দুইজনাতেই পর্ব ১৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
দ্বিতীর মনটা ফুরফুরে। সাক্ষ্য এহসানকে না করতে পেরে বেশ ভালো রকমেরই খুশি। কি ভেবেছে? দ্বিতীর অনুভূতি আছে বলে দ্বিতী নেচে নেচে রাজি হয়ে যাবে? কোন আত্মসম্মান নেই নাকি তার? দ্বিতী এই ফুরফুরে মেজাজ নিয়েই চায়ের কাপে চুমুক রাখল। এত শান্তি কেন আজকের চা টা? আহ! দ্বিতী চোখ বুঝে। গুণগুণিয়ে কোন একটা গানের সুরও ধরল। ঠিক তখনই তার মা এল সামনে। দ্বিতীকে ফের আবারও বলল,
“ দ্বিতী? আরো একটাবার ভেবে দেখ না। ওরা আবারও বলছিল যে আনুষ্ঠানিক বিয়েটা যদি সেরে ফেলা যায় ভালো হয়। আজাদ ভাই বোধহয় হজ করতে যাবেন। এই কারণেই তাড়া দিচ্ছিলেন। আমি তো তোকে রোজ গিয়ে দেখে আসবই। রাজি হয়ে যা। ”
দ্বিতী সরু চোখে চাইল। বলল,
“ তোমার বান্ধবীর ছেলে না হয়ে অন্য কেউ হলে রাজি হয়ে যেতাম আম্মু। কিন্তু এখন রাজি হওয়া পসিবল না। ”
“ পসিবল না? কেন? সাক্ষ্য কি করেছে? কত ভদ্র ছেলে। ”
দ্বিতী শুনে চাইল। তারপর টেনে টেনে বলল,
“ অনেক ভদ্রঅঅঅ! ”
দ্বিতীর মা ফোঁস করে শ্বাস ফেললেন। মেয়ের কথা শুনে জানাল,
“ তুই সাক্ষ্যকে পছন্দ করিস না? সহ্য করতে পারিস না? সবসময় ওর নাম শুনলে এমন করিস কেন? ”
দ্বিতী মাথা দুলাল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। বলল
“ একদম সঠিক কথা আম্মু! সহ্য করতে পারি না তোমার বান্ধবীর ছেলেকে। ”
এই পর্যায়ে দ্বিতীর মাকে হতাশ দেখাল। মেয়ের দিকে চেয়েই ছোটশ্বাস ফেলে বললেন,
“ তো? এই বিয়ের ভবিষ্যৎ কি সবসময় এমন থাকবে নাকি? কখনো যাবে না সাক্ষ্যর সংসারে? ”
এইটুকু বলেই যখন মেয়ের মুখের দিকে উত্তরের আশায় তাকালেন ঠিক তখনই হাতের ফোনটা বেজে উঠল। পরমুহুর্তেই স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে বুঝলেন কলটা সাজিয়া আফরোজ করেছেন। এই নিয়ে কয়েকবারই বলে ফেলেছেন দ্বিতীকে রাজি করাতে পেরেছে কিনা।দ্বিতীর মা ছোটশ্বাস ফেলল। ফোন তুলে ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
.“ রাজি হয়নি। জানিসই তো ছোট থেকে কি পরিমাণ ঘাড়ত্যাড়া। মনে হয় না, রাজি হবে বলে। বরং, অনুষ্ঠানটা নাহয় পরেই করি। আমার মেয়েটাও আরেকটু সময় থাকুক আমার কাছে। ”
সাজিয়া আফরোজের ফোনটা লাউড স্পিকারেই দেওয়া ছিল। সাক্ষ্য তখন মায়ের থেকে একটু দূরের ডাইনিং টেবিলে চেয়ার টেনে বসে প্লেটে নুডুলস খাচ্ছিল। ঠিক এই কথাটা শুনেই ভ্রু বাঁকাল। কি সাংঘাতিক কথাবার্তা। ঘাড়ত্যাড়া বলেই সাক্ষ্য এই মুহূর্তে অনুষ্ঠানটা করতে চাইছে। যে পরিমাণ ঘাড়ত্যাড়া আর অবাধ্য যদি বউ হাতছাড়া হয়ে যায়? সাক্ষ্য ছোটশ্বাস ফেলে আগের মতেই মুখচোখ থমথমে করে কান খাড়া করল কি বলছে তা শোনার জন্য। এইবারে তার মা বলল,
” দেখি, একটু দে তো দ্বিতীকে। রাজি কিভাবে করাতে পারিস না তা দেখি। যদি বলেও রাজি নাহয় তো আমি আর আজাদ যাব। গিয়ে ঠিকই বুঝাব। ”
“ দেখ। ”
এইটুকু ক্লান্ত স্বরে বলেই দ্বিতীর মা ফোনটা বাড়িয়ে ধরল দ্বিতীর দিকেই।ইশারা করে বলল ফিসফিসিয়ে,
“ সাজির সাথে কথা বলো দ্বিতী। কি বলার বলো, তোমাকে অবশ্যই জোর করা হচ্ছে না বুঝলে? তুমি নিজের মতো মত দিবা। ”
দ্বিতী মাথা নাড়াল। কপাল কুঁচকে ফোনটা কানে নিয়ে মৃদু কন্ঠে জানাল,।
“ আসসালামুআলাইকুম সাজি আম্মু, কেমন আছো? ”
“ কি করে ভালো থাকি? তুই তো আমাদের বাড়ি আসতে রাজি হচ্ছিস না আম্মু? আসবি না? আমার পরিবারে কেউ কি তোর সাথে খারাপ কিছু করেছে আম্মু? এত অসুবিধা কিসের?”
