দাহশয্যা পর্ব ৯৯ (২)
Raiha Zubair Ripti
রাত তখন বেশ গভীর। বাইরে শীতল ঠান্ডা বাতাস বইছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। এজওয়ান তার স্টাডিরুমে বসা। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ খোলা। পর্দাজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তথ্য, রিপোর্ট আর গ্রাফ।
তার তৈরি করা AI-চালিত স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেমটি নিয়ে গত কয়েক মাসে তিনটি দেশের বিভিন্ন সংস্থা থেকে যে পরিমাণ তথ্য আসছিল, তাতে ইতোমধ্যে মানবপাচার, আর্থিক অপরাধ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বেশ কিছু চক্র শনাক্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন পর আজ আবার সেই অ্যাপটি নিয়ে গভীরভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করছে এজওয়ান। বিদেশ থেকে পাঠানো তথ্যগুলো তীক্ষ্ণ নজরে দেখছে। একটার পর একটা রিপোর্ট বিশ্লেষণ করতে করতে হঠাৎ ল্যাপটপের ডান পাশে ছোট্ট একটি নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। নতুন ই-মেইল। এজওয়ান প্রথমে তেমন গুরুত্ব দিল না। কাজের ফাঁকে প্রতিদিনই অসংখ্য ই-মেইল আসে। কিন্তু প্রেরকের নামটি চোখে পড়তেই তার হাত থেমে গেল।
ই-মেইলটি একটি আন্তর্জাতিক অফিসিয়াল ঠিকানা থেকে এসেছে। Nobel Prize Committee!
কয়েক সেকেন্ড এজওয়ান স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর মেইলটি খুলল। মেইলের শুরুতেই আনুষ্ঠানিক ভাষায় লেখা,
“Dear Mr. Ajwan,
We are pleased to inform you that you have been selected as the recipient of the Nobel Peace Prize for your exceptional contribution to the protection of human lives through artificial intelligence, particularly in preventing human trafficking, organized crime and large-scale financial crimes.”
এজওয়ানের চোখ ধীরে ধীরে পরের লাইনগুলোয় গেল। তারপর একটি নির্দিষ্ট তারিখ। ১০ ডিসেম্বর। স্টকহোমে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়, স্থান, আনুষ্ঠানিকতার বিবরণ। সবকিছুই মেইলে দেওয়া।
এজওয়ান পুরো মেইলটা একবার পড়ল। তারপর আবার প্রথম থেকে পড়ল। মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। কোনো বিস্ময়ও যেন নেই। শুধু কয়েক মুহূর্ত নীরবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই দরজার কাছে মাহির কণ্ঠ শোনা গেল।
“আপনি এত রাত অব্দি কী করছেন এখনো জেগে স্টাডি রুমে?”
ঘুমঘুম চোখে কথাটা বলতে বলতে মাহি এগিয়ে এলো।এজওয়ান বাঁ হাত দিয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করতে চাইলে মাহির চোখ ততক্ষণে চলে গেছে স্ক্রিনের ওপর। প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। কিন্তু প্রথম কয়েকটি লাইন পড়ার পরই তার মুখের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি বদলে গেল। চোখের ঘুমঘুম ভাব মুহূর্তেই উধাও। বড় বড় পা ফেলে ল্যাপটপের কাছে এসে মাহি বলল,
“এই ই-মেইল সত্যি নোবেল প্রাইজ কমিটি পাঠিয়েছে?”
এজওয়ান ই-মেইলটা বন্ধ করে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“হু। তাই তো মনে হচ্ছে।”
মাহি ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“অন্য কাউকে পাঠাতে গিয়ে ভুলে আপনাকে পাঠায়নি তো আবার?”
এজওয়ান আবার মেইলটা খুলে দিয়ে বলল,
“এখানে যা লেখা আছে, জোরে জোরে পড়ো।”
মাহি ল্যাপটপে চোখ রাখল। শুরুতেই এজওয়ানের নাম।কিন্তু কিসের জন্য নোবেল পেতে যাচ্ছে সে? আবার কী আবিষ্কার করেছে?
“কী হলো? পড়ো।”
মাহি হকচকিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল,
“আপনাকেই পাঠিয়েছে। তবে তারা আপনাকে কী জন্য পুরস্কার দিতে চাচ্ছে? তাদের কি পুরস্কার এবার বেশি হয়ে গেছে? নাকি মানুষ পাচ্ছে না দেওয়ার জন্য?”
