Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ১২

দুইজনাতেই পর্ব ১২

দুইজনাতেই পর্ব ১২
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

তখন রাত্রি বারোটা। সাক্ষ্য তখনও বেলকনিতেই বসা। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ম্যাসেজ করল শান্তভাবেই,
“ দ্বিতীকা তাসনিম, অন্যের দিকে তাকানোর মতো ভুল ভুলেও করবেন না।মুগ্ধ হওয়া তো দূরের কথা। আপনি যার তার প্রতিই মুগ্ধ হবেন শুধু। নয়তো খারাপ হবে। ”
দ্বিতী তখন মহাঘুমে। ম্যাসেজটা এল ঠিকই তবে দেখা হলো না। দেখতে পেল রাত তিনটায় যখন ঘুম ভাঙল তখনই। ম্যাসেজটা দেখেই বোধহয় সর্বপ্রথম কপাল কুঁচকাল। নিজেও লিখল,

“ অথচ আমি তো ঈশানের প্রতি খুব করে মুগ্ধ হয়ে আছি। নেশায় বুদ হয়ে যাওয়ার মতো। এক্সেপ্টও করে নিয়েছি বুঝলেন? এতে খারাপ হলেও কিছু করার নেই যে। প্রেম কি অতো বিদ্রোহ মানে বলুন তো? ”
সাক্ষ্যও এই ম্যাসেজটা পেল সাতসকালে। প্রতিদিন ভোরে উঠে মর্নিং ওয়াক করলেও আজ বের হলো না সে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল দিল সর্বপ্রথম দ্বিতীকেই৷ ওপাশের দ্বিতী তখনও ঘুমে। বৃষ্টিময় ঠান্ডা আবহাওয়ায় ঘুমই এখন সঙ্গী তার। দ্বিতী দ্বিতীয়বারের সময় চোখ কচলে নিয়ে উঠল। ফোনটা হাতড়ে নিয়ে ফোন স্ক্রিনে চাইল ঘুমোঘুমো চোখেই। অতঃপর কল রিসিভড ও করল।বলল,
“ সাতসকালে কল দেওয়ার মানে কি স্যার ? আপনার আর নিধির বিয়ের ইনভাইটেশন দিবেন? আশ্চর্য! ”
সাক্ষ্য শান্ত শীতল স্বরে বলল,
“লাস্ট ম্যাসেজটা সজ্ঞানেই করেছেন ম্যাম? ”
দ্বিতীর হঠাৎ ই মনে পড়ল না। তারপর মনে পড়ল কি ম্যাসেজ দিয়েছিল সে। বলল,

“ অফকোর্স! ”
“ ওকে ফাইন, তার মানে চাইছেন বিদ্রোহ হোক? সামাল দিতে পারবেন এই বিদ্রোহ? ”
দ্বিতী ওভাবেই বালিশে মুখ গুঁজে দিয়ে উত্তর করল,
“ প্রেম কোন বিদ্রোহ মানে না। করতে পারেন আপনি। ”
“ খুব কনফিডেন্স? ”
“ থাকবে না কেন? ”
সাক্ষ্য শুনল। অতঃপর ঠোঁট বাঁকিয়েই হুট করে হেসে উত্তর করল,
“ ওকে ফাইন। তৈরি থাকুন। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য ফোন রাখল। মুখচোখ গম্ভীর ছেলেটার। আশ্চর্যজনক ভাবে সে ঈশানকে সহ্য করতে পারছে না মনে হলো। মনে হলো অদ্ভুত রকমের ঈর্ষা ফিল হচ্ছে। অথচ এর আগে সাক্ষ্য কখনো কোন মেয়েকে নিয়ে কোন ছেলের প্রতি ঈর্ষা অনুভব করেনি। বরং বরাবরই জেনে এসেছে দ্বিতী মেয়েটা সে ব্যাতীত আর কিছুই ভাবতে পারে না। পারে না মানে পারেই না। সাক্ষ্য দ্বিতীকে খুব ভালোভাবেই চেনে। এমনকি এখনো সে নিশ্চিত যে দ্বিতী এমনটা করবেই না। তবু বিনা কারণেই তার ঈশানকে সহ্য হচ্ছে না। সে কেন পছন্দ করবে তার বউকে? কোন সাহসে?

