দুইজনাতেই পর্ব ১১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
দ্বিতী সাক্ষ্যর পিছুপিছু পা চালালেও মুখটা কুঁচকানো। যেন তীব্র অসন্তোষ ফুটে উঠেছে চোখেমুখে। সে বিতৃষ্ণা চোখেমুখে ফুটিয়েই দ্বিতী প্রথমে বলল,
“ এভাবে ওদের মাঝখান থেকে ডেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কেনই বা নিয়ে যাচ্ছেন? ”
সাক্ষ্য ঘাড় কাঁত করে চাইল। মুখে চোখে গম্ভীর একটা রূপ ফুটিয়ে তুলে বলে উঠল,
“ কেন? নাচ করবেন না? নাচের রিহার্সাল করাতে নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে। ”
পাল্টা প্রশ্ন দ্বিতীও করল এবারে,
“ আমার তো ঈশানের সাথে ডুয়েট নাচার কথা। আপনার সাথে কেন যাচ্ছি? ”
সাক্ষ্য ফের আবারও গম্ভীর মুখ করে ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন আমি আপনার টিচার হই মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম। টিচারদের আদেশ মানা স্টুডেন্টদের কর্তব্য। ”
দ্বিতী ওভাবেই চাইল। রাগ ও হলো বোধহয়। মুখ কুঁচকে বলল,
“ আমার মনে আছে আপনি আমার টিচার। টিচার হিসেবেই প্রশ্নটা করেছি, অন্যকিছু হিসেবে নয়। ”
“ টিচার হিসেবে প্রশ্ন করাটাও আমার কাছে স্রেফ বেয়াদবি মনে হচ্ছে। ”
দ্বিতী যেন বিস্মিত হলো এমন ভাব করেই জিজ্ঞেস করল,
“ টিচারকে এইটুকু জিজ্ঞেস করাও যায় না? ”
“ শুনুন, কথা বাড়াবেন না। এখানেই দাঁড়ান। আমি আসছি। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য পা চালিয়ে কোথায় যেন গেল। দ্বিতী রাগে জেদে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল হতাশ হয়ে। টিচার? টিচার বলে মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? সবসময় দ্বিতীকে কি ভাবে? এইটুকু ভাবতেই ভাবতেই দ্বিতীও পা চালাল। সাক্ষ্য, তার সাথে হঠাৎ হওয়া আকদ সবকিছুকেই মনে মনে বিরক্তিকর বস্তু হিসেবে ধরে নিয়ে যখনই পা চালিয়ে অনেকটুকু পথ বাড়াল ঠিক তখন কানে এল গম্ভীর গলা,
“ চলুন। কাজ আছে। ”
দ্বিতী ফিরে চাইল। সাক্ষ্যর মুখচোখ এতোটাই গম্ভীর যেন সত্যিই কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা বলছে। দ্বিতী ভ্রু বাঁকিয়েই বলল,
“ কি কাজ? ”
“ ভার্সিটির বাইরে। আমার পিছুপিছু আসুন। ”
দ্বিতী ফের ভ্রু বাঁকাল। সাক্ষ্য ব্যস্ত হয়েই পা চালাল। গুরুত্বপূর্ণ গুরুত্ব বুঝাতে চোখে মুখে ফুটাল একরাশ ব্যস্ততা। দ্বিতী অবশ্য ওভাবেই দাঁড়ানো। সাক্ষ্য ফের আবারও ঘাড় ফিরিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কথা শুনতে পান না? আপনার কি মনে হচ্ছে টিচার হয়ে আপনাকে বিনা দরকারেই আমি ডেকে নিয়ে যাচ্ছি? ”
একদমই না। কিন্তু এটা যেমন মনে হচ্ছে না, তেমন এটা মানতেও মন চাইছে না দ্বিতীর। ভার্সিটির বাইরে আবার টিচার স্টুডেন্টের কি কাজ থাকবে? এইটুকু মনে মনে আওড়িয়েই পা বাড়াল। যেতে যেতে বলল,
“ আপনার দিকে তাকিয়ে থাকলে দোষ হয়, পাশাপাশি হাঁটলেও তো দোষ হওয়ার কথা। এই কারণেই..”
