দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৬০
আফরোজা আশা
তালুকদার বাড়ির বাগানের দিকে এক রমণীর অবস্থা অস্থির। মিতালীকে বার বার ডাকছে আর বলছে কাজ হয়েছে কিনা! ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে সেখানে আগমন ঘটে দিশার। বেলার পাশে দাঁড়িয়ে অলস ভঙ্গিতে হাই তুলে বলে,
‘ কটা বাচ্চা হলো? ’
ছোট ঝুড়িতে রাখা বাচ্চাগুলোকে দেখে জবাব দিল বেলা,
‘ তিনটা হয়েছে। আরেকটা হবে নাকি। ’
দিশা শুনে মাথা নাড়াল। সম্মুখে সদ্য মা হওয়া বিড়াল জেনির খেদমত করছে তার মা মিতালী। দুহাত বুকের সাথে ঠেকিয়ে সেদিকে চেয়ে থাকল সে। কিছুক্ষণ পর আরেকটা ছোট বাচ্চা এনে ঝুড়িতে রাখল মিতালী। একেবারের পরিষ্কার করে ভালো কাপড়ে পেঁচিয়ে বাচ্চাগুলোকে রাখছে সেখানে।
শেষের বাচ্চাটা আসতেই পা আলগা করে দেখল বেলা। মুখে হাসি ফুটল তার। তড়াক করে লাফিয়ে বলে উঠল,
‘ প্রথমটা মেয়ে আর বাকি তিনটা ছেলে হয়েছে। ’
বেলার কাজ দেখে খিলখিলিয়ে হাসল দিশা। একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সেও বেলার মতো তার লিঙ্গ দেখল। পরমুহূর্তেই আবারো হাসল। ফিচেল গলায় বলল,
‘ ইসস! বেটা ছেলের শরম দেখে নিয়েছি। ’
টিপনী কাটল বেলা,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘ সাবধান! এটা কিন্তু বিড়ালের বাচ্চা। ফ্লার্টিং করতে যেও না যেন! ’
‘ তুই…’ বলতে গিয়েও থামল দিশা। সম্বোধন বদলেছে। তার বড় ভাইয়ের বউ বেলা, তুই ডাকা মানানসই না। বেশ কদিন থেকে তুই আর তুমির মিশ্রণে বেলার সাথে কথা বলছে সে। তুই-তোকারি করে অভ্যস্থ দিশার কি আর এতো সহজে তুমি ডাক মুখে আসতে চাইবে? ইদানিং বার বার তুই বলতে গিয়েও নিজেকে শুধরে নিচ্ছে দিশা। আজও তাই হলো।
‘ তুমি মেয়ে কি ভাবো আমাকে? চয়েস এতো খারাপ না যে বিল্লুর ছানার সাথে ওসব করব। ওরা আদরের। আদর করব সবসময়।’
‘ সে করিও। এখন ওকে ঝুড়িতে রাখো। বাইরে শীত, ঘরে রেখে আসি। ’
দিশা তার কোলের বাচ্চাটাকে ঝুড়িতে রাখল। ওদিকে মিতালী জেনিকে পরিষ্কার করছে। তাকে পরিষ্কার করে ভেতরে আনতে বলে, বাচ্চাদের নিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঘরের পানে ছুটল বেলা। দিগন্তকে বলার জন্য পেট তার ফুলে উঠেছে।
ঘরে এসে বিছানার একপাশে ঝুড়ি রেখে দিগন্তের গা ঝাঁকিয়ে ডাকল রমণী। এদিকে রাতে দেরী করে ঘুমানোর কারণে এখন গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে দিগন্ত। বেলার হালকা ডাকে সে ঘুম ভাঙল না।
দিগন্তকে উঠতে না দেখে মহাবিরক্ত হলো বেলা। তার বাহুতে জোরে খামচি দিয়ে বলল,
‘ কেমন লোক! এতোবার ডাকছি তাও উঠছে না। ’
সহসা হাতে টান পড়ল বেলার। ওকে টেনে কম্ফোর্টারের নিচে নিয়ে পেঁচিয়ে ধরল দিগন্ত। এতে রাগের পারদ তড় তড় করে বাড়ল বেলার। গজগজিয়ে বলল,
‘ ছাড়েন। ডাকছি উঠার জন্য, আবার আমাকে নিয়ে ঘুমাচ্ছে। উঠেন বলছি। ’
ঘুম ভাঙা স্বরে আওড়াল দিগন্ত, ‘ উমম!ঘুমা। ’