দ্বিতী মেয়েটা চঞ্চল হলেও প্রায়সই সে শাড়ি পরে এদিক সেদিক ঘুরে বন্ধুবান্ধব নিয়েই৷এমনি সময়ের দ্বিতী আর শাড়ি পরে থাকা দ্বিতীকে দেখতে আসলেই সুন্দর লাগে। যেন স্নিগ্ধ রমণী। দ্বিতী আজও শাড়ি পড়ে বেরিয়েছে। সাক্ষ্যর সাথে কথা হওয়ার একটু পরই বেরিয়েছিল। পরনে সুতির একটা শাড়ি। শাড়িটা কালো আর সবুজ এর মিশ্রনে। শুধু দ্বিতীই নয়।খেয়াও পরেছে কালো রংয়ের একটা শাড়ি। সাথে কথা আর ওর আদুরে বিড়ালটা আছে। মেডিকেলে পড়ার পর থেকে কথা দ্বিতীর থেকে আলাদা হয়ে গেলেও দ্বিতী প্রায়সই জোড়াজুড়ি করে তাকে তাদের আড্ডায় আনে। শহর ঘুরে, গল্প করে। আজও তাই হলো। তবে দ্বিতী এত করে বলেও কথাকে শাড়ি পরাতে পারেনি। কারণ, তার ধারণা সে মোটা বলে শাড়ি পরলে আরো মোটা লাগবে। তাই তো মিল রেখে কূর্তি পরেছে, মাথায় দিয়েছে ঘোমটা। মিহু অবশ্য আসতে পারেনি পারিবারিক অনুষ্ঠান থাকাতে। তবুও এই তিনজন কি সুন্দর টইটই করে শহর ঘুরল। টং দোকানে চা খেল। মাঠে দাঁড়িয়ে ফুসকা, বেলপুরিও খেল। অবশেষে কথাই সর্বপ্রথম বলল,

“ আরো হাঁটবি দ্বিতী? ”
দ্বিতী চাইল। জানাল,
“ হু। সন্ধ্যে অব্দি হাঁটব। তুই হাঁটতে না পারলে কোলে করে নিয়ে যাব না হয়।”
খেয়া হেসে ফেলল। এখানে খেয়া, কথা দুইজনই চুপচাপ শান্ত স্বভাবের।শুধু বকবক করার মধ্যে আছে দ্বিতীটাই। মিহু হলে অবশ্য আরো ভালো জমত। দ্বিতী আরো কয়েক পা বাড়িয়ে কথার আদুরে বিড়ালটাকে কোলে তুলতেই অদূরে চোখে পড়ল কিয়ান আর ঈশানকেও। ওদের দেখেই এগিয়ে এল। অবশেষে এসেই কিয়ান দাঁত কেলিয়ে শুধাল,
“ কিরে? তোরা এখানে? কোন ছেলের পিছুপিছু চলে এলি? ”
দ্বিতী উত্তর করল,

“ তোর পিছু পিছু। ”
“ সে তো আসবিই। কিন্তু চারচোখ? কি যেন নাম? ভুলে গেলাম তো.. ”
কথা মিনমিন করে চাইল। দ্বিতীর সাথে এরজন্যই ওর বের হতে মন চায় না। কোথায় থেকে কোন ছেলে চলে আসে। এর আগেও দুয়েকবার দেখেছে সে এই ছেলেটাকে। দ্বিতীর বন্ধু এটাও জানে। কথা অস্বস্তি নিয়েই বলল,
“ কথা। ”
কিয়ান ভ্রু নাচিয়ে মজা করে জানাল,
“ হু বলেন, কি কথা বলবেন? ”
দ্বিতী মুহূর্তেই পিঠে কিল বসাল। জানাল,
“ ওর নাম কথা ছাগল। ”
“ ওহ আচ্ছা। মিস কথা, আপনার বিড়ালটা তো দারুণ। একদম আপনার মতোই। ”
এইটুকু বলেই কিয়ার হাসল। কথা সৌজন্যতা মূলক বলল,
“ ধন্যবাদ। ”

