Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯

দাহশয্যা পর্ব ৯

দাহশয্যা পর্ব ৯
Raiha Zubair Ripti

চট্টগ্রামে ১০ দিন থেকে গতকাল রাতে ঢাকায় নিজ বাড়ি সুলতান নিবাসে ফিরেছে এজওয়ান। এসেই সেই যে রুমে ঢুকেছে তু ঢুকেছেই আর বের হয় নি। এখন বাজে বেলা ১১ টা। সোলেমান সকালের খাবার খাচ্ছে টেবিলে বসে। বাশার সুলতান গুমরো মুখ করে চেয়ার টেনে বসলেন। সোলেমান একবার চাচার দিকে চেয়ে বললেন-
-” মুখ এমন বাংলার বর্ণমালা ঙ ঞর মতো কেনো?
বাশার সুলতান পাউরুটি মুখে নিয়ে বললেন-
-” এজওয়ান এসেছে গতকাল রাতে। খুব রেগে ছিলো।
-” কি করে এসেছে?
-” বলে নি।
-” আসতে বলো সামনে। বলো আমি ডেকেছি।
বাশার সুলতান ম্যেড কে ডেকে বললো এজওয়ান কে ডেকে বলতে সোলেমান ডাকে তাকে।
বাড়ির ম্যেড এজওয়ান কে ডেকে বলল-

-” ছোট স্যার সোলেমান স্যার ডাকে আপনাকে।
কথাটা বলেই ম্যেড চলে যায়। সোলেমান অপেক্ষা করলো এজওয়ানের। কিন্তু এজওয়ান আসলো না। তা দেখে সোলেমান নিজেই এজওয়ান এর রুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে দরজায় ঠকঠক করে বলল-
-” কিরে দরজা খুলছিস না কেনো? বেঁচে আছিস? নাকি ম’রে গেছিস? ম’রে গেলে বল এম্বুলেন্সকে ফোন দিয়ে সুলতান নিবাসে আসতে বলি।
এজওয়ান রুমের ভেতর থেকে বলল-
-” ভাই মরি নাই আমি। বেঁচেই আছি।
-” তাহলে মুখে কি পোকা পড়ছে তোর? নাকি পা, হাত ভাঙা যে দরজা খুলছিস না?
-” সবই আস্ত আছে তোমার দোয়ায়।
-” তাহলে দরজা খুলছিস না কেনো হা’রামজাদা? দরজা খোল বলছি তাড়াতাড়ি।
এজওয়ান ড্রিংকস এর বোতল হাতে নিয়ে দরজা খুলে দিলো। সোলেমান ভেতরে ঢুকে দেখলো পুরো রুম জুড়ে ম’দের বোতলে ছড়াছড়ি।

-” রুমের এ অবস্থা কেনো?
-” খাচ্ছিলাম।
-” খাওয়া শেষ?
-” হুমম।
-” তাহলে ফ্রেশ হয়ে নে। আর শোন?
-” বলো।
-” চাচা বললো তুই রাতে রেগে ছিলি। রাগার কারন কি?
এজওয়ানের মূহুর্তে মনে পড়লো সেই মেয়ের কথা। যে কি না এই এজওয়ান সুলতান কে ধাক্কা দিয়েছিল।
-” এমনি ভাইজান। তোমার চাচা বাসায় আসতে না আসতেই প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে বসেছিল। সেজন্য রাগ উঠেছিল।
সোলেমান এজওয়ান কে আপাদমস্তক দেখে রুম থেকে বের হলো। বসার ঘরে আসতেই দেখলো ইব্রাহিম এসেছে। সোলেমান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-

