Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 27

Naar e Ishq part 27

Naar e Ishq part 27
তুরঙ্গনা

সুহিনের চেতনার চারপাশটা যখন নিথর, নিস্তব্ধ এক মায়াজালে রমণীর তনু-মন আবদ্ধ, ঠিক তখনই অতর্কিত এক হেঁচকা টানে তার সংবিৎ ফিরল। হৃদপিণ্ডটা যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সুহিনের। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিমরা তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। নিমরার চোখেমুখে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো দাউদাউ করা রাগ আর কণ্ঠে চাপা উদ্বেগের সংমিশ্রণ।

—”কিরে তুই! তুই এমন কেন? এমনিতেই চলতে ফিরতে সব ভুলিয়ে ভক্করচক্কর খাস আর একটু আগে কিছু না বলেই এখানে চলে এসেছিস…!”
নিমরা কথা বলতে বলতে হাপিয়ে উঠল। এই মেয়ের পিছু ছুটতে গিয়ে তার হাল নাজেহাল।
“তুই মাথা খাবি আমার। জানিস তোর পিছু ছুটতে গিয়ে আমার কি অবস্থা হয়েছে! মাঝরাতে কোথাও হারিয়ে গেলে দানিয়েল ভাই আমার কি করতো জানিস তুই? চল এখন বাড়ি চল!”
সুহিন কোনো জবাব দেবার আগেই, নিমরা তার হাত ধরে আশেপাশে না তাকিয়ে টানতে টানতেই বাড়ি ফেরার রাস্তার দিকে এগোতে লাগল।
—“নিমরা আমার কথা শোন, আমি এখানে….’
সুহিন কোনো প্রত্যুত্তর করার সুযোগটুকুও পেল না। নিমরা তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে অন্ধের মতো টানতে টানতে বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সুহিন অসহায়ভাবে বারকয়েক পেছনে ফিরে তাকাল। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় কেকে’-র সেই অন্ধকার ও রহস্যময় অবয়বটি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। তার মনে এক বিষণ্ণ ঝড় বইছে, অথচ সে নিমরাকে থামানোর কোনো পথ পেল না। নিঃশব্দ আর্তনাদ বুকে চেপেই সে নিমরার দ্রুতগতির পদচারণার সঙ্গী হলো।

—‘কেকে!’,রমণীর উৎফুল্ল কন্ঠস্বর।
রোজি কেকে’কে জড়িয়ে ধরামাত্রই, কেকে-র কপালে কিঞ্চিৎ বিরক্তির ছাপ পড়ল। শান্তিতে দুটো মিনিট একা থাকার জো নেই। তার উপর এই মেয়ের হুটহাট এতো সখ্যতা কিংবা অযাচিত ঘনিষ্ঠতা তাকে বরাবরই কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
কেকে তার আঙুলের ডগায় ধরা জ্বলন্ত সিগারেটটা, সাবধানতায় সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। বরং অত্যন্ত সুনিপুণ নির্লিপ্ততায় সেটি রোজির ফর্সা হাতের ত্বকে ছুঁইয়ে দিল।
আকস্মিক দহনের যন্ত্রণায় রোজি আর্তনাদ করে ছিটকে সরে গেল। বিস্ময় আর ব্যথায় বিমূঢ় রোজি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই কেকে নির্বিকার গলায় বলে উঠল,
“সরি,বাট নট সরি ফর দ্যাট! তোমার উচিত ছিল দেখেশুনে পদক্ষেপ নেওয়া।”
রোজি তার কথা বুঝল না। তার আগেই কেকে সিগারেটের অবশিষ্টাংশে শেষবারের মতো টান দিয়ে, বাকিটা রাস্তায় ফেলে দিল; জুতোর তলায় পিষে ফেলল নিস্পৃহে। রোজি সবটাই চেয়ে চেয়ে দেখল। যথারীতি তার এমন অদ্ভুত ভাবগম্ভীর্য দেখে সে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল এই ভেবে যে, কেকে হয়তো তার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্যই ঐ রুক্ষ সরি’টা বলেছে।
তপ্ত সিগারেটের ছোঁয়ায় নিজের হাতের লালচে ক্ষ তর দিকে চেয়ে রোজি ভারী শ্বাস ফেলল। বরাবরের মতো এই কনসার্টেও সে স্টেজের সম্মূখেই পুরোটা সময় উপস্থিত ছিল। কনসার্ট শেষ হতেই কেকে’র খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে; পুরো টিম যেখানে একত্রে যেখানে কেকে কোথায় যেন ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কেকে আর নতুন করে কোনো সিগারেট ধরাল না। তার হাতের ব্ল্যাক মেটাল লাইটারটা অবিরাম ‘ক্লিক-ক্ল্যাক’ শব্দে জ্বলছে আর নিভছে। তার এই নিস্তব্ধ গাম্ভীর্য সহ্য করতে না পেরে রোজি জিজ্ঞেস করল,
“বাড়ি ফিরবে কখন?”