এজওয়ানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
“কথায় লজিক আছে। হতে পারে।”
ল্যাপটপটা বন্ধ করতে করতে বলল সে। মাহি ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“কী জন্য দিচ্ছে আপনাকে অ্যাওয়ার্ড?”
এজওয়ান কফির মগে চুমুক বসিয়ে বলল,
“তোমাকে বিয়ে করে গ্রিনেস ওয়ার্ল্ডে নাম লিখিয়েছি। সেজন্য তারা আমাকে অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছে।”
“ফালতু কথা বলবেন না তো।”
“তুমি নিজে আগে ফালতু প্রশ্ন করা বন্ধ করো। অন্যসব স্ত্রী হলে এতক্ষণে..”
“খুশিতে অজ্ঞান হয়ে যেত, তাই না?”
“নিঃসন্দেহে।”
এজওয়ান মগটা টেবিলে রাখল।তারপর চোখ তুলে তাকাল মাহির দিকে।
“বাট আমার মনে হচ্ছে তোমার জ্বলন হচ্ছে। আর ইউ জেলাস অফ মি, সুইটহার্ট?”
মাহি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“নেভার। কখনোই না। আমার আপনাকে নিয়ে জেলাস করার মতো কিছুই নেই আপনার।”
এজওয়ান ভ্রু তুলে তাকাল। “ওকে। এবার আসতে পারো।”
“আর কী করবেন? ঘুমাবেন না?”
“আমার ঘুম নিয়ে তোমার এত মাথাব্যথা কেন? তুমি ঘুমাও গিয়ে। আমার কাজ আছে।”
এজওয়ান আবার কাজে মনোযোগ দিল। কিন্তু মাহি নড়ল না।
কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সে। টেবিলে বাঁ হাত রেখে এজওয়ানের দিকে একটু ঝুঁকে বলল,
“আপনার ওই অ্যাপটার ব্যাপারে একটু জানতে চাচ্ছিলাম।”
এজওয়ানের আঙুল কিবোর্ডের ওপর থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে চোখ তুলে মাহির দিকে তাকাল।
“হঠাৎ অ্যাপের ব্যাপারে এত আগ্রহ কেন?”
“এতদিন ধরে আপনি এটা নিয়ে কাজ করছেন। বিদেশ থেকেও কত তথ্য আসছে। আসলে জানতে ইচ্ছে করছিল, এটা কীভাবে কাজ করে।”
“At this hour?”
“অ্যাপ নিয়ে জানতে চাওয়ার জন্য সময়ের আবার কী হলো?”
এজওয়ান চেয়ার থেকে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“Nothing. I was just wondering…whether you’re actually interested in my app.”
মাহি ভ্রু কুঁচকাল। “মানে?”
এজওয়ান আরও কাছে এসে নিচু গলায় বলল,
“you’re interested in me.”
মাহি সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল, “I am asking about the app.”
“Sure. ”
” বলুন তবে। ”
এজওয়ানের ঠোঁটে হাসি ফুটল। ” বললে কী দিবে? ”
” কী চান? ”
” I want you in my bed tonight, sweetheart.”
” সে তো আপনি আমাকে প্রতিদিনই আপনার বেডে পান।”
” উঁহু আজ একটু ভিন্ন ভাবে চাই। ”
মাহির কোমরে আলতো করে হাত রাখল।মাহি তার হাত সরিয়ে দিতে গিয়ে থেমে গেল।
“আপনি সব সময় শুধু লম্পটামি করতে চান। আপনার সব ইশারা ইঙ্গিত কেবল ঐসবে গিয়েই থামে।”
এজওয়ান হাসে। হাসতে হাসতে মাহির ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল,
“Because you make it too easy. Do you remember what you said? ”
” what did i say?
” I am yours, and you are mine. In the end, it’s you and me.”
মাহি খামচে ধরলো এজওয়ানের পড়নের টি-শার্ট টা।
“এজওয়ান!”
“Yes, wife?”
মাহি এবার চোখ তুলে তাকাল।
“অ্যাপটা কীভাবে কাজ করে বলবেন?”
এজওয়ান কয়েক মুহূর্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“Not tonight sweetheart .”
“কেন?”
“Because right now, I have something much more interesting standing in front of me.”
মাহির মুখ গরম হয়ে উঠল।
“You are impossible.”
” সে তো আমি বিয়ের আগে থেকেই। But seriously you’re looking ridiculously beautiful tonight.”
