Home দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৯

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৯

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৯
আফরোজা আশা

‘ কি হলো ভেতরে আয়! ’
বৃষ্টির কণ্ঠ শুনে ধ্যানে মগ্ন থাকা দিশা গাড়ি থেকে উঠতে নিলে জোরে টান খেলো। সীটবেল্ট না খুলেই বের হচ্ছে সে! আহাম্মক! এই মুহূর্তে বড় আহাম্মক বনে আছে রমণী। গাড়ি থেকে নেমে বৃষ্টির পাশে দাঁড়াল। প্রত্যাশা নেই, হয়তো ফাহাদ ওকে নিয়ে ভেতরে চলে গিয়েছে। এদিকে এতো সময় যাবৎ দিশা এ দুনিয়ায় ছিল না।
তাড়া দিল বৃষ্টি,

‘ রাত হয়েছে অনেক। শীত করছে বাইরে। চল দ্রুত। ‘
দিশা ওর হাত ধরল। মান-ইজ্জত ইতোঃমধ্যে নিলামে উঠেছে। ফাহাদ ওর ফেক আইডির বিষয়ে সব জানে। ওখানে কি কম ছ্যাঁড়ামি করেছে সে। লজ্জা-অপমানে থমথমে দিশা করুণ স্বরে আওড়াল,
‘ আ..আমি বাড়ি যাবো। এই আপা। আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাও। বাড়ি যাবো আমি। আম্মুর কাছে যাবো। ’
লাগাতার একই বুলি আওড়াতে শুরু করল দিশা। এদিকে হতবাক বৃষ্টি দিশার পানে চাইল। ছোট বাচ্চা ভয় পেলে যেমন মায়ের কাছে যেতে চায় সেরকম করছে মেয়েটা। কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই ফয়সাল এলো সেখানে। মিনমিন করতে থাকা দিশার মুখে তালা লাগল। বৃষ্টির সামনে গাঁইগুঁই করতে পারলেও, ফয়সালের সামনে করা গেল না আর।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কোয়ার্টার বেশি বড় নয়। দুটো রুম, একটা বাথরুম, একটা কিচেন আর ছোটখাটো একটা ড্রয়িং স্পেস। ছোট হলেও জিনিসপত্র দিয়ে বেশ গোছানো সংসার। হয়তো ফয়সাল আগে থেকে একটু একটু করে সাজিয়েছে।
ড্রয়িং স্পেসের একটা বেতের সোফায় দুহাত মেলে আয়েশ করে বসে আছে ফাহাদ। পাশে প্রত্যাশা পা ঝুলিয়ে বসে চকলেট খাচ্ছে।
বৃষ্টির রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসে দিশা। ফয়সাল ডাকছে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ড্রয়িংরুমে আসতে হলো তাকে। দিশাকে আসতে দেখে একটা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বৃষ্টি। ওকে সেখানে বসতে বলে শুধাল,
‘ চা নিবি নাকি কফি? ’
আর খাওয়া! এ জায়গায় তার মন টিকছে না। খাওয়া-দাওয়া তো পরের বিষয়। বলল,

‘ লাগবে না কিছু। ’
‘ বলতে হবে না তোকে। এখানে বসে গল্প কর ভাইয়াদের সাথে। আমি কফি আনছি। ‘
বলে বৃষ্টি রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। এদিকে ভাইয়া শুনে মুখ বেঁকাল দিশা। সাইয়া সাইয়া করে এখন কি ভাইয়া ডাকবে নাকি! তবে কি ফাহাদ তাকে দোমুখো ভাববে না। তার থেকে কিছুই ডাকবে না, কথাও বলবে না। কাহিনী শেষ।
ফয়সালের সাথে এক কথায়, দুকথায় বাঁচাল দিশা তার রূপে ফিরল। বেশ আলাপাচারিতায় ডুবে গেল তারা। একসময় ফয়সালের জরুরি কল আসায় বাইরে যেতে হলো তাকে। হলো দিশার ভাগ্যের প্যাঁচ! এখানে এখন ফাহাদ আর ও ছাড়া আর কেউ নেই। প্রত্যাশাও কিছুক্ষণ আগে হাত ধোঁয়ার বাহানায় বৃষ্টির কাছে গিয়েছে। কোন শয়তানের প্ররোচণায় যে এখানে আসতে রাজি হলো সে! নিজ কপালকে সালাম আর পছন্দকেও একদফা সালাম ঠুকলো রমণী।
এখানে একাকী থাকার আর মানে আছে! উঠল দিশা, রান্নাঘরের জন্য পা বাড়াতেই যাবে এমনি একটা ভয়েস এসে কানে লাগল।