কিয়ান ভেবেছিল আরেকটু ফ্লার্ট করবে। কিন্তু বিড়ালটাকে কথার কোল থেকে নিতে চাওয়ার চেষ্টা করতেই আঁচড়ে দিল হাতে। কিয়া মুহূর্তেই হাত সরাল। বলল,
“ বাবাহ! আপনার বিড়াল তো দারুণের পাশাপাশি ডাকাত ও। আপনার মতোই! ”
কথার মুখটা ফ্যাকাশে। কিয়ানের দিকে একবার চেয়ে সরি বলতে নিবে ঠিক তখনই দ্বিতী বলে উঠল,
“ পরশু ভার্সিটির অনুষ্ঠানে আসিস নি কেন? তোর না নিধির সাথে গান করার কথা ছিল? নাকি পলিটিক্সে সময় দিতে গিয়েছিস? ”
কিয়ান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
“ কথা সত্য। পলিটিক্স আর মেয়ে ব্যাতীত লাইফে আছেটা কি? তাছাড়া সাক্ষ্য স্যার করে দিল না গান? আর কি? আমারে তো লাগলই না। ”
দ্বিতীর মনে পড়ল আবারও সে ঘটনা। তারপর বলল,
“ তুই করলে লোকজন তোকে আর নিধিকে পার্ফেক্ট কাপল বলত। এখন তোর জায়গাটা ঐ নাকউঁচু লোক নিয়ে নিয়েছেরে। তোর আর কাপল গড়া হলো না। ”
“ তাই নাকি? আমার তো আসলেই মনে হয় এরা কাপল। কাজেই অন্যের বেডি নিয়ে টানাটানি করার অভ্যাস নাই।”
এউ পর্যায়ে দ্বিতীর আবারও মন খারাপ হলো বোধহয়৷ মুখ ভেঙ্গাল কেবল। আসলেই কি নিধির সাথে সাক্ষ্যর কিছু আছে? নাহলে সবাই এমন মাথায় তুলে কের এই জুটিকে? কারণ কি? দ্বিতীর তো অসহ্য লাগে।

দ্বিতী, খেয়ে এবং কথার বিড়াল মিষ্টু তিনজনেরই বহু ছবি তোলা হলো কিয়ানের ক্যামেরাটায়। শুধু ছবি তুলল না কথাই। পাশে চুপচনপ বসে ছিল। যদিও কিয়ান কথা বলেছিল তার সাথে। কথা টুকটাক উত্তর দিয়েছিল কেবল। ভালো লাগছে না বলে এক পর্যায়ে সাক্ষ্যকেও কল করে বলেছে এসে নিয়ে যেতে। ভালো লাগছে না। সাক্ষ্য এল প্রায় মিনিট পনেরো পর। গাড়িতে সাথে সাম্যও আছে অবশ্য। দুইজনই যাচ্ছিল অন্য জায়গায়। মাঝপথে কথার জন্য এখানে আসতে হচ্ছে বলে সাম্য অবশ্য নারাজি কিছুটা। সাক্ষ্য রাস্তার অপর পাশে গাড়ি পার্কিং করতে করতেই চোখে পড়ল দ্বিতী, খেয়ার সাথে সাথে ঈশানকেও। কি আশ্চর্য! এই ছেলেটা এখানেও , তাও দ্বিতীর সাথে। দ্বিতীরই ছবি তুলছে। একটা ক্যামেরা কিনে কি ভেবেছে? রমণীদের মন কিনে নিবে ছবি তোলার অযুহাতে? সাক্ষ্য দ্রুতই গাড়ি পার্ক করে নামল। কথাকে কল দিয়ে বলল,