“ কাজ থাকলে সবার সাথেই হাঁটা যায়, কথা বলা যায়। কিন্তু আপনি কাজের জন্য তাকাননি। ”
“ ওটা আমার কাজই ছিল। কাজ ছিল বলেই তাকিয়েছি।”
দ্বিতী এইটুকু মনে মনে বলেই মুখে রাগ রাগ ভাব নিয়ে চাইল। অতঃপর পাও বাড়াল। এরপর ভার্সিটির রাস্তা ধরে হেঁটে চলে এল বহু দূরে। অথচ কি দরকারি কাজ তা দ্বিতী খুঁজে পেল না। আদৌ কোন কাজ আছে কিনা তাও জানে না। শুধু মনে একরাশ বিরক্তি।আর এই বিরক্তি নিয়ে সাক্ষ্যর পিছু পিছু আসতেই কল দির ঈশান। ওপাশ থেকে জানাল,
“ দ্বিতী? কোথায় তুমি? ডান্স করবে না? করবে না ভালো কথা, দেখবেও না। মিহু তো খুঁজছিল তোমাকে ভিডিও করার জন্য। ”
দ্বিতী মুহুর্তেই লাফিয়ে উঠল। জানাল,
“ নাচ করব আমি। মিহুকে না করো ঈশান। বলো যে ওর পরিবর্তে আমি ডান্স করব। ”
“ কিন্তু সাক্ষ্য স্যার নিষেধ করেছে তোমাকে নিতে। করলে মিহু করবে। ”
“ আরেহ নাহ, সিনিয়র আপুরা তো বলেছে আমি নাচের স্টেপ ভালো পেরেছি। তার মানে পারফর্মমেন্সও ভালো করব। তুমি একটু বুঝিয়ে বলো।”
সাক্ষ্য এতক্ষন চুপচাপ শুনছিল শুধু। এবার না পারতেই গলা ঝাড়ল। গম্ভীর রূপটা তখনও মুখচোখে ধরে রেখে গলা ঝেড়ে বলে উঠল ধমকের সুরে,
“ হোয়াট হ্যাপেন্ড? পা না চালিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কি? ”
সাক্ষ্যর মুখ থমথমে। দ্বিতী যখন ওটুকু শুনেও ফোন নামাল না তখন আবারও বলল গম্ভীর গলাতে,
“ ফোনটা রাখুন। ”
দ্বিতী কেমন করে চাইল। কি আশ্চর্য। ফোনেও কথা বলতে পারবে না সে? এইটুকু ভেবেই জানাল,
“ আমি একটু কথা বলেই রাখছি স্যার।”
এই পর্যায়ে সাক্ষ্য নিজেই ফোনটা কেড়ে নিল। পকেটে ফোনটা গুঁজে নিয়ে পা চালাতে চালাতে বলল,
“ আমার পিছু পিছু আসবেন সোজা। এদিক ওদিক তাকালেও ফানিশমেন্ট থাকবে। ”
দ্বিতী তাজ্জব যাওয়ার মতো করেই চাইল। আরেকটু পথ যাওয়ার পর প্রায় মিনিট পাঁচেক পরই একটা গাড়ি এসে থামল তাদেরই সামনে। গাড়ির জানালা নামিয়ে বেরিয়ে এল সাম্যর দাঁত বের করা মুখ। গাড়ির সামনের সিটেই বসেছে। চাহনিটা এমন যেন বেশ উৎফুল্ল মন নিয়েই বেরিয়েছে। সাম্য দ্বিতীকে একপ্রকার ঐ দাঁত কেলানো হাসি উপহার দিয়েই বলে উঠল,
“ দ্বিতী, উঠ উঠ। তোদের ভার্সিটিতে বহু আয়োজন হয়েছে নাকি? সুন্দরী সুন্দরী মেয়েও আছে তাই না? ”
