Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 25

Naar e Ishq part 25

Naar e Ishq part 25
তুরঙ্গনা

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় লম্বার্ডি অঞ্চলের রাজধানী মিলান; দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। ভৌগোলিকভাবে আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এই শহরটি বিশ্ব ফ্যাশন, আধুনিক ডিজাইন এবং উচ্চতর প্রযুক্তিগত গবেষণার একটি প্রধান বৈশ্বিক হাব হিসেবে সারাবিশ্বে সমাদৃত। স্থাপত্যের দিক থেকে গথিক নিদর্শন দুয়োমো দি মিলানো কিংবা রেনেসাঁ যুগের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো শহরের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কালজয়ী শিল্পকর্ম ও লা স্কালা অপেরা হাউসের মতো সাংস্কৃতিক সম্পদ মিলানের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক গুরুত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়া উন্নত মেট্রো নেটওয়ার্ক, তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ইতালির প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জের উপস্থিতির কারণে মিলান ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী ও সুশৃঙ্খল মহানগরী হিসেবে বিবেচিত হয়।

মিলানের মূল জনপদ থেকে কিছুটা দূরে, যেথায় কোলাহল এসে থমকে দাঁড়িয়েছে গহীন নিস্তব্ধতায়—সেখানেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রকাণ্ড রাজপ্রাসাদসম অট্টালিকা।বিশাল এক ভূখণ্ডের ওপর নির্মিত এই বাড়িটির চারপাশ ঘিরে আছে মখমলের মতো মসৃণ সবুজ ঘাস আর অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ল্যান্ডস্কেপিং।
বাড়ির বিশালতা আর আভিজাত্যই বাইরের জগতকে স্পষ্টত বুঝিয়ে দেয়—এটি কোনো সাধারণ মানুষজনের আবাসস্থল নয়; মূল ফটকের কালো মার্বেলে রুপালি হরফে খোদাই করা একটি নামই তার প্রমাণ—‘ BLACKVANE EMPIRE’
বাড়ির স্থাপত্যশৈলীতে আধুনিকতার চরম উৎকর্ষ; ইন্টেরিয়র ডিজাইনের প্রধান বিশেষত্বই হলো কালো আর সাদার এক ধ্রুপদী সমন্বয়। দেয়াল থেকে শুরু করে আসবাবপত্র—সবখানেই এই গম্ভীর আভিজাত্য বজায় রাখা হয়েছে। তবে বাড়ির ভেতরে নির্দিষ্ট কিছু অংশে সদস্যদের পছন্দের রেশ ধরে নীল রঙের ছোঁয়াও রাখা হয়েছে; যা সেই গাম্ভীর্যের মাঝে এক হয়তো টুকরো স্নিগ্ধতা বিলিয়ে দেওয়ার মতোই।

বিশাল আর্ট স্টুডিওর নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসছিল রঙের আঁচড়ের মৃদু শব্দ। ঘরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ক্যানভাস, স্ট্যান্ড আর হরেক রকমের তুলি। সেই শৈল্পিক আবহের ঠিক মাঝখানে টুলে বসে আছে একজন বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী সুদর্শন। তার এক হাতে রঙের প্যালেট, অন্য হাতে সূক্ষ্ম কারুকাজের পেইন্টিং ব্রাশ। পরনে তার চিরচেনা সেই কালো আউটফিট—একটি ব্ল্যাক ফিটেড টি-শার্ট আর ট্রাউজার। সদ্য গোসল সেরে আসা যুবকটির ওল্ফ কাটের অবিন্যস্ত চুল থেকে তখনও চুইয়ে পড়ছে স্বচ্ছ জলকণা; যা তার ঘাড় ছুঁয়ে টি-শার্টের কালো কাপড়ে শুষে নিচ্ছে। কানে তার হেডফোন গোঁজা, বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক সত্তা।
​তার একপাশের ছোট টেবিলে রাখা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি, আর অন্যপাশে একটি কাঁচের বোলে রাখা তাজা ব্লু-বেরি। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই কেকে-র। সে তখন মগ্ন তার বিশাল ক্যানভাসের মায়াজালে। রঙের খেলায় ডুবে থেকে,হালকা মাথা দুলিয়ে শিস বাজাচ্ছে;কখনো বা অস্ফুটে হাস্কি-গম্ভীর স্বরে আপনমনেই গুনগুন করছে তার প্রিয় গানগুলোর মাঝে অন্যতম একটি,