“ তোর সাথে আর কে আছে? ”
কথা এপাশ ওপাশ চাইল। বলল,
“ দ্বিতী আছে। ”
“ নিয়ে আয় ঐ আহাম্মককেও। আম্মু বলেছে উনাকে বাসায় নিয়ে যেতে। ”
অথচ সাক্ষ্যর আম্মু বলেনি। কাল বলেছিল অবশ্য। কথাও তাতে সাঁই দিল৷ দ্বিতীকে বলেকয়ে তাড়াহুড়ো করে নিয়ে এল সঙ্গে কনে। সাম্যও অবশ্য দূর থরকে দেখছিল এসব। কিয়ান যে আসার সময় কথাকে বাই দিল, একটু আগে অব্দিও একসাথে বসা ছিল সবটাই। সাম্য মোবাইলে তুলে নিল একটা ছবিও। অতঃপর মনে মনে পেয়ে গেল যেন বিশাল এক সুযোগ। আজই সে আম্মুকে বলবে তার মেয়ে কেমন। কি করে বেড়ায়! সবসময় ভালো ভালো বলা কথার কপালেও কিছু জুটুক। আহা! সাম্যর খুশি আর কে রাখে।

দ্বিতী এল কথার সাথেই। তবে সাক্ষ্যকে দেখে নারাজ হলো। মুখ চোখ কুঁচকে নিয়ে উঠে বসল ও গাড়িতে। সাক্ষ্য বাসার সামনে আসার পর সাম্য আর কথাই নামল প্রথমে। তারপর নামল দ্বিতীও। পিছুপিছুই গেল। সাক্ষ্যকে দেখা গেল না অবশ্য। দ্বিতী ততক্ষনে পা বাড়িয়ে উপরে গেল। সাজিয়া আফরোজকে দেখেই সালাম দিতেই উনিও বললেন,
“ তোর কথা তো আজই বলছিলাম দ্বিতী। তোর আম্মুর সাথেও দরকারি কথা বলার ছিল বুঝলি? ভালো হয়েছে তুই এসেছিস। ”
দ্বিতী ভ্রু কুুচকাল। জানাল,
“ মানে? তুমি জানতে না আসছি যে? ”
“ কি করে জানব? জানিয়েছিস নাকি হুহ? ”
এইটুকু বলা শেষ করতেই সিঁড়ি বেয়ে এসে সদর দরজা দিয়ে এসে সবরই সাক্ষ্য পা রাখল বাসায়। দ্রুতই বলল,
“ আম্মু, আমার জন্য চা করো তো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধুু শুধু যারতার সাথে বকবক করো না। ”
যারতার? দ্বিতী মুখ কুঁচকে চাইল। সাক্ষ্য ততক্ষনে পা এগিয়ে রুমে গিয়েছে। পেছন থেকে সাজিয়া আফরোজ আবার ও বললেন,

“ কিরে? চা? কিন্তু তুই তো চাই খাস কেমন.. ”
সাক্ষ্য ফিরে চাইল। দূর! কি বলতে কি বলছে ও। বলল,
” ঐ আরকি। ”
তারপরই গম্ভীর মুখচোখ করে চলে গেল নিজের ঘরে। দ্বিতী ফিরে চাইল। সাজিয়া আফরোজের সাথে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই গল্পগুজব করল। মাঝে উনিই জিজ্ঞেস করলেন,
“ তোর তো এখন ব্যস্ততা নেই, তাই না আম্মু? কয়েকমাস তো মোটামুটি কম ব্যস্ততা আছে তাই না? ”
দ্বিতী উত্তর করল,
” হু।’
“ যাক। বাঁচলাম। তাহলে ভাবতে আর অসুবিধে নেই। ”
“ কি নিয়ে গো? ”
“ জানবি জানবি৷। জানাব আমি। ”
এইটুকু বলেই হাসলেন উনি। ছেলে আজ সকালেও মুখচোখ গম্ভীর রেখে বলেছে দ্বিতীকে নিয়ে। তার বড় ছেলের এহেন গম্ভীর কথা তো আর ফেলা যায়না। বান্ধবীর মেয়েকে তো ঘরে তোলা উচিত। সাথে এই দুইজনের একটা বুঝাবুঝি হলেও ভালো। তাইতো কফিটা তৈরি করেই দ্বিতীর হাতে দিয়ে বলল,
“ সাক্ষ্যকে দিয়ে আসবি একটু? আমার হাতে কাজ আছে। একটু পরই যাব। ”
“ আমি? ”
“ হু। ”

