীতে আমাকে একা ফেলে রেখে যাচ্ছ কীভাবে? আমার বয়সই বা কত আব্বু? আল্লাহ কেন আমার কাছ থেকে একে একে সবকিছু কেড়ে নিচ্ছেন? আমি আর কতটুকু সহ্য করব? আমার বুকে আর কতটা শূন্যতা দিলে খোদা সন্তুষ্টি হবে? আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও, আব্বু। আব্বু.ফিরে আসো, একবার শুধু ফিরে আসো। এই পৃথিবীতে আমাকে একা রেখে যেও না। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে জানি না… তুমি আমাকে তুমি হীনা বাঁচতে শেখাওনি, আমি মরে যাব আব্বু। সত্যি মরে যাব। ”

তার এক একটা শব্দে উপস্থিত সবার হৃদয় রক্তক্ষরণ হতে লাগলো। তারা জানে মোতালেব ভুঁইয়া আর মেহরিন একে ওপরকে কতটা ভালোবাসতো। তারা বাবা মেয়ে একে ওপরকে বলতে পাগল ছিলো। মোতালেব ভুঁইয়ার মুখে সব সময় তার ছোট মেয়ের প্রশংসা আদুরে ভালোবাসার কথা লেগেই থাকতো। সেই বাবা আজ তার আদরের মেয়েটাকে ছেড়ে চিরকালের জন্য পরকালে পাড়ি জমালো।
একসময় মেহরিন কথা গুলো বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটে পরলো। এই সত্যের ভার মেহরিনের সহ্যের বাহিরে ছিলো। মেহরিন কে ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। ইমন গোরস্থান থেকে আসলে মোতালেব ভুঁইয়া কে নিয়ে চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসলো। সানজিদা বেগমের বুক ফাটা আর্তনাদ! তাদের দু’জনের টোনাটুনির সংসারে সে এখন একা রয়ে গেল। স্বামী টা যে নেই এহ সত্য কিভাবে মেনে নিবে সে? ইমনের চোখাচোখি হলো সোলেমানের সঙ্গে। এক মুহূর্তেই সব বুঝে গেল ইমন। মেহরিনও এসেছে। সোলেমানকে দেখেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। কিছুক্ষণ থম মেরে রইল সে। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে কেবল গভীর এক ভার।

মোতালেব ভুঁইয়া হয়তো তাঁর মৃত্যুর আঁচ পেয়েই ইমনকে সর্বপ্রথম ফোন করেছিলেন। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি সুলতান বাড়ি সম্পর্কে ভয়ংকর কিছু একটা হয়তো জানতে পেরেছিলেন। কী জানতে পেরেছিলেন, তা ইমনকে বলতে পারেননি। তার আগেই সম্ভবত তাঁকে আক্রমণ করা হয়েছিল। ইমন শুধু শুনেছিল তাঁর আর্তনাদের আগে মোতালেব ভুঁইয়া প্রথমে বলেছিলেন তাঁর মেয়েটাকে আগলে রাখতে। মেহরিনের ভার তিনি ইমনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এমন এক ভার, যা ইমন নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পালন করবে। আরও একটি কথা বলেছিলেন তিনি সোলেমান আর মেহরিনের সামনে ভয়ংকর কোনো বিপদ আসছে। কিন্তু কী সেই বিপদ? কেমন তার ধরন? কোথা থেকে আসবে? এসবের কোনো উত্তরই আর জানা হয়ে ওঠেনি।
মোতালেব ভুঁইয়ার উন্মুক্ত মুখটা কাফনের কাপড়ে বাঁধার আগে সোলেমান শেষবারের মতো তাঁর মুখের দিকে তাকাল। পরিচিত সেই মুখটা নিথর। অথচ এই মানুষটাই একদিন আগেও বেঁচে ছিলেন। কথা বলেছিলেন। তাঁর মেয়ে মেহরিনের জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন। অপরাধবোধের এক অসহ্য ভারে সোলেমানের বুকটা যেন অসাড় হয়ে গেল।মোতালেব ভুঁইয়ার এমন আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদ তাকে পেতে হবে এটা সে কখনো ভাবেনি।
খাটিয়ার এক পাশের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিল সোলেমান। অন্য পাশে ইমন। পেছনের দুই পাশ ধরল অনিক আর গ্রামের এক মুরব্বি। নীরব পায়ে তারা এগিয়ে গেল অলংকারপুর কেন্দ্রীয় গোরস্থানের দিকে। তারপর মাটির নিচে শুইয়ে দেওয়া হলো মোতালেব ভুঁইয়াকে চিরকালের জন্য। কবর দেওয়া শেষ হলে সবাই ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরল। উঠানে পা রাখতেই সোলেমানের চোখ আটকে গেল মেহরিনের দিকে। মেয়েটা এক কোণে বিধ্বস্ত হয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে, কান্না করতে করতে শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। হয়তো কিছুক্ষণ আগেও বুক চাপড়ে কেঁদেছে। এখন আর চোখ দিয়ে জলও বের হচ্ছে না। ইতি বেগম সানজিদা বেগমের মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছিলেন। ঊর্মিও এসেছে। পাশে নিজের ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ইব্রাহিম।

