Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 26

Naar e Ishq part 26

Naar e Ishq part 26
তুরঙ্গনা

রোমের গোধূলি প্রান্তর ক্রমশই রক্তিম আভা ছেড়ে ফিকে নীলচে অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। ভিলা বোরঘিজের দীর্ঘকায় পাইন আর ওক গাছের ছায়াগুলো যেন কোনো এক বিষণ্ণ মহাকাব্যের অবয়ব ধারণ করে মাটির ওপর দীর্ঘতর হচ্ছিল।
ভুলের আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া স্মৃতিগুলো যখন সুহিনকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলছিল, ঠিক তখনই ঘাসের ওপর পরিচিত জুতো আর ঝরাপাতার মচমচে শব্দে তার তন্ময়তা ভাঙল। দানিয়েল আর নিমরা ফিরছে।
​দানিয়েলের পরনে একটি কালো উলের লংকোট—যা তার দীর্ঘ দেহকাঠামোয় খানিক গাম্ভীর্যপূর্ণ আভিজাত্য এনে দিয়েছে। তার কাঁধে ঝোলানো ল্যাপটপ ব্যাগ আর হাতে খাবারের কিছু প্যাকেট।
অন্যদিকে নিমরা পরণে গাঢ় খয়েরি রঙের একটি ওভারকোট, গলায় জড়ানো ধূসর পশমি মাফলার। কাঁধ অব্দি চুলগুলো পরিমার্জিত রূপে গোছানো। তাদের দুজনের চোখেমুখেই খানিক দায়িত্ববোধের ছাপ স্পষ্ট; যে দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে কেবল সুহিন।
​নিমরা সুহিনের পাশে বসে তার হাতে একটি উষ্ণ কাগজের কাপ তুলে দিয়ে বলল,

“এই নে তোর হট চকোলেট।”
​সুহিন ম্লান হেসে কাপটি হাতে নিল। দানিয়েল সুহিনের ঠিক উল্টো দিকে বসল। তার তীক্ষ্ণ এবং বিচলিত দৃষ্টি সুহিনের ফ্যাকাসে মুখে নিবদ্ধ। সে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“বউপাখি! রোম সৌন্দর্যের শহর, বিষণ্ণতার নয়। তুমি নিজেকে এভাবে গুটিয়ে রাখলে এই শহরের সৌন্দর্য তোমার বিষন্নতাকে গ্রাস করতে পারবে না। নিজেকে একটু সময় দাও, একটু স্বাভাবিক হতে চেষ্টা কর।”
​সুহিন কোনো উত্তর না দিয়ে কফির কাপে চুমুক দিল। তিনজনে মিলে পার্কের ল্যাম্পপোস্ট ঘেরা পথ ধরে ধীরপায়ে হাঁটতে শুরু করল। রোমের সন্ধ্যা তখন পুরোপুরি জেঁকে বসেছে; চারপাশের প্রাচীন স্থাপত্যগুলো কৃত্রিম আলোয় ঝলমল করছে। হাঁটতে হাঁটতে নিমরা হঠাৎ উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল,
​”হেই সুহিন, একটা খবর আছে। দুদিন বাদে রোমের একটা ফেমাস অডিটোরিয়ামে নাকি বিশাল এক মিউজিক কনসার্ট হতে যাচ্ছে।মিলান থেকে ইতালির নামকরা একটা মিউজিক ব্যান্ড আসবে। তুই যদি বলিস তবে… আমি ভাবছি আমরা তিনজন মিলে যাব। টিকিটগুলো এখনই বুক করে ফেললে ভালো হয়, পরে আর পাওয়া যাবে না।”
​সুহিনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা খেলে গেল। কোলাহল আর মানুষের ভিড় এখন তার কাছে এক ধরণের আতঙ্ক। সে নিচু স্বরে বলতে চাইল,