‘ জান, তুমি আমার ফোন ইগনোর করো কেনো জান? তোমার সাথে একটু কথা বলার জন্য আমার ভেতরেটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, মরে যাবো বুঝি। তুমি কবে আমার হবে জান? কবে আমরা এক হবো। আমাদের হানিবানি বাচ্চারাই বা কবে আসবে জান? ’
হায় হায়! কি সর্বনাশ! এ যে তার ইতরামিগুলো। এই নির্লজ্জ ভয়েস মেসেজ আর কারো নয়, স্বয়ং দিশা তালুকদারের। তবে মুখের সামনে ওড়না পেঁচিয়ে কথা বলেছিল বলে আওয়াজটা মোটা মোটা ধরণের। আইডি ডিলেটের আগে এসব তো কেটে দিয়েছিল সে, ফাহাদের কাছে এখনো আছে কিভাবে? শরীর জমে গেল দিশার। শুকনো ঢোক চেপে আস্তেধীরে পেছনে ফিরল। সহসা ঘাবড়াল রমণী, পিছিয়ে গেল দুপা। ফাহাদ ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। হুট করে পাশে ওর উপস্থিতি দেখে ভয়ে জান উড়ে গিয়েছে তার। ডানপিটে চঞ্চল দিশাকে কেমন কাবু করে দিয়েছে ফাহাদ! ভয় ভীতি শরীরের গাঁটে গাঁটে জমে গেছে।
হড়বড়িয়ে বুকে থুতু ঘষল দিশা। তা দেখে চোখ ঘুরিয়ে নিল ফাহাদ। ফোনটা পকেটে রেখে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

‘ এসব অপকর্ম করার আগে একবারো ভয় লাগেনি? আমাকে চেনো তুমি? শূন্য পরিমাণ আইডিয়া নিয়ে আমার পেছনে লাগতে এসেছিলে। মেয়ে তো বেশ ছোট, সবে অর্নাসের যাত্রা শুরু করেছো। মাথায় এতো ব্রিটিশি বুদ্ধি! ’
অজানা ভান ধরল দিশা,
‘ মানে? কিসব বলছেন? ’
‘ উহুম। পাল্টি খেতে চাইলেই পারবে না। কমিশনারের ছেলে আমি। একটা ফেক আইডির ডিটেইলস বের করা চুটকির কাজ। আরো কিছু জিনিস দেখাই তবে শান্তি পাবে। ’
ফোন থেকে ওদের কথোপকথন এর স্ক্রিন ভিডিওটা মেলে ধরল দিশার সম্মুখে। যদিও সেখানে ফাহাদের মেসেজ একেবারেই স্বল্প। পুরোটা জুরে দিশার মেসেজ।
অনেক হয়েছে, একটু ভয় পাচ্ছে বলে চড়ে বসেছে ফাহাদ। বেশ ভক্ত সাজছে। সহ্য হলো না দিশার। যা করেছে ঠিক করেছে, কাউকে ভয় পাবে না সে। কি করবে করবে দেখে নিবে। অস্বস্তি,ভয়-ভীতিকে ঠেলে দূরে সরিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়াল রমণী,

‘ আসলে কি বলেন তো! খুব শখ পড়েছিল আমার। আপনাকে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে শখ মিটয়েছি। তখন আমার সময় ছিল তাই আচ্ছামতো গুঁতিয়েছি। এখন আপনার সময় চলছে তাই আপনিও গুঁতাচ্ছেন। আচ্ছা! আমি আপনার রূপের আগুনে ঝলসে গিয়ে গুঁতিয়েছি ব্যাপারটা যায় কিন্তু আপনি কেনো আমাকে গুঁতাচ্ছেন? বাই এনি চান্স, আমার আর আপনার উদ্দেশ্য এক নয় তো? ’
‘ হোয়াট রাবিশ! ’
‘ জানাজানি যখন হয়ে গিয়েছে তখন আর লুকিয়ে ছুপিয়ে লাভ নেই। আমি আপনাকে ভালোবাসি। সহৃদয়বান ব্যক্তি হলে আমাকে গ্রহণ করেন, নয়তো… ’
‘ নয়তো কি? ’
‘ নয়তো আমি তোমাকে বিয়ে করব। তারপর একবারে দশমাস জায়ায়ায়ান! ’