কপাল কুঁচকে নিল বেলা। সুখবর দিতে এসেছে, তা না শুনে ঘুমাতে বলছে! কি যেন ভেবে, হুট করে বলে উঠল বেলা,
‘ আপনি নানা হয়েছেন। ’
আরামের ঘুমে মগ্ন দিগন্তের কর্ণগহ্বরে সে কথা যেতেই ঝট করে চোখ খুলল। বেলার মুখপানে চেয়ে বিস্মিত গলায় শুধাল,
‘ কিহহহ! ’
‘ আমাদের নাতি নাতনি হয়েছে। ’
‘ এ্যাঁহহ! কিভাবে? ’
‘ একটা মেয়ে, তিনটে ছেলে হয়েছে আমাদের বাবুর। ’
‘ বাবু? ’
উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে খোশমনে জবাব দিল বেলা,
‘ হুম। আমাদের জেনি মা হয়েছে। ’
এতোক্ষণে বেলার কথা ধরতে পারল দিগন্ত। ঘুমে থাকার কারণে মাথা কাজ করতে সময় লাগল তার। অতঃপর বেলার নাতি-নাতনির কথা শুনে আবারো পূর্বের ন্যায় শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর বেলার ওপাশে থাকা ঝুড়ির দিকে চেয়ে ললাটে ভাজ ফেলল দিগন্ত। ছানাগুলোর মধ্যে দুটো বাচ্চা সাদা, একটা লাল সাদা মিশেল, আরেকটা পুরোই কালো।
তাতক্ষণাৎ নাক ছিটকে বলে উঠল সে,
‘ তোর বিড়ালের চরিত্র খারাপ। একেকটা একেক কোম্পানির। বেছে বেছে এরকম একটা চরিত্রহীন বিড়াল পাঠিয়েছে তোর বাপ। খবরদার ওই বিড়ালের আশেপাশেও যাবি না আর। ’
কথার মানে ধরতে পারল বেলা। কিভাবে বলে দিল তার জেনির চরিত্র খারাপ! তখনি অগ্নিরূপ ধারণ করল মেয়েটা। চিবিয়ে বলে উঠল,
‘ রং দেখে বিচার করবেন না। ওসব জিনোটাইপ, ফিনোটাইপ এর কারণে হয়। ‘
আহত গলায় ফের বলল রমণী,
‘ কেমনে লোক আপনি? মেয়েকে কেউ এভাবে চরিত্রহীন বলে! ‘
‘ চুপ কর! চুল পেকে যাচ্ছে এখনো বাচ্চার বাবা হলাম না। বিড়াল নিয়ে টানাটানি করছে। অভদ্র! ’
কাঠখট্টা কথাগুলো মোটেও পছন্দ হলো না বেলার। হাসিমুখে এলো জানাতে। ত্যাদড় লোক তার খুশিতে পানি ঢেলে দিল। মনে মনে একশো গালি দিয়ে শোয়া থেকে উঠতে চাইলো বেলা। কিন্তু পারল কই? যেই না একটু নড়েছে অমনি দিগন্তের দাবাং দুহাত তাকে আরো শক্ত করে আকড়ে ধরল। কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই বেলার স্থান পরিবর্তন হয়ে গেল। পুরুষালি বিশাল শরীরের নিচে ইতোঃমধ্যে চাপা পরেছে সে। কি অবলীলায় তাকে পিষে ফেলার ধান্দা চালাচ্ছে লোকটা! হতভম্ব বেলা! আতংকিত স্বরে আওড়াল,
‘ কি করছেন? ’
সে প্রশ্ন আমলে নিল না দিগন্ত। নিরুত্তর সে মহাব্যস্ততার সময় পাড় করছে। কিয়ৎকাল পর বেলার ওষ্ঠজোড়া ছেড়ে গ্রীবাদেশে মুখ গুজল দিগন্ত। অসাড় শরীরে পরে থাকা বেলা ঝুড়ির দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
‘ কেমন অসভ্য লোক! দুধের বাচ্চাদের সামনে কেমন করছে! ‘
নাক-মুখ কুঁচকে মুখ উপরে তুলে দিগন্ত। চড়া গলায় বলল,
‘ দেখুক। দেখেশুনে বড় হবে। মুখ থেকে যেন আর একটাও কথা বের না হয়। আমার কাজে বাঁধা দিলে সারাদিন এঘরে আটকে রাখব। ’
গা-পিত্তি জ্বলে গেল বেলার। কিন্তু নড়ার জো পেল না। কেবল হাত বাড়িয়ে পাশে থাকা একটা নরম বালিশ ঝুড়ির ওপর ফেলে দিল। তারপর আর ওকে কোনো সুযোগ দিল পুরুষটা! সময় যত বাড়ল ততই উন্মাদ দিগন্তের উন্মাদনায় সিক্ত হলো রমণী।