‘If you like your coffee hot
Let me be your coffee pot
You call the shots, babe
I just wanna be yours______
Secrets I have held in my heart
Are harder to hide than I thought
Maybe I just wanna be yours
I wanna be yours, I wanna be yours
Wanna be yours________’

​ছবি আঁকা নয়, যেন এক উগ্র নেশায় বুঁদ হয়ে আছে সে। তুলি দিয়ে ক্যানভাসে রঙের প্রলেপ দেওয়ার ফাঁকে কখনো সে তুলিটি ক্যানভাসের ওপর আলতো করে রাখছে, আবার পরক্ষণেই কফির কাপে চুমুক দিয়ে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। কখনোবা একটি ব্লু-বেরি হাতের আঙুলে টস করে নিখুঁত নিশানায় মুখে পুরে দিচ্ছে। সবমিলিয়ে গুরুগম্ভীর আবহের মাঝেও প্রফুল্লতার বিশেষ এক আবরণ প্রতিফলিত হয়েছে তার মাঝে।
কেকে’র বলিষ্ঠ বাহু আর টি-শার্টের কিছু অংশে জলরঙের ছিটেফোঁটা লেগে গেছে, কিন্তু তাতে কেকে-র বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপনেই। বরং এই অগোছালো ভাবটাই তার সৃষ্টিশীলতাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তার এই উগ্র নেশা যখন মাথাচাড়া দেয়, তখন সে ভুলে যায় সময়, চারপাশের বাস্তবতাকে। কেকে’র ছবি আকার নেশা আগে থেকেই। প্রফেশনালদের মতো ছবি এঁকে ফেললেও, কখনো এই শখটাকে প্রফেশনে পরিবর্তন করার ইচ্ছে জাগেনি তার। কোনো এক বিশেষ কারণেই,নিজেকে স্বস্তি দেবার জন্য সে আজও ছবি আঁকে।
​ক্যানভাসের সামনেই বিশাল এক ফ্রেঞ্চ উইন্ডো; যার ওপাশে দিগন্তজোড়া নীল সমুদ্র। সকালের কাঁচা রোদের সোনালী আভা সমুদ্রের জলস্রোতে মিশে এক মায়াবী ঝিলিক তৈরি করেছে। ওপাড়ের আধুনিক শহরটাকেও দেখা যাচ্ছে অস্পষ্ট রেখায়। কেকে সেই অনবদ্য দৃশ্যটিকেই তার রঙ-তুলিতে জীবন্ত করে তুলছে।
​আঁকাআকির একপর্যায়ে কেকে তার হেডফোনটা খুলে ঘাড়ে ঝুলালো। আড়চোখে পাশে তাকাতেই দেখল, তার পাশে অত্যন্ত ভদ্রভাবে বসে আছে টমি। নীল চোখের সাইবেরিয়ান সাদা-কালো এই হাস্কি কুকুরটি যেন কোনো শিল্পবোদ্ধার মতো একমনে কেকে-র পেইন্টিংটা দেখছে। কেকে তার দিকে তাকিয়ে সহজাত গুরুগাম্ভীর্যের সাথে বলল,

“হাউ ইজ দ্য পিকচার, টমি? ডু ইউ লাইক ইট?”
​টমি তার মালিকের প্রশ্ন বুঝতে পেরে তার বিশেষ নেকড়ের মতো স্বরে ডেকে উঠল, যার অর্থ দাঁড়ায়—প্রচণ্ড সুন্দর হয়েছে,সে মুগ্ধ। কেকে-র ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। সে আবারও ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থেকে; বুকে হাত গুঁজে বৃদ্ধাঙ্গুলিটা চিবুকে স্লাইড করতে করতে আত্মবিশ্বাসের সাথে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ইয়াপ, ইট’স রিয়েলি গুড। এন্ড হোয়াই নট? কেকে হ্যাজ পেইন্টেড দিস!”
​স্টুডিওর চারদিকের দেয়ালে চোখ বুলালে কেকে-র পছন্দের গভীরতা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশাল এই ঘরের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে তার আঁকা অসংখ্য পেইন্টিং। তবে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এই সংগ্রহশালার সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে ফেরারির নিত্যনতুন ব্ল্যাক কালেকশনের সব অত্যাশ্চর্য ছবি। প্রতিটি গাড়ির মডেলের আভিজাত্য আর কারিগরি সৌন্দর্য সে রঙের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে। প্রতিটি ছবির নিচে সে যত্ন করে নিজের সিগনেচার আর তারিখও বসিয়ে রেখেছে।
​প্রায় বছর খানেক সময় পেরিয়ে গেছে। মহাকালের নিয়মে অনেক কিছুই বদলেছে এই এক বছরে। কিন্তু কেকের জীবনে বিশেষ কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি, কিংবা সে তা লাগতে দেয়নি। সে আজও নিজের মেজাজেই অটল। কখনো সে উগ্র, উশৃঙ্খল আর বেপরোয়া, আবার কখনো পুরোদস্তুর একজন প্রফেশনাল এবং মার্জিত ব্যক্তিত্ব। তার চরিত্রের এই দুই বৈপরীত্যই হয়তো তাকে অন্যদের থেকে সবসময় আলাদা করে রাখে।