“নিমরা, আমি আসলে ঠিক…”
​তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই দানিয়েল বাধা দিয়ে বলল,
“নিমরার প্রস্তাবটা মন্দ নয়। এই মূহুর্তে তোমার মুড ভালো করা বেশি প্রয়োজন। তবে একটা সমস্যা আছে, আমি হয়তো তোমাদের সাথে যেতে পারব না। ভার্সিটিতে আমার রিসার্চের একটা বড় অংশ বাকি, প্রফেসর আগামী সপ্তাহেই সেটা সাবমিট করতে বলেছেন। আমি চাইলেও এটা আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব না। এখন বরং তোমরা দুজন যাও, আমি টিকিট বুক করে দিচ্ছি।”
​নিমরা কিছুটা হতাশ হয়ে মুখ বাঁকাল,
“তুমি না থাকলে মজা হবে না ভাই। কিন্তু কাজ থাকলে তো আর কিছু করার নেই।…. কিন্তু সুহিন? তুই তো যাবি? তুই প্লিজ না করিস না, এখানে এসে ভার্সিটির চক্করে আর কোথাও যেতে পারছি না।”
সুহিন দেখল দানিয়েল আর নিমরা দুজনেই তার উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। দানিয়েলের চোখে খানিক নীরব অনুরোধ—সে চায় সুহিন যেন চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসে। দুজনের অকৃত্রিম প্রচেষ্টার অবজ্ঞা করার শক্তি সুহিনের নেই। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
​”আচ্ছা ঠিক আছে, আমি যাব।”
​নিমরা খুশিতে সুহিনকে জড়িয়ে ধরল। পুরোপুরি রাত নেমে আসার পূর্বেই তিনজনে নিজেদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। একটা এ্যাপার্টমেন্টের একপাশে দানিয়েল আলাদা ভাবে থাকে,অন্যটাতে সুহিন আর নিমরদ একত্রে। যদিও কিছুদিন পর সুহিন ইতালি হতে চলেই যাবে।

দুই দিন পরের সন্ধ্যা। রোমের ঐতিহাসিক সিরকো মাসিমো পরিণত হয়েছে এক তপ্ত রণক্ষেত্রে। ইতালির অন্যতম বৃহত এই উন্মুক্ত প্রান্তরে আজ তিল ধারণের জায়গা নেই। ইউরোপের বর্তমান সেনসেশন, ইতালির সবচাইতে বড় রক ব্যান্ড ব্ল্যাকভেইন এর কনসার্টকে ঘিরে চারদিকে সাজ সাজ রব। পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে কালো, ধূসর আর নীলচে আলোর মায়াবী কারসাজি; যা সম্পূর্ণ জায়গটাকে কিছুটা ভুতুরে, রহস্যময় কিংবা গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করেছে।
​কনসার্ট শুরু হয়েছে বেশ আগেই। সুহিনের দ্বিধাদ্বন্দের মাঝে তৈরি হতে হতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। যার ফলে নিমরা তাকে নিয়ে যখন ভেন্যুতে পৌঁছাল, তখন ভিড় সামলে ভেতরে ঢোকাই দায়। তারা ফার্স্ট ক্লাস টিকিট পেলেও সামনের সারিতে যাওয়ার পথ তখন রুদ্ধ। অগত্য পেছনে দাঁড়িয়েই বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকাতে হলো তাদের।
স্ক্রিনে প্রথম দৃশ্যটি ভেসে উঠতেই সুহিন পাথরের মতো থমকে গেল। নীল-কালো রঙের একটি গিটার নিয়ে স্টেজের ওপর উন্মাদের মতো লাফাতে থাকা দীর্ঘদেহী মানুষটাকে সে খুব ভালো করে চেনে। তার বিস্ময়ের রেশ কাটতে না কাটতেই পাশ থেকে নিমরা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,

​”এই সুহিন! এই বাদরের মতো লাফাতে থাকা লোকটাকে আমি কোথায় যেন দেখেছি। কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছি না…”
​সুহিন কেবল অস্ফুট স্বরে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল,
“সাদ ভাইয়া।”
​নিমরা হড়বড়িয়ে বলে উঠল,
“কী! তুই একে কীভাবে চিনিস? আমরা তো এই শহরে দুদিনও হলো না এসেছি…”
নিমরা বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে ভাবল হয়তো আন্তর্জাতিক ব্যান্ড তারকা হিসেবেই সুহিন চেনে; যেহেতু চারপাশে এতো সমাগম দেখেই আন্দাজ করা যায় ব্ল্যাকভেইন ইতালির অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মিউজিক ব্যান্ড। কিন্তু সাদ নামটা তো কেমন যে বেশি দেশি ভাইব দিচ্ছে, আবার সুহিন তাকে ভাইয়া কেন বলছে? নিমরার মনে সন্দেহের দানা বাঁধার আগেই সুহিন শুকনো গলায় বলল,