দ্বিতী হা না করে নিল। অতঃপর পাও বাড়াল। সাক্ষ্যর রুমের দরজায় সামনে গিয়ে কিছুটা সময় দাঁড়ালও। তারপর ডুকল রুমে। সাক্ষ্যর দিকে বাড়িয়ে দিল। অতঃপর বলল,
“ বাবাহ! রুম এত গোছালো। কে শিখাল এই রুম গোছানো স্যার? নিধি?”
সাক্ষ্য তাকাল ভ্রু বাঁকিয়েই৷ উত্তর করল না। এতোটা সময় শুধু চাপা গম্ভীর থেকে রাগ দমিয়ে রেখে ছিল। যা এখন প্রকাশের সুযোগ পেল।
সাক্ষ্য ঠিক এক পা এক পা করেই দ্বিতীর দিকে এগোল। মুখটা গম্ভীর টানটান। যেন শীতল এক রাগ স্পষ্টই ফুটে উঠছে চোখেমুখে। দ্বিতী যখন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে সাক্ষ্যকে বুঝার চেষ্টা করছিল ঠিক তখনই সাক্ষ্য একদম দ্বিতীর সামনে এসে দাঁড়াল। এক হাত দ্বিতীর পেছনে দেওয়ালে রেখে অন্যহাতে দ্বিতীর কপালের উপর পড়া চুলগুলো সরিয়ে কানে গুঁজে দিতে দিতেই হিমশীতল গলায় বলল,

“ আজকাল একটু বেশিই উড়ছেন না ম্যাডাম?”
দ্বিতী চাইল। ফের আবারও বলা হলো,
“ ছবি তুলছেন, হাসছেন, মুগ্ধ হচ্ছেন, এক্সেপ্ট করছেন নো প্রবলেম। কিন্তু একবার সাক্ষ্য এহসানের মাথা বেঠিক হলে আপনাকে একবিন্দুও ছাড় দিবে না,মাইন্ড ইট। এভাবে মনমতো উড়ার শখও গুঁছিয়ে দিবে। তখন কেবল সাক্ষ্যর মন আকাশেই উড়বেন।”
দ্বিতী এবারে বলল,
“ ডানাই নাই, আবার উড়ব আমি! ”
সাক্ষ্য ফের কপালের পাশের চুলগুলোতে আঙ্গুল বুলাল। বলল,
“তো বলুন, ছবি তোলার মানুষের অভাব আপনার? ফটোগ্রাফার লাগবে? আজকল পেমেন্ট করলে অনেক ফিমেইল ফটোগ্রাফারও পাওয়া যায়। ”
দ্বিতী ওভাবে থেকেই বলল,
” ঈশানের মতো ফটোগ্রাফি পারবে নাকি সবাই? আশ্চর্য! ”
সাক্ষ্য আরেকটু এগোল। দ্বিতীর অনেক কাছে চলে আসতেই এবার দ্বিতী উশখুশ করল। কি আশ্চর্য। এমন এগোচ্ছে কেন? দ্বিতী নড়বড়ে হতেই সাক্ষ্য বলল,
“ তাই নাকি? কত ভালো পারে? করে তো শুধু মেয়েদের ফটোগ্রাফি। ”
দ্বিতী নড়বড়ে হলেও উপরে বলল,