—“তুমি ওদের সাথে চলে গেলেই পারতে।”,কেকের কাটকাট জবাব। রোজি হতাশার ভঙ্গিতে আবারও শুধালো,
“আমি তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছি কেকে! বাড়ি ফিরবে না?”
—“ফিরতে দেরি হবে।”
—“এখন মধ্যরাত! রোম থেকে মিলানে পৌছাতেই তো ঘন্টা ছয়েক-এর মতো লেগে যাবে।”
রোজির কথা শেষ হওয়ামাত্রই কেকে বলল,
—“ভোর রাতে ফিরব।”
রোজি যুক্তিসঙ্গত তাগাদা দিল।অথচ কেকের শান্ত-সরু দৃষ্টি কেবল তার হাতের লাইটারের ওপর নিবদ্ধ। চুলগুলো এলোমেলো, অবিন্যস্ত রূপে ঝাঁকালো।তার এলোমেলো কালো চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে; ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তাকে আরও গম্ভীর ও দুর্ভেদ্য দেখাচ্ছে।
শুরু হতেই এমন নির্লিপ্ত ভাবমূর্তিতে রোজির ধৈর্যের বাঁধ এবার ভাঙল,
“তুমি এমন কেনো কেকে?”

—“আমি এমনই!”
—“কেনো? কেনো তুমি এমন? আর সবার মতো হতে ক্ষতি কি?”
রোজির কন্ঠস্বরে অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। অথচ কেকে-র ঠোঁটের কোণে দেখা মিলল এক চিলতে বিদ্রুপাত্মক তির্যক হাসি। সে গুরুগমম্ভীর হাস্কি স্বরে অকপটে বলল,
—”বিকজ আই’ম নট লাইক আদারস্। কেকে হ্যাজ অলওয়েজ বিন অ্যাপার্ট ফ্রম দ্য ফা কিং ওয়ার্ল্ড।”
(কারণ আমি আর বাকিদের মতোই নই৷ কেকে সবসময়ই সবার চেয়ে আলাদা)
কেকে থেমে আবারও শান্ত স্বরে বলল,
—”এভরি পারসন’স স্টোরি ইজ ডিফারেন্ট, অ্যান্ড নো ওয়ানস্ এভার ফা কিং ম্যাচেস। সো হোয়াই দ্য হেল শুড আই ট্রাই টু বি লাইক এনিওয়ান এলস্?”
(প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের গল্প ভিন্ন, কারোর সাথে কারোরই মেলে না। তাহলে আমি কেনো বাকিদের মতো হতে যাবো?)
রোজির বলার মতো আর কিছু রইল না। সে থমকে দাড়াল। একটা মানুষ এমন উদ্ভট হয় কি করে! সমাজ, যুক্তি-তর্ক,নিয়মনীতিবিহীন আশ্চর্যময় এক চরিত্র! কি করে যে সে এই উদ্ভট একপিসকেই ভালোবেসেছিল কে জানে। এখন দিনে-রাতে প্রতিনিয়ত জ্যান্ত ম’রতে হচ্ছে তাকে। না কেকের সঙ্গ ছাড়তে পারছে,আর না কেকে’কে নিজের করে না পেয়ে শান্তিমতো বাঁচতে পারছে।
রোজির এসকল ভাবনার মাঝেই কেকে হঠাৎ তার হাতের লাইটারের শব্দ থামিয়ে দিল। মুখ তুলে তাকাল নির্লিপ্তে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অথচ কেবল শান্ত-শীতল অন্ধকার ঐ দুটো চোখভরে। কেকে দুদন্ড স্থির দৃষ্টিতে রোজির দিকে তাকিয়ে থাকার পর, স্পষ্ট গলায় বলে উঠল,
“তুমি ভুল মানুষের পেছনে ছুটছো৷ আমার কাছে তুমি কখনোই কোনো নিশ্চয়তা পাবে না৷ তাই ভালো হয় যদি তুমি সময় থাকতেই বুঝে যাও, তোমার জন্য কোনটা বেশি পারফেক্ট! ”

রাত আনুমানিক একটা। রোমের নির্জন রাস্তাঘাট পেরিয়ে নিমরা আর সুহিন অবশেষে তাদের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছাল। চারপাশ তখন নিঝুম মৌনতায় নিমগ্ন। কলিং বেলের তীক্ষ্ণ শব্দে সেই স্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। কপাট খুলতেই দেখা মিলল দানিয়েলের। পরনে তার ঘরোয়া টি-শার্ট আর প্যান্ট, চোখেমুখে কিছুটা ক্লান্তির ছাপ থাকলেও দুজনকে দেখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
​দানিয়েল ডাইনিং টেবিলের দিকে ইশারা করে সহাস্যে বলল,
“আমি তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ভেবেছিলাম আর মিনিট পাঁচেক দেখে ফোন দেব। ভালোই হলো যে তোমরা চলে এসেছ। হাত-মুখ ধুয়ে নাও, আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।”
​সুহিন তখনও সেই ঘোরের মধ্যে। বিষণ্ণতা আর একরাশ ক্লান্তি তাকে ঘিরে রেখেছে। সে ম্লান মুখে দানিয়েলের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আপনি এখনো জেগে আছেন? আমাদের জন্য অপেক্ষা না করলেও হতো।”
দানিয়েলের অভিজ্ঞ চোখে সুহিনের এই মনমরা ভাবটুকু এড়াল না। তবে সে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করে পরিবেশকে ভারী করতে চাইল না। নিমরা পাশেই ছিল, সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফায় ব্যাগটা নামিয়ে রাখতে রাখতে কৃত্রিম ক্ষোভ নিয়ে বলে উঠল,