মাহি মুখ ফিরিয়ে নিল।
“Flirting won’t work.”
“Who said I’m flirting?”
“আপনি করছেন।”
” I just missed my wife.”
মাহি এবার আস্তে বলল,
“You see? This is exactly how you avoid my questions.”
“You’re very observant.”
“আপনি উত্তর দেবেন না?”
“Tomorrow.”
“And tonight?”
এজওয়ানের ঠোঁটে ধীর হাসি ফুটল।
“Tonight, I want my wife. No questions. No work. Just you and me.”
“ঠিক আছে।”
এজওয়ান মৃদু হেসে বলল,
“Good girl.”
পরক্ষণেই মাহি সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“Don’t.”
“Don’t what?”
” হাত সরান”
“Why?”
“কারণ…”
কথাটা শেষ করার আগেই এজওয়ান তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর গালে। মাহি চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। এজওয়ান তাকে পাজা কোলে নিয়ে নিচু গলায় বলল,
” Let’s go to bed, sweetheart. I wanna sleep with you. উত্তেজনা ধরিয়ে দিছ শরীরে। তা নিবারন করা প্রয়োজন।”
মাহি পারে না এজওয়ানের গলা চেপে মেরে ফেলতে। খবিশটা এপ্স নিয়ে কথাই বলতে চায় না।
একটা নতুন সকাল। মাহির ঘুম ভাঙতেই চোখ মেলে পাশে তাকিয়ে দেখলো এজওয়ান নেই। পুরো রুম বেলকনিতে চোখ বুলিয়েও পেলো না। নিচে নাকি? দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ওয়াশরুমে ঢুকে লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে মাহি নিচে এসে দেখলো এজওয়ান নিচেও নেই। বাহিরে তাকিয়ে দেখলো গাড়িটাও নেই। তাহলে কী এজওয়ান কোথাও বেরিয়েছে! কোথায় বেরিয়েছে তবে! ঠিক সেই সময় তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর পড়ে থাকা ফোনটির দিকে। এজওয়ানের ফোন নয়। তার নিজের ফোন। স্ক্রিনে একাধিক মিসড কল।
মাহির বুকটা হঠাৎ কেমন যেন ধক করে উঠল।
এজওয়ান ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছে। রাগে শরীর টা ফেটে যাচ্ছে। কপালের ঘাড়ের রগ ফুলে আছে। বারবার ফোন করছে এনা কে। কিন্তু এনা ফোন ধরছে না।
সকাল সকাল এজওয়ান এনার মেসেজ পায়। এনা লিখে পাঠিয়েছিল,
” আমি বাংলাদেশে যাচ্ছি এজওয়ান। তোমরা আমাকে ঠকিয়েছ। সোলেমান বিয়ে করেছে! আর সেটাও তিন বছর আগে। অথচ তোমরা আমাকে কিছুই বলো নি! আমি আজ জানতে পারলাম! ”
এজওয়ান সাথে সাথে এনাকে ফোন করে। কিন্তু এনা ফোন ধরে না। এজওয়ান মেসেজ পাঠায়,
” দেখো এনা,পাগলামি করবে না খবরদার। ভাইজানের সংসার নষ্ট করার চেষ্টা করলে কিন্তু আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না। তুমি খবরদার বাংলাদেশে যাবে না। ”
এনা মেসেজ টা সিন করে। কিছুক্ষণ পর বলে, ” আমি বাংলাদেশে যাচ্ছি। পারলে আটকে তো দেখাও। ”
এজওয়ান তখনই সাথে সাথে শাওয়ার না নিয়েই টি-শার্ট টা পড়ে কোনোমতে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু তাতেও লাভ হলো না। কারন এনা যখন এজওয়ান কে মেসেজ দেয় তখন এনা এয়ারপোর্টে। এজওয়ান আসতে আসতে ফ্লাইট ছেড়ে দিয়েছিল। এজওয়ানের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসলো। গাড়ি থামিয়ে স্টিয়ারিংয়ে দুহাত রেখে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল সে।তারপর মুষ্টিবদ্ধ হাতটা স্টিয়ারিংয়ে আঘাত করল। “শিট!”
এনার কান অব্দি সোলেমানের বিয়ের খবর আসলো কী করে? এনার সব যোগাযোগ তো এজওয়ান বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। তাহলে?
