Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৬

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৬

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৬
নওরিন মুনতাহা হিয়া

আদ্রিয়ান তার কেবিন থেকে বাহির হতে যাওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়ায় কারণ জিয়ার সাথে কথা বলার বিন্দুমাএ ইচ্ছা তার নাই। কিন্তু জিয়া এগিয়ে এসে আদ্রিয়ানের হাত ধরে বসে এরপর আকুতি স্বরে বলে
“ আদ্রিয়ান তুমি মিথ্যা বলছ তাই না? তুমি বিবাহিত না? যদি তুমি বিবাহিত হও তবে তোমার স্ত্রীকে বিদেশে রেখে সাত বছর ধরে এখানে কেনো থাকবে? আর তোমার স্ত্রী এতোদিন আমেরিকায় কেনো আসেনি? “

জিয়ার আকুতি মিনতি বা কষ্ট আদ্রিয়ানের মন গলাতে পারে না এক ঝটকায় জিয়ার হাত সরিয়ে দেয়। যা আদ্রিয়ানের হাতের উপর রাখা ছিল। আদ্রিয়ান জিয়াকে ধাক্কা দিয়ে নিজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এরপর বলে উঠে
“জিয়া তোমাকে মিথ্যা বলে আমার লাভ কি? আমি সত্যি বিবাহিত, বাংলাদেশে আমার স্ত্রী রয়েছে। আর যদি বলো সাত বছর দূরে থাকার কথা এর কারণ আমার স্ত্রীর সাথে আমার মান – অভিমান চলছিল তখন। তাছাড়া মালিহার পড়াশোনা আর আমাদের কেরিয়ারের কথা চিন্তা করে আমরা দূরে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু আমি আমার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসি যতই রাগ, বা অভিমান থাকুক না কেনো বউ রেখে অন্য নারীর সাথে পরকীয়া করা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। “

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আদ্রিয়ানের ধাক্কায় জিয়া দূরে সরে যায় এরপর পুনরায় ফিরে আসে আদ্রিয়ানের কাছে। শক্ত করে আদ্রিয়ানের পরহিত শার্ট চেপে ধরে রাগী স্বরে বলে উঠে
“‎আদ্রিয়ান যদি তোমার কাছে তোমার স্ত্রী সব হয়, তবে আমি কে? তোমাকে আমি পা’গ’লের মতো ভালোবাসি তা কি তোমার চোখে পড়ে না? আমার ভালোবাসা আর অনুভূতির কি কোন মূল্য নাই তোমার কাছে? উত্তর দাও আমায় আদ্রিয়ান? “‎
শার্টের কলার থেকে জিয়ার হাত সরিয়ে শক্ত করে দিয়ে মুষ্ঠিবদ্ব করে আদ্রিয়ান কথার জবাবে উত্তর দেয়
“জিয়া তোমার ভালোবাসার দায় আমার না। কারণ আমি তোমায় কোন প্রকার ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি বা আশা দেয়নি। শুরু করে শেষ অবধি আমি সবসময় তোমার ছাএী হিসাবে দেখে এসেছি জিয়া। আর তুমি যতবার আমার প্রতি দুবর্ল হয়েছ ঠিক ততবার আমি তোমার দূরে সরে গিয়েছি। আমার ব্যবহার বা কথা দিয়ে শতবার বুঝিয়েছি তোমায়, যে আমি তোমাকে ভালোবাসি না। তোমার প্রতি আমার মনে কোন অনুভূতি নেই আর ভবিষ্যতে ও কোনো অনূভুতি জন্মাবে না “।

আদ্রিয়ানের কথা শুনে জিয়ার চোখ – মুখ শান্ত হয়ে এতোখন যে চোখে রাগ, জেদ, ঘৃণা ছিল। সে চোখ এখন শান্ত জিয়া নিথর পাথরের ন্যায় চুপচাপ হয়ে যায়। জিয়া অশ্রু মিশ্রিত কণ্ঠে আর অসহায় দৃষ্টিতে প্রশ্ন‎ করে
“‎তোমার ভালোবাসার কাঁটার আঘাতে আমি র’ক্তা’ক্ত হয়ে যাচ্ছি তবুও তুমি আমায় ভালোবাসো না আদ্রিয়ান? “
জিয়ার অসহান কণ্ঠ শুনে আদ্রিয়ান শান্ত হয়ে যায় এরপর জিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে
“জিয়া কাঁটার কি দোষ বলো পা তুমি নিজেই দিয়েছিলে “….