-” কিরে আমার বাসায় যে এই সময়?
-” আশ্চর্য আজ কি নতুন এসেছি নাকি তোর বাড়ি?
-” সব ঠিকঠাক?
-” সব ঠিকঠাক মেরি পেয়ারি দোস্ত। তোকে নিতে এসেছি।
-” নতুন জামাই নাকি আমি যে নিতে এসেছিস?
-” নতুন জামাই তো হতেই যাচ্ছিস ৮ দিন পর। চল এখন।
-” কোথায়?
-” আহা চল না। গেলেই দেখতে পারবি।
ইব্রাহিম সোলেমান কে নিয়ে বাহিরে আসলো।ইব্রাহিমের গাড়িতে অচেনা এক ছেলেকে দেখে বলল-
-” এই ছেলে কে?
-” আমার নতুন ড্রাইভার ইমন।
ইব্রাহিম ইমন কে বললো বসুন্ধরায় নিয়ে যেতে।
সকালে আফিয়া সুলতান ইব্রাহিম কে ফোন করে বলেছে সোলেমানের বিয়ের শপিং এর দায়িত্ব তাকে নিতে। সেজন্য ইব্রাহিম চলে এসেছে সোলেমান কে নিতে। বসুন্ধরা মলের সামনে আসতেই তারা মলের ভিতরে ঢুকলো। ইমন কেও নিয়ে আসলো ইব্রাহিম ভিতরে। সোলেমান হঠাৎ মলে আসতে দেখে ইব্রাহিম কে জিজ্ঞেস করলো-

-” মলে আসলাম কেনো আমরা?
-” মলে মানুষ আসে কিসের জন্য?
-” শপিং করতে। ঈদের তো এখনও অনেক দেরি আছে।
-” ঈদের না বিয়ের।
-” কার তোর? কবে ঠিক হলো?
ইব্রাহিম মাথায় হাত দিলো।
-” আমার বিয়ে হতে যাবে কেনো? বিয়ে তো তোর ভুলে গেলি এত তাড়াতাড়ি ?
সোলেমানের মনে পড়লো তার বিয়ের কথা।
-” মা বলেছে এসব করতে তাই তো?
-” হুমম। এখন কথা কম। শেরওয়ানি পছন্দ কর। তারপর ভাবির জন্য লেহেঙ্গা নিতে হবে।
-” জাস্ট একটা সাদা পাঞ্জাবি কিন। ওসব শেরওয়ানি মেরওয়ানি পড়ছি না আমি। আর উনার জন্য কোনো লেহেঙ্গা নয়, লাল বেনারসি কিন।
-” বিয়েতে সাদা পাঞ্জাবি পড়বি! সব সময় তো সাদা পাঞ্জাবিই পড়িস। এবার বিয়েতে ভিন্ন কিছু তো পড়।
-” বিয়ে তোর নাকি আমার?
-” তোর।
-” তাহলে যা বলছি তাই কর।

ইমন মুগ্ধ হয়ে চারিপাশ টা দেখলো। এই প্রথম আসা তার বসুন্ধরা। তার আর মেহরিনের বিয়েতে মেহরিনের জন্য সেও এখান থেকে বিয়ের শাড়ি কিনবে। চারিপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো। দূরে থাকা একটা লাল টুকটুকে বেনারসি তে ইমনের চোখ আঁটকে গেলো। বেনারসি টার কাছে এগিয়ে গেলো। কি সুন্দর বেনারসি টা! ইমন হাত বুলালো৷ শাড়ি টার গায়ে মূল্য লেখা ১৭০০০০। ইমন জিজ্ঞেস করলো দোকানদার কে-
-” দাম কি এটার ফিক্সড এটাই?
-” জ্বি।
ইমন শেষবার চোখ বুলালো শাড়ি টায়। এই শাড়ি টা সে কিনবে মেহরিনের জন্য বিয়েতে৷ ১৭০০০০ টাকা সে ইনকাম করবে এরমধ্যে।
-” ভাই শাড়ি টা রেখে দিবেন আপনার দোকানে। আমি নিতে আসবো ফের।
-” এই শাড়ি কেউ না কিনলে অবশ্যই রেখে দিব।
ইমন চলে আসলো। সোলেমান মল টার আশেপাশে দেখছিল। ইব্রাহিম সাদা পাঞ্জাবি কিনে এনে বলল-