দ্বিতী একবার সাক্ষ্যর দিকে চাইল। এতক্ষন টিচার হিসেবে মান্যগন্য করলেও সাম্যকে পেয়ে যেন দ্বিগুণ সাহস ভর করল। দাঁত কেলিয়ে বলল,
“ খুবই সুন্দর আয়োজন সাম্য ভাই। তুমি দেখবে সুন্দরীদের? নামো, এক্ষুনি নামো। সুন্দরী কারোর সাথে ফিক্সড করে দেই তোমাকে চলো। ”
সাক্ষ্য তখনও স্থির চোখে চাওয়া। সাম্যই ফের হেসে বলল,
“ আমার ভার্সিটিতেও আয়োজন আছেরে দ্বিতুপাখি। নয়তো যেতাম। তুই উঠ। আমার ভার্সিটিই ঘুরিয়ে আনি তোকে চল।”
দ্বিতী ফের আবারও চাইল সাক্ষ্যর দিকে। এবারে ফুরফুরে মন নিয়েই গাড়িতর উঠতে উঠতে সাক্ষ্যকে বলল
“ স্যার, আমার ভাই হয়। উনার সাথে যাই? ”
সাক্ষ্য শুধু গম্ভীর ভাবেই তাকাল। অতঃপর দ্বিতী উঠে বসতে বসতেই সাক্ষ্যও পা চালিয়ে গাড়ির সামনের সিটের বিপরীত অংশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর গাড়ির দরজা তুলে সাম্যর দিকে চেয়েই গম্ভীর গলাতে সরাসরি বলল,
“ নাম গাড়ি থেকে। ”
সাম্য বিস্ময় নিয়ে চাইল যেন। ফ্যালফ্যাল করর চেয়ে বলল,
“ তুমি না বললে গাড়ি নিয়ে আসতে? আমি এখন ভার্সিটিতে যাব কি করে তাহলে? ”
সাক্ষ্য স্থির চোখে চেয়েই শুধাল,
“ এখান থেকে নেমে মিনিট কয়েক রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে রিক্সা নিয়ে যাবি। আমার দরকার আছে একটু সামনে। ”
“ তাই বলে আমি নেমে যাব? আমি আনলাম আর তুমি আমাকে নামিয়ে দিচ্ছো এভাবে? অন্যায় করছো না? ”
সাক্ষ্য শান্ত স্থির চাহনিতে চেয়েই এবার শীতল স্বরে বলল,
“ বেশি কথা বলছিস না সাম্য?”
সাম্যর কি হলো এবার কি জানি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। বিড়বিড় করে বলল
“ কি জুলুম বড় ভাইয়া। ছোটভাইয়ের প্রতি একটু মায়ামহব্বত ও নাই। ”
সাক্ষ্য ততক্ষনে নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখেই উঠে বসল গাড়িতে। ড্রাইভিং সিটে বসেই গাড়ি চালাতেই দ্বিতী হৈরৈ করে বলে উঠল,
“ কি আশ্চর্য! সাম্য ভাই? সাম্য ভাইকে নিলেন না কেন? ”
সাক্ষ্য শুধু গাড়ি চালাতে চালাতে জানাল,
“ ইচ্ছে আমার। ”
“ নামিয়েছেনই বা কেন গাড়ি থেকে? পিছনের সিটে ও নিলেন না? সোজা নামিয়ে দিয়ে চলে আসলেন? ”
“ আসলাম। ”
দ্বিতী এবার ভ্রু কুঁচকে চাইল। বলল,
“ এটা আপনার কাজ স্যার? স্টুডেন্ট নিয়ে গাড়ি চালানো? ”
সাক্ষ্য আরেকটু পথ গিয়েই গাড়ি থামাল রাস্তার পাশেই। বলল,