দিনের তখন বাজে বেলা এগারোটা। ব্যস্ত কফিশপটার ভেতরের এক কর্ণার আজ ফাঁকা। লোকচক্ষু থেকে সুদূরে একটা টেবিলে বসে আছে তিন পুরুষ। তন্মধ্যে একজন খটখট শব্দ তুলে তুখোড়ে ল্যাপটপে হাত চালাচ্ছে। বাকি দুজন চুপ করে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে। চোখমুখ তাদের ফ্যাকাসে। ভীষণ আগ্রহ নিয়ে দেখলেও, তাদের ভেতরে হাহাকারের তুফান চলছে। মুখাবয়ব শান্ত,স্বাভাবিক। অথচ কারো ওপর চাপা আক্রোশের জোরে দাউ দাউ করে দাবানল জ্বলছে মনে।
পেনড্রাইভ কানেক্ট করে ল্যাপটপ আড়াআড়িভাবে রাখল রায়হান। ক্রমাগত হাত কাঁপছে তার। ভিডিওটা অন করবে করবে করেও মিনিট দশেক সময় নষ্ট করে ফেলল। নিশ্চুপ বসে থাকা ফাহাদ হাত বাড়িয়ে ভিডিও অন করল। এতোক্ষণ টকটকে চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, ভিডিও শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল দিগন্ত। নত মস্তকে দুহাত এক করে টেবিলের দিকে মুখ করে রাখল। নজর সরিয়েছে রায়হানও। শীর্ণ মনোবল তার।
ভিডিও চলছে। তা দেখার সাহস দিগন্ত-রায়হানের না হলেও, ফাহাদের নজর টলানো গেল না। পলকহীন চোখে দেখছে সে। চোখজোড়া রক্তিমবর্ণের হয়ে এসেছে ইতোঃমধ্যে।
ভিডিও থেকে আসা একেকটা আর্তনাদ তাদের কানের নরম পর্দা ভারি করে তুলছে। হাজারো আকুতি-মিনতি আর ব্যথা-যন্ত্রণা মিশ্রিত নারী চিৎকারগুলো যখন চলছিল তখন তিন পুরুষের চোখ ছলছল। হয়তো তিনজনের মনের অবস্থা সে সময় একই! হাতে সুযোগ থাকলে ছুটে গিয়ে তাকে বাঁচাত! পেতে দিত না মেয়েটাকে এতো কষ্ট, এতো লাঞ্চনা। কিন্তু বর্তমানে এসে কি আর অতীত ঠিক করা যায়! ভাগ্যের লিখন কি খণ্ডন করা যায়!
দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে ঠিক রাখার ব্যর্থ প্রয়াসে, গলা-ঘাড়ের মোটা রোগগুলো টানটান হয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে ফাহাদের। হয়তো একটু টান পেলেই ছিঁড়ে যাবে। চোখের সামনে ভাসছে মনার রেইপ ফুটেজগুলো। সেখান থেকে এক ভয়ংকর কঠিন সত্যও জানছে সে। মেয়েটার একেকটা কাতর কণ্ঠস্বর, ওর পাঁজরে তীব্র আঘাত হানছে। সে সাথে নিকৃষ্টভাবে ভাঙছে আপন রক্তের এক সম্পর্কের সীমারেখা।
একটা জায়গায় এসে ভিডিও পুশ করল ফাহাদ। কাঠিন্য স্বরে আওড়াল,
‘ এদিকে তাকা। দেখ কালপ্রিট দুজনকে। ’
সহসা দুটো ঘাড় একসাথে পাশ ফিরল। ভিডিও থেমেছে একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে, ছেলেদুটো যখন নিজেদের খায়েশ মিটিয়ে স্টুডিও ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। যে জায়গায় আটকে রেখেছে ফাহাদ, সেখানে তাদের চেহারা স্পষ্ট। রায়হান বাকহারা; স্ক্রিন থেকে সোজা ফাহাদের দিকে তাকাল। কেমন শূণ্য চোখে তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল সে!