-” এবার বউয়ের বেনারসি টা কিন নিজের পছন্দের মতন।
সোলেমান ঠোঁট কামড়ে মেয়েদের সাইটে আসলো। দূরে ঝুলানো এক লাল বেনারসি দেখে এগিয়ে গেলো। মূল্য লেখা ১৭০০০০। ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” এটা প্যাক করতে বল।
ইব্রাহিম দোকানদার শাড়িটা প্যাক করতে বলে বিল পে করে দিলো। শাড়ি পাঞ্জাবি নিয়ে নিচে নামতেই ইব্রাহিমের মনে পড়লো ইমন তো তাদের সাথে নেই৷ পকেট থেকে ফোন বের করে ইমন কে কল করলো।
-” কোথায় তুমি? আমরা গাড়ির কাছে।
-” এই তো ভাইয়া আসতেছি।
ইব্রাহিম সোলেমান বসে পড়লো গড়িতে৷ ইমন আসতেই ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো-

-” কোথায় ছিলে?
-” ভেতরেই ছিলাম। দুঃখিত দেরি হওয়ার জন্য।
ইমন গাড়ি স্টার্ট দিলো। চোখে এখনও সেই শাড়ির প্রতিচ্ছবি। এই শাড়িতে তার মেহরিন কে একদম পুতুল বউয়ের মতন লাগবে। টাকা টা জমিয়েই জমানোর টাকা দিয়ে আগে ইমন এই শাড়িটা কিনবে৷
অথচ বেচারি ইমন জানতেই পারলো না সেই শাড়ি টা আর নেই, সেল হয়ে গেছে। এবং যে শাড়িটা কিনেছে সেও মেহরিনের জন্যই কিনেছে৷
সোলেমান কে তার বাসায় নামিয়ে ইব্রাহিম তার বাসার দিকে গাড়ি ঘুরাতে বলল ইমন কে। ইমন লুকিং গ্লাসে ইব্রাহিম কে দেখে বলল-

-” উনি কে ছিলো ভাইয়া?
-” এই আসনের এমপি। আর আমার কলিজার বন্ধু।
ইমন ভ্রু কুঁচকালো। এমপি রা কি এভাবে ঘোরাঘুরি করে গার্ড ছাড়া?
-” দেখে তেমন টা মনেই হয় নি।
-” মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারন ও এখন কোনো রাজনীতির সভায় নেই সেজন্য। ও যখন রাজনীতির ভেতর থাকে তখন ওর গেটআপ একরকম আর যখন রাজনীতির বাহিরে থাকে তখন গেটআপ অন্য রকম।
-” উনার কি সামনে বিয়ে?
-” হুমমম।
-” ওহ্।
-” হুমম। তা তোমার বাসায় কে কে আছে ইমন?
-” আমি, মা, আর বোন।
-” বাবা?
-” মারা গিয়েছে।
-” ওহ্ সরি।

মানুষের মন যেন এক রঙিন ঘুড়ির মতো। কখনো সে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে, কখনো আবার হাওয়ায় দুলতে দুলতে হারিয়ে যেতে চায় অসীম নীলিমায়। সেই ঘুড়ির সুতো হয়তো নিজের হাতে থাকে না,কেউ না কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, টেনে ধরে কিংবা থামিয়ে দেয় ঠিক মাঝ আকাশে।
আমাদের মনেরও তেমনই অবস্থা। কখনো কোনো আনন্দের মুহূর্তে মন একেবারে আকাশ ছুঁয়ে ফেলে, আবার কোনো অদৃশ্য বাধা বা বাস্তবতার ভার তাকে নিচে নামিয়ে আনে। তবুও মন থেমে থাকে না। সে চায় মুক্তি, চায় উড়তে, চায় নিজস্ব রঙে রাঙাতে চারপাশ।
মেহরিন রুমে নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে ভেবে চলছে কিছু৷ আজ কেমন জানি একটু মন খারাপ মেহরিনের। কেনো তা জানে না। মনে হচ্ছে সে খুব তাড়াতাড়ি পৃথিবী থেকে একদিন ঝড়ে যাবে। মেহরিন মৃত্যু কে ভীষণ ভয় পায়। এই একটা সত্য তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। মেহরিন অনেক বছর বাঁচতে চায় তার পরিবার প্রিয়জনদের সাথে।
সেরিন রুমে এসে বোন কে জায়নামাজে বসে থাকতে দেখে পাশে বসে বলল-