​’ব্ল্যাকভেইন এম্পায়ার’—বাড়ির অন্দরমহলে গুরুগম্ভীর আবহ বিরাজ করছে; ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের সেই গম্ভীর আবহে প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে হাজির হলো এক রূপসী রমণী।
পরনে তার গাঢ় লাল রঙের একটি লং গাউন;ফর্সা ত্বকে বেশ মানিয়েছেও বটে। মেয়েটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব তার আগুনের মতো লাল রাঙা চুল। হাতে কিছু খাবারের গ্লাস কন্টেইনার বক্স নিয়ে, ধীরপায়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে এলো সে।
​ওদিকে সোফায় বসে তখন সাদ আর জায়ান তুমুল গতিতে ভিডিও গেইমে রেসিং করছে। তাদের উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে; আর ফারিস পাশ থেকে তাদের সমানে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ রোজির আগমনে গেইমের সেই উত্তপ্ত আবহ যেন এক নিমেষেই থমকে গেল। সবাই নিজ নিজ কন্ট্রোলার পজ করে দিল। অস্থির চিত্তের সাদ তৎক্ষণাৎ সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

​—“আরে রোজি! তুমি এসেছো? এসো, এসো, তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম।”
​মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে রোজি লাজুক হেসে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। সাদ তার হাতের খাবারের বক্সগুলোর দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী স্বরে বলল,
​”খাবার এনেছো? তুমি বানিয়েছো নিশ্চয়! তোমার হাতের রান্না মানেই তো দুর্দান্ত কিছু। কী এনেছো আমাদের জন্য?”
​রোজি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
​”তেমন বিশেষ কিছু না। তোমাদের সবার জন্য টাকোস এনেছি, আর কেকে-র জন্য আলাদা করে লাজানিয়া।”
​রোজির কথা শেষ হতেই সাদ তীক্ষ্ণ বাঁকা হাসি দিয়ে টিপ্পনি কেটে বলে উঠল,
​”ওয়েই হোয়েই! আমাদের জন্য সাধারণ টাকোস, আর কেকে-র জন্য স্পেশাল লাজানিয়া? ঘটনা তো বেশ গভীর মনে হচ্ছে!”
​সাদের কথায় রোজি বেশ ইতস্তত বোধ করল। গাল দুটো সামান্য রক্তিম হয়ে উঠল তার। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
​”না, না, তোমরা যা ভাবছো তা নয়। ইয়ে মানে… তোমরাও খেও, সবার জন্যই তো এনেছি। তবে ও লাজানিয়াটা একটু বেশি পছন্দ করে, তাই আর কি…”
​সাদ হো হো করে হেসে উঠে বলল,

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝেছি। আমরা সবটাই বুঝেছি!”
​তাদের এই হালকা মেজাজের কথোপকথনের মাঝেই কেকে তার আর্ট স্টুডিও থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে এলো। দীর্ঘক্ষণ ছবি আঁকার পর তার চোখেমুখে সামান্য ক্লান্তি থাকলেও গুরুগম্ভীর্য কমেনি বিন্দুমাত্র। রোজি তাকে দেখামাত্রই ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
​”গুড মর্নিং কেকে! কেমন আছো তুমি?”
​কেকে একবার স্থির দৃষ্টিতে রোজিকে আপাদমস্তক দেখে নিল।অতঃপর নিজের সহজাত গাম্ভীর্য বজায় রেখে সংক্ষিপ্তে উত্তর দিল,
​”আই’ম গুড…গুড মর্নিং!”
​সে আর কথা বাড়াল না। পকেটে হাত গুঁজে বাড়ির বাইরের দিকে পা বাড়াল। কেকে-কে বেরিয়ে যেতে দেখে রোজি কিছুটা বিচলিত হয়ে বলে উঠল,
​”এখন কোথায় যাচ্ছো তুমি? আমি তো তোমার জন্য লাজানিয়া নিয়ে এলাম…”
​রোজির কথা শেষ হওয়ার আগেই কেকে নির্লিপ্ত গলায় বাঁধা দিয়ে বলল,
​”আমার সকালের ব্রেকফাস্ট করা হয়ে গেছে। রেখে দাও, পরে কোনো এক সময় এসে খেয়ে নেব।”
​”কিন্তু কেকে, এটা তো ঠান্ডা হয়ে গেলে একদমই…”