​”উনার বন্ধু ইনি।”
​নিমরা ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কার কথা বলছিস তুই?”
সুহিন কিছুটা ইতস্তত করে নিচু স্বরে আওড়াল,
“উনি… মানে কেকে।”
​”হোয়াট! কেকে এখানে?” নিমরার বিস্ময় যেন আকাশ স্পর্শ করল।
​সুহিনের দৃষ্টি তখন ডিজিটাল স্ক্রিনে স্থির হয়ে আছে। রকস্টার বেশে চারজন সদস্যকে দেখা যাচ্ছে, যাদের প্রত্যেককেই সুহিন চেনে। কিন্তু মনের গহীন হতে যার খোঁজ সে এক বছর ধরে চালাচ্ছে, তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সুহিনের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি দলা পাকিয়ে এল।
‘আশ্চর্য! যাকে সে বিয়ে করেছে, তার সম্পর্কে সে নূত্যতমও ঠিকঠাক কিছু জানে না। তার আন্দাজ যদি ঠিক হয়, উনি যদি সত্যিই এই ব্যান্ডের লিডার হয়, তবে সেই কাঙ্খিত ব্যক্তিটি কোথায়?’
​এরিমধ্যে হঠাৎ চারপাশ বিকট শব্দে কেঁপে উঠল; সুহিনের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। স্টেজ ছেয়ে গেল ফায়ারওয়ার্কস আর কৃত্রিম ধোঁয়ায় হাজার হাজার মানুষের চিৎকার ধ্বনিত হলো কেবল এক নামে—
“কেকে! কেকে! ব্যাড ওল্ফ! ব্যাড ওল্ফ!”
​সুহিনের হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। ধোঁয়ার আড়াল চিরে স্টেজের মাঝখানে এক তীব্র, উন্মত্ত কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো,

​”Baby, I’m preying on you tonight
Hunt you down, eat you alive
Just like animals, animals, like animals, —mals
Maybe you think that you can hide
I can smell your scent from miles
Just like animals, animals, like animals, —mals
Baby, I’m… (Hey)”
নিমরা চোখ-মুখ খিঁচে ফেলল। এমন গানের প্রতিটি পঙক্তিতে গা-পিত্তি সব যেন উগড়ে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হলো তার। অথচ চারপাশের উন্মাদনার তিল-বিন্দু কমতি নেই।
‘So what you trying to do to me? (Hey)
It’s like we can’t stop, we’re enemies (Hey)
But we get along when I’m inside you, yeah (Hey)
You’re like a drug that’s killing me (Hey)
I cut you out entirely (Hey)
But I get so high when I’m inside you….’

​অন্যদিকে কৃত্রিম ধোঁয়া কাটিয়ে, ক্রমশই স্ক্রিনে বড় হয়ে ফুটে উঠল সেই কাঙ্ক্ষিত অবয়ব। সাদা টি-শার্টের সাথে কালো লেদার জ্যাকেট; ‘ফেরারি’ পাগল উন্মাদ মানবটার জ্যাকেটের বা’পাশে ফুটে তারই কালচে লাল-সাদা রঙের লোগো। এছাড়া পরণে কালো প্যান্ট, কালো বুট। কাঁধ ছুঁয়ে থাকা ওল্ফ-কাটের কুচকুচে কালো চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে কপাল আর ঘাড় ঢেকে রেখেছে। চোখে সেই চিরচেনা তীক্ষ্ণ-শীতল গাম্ভীর্য; যেন কোনো এক মৃতপ্রায় জীবন্ত আত্মার চিরস্থির চাহনি তা।
গলার ব্ল্যাক মেটালের চেইনে ‘KK’ অক্ষরটি জ্বলজ্বল করছে। তবে সুহিনের নজর আটকে গেল তার বাম হাতের অনামিকায় থাকা ব্ল্যাক মেটালের রিংটির ওপর।
​রিং তো কেকে আগেও পরত, কিন্তু ঠিক ওই আঙুলেই কেন? এটা কি নিছকই ফ্যাশন নাকি অন্যকিছু? না চেয়েও সুহিনের অন্তরাল অজানা এক সংশয়ে কম্পিত হলো।
সুহিন নিস্পৃহ দৃষ্টিতে নিজের শূন্য হাতের দিকে তাকাল। কেকে চলে যাওয়ার পর সে কেকের দেওয়া সেই ব্ল্যাক ডায়মন্ডের আংটিটা আর কখনো পরেনি; কেবল মাঝেমধ্যে নির্জনে নেড়েচেড়ে দেখেছে।
​সুহিনের এসকল ভাবনার মধ্যেই কেকের সুর আরও কিছুটা হিং স্র-উন্মুক্ত হয়ে উঠল।সে উন্মাদের মতো গাইতে শুরু করল,