তারপর আর দিশাকে পাওয়া গেল! ফাহাদকে তব্দা লাগিয়ে দিয়ে ফুরুৎ করে উড়াল দিল সেখান থেকে। বৃষ্টির সামনে এসে বড় দম টানল। কাহিনী করেছে সে আবার কত বড় সাহস দেখিয়ে এলো।
কিছুক্ষণ পর আবারো এক জায়গায় বসতে হলো সবাইকে। গরম গরম ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে চুমুক দিয়ে কোণা চোখে দূরে থাকা ফাহাদের দিকে তাকাল দিশা। বেখেয়ালিভাবে ফাহাদও সেসময় সেদিকে তাকিয়েছিল। অতঃপর চোখাচোখি হলো দুজনের। চোখ সরিয়ে নেওয়ার জন্য উদ্যত হতেই ফাহাদের দিকে চোখ মারল দিশা। অতিষ্ট ভঙ্গিতে কপাল কুঁচকে নিল ফাহাদ। ঠিক তখনি কফির কাপ মুখ সম্মুখে এনে আগে ফাহাদের উদ্দেশ্যে ঠোঁট চোখা করে ইশারা ছুঁড়ল দিশা। সেকেন্ড একের ভেতর আবার ঠিকঠাক হয়ে গেল রমণী। নিরুদ্বেগ ভাবে কফিতে মনোনিবেশ করল।
এদিকে হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের কাছে বার বার ইভটিজিং এর শিকার ফাহাদ তেঁতে উঠল। করার অনেক কিছু থাকলেও এই মুহূর্তে বলার কিছু নেই। ভাইয়ের বাড়িতে কোনো সীন ক্রিয়েট করতে চায় না সে। বিতৃষ্ণায় আর কফিটুকু শেষ করতে পারল না। ফয়সালকে বলে বাইরের দিকে যেতে শুরু করল। পিছু ডেকে ফয়সাল বলল,

‘ এতো রাতে কোথায় যাবি? ’
‘ আশেপাশেই। ঘুরি একটু। ’
তারপর আর এক মিনিট থাকল না সেখানে। না তাকাল তালুকদার বাড়ির বখে যাওয়া অভদ্র মেয়েটার দিকে। যেমন ভাই তেমন বোন। কোনো ম্যানারস নেই। জুলুম করে অন্যের জিনিসে ভাগ বসাতে মাহির।

শিম শিমে ঠাণ্ডা বাতাস। গরম কাপড় ছাড়া এ পরিবেশে থাকা মানে হাঁড় কাঁপুনি উঠানো। গা ছমছমে নিস্তবদ্ধতার মাঝে পানির কল কল আওয়াজ শোনা যাচ্ছে কেবল। এহেন পরিবেশের মাঝে পায়ের তালু ছুঁইছুঁই পানিতে দুজোড়া পা চলছে। এক রমণীর কদম যাচ্ছে আগে আগে আর পিছনে অলসভঙ্গিতে তাকে অনুসরণ করছে এক সুঠামদেহী পুরুষ।
‘ পা গুলোকে একটু আরাম দিলে ভালো হতো। ’
দাঁড়িয়ে পড়ল বেলা। পিছু না ফিরে গমগমে স্বরে আওড়াল,
‘ কাউকে আমার পেছন পেছন আসতে বলিনি। ’
অভিমানী বূধুর দিকে চেয়ে নরম গলায় বলল দিগন্ত,
‘ একটাই বউ আমার। এই অচেনা সমুদ্রপাড়ে ছেড়ে যাবো কোন দুঃখে। আর মেয়ে হারিয়েছে জানতে পারলে, ওর বাপ আমাকে জ্যান্ত কবর দিবে। ’