​রোজির আর্তি কেকে-র কানে পৌঁছাল কি না বোঝা গেল না। সে আর থামল না। নিজের কথাটুকু শেষ করেই এক মুহূর্ত দেরি না করে দৃঢ় পদক্ষেপে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার ছায়াসঙ্গী হয়ে পেছন পেছন বেরিয়ে গেল টমিও।
​কেকের এই অদ্ভুত আর রুক্ষ আচরণ দেখে সাদ আর জায়ান একত্রে বিড়বিড় করে উঠল,
​”এই বেটা দিন দিন আরও বেশি বিগড়ে যাচ্ছে। কারোর কোনো আবেগেরই তোয়াক্কা করে না!”
​রোজি ততক্ষণে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার উজ্জ্বল চোখ দুটো যেন মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। কেকে যে পথে চলে গেছে, সেদিকেই সে অপলক তাকিয়ে রইল। রোজিকে এমন হতাশ হতে দেখে সাদ তড়িঘড়ি করে সোফা ডিঙিয়ে তার কাছে এগিয়ে এলো। সান্ত্বনার সুরে বলল,
​”আরে রোজি, মন খারাপ করো না তো। ও বলেছে যখন, ঠিকই খাবে। এখন না হোক, পরে খাবে। তার চেয়ে বরং আমাদের এখন একটু খেতে দিলেও পারো; খুব খিদে পেয়েছে। বাই দ্য ওয়ে, তোমাকে কিন্তু আজ দেখতে হেব্বি লাগছে!”
​সাদের মজার কথায় রোজি শেষ পর্যন্ত হেসেই ফেলল। তার বিষণ্ণ মনটা কিছুটা হলেও হালকা হলো। তবুও মনের কোনো এক নিভৃত কোণ হতে, সে কেকের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে আওড়াল,
​”কতগুলো বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, তবুও তুমি আমায় বুঝতে চাইলে না কেকে। তোমার এই উদ্ধত আর অদ্ভুত আচরণ আমাকে আরও কত কাল সইতে হবে, তা কেবল ওপরওয়ালাই জানেন।”

​মিলানের তুলনায় রোমের আবহাওয়া এবং স্থাপত্যশৈলী অনেকটাই ভিন্ন। মিলান যেখানে আধুনিক-বানিজ্যিক ধাঁচের কিংবা একদম শার্প, ডমিনেটিং এবং হাই-এন্ড ফ্যাশনে মোড়া শহর; রোম সেখানে ঐতিহাসিকভাবে অনেক বেশি প্রাচীন ও রাজকীয়। শহরের প্রতিটি মোড়ে রয়েছে প্রাচীন সাম্রাজ্যের নিদর্শন, বিশালাকার পাথরের তৈরি স্থাপনা এবং মার্বেল পাথরের কারুকার্য।
এখানকার রাস্তাগুলো কিছুটা অগোছালো হলেও, সর্বত্রেই প্রাচীন আভিজাত্য মিশে আছে। টাইবার নদীর তীরের এই শহরটি তার বিশাল চত্বর বা পিয়াজ্জা এবং প্রাচীন ক্যাথেড্রালগুলোর জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
​দানিয়েল তার প্রথম মাস্টার্স শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় মাস্টার্সের জন্য ইতালির রোম ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। একই সময়ে নিমরা এবং সুহিনও সিদ্ধান্ত নেয় যে, যেহেতু দেশে তাদের প্রথম বর্ষ শেষ হয়েছে, তাই বাকি পড়াশোনা তারা ইউরোপেই সম্পন্ন করবে। সেই লক্ষ্যে ভাষা শেখা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি তারা সম্পন্ন করে। যথারীতি চেষ্টার পর নিমরা রোমের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও, সুহিন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি।
​এই নিয়ে দানিয়েল হয়তো মনে মনে বেশ হতাশ ছিল; কারণ ইতালিতে সুহিনের থাকা মানেই, সে তার কাছেই থাকবে। অথচ এখন তা হলো না। যদিও সে পরবর্তী সেশনে কিভাবে সুহিনকে তার ভার্সিটিতেই ভর্তি করানো যায়; তার জন্য এখন থেকেই বেশ তোরজোর শুরু করে দিয়েছে।