-” কিরে কি ভাবছিস?
মেহরিন বোন কে জড়িয়ে ধরে বলল-
-” আচ্ছা আপু মানুষ মরে গেলে নাকি মানুষ মানুষকে ভুলে যায়? আমি ম’রে গেলে কি তুমি আমাকেও ভুলে যাবে?
সেরিনের বুক কেঁপে উঠলো৷ গতকাল তার বাবাও মৃত্যুর কথা বলেছে আর আজ তার বোন বলছে! তারা কি বুঝে না তাদের মুখে এমন কথা শুনলে তার বুক ফেটে যায়।
-” এসব বাজে কথা কেনো বলছিস মেহু? অনেক বছর বাঁচবি তুই। আমার সকল হায়াত তোদের হোক।
মেহরিন বুক থেকে মাথা তুলে হাসার চেষ্টা করে বলল-
-” কেন জানি মনে হয় আমি বেশি দিন তোমাদের মাঝে থাকবো না। মনে হয় আমি এমন ভাবে তোমাদের ছেড়ে চলে যাব যেন আমার অস্তিত্ব একেবারেই মুছে যাবে পৃথিবী থেকে। কোথাও আমার কোনো শেষ চিহ্নও অবশিষ্ট থাকবে না।
-” হুঁশশ মেহরিন এসব বলে না। কদিন বাদেই তোর বিয়ে সেটায় ফোকাস কর। আর জানিস তোর বিয়ের বেনারসি কেনা হয়ে গেছে।
মেহরিন জায়নামাজ উঠিয়ে ভাজ করতে করতে বলে-

-” আব্বা কিনে আনছে?
-” না।
-” তাহলে?
-” তোর জামাই কিনেছে ঢাকা থেকে।
-” জামাই বলছো কেনো। এখনও বিয় হয় নি আপা।
-” হবে তো বিয়ে কদিন পর।
-” যেদিন হবে সেদিন বলিও।
সোলেমান বাড়ি ফিরে প্যাকেট গুলো সেই যে বিছানার উপর রেখেছে এখনও সেখানেই পড়ে আছে। সোলেমান নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে আছে লাল বেনারসি টার দিকে। আচ্ছা সে তো বলেছে বিয়ে করবে। কিন্তু মেয়েটাকে কি স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারবে? মেয়েটাকে তো ঢাকায় আনবে না সোলেমান। মেয়েটা থাকবে সুলতান ভিলায়।সুলতান নিবাস তার জন্য না। সুলতান নিবাসে কোনো নারী থাকতে পারে না।
সোলেমান এসব ভাবার মাঝেই পকেটে থাকা ফোন টা বেজে উঠলো। ফোনের নম্বর টা দেখেই মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটলো। ফোনের ওপাশ থেকে রুমাইসা সুলতান সোলেমানের একমাত্র ছোটবোন বলে উঠলো-

-” হ্যালো ভাইয়া।
-” হুমম বল শুনছি। কেমন আছিস?
-” ভালো আর থাকতে দিলে কই? তোমায় নিয়ে আমাদের কত চিন্তা হয় জানো?
-” হুমম জানি তো।
-” কচু জানো। জানলে কি আর এভাবে দূরে থাকতে? ঈদ চলে গেল তারপরও আসলে না। এখন বিয়ে তোমার তারপরও আসছো না। মেয়েটাকে দেখলেও না। আমি ছবি তুলে এনেছিলাম ওর। ভীষণ কিউট দেখতে মেয়েটা।
-” পছন্দ হয়েছে খুব?
-” ভীষণ। এক দেখাতেই। এখন তোমার হলে হয় পছন্দ। ছবি কি পাঠাবো দেখবে?
সোলেমানের দেখতে ইচ্ছে করলো না। বিয়ের দিনই গিয়ে দেখবে একবারে।
-” না থাক। শপিং করেছিস?
-” হ্যাঁ মা বাবা নিয়ে গিয়েছিল।
-” আচ্ছা রাখছি তাহলে এখন।