এদিকে কপালে গাঢ় ভাজ ফেলে ছেলেগুলোকে দেখল দিগন্ত। দূর থেকে দেখে কি যেন ধরতে পারল। ল্যাপটপটা নিজের কাছে টেনে এনে একটা ছেলেকে জুম করে দেখল। বার কয়েক দেখল। অতঃপর তার অবাক, বিস্মিত চোখজোড়া তাকাল ফাহাদের দিকে। দিগন্তের সে দৃষ্টি দেখে উন্মাদের ন্যায় গা দুলিয়ে হেসে উঠল ফাহাদ। পরক্ষণে ঝুঁকে এসে স্ক্রিনের ওপর আঙুল ঠেকিয়ে আওড়াল,
‘ চিনতে পারছিস? তোরা চিনিস এই কালপ্রিটকে। দেখ, আমার চেহারার সাথে অনেকটা মিলে, তাই না? এই যে কালো টি-শার্ট পড়া জানোয়ারটা ফাহিম দেওয়ান আর ওর পাশেরটা ওর বন্ধু গালিব। ’
কথাটুকু শেষ করেই ধুপ করে চেয়ারে বসে পড়ল ফাহাদ। শরীর তার পর পর করে ঘাম ছেড়ে দিল। ডান ঘাড়ের রগটা আকষ্মাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় ঝিলিক মেরে উঠল। তাতে কিছু যায় আসলো কি ওর! উহুম! পুরো মস্তিষ্কজুরে চলছে এখন একটাই কথা মোনালিসা মনা শেষ নিঃশ্বাস অব্দি ওকেই ভালোবেসেছে। গানের ক্যারিয়ার গড়া, স্টুডিওতে যাওয়া এসব কেবল বাহানা ছিল! বাহানা ছিল ফাহাদের একটু সান্নিধ্যে থাকার, ওর এটেনশন পাওয়ার, ওর মনে নিজের জন্য একটু জায়গা করে নেওয়ার। মেয়েটা যদি ওর জন্য ওসব পাগলামো না করত, তাহলে ওরা ওকে অপবিত্র করতে পারত না। স্টুডিও যেত না, গান গাইত না আর না পেত ওই বিভষৎ কষ্টগুলো।
সবশেষে দোষী ফাহাদ। নিজের দোষটা খুব সহজে ধরতে পারল সে। নিজেই নিজেকে মনার দোষী হিসেবে আখ্যায়িত করল। হুট করেই কতগুলো অপরাধবোধ একসাথে আকড়ে ধরল ওকে। টেবিলের ওপরে রাখা দিগন্তের হাতের উপরে হাত রেখে বলে উঠল,
‘ ওর মায়া কাটাতে জোর করে বেলাকে ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ এই মুহূর্তেও ওর প্রতি আমার অগাধ মায়াটা কিছুতেই ছাড়তে পারছি না। এই মায়ার কোনো মানে আছে? নাম আছে কোনো? কবেই না মনা অন্যের স্ত্রী হয়েছিল। জুনায়েদ তালুকদারের স্ত্রী হয়েই সে দুনিয়া ছাড়ল। ফাহাদ দেওয়ান কারো স্ত্রীর দিকে নজর দেয় না। তোর বাপের কাছে অপরাধী না হলেও, তোর কাছে অপরাধী। সুখে সংসার করিস। আর পারলে আমাকে মাফ করে দিস। ’
ফাহাদের অস্বাভাবিকতা খেয়াল করে রায়হান উঠে এলো ওর কাছে। চিন্তিত গলায় শুধাল,
‘ ঠিক আছিস? এতো ঘামছিস যে! তোর কি হাই ব্ল্যাড প্রেশার? শরীর খারাপ করবে, শান্ত হো। ’