তবে সুহিনের এই নিয়ে বিশেষ কোনো আফসোস নেই। সে আপাতত দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দীর্ঘ ছুটি নিয়ে নিমরা ও দানিয়েলের সাথে ইতালিতে চলে এসেছে। তারা রোমে এসেছে মাত্র দিন দশেক হয়েছে। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ, ভাষা এবং জীবনযাত্রার সাথে মানিয়ে নিতেই তারা এখন ব্যস্ত সময় পার করছে।
​গত একটি বছর ধরে তারা তিনজন প্রায় একসাথেই থাকছে। এক বছর আগের নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার পর সুহিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে। আগে সে স্বভাবগতভাবে বেশ ভীতু এবং বোকা প্রকৃতির রইলেও, দীর্ঘ সময় দানিয়েল ও নিমরার সাথে থাকায় তার সেই জড়তা এবং ভয় এখন অনেকটাই কেটে গেছে।
​সুহিন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, তার এই পরিবর্তনের পেছনে নিমরার চেয়ে দানিয়েলের ভূমিকা অনেক বেশি। কোনো পারিবারিক বা রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তারা যেভাবে তাকে আগলে রেখেছে এবং আপন করে নিয়েছে, তা সুহিনের কাছে অনেকটাই অবিশ্বাস্য মনে হয়। বহু বছরেও সে কখনো এমন নিঃস্বার্থ আশ্রয় পায়নি। এই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই দানিয়েলের প্রতি তার এক গভীর শ্রদ্ধা ও নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।

​রোমের পড়ন্ত বিকেলের মায়াবী আভা ছড়িয়ে পড়েছে ভিলা বোরঘিজ পার্কের চারধারে; শহরের ব্যস্ততা থেকে খানিক দূরে এই উদ্যানটি এক টুকরো স্নিগ্ধতার আলয়। পার্কের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত শান্ত লেকটির পাড়ে একা বসে আছে সুহিন। তার পরনে শুভ্র সাদা রঙের একটি লং গাউন; বিকেলের মৃদু বাতাসে হালকা দুলছে। গাঢ় বাদামী চুলগুলো পরিপাটি করে মাথার ওপরে খোঁপা করে বাঁধা। হাতে একটি বোবা ড্রিংকসের কাপ।
​সুহিনের নীলাভ চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে লেকের স্বচ্ছ স্থির জলের ওপর। চারপাশে পর্যটক আর স্থানীয় মানুষের আনাগোনা থাকলেও, তার সামনের এই অংশটুকু অদ্ভুত রকমের নির্জন। গোধূলির শেষ রশ্মিটুকুও বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে; ঠিক তখনই সুহিন নিজের ভেতরে এক গভীর শূন্যতা অনুভব করল। নিমরা আর দানিয়েল কাছাকাছিই কোথাও গিয়েছে স্ন্যাকস কিনতে; সারাদিনের ক্লান্তি শরীরজুড়ে ভর করায় সে আর তাদের সাথে যাওয়ার উৎসাহ পায়নি।

​লেকের ধারের এই নিস্তব্ধতায় সুহিন ডুব দিল তার পুরোনো স্মৃতির অতল গহ্বরে।
কেকে চলে যাবার পর এক মূহুর্তেই যেন তার জীবনের অনেক কিছুই উলোটপালোট হয়ে যায়। সে অনেকভাবে চেষ্টা করে,একবারের জন্য হলেও কেকে’র সাথে যোগাযোগ করার—কিন্তু তা কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি।
সেই ঘটনার দুদিন পরই, দানিয়েল আর নিমরা তার সাথে দেখা করতে কাহসান কুঞ্জে যায়। গতকাল ভার্সিটি খুলেছে অথচ সুহিন ভার্সিটিতে যায়নি। ফোন করলেও কোনো খোঁজখবর নেই। বাড়িতে গিয়ে দেখে সে মন-মরা হয়ে পড়ে আছে; কি হয়েছে, তাতেও সে মুখ খুলতে নারাজ।
দানিয়েল মনে মনে আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। অতঃপর অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে একটি পার্কে নিয়ে আসা হয়। তিনজনে মিলে পার্কের এক নির্জন কোণে বসে জানতে চায়, ঘটনা কি।
“সুহিন, কি হয়েছে বল না ভাই। কোনো সমস্যা থাকলে বল আমাদের, তা না করে এমন মরার মতো হয়ে যাচ্ছিস কেনো।”