“ তো? ”
“ দাঁত কেলিয়ে হাসুন তো দেখি আমার সামনে। যতোটা ওখানে হেসেছরন ওভাবেই। ছবি তুলব। ভালো ফটোগ্রাফি হয় কিনা দেখা যাক। ”
দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। সাক্ষ্য ফের আবারও চাপা ধমকে বলল,
” হাসুননন”
দ্বিতী ওভাবেই চাইল। সাক্ষ্য যে কথাটা শীতল রাগ নিয়েই বলল তা স্পষ্টই বুঝা গেল। সাক্ষ্য ততক্ষনে ফোনটা এগিয়ে ধরল। দ্বিতীর ওভাবেই একটা ছবি তুলে দেখিয়ে বলল,
“ জড়োসড়ো মিসেস! লুক, সাক্ষ্য এহসানের ক্যামেরায় আপনার ছবি যতোটা সুন্দর আসে কারোর ক্যামেরাতেই অতোটা সুন্দর আসে না বুঝলেন? ”

দ্বিতী চাইল। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতেই হাতের অস্পষ্ট টাচে চলে এল এই ছবিটার পাশের ছবিটা। অদ্ভুত ভাবে এই ছবিটাও দ্বিতীরই। গতকাল ভার্সিটিতে তোলা ছবি। বোধহয় দূর থেকেই তোলা হয়েছে। দ্বিতী ভ্রু কুঁচকেউ বলতে নিল,
” এটা? এটা কে তুলেছে? ”
সাক্ষ্য চাইল ফোনে। ঠিক মুহূর্তের মধ্যেই ফোনটা নিজের পকেটে গুঁটিয়ে নিল এক মুহুর্তেই। বলল,
“ যেউ তুলুক, আপনার ঈশানের থেকে সুন্দর হয়েছে। দারুণ হয়েছে৷ ”
এইটুকু বলেই পিছু ঘুরল সাক্ষ্য। দ্বিতী ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। মুহূর্তেই মুখ ভেঙ্গাল। বলল,
“ তাকে বলবেন দেখা করতে। ধন্যবাদ জানাব। ”

দ্বিতী ওখান থেকে এসেই ঘুমিয়েছির সন্ধ্যা অব্দি। কিন্তু ঘুম ভাঙ্গল তখন যখন তার মায়ই বারকয়েক ডাকতে ডাকতে তার মাথা খেয়ে নিল। অবশেষে দ্বিতী যখন ঘুমঘুম চোখেই মায়ের দিকে তাকাল অনেক ডাকাডাকির পর ঠিক তখনই তাকে ডাকা হলো,
“ দ্বিতী? এই দ্বিতী উঠছিস না কেন? ”
দ্বিতী এই ঘুম ঘুম ভাব নিয়েই উঠে বসল। মায়ের এমন জরুরী তলব দেখে ঘুমের রেশ কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কি হয়েছে আম্মু? ”
“ সাজি কল করেছে। আজাদ ভাইও কল করে বললেন যে.. ”
“ কি বললেন? ”
এই বারে দ্বিতীর মা ছোটশ্বাস ফেললেন। বললেন,
“ তোর আর সাক্ষ্যর আনুষ্ঠানিক বিয়ের বিষয়ে কিছু ভেবেছি কিনা জিজ্ঞেস করছেন। সাজিরা চাইছিল আনুষ্ঠানিক বিয়েটা হয়ে যাক। ”
দ্বিতীর ঘুমের রেশ তখন সবটুকুই কাটল। চোখমুখ কুঁচকে বলল,
“ হঠাৎ? কি কারণে? ”
“ হঠাৎ কোন কারণ নয়। আকদ যখন হয়েছে আনুষ্ঠানিক বিয়ে তো হবেই। তোর আর সাক্ষ্যর সম্পর্কটাও কেমন ছন্নছাড়া। এগোচ্ছে না। বোধহয় একসাথে থাকলে তবুও তোদের একটা টান তৈরি হবে। একমত বলে দেই? ”
দ্বিতী ফ্যালফ্যাল করে চাইল। একমত বলে দিবে মানে? দ্বিতী চলে যাবে পরিবার ছেড়ে? আম্মুকে ছেড়ে? এইটুকু ভেবেই দ্রুত বলল,