দ্বিতী শুনল। তারপর উত্তর করল,
“ তোমাদের পরিবারে যেতে কোন অসুবিধাই নেই আমার। মোটামুটি সবাই ভালো তোমরা। শুধু তোমার নাক উঁচু ছেলেটা ছাড়া। ”
ওপাশে সাজিয়া আফরোজ ভ্রু কুঁচকালেন। কার কথা বললেন? সাক্ষ্য নাকি সাম্য? বললেন,
“ কে? সাক্ষ্য? ”
“ অবশ্যই। ”
সাজিয়া আফরোজ বুঝলেন। দুইজনের মধ্যে যে বনিবনা খুব একটা নেই এটাও তারা আগে থেকেই আন্দাজ করেছিল। ছোটস্বরে বললেন,
“ আর খারাপ ব্যবহার করবে না ও আম্মু। কথা দিচ্ছি আমি। ”
“ তবুও না। ”
“ কেন? ”
দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলে জানাল,
“ উনি নিজেই বলেছিলেন ভার্সিটি লাইফ যতদিন না শেষ হচ্ছে ততদিন যাতে বিয়ের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান না হয়। মনে আছে আন্টি? ”
“ আছে। কিন্তু এখন তো সাক্ষ্যও একমত আম্মু। তুই কি এইজন্য রাজি হচ্ছিলি না?”
দ্বিতী শুনল না। তার শুধু মনে পড়ল সাক্ষ্য প্রথমে স্টুডেন্ট বিয়ে করবে না বলে দ্বিতীর সাথে আকদে রাজি হতে চায়নি। মনে পড়ল, আকদের পর ও কোন আগ্রহ না দেখানোর কথা। মনে পড়ল সেদিন ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ার কথাও। কি ভাবেন নিজেকে হুহ? এইটুকু মনে করেই দ্বিতী উত্তর করল,
“না। স্টুডেন্ট বিয়ে করছে জানাজানি হলে এখন উনার সম্মান যাবে না?”
“ কতজনই তো স্টুডেন্ট বিয়ে করে। ওটাতে কি সম্মান যাবে পাগল? ”
“ উনার যাবে কিনা জানি না, তবে উনার মতো নাক উঁচু, ইগোওয়ালা পুরুষ মানুষ বিয়ে করেছি জানলে আমার বন্ধুবান্ধবরাই আমাকে রোস্ট করবে। ”
সাক্ষ্য সবটাই শুনছিল। নিজের এতগুলো বদনাম বিনা শব্দেই হজম করছিল বসে বসে। অবশেষে পারল না। উঠে এসে দাঁড়াল মায়েরই পাশে। অতঃপর ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের কানের কাছে ধরে ভরাট গলায় বলে উঠল,
“ এক্সিকিউজ মি, কে নাক উঁচু? কে ইগোওয়ালা পুরুষ মানুষ? ”
কন্ঠটা পরিচিত। দ্বিতীর চিনতে খুব একটা অসুবিধে হলো না। এতক্ষন বেশ আরামেই নিশ্চিন্তায় বসে বসে বদনাম করলেও এবার শুকনো ঢোক গিলল। যদিও ভয় পায় না সে। কিন্তু যার বদনাম করছে, তারই সম্মুখে এতক্ষন এসব বকে যাচ্ছিল? বলল,
“ ক্ কে? ”
সাক্ষ্য গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কার সম্পর্কে কথা বলছিলেন? ”
দ্বিতিী একটু অপ্রস্তুক হরেও কাঁটিয়ে নিল। গলায় কনফিডেন্সের ছাপ রেখেই বলে উঠল,
“ যার সাথেই বলি। কান পেতে শুনছিলেন কোন আক্কেলে? ছিঃ! এতদিন তো ভাবতাম সাক্ষ্য এহসান খুব ব্যাক্তিত্ববান পুরুষ। আর এখন কিনা কান পেতে মানুষের কথা শুনে। ”
সাক্ষ্যর মুখচোখ কেমন গম্ভীর হয়ে এল। চাহনি শান্ত। বোধহয় রেগে যাচ্ছে। গলা শক্ত করে বলল,
“মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম..”