নিমরার কথায় সুহিন মুখ তুলে তাকায়। চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় দানিয়েলের বিচলিত মুখাবয়ব। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ, উদ্বিগ্ন চাহনি তার দিকেই নিবদ্ধ। সুহিন বেশিক্ষণ আর তার চোখের সামনে চোখ মেলাতে পারে না। সুহিন নজর নামিয়ে নিতেই, দানিয়েল আচমকা টেবিলের উপর রাখা তার হাতদুটো আগলে ধরে। সুহিন হকচকিয়ে মুখ তুলতেই,সে বলল,
“বউপাখি! কি হয়েছে এবার বলবে প্লিজ? ঐ বাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে? আর ভার্সিটিতে গিয়ে শুনলাম…গেস্ট প্রফেসর হিসেবে যে মি. কেকে এসেছিলেন, সে নাকি চলে গিয়েছে। বাড়িতেও তো এবার কাউকে দেখলাম না। ওনারা কি সত্যিই চলে গিয়েছে?”
সুহিন আনমনা হয়ে মাথায় নাড়ায়। দানিয়েল অজান্তেই কিছুটা খুশি হয়ে বলে,
“তাহলে তো বেশ ভালো কথা। তুমিই না বলতে, ওতোগুলো অপরিচিত মানুষের মাঝে তোমার অস্বস্তি হয়; এবার তো তুমি খুশি?”
সুহিনের মুখটা শুকিয়ে যায়। অচিরেই চোখজোড়া ভিজে ওঠে। তার এমন পরিবর্তন দেখে পাশ থেকে নিমরা ভ্রু উঁচিয়ে রূঢ় কন্ঠে বলল,

“এবার কি হলো? কাঁদছিস কেনো?”
সুহিন মাথা নুইয়ে ফেলে। দানিয়েল তার হাত-জোড়া আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলে,
“বউপাখি, কি হয়েছে? বলো না প্লিজ।”
পাশ থেকে নিমরা বলে ওঠে,
“ঐ এক সেকেন্ড, ঐ লোকগুলো চলে গেছে দেখে তুই কষ্ট পাচ্ছিস?ওদের মিস করছিস,এইজন্য কাঁদছিস?”
সুহিন মুখ তুলে তাকায়৷ নিজের কান্না থামিয়ে, দুজনের উৎসুক মুখাবয়ব একবার দেখে নেয়। সুহিন কিছু বলবে, তারই অপেক্ষায় দুজন চেয়ে আছে।
এরিমধ্যে সুহিন আচমকা ঠোঁট চেপে বলে উঠল,
“আ…আমার…বিয়ে হয়ে গেছে।”
তার এহেন কথায় শুনে নিমরা অকস্মাৎ উঠে দাঁড়াল। বিস্ময়ে তাজ্জব বনে চেঁচিয়ে বলল,
“কিহ্!”

দানিয়েলের হাত শিথিল হলো। সে অস্ফুটস্বরে আওড়াল,
“বউপাখি…তুমি…কি বলছো এসব…এটা কেমন মজা?”
সুহিন মাথা ঝাঁকিয়ে কান্না চেপে বলে,
“আমি মজা করছি না, এটা সত্যি।”
—“কার…কার সাথে বিয়ে হয়েছে তোমার?”
—“উনি বিয়ে করেছেন…”
সুহিন ঠোঁট চেপে একে একে সব ঘটনা খুলে বলল। বিস্ময়ে নিমরা নিজের মাথা ফাটাবে কিনা বুঝে উঠতে পারছে না। তবে ঘটনার শুরুতে বিস্ময় ও দানিয়েলের জন্য তীব্র খারাপ লাগা কাজ করলেও, শেষের দিকে বুঝতে পারল কাহিনিতে টুইস্ট আছে। সবটা শোনার পর, দানিয়েল কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। শুরুতে তার মনে হচ্ছিল, তার পুরো দুনিয়া উলোটপালোট হয়ে গেছে।
ওদিকে সুহিনের কান্না থামছে না। কেনো কাঁদছে সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না। দানিয়েল তার হাত এক মূহুর্তের জন্যও ছাড়ল না। আরো বেশি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল,
“বউপাখি শান্ত হও, কিচ্ছু হয়নি। তুমি যদি একবার আমায় এসব নিয়ে আগে বলতে… যাই হোক, যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। ধরে নাও একটা কালো অন্ধকার ছায়া তোমার জীবনে ক্ষণিকের জন্য এসে, তা আবার চলে গিয়েছে। এটা তো ভালো বিষয়, তুমি এতো কেনো প্রেশার নিচ্ছো বলোতো? তোমার তো কোনো দোষ নেই, তাই না? নিজেকে কষ্ট দেওয়া বন্ধ করো বউপাখি।”
ওদিকে নিমরা তখনো হতভম্ব হয়ে বসে আছে। তার কি এখানে বলার মতো আদৌও কোনো ভাষা আছে? তবুও সে কিসব ভেবে নিয়ে রুক্ষ গলায় বলতে শুরু করল,