“ না! আকদের সময় তো সাজি আম্মুর ছেলে নিজেই জানিয়েছিল যে আমি যতদিন না ভার্সিটি লাইফ শেষ করছি ততদিন আনুষ্ঠানিক বিয়ে হবে না। ”
“ কিন্তু তুই তো ভালোবাসিসি আম্মু। যাকে ভালোবাসিস তার সংসারে যাওয়ার ইচ্ছে নেই? ”
“ আছে। কিন্তু আমি জোর করে ও কারোর ঘাড়ে বসে যেতে চাই না আম্মু। তোমার বান্ধবীর ছেলে নিজে যখন চাইবে তখন আনুষ্ঠানিক বিয়ে নিয়ে ভাবা যাবে। ”
তার আম্মু আবারও বলল,
“ সাক্ষ্যকে না জিজ্ঞেস করে কি ওরা আমায় বলেছে? নিশ্চয় সাক্ষ্যও হ্যাঁ বলেছে। ”
“ শিওর হচ্ছো কি করে? বিয়ে ও তো মনে হয়েছিল মত দিয়েই করেছিল। কিন্তু পরে জানলাম এটা তার জন্য আকস্মিক হওয়া বিয়ে। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতী ফের আবারও ঘুম দিল। দ্বিতীর মা না পেরেই সাক্ষ্যদের জানালেন দ্বিতীর সময় লাগবে। অপর দিকে সাক্ষ্য এই উত্তরটা শুনেই ইগোতে লাগল বোধহয়। কল দিল দ্বিতীকেও। প্রথমেই বলল,
“ সাক্ষ্য এহসানের সাথে সংসার করতে অসম্মতি জানিয়েছেন? কারণ কি? এখন আর ভালো লাগে না তাকে? ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকে বলে,

“ কোনকালে ভালো লেগেছিল নাকি? আমার তো মনে পড়ছে না আমি এমনটা কখনো বলেছি বলে। ”
সাক্ষ্য চুপ থাকল। ঠিক এরপরই বলল,
“ লিসেন,এক দুই দিন নয়, আমি আপনাকে বহুবছর যাবৎ চিনি। আম্মুর বান্ধবীর কোন এক পিচ্চি মেয়ে আমাকে পছন্দ করে এটা না বুঝতে পারার মতো বোকা ছিলাম না আমি। ”
দ্বিতী হেসে বলল,
“ ইয়েস, বোকা ছিলেন না। চালাক ছিলেন খুব। তো ভার্সিটির কোন কোন মেয়ে আপনাকে পছন্দ করে তা অবজার্ব করেন না? নাকি ভালোই লাগে এসব? ”
গম্ভীর কন্ঠে উত্তর এল,

“ ভার্সিটির সব মেয়ের দিকে চেয়ে থাকি না আমি যে বুঝব কার চোখের ভাষা কেমন। ”
“ নিধির চোখের ভাষা বুঝেন? বুঝার কথা তো। আই থিংক আপনিও নিধিকে পছন্দ করেন রাইট? ”
সাক্ষ্য দাঁতে দাঁত চাপল এবারে। বলল,
“ মাথায় কে ডুকিয়েছে এসব আজেবাজে কথা? ”
“ আমার কাছে ভালো কথাই! অন্যের ভালোবাসা দেখতেও সুন্দর লাগে। বুঝলেন? ”
“ তারপর? ”

দুইজনাতেই পর্ব ১১

“ তারপর? তারপর আপনাদের ভালোবাসা ভালোই লাগে। ”
সাক্ষ্য ফের দাঁতে দাঁত চাপল। গম্ভীর স্বরে বলল,
“ ওয়েট, আরো ভালো লাগবে। তবে নিধি নয়, অন্য কেউ হবে। ”

দুইজনাতেই পর্ব ১৩