​”I wanna be your slave, I wanna be your master
I wanna make your heart beat run a little faster!…’…
​চারপাশে মানুষ উগ্র হয়ে উঠলেও সুহিনের প্রচণ্ড অস্বস্তি হতে লাগল। এই কণ্ঠস্বর, এই ব্যক্তিত্ব তাকে নতুন করে এক গোলকধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে। নিমরা কানে হাত চাপা দিয়ে বলে উঠল,
“ছিঃ ইয়ার! এসব কী গান আর কী লিরিক্স! এগুলোও নাকি আবার এই কেকের সিগনেচার গান। একটু আশেপাশে চেয়ে দেখ, সব’কটা উন্মাদ হয়ে লাফাচ্ছে। কোন জাহান্নামে চলে এলাম কে জানে।”
​নিমরা দ্রুততর এখান থেকে ফিরতে চাইলেও ভিড়ের কারণে সম্ভব হলো না। ওদিকে কেকে কানে ব্লুটুথ ডিভাইস আর হাতে মাইক্রোফোন শক্ত করে চেপে ধরে গেয়েই চলেছে। তার সাথে সাথে ব্যান্ডের বাদবাকি সদস্য কিংবা দর্শকসারী তো রয়েছেই। সবক’টার শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি যেন একেকটা বন্য উন্মাদনার বহিঃপ্রকাশ। কিছুক্ষণ পর উন্মত্ততা কিছুটা কমলে কেকে গাইতে শুরু করল,

‘….Cross my heart and hope to die
Welcome to my darkside!’
​একের পর এক গান চলতে থাকল। তবে ধীরে ধীরে কিছু ইংরেজি আর রোমান গানের পর, ‘বাড়ি চল,বাড়ি চল’ বলে চিল্লাতে থাকা নিমরাও হঠাৎ প্রশংসা করে বসল,
“উমমম…এই বান্দা সাইকো হলেও গান দারুণ গায়। এমনি এমনি এমন ইন্টারন্যাশনাল ব্যান্ডের লিডার হয়নি।”
​রাত বাড়ার সাথে সাথে গানের মেজাজ বদলে গেল। রকস্টার কেকে’র কন্ঠস্বর হতে হুট করেই নির্গত হলো,
‘কিউ ইতনা হ্যায় মুঝসে হ্যায় খাফা তু
​কি মেনে অ্যায়সি ক্যায়া খাতা
​কিউ ইতনা হ্যায় মুঝসে হ্যায় জুদা তু
​ক্যায়া তেরে দিল মে হ্যায় বাতা
​ম্যায় চাহু তুঝকো, মেরি জান বেপনাহ
​ফিদা হুঁ তুঝপে,মেরি জান বেপনাহ___
​Whoa-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh.
Whoa-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh.
Whoa-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh________’