সোলেমান ফোন কেটে শাড়ি পাঞ্জাবি টা আলমারি তে রেখে দিলো। আজ সন্ধ্যার পর একটা বোর্ড মিটিং আছে। সেখানে যেতে হবে৷ আর সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
এজওয়ান শুনতে পেরেছে তার ভাইজানের বিয়ে। যাক এবার বউ আসলে তার উপর থেকে ভাইজানের নজর সরবে। এই ভেবে খুশি হলো। এজওয়ানের এসব বিয়েশাদি ভালো লাগে না। তাই বিয়েতে যাবে কি না এসব নিয়ে ভাবছে না। ব্লাক হুডি মাক্স পড়ে সন্ধ্যা হতেই বাড়ি থেকে বের হলো।
ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানের এক পুরোনো বহুতল ভবনের উপর তলায়, বাইরের চেহারা খুব সাধারণ, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ।
নাইট হেইভেন আর বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক সাধারণ বার, কিন্তু মধ্যরাতের পর ক্লাবের আসল চেহারা দেখা যায়। দেয়ালজুড়ে লাল আলো, ডিজে বক্সে ধোঁয়াশা, আর ভিতরে আলাদা আলাদা ভিআইপি রুম। এখানে আমন্ত্রিতদের জন্য গোপন ডিল চলে। মাদক, অর্থ, শরীর,সবকিছু বিনিময়ের মাধ্যম। মেয়েরা হয় লোভে, নয়তো বাধ্য হয়ে আসে। কেউ আবার এসেই হারিয়ে যায়। এই ক্লাবে একবার ঢুকলে, কেউ আর আগের মতো থাকে না।
আজ এখানে একটা গুরত্বপূর্ণ ডিল হবে। কিছু বিদেশি ক্লায়েন্ট এসে অপেক্ষা করছে কারো জন্য। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরই একজন লোক আসলো। মুখে মাক্স শরীরে ব্লাক হুডি। লোক গুলোর সামনে বসে বলল-

-” আপনারা আমারই অপেক্ষা করছিলেন।
-” জ্বি আপনিই মিস্টার…
-” জ্বি আমিই সেই। টাকা গুলো এনেছেন তো?
-” জ্বি এনেছি।
কথাটা বলেই লোকগুলো কালো একটা স্যুটকেস লোকটার দিকে এগিয়ে দিতেই লোকটা বলল-
-” টাকা পুরোটাই আছে তো?
-” জ্বি পুরোটাই ৩ কোটি আছে।
-” গুড। ১০৪ নম্বর রুমে গিয়ে দেখুন মেয়েগুলো আছে। হাত পা বাঁধা। পেছনের দরজা দিয়ে নিয়ে যাবেন। ড্রাইভার রেডি আছে আমার।
লোকটা চলে গেলো স্যুটকেস নিয়ে। লোকগুলো উঠে ১০৪ নম্বর রুমে গিয়ে দেখলো ১০ জন নারী হাত পা বাঁধা অবচেতন হয়ে পড়ে আছে। ড্রাইভার এসে নিয়ে গেলো নারী গুলো কে গাড়িতে।
নাইট হেইভেন ক্লাবে বসে ড্রিংকস করছে এজওয়ান। আজ বাহাদুর কে নিয়ে আসে নি। শালার ঘরে শা’লা কে নিয়ে আসলে শুধু জ্ঞান দেয়। সেজন্য আজ এজওয়ান একাই এসেছে। ড্রিংকস এর গ্লাসে চুমুক দিতেই দেখলো দরজার কাছে বাহাদুর দাঁড়ানো। ভেতর থেকে একটা বিশ্রী বকা সে বাহাদুর কে দিয়ে বসলো। বাহাদুর এজওয়ান কে দেখে এগিয়ে এসে বলল-