অযাচিত কথাগুলো আর কর্ণপাত করল না বেলা। ধুপধাপ করে হাঁটতে শুরু করল আবারো। এদিকে একহাতের মাঝে রাখা শালটা নিয়ে দিগন্তকে ছুটতে হলো ওর সাথে। ঠাণ্ডার তোপে রীতিমতো কাঁপছে মেয়েটা। কিন্তু রাগের বশে শরীর তার জ্বলছে।
প্রকৃতিতে তখন ভোর হচ্ছে। বিস্তৃত অম্বরে সূর্যের আগমন ঘটছে। সমুদ্রের নীলচে-সাদা পানিতে তার প্রতিফলন দেখা দিতে শুরু করেছে। পাড়গুলোতে আস্তেধীরে মানুষের আনাগোনা শুরু হচ্ছে। রাতের আঁধার কেটে সূর্যের মনোমুগ্ধকর দৃশ্যটা দেখার জন্য পর্যটকদের একে একে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরছে ইতোঃমধ্যে। এদিকে বেলাকে থামানো দুঃসাধ্য। একঘেঁয়ামির ন্যায় চোখ যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই হাঁটছে রমণী। এতোসময় নিশ্চুপ ওর সাথে হাঁটলেও এবার বড় বড় পা ফেলে বেলার পাশ ঘেঁষে থামল। শালটা ওর দুইবাহুর ওপর ভালোভাবে মেলে দিল। এতে যেন বিরক্তিতে চিরবিড়িয়ে উঠল বেলা। হাত নাড়িয়ে শালটা ফেলে দিতে চাইল।
সহসা ধমকাল দিগন্ত। গুরুগম্ভীর গলায় বলল,

‘ বাড়াবাড়ি করবি না। ’
‘ কথা বলবেন না আমার সাথে। ’
‘ কিসের রাগ এতো? ’
‘ এক প্রশ্ন তিনবার করলেও জবাব পাই না। আবার আদিক্ষেতা দেখিয়ে ওভাবে আপাদের সামনে থেকে এখানে আনার কোনো দরকার ছিল? অন্যদের সামনে দেখালেন খুব ভালোবাসেন আমাকে। এদিকে বুকে কার না কার নাম নিয়ে ঘুরছেন। ’
‘ বলেছিলাম তো সময় দে একটু। ’
ছ্যাঁত করে উঠল বেলা,
‘ আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে আর আপনার সময় চাই? ’
বেলার একদম কাছাকাছি চলে আসে দিগন্ত। খানিকটা ঝুঁকে ধীর কণ্ঠে আওড়ায়,
‘ দম বন্ধ বন্ধ লাগছে আগে বলবেন না। ’

তাতক্ষণাৎ পুরুষালি অধরজোড়া বেলার ওষ্ঠকোণ ছুঁয়ে দেয়। তাতে মূর্ছা যাওয়ার কথা থাকলেও রমণী শক্ত হয়ে খিঁচিয়ে নিল নিজেকে। দিগন্তের বুকের কাছে, নামের অংশটুকুতে খামচে ধরল। চিবিয়ে আওড়াল,
‘ আমি থাকতে অন্য কারো নাম এখানে কেনো থাকবে? লোক আমার, মাথার চুল থেকে পা অব্দি পুরোটাই আমার, ভালোলাগে আমার, ভালোবাসি আমি তবে এখানে অন্য কেউ কেনো? আমি থাকবো শুধু আমি। একা আমিই থাকব সর্বত্র। এই বেলা পাটোয়ারীই। ’
নিশ্চুপ দিগন্ত কেবল একদৃষ্টে চেয়ে আছে বেলার দিকে। এদিকে মেয়েটার নখগুলো বোধহয় বেশি বড় হয়েছে। বুকের জায়গাটুকে গেঁথে গেছে এতোক্ষণে। হালকা একটু টানলেই হয়তো মাংসসহ তুলে ফেলবে। জ্বেলাসি বড় খারাপ জিনিস! নরম কাঁদা মাটিকেও শক্ত ঢিলে পরিণত করে। সব ছেড়ে দিগন্ত উপভোগ করছে হিংসায় ঝলসে যাওয়া তার নাদান বউকে।
রাগান্বিত বেলা পুনরায় বলে উঠল,