“আরে ভাইয়া, এই মেয়ে তো আজ আমায় মে-রেই ফেলত! যা ভিড় আর যা উন্মাদনা—তার ওপর সুহিনের খামখেয়ালি তো আছেই।”
—“কেনো কি হয়েছে?” দানিয়েল উৎসুক মুখে জানতে চায়। নিমরা সুহিনের দিকে তাকিয়ে হুট করে থেমে যায়। চাপা স্বরে বলে,
“না,ও কিছু না।”
নিমরার এরূপ বিহেভিয়ারের দানিয়েল বুঝে যায় কিছু একটা তো হয়েছে। কিন্তু সে এই মূহুর্তে সেসব নিয়ে আলোচনা করার নূন্যতম প্রয়োজনবোধ করল না।
দানিয়েল প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
“তা তোমাদের কনসার্ট কেমন হলো? সব ঠিকঠাক তো?”
​সুহিন কেবল যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, ভালো।”
দানিয়েল তখন খাবারের তাড়াহুড়ো করছিল, আর সেই ব্যস্ততায় নিমরা কেকে-কে দেখার বিষয়টি আপাতত ভুলে গেল। পেটে খিদে আর সামনের সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণে নিমরার মন তখন অন্য সব চিন্তা থেকে বিচ্যুত।
​কিছুক্ষণ পর তিনজন ডাইনিং টেবিলে বসল। দানিয়েল নিজের হাতে রান্না করেছে; বেশিরভাগ সময় সে নিজেই রাঁধে। ছোট বোন কিংবা নিজের প্রিয় বউপাখিকে শুধু শুধু এসব কাজে খাটানোর মতো ঘোর অন্যায় সে কখনোই করতে চায়না। ফলে নিমরা বা সুহিন চেয়েও কিছু করতে পারে না।আর এভাবেই আরাম-আয়েশ দুজনের দিন কেটে যাশ।

ধোঁয়া ওঠা গরম পাস্তা,রিসোত্তো আর সালাদ পরিবেশন করতে করতে তারা কনসার্টের ভিড় নিয়ে মজার সব গল্প শুরু করল। দানিয়েলের বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা আর নিমরার সাবলীল বাচালতা টেবিলের গুমোট ভাবটা ক্রমশই কাটতে শুরু করল। নিমরা তখন হাত-পা নেড়ে বর্ণনা দিচ্ছিল কীভাবে কনসার্টের ভিড়ের মধ্যে সবাই বাঁদর-উন্মাদের মতো লাফালাফি করছিল,কিভাবে কনসার্ট শেষে সুহিন হুট করেই দৌড়ে পালালো, আর সে তাকে খুজতে খুঁজতে দিশেহারা হলো—সবটাই সে বিরক্তি-ঠাট্টা নিয়েই বলে গেল। তার অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে মুখ ভেঙ্গিয়ে বলা অভিব্যক্তিতে দানিয়েল নিজে না হেসেও পারল না।
​দুজনের অকৃত্রিম হাসি আর খুনসুটিতে সুহিনও আর নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পারল না। তার মনের ভেতরে জমে থাকা কালো মেঘগুলো মুহূর্তের জন্য সরে গেল। এভাবেই খানিকক্ষণ বাদে দানিয়েলের একটি রসিকতায় সুহিন খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না কোনো দীর্ঘশ্বাসের রেশ।
​সুহিনের ঠোঁটের কোণে সেই অমলিন হাসি দেখে দানিয়েলের অন্তরাল অচিরেই প্রশান্তিতে ভরে উঠল। সে একনাগাড়ে তার দিকে চেয়ে রইল। একখান তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে দানিয়েল নিজের মনেই অস্ফুট স্বরে আওড়াল,
​”এভাবেই সবসময় হাসিখুশি থাকো আমার বউপাখি! তোমার অধরের এই এক চিলতে হাসির জন্যই তো আমার পৃথিবীর সব আয়োজন।”

Naar e Ishq part 26

স্নিগ্ধ আলোকছটায় সুহিন ক্ষণিকের তরে হলেও তার জীবনের সকল জটিল সমীকরণ আর অপ্রাপ্তির দহন ভুলে। অথচ সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে, তার জীবনের এক দিগন্তে যেমন এক অন্ধকার মায়াজাল নিঃশব্দে বিস্তার লাভ করছে, ঠিক অন্য দিগন্তে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক দুর্ভেদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় অটুট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টির সীমানায় পেরিয়ে মধ্যরাতে রমণীকে ঘিরে অদ্ভুত এই বৈপরীত্য আর মিশ্র অনুভূতির আলপনা এঁকে ধীরলয়ে এগিয়ে চলল সমাপ্তির দিকে!

Naar e Ishq part 28