ইতি বেগম সেরিন আর সানজিদা বেগমকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। দুজনের কান্নায় যেন ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ঊর্মি মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। কী বলে সান্ত্বনা দেবে সে প্রানপ্রিয় বান্ধুবী কে?
কোনো ভাষা কি বাবাকে হারানোর শূন্যতা পূরণ করতে পারে? ঊর্মিও তো তার বাবাকে হারিয়েছে। এই যন্ত্রণা কেমন, সে জানে। তাই মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো শব্দই খুঁজে পেল না। ঠিক তখনই ক্ষুধায় ইব্রাহিমের ছেলেটা কেঁদে উঠল। ইব্রাহিম আর ঊর্মি শেষ পর্যন্ত নিজেদের বাড়ির দিকে চলে গেল।
ইমনও থাকল না। তার হিসাব মেলানো বাকি। মোতালেব ভুঁইয়া কী জানতে পেরেছিলেন? কারা তাঁকে হত্যা করল?
সুলতান বাড়ি সম্পর্কে এমন কী জেনেছিলেন তিনি, যার জন্য তাঁর জীবনটাই কেড়ে নেওয়া হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। অনিকও ভেতরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ আগেই বাতাসি আর তানজিলা বেগমরা এসে পৌঁছেছে। তারা রান্নাবান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। শোক থাকলেও মানুষকে খেতে হয়। না খেয়ে তো আর বেঁচে থাকা যায় না। তানভীর আসতে পারেনি। পরীক্ষা চলছে তার।
ধীরে ধীরে উঠানটা ফাঁকা হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত সেখানে রইল কেবল সোলেমান আর মেহরিন। সোলেমান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেহরিনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। মেহরিন শূন্য চোখে তাকাল তার দিকে। সেই চোখে রাগ নেই। ঘৃণা নেই। অভিযোগও নেই। আছে কেবল সীমাহীন অসহায়ত্ব।
মেহরিনের ঠোঁট কাঁপল। তারপর হঠাৎ করেই বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কষ্ট বেরিয়ে এলো। ভাঙা গলায় সে বলল,

“আমার আব্বু চিরকালের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে গেল। এখন আর কেউ আপনার কাছে আমাকে একটুখানি দেখার জন্য আকুতি জানাবে না। ওরা আমার আব্বুকে মেরে ফেলেছে। এখন কি খুশি আপনি? আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, সোলেমান সাহেব। মরি, বাঁচি, পচি আপনার পা আঁকড়ে ধরেই আপনার কাছে পড়ে থাকব। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যাব না। আমি সুলতান নিবাসেই পড়ে থাকব। শুধু এটুকুর নিশ্চয়তা দিন,আমার আব্বুর খুনিদের আপনি সর্বোচ্চ সাজা পাইয়ে দিবেন। শুধু এটুকুই চাই আমি। আপনার কাছে আর কোনো কিছুর চাওয়া পাওয়া নেই। পারবেন আপনি? ”
সোলেমান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মেহরিনকে শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল।
“পারব। তোমার আব্বুকে যারা মেরেছে, কসম তাদের একজনকেও আমি ছাড়ব না। একজনকেও না। খুঁজে বের করব তাদের। আর তারপর মারব। খুব কষ্ট দিয়ে মারব। শুধু একবার জানতে দাও, কারা মেরেছে তোমার আব্বুকে।”

কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেহরিনের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। সোলেমানের বুকের ভেতর মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল সে। তার আব্বু কোথায় আছে এখন? ঐ অন্ধকার কবরের ভেতর। একা,মেহরিনকে ছাড়া।

দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (৩)

যে বাবা সারাজীবন মেয়েটাকে বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলেন, সেই বাবা এখন কীভাবে থাকবেন মাটির নিচে?এই প্রশ্নের উত্তর মেহরিন জানে না। জানে না, তার আব্বু অন্ধকার কবরের ভেতর একা শুয়ে আছেন এই সত্যিটা কীভাবে মেনে নেবে সে। শুধু জানে, আজ থেকে তার পৃথিবীটা সত্যিই ফাঁকা হয়ে গেছে। তার আব্বু আর কোনোদিন তাকে ডাকবেন না। কোনোদিন বলবেন না—
“মেহরিন, আমার ননির পুতুল..আমার চোখের মণি। আমার কলিজা,আমার আম্মা…”

দাহশয্যা পর্ব ৯৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here