‘ ভার্সিটিতে তো কারো প্রেমে পড়েননি। কোনো মেয়েকেও কাছে আসতে দেননি। জানি আমি সব। তবে এই নাম কার বিরহে লিখছিলেন? কবে লিখেছিলেন? নিশ্চয়ই স্কুল লাইফে আপনি অনধিকার চর্চা করেছেন। ’
অনধিকার চর্চা? বেশ হাসি পেল দিগন্তের। ঠোঁট কামড়ে বলল,
‘ প্রেমে পড়লে বুঝি অনধিকার চর্চা হয়? ’
নিজের যুক্তিতে অটল বেলা দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
‘ হয়, আলবাৎ হয়। এই লোকটা আমার, মনটাও শুধুমাত্র আমার জন্য বরাদ্দ। অন্য শাকচুন্নি কেন এসেছিল এ মনে? ’
আকষ্মাৎ বেলাকে ঘুরিয়ে বক্ষপিঞ্জিরাবদ্ধ করল দিগন্ত। ঠাণ্ডা হাতজোড়া আস্তে আস্তে শাল গলিয়ে, কাপড়ের ওপর বেলার মেদহীন উদর আঁকড়ে ধরল। ঝট করে টেনে বেলাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল সে। যেটুকুও ফাঁকা ছিল সেটুকু লাঘব হলো অচিরেই। ছোটাছুটি করার ইচ্ছে থাকলেও, শরীর সায় দিল না বেলার। বরফের ন্যায় জমে গেল সেখানে।
দিগন্তের উষ্ণ শ্বাস-প্রশ্বাস ওর ঘাড়-গলায় আছড়ে পড়ছে। নিরবতায় কাটল কিছুপল। হুট করে খুব কাছে থেকে দিগন্তের কণ্ঠস্বর পাওয়া গেল,

‘ সূর্যটা দেখছেন? একটু একটু করে আঁধার কাটিয়ে আলো ছড়াচ্ছে। আকাশের ওই সীমান্তে দিগন্তবেলা; আর নিচ বিন্দু থেকে সিন্ধুতে পৌঁছানো সমুদ্র! ওই অঢেল পানিতে দেখেন সূর্যটা কেমন ছেয়ে যাচ্ছে। আস্তেধীরে সমুদ্রকোলে নিজের সিলমোহর বসাচ্ছে। ঠিক যেভাবে একটু একটু করে এক নাদান বেলা, দিগন্তের অন্তর সমুদ্রে বিচরণ ঘটিয়েছে। কবে যেন তাকে মোহে ফেলেছে, তারপর আকৃষ্ট করেছে, তারপর ভালোবাসতে শিখিয়েছে, তারপর বিশাল ধৈর্য্যের পাহাড় গড়ে দিয়েছে। সবশেষে অনেক চড়াই-উতরাই করে সে তার ‘বিন্দুচারিণীকে’ পেয়েছে। দিগন্তের বেলা; আমার ‘বিন্দুচারিণী’, আমার নাদান বেলা পাটোয়ারী। ’
ছলছল নেত্রে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় কানের কাছে নড়তে থাকা ওষ্ঠজোড়ার কথাগুলো শ্রবণ করল বেলা। তড়িৎ বেগে সামনে ঘুরে দুহাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল দিগন্তকে। ওর বুকে মুখ গুজে কান্নারত ভেজা গলায় আওড়াল,
‘ বেলা পাটোয়ারীও দিগন্ত তালুকদারকে ভালোবাসে। এতো এতো ভালো লাগার মধ্য দিয়ে ভালোবাসতে শিখেছে সে। গোটা এই দিগন্ত তালুকদারকে ভালোবাসে। লোকটা শুধু তার, সে-ও শুধু লোকটার। ‘