প্রতিত্তরে কেবল হাসল ফাহাদ। অসময়ে হাসিটুকুও যেন নিতে পারল না তার মস্তিষ্ক। মাথার শিরা-উপশিরায় ঝিনঝিন করে এক বিষব্যথার আঁচ কাটল। তাতে কাতর হওয়ার কথা থাকলেও, হলো না ফাহাদ। বরং ব্যথায় চাপা এক প্রশান্তি খুঁজে নিল।
এদিকে পাথর বনে বসে থাকা দিগন্তের বুঝি এবার ধ্যান ভাঙল। ফাহাদের কথাগুলো শুনেছে সে। প্রেক্ষিতে কিছু বলবে; কিন্তু সুযোগ পেল কই! সেখানে আর এক মুহূর্তও থাকে না ফাহাদ। বিনা বাক্য ব্যয়হীন, বড় বড় পা ফেলে বাইরে চলে যায়।
ফাহাদের এভাবে চলে যাওয়া ভালো লাগল না দিগন্তের কাছে। মনার প্রতি ওর দূর্বলতা আগেও স্বচক্ষে দেখেছে সে, যেদিন প্রথম জেনেছিল মনা বিয়ে করেছে। আবার সেদিনই দিগন্তের নাম্বারে প্রথম ফোন করেছিল ফাহাদ। দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছিল দুজনের মধ্যে। ফাহাদ রাগ ঝেরেছিল নাকি কষ্ট উজার করেছিল জানা নেই দিগন্তের। সেবারই প্রথম; যখন দুজনের একসাথে খারাপ সময় চলছিল, আর একজন অপরজনের প্রতি সান্ত্বনা বুলি আওড়েছিল।
রায়হানের দিকে চেয়ে থমথমে গলায় বলল দিগন্ত,
‘ হয়তো ওদের ক্লাবে গেল। একটু দেখে আয়। ’
সিলভার কালারের গাড়িটা স্বাভাবিকভাবেই রাস্তায় চলছে। কিন্তু বড় মোড়ের কাছে এসে তার গতি মাত্রাতিরিক্ত অস্বাভাবিক হয়ে গেল।
অদূরে রাস্তার একপাশে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে ফাহিম। বেশভূষায় কোনো ভদ্রতার ছাপ নেই। তার থেকে কিছুটা দূরে কতগুলো ছেলে। তাদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে সে। আগে পিছে কোনো মনযোগ নেই।
এদিকে সিলভার রঙের গাড়িটা সর্বোচ্চ গতিতে ধেয়ে আসছে তার দিকে। যতক্ষণে ফাহিম বুঝতে পারল তার চেনা পরিচিত একটা গাড়ি রাস্তায় থেকে সরে তার দিকে এগিয়ে আসছে, ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। গাড়ির মালিক ইতোঃমধ্যে গাড়ি তার ওপর উঠিয়ে দিয়েছে।
একেবারে চাকার নিচে ঢুকে গেছে ফাহিম। তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গাড়িটা চলছেই। কিছুক্ষণ আর্তনাদ করেছিল সে, তারপর একদম শান্ত হয়ে গেছে। রাস্তার পাশে মাটির জায়গাগুলোতে র*ক্তের ছাপ। একপাশে পরে আছে ফাহিমের থে’তলে যাওয়া মর’দেহ। বেঁচে থাকার অবকাশ নেই! হাত-পা-মাথা বিকৃত হয়ে গেছে। মুহূর্তে সে স্থানে লোকের ভিড় জমল।