সে সোলেমান কে ফোন দিতে লাগলো। সোলেমানের ফোন বাজতে লাগলো।
মেহরিন নামাজ শেষ করে সবে বিছানায় গা টা এলিয়ে দিতে যাবে, তখনই পাশে থাকা ফোনটা বেজে উঠায় তাকিয়ে দেখে সোলেমানের ফোন বাজছে। সোলেমান রুমে নেই। কোথায় যেন গিয়েছে। ফোন একবার কেটে আবার বাজতে শুরু করলো। মেহরিন উঁকি দিয়ে দেখলো এজওয়ানের নাম লেখা। কিছুক্ষণ নীরব থেকে পরে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে এজওয়ান বলল,
” হ্যালো ভাইজান। ”
মেহরিন সালাম দিয়ে বলল, ” উনি রুমে নেই। ”
এজওয়ান সালামের জবাব দিয়ে বলল, ” ভাইজান আসলে ভাইজান কে বলবেন এনা আসছে সুলতান নিবাসে। ”
মেহরিনের কপাল কুঁচকে আসলো। জিজ্ঞেস করলো,
” কে এনা? ”
এজওয়ান এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর বলল,
” আপনি ভাইজান কে বলবেন। ভাইজান বুঝে নিবে বাকিটা। ”
এজওয়ান ফোন কেটে তার বাবার নম্বরে কল করতে লাগলো। ফোন বেজে যাচ্ছে। কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। বিরক্ত হলো। এই বাপটাকে সময়ে ফোন দিলে পাওয়া যায় না।
সোলেমান মর্নিং ওয়াক শেষে ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে রুমে প্রবেশ করলে মেহরিন গম্ভীর গলায় বলল,
” এজওয়ান ভাইয়া ফোন করেছিল। ”
সোলেমান ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, ” কী বললো? ”
” বলল,এনা নামের কেউ একজন সুলতান নিবাসে আসছে। ”
সোলেমানের স্বাভাবিক মুখটা এবার অস্বাভাবিক হতে লাগলো। বসা থেকে ত্বরিত মোড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
” কিহ্। পাগল মেয়েটা সুলতান নিবাসে আসছে! ওহ্ শীট! জঞ্জাল কেন শেষ হয় না আমার জীবন থেকে মাবুদ।”
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো, ” কে এই এনা? ”
সোলেমান রুম থেকে বেরিয় যেতে যেতে বলল,
” একটা আস্ত পাগল । আমার জীবনটা ভাজা ভাজা করতে আসছে হয়তো। মেরেই ফেলবো এবার এটাকে। ”
বিকেলের দিকে এনা আসে সুলতান নিবাসে। বাড়িতে আছে শুধু ম্যেডরা। মেহরিন পুলিশ স্টেশনে গিয়েছে। খবর পেয়েছে ইমনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। ইতি বেগম চিন্তায় আছে। মেহরিন কে ফোন করলে মেহরিন দেখছে বলে ছুটে যায়। সোলেমান টাও যে কোথায় গেছে জানে না। মেহরিন থানায় এসে দেখলো ইমনের সাথে সাৎে শিবিরের আরো কয়েকজন কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। সে ছুটে ইমনের কাছে যেতে চাইলে এক কনস্টেবল মেহরিন কে থামিয়ে দিয়ে বলে,
” কোথায় যাচ্ছেন আপনি? ”
মেহরিন কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে বলে, ” ইমন ভাইকে কিসের ভিত্তিতে ধরে এনেছেন আপনারা? কী করেছে সে? ”
কনস্টেবল উত্তর না দিয়ে উল্টা প্রশ্ন করলো, ” আপনি কে? নাম কী? কে হন? ”
” আমি মেহরিন তাবাসসুম। ইমন ভাইয়ের বোন। এখন বলুন তার অপরাধ টা কী? ”
কনস্টেবল আপাদমস্তক বোরকা নিকাবে ঢাকা মেহরিন কে দেখে নিয়ে বলল,
” ওদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ আছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার চেষ্টা, সরকারি কাজে বাধা, ভাঙচুর আর উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আটক করা হয়েছে।”
মেহরিন থমকে গেল। “ভাঙচুর? ইমন ভাই ভাঙচুর করেছে?”
” জি অভিযোগ আছে।”
“কোথায়?”
“সেটা তদন্তে বের হবে।”
মেহরিন এবার গলা শক্ত করল। “তাহলে অভিযোগের ভিত্তিটা কী?”