“ঐ লোকটাকে আমার আগে থেকেই পছন্দ না। আজব মানুষ একটা। তাই বলে,এমন একটা কাজ করবে এটাও কল্পনা করিনি৷ নিশ্চয় লোকটার বজ্জাত কোনো পরিকল্পনা ছিল, আচ্ছা তোর জাভিয়ান আঙ্কেল কিছু বলেছে? সে জানে তো বিয়ের বিষয়ে?”
সুহিন মাথা নেড়ে বলে,
“জাভিয়েন আঙ্কেল দুদিন ধরে বাড়িতেও আসছে না। একজন মেড বলল, সে নাকি এনগেজমেন্টের রাতেই কাজের জন্য বিদেশে চলে গেছে।
আর বিয়ের বিষয়ে কেউ কিছুই জানেনা; শুধু ওনার বন্ধু তালহা ভাইয়া ছাড়া। উনি আমাদের বিয়েতে ছিলেন।”
‘আমাদের বিয়ে’ শব্দদুটো দানিয়েলের মস্তিষ্কে তীব্রতার সহিত বিঁধল। অজান্তেই এক জ্বালাপোড়া অনুভূত হলো তার সর্বাঙ্গে। তবুও নিজেকে শান্ত রেখে বলল,
“এটা বিয়ে নয় বউপাখি, হয়তো তার কোনো উদ্দেশ্য ছিল তাই সে এই কাজটা করেছে। নয়তো কেউ কাউকে বিয়ে করে, পরদিনই আবার তাকে অন্যকোথাও বিয়ে দিতে চায় কি করে। আচ্ছা আমার একটা প্রশ্ন ছিল, যদি তুমি….”
সুহিন উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। দানিয়েল কিছুটা ইতস্তত করল; নিমরা হয়তো বিষয়টা আন্দাজ করে নিল। সে দ্রুততর পাশ থেকে আড়ালে দানিয়েলের হাত’টা চেপে ধরল। দানিয়েল তবুও নিজেকে তটস্থ করে বলল,
“আ…তোমাদের মাঝে কি ওমন কিছু হয়েছে?”
সুহিন শুরুতে বুঝে উঠতে পারল না, দানিয়েল কোন বিষয়ে জানতে চাইছে। পরক্ষণেই তার ধীরস্থির মস্তিষ্কে কথাটা বোধগম্য হতেই, কিছুটা সংকোচ নিয়েই আওড়াল,

“না।”
দানিয়েলের উপর থেকে যেন বড়োসড়ো এক পাথর সরে গেল। সে ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“তবে তুমি এবার নরমাল হবার চেষ্টা করো। সে তো তোমায় বলেছে, তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে। যেহেতু বিয়েটা আইনগত ভাবে হয়ে গিয়েছে,সেক্ষেত্রে ডিভোর্সটাও হওয়া জরুরি। এটা একবার হয়ে গেলে, মনে হয় না আর কোনো চিন্তার বিষয় আছে। আর শোনো, তুমি যদি চাও এবার থেকে আমাদের সাথে থাকতে পারো। মানে নিমরা তুমি একই ফ্ল্যাটে…”
এভাবেই শুরু হয়েছিল তার জীবনের নতুন মোড়ের গল্প। শুরুতে কাহসান কুঞ্জ পুরোপুরি ছাড়তে পারেনি সে। যে সুহিন সবসময় চেয়েছে, ঐ বাড়ি থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে—সে তখন অজানা কোনো মায়াজালে আঁটকে পড়েছে। রাত-বিরেতে কেকে’র ঘরে প্রায়সই যাওয়া হতো তার। বেশিরভাগ সময় ঘুম আসত না, রাত জাগা মাফিনের মতো সারারাত সে-ও জেগে জেগে কাটিয়ে দিতো।
বিশাল বড় একটা প্রাসাদের অতিতুচ্ছ্য এক বন্দিনী মনে হতো নিজেকে। মাঝেমধ্যে আবেগের বশবর্তী হয়ে কান্নাকাটি করলে, পরক্ষণেই আবার নিজেকে বকাবকি করে সামলে নিতো। নিজেকে ধীরে ধীরে বুঝ দিতে লাগল, সে সম্পূর্ণ ভুল আশায় বসে আছে। দানিয়েল যখন একবার তাকে জিজ্ঞেস করে বসল,
“বউ পাখি তুমি কি কেকে’কে ভালোবাসো?”
সুহিন স্তব্ধ হয়ে রইল দুদণ্ড। পরক্ষণেই সোজাসাপ্টা জবাব দিল,