বুকের মাঝে লেপ্টে থাকা ছোট শরীরটাকে নিজেও জরিয়ে নিল দিগন্ত। বেলার চুলের ভাজে চুম্বন রেখে ঠোঁট হেলিয়ে হাসল। সাধারণত ওর ওই গম্ভীর অধরকোণে অমন প্রশান্তি মূলক হাসি দেখা দেওয়া দুর্বোধ্য।
অতঃপর এক শালের ভেতরে দুটো শরীরের উপরাংশ ঢেকে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে চলল তারা গন্তব্যহীনভাবে। তাদের খুঁনশুটি থামল কি! বরং চঞ্চলে বেলার মুখের লাগাম ছেড়ে গেল। বেলার দশ কথার মাঝে দিগন্তের হুটহাট বলা কোনো এক কথায় লজ্জায় মূর্ছা যাচ্ছে রমণী। আবার সময়ে অসময়ে দিগন্তের অবাধ্য হাতের বিচরণে ছোট দেহখানা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় দুলে উঠছে। সব ঘটছে লোকচক্ষুর আড়ালে, একান্তে তাদের মাঝে। পুরো পাড়জুরে লোক সমাগম বাড়ল কিন্তু সবাই নিজ মনে, নিজ পরিবার কেউবা নিজ প্রেয়সীর সাথে পরিবেশ উপভোগ করতে ব্যস্ত। এদিকে একজোড়া যুগলও ব্যস্ত নিজেদের একান্ত সময় মধুময়ভাবে কাটাতে।

নতুন বছরের সাথে নতুন দিনের আগমন হয়েছে ধরত্রীতে। সূচনা ঘটেছে নতুন দিনের। মাস ছয়েক থেকেই চলা পাঁচটা অ্যালবামের, পাঁচ নাম্বার মিউজিক রেকর্ডিং শেষ হলো আজ।
পুরো স্টুডিও এখন রাজ চলছে দিগন্ত আর দিশার। সহজ-সরল দিহানকে এসব থেকে সরিয়ে নিয়েছে দিগন্ত। ওকে চট্টগ্রামের ব্যবসার কাজে জরিয়ে এখানকার সবকিছু নিজ দায়িত্বে নিয়েছে। কাজ শেষ হলে আবার দিহানকে ওর পদে বসিয়ে দিবে। জয়নাল তালুকদার, জুনায়েদ তালুকদার কারো ধার ধারছে না দু’ভাইবোন। দিগন্ত ডিরেক্ট চেয়ারে বসে যেভাবে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে সেভাবেই চলছে পুরো টিম। প্রডিউসিং করছে দিশা। জুনায়েদ তালুকদার এ নিয়ে ঝামেলা তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু ছেলের সামনে টিকে তার কোনো কথা। উপরন্তু দিশার কাজ নিখুঁত, ওকে আটকানোর কোনো উপায় নেই। শেষমেষ ভাতিজী আর ছেলেকে তাদের মতো ছাড়তে বাধ্য হয়েছে জুনায়েদ।
এসবে জয়নাল তালুকদার নিরব ভূমিকা পালন করছে। দিগন্তের কথামতো সে লোক দেখানো অফিসে যাচ্ছে। এক-দু’ঘণ্টা থেকে আবার বাড়ি চলে আসছে। স্ত্রী নিয়ে বেশ ভালোই দিন কাটছে তার।

রেকর্ড শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ হলো। টিম মেম্বার্সরাও প্রায় সব চলে গেছে। রেকর্ডরুমে এখন দিগন্ত, রায়হান আর মাইশার উপস্থিতি। সেসময় সেখানে আসে দিশা। ক্লান্ত রমণী এসেই ধুপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে। ব্যাগ থেকে একটা চাবি বের করে সবার সামনে তুলে ধরল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাতে দেখাতে ম্লান সুরে আওড়াল,
‘ এমন কাজ দিয়েছো আমাকে! এসব আমার সাথে যায়? সোজাসোজি চোর-ছ্যাঁচড় বানিয়ে দিলে আমাকে। ’
চাবির দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকাল দিগন্ত। জুনায়েদ তালুকদারের অফিসরুমের চাবি এটা। সন্দিহান গলায় শুধাল,
‘ কিভাবে আনলি? টের পায়নি? ‘
ক্লান্ত মুখশ্রীতে বিস্তর হাসল দিশা। বলল,