-” আমাকে না জানিয়ে এখানে এসেছিস কেনো?
-” তুই কে রে যে তোকে জানিয়ে সব জায়গায় আসতে হবে আমার?
-” এটা তোর অস্ট্রেলিয়া না। এখানে তোর বাপ ভাইয়ের শত্রুর অভাব নেই। যদি কেউ তোর…
-” আমাকে চিনতে তোর জীবন পাড় হয়ে যাবে তাও চিনতে পারবি না এই এজওয়ান আসলে কি। তাই আমাকে জ্ঞান দিস না বাহাদুর। তোর জ্ঞান সবসময় মজা লাগে না। আমার কাজ আমাকে করতে দে।
-” কিসের কাজ করতে এসেছি তুই এখানে?
আর তখনই একটা মেয়ে এসে এজওয়ানের হাত ধরে টান দিলো। এজওয়ান বাহাদুরের দিকে চোখ মেরে বলল-
-” এই যে এই কাজ।

এজওয়ান চলে গেলো উপরে সেই মেয়ের সাথে। উফ এই এজওয়ান নারীর জন্য এখানে এসেছে!
নীরব শুনশান নীরব রাস্তা দিয়ে চলছে গাড়ি। গাড়ির ভেতর আছে দশ দশটি মেয়ে আর ড্রাইভার। দিনের আলো ফোটার আগেই মেয়ে গুলো কে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় দিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তার আগেই দেখলো মাঝ রাস্তায় একটা কালো ট্রাক দাঁড় করানো। গাড়িটা থেমে গেলো। গাড়ি থেকে ড্রাইভার বের হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” এ্যই কে রে এভাবে মাঝ রাস্তায় গাড়ি কে থামালো?
গাড়ির দরজা ধরে টান দিতেই দেখলো গাড়ির ভেতর কেউ নেই। মুহূর্তে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দে পেছন ফিরতেই দেখলো মেয়ে ভর্তি সেই ট্রাকটা কেউ নিয়ে চলে যাচ্ছে।
ড্রাইভারের মাথায় হাত। নিজের ট্রাক কে ফলো করার জন্য এই ট্রাকে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়ে দেখে গাড়ি স্টার্ট হচ্ছে না। ট্রাক টা মূহুর্তে চোখের সীমানার বাহিরে চলে যায়। মালিকের কানে এই খবর গেলে মালিক তো তাকে জানেই মেরে ফেলবে।
নাইট হেইভেনের ১০৫ নম্বর রুমে এক মেয়েকে হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছে। সামনেই সোফায় পায়ের উপর পা তুলে টিভি দেখছে এজওয়ান। মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলছে-

-” বেডেই যখন নিবে না তাহলে হাত পা বাঁধার কি মানে?
এজওয়ান ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। নীল চোখ জোড়ার চাহনি শক্ত।
-” আমার বেডে জায়গা হবে তাও আবার তোদের মতন সস্তা মেয়েদের? নাইস জোক্স। রাত অব্দি এভাবেই থাকবি। সকাল হলে ছেড়ে দিব। তারপর নেক্সট টাইম আমার চোখের সামনে আসবি না।
-” সারা রাত এভাবে রাখার মানে কি?
-” তোর প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি রাজি নই। সো সাইলেন্ট। আমি এখন টিভি দেখছি।
মেয়েটা চুপ হয়ে গেলো। কে এই ছেলে। এভাবে বেঁধে কেনো রেখেছে?
এজওয়ান এর ফোন বেজে উঠলো। ওপাশ থেকে শুধু একটাই আওয়াজ আসলো-
-” কথামতো কাজটা সাকসেসফুলি হয়ে গেছে।
এজওয়ান বাঁকা হেঁসে বলল-
-” গুড। নেক্সট টার্গেটে যেতে হবে এখন আমাদের।