“না।”
সুহিনের মতে এটাই যথার্থ উত্তর। ওমন একটা মানুষকে কে ভালোবাসতে যাবে। মানুষ নয় অমানুষ একটা। শুধু শুধু তার জীবনে এক অন্ধকার ঝড় হয়ে এসে, অন্ধকারেই মিলিয়ে গেছে। তছনছ করে দিয়েছে সবকিছু। হ্যাঁ,সে ভুল করেছিল। কিন্তু সেই ভুলের জন্য এতো বড় শাস্তি তো তার প্রাপ্য নয়। অন্তত ক্ষমা চাইবার জন্যও তো নূন্যতম সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কই, কেকে তো তা করেনি। যদি কেউ কাউকে সত্যিই ভালোবেসে থাকে, তাহলে কি কেউ এমনটা করবে? না কখনো না, কেকে তাকে কখনোই ভালোবাসেনি। সবটাই তার গোপন কোনো উদ্দেশ্য, নয়তো পরিকল্পনার অংশ। অবশ্য লোকটা কি আদৌও ভালোবাসতে জানে?
বর্তমানে ফিরে সুহিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ আগেও তার ঠোঁটের কোণে যে ক্ষীণ হাসির রেখা ছিল, তা এখন ম্লান হয়ে বিষণ্ণতায় রূপ নিয়েছে। বছর খানেক আগের সেই একটি ভুল, আর তার বিনিময়ে পাওয়া এই দীর্ঘ প্রায়শ্চিত্ত। মানুষটা যেন কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল; একবারের জন্যও খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। অবশ্য তার মতো এক খামখেয়ালি আর রূঢ় মানুষের কাছে স্বাভাবিক আচরণের প্রত্যাশা করাটাই হয়তো বোকামি।
​ভাবলে আজও শরীর শিউরে ওঠে—সেই অদ্ভুত মানুষটাই তাকে বিয়ে করেছিল। কেন করেছিল, তার কোনো যৌক্তিক উত্তর সুহিন আজও খুঁজে পায়নি। সে একজন বিবাহিত নারী, তার আইনত স্বামী আছে, অথচ সেই মানুষটি আজও এক দুর্ভেদ্য অজানার আড়ালে। চিরকুটে বলেছিল সময়মতো ডিভোর্স দিয়ে দেবে, কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির কোনো চিহ্ন নেই।

​সুহিন এখন কেবল এই দমবন্ধ করা অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি চায়। তার মতে, একটি অসুস্থ সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগেই চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়াই ভালো। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তির জন্যও তাকে অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দানিয়েল গত এক বছরে বহুবার চেষ্টা করেছে কেকের সাথে যোগাযোগ করার; অসংখ্য ইমেইল পাঠানো হয়েছে শুধু একটি বিচ্ছেদের স্বীকৃতির জন্য। কিন্তু আজব সেই লোকটার অস্তিত্ব যেন পৃথিবী থেকে মুছে গেছে। কোনো উত্তর নেই, কোনো চিহ্ন নেই।
​সুহিন একটি ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোবা ড্রিংকসের স্ট্র-টা আনমনে নাড়তে-চাড়তে লাগল। লেকের জলে আকাশের শেষ লালচে আভাটা মিলিয়ে যেতে দেখে, সে অত্যন্ত ক্ষীণ-মলিন কণ্ঠে বিড়বিড় করে আওড়াল,

Naar e Ishq part 24

“আপনার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আপনি মানুষটাই যে সবার চেয়ে আলাদা; আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাধ্য কি আমার আছে? না আমাকে মুক্তি দিয়েছেন, না কখনো খোঁজ নিয়েছেন—কতটা অদ্ভুত, তাই না? আপনার মতো মানুষটাও আজও আমার স্বামীর স্বীকৃতি নিয়ে রাজত্ব করে চলেছে। আপনি আমায় দূরে সরিয়ে দিয়ে হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে আমি মুক্ত; অথচ সত্যিকার অর্থে আপনি আজও আমায় সম্পর্কের এই গোলকধাঁধায় ফাঁসিয়ে নিজের সেই অন্ধকার জগতে বন্দিনী করে রেখে দিয়েছেন।”

Naar e Ishq part 26