ব্ল্যাকভেইনের পুরো পাঁচজন সদস্য একত্রে কন্ঠস্বর হতে সুর তুলে গেয়ে উঠল। গানের প্রতিটি লিরিক্স সুহিন অনুভব করল তার অস্থি-মজ্জায়। যেন এই সুর কেবল তার জন্যই সাজানো। এরই মাঝে কেকের কণ্ঠস্বর থেকে আবারও বাংলায় ঝরে পড়ল তিক্ত কিছু পঙক্তি,
​”তোর প্রেমেতে অন্ধ হলাম, কি দোষ দিবি তাতে?
বন্ধু তোরে খুঁজে বেড়াই,
সকাল, দুপুর, রাতে_______’
ইতালিতে দেশী কালচারালের পাশাপাশি নানান বিদেশী সংস্কৃতিরও বেশ প্রচলন রয়েছে। যথারীতি জাতিভেদে মানুষ সকল ভাষার প্রতি অবগত না রইলেও,ভিন্ন সংস্কৃতিকে নিজস্ব প্রেক্ষাপটে গ্রহণ করার এক দারুণ মানসিকতা তাদের মাঝে লক্ষ করা যায়।
​অন্যপ্রান্তের দৃশ্যপটে সুহিনের অন্তরালে ঘটে যায় দুর্বার প্রলয়। যে মানুষটিকে সে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছে বহুবার—সেই লক্ষেই যাকে এতোদিন হতে খুঁজে পেতে চাওয়া, আজ সে হাজার মাইল দূরে এক জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তারই ভাষায় হাহাকার করছে। আপাতদৃষ্টিতে নাজুক রমণীর মাথায় কেবল একটিই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে; এই মানুষটি কি সত্যিই তার সেই জানা-অজানার ধরাছোঁয়ার বাহিরের মানব কেকে? নাকি সে এক দুর্ভেদ্য অজানার রাজপুত্র, যাকে চেনার সাধ্য সুহিনের মতো সামান্য বন্দিনীর আজ অব্দি হয়নি।

কনসার্ট শেষে মধ্যরাতের রোম এক ক্লান্ত কোলাহলের শহরে রুপান্তর হয়েছে। রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় দীর্ঘ ছায়া ফেলছে ফিরতি জনতা। নিমরার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। এমনিতেই রগচটা মেয়ে সে; ভিড় আর উচ্চশব্দে তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে আছে।
কিন্তু পাশে হাঁটা সুহিন যেন এক অন্য জগতের বাসিন্দা। তার অন্তরালে বয়ে চলেছে এক অব্যক্ত বিষন্নতা; যা কনসার্টের প্রতিটি সুর আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিষণ্ণতার এক ভারী চাদর তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে।
​জনাকীর্ণ রাস্তার একপাশ ধরে তারা এগোচ্ছিল। মানুষের ধাক্কাধাক্কি আর অসংলগ্ন কথাবার্তার মাঝেও সুহিনের দৃষ্টি হঠাৎ আটকে গেল রাস্তার কিছুটা দূরে, ছায়াবৃত এক নির্জন কোণে। একটি কুচকুচে কালো ফেরারির সাথে গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘকায় পুরুষ। অন্ধকারে তার মুখাবয়ব অস্পষ্ট হলেও, আঙুলের ডগায় জ্বলতে থাকা সিগারেটের আগুনের লাল আভা আর ধোঁয়ার কুন্ডলী এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করেছে। লোকটার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, সেই এলোমেলো অথচ গম্ভীর অবয়ব সুহিনের হৃৎপিণ্ডে তীব্র এক আঘাত হানল।চেহেরা স্পষ্ট না হলেও, ব্যক্তির এলোমেলো ভাবগম্ভীর্যেই সুহিন ধরে নিল, এটাই তার সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি।
​সুহিনের মাথায় তত খেয়াল নেই, সে কেবল জানত, এই সুযোগ হারালে হয়তো আর কখনোই তাকে পাওয়া যাবে না। কোনো পরিণতির কথা না ভেবেই সে নিমরার দিকে তাকিয়ে দ্রুত গলায় বলল,
“নিমরা! তুই এখানে একটু দাঁড়া, আমি এখনই আসছি।”
নিমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুহিন ভিড় ঠেলে ঝড়ের গতিতে অন্ধকারের দিকে ছুটে চলল। পেছন থেকে নিমরার চিৎকার শোনা গেল,