অপরদিকে ফাহাদের অনিয়ন্ত্রিত গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা খায় গাছের সাথে। জোরে শব্দ তুলে আঘাত হানে গাড়িটা। সামনের অংশটুকু ভেঙে চূড়মার হয়েছে। ভেতরে তার দেহখানা হেলে পরে আছে। চোখ আধখোলা অবস্থায়। স্টিয়ারিং এর সাথে মাথা হেলে আছে তার। কানের পাশ গড়িয়ে চুইয়ে চুইয়ে গাঢ় তরল পড়ছে।
অর্ধচেতন ফাহাদের অনুভূতি আসছে না কোনো। কেবল নিজের ওপর হাসি পায়। দমায় না! সেভাবেই হাসার চেষ্টা চালায়। ব্যস, হাতের রগ থেকে শুরু করে ঘাড়-মাথাসহ পুরো শরীরের রগগুলো টান খেয়ে ঝিম ধরে যায়। গলার কাটাগুলো আস্তেধীরে চেপে আসছে টের পেয়ে হাসি থামায় ফাহাদ।
টের পায় কেউ ডাকছে ওকে। আবছা আবছা দৃষ্টিতে দিগন্তের চেহারা দেখে আস্তে করে বলে উঠে,
‘ আরেকজনকে ছাড়বি না। ’
ব্যস, কথাটুকু বলতে বলতে জবান চলে গেল ফাহাদের। বুকে এতোক্ষণ চিনচিন ব্যথা করলেও এবার সেটা বৃহদাকার ধারণ করল। বিশাল ভারি পাথর চাপা দিয়েছে মনে হচ্ছে! হৃদপিণ্ডে কেউ যেন হাত ঢুকিয়ে খুবলে খুবলে চাপ দিচ্ছে। বুকের তীব্র চাপা ব্যথা, আর সমস্ত শরীরের রগগুলোর আন্দোলনের কাছে হার মানল ফাহাদ। নাক দিয়ে গড়গড়িয়ে র’ক্তের ধারা গড়াতে শুরু হলো।
স্টিয়ারিং থেকে ফাহাদের মাথা তোলের চেষ্টা চালিয়ে দিগন্ত জোর গলায় বলল,
‘ এই ছেলে ওঠ। চোখ বন্ধ করিস না। সোজা হয়ে বস। ’
সে সব কথায় কি কোনো কাজ হলো? হলো না বরং বলবান দেহটা আস্তেধীরে মিইয়ে যাচ্ছে। উদ্বিগ্ন দিগন্ত এক হাত দিয়ে ফাহাদের নাক চেপে ধরল। র’ক্ত বন্ধ করা জরুরি। অপরপাশ থেকে এসে ফাহাদের সীটবেল্ট খুলল রায়হান।
ওকে সোজা করে তুলে আর সময়ব্যয় করল না তারা। দুদিক থেকে দুজনে ফাহাদকে ধরে জীপে উঠাল। রায়হান চাবি ঘুরিয়ে জীপ স্টার্ট দিল। আর দিগন্ত পূর্বের ন্যায় এখনো ফাহাদকে ধরে রেখেছে। একহাত দিয়ে ব্লি’ডিং আটকাচ্ছে। আরেকহাত দিয়ে ওকে ডাকছে, চোখ খুলে রাখতে বলছে।
এদিকে অর্ধচেতন ফাহাদ তার পুরনো অতীতে বিচরণ করছে। স্মৃতিপটে ভাসছে কেবল মনার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো। তার জন্য রমণীর করা পাগলামীগুলো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে এই মুহূর্তে। কি মায়া মেয়েটার চেহারায়! কি মোহনীয় ওর কণ্ঠস্বর। এই কণ্ঠের মোহে পড়েছিল সে। মায়া হতো মেয়েটার জন্য। বড্ড মায়া!
আসলেই কি মায়া? মায়া এতো ভয়ংকর খারাপ! ওই মায়াবী মেয়েটার অমন করুণ অবস্থা সইতে পারল না সে! তার মতো জোয়ান পুরুষ মায়ার কারণে মনার জন্য এতো কষ্ট পাচ্ছে?