“ কেন? কোন সমস্যা? ”
“ হু, রিহার্সাল থেকে ডেকে এনে কাজ আছে কাজ আছে বলে আপনার পিছু পিছু এনে এখন গাড়ি চালাচ্ছেন? কেমন কাজ এটা? এর থেকে এতক্ষনে ঈশানের সাথে আমার নাচটা হতো ভালোভাবে। ভার্সিটিজুড়ে সবাই বলত তখন, নাইস কাপল। আপনার জন্য তো কিছুই হলো না। ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল। নাচার এত বেশি শখ? কেন? নিজের ফোনটক বের করেই বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচার মতো কয়েকটা গান শুনিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ নাচার খুব শখ না? নাও চ্যুজ এ সং ফর ইওর ওয়েডিং.. ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে চেয়েই মুহুর্তে শুধাল,
“ করব না চ্যুজ। ”
“ ওকে করতে হবে না। আমি চ্যুজ করে নিব৷ বাট রিহার্সাল কয়দিন যাবৎ করবেন তা ডিসাইড করে রাখুন। রিহার্সালে কোন কমতি যেন না থাকে হুহ? একদম ষোলো আনা রিহার্সালই পূর্ণ করব আপনার। কোন কমতি থাকবে না। ”
কথাগুলো বলার সময় সাক্ষ্যর মুখভঙ্গি ছিল স্থির, গম্ভীর এবং কন্ঠটা শীতল। যেন শান্ত ভাষাতেই হুমকি দিল। দ্বিতী ওভাবেই তাকানো। এতগুলো কথা শুনে বিড়বিড় করে মনে মনে বলল,
“ রিহার্সাল কথাটা এতবার বলার কারণ? ঈশানের সাথে রিহার্সাল করেছি বলে? ”
ঠিক এর পরমুহুর্তেই মনে পড়ল নিধি আর সাক্ষ্যর গান করার দৃশ্যটাও। সাথে চারপাশের সবার গুঞ্জন। দ্বিতভ চুপ থাকল না এবারে। রাগে জেদে জ্বলে বলল,
” ঈশানের সাথে আমায় দারুণ মানাবে না বলুন? সুন্দর, লম্বা, শান্ত-শিষ্ট এবং আমাকে ভালোবাসে এমন একজন। ছেলেটা আমাকে প্রোপোজ করেছিল। এন্ড আই থিংক, আমার সাথে ওর
জোড়টা খারাপ হবে না। সো আই উইল এক্সেপ্ট হিজ প্রোপোজাল। রাইট ডিসিশন না স্যার? ”
সাক্ষ্যর নজর আরো শান্ত হয়ে এল যেন। একদম শীতল চাহনি। স্থির সে চাহনিতে তাকিয়ে থাকতেই দ্বিতী ফের আবারও বলে উঠল,
“ ঈশান আমায় কতদিন ধরে ভালোবাসে জানেন? কতটুকু ভালোবাসে জানেন? আমার আজকাল সত্যিই ওর জন্য মায়া হয়। যারা ভালোবাসে তাদেরই আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত তাই না? বাকিদের গুরুত্ব দেওয়া শুধু শুধু টাইম লস! ”
“ ওহ। তারপর? ”