‘ টের পাওয়া এতো সহজ? যা মটকা মেরেছি না! প্রথমে তো রেগে ছিল আমার উপর; তার কাজবাজে বাঁ হাত ঢুকিয়েছি যে। পরে কতক্ষণ ধরে মানালাম। দুপুরে খেতে বসল যখন, তখন কত তোষামোদ করলাম। ভাগ্যিস জ্বর চলছে বড় আব্বুর! আমার একটু আদর-যত্নে বেচারা গলে গেছে। হিহি! আমি তো জানি তালুকদার বাড়ির বেটা ছেলেরা জ্বর এলে কাবু! ছোট বাচ্চাটি হয়ে যায় একদম। কফির বাহানায় একটা ঘুমের ওষুধও খাইয়ে দিয়েছে। তারপর তার পকেট থেকে চাবি নিয়ে দৌড়। ’
এক শ্বাসে কথাগুলো বলে দম টানল মেয়েটা। দিগন্ত ওর হাত থেকে চাবিটা নিয়ে ভাবুক গলায় বলল,
‘ রুমে যে সিসিটিভি আছে সেটার কি করলি? ’
বিগলিত হাসে রমণী,
‘ তার কাজ তো গতকালই সেরে রেখেছিলাম। রুম গোছানোর ছুঁতোয় সিসিটিভিতে গুঁতো মেরে ভেঙ্গে ঝুরি বানিয়েছি। ’

ফাহাদের সাথে ফোনকলে ছিল রায়হান। এতোক্ষণ দিশার কথা বলছিল বলে চুপ করে শুনছিল সে। ব্লুটুথে হাত রেখে রায়হান বলল,
‘ আচ্ছা রাখ। কাল সকাল এগারোটায় কফিশপে চলে আসিস। ’
খট করে লাইন কেটে দিল রায়হান। এদিকে মুখের হাসিটুকু মিলিয়ে নিয়ে দিশা তড়াক করে চেঁচিয়ে উঠল,
‘ আমি কথা বলছিলাম না। কার সাথে ফোনে ছিলে তুমি? ’
অবাক রায়হান! জবাব দিল,
‘ ফাহাদ। কাল আসতে বললাম। ’
‘ তো আমি যখন পার্সোনাল কথা বলছিলাম তখন কেটে দিবা না। কি আশ্চর্য! চেনা-অচেনা সব মানুষের সামনে আমাকে অপদস্থ করছো তোমরা? মানুষ কি বলবে? দিশা তালুকদার চোর! তোমাদের হেল্প করতে এসে এতো অপমান সইবো আমি। ’

মাইশা সান্ত্বনার স্বরে বলল,
‘ তুমি হাইপার হচ্ছো কেন? আমদের মাঝেই আছে এসব কথা। বাইরের কেউ তো আর শোনেনি। ’
গজগজিয়ে উঠল দিশা,
‘ শোনেনি মানে? ফাহাদ দেওয়ান বাইরেরই লোক। দূর! আসলেই মানুষের ভালো করতে নেই। আমার মন নরম বিধায়, বারবার ধরা খেয়েও আবার বেহায়ার মতো হেল্প করছি। তোমরা কিভাবে পারলে আমার কথা লিক করতে? এভাবেই তো একজন দুজন থেকে লোক জানাজানি হয়। তারপর সবাই বলবে দিশা চোর! নিজ বাড়ি থেকে জিনিস চুরি করে। ‘
দিগন্ত ছোট চোখে দেখছে দিশাকে। রাশভারি গলায় বলল,

‘ ওভাররিয়েক্ট করছিস! মনে হচ্ছে বাড়া ভাতে ছাঁই দিয়েছে কেউ! সত্যি বল, কোনো কাহিনী বাঁধিয়েছিস নাকি? যেরকম ডানপিঠে, একটুও বিশ্বাস করিনা তোকে। অকাজের বুদ্ধি মাথায় ঠেসে নিয়ে ঘুরিস। যদি কোনোকিছু আমার কানে এসেছে তবে পিঠের ছাল তুলব আমি। ’

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৮

মিইয়ে গেল দিশা। ভেতরে ভেতরে বুক দুরদুর করল। সেই যে বৃষ্টির বাড়ি থেকে ফিরেছে, তারপর আর ফাহাদকে দেখেনি। গরম পরিবেশ ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য নিজে থেকেও আর ফাহাদকে ডিস্টার্ব করেনি। বুদ্ধি এঁটে রেখেছে, ইয়ার ফাইনাল শেষে একেবারে বাড়িতে গেড়ে বসবে তাকে বিয়ে করার জন্য। নয়তো মিছে হাত কাটার অভিনয় করবে। দিগন্তসহ, বাড়ির সকলের অন্তপ্রাণ সে। তার কথা শুনতে বাধ্য হবে।

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৬০