আদ্রিয়ান মুষ্ঠিবদ্ব হাত ছেড়ে দিয়ে একবার জিয়ার দিকে তাকিয়ে বড় বড় পা ফেলে কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। জিয়া শরীরের সব ভার ছেড়ে দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। আজ দিনের আলোয় তার পৃথিবীটা অন্ধকার মনে হচ্ছে চোখের কার্নিশ বেয়ে দু ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ে তার।
দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে মেঘ এতোখন জিয়া আর আদ্রিয়ানের কথা শুনছিল। মেঘ এখন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সত্যি কি আদ্রিয়ান আর জিয়ার মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই। আর আদ্রিয়ান মালিহার নাম নিল, মালিহা মেঘের পূর্ণনাম মালিহা জান্নাত মেঘ। সার্টিফিকেট সহ সকল কাগজপএে মেঘ এই নাম ব্যবহার করে থাকে কিন্তু এই নাম আদ্রিয়ান জানল কি করে?

বাংলাদেশে থাকার সময় মেঘ আর আদ্রিয়ানের দেখা হয়নি তবে কি বাড়ির কেউ বলেছে যে মেঘের নাম বলছে। অবশ্য মেঘ যখন ডিভোর্স পেপারে সাইন করছিল তখন মালিহা নামে করেছিল। তবে কি আদ্রিয়ান সেই নাম দেখেছে? কিন্তু নাম এখন বড়ো বিষয় না যদি আদ্রিয়ান জিয়াকে ভালো না বাসে। তার স্ত্রী মালিহা মানে মেঘকে ভালোবাসে তবে কোন নতুন করে একমাসের মধ্যে ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলছে? জামান সাহেবের কাছে সে স্বীকার করেছে যে, সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।
আদ্রিয়ানের ভালোবাসার মানুষ জিয়া। তবে আজ কেনো জিয়াকে সে বলল শুরু করে শেষ অবধি জিয়াকে আদ্রিয়ান কখন ভালোবাসেনি? আর মেঘকে স্ত্রী পরিচয় কেনো দিল? চৌদ্দ বছর আগে মেঘের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়েছিল বলে রাগ করে আদ্রিয়ান আমেরিকায় চলে আসে। তবে আজ হঠাৎ করে মেঘের প্রতি এতো ভালোবাসা তার কোথা থেকে উদয় হলো?

গায়ে হলুদের দিন ছাদে আদ্রিয়ান আর জিয়া ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত যা মেঘ দেখেছিল তা কি মিথ্যা? আদ্রিয়ান কি সত্যি জিয়াকে ভালোবাসে না? তবে কি আদ্রিয়ান মেঘকে ভালোবাসে? কিন্তু যদি মেঘের সাথে সংসার করতে চাই তবে ডিভোর্সের কথা কেনো বলেছে? সাত বছর আগেও মেঘকে তালাক দিতে চেয়েছে কেনো? বাবার বন্ধুর মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছে বলে কেনো রাগ করে আমেরিকায় চলে এসেছে?
আদ্রিয়ান কি জিয়াকে বিয়ে করতে চাই না বলে নিজেকে বিবাহিত বলে দাবি করেছে? কিন্তু আদ্রিয়ান জিয়াকে বিয়ে করতে চাইবে না কেনো? জিয়াকে সে ভালোবাসে? না হলে মেঘের থেকে ডিভোর্স কেনো চাইবে? কিন্তু জিয়া আর আদ্রিয়ানের কথা শুনে মনে হয়নি তাদের মধ্যে প্রেম ঘটিত কোন সম্পর্ক রয়েছে। আসলে আদ্রিয়ানের মনে কি চলছে? এই বিয়ে, ডিভোর্স, আর পরকীয়া এইসবের আসল সত্যি কি?
মেঘ যখন দরজার সামনে ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে এইসব চিন্তা করছিল তখন হঠাৎ দরজা খুলার শব্দ হয়। আদ্রিয়ান তার কেবিনের দরজার খুলে বের হয়ে আসে, কিন্তু দরজার সামনে মেঘকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বলে
“‎ মেঘ তুমি এখানে? আমার কেবিনের সামনে হঠাৎ?“

আদ্রিয়ানের কথা হয়ত মেঘের কানে পৌঁছায় নি যার কারণে আদ্রিয়ান পুনরায় ডাক দেয়
“‎মেঘ কথা বলছ না কেনো? তুমি এখানে কি করছ?“
আদ্রিয়ান এইবার বেশ জোরে বলল কথাটা, তার ডাক শুনে মেঘের ঘোর কাটল। মেঘ আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে
“আদ্রিয়ান স্যার আপনি আমাকে আসতে বলেছেন। আপনার কেবিনে।“