রাজনীতির মূল কেন্দ্রস্থলে, জনতার কল্যাণ পরিষদ নামের একটা তথাকথিত জনবান্ধব রাজনৈতিক দলের বোর্ডরুম। এখানে প্রতি মাসে একবার করে উন্নয়ন ও প্রগতির মিটিং হয় যার আসল উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতা ধরে রাখা, টাকা ভাগাভাগি, চক্রান্ত আর নিজ নিজ এলাকার প্রভাব রক্ষা করা।
মিটিং এ আলোচনার বিষয়সমূহ. চাঁদার অডিট কে কয়টা ঠিকাদারি থেকে কত পেয়েছে, আর কাকে দিতে হয়নি। বিরোধী দলের বদনাম ছড়ানোর নতুন পদ্ধতি সোশ্যাল মিডিয়া বা নাটকীয় গ্রেফতার? গণমাধ্যম পোষ মানানোর কৌশল, কার সাথে রাতের ডিনার, আর কে চুপ রাখার জন্য চেক পাবে। অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র দলের ভেতর যারা বেশি সৎ তাদের ঠেকাতে গোপন প্ল্যান। নির্বাচনী এলাকার শোডাউন বাজেট কে কত মানুষ ভাড়া করে আনবে, আর মঞ্চে কে কার পাশে দাঁড়াবে।
চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে শুরু হলো বৈঠক। সোলেমান এখনও আসে নি।
চেয়ারম্যান টেবিলের মাথায় বসেই বললেন-

-“ আমরা এই মাসে ২৮ কোটি বরাদ্দ পাচ্ছি। তিন ভাগে ভাগ হবে, ৩ কোটি যাবে মিডিয়া ম্যানেজে, বাকি ঠিকাদার আর অফিস ভাগ বুঝে নেবে।
সোলেমানের পাশের আসনের এমপি রিয়াজ আলম বললেন-
-” সোলেমান কি মানবে?
-” উনি তো নিজেই একাই এক দল। বোর্ডের প্রতিটা সিদ্ধান্ত আটকে দিচ্ছেন। চাঁদা, ভাগ,কোনো কিছুতে হাত দিচ্ছেন না। উনাকে জানানো যাবে না।
-” কিন্তু আমি তো সব জেনে গেলাম চেয়ারম্যান সাহেব।
কথাটা বলতে বলতে রুমের ভেতরে ঢুকলো সোলেমান।
চেয়ারম্যান বিরক্ত হয়।
-” শুনেই যখন ফেলছো তাহলে বাঁধা দিও না সোলেমান।
-” আপনারা সেতু বানাতে চান, ঠিক আছে। কিন্তু কেন ৩ কোটি মিডিয়ায় যাবে? কে ঠিক করবে কোন পত্রিকায় কী লেখা হবে?
রিয়াজ আলম হাল্কা হেঁসে বললেন-

-” আপনার মতো আদর্শবাদীরা রাজনীতিতে বেশিদিন টিকে না ভাই। মিডিয়া চালাতে হয়, গল্প বানাতে হয়। বড় ভাবমূর্তি বলতে যা বোঝায়, সেটা এমনি এমনি তৈরি হয় না।
সোলেমান টেবিলে হাত রাখেন, চোখ সোজা রিয়াজ আলমের চোখে চোখ রেখে বলে-
-” ভাবমূর্তি বানাতে গিয়ে দেশের সেতু যদি ভেঙে পড়ে, মানুষ যদি ডুবে মারা যায়, তখন আপনারা পোস্ট দিবেন দুঃখজনক লিখে?
-” আপনি কী বোঝেন না, রাজনীতি মানেই একটা ব্যালান্স? আমরা তো ভিক্ষা করছি না,পরিশ্রম করছি! মিডিয়া চালাই, পোস্টার ছাপাই, মানুষ চালাই এটাও খরচ।
-” এত কথা জানি না আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় এই কাটফান্ডের খেলা হতে দেব না। সেতু হোক, আর যাই হোক। ৩০% কাট মানে জোড়াতালি সেতু, এক বছরেই ধসে পড়বে।
রিয়াজ আলম চোখ উল্টে বললেন –