কনস্টেবল এবার বিরক্ত হয়ে বলল, “ম্যাডাম, আপনি পুলিশকে জেরা করবেন না। তদন্ত চলছে।”
“জেরা করছি না। ইমন ভাইকে কেন ধরে এনেছেন সেটা জানতে চাইছি।”
“আপনার ভাই একা না। আরও অনেককে ধরা হয়েছে।”
মেহরিন চারপাশে তাকাল। সবার মুখেই একই আতঙ্ক।
কারও হাতে কোনো অস্ত্র নেই। কারও জামাকাপড়ে ভাঙচুরের চিহ্ন নেই। অথচ তাদের সবার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ। মেহরিনের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। এটা নিছক গ্রেপ্তার নয়। সে ইমনের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল।
“আমি ইমন ভাইয়ের সঙ্গে এক মিনিট কথা বলব।”
“অনুমতি নেই।”
“কেন?”
“উপর থেকে নির্দেশ আছে।”
মেহরিন থেমে গেল। “কার নির্দেশ?”
কনস্টেবল চুপ। মেহরিন বুঝে গেল এই প্রশ্নের উত্তর সে এখানে পাবে না। সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করল। পরিচিত এক আইনজীবীর নম্বরে কল দিল।
“হ্যালো, স্যার? আমি মেহরিন তাবাসসুম বলছি। ইমন ভাইকে আজ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।”
ওপাশ থেকে কিছু বলতেই মেহরিন দ্রুত বলল,
“জি, অভিযোগগুলো বলছে সহিংসতা, ভাঙচুর, সরকারি কাজে বাধা… কিন্তু ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির কোনো প্রমাণ তাদের জানা নেই।”
কিছুক্ষণ শুনে মেহরিনের মুখ আরও গম্ভীর হলো।
“আজই কি জামিনের আবেদন করা সম্ভব?”
ওপাশের কথা শুনে তার চোখ বন্ধ হয়ে এল।
“কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?” আবার নীরবতা। “কিন্তু স্যার, ওকে থানায় রেখে দিলে…”
ওপাশ থেকে আইনজীবী এবার কিছু একটা ব্যাখ্যা করলেন।
মেহরিন ধীরে ধীরে বলল, “বুঝেছি। আপনি তাহলে কাগজপত্র তৈরি করুন। আমি এখনই প্রয়োজনীয় সব তথ্য পাঠাচ্ছি।”
ফোন কেটে সে ইমনের দিকে তাকালো। হাত নাড়িয়ে তাকে ডেকে উঠলো। ইমন খেয়াল করে নি এতক্ষন। কারন তার সামনে কয়েকটা পুলিশ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলো। জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। ইমন তাকাতেই মেহরিন বলল,
” ইমন ভাই,আগামী কালকের মধ্যেই ইনশাআল্লাহ আপনার জামিনের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আপনার কিছু হতে দিব না। ”
ইমনের অস্থিরতা বেড়ে গেল। লোকাবের লোহার শিকের উপর হাত রেখে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
” মেহরিন! তুমি এখানে কেনো? কে খবর দিয়েছে তোমাকে যে আমি থানায়? ”
” চাচি ফোন করে বলেছিল। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। চাচি কে বুঝিয়েছি। আর আপনিও ভয় পাবেন না। আপনাকে উনারা খেতে দিয়েছিল তো? ”
ইমন কে ধরে আনার পর এক ফোটা পানিও দেয় নি। মাথা নত করে ফেলায় মেহরিন বুঝলো। সে দৌড়ে বাহিরে গিয়ে পাউরুটি কলা আর এক বোতল পানি কিনে এনে ইমনের হাতে দিয়ে বলল, ” এটা খেয়ে নিবেন ইমন ভাই। আজ আসছি। কাল আসবো। আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন। ”
মেহরিন চলে গেল। ইমন পাউরুটি টা মুখে দিতে যাবে আর ওমনি তার মুখের খাবার টা কেঁড়ে নিয়ে কনস্টেবল ফেলে দিল মাটিতে। ইমনের রাগ দাউদাউ করে বেড়ে গেল। ইচ্ছে করলো ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে ফেলতে। কিন্তু পারলো না। কনস্টেবল তার ডান পা দিয়ে রুটি কলা পিষে ফেললো।
মেহরিনের বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে আসে। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই হুট করে সোফায় চোখ পড়তেই চমকে উঠলো। ওয়েস্টার্ন স্লিভ হাতার একটা লাল ড্রেস পড়া। যার দৈর্ঘ্য হাট অব্দি। চুল গুলো ঘাড় অব্দি কুঁকড়ানো। ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক। মুখে একগাদা মেক-আপ। মেহরিন এগিয়ে যেতেই মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
” দাঁড়াও। ”
মেহরিন দাঁড়িয়ে গেল। মেয়েটা এগিয়ে এসে মেহরিন কে আপাদমস্তক দেখে তারপর হুট করে মেহরিনের মুখের উপর থেকে নিকাব টা টেনে সরিয়ে ফেলে। আকস্মিক ঘটনায় মেহরিন হকচকিয়ে উঠে। রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে। ঝাড়া দিয়ে মেয়েটার হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,