“ কি? ”
“ বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন। সহ্য হচ্ছে না একদম। ”
দ্বিতী ফুঁসে উঠে যেন। দ্রুতই বলল,
“ সহ্য করতে বলেছে কে? আমি বলেছি? ”
“ আপনি বললেই যে সহ্য করব ভাবেন কি করে?, ”
সাক্ষ্যর মা সাজিয়া আফরোজ এতক্ষন দুইজনের ঝগড়া দেখছিলেন তাজ্জব হয়ে। তার শান্তশিষ্ট ছেলেটা ঝগড়াও পারে এহেন ধারণা তার আজই জন্মাল। এর আগে কখনো দেখেনি সাক্ষ্যকে এমন কারোর কথায় কথায় পাল্টা জবাবা দিয়ে ঝগড়া করতে। সাজিয়া আফরোজ হাসলেন দুইজনের কান্ডা দেখে। এক পর্যায়ে বললেন,
“ আহ সাক্ষ্য! কি শুরু করেছিস এসব? ”
এইটুক বলেই ফোন কেড়ে নিলেন ফের। দ্বিতীকে দ্রুতই বলে উঠলেন,
“ শোন দ্বিতী, সাক্ষ্য তোর কথা কান পেতে শুনছিল না আম্মু। ও টেবিলেই বসা ছিল। ফোনটাই লাউড স্পিকার দেওয়া ছিল। তাই শুনেছে। ”
দ্বিতী শুনল। উত্তর শুনে খুশি হলো না সে। দ্রুতই বলে উঠল,
” ছেলের হয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছো সাজি আম্মু? ”
“ আরেহ নাহ। সত্যিই বোকা। তুই একটু ভাব আম্মু। ভেবে মত জানা হুহ? ”
দ্বিতী তীব্র বিরোধীতা দেখি দ্রুত বলল,
“ মত জানানোর কি আছে সাজি আম্মু ? ভার্সিটি লাইফ শেষ হওয়া অব্দি মত নাই থাকবে সাজি আম্মু। উনি আমার টিচার, আমি উনার স্টুডেন্ট। আপাতত টিচারকে অন্য কোন নজরে দেখতে চাই না। এখন রাখি হুহ? ভালো থেকো সাজি আম্মু। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতী ফোন রাখল। অপর দিকে সাজিয়া আফরোজ চাইলেন ফোনের দিকে। না বলে দিল? ছোটশ্বাস ফেলে ফোনটা একপাশে রেখেই সাক্ষ্যকে বললেন,
“ না বলে দিল। তোরা দুটোই কেমন জানি। অদ্ভুত! একটা তুই, আরেকটা দ্বিতী। এমন জানলে বিয়েই দিতাম না।”
সাক্ষ্যর মুখ থমথমে। বেশি উড়ছে মেয়েটা। একটু বেশিই উড়ছে। আকদ হওয়া বরকে এত ইগ্নোর করার সাহস হয় কি করে? সাক্ষ্য ওভাবেই বলল,
“ তোমার বান্ধবীর মেয়ে কি আমাকে রিফিউজড করল আম্মু? আনুষ্ঠানিক বিয়েতে না করে কি বুঝাচ্ছে? আমি উনাকে বিয়ে করতে খুব করে চাইছি? ”
সাজিয়া আফরোজ ফোন করেও বিপাকে পড়লেন। ঝামেলা কমার বদলে বোধহয় বাড়ছেই। এই যে, দুইজনের সমস্যা কমাবে ভাবল অথচ দুইজনই আরও দ্বিগুণ ভাবে বেঁকে বসে আছে। সাক্ষ্যকে শান্ত রাখার জন্য বললেন,
“ আরেহ নাহ নাহ। রিফিউজড কেন করবে? বলল তো ভার্সিটির পর করবে বিয়ে। ”
সাক্ষ্যর মুখচোখ আরো গম্ভীর। আরো থমথমে। কেমন রাগ রাগ ভাব যেন। অতঃপর ওভাবেই যেতে যেতে পা বাড়িয়ে বলল,
“ এটা রিফিউজডই আম্মু। ”
সাজিয়া আফরোজ ডাকলেন পিছনে থেকে মুহূর্তেই
“ সাক্ষ্য…”
সাক্ষ্যর উত্তর এল না। ওর শুধু মাথায় এটাই ঘুরছে ওকে না বলেছে। ঐটুকু দ্বিতী তাকে না করেছে। মানা যায় এহেন কথা?