” ঈশান খুব ভালো ফটোগ্রাফিও করে বুঝলেন? দারুণ সব ছবি তুলে। আমার সব দারুণ দারুণ ছবি ওই তুলে দিয়েছে বুঝলেন? আপনি জানেন? আমার জন্য তো পুরো একটা পেনড্রাইভই রেখেছে। পুরো পেনড্রাইভ জুড়ে শুধু আমার ছবি। ”
সাক্ষ্য শুনল। এই পর্যায়ে বোধহয় আর চিলমুডে বসে থাকতে পারল না। অহেতুক একটা রাগ হচ্ছে সাক্ষ্যর। অথচ সে জানে রাগ করা উচিত না। ঐটুকু স্বাভাবিক। তবুও মুখচোখে থমথমে এক ভাব রেখে সাক্ষ্য শুধাল,
“ ঈশানের সম্পর্কে দেখছি পি এইচ ডি কম্প্লিট করে নিয়েছেন। আর কি কি জানেন তার সম্পর্কে? ”
দ্বিতী ফের আবারও আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,
“ ওর আব্বুকে চিনি, আপুকে চিনি। ওর আম্মুর সাথেও কথা হয়েছিল আমার ঘন্টাখানেকের মতো। এত অমায়িক মানুষজন। ”
“ গুড। আরকিছু? ”
দ্বিতী যখন ফের উচ্ছ্বাস নিয়ে উত্তর করতে যাবে ঠিক তখনই সাক্ষ্যর পকেটে থাকা ফোন বেজে উঠল। সাক্ষ্য কপাল ফোনটা বের করতেই দেখল দ্বিতীর ফোনটাই। কল এসেছে তাও ঈশানের নাম্বার থেকেই। সাক্ষ্য ঐ শীতল চাহনিতেই চেয়ে কল কাঁটল। মোবাইলটা আবারও পকেটে গুঁজে তাকাতে না তাকাতেই দ্বিতী বলল,
“ কল রাখলেন কেন? কোন দরকারি কলও তো হতে পারে। আমার ফোনটা দিন। ”
“ খুব দরকারি কল? ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকিয়েই প্রশ্নটা ছুড়ল। দ্বিতী উত্তর করল,
“ অবশ্যই, হতেই পারে। ফোনটা দিন। ”
ঠিক এরপর আরো দুবার কল এল। দুইবারই ঈশান কল দিয়েছে। সাক্ষ্যর রাগে বিরক্ত লাগছিল। অন্যের বউকে কল দিতে নেই জানে না এত বড় তাগড়া ছেলে? নাকি জানে না? এরপরই ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ কল রিসিভড করুন। আর বলুন, অন্যের বউকে এভাবে বিরক্ত করতে নেই কল করে। নিন, ফার্স্ট। ”
দ্বিতী ফোনটা নিল ঠিকই। কলও তুলল সাক্ষ্যর কথামতো। অথচ কল তুলেই সর্বপ্রথম হেসে বলে উঠল,
” ঈশান, আই থিংক ইউ আর পার্ফেক্ট ফর মি। সো, সো আই এম এক্সেপ্টিং ইওর প্রোপ….”
বাকিটা বলা হলো না দ্বিতীর। সাক্ষ্য একপ্রকার প্রায় ছিনিয়েই নিল ফোনটা। অতঃপর ওভাবেই কল রেখে পকেটে গুঁজল। বলল,
” খুব সাহস দেখাচ্ছেন মিসেস সাক্ষ্য এহসান। এতোটাও সাহস দেখাবেন না যে, পরে আফসোস করতে হয়। ”
দ্বিতী মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। জানাল,
“ আশ্চর্য! আপনার জন্য প্রোপোজাল ও এক্সেপ্ট করতে পারব না? কিনে নিয়েছেন নাকি আপনাকে?”