মনার মুখশ্রী আবারো দেখছে ফাহাদ। শেষবার যে ওর হাতের সাথে মেয়েটার হাতের ছোঁয়া লেগেছিল, এই মুহূর্তে এসে সেই ছোঁয়া নিগূঢ়ভাবে অনুভব করতে পারল ছেলেটা। সে সাথে বুঝল তার মনের আসল কথাখানা। হ্যাঁ! জীবনের অন্তিম সময়ে এসে ফাহাদ দেওয়ান বুঝল শুধু মায়া নয়, মনাকে ভালোবাসত সে। মায়া থেকে কেউ এতো যাতনা অনুভব করে না, যতটা সে করছে। যখন ওরা মনাকে ছুঁইছিল তখন ফাহাদ কি অসহনীয় পীড়া টের পেয়েছে অন্তরে। এ জীবনে ওরকম যন্ত্রণা কখনো পায়নি সে। নিশ্চয়ই, কেবলমাত্র ভালোবাসলে এভাবে, এতো পরিমাণ কষ্ট পেতে হয়। সহসা তার ভেতর থেকে কে যেন চেঁচিয়ে বলল,
‘ ভালোবাসারা মরে ভালোবাসার জন্য। মরে যা ফাহাদ! মরণেও শান্তি আছে। ’
আসলেই কি ভালোবাসারা ভালোবাসার জন্য মরে? শুকিয়ে আসা ওষ্ঠপুট প্রসারিত হলো ফাহাদের। তবে ঠিক ধরেছে সে; ভালোবাসে মনাকে। তাই তো মৃত্যু স্বাদও গ্রহণ করছে সাদরে।
ফাহাদকে যখন হাসপাতালে আনা হলো, সে মুহূর্তেই তাকে মৃত ঘোষণা দিয়েছে ডাক্তার। স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা নিথর দেহটার দিকে হতবুদ্ধির ন্যায় চেয়ে আছে দিগন্ত। দুহাত তার র’ক্তে ভেজা। ফাহাদের চোখগুলো এখনো আধখোলা অবস্থায় আছে। কাঁপা হাতে দু’চোখের পাতা মিলিয়ে দিল দিগন্ত। সহসা তার চোখ ফেটে ঝরে পড়ল অশ্রুবিন্দু।
গাড়িতে কোনো আঘাত পায়নি ফাহাদ। স্ট্রোক করার কারণে ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে গেছে। নাক-কানের পর্দা ফেটে অঝোরে র’ক্ত ঝরেছে। সে সাথে হার্ট ব্লকেজ এর ফলে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই পৃথিবীর মায়া ছেড়েছে সে।
ফাহাদের ফর্সা মুখটা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। ছেলেটার নাক থেকে এখনো তা’জা র’ক্ত বের হচ্ছে। একজন নার্স এসে নাক-কানে গজতুলা আটকে দিল। অতঃপর একটা সাফেদ পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল ওর মুখখানা।
লিভিংরুমে বসে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে দিশা। কেন যেন আজ শরীর একদম ভালো নেই। ভাগ্যিস! ওর যা কাজ ছিল তা কালকেই শেষ করেছে। জুনায়েদ তালুকদার অসুস্থ বলে এখনো টের পায়নি তার পকেট থেকে চাবি চুরি হয়েছে। ওদিকে শুধু চাবি নয় তার পুরো অফিস রুম ছিন্ন-ভিন্ন করে পেনড্রাইভ খুঁজে বের করেছে দিগন্ত। এখন আবার ওরা একসাথে দেখবে সেটা। দিশাও যেতে চেয়েছিল কিন্তু দিগন্ত নেয়নি ওকে।
পুনরায় ভেতরে থেকে হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস বের হলো দিশার। কেন যেন মনে হচ্ছে কত মাইল দৌড়ে এসেছে সে। বুক ধড়ফড় করছে। যখন দীর্ঘশ্বাস টানছে তখন আরাম মিলছে।
সেসময় মোবাইল হাতে এলোমেলো পায়ে সেখানে ছুটে আসে মিতালী। গলা বাড়িয়ে সোফায় বসে থাকা স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
‘ খবর পেয়েছো? বৃষ্টির দুটো দেবর’ই নাকি মারা গেছে। ’
ঝট করে মায়ের দিকে তাকাল দিশা। অবুঝ গলায় প্রশ্ন করল,
‘ কে মারা গেছে? ’
‘ বৃষ্টি দেবর। একজনকে দেখিনি আমি। আরেকজনকে তো তুই চিনিস। ফাহাদ! বেলার সাথে বিয়ে হতে যাচ্ছিল যে ছেলেটা। ’
মিতালীর অত কথা কি আদৌ দিশা শুনছে! তার মুখনিঃসৃত নামখানা শুনেই দুনিয়া থমকে গেছে দিশার। কানে কেবল একটা নামের উচ্চারণ বাড়ি খাচ্ছে বারংবার।
দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৯
ভেতর থেকে দম আটকে আসে রমণীর। ঠিক তখনি অবস্থা ভয়াবহ হলো তার। মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। গলার কাছের দলাপাকা কান্নারা ছিড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু শরীরে যে সে বলটুকুও নেই! কেবল অবিশ্বাস্য চাউনি মেলে মিতালীরকে দেখছে আর জোরে জোরে শ্বাস টানছে মেয়েটা।