সাক্ষ্য কল দিল দ্বিতীকে। একবার, দুইার, তিনবার কল যাওয়ার পর দ্বিতী কল তুলল। আর ঠিক তখনই সর্বপ্রথম সাক্ষ্য বলে উঠল,
“ কয়বার রিফিউজড করছেন সাক্ষ্য এহসানকে? ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়। প্রথমেই এমন প্রশ্ন কেন? কপাল কুঁচকে বলল,
“ কয়বার? ”
গম্ভীর কন্ঠে ভেসে এল,
“ আপনি জানেন না? ”
“ আজব! কি করে জানব? ”
সাক্ষ্য থামল। তার ঠিক একটুখানিক পরই বলল,
“ দ্বিতী, আমাকে রিফিউজড করে পরে কিন্তু ভুগতে হবে আপনাকে। দেখে নিবেন। ”
“ কি আশ্চর্য! খালি রিফিউজড নিয়ে পড়ে আছেন।”
সাক্ষ্য ঠোঁট বাঁকাল এবারে কিঞ্চিৎ। বলল,
“ নেচে নেচে আকদ করেছেন, কবুল বলেছেন। সংসার করবেন না কেন? ”
দ্বিতীর ও মনে হলো এই প্রশ্নের জবাবে সে একটা চমৎকার উত্তর দিতে পারে। অন্তত উত্তরটা দিয়ে সে খুবই সুখ সুখ অনুভব করবে। তাই তো দ্রুত বলল,
“ আপনি আমার স্যার না? স্যারের দিকে তাকানোই যায় না, আবার সংসার করব? কিভাবে সম্ভব? ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকায়। বলে,
“ যেভাবে মায়ের বান্ধবীর ছেলের প্রেমে পড়া সম্ভব হয়েছে সেভাবেই। ”
দ্বিতী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“ অসম্ভব! আপনার সাথে একই রুমে থাকব? একই আলমারিতে জামাকাপড় রাখব? একই ড্রেসিং টেবিল ব্যবহার করব? একই বিছানাতে ঘুমাব? নির্ঘাত খুনা’খুণি হয়ে যাবে দেখবেন…”
“ তো? একই রুমে থাকাটাই প্রবলেম? এর জন্য সংসার করবে না মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম? ”
“ প্রবলেম না? আপনার সাথে একই রুমে থাকা যাবে না। ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ কেন? ”
“ সমস্যা। ”
সাক্ষ্য হাসল বোধহয় এবারে। বলল,
“ যেমন? ”
“ সহ্য করতে পারি না আপনাকে আমি। এটাই প্রবলেম। ”
“ তাহলে সহ্য করে নিন। আপনি চাইলে এক রুমে থাকাটাও প্র্যাকটিস করে নিতে পারি, যাতে খু”নাখু’নি নাহয়। ”
দ্বিতী তবুও মানল না। কাটকাট গলায় বলল,
“ তবুও হবে না। আমি সংসার টংসার করব না আপাতত আপনার সাথে।”
“ কিন্তু করতে হবে। রুমে থাকা এটাই প্রবলেম তাই না মিসেস সাক্ষ্য এহসান? সো উই ক্যান ট্রাই দিস ফার্স্ট, রাইট? ”
দ্বিতী মুহুর্তেই গলা উঁচাল। বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ১২
“ আমার আম্মু, আপনার আম্মু অকালে সন্তান হারা হবে? এটাই চান?”
সাক্ষ্য ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল কেমন। বলল,
“ অকালে অন্য কিছু হতে পারে। লাইক, দাদী, নানী… ”
দ্বিতী শুনল। শুনেই মাথায় দপাদপ রাগ নিয়ে বলল,
“ টিচার হয়ে কয়জন স্টুডেন্টের সাথে ফ্লার্ট করেন রোজ? ফ্লার্টিং লেভেল তে খুব হাই। এভাবেই মেয়ে পটান হুহ? ”