সাক্ষ্য ওভাবেই গাড়ি চালাতে চালাতে উত্তর করল,
“ বহু আগেই ম্যাম। ”
সাক্ষ্য ওখান থেকেই দ্বিতীকে দ্বিতীর বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে এসেছেে।বাসার সামনে নামার আগে আরো একবার শীতল গলায় বলল,
“ আরো একবার সাবধান করছি। আপনি মানুষটা বেঠিক হলেও কাজকর্ম যেন সঠিক থাকে। ”
দ্বিতী শুনলেও গুরুত্ব দিল না। যেতে যেতেই মুখ ভেঙ্গিয়ে শুধাল,
“ আপনি মানুষটা বেঠিক হলেও কাজকর্ম যেন সঠিক থাকে। ওরে ঢংরে! নিজে ভাই অন্যের সাথে গান করে, আর আমি নাচ করলে বেঠিক কাজ? ঢং! ”
দ্বিতী মুখ ভেঙ্গাতে ভেঙ্গাতেই উপরে গেল৷ অপর দিকে সাক্ষ্য তার যাওয়ার দিকে কিয়ৎক্ষন চেয়ে থেকেই গাড়ি ঘুরিয়েছে। বউ অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। অন্যের প্রতি মুগ্ধ হচ্ছে, অন্যের খোঁজখবর নিচ্ছে, অন্যের পরিবারের সাথে ঘনিষ্ট হচ্ছে এতকিছু তো মেনে নেওয়া যায় না। বউ ইদানিং তাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেও না লুকিয়ে চুরিয়ে। ফিরেও দেখছে না তার দিকে। এতকিছুর কারণ কি? মুগ্ধতা কমে যাচ্ছে নাকি? সাক্ষ্য এতসব ভাবতে ভাবতেই যখন গাড়ি নিয়ে বাসায় হাজির হলো তখন উপরে যেতে যেতে কল এল তার সবচাইতে কাছের বন্ধু নিষাদের। সাইলেন্ট থাকলেও ভাইব্রেট হচ্ছিল। এবং এতক্ষন গাড়িতেও ভাইব্রেট হচ্ছিল। সাক্ষ্য ইচ্ছে করেই তুলেনি কল। অবশেষে এখন কল তুলতেই ওপাশ থেকে বলল,
” কল তুলিসনি কেন এতক্ষন? কতবার কল দিলাম শালা? দরকার বলেই তো কল দিলাম নাকি? ”
সাক্ষ্য শুনল। কোনরকম উঠতে উঠতে বলল,
“ হু। ”
ওপাশ থেকে ফের আবারও বলল,
” কি হু? কোন জগৎ এ আছিস হারামি? দরকারে কল দিয়েছি তোকে। নিধিকে কল দিচ্ছি এতবার। তুলছেই না সে সকাল থেকর কল। এর জন্যই কল দিচ্ছি তোকে এত করে। আর তুই হারামি তো কল তোলার নামই করছিস না । পেলে দিতাম কয়টা তোরে। কি এমন করছিলি হুহ? ”
সাক্ষ্যর মেজাজ এমনিতেই খারাপ লাগছিল। এমন সময় নিষাদের কথা গুলোও বিরক্ত লাগছের।উঠতে উঠতেই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ বউ ঘরে তোলার আগেই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে আমার আর তুই আশা করিস তোকে আমি কৈফিয়ত দিব কেন কল তুলিনি? ইডিয়ট কোথাকার! ”
এইটুকু বলেই কল রাখল সাক্ষ্য। অতঃপর ধুপধাপ সিঁড়ি বেয়ে বাসায়ও পৌঁছাল। জুতো খুলে, ঘড়ি খুলে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়েই চোখেমুখে পানি দিতেই পিছন থেকে শোনা গেল,
“ তুই নাকি দ্বিতীর সাথে ছিলি সাক্ষ্য? বাসায় আনলি না কেন মেয়েটাকে? মেয়েটা ঘরে থাকলে তাও হাসিখুশি লাগে ঘরটা। ঘরের মানুষ তো ঘরর আসলে তো ভালোই তাই না?”
সাক্ষ্য ফিরে চাইল। অতঃপর গম্ভীর, শান্তিশিষ্ট সাক্ষ্য এহসান এই প্রথমবারের মতোই নিজের মাকে গম্ভীর মুখে বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ৯+১০
“ চারমাস আগে এত তাড়াহুড়ো করে আকদ করিয়ে এখন নিজের বান্ধবীর মেয়েকে পার্মানেন্টলি ঘরে তুলছো না কেন আম্মু? ”
সাক্ষ্যর মা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে শুধু এইটুকুই উচ্চারণ করল,
“হু? ”
সাক্ষ্য যেতে যেতেই বলল,
“ ঘরে তুলে নিলে তো ঘরও হাসি খুশি থাকবে, তোমার ইচ্ছেও পূরণ হবে। তাছাড়া, ঘরের মানুষ তো ঘরেই মানায় তাই না?”