” কী ধরনের অসভ্যতা এটা? কে আপনি? ”
মেয়েটা মেহরিনের বাহু চেপে ধরে বলল, ” তার আগে বলো তুমি কে? ”
মেহরিন হাত সরাতে সরাতে বলল, ” আমি মেহরিন তাবাসসুম। ”
মেয়েটা নাম টা শুনে যেন আরো পাগলাটে হয়ে গেল। বাহু আরো শক্ত করে চেপে ধরে বলল, ” তুমিই সেই মেয়ে তবে! যার সাথে সোলেমানের বিয়ে হয়েছে! এই রূপ দেখিয়েই কি তুমি তাকে ফাঁসিয়েছ? বলো। জবাব দাও। কি দেখিয়ে ফাঁসালে সোলেমান কে? ”
মেহরিন এবার ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মেয়েটাকে ধক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
” আপনি কি পাগল? চেনা নেই জানা নেই আমার সাথে অসভ্যতামি করছেন। কে আপনি? এই বাড়িতে কি চাই? ”
মেয়েটা মেহরিনের কথা শুনে হাসতে শুরু করলো। ” আমি এনা। ”
নাম টা চেনা চেনা লাগলো। এজওয়ান এই নাম বলেছিল তখন। আর সোলেমান বলেছিল এই নামের মেয়েটা পাগল। সত্যিই তো পাগল লাগছে। এরিমধ্যে সোলেমানও আসলো। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই সিঁড়ির সামনে মেহরিন আর এনাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। এগিয়ে এসে বলল, ” তুমি সুলতান নিবাসে কি করছো এনা? তোমাকে না আসতে নিষেধ করা হয়েছিল? তারপরও এখানে আসলে কেন? ”
এনা সোলেমানের দিকে তাকালো। চোখের চাহনিতে আর রাগ অহং কিছুই নেই। উল্টো নম্র ভদ্র গলায় বলল,
” হোটেলে রুম খালি ছিলো না সোলেমান। আর তাছাড়া আঙ্কেলের এই অবস্থা আমাকে জানালে না তোমরা! আমি আঙ্কেল কে দেখতে এসেছি। বাংলাদেশে এক তোমাদের বাড়ি ছাড়া তো আমি আর কিছু চিনি না। ”
সোলেমান একবার মেহরিনের দিকে তাকালো। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, ” রুমে যাও তুমি। ”
মেহরিন রুমে চলে গেল। সোলেমান এনার দিকে তাকিয়ে বলল, ” অন্য কোনো মতলবে যদি তুমি এ বাড়িতে এসে থাকো এনা। তাহলে আই স্যোয়ার তোমাকে মেরে ফেলবো। তখন মাথায় রাখবো না হু আর ইউ। মাইন্ড ইট। নিচ তালায় গেস্ট রুম আছে সেখানে থাকো। ভুলেও উপরে যাবে না। ”
এনা মাথা নেড়ে সম্মত জানালো। সোলেমান সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যেতেই এনা বাঁকা হাঁসলো।
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবরটা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই এজওয়ানের চারপাশটা যেন হঠাৎ বদলে গেছে।
দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে তার নাম। বিভিন্ন সংস্থার অভিনন্দন বার্তা। সাক্ষাৎকারের অনুরোধ। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে ব্যস্ততার যেন শেষ নেই।
স্টকহোমে যাওয়ার আগে আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকি।তার মধ্যেই একদিন বিকেলে মাহিকে নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এজওয়ান।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মাহি আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের চুল ঠিক করছিল। এজওয়ান তখন স্টাডিরুমে ঢুকে আলমারির নিচের ড্রয়ারটা খুলল। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে সেখান থেকে ছোট্ট একটি কালো পেনড্রাইভ বের করল। পেনড্রাইভটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল সে। তারপর সেটা পকেটে রেখে স্টাডিরুম থেকে বেরিয়ে এল। মাহি ঘুরে তাকাল। এজওয়ান জ্যাকেটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে বলল,
“তুমি গাড়িতে গিয়ে বসো। আমি এক মিনিটে আসছি।”
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“একটা জিনিস নিতে হবে।”
মাহি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কয়েক মিনিট পর এজওয়ান গাড়ির কাছে এসে দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসল। মাহি পাশের সিটে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল।
কিছুদূর যাওয়ার পর এজওয়ান হঠাৎ জ্যাকেটের ভেতর থেকে পেনড্রাইভটা বের করল। মাহির চোখ সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে গেল।
“এটা কী?”