-” আপনি দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছেন নওয়াজ ভাই। আপনি কি বোর্ডের সিদ্ধান্ত মানেন না? আপনি যদি দলের ভেতর থেকে কাঁটা হয়ে দাঁড়ান, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেই কাঁটাই ছেঁটে ফেলা হয়। আমরা আপনাকে বন্ধু ভাবি, শত্রু বানাতে চাই না।
-“আপনারা বন্ধুদের মতো আচরণ করুন, তাহলে শত্রু বানানোর দরকারই হবে না। আমি জনতার ভোটে এমপি হয়েছি, পেছনে কারো চেক ছিল না। তাই যখন আমার কেউ বলে – চুপ থাকুন, নইলে দেখবেন। আমি সোজা বলি, আমি দেখার জন্যই রাজনীতিতে এসেছি। তাছাড়া আমার এলাকায় কী হবে, সেটা জনগণ ঠিক করবে, জনগনের চাওয়ার ভিত্তিতে আমি ঠিক করবো। কমিশনধারীরা নয়।
-” আপনি কি আমাদের প্রকল্প আটকে দিবেন?
-” না। আমি শুধু বলছি, রাস্তা হোক। কিন্তু বাজেটের ৩০% দলীয় ফান্ডে গেলে সে রাস্তা তিন মাসেই ভেঙে পড়বে। সে দায় আমি নেব না।

-” এতো সৎ হয়ে রাজনীতি চলে না, এমপি সাহেব। এটা কোনো স্কুল না, রাজনীতি।
-” রাজনীতির নাম দিয়ে যেটা চলছে, তা দুর্বৃত্তায়ন। আমার এলাকায় সরকারি প্রকল্পে কাট মানে ০%। জনগণের টাকা লুট করে কেউ উন্নয়ন বলে চালালে আমি সেই উন্নয়নে বাধা হবো। দাঁড়িয়েই থাকব। দরকার হলে একা।
-” তাহলে আপনি বুঝে নিন, আপনি আমাদের বিপক্ষে যাচ্ছেন। একা পড়বেন।
-” আমি আপনাদের হাত ধরে রাজনীতিতে আসি নি। তাই এই ফাফর আমায় দিবেন না। লুটপাট করার হলে আপনার এলাকায় করুন। আমি বাঁধা দিব না। কিন্তু আমার এলকায় হবে না এসব। আর চেয়ারম্যান সাহেব আপনি বেশ ভালো করে জানেন আমাকে। আমার কথার হেরফের হলে আমি কি করতে পারি তার ধারণা নিশ্চয়ই আপনার আছে? তাই সো বি কেয়ারফুল। আমার এলাকায় চোখ তুলে তাকালে চোখ উপড়ে ফেলবো। মাইন্ড ইট।
সোলেমান বের হয়ে আসলো বোর্ড রুম থেকে।রিয়াজ আলম চেয়ারম্যানের এমন নীরবতা দেখে অবাক হলো। চেয়ারম্যান সাহেব পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে ফোন করে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ৮

-” নওয়াজ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে তার ওপর নজর রাখতে হবে। কখন কী ফাঁস করে দেয় বলা যায় না।
ফোনটা পকেটে ভরলো চেয়ারম্যান। রিয়াজ তা দেখে বলল-
-” আপনি সোলেমান কে এত ভয় পান কেনো?
-” ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারন আছে রিয়াজ। প্রতিটি মন্ত্রী, এমপির আমলনামার প্রমান তার কাছে আছে। তার উপর সে যেভাবে তার এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছে সব এমপি মন্ত্রী কে ছাপিয়ে গিয়েছে।
-” তো তাকে শেষ করে দিলেই তো হয়।
-” মুখে বলা সহজ, করতে গিয়ে জানবে সোলেমান কি জিনিস। এখন থেকে ওর এলাকা ব্যতিত আর কোনো মিটিং এ তাকে ডাকা হবে না।

দাহশয্যা পর্ব ১০