আদ্রিয়ান এতো ঝামেলার মধ্যে মেঘকে ডেকে পাঠানোর কথা ভুলে গিয়েছিল। কাল রাতে জ্বরের সময় মেঘ তার কতো সেবা করেছে কিন্তু মেঘকে একবার ধন্যবাদ অবধি দেওয়া হয়নি। কিন্তু এখন এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলা ঠিক হবে না কেবিনের ভিতরে জিয়া আছে। ওহ যদি মেঘকে এখানে দেখে তাহলে সমস্যা করবে। আদ্রিয়ান বলে
“মেঘ এখানে কথা বলা যাবে না, চলো লাইব্রেরিতে যাওয়া যাক। “
আদ্রিয়ানের সব কথা মেঘের কান অবধি পৌঁছায় না মেঘ শুধু বলে
“‎ হুম।“

‎মেঘের সম্মতি পেয়ে আদ্রিয়ান লাইব্রেরির দিকে চলে যায়, মেঘ এখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আদ্রিয়ানের কোন কথার মানে সে এখন বুঝতে পারছে না। কিন্তু এই সকল কথার জবাব মেঘের চাই? আর তা আদ্রিয়ানকে দিতে হবে। মেঘ বড় বড় পা বাড়িয়ে আদ্রিয়ানের পিছন পিছন লাইব্রেরির দিকে ছুটে যায়।

কলেজের তিন তালার উপরে দক্ষিণ দিকে লাইব্রেরির অবস্থান। আশেপাশে পরিবেশ বেশ নীরব আর শান্ত কোথাও কোনো মানুষজন নাই। সকল শিক্ষার্থী এখন ক্লাস রুমে ক্লাস করছে, মেঘের ও ক্লাস ছিল কিন্তু তা মিস দিয়েছে সে। এখন ক্লাস করা বা পড়াশোনার মুডে নাই মেঘ। আদ্রিয়ান সিঁড়ি বেয়ে লাইব্রেরিতে পৌঁছায় মেঘ ও তার পিছুপিছু সেখানে যায়।
আদ্রিয়ান মেঘকে কাল রাতের জন্য ধন্যবাদ দিতে যাবে তার আগেই মেঘ তাকে থামিয়ে গম্ভীর আর রাগী কণ্ঠে বলে উঠে
“‎আদ্রিয়ান স্যার আপনি কি সত্যি বিবাহিত? মালিহা কি আপনার স্ত্রী? বাংলাদেশে থাকতে কি আপনি বিয়ে করেছেন? “
মেঘের কথা শুনে আদ্রিয়ান বুঝতে পারে মেঘ হয়ত কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়া আর তার সকল কথাবার্তা শুনেছে। মেঘের থেকে এই সত্যি লুকিয়ে রাখতে আর আদ্রিয়ান চাই না, আদ্রিয়ান হ্যা বোধক মাথা নাড়িয়ে বলে
“‎ হুম মালিহা আমার স্ত্রী, আমি বিবাহিত। বাংলাদেশে থাকতে আমার বিয়ে হয়েছে। “

আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘ বলে
“তবে কি ডক্টর. জিয়ার সাথে আপনার প্রেমের কোনো সম্পর্ক নাই? আপনি কি জিয়া ম্যামকে ভালোবাসেন না? “
মেঘের কথার জবাবে আদ্রিয়ান বলে
“‎না জিয়ার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। কারণ জিয়া শুধুমাএ আমার ছাএী। আর নিজের বউ রেখে অন্য নারীর সাথে পরকীয়ায় কেনো জড়াব আমি? “
আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘ তার দিকে এগিয়ে দিয়ে জোড়ালো কণ্ঠে বলে
“‎ যদি নিজের বউকে আপনি এতো ভালোবাসেন তার প্রতি এতো দায়িত্ব বোধ আপনার। তবে কেনো নিজের স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে চান আপনি? বলুন কেনো? “

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৫

মেঘের কথা শুনে আদ্রিয়ান অবাক হয় সে একবার ও জিয়াকে বলেনি তার আর মালিহার ডিভোর্সের কথা। তবে মেঘ কি করে জানল এই কথাটা।আদ্রিয়ান অবাক হয়ে বলে
“মেঘ তুমি করে জানলে আমি মালিহাকে ডিভোর্স দিতে চাই? “
মেঘ রাগী আর তেজী কণ্ঠে বলে
“কারণ আমি আপনার স্ত্রী মালিহা

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৭