এজওয়ান পেনড্রাইভটার দিকে তাকিয়ে বলল,
” আমার বানানো AI-চালিত স্মার্ট মনিটরিং এপ্সের পুরো সিস্টেমের ব্যাকআপ আছে। অ্যাপের মূল আর্কিটেকচার, ডেটা-স্ট্রাকচার, অ্যালগরিদম, প্রয়োজনীয় ফাইল সব এখানে।”
মাহির হাত ধীরে ধীরে পেনড্রাইভটার দিকে এগোল। কিন্তু ধরার আগেই এজওয়ান সেটা আবার নিজের হাতে নিয়ে নিল। মাহি নিজের দৃষ্টি সরিয়ে বলল,
” এটা নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন তাহলে? ”
” তোমাকে নিয়ে আগে শপিং করে দ্যেন ল্যাবে যাব। কাজ আছে কিছু। আরো কিছু ফিচার এড করবো। আরো স্ট্রং করবো। ”
এজওয়ান পেনড্রাইভটা নিজের জ্যাকেটের পকেটে রেখে দিল। মাহি আর কোনো কথা বলল না। এজওয়ান গাড়ি চালানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগে মাহি খুব দ্রুত নিজের ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে কয়েকটা শব্দ টাইপ করল। তারপর একটি নির্দিষ্ট নম্বরে মেসেজ পাঠিয়ে দিল।
” অ্যাপ্সের পুরে সিস্টেমের ব্যাকআপ একটা পেনড্রাইভে আছে। আর সেটা এজওয়ানের সঙ্গে আছে।”
মেসেজ পাঠানোর পরই ফোনটা নিঃশব্দে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল সে। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।যেন মনে হলো এজওয়ান কিছুই টের পেল না।
বাইরে তখন শহরের ব্যস্ত রাস্তা। কিছুদূর যাওয়ার পর এজওয়ান হঠাৎ ব্রেক কষল। সামনে একটি কালো গাড়ি আড়াআড়িভাবে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। পেছন থেকেও আরেকটি গাড়ি এসে তাদের পথ বন্ধ করে দিল।
এজওয়ানের চোখ সরু হয়ে এল। পরের মুহূর্তেই দুদিক থেকে কয়েকজন লোক নেমে এলো। এজওয়ান মাহির দিকে তাকাল। “নিচু হয়ে বসো তরিকুলের বেটি। সিটবেল্ট খুলবে না। চুপচাপ বসে থাকবে ভেতরে। ”
এজওয়ানের গলা একদম ঠান্ডা। লোকগুলো গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। এজওয়ান পেনড্রাইভ আর গায়ের জ্যাকেট টা খুলে গাড়ির ভেতরে রেখে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতে নিলে মাহি সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরতে চাইল।
“এজওয়ান, যাবেন না!”
এজওয়ান পেছনে ফিরে তাকাল। “গাড়ির ভেতরেই থাকো তুমি। খবরদার বের হবে না।”
“কিন্তু…”
“মাহি।”
একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু তাতেই মাহি চুপ হয়ে গেল। এজওয়ান দরজা বাহির থেকে লক করে সেই চাবিটা সমুদ্রের দিকে ছুঁড়ে মারলো।
একে একে লোকগুলো তাকে ঘিরে ফেলল। প্রথম লোকটা ঘুষি ছুড়তেই এজওয়ান মাথা সরিয়ে আঘাতটা এড়িয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই তার মুষ্টি গিয়ে আঘাত করল লোকটার চোয়ালে। লোকটা টলতে টলতে পেছনে পড়ে গেল।আরেকজন লোহার রড নিয়ে এগিয়ে এলো। এজওয়ান পাশ কাটিয়ে তার হাত চেপে ধরল। এক টানে রডটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলল। তারপর কনুইয়ের আঘাতে লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিল। একসঙ্গে কয়েকজন ঝাঁপিয়ে পড়ল।
রাস্তার পাশে মুহূর্তেই ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। মাহি গাড়ির ভেতর থেকে আতঙ্কিত চোখে সব দেখছিল। কিন্তু তখনই একজন লোক পিছন দিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলার চেষ্টা করলো। মাহি চমকে উঠল। লোকটা দরজা টানল। খুলল না।
বাইরে তখন এজওয়ান একসঙ্গে কয়েকজনের সঙ্গে একা লড়ছে। মাহি জানালায় ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করল,
“এজওয়ান!”
এজওয়ান পিছু ফিরলো। দৌড়ে এসে সেই লোকটাকে টেনে আঘাত করলো টুনটুনি বরাবর। লোকটা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো। এজওয়ান একে একে লোকগুলোকে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে। কেউ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কেউ পেট চেপে কাতরাচ্ছে। কেউ মুখে হাত দিয়ে বসে আছে। শেষ লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে এজওয়ান হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়াল। তারপরই গাড়ির ভেতর থেকে মাহির চিৎকার কানে এল।
“গোলামের পুত! তুই মারামারি করবি ভালো কথা, কর। কিন্তু তুই আমায় গাড়ির ভেতর লক করে, গাড়ির চাবি কেন পানিতে ছুড়ে ফেললি?”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকে গাড়ির দিকে তাকাল। মাহি তখন মরিয়া হয়ে দরজা ধাক্কাচ্ছে। অনেকক্ষণ গাড়ি লক থাকায় তার শ্বাসকষ্ট শুরু হতে লাগলো। মাহি কি মারামারি করতে পারে না? তাকে গাড়ির ভেতর লক করে কি প্রমাণ করতে চাইছে এজওয়ান? দুজন মিলে ফাইট করলে অনেক আগেই সব কটাকে কপোকাত করে ফেলতো। তা না তার হিরোগিরি দেখাতে হবে একা একা। সবকটা ধরে যদি উল্টো এজওয়ান কে মারতো তখন? মাহি গাড়িতে বসে বসে সিনেমা দেখতো?
“এখন চাবি ছাড়া আমায় বের করবি কেমনে তুই? যা, তাড়াতাড়ি পানিতে নেমে চাবি খুঁজে আন! দরজা খোল! তাড়াতাড়ি খোল! খুলে আমায় বের কর! আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে!”
এজওয়ান ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“দম বন্ধ হয়ে আসলে মরে যা। না করছে কে?”
মাহির শরীর কিরমির করে উঠল।
“তাড়াতাড়ি দরজা খোল! সিরিয়াস আমি। সত্যি দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
এজওয়ান গাড়ির কাছে এসে চারপাশটা একবার দেখে নিল। তারপর বলল, “ব্যাক সিটে যাও।”
মাহি হতভম্ব। “কী?”
” বললাম ব্যাক সিটে যাও।”
মাহি ভ্রু কুঁচকে ফেলল। দরজা খুলতে বলছে, আর এই লোক তাকে ব্যাক সিটে যেতে বলছে!
“আমি এখানে দম বন্ধ হয়ে মরছি আর আপনি..”
“ব্যাক সিটে যেতে বলছি কিন্তু ।”
এজওয়ান এবার রাস্তার পাশে তাকিয়ে একটা ভারী পাথর তুলে নিল। মাহি চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“ওটা নিয়ে কী করবেন?”
এজওয়ান পাথরটা হাতে নিয়ে গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“শালী, পিছে যা। নইলে এই পাথর তোর মাথায় ছুড়ে মারব।”
“আপনি আমাকে মারবেন?”
“পিছে যা!”
দাহশয্যা পর্ব ৯৯
মাহি গজগজ করতে করতে ব্যাক সিটে চলে গেল।এজওয়ান আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। ভারী পাথরটা দিয়ে গাড়ির সামনের কাঁচে সজোরে আঘাত করল। পুরো সামনের কাঁচ ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেল।
” আয় বাহিরে আয়। বাহিরে এসে শ্বাস নে প্রাণ ভরে। তুই এত তাড়াতাড়ি মরে গেলে আমার সমস্যা। আমার জাইঙ্গা ধুয়ে দিবে কে? আমার বাচ্চা কাচ্চা দুনিয়ায় আনবে কে? অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তুই আমার জীবনে। ”