“আরে কোথায় যাবি তুই? সুহিন! শোন!”
কিন্তু সুহিন তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাগে আর উদ্বেগে নিমরার কপাল কুঁচকে গেল; মাঝরাস্তায় সুহিনের এই খামখেয়ালি আচরণ তার অসহ্য লাগল।
​হাঁপাতে হাঁপাতে সুহিন যখন সেই নির্দিষ্ট জায়গাটায় পৌঁছাল, তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় লোকটাকে এখন আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ, এই তো কেকে। কোনো সিকিউরিটি নেই, কোনো চাকচিক্য নেই; স্রেফ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছে সে; শূন্যপানে ধোঁয়া উড়াচ্ছে নির্বিকার মনে।
জায়গাটা নিত্যন্তই জনসাধারণ৷ ফলে এখানে কেকের মতো ব্যক্তির সিকিউরিটি বিহীন থাকাটা একদমই কথা ছিল না। তবে কেকে তো কেকেই। সে কোথায় কারো নিয়মনীতিরধার ধরে! ইচ্ছে হয়েছে মধ্যরাতে দল-বল ছেড়ে খোলা রাস্তায় দাড়িয়ে সিগারেট খাবে,তাই সে খাচ্ছে।
এদিকে নাজুক রমণী সুহিন কিছুটা দ্বিধার তোপে কাপছে। কেকের দেখা পেয়ে ছুটে এলেও,তার মুখোমুখি হওয়ার কেনো যেন সাহস হচ্ছে না।আচ্ছা কেকে কি তাকে ক্ষমা করছে? করেনি হয়তো। হয়তো কেকে তার সেই একটি কথায় অনেক বেশি আঘাত পেয়েছিল, যার কারণে আজ অব্দি সে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, এই খোঁজটাও নেওয়ারও প্রয়োজন করেনি। সুহিন জানে না তাদের দুজনের মাঝে কে ভুল, কে ঠিক। তবে এই অসুস্থ সম্পর্কটার এবার একটা রফদফা হওয়া উচিত।

​সুহিন কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে রইল। নাকের ডগায় নেমে আসা চশমাটা কাঁধ দিয়ে ঠেলে সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল। আঙুলগুলো বাচ্চাদের ন্যায় কুঁকড়ে হাত মুঠো করে সে ভাবছিল কীভাবে এগিয়ে যাবে। কিন্তু তার ভাবনার জাল ছিঁড়ে গেল এক আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত দৃশ্যপটে।
​অন্ধকার চিঁড়ে হঠাৎ একটি লাল রঙের ঝকঝকে গাউন পরা রমণী ছুটে এল। কোনো কথা নেই, কোনো ভূমিকা নেই—সে সরাসরি কেকে-কে জাপটে জড়িয়ে ধরল। সুহিন নিজের চোখের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলল। ল্যাম্পপোস্টের ওই হলদেটে ক্ষীণ আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষের এমন নিবিড় অন্তরঙ্গতা নাজুক রমণীর অন্তারালে এক অজানা ঝড়ের সৃষ্ট করল।

​সুহিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সমস্ত চিন্তা আর আবেগ এক মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেল। কে এই রমণী? কেকের সাথে তার সম্পর্কই বা কী? তবে কি তার আশঙ্কাই সত্যি ছিল? কেকের হাতের ওই কালো মেটাল রিংটা তবে কোনো ফ্যাশন কিংবা স্টাইলের জন্য নয়, বরং অন্য কারো প্রতি তার অঙ্গীকারের প্রতীক?

Naar e Ishq part 25

এক বছর ধরে সুহিন যাকে খুঁজে পাবার জন্য প্রতিনিয়ত অপেক্ষার প্রহর গুনেছে, সে কি তবে অন্য কারো মায়াজালে নিজেকে সঁপে দিয়েছে? প্রশ্নের অতল গহ্বরে সুহিন নিজেকে আবিষ্কার করল এক নিঃস্ব মানবী হিসেবে। তার আলগোছে বাঁধা খোপাটা এই পর্যায়ে আলগা হয়ে খুলে পড়েছে। রাতের দমকা হাওয়ায় সেই কোমড় অব্দি ছোঁয়া বাদামী চুলগুলো অবিন্যস্তরূপে উঠছে। নিঝুম রাতের রোমান রাস্তায় দাড়িয়ে রমণীর নিস্পৃহ নীলচোখ দুটো কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষের দিকে—যে এখন অন্য এক বাহুডোরে আবদ্ধ।

Naar e Ishq part 27

1 COMMENT

